ছেলেবেলা
অনিতা নাগ
জৈষ্ঠের খাঁ খাঁ করা দুপুরে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশঃ উর্ধমুখী। নিজের ঘরে শীততাপনিয়ন্ত্রক মেশিনের ঠান্ডায়, জানলায় মোটা পর্দার আড়াল স্বত্বেও আনমনা অনু। ঘুম আসে না। আরাম আয়োজনের আড়াল সরিয়ে মন ছুটে চলে ছোটবেলার দিনগুলোয়। তখনও ঋতু পরিবর্তন হতো। গরম আসতো। কিন্তু এতো বিলাসী ছিলো না কিছুই। ঠান্ডা মেশিনের কথা তো তারা জানতোই না। অনেকের বাড়ীতে ফ্যান ও ছিলো না। তাদের পৈত্রিক তিনতলা বাড়ী। একতলায়, এখন যাকে গ্রাউন্ড ফ্লোর বলা হয়, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর আর কয়লাঘর। শুনে অবাক হয়ো না। তখন মাটির পাতা উনুনে রান্না হতো। সেই ঘরে মজুত করা থাকতো কয়লা আর ঘুঁটে। কয়লার বড় বড় চাঁই ভেঙে মা ছোট ছোট টুকরো করতেন। কয়লার গুঁড়ো জমলে জল দিয়ে মেখে মা গুল দিতেন। অনুর খুব পছন্দের কাজ৷ ছুটিছাটায় বাড়ী থাকলেই বায়না করতো। মা খুব রেগে যেতেন। তখন মার উপর খুব রাগ হতো অনুর। এখন বোঝে, আসলে এই সংগ্রাম থেকে তার আদরের মেয়েকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন মা। অনুদের ঘরে একটা ছবি টাঙ্গানো ছিলো, কালো কাপড়ের উপর রেশমি সূতোর নকশা তুলে লেখা ছিলো সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে। অনু ভাবতো গুল দেয়াটাও কি সেই গুণের মধ্যেই পড়ে! আজও উত্তর পায়নি অনু। কি করে যে একা হাতে মা অতো কাজ করতেন এখন ভাবতে অবাক লাগে। অনু তো এখন এত আরামে থেকেও একটুতেই বিরক্ত হয়ে পড়ে। আসলে ফ্ল্যাটবাড়ীর গণ্ডিতে থাকতে থাকতে মাপা কথা বলতে বলতে জীবনের সহজ ভাবটাই কেমন হারিয়ে যাচ্ছে। কথা বলবে কার সাথে! সকলেই ছুটে চলেছে। অনুদের ঘরে একটা কালো কূজোয় জল থাকতো। মা কর্পূর দিয়ে দিতেন। ঠান্ডা, শীতল জলে জীবন জুড়িয়ে যেতো। সন্ধ্যেবেলা একটুকরো অবসরে তালপাতার পাখায় মা শাড়ীর পাড় বসিয়ে মুড়ে দিতেন। যেমন সুন্দর লাগতো দেখতে তেমনি চলতোও অনেকদিন। সংসারের শতেক কাজের ফাঁকেও কতো রকম আমের আচার বানাতেন। কাঁচের বয়েম ভর্তি সেই আচার ছাদের রোদে থাকতো। সুযোগ পেলেই সেই আচার চুরি করে খেতো অনু। কি তার স্বাদ। মা ঠিক বুঝতে পারতেন। একসময়ে মিটসেফ বন্দী হতো আচারের বয়াম। বাবা বিকেলের শিফটে অফিস বেড়িয়ে গেলে ঘরে মা আর অণু। মা ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি বারান্দায়। কতো রকমের ফেরীওয়ালা আসতো। সাইকেলে কাঁচের বাক্সে হরেক মণিহারী জিনিষ নিয়ে যে লোকটি আসতো তার মুখে বসন্তের দাগ, গলা ভাঙা। সেই ভাঙা গলায় সে হাঁক পাড়তো, হরেক জিনিষ নেবে….., পাশের বাড়ীর হিন্দুস্থানী বন্ধু রূপার মা কিনতো কাঁচের চুড়ি। অনু কিনতো বৈশাখী মেলায়। সব কিছুর জন্য একটা সময় নির্দিষ্ট ছিলো। যখন তখন আবদার করার অভ্যেস ছিলো না। এখন তো কিছু পছন্দ হলেই মুঠোফেনে অর্ডার হয়ে যায়। অপেক্ষা করতে হয় না। একজন আসতো কাঠের ঠেলা গাড়ীতে রঙিন আসইক্রীম আর বরফ নিয়ে। বরফ ঘষে তাতে রঙিন সিরাপ দিয়ে বানিয়ে দিতো বরফের গোলা। বারান্দার এক কোণে রাখা তার পুতুলের সংসার, জমিয়ে রাখা বাসের টিকিট, কিতকিত খেলার জন্য লুকিয়ে রাখা টালির টুকরো, সামনের টালির চালের বাড়ীর বন্ধুরা, লুকিয়ে রাখা তেঁতুল খাওয়া, বর্ষায় মাছ ভেবে ডোবা থেকে ছোড়দার ব্যাঙাচী ধরা, মা' র বকুনি, গরম খিচুড়ির গন্ধ, সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় অনুর চেতনায়। সামনে খোালা পড়ে থাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো, গীতবিতান। মন তখন ঘুরে বেড়ায় এক অলিন্দ পেরিয়ে অন্য অলিন্দে। কতো রকমের আলো সেখানে।
জীবনের অপরাহ্নে এসে নিজের যে একটা ছোটবেলা আছে তাই তো ভুলতে বসেছিলো অনু। নানান সম্পর্কের জালে কোথায় হারিয়ে গেছে জীবনের স্বর্ণালী দিনগুলো। সম্পর্কের নানান রসায়ন মেলাতে মেলাতে নিজেকে খুঁজে দেখার সময় কোথায়! এখন তো তাল মিলিয়ে ছুটে চলা। তবু সেই শিকড় আজো আঁকড়ে বেঁধে রেখেছে। পথ হারাতে দেয় না। আঁধার আসে, বিপদ আসে, হতাশা আসে। জীবন যে বড় জটিল। তবু আজও সব প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠার মনের শক্তিটুকু সেই ছোট্টবেলায় পাওয়া। সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ভীড়ে আলো হয়ে রয়েছে অনুর ছেলেবেলা। জীবনের সেই প্রিয় দিনগুলো আজ স্মৃতির অলিন্দে বন্দী। কখনো কোনো দমকা বাতাসে সেই ঘরের আগল যায় খুলে। যখন মেঘ জমে মনে, দিশাহারা লাগে তখন কানে ভেসে আসে রবিঠাকুরের সুর। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পায় আলো ভরা ছেলেবেলার দিনগুলোকে। দেখতে পায় উনুনের আঁচে লাল হয়ে যাওয়া মায়ের মুখটা। কপালে লাল টিপ, এলো খোঁপা বাঁধা। ওই আবার সাইকেলের ঘন্টা শোনা যায়। বাবা, তার বাবা। দরাজ কন্ঠে উচ্চারণ করছেন ‘গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেলো ক্রমে, মৈত্র মহাশয় যাবে সাগর সঙ্গমে’, সাইকেলের ঘন্টাটা ক্রমশঃ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বাবা…..,, দু' ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে অনুর চোখ থেকে। ঘোর কাটে। গীতবিতানটা হাতে তুলে নেয়। তার এখনকার আশ্রয়, তার দুখ জাগানিয়া।
“অমনি করে আমার এ হৃদয় তোমার নামে হোক-না নামময়
আঁধারে মোর তোমার আলোর জয় গভীর হয়ে থাক জীবনের কাজে”।।
আঁধারকে জয় করার মন্ত্রকে আগলে রাখে বড় সাবধানে। হঠাৎ দু'চোখে অকাল বর্ষণ নামে। ঝাপসা হয়ে যায় গীতবিতানের অক্ষরগুলো। শুধু সুরটা রয়ে যায় আলো হয়ে।

No comments:
Post a Comment