শান্তিনিকেতনের নিয়ে গুরুদেব এবং মহাত্মা গান্ধীর দ্বন্দ্ব
বটু কৃষ্ণ হালদার
বৈশাখ মাসের সঙ্গে বাঙ্গালীদের নাড়ির সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে। পয়লা বৈশাখ যেমন বাঙ্গালীদের কাছে এক অতি প্রিয় লোক উৎসব, তেমনি ২৫ বৈশাখ হলো বাঙালির কাছে অত্যন্ত আনন্দের।১২৬৮ সালের ২৫ শে বৈশাখ মঙ্গলবার কলকাতার জোড়াসাঁকোতে বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সারদা দেবীর কোল আলো করে জন্ম নিলেন রবি ঠাকুর। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভোরের আকাশে পূব দিকে সূর্য যেমন ওঠে হেসে হেসে, ঠিক তেমনই আমাদের হৃদয়ের আকাশে ছেয়ে আছে তোমার স্মৃতি পট।।১৩১৭ সালের ৩১ শ্রাবণ "গীতাঞ্জলি" ছাপা হয়েছিল।এই গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পর বিশ্বের লেখক কবিদের মধ্যে সাহিত্যে নবজাগরণের সূচনা করেছিল। এই "গীতাঞ্জলি" এনে দিয়েছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান নোবেল পুরস্কার। সর্বপ্রথম এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ভারতের গৌরব বাঙালি কবি রবি ঠাকুর। বিশ্বের দরবারে বাঙালি সত্তাকে তিনি প্রথম উন্মোচন করেছিলেন। সেই থেকে বাঙ্গালীদের আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি ঘটনাটা হল এদেশের সর্বশেষ্ঠ কলঙ্ক। তিনটি দেশের জাতীয় সংগীত যাঁর অবদান, নোবেল চুরি করে সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ের যুগে যুগে বিরাজমান। রাজনীতি প্রসঙ্গ বিশ্বকবির অবদান কম নয়। তিনি বরাবরই স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন লেখনীর মাধ্যমে।যেমন"আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসির হুকুম হইয়া গেলে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত দুই হাতে লোহার বেরি বাজাইতে বাজাইতে রবীন্দ্রনাথের গান ধরেন। তিনি গেয়ে ওঠেন_"সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে"।একদিন ভূপেন্দ্র কুমার বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত কে জিজ্ঞাসা করেন_"আচ্ছা দিনেশ তুমি তো ভীষণ চঞ্চল ছেলে, তুমি কি পড়ার সময় শান্ত হয়ে যাও? বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত বলে কবিতা। ভূপেন্দ্র কুমার জিজ্ঞেস করেন কার কবিতা? বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত উত্তর দেন রবীন্দ্রনাথের।এসবের মধ্যে দিয়ে তিনি দেশপ্রেমের নমুনা দিয়ে গেছেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছিল প্রচন্ড আন্তরিকতা ও ভালোবাসা।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জীবনশৈলী তে বিশ্বাসী অসীম সাহিত্যের দার্শনিক। সবচেয়ে বড় কথা তিনি ছিলেন জীবন রসের কবি। আসীম সসীমের মিলনকে কবি অনুভব করেছেন।প্রেম ভালোবাসার রূপে, রসে, গন্ধ, স্পর্শে, বিষাদে, সুখ দুঃখে পৃথিবীর তুচ্ছতম ধুলিকনা ও কবির কাছে পরম উপভোগ্য হয়েছে। সবই অভিষিক্ত হয়েছে সৌন্দর্যায়নের উৎসরসে। বিশ্বের অন্তর্নিহিত যার থেকে এই অনন্তময় পৃথিবীর সৃষ্টি, সেই অন্তর্নিহিত সৃষ্টির মূল সত্য কবির মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার সাথে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বে কোনো কিছুর স্থির নেই। সমস্ত বিপুল পরিবর্তনময়। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে অবিরাম। এই অনির্দিষ্ট ছুটে চলা, অনন্ত জীবন প্রবাহের এটাই বিশ্ব সৃষ্টির মূল তত্ত্ব। কবি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ও গভীর ভাবে অনুভব করেছিলেন।
১৯১৯ সালে বিশেষ করে জালীয়ানওয়ালাবাগে বর্বর হত্যাকান্ডের নায়ক জেনারেল ডায়ারের তীব্র নিন্দা করেন এবং সেই সঙ্গে ব্রিটিশ দের থেকে প্রাপ্ত নাইট উপাধি ত্যাগ করেন লর্ড চেমসফোর্ডকে তিনি বলেন যে, "আমার এই প্রতিবাদ, আমার আতঙ্কিত দেশ বাসির মৌন যন্ত্রণার অভিব্যক্তি"।এর থেকে বোঝা যায় তিনি কত না দেশ কে ভালোবাসতেন।তিনি শুধু কলম দিয়ে নয় মন প্রাণ দিয়ে দেশ কে সেবা করেছেন। তিনি এক দিকে দেশ প্রেম আর অন্য দিকে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে মোহিত করা দুটো কেই সমান তালে চালিয়ে নিয়ে গেছেন। সাহিত্য দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন সমগ্র বিশ্বে।তিনি বিশ্ব জোতিরময়ের অগ্নি বল য়। জীবন্ত প্রতিমূর্তি, যুগ যুগ ধরে জাজল্য মান।বিশ্ব কবি তাঁর অমূল্য সৃষ্টি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ লিখে পেয়েছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল ১৯১৩ সালে।বিদগ্ধ এশিয়ায় সর্ব প্রথম এই বিশ্ব সম্মানে ভূষিত হয়ে সমগ্র বাঙালি জাতি তথা ভারতকে বিশ্বের দরবারে এক আলাদা স্বাক্ষর রেখে যান। ।তিনি সর্বদা সন্ত্রাস বাদের বিরোধিতা করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কে সমর্থন করেন।১৮৯০ সালে প্রকাশিত "মানসী" কাব্যগ্রন্থ তে কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।হিন্দু _জার্মান ষড়যন্ত্র মামলায় তথ্য প্রমাণ ও পরবর্তী কালের বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায় তিনি গদর ষড় যন্ত্রর কথা শুধু জানতেন না বরং এই ষড়যন্ত্র তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী তেরাউচি মাসাতাকি ও প্রাক্তন প্রিমিয়ার ওকুমা শিগেনোবুর এর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। অন্যদিকে ১৯২৫ সালে একটি গ্রন্থে স্বদেশী আন্দোলনকে "চরকা" সংস্কৃতি বলে বিদ্রুপ করে রবি ঠাকুর এর কঠোর বিরোধিতা করেন।তিনি সাম্রাজ্যবাদ কে ঘৃণা করতেন।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার চোখে ছিল "আমাদের সামাজিক সমস্যা গুলির উপসর্গ"।এই কারণে বৈকল্পিক ব্যখ্যা হিসাবে তিনি বৃহত্তর জনসাধারণের স্বনির্ভরতা ও বৌদ্ধিক উন্নতির উপর গভীর ভাবে আলোক পাত করেন।তিনি অন্ধ বিপ্লব কে বিশ্বাস করতেন না।বাস্তব সম্মত উপযোগী মূলক শিক্ষার পন্থাটি কে গ্রহণ করার আহবান জানান।তাঁর এই ধরণের রাজনৈতিক মতবাদে অনেকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিলেন।১৯১৬ সালের শেষ দিকে সানফ্রান্সিসকোর একটি হোটেলে অবস্থান কালে একদল ভারতীয় চরম পন্থী রবি ঠাকুর কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কে উজ্জীবিত করার জন্য লিখেছেন অগনিত গান ও কবিতা, নাটক ইত্যাদি. তাঁর কবিতা "চিত্ত যেথা ভয় শূন্য" ও গান " যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে" রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে টনিক হিসাবে কাজ করেছিল।একলা চলো রে গানটি বাপুজির খুব প্রিয় ছিল।গানটির আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে মানব জীবনের অঙ্গlঙ্গি ভাবে জড়িত। সত্যই একা এই পৃথিবীতে আগমন ও একা একা ফিরে যাওয়া তবু ও এই বিশ্বের দরবারে আমার আমিত্ব সংজ্ঞায় ভাই ঝরায় ভাই য়ের রক্ত বা সন্তান ঝরায় পিতা মাতার রক্ত।মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কবির ছিল অমল মধুর।দলিত সম্প্রদায় দের জন্যে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা কে কেন্দ্র করে মহাত্মা গাঁধী ও ড: বি. আর. আমবেদকরের মধ্যে যে বিরোধের সূত্র পাত হয় তার সমাধানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গান্ধী তাঁর আমরণ অনশন প্রত্যাহার করে নেন ।স্বদেশ প্রেমে তিনি মোহিত ছিলেন কারণ দেশের উন্নতি কল্পনায় সর্বদাই উন্নত শীল চিন্তা করতেন। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় আনতে চেয়েছিলেন আমূল পরিবর্তন। তিনি বুঝেছিলেন যে একমাত্র শিক্ষার আলোয় অন্ধ কুসংস্কারছন্ন ভারতের মুক্তির পথ লুকিয়ে আছে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে মিলিয়ে দিয়ে নতুন শিক্ষার অঙ্গন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।আধুনিক চিন্তা ধারায় সমাজকে সাজাতে চেয়েছিলেন. আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠবে আধুনিক ভারতের সমাজ ব্যবস্থা, এই রাস্তায় আসবে প্রকৃত বিপ্লব, পাল্টাবে বস্তা পচা ধ্যান ধারণা, আসবে উন্নতির জোয়ার তাই জ্ঞানের আলোয় সমাজকে আলোকিত না করলে থমকে যাবে উন্নত সমাজ ব্যবস্থা র ধারা।আর উন্নত সমাজ না গঠন হলেগড়ে উঠবে না উন্নত দেশ। উন্নত দেশগড়ার মানচিত্র থেকে যাবে খাঁচায় বন্ধী পাখির মত,শুধু ই ডানা ঝাপটাবে কিন্তু অসীম আনন্দের দিশা খুঁজে পাবে না।১৯১৭ সালের ১১ ই অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার সানটা বারবারা ভ্রমণের কালে এই চিন্তা ধারার ফলশ্রুতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নতুন ধরণের বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করেন।তাঁর হাতে গড়া শান্তিনিকেতনের আশ্রম টিকে দেশ ও ভূগোল এর গণ্ডির বাইরে ভারত ও বিশ্বকে এক সূত্র ধারায় বিশ্ব পাঠ কেন্দ্র তে পরিনত করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।এক কথায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কে এক ধারায় আনতে চেয়েছিলেন।অবশেষে ১৯১৮ সালের ২২শে অক্টোবর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিলান্যাস করেন।১৯২২ সালের ২২ শে ডিসেম্বর উদ্বোধন করেন বিশ্ব বিদ্যালয়েরর।তিনি নিজে কঠিন পরিশ্রম করে অর্থ জোগাড় করেছেন শুধু মাত্র দেশের মানুষ কে সু চিন্তায়, সু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে বলে।তিনি পেয়েছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থের জন্য সেই পুরস্কার এর অর্থ মূল্য ও ব্যয় করেন বিশ্ব বিদ্যালয়ের জন্যে।১৯১৯ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত একাধিক বার ইউরোপ ও আমেরিকায় গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে অর্থ জোগাড় করতে।তিনি এক ধারে মহান ব্যক্তিত্ব অন্য দিকে সাহিত্যের দরবার।ভারতের সক্রিয় রাজনীতিতে তিনি নিজেকে যুক্ত না করলেও অনেক খানি ভূমিকা পালন করেছিলেন কারণ সমসাময়িক কিছু কিছু ঘটনা গুলি (বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন, জালীয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ইত্যাদি)থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি বরং তিনি ছিলেন স্বদেশীকতার বরেন্য পুরুষ। ১৮৯৬সালে কলকাতায় যে কংগ্রেস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে " বন্দে _মাতরম" গানটি রবি ঠাকুর উদ্বোধন করেন।মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর শিবাজি উৎসব পালন করেন তার অনুপ্রেরণায় তিনি লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা "শিবাজী উৎসব"।
কবিগুরুর স্বপ্নের শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীর নানা বিভাগের পরিচালনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে কত সময় আর্থিক কৃচ্ছতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে একথা আজ আর আমাদের নিকট কারো অজানা নয়।বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য কবিকে অনেক সময় দেশে বিদেশে ভাষণ দিতে হয়েছে মাঝে মাঝে তিনি শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকদের নিয়ে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সংগীত নিত্য নাট্যাভিনয় জন্য ঘুরে বেড়াতেন। অর্থের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টা গান্ধীজীর মনে খুব কষ্ট দিত।রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে একবার অর্থ সংগ্রহের জন্য উত্তর ভারত অঞ্চলের সফরে বের হলেন এই সংবাদ গান্ধীজীর মনে ব্যথা দিলো। দিল্লিতে সদলবলে কবির সঙ্গে গান্ধীজীর সাক্ষাত হলে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিকে ফেরত পাঠালেন।
গান্ধীজী গুজরাটের ওয়ার্ধা থেকে ১৩/১০/১৯৩৫ তারিখে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন_"একথা আমার নিকট ভাবনার অতীত বলে মনে হইতেছে যে আপনার এই বয়সে আপনাকে আবার ভিক্ষার উদ্দেশ্যে বাইর হইতে হইবে আপনার শান্তিনিকেতনের বাইরে পা বাড়ান ব্যতীত ই এই অর্থ কে আপনার নিকট পৌঁছে দিতে হইবে"। মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে ব্যবসায়ীরা রবীন্দ্রনাথের নিকট ৬০ হাজার টাকা পৌঁছে দিলেন। ওই অর্থে শান্তিনিকেতনের বহু ঋণ শোধ করা হয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেব নিজের উত্তরোত্তর বার্দ্ধনমান বিশ্বভারতীর জন্য চিন্তা করতে শুরু করলেন। কারণ মৃত্যু চিরন্তন সত্য, তাকে উপেক্ষা করার মতো সাহস বিশ্বে কারো নেই। এই ভেবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করতে লাগলেন যে তার অবর্তমানে বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ কী হবে। এই ভাবনা গুরুদেবের মনকে প্রবলভাবে ভারাক্রান্ত করে তুলতে লাগলো। তবে তিনি চিন্তা করেননি এমনটা নয়, ভেবেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর কথা। মহাত্মা গান্ধীর নিকটের বিশ্বভারতী স্থায়িত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ গুরুদেবের চোখে গান্ধীজী যেমন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতাও অপরিসীম তেমনি বিশ্বভারতী আদর্শের প্রতি অতি নিয়ে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাবান ছিলেন। মনে মনে এত শত ভাবার পর গান্ধীজীর অনুমতি না নিয়ে গুরুদেব বিশ্বভারতীর একজন আজীবন ট্রাস্টি মনোনীত করেন গান্ধীজী কে। ট্রাস্টি মনোনয়নের পর পর কবি গান্ধীজী কে একটি চিঠি লিখেন_"(১০.০২.১৯৩৭) আমি আপনাকে আমাদের বিশ্বভারতীর একজন আজীবন ট্রাস্টি মনোনীত করার স্বাধীনতা গ্রহণ করেছি। আমার জীবনের এই ভাঙ্গা শেষ বয়সে জিনিসটা জানতে পারলাম যে যে প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশ এবং শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য নিয়োজিত করিয়াছি সেই প্রতিষ্ঠান আপনাকে তার একজন অভিভাবকরূপ লাভ করিবে"। উদ্ভিদও উক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাত্মা গান্ধীকে কতটাইনা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে।
তবে সমস্যার সূত্রপাত হলো এখান থেকে। গুরুদেব এভাবে গান্ধীজিকে বিশ্বভারতীর আজীবন ট্রাস্টি মনোনয়ন দেওয়ার উভয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়েছিল।গান্ধীজী রবীন্দ্রনাথের এই চিঠির উত্তরে যে কথা লিখেছিলেন তার মধ্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যে গান্ধীজিকে এই ট্রাস্টি মনোনয়নের ভিতরে প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষে অর্থ সংগ্রহের যোগ আছে।মহাত্মা গান্ধীর একথা ঠিক অভিপ্রেত না থাকলেও গান্ধীজীর উত্তরের ভিতরে দিয়ে একথা কবিগুরু মনে মনে ক্ষুন্ন হয়েছিলেন। একটা সময় শান্তিনিকেতনের জন্য গুরুদেব সংগীত নৃত্য নাট্যাভিনয়ের দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন,তা দেখে গান্ধীজি একটি পথে কবি এই জাতি সম্পর্কে একটি "ইবমমরহম সরংরপড়হ" বলে অভিহিত করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর এমন ধারণা দেখে কবিগুরু মনে মনে প্রচন্ড ব্যথিত হয়েছিলেন।গুরুদেবের এইজাতীয় সফরের সাথে আর্থিক প্রয়োজন এর কোন সম্পর্ক ছিল না এ কথা যেমন সত্য নয়, তেমনি শান্তিনিকেতনের জন্য কেবল অর্থ ভিক্ষার অভিযান বলে অভিহিত করলে ও ঠিক হবে না। গুরুদেব নতুন নতুন সৃষ্টিতে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালবাসতেন। সেই সৃষ্টির মধ্যে নিখুঁত সুরে নৃত্য অভিনয় রূপায়িত দেখতে দেখতে তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন। তাঁর কাছে অর্থের মূল্যের থেকে আনন্দের মূল্য কোন অংশে কম ছিলনা। যার ফলস্বরূপ বয়স কোনো বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি।বৃদ্ধ বয়সেও তাই দলবল নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরতে তাঁর উৎসাহের খামতি ছিল না। এটাতে শুধুমাত্র গুরুদেবের ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, যে দৃশ্য দেখার জন্য বিশ্বের সুতা ও দর্শক দিনের-পর-দিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। আনন্দ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মানুষের রুচি আচরণ জীবনের সাধারণ মূল্যবোধ উন্নত করে তোলাই গুরুদেবের মহৎ দায়িত্ব ছিল। এসবই ছিল গুরুদেবের দেশ ভক্তি র নমুনা।তিনি মনে করতেন এই সমস্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে দেশবাসীর প্রতি তার মহৎ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তবে গান্ধীজীর সহজাত ধারণা ভিন্ন ছিল বলে তিনি হয়তো এই সমস্ত অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই মহাত্মা গান্ধীর ধারণা সম্বন্ধে গুরুদেব একটি চিঠি লেখেন (২৬/২/১৯৩৭)_"আমার দিক হতে অকপটে আপনাকে একটা কথা বলতে দিন।আমি যে কাজকে সানন্দে আমার নিজের বন্ধু বলে মনে করই সম্ভবত আপনার নিজের ধাত্রী সে ব্রতের মহিমা উপলব্ধি করতে আপনাকে বাধা দেয়। আমার এই যে ব্রত তাহা ভারতবর্ষের কেবলমাত্র কোন আর্থিক সমস্যা লইয়া ব্যস্ত নয়। ভারতবর্ষের কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মমতের লইয়াও ব্যস্ত নয়। ইহা একটা ব্যাপক অর্থে মানব মনের সংস্কৃতিকেই ধারণ করে আছে।আমার মতে আমার একটি কবি সৃষ্টিকে আমি যখন বাহিরে পাঠাইয়া দিবার জন্য ভিতরে তাগিদ বোধ করি তখন আমি শুধু ভিক্ষা বা কোন উপকার আশা করি না।আমার এই কবি সৃষ্টিকে সাড়া দেওয়ার মতো যাদের মধ্যে একটি সংবেদনশীল হৃদয়ে আছে তাহাদের নিকট হইতে আমি আশা করি আমার সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রতি একটি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধার্ঘ্য"।
এই সমস্ত অনুষ্ঠানে অসুস্থ শরীরেও গুরুদেব দেশ-বিদেশে কেন নিজে সশরীরে উপস্থিত থাকতেন তার কৈফিয়ৎ স্বরুপে মুক্ত চিঠিতে আরো লেখেন_"একটা কথা আমি স্বীকার করতেছি, আমি নিজে যে সকল শিল্পীদের শিক্ষা দিয়াছি সেই সকল শিল্পী যখন ছন্দ তালে সমন্বিত অঙ্গ সঞ্চালন এবং সুরময় কণ্ঠস্বরে আমার কোন সৌন্দর্যের স্বপ্নকে একটি নিখুঁত রূপ দান করিতে চাহে তখন তাদের পাশে সগর্বে বসে থাকা অপেক্ষা আর অন্য কোনো জিনিসই আমি বেশি ভালোবাসি না। আমি সগর্বে এই জন্য বসে থাকি যেন তাহাদিগকে বলিতে পারি চমৎকার হইয়াছে"।

No comments:
Post a Comment