Tuesday, June 2, 2026


 

গণতন্ত্র 

অভিজিৎ সেন 


গ্রিক শব্দ "demos"(জনগণ ) "kratos"(শাসন) অর্থাৎ জনগণের শাসন হলো গণতন্ত্র । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধুমাত্র  সংখ্যাগরিষ্ঠরা শাসন করেন তাই নয় এখানে সংখ্যালঘু ও বিরোধী মতাদর্শের মানুষের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন,'Democracy is a government of the people, by the people and for the people' ভীমরাও আম্বেদকর বলেছিলেন,'Democracy is not just a method of government, it is a form of social organisation' প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে গণতন্ত্র হলো 'অজ্ঞদের শাসন' । তিনি তাঁর 'The Republic' গ্রন্থে গণতন্ত্রের বদলে একজন 'দার্শনিক রাজা'র শাসনকে উপযুক্ত মনে করেছেন । অ্যারিস্টোটলের মনে করতেন গণতন্ত্র হলো 'বিকৃত শাসন ব্যবস্থা' । তাঁর মতে গণতন্ত্র হলো বহুজনের বা দরিদ্রদের শাসন ব্যবস্থা যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে । কিন্তু তিনি মধ্যবিত্তের শাসনকে সর্বোত্তম মনে করতেন । যা অনেকটা আধুনিক গণতন্ত্রের কাছাকাছি । 

               আধুনিক যুগে ইউরোপে বিভিন্ন দার্শনিক ও চিন্তাবিদেরা যেমন জন লক, জঁ জ্যাক রুশো, জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রের পক্ষে নিজেদের যুক্তিপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। আধুনিক গণতন্ত্র ও উদারতাবাদের জনক হলেন জন লক । 'Two Treatises of Government'(১৬৮৯) জন লকের এই গ্রন্থটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসাবে পরিচিত । এখানে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে চলা, মত প্রকাশের অধিকার, নিজের শ্রম দ্বারা অর্জিত সম্পদ ভোগের অধিকারের কথা বলা আছে। বলা হয়েছে সরকার ঐশ্বরিক নিয়মে তৈরি হয় না মানুষ নিজের অধিকার গুলো রক্ষার জন্য পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে, সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সরকার গঠন করেন । যদি সেই সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয় স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, জনগণ সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন সরকার গঠন করতে পারে । তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে মত দেন। রাষ্ট্র ব্যক্তির উপর জোর করে ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারেন না । জন লকের রাজনৈতিক চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন পরবর্তীকালে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার ও রুশো । ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ও আমেরিকার সংবিধান লকের দর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ।

        দার্শনিক ভলতেয়ার মনে করতেন আইনের চোখে সবাই সমান । তিনি বাক্ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষপাতী না হলেও ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্র Liberty, equality, fraternity-এর পেছনে তাঁর লেখনীর অবদান ছিল ।রুশো 'জনগণের সার্বভৌমত্ব' এবং 'সাধারন ইচ্ছা'র ধারণা দিয়েছেন । তাঁর মতে প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব জনগণ যখন সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেবে। তিনি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রকে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে দেখেছেন । তিনি বলেন খেয়াল রাখতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন যাতে স্বৈরাচারে পরিণত না হয়। তিনি জোর দিয়েছেন সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার উপর। তিনি শিক্ষিত নাগরিকদের ভোটাধিকারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রচলিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে ধনীদের শাসন হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের মতে প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই আসবে যখন সমাজে কোন শ্রেণিবিভাগ থাকবে না এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ উল্লেখিত দার্শনিকগণ ব্যক্তি মানুষের মর্যাদা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করাকেই গণতন্ত্রের প্রকৃত লক্ষ্য মনে করেছেন। 

          আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রকে কয়েকটি ধারায় পরিচালিত হতে দেখা যায় । (১) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে নাগরিকরা কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয় । যেমন সুইজারল্যান্ডে যেকোনো জাতীয় বিষয়ে নাগরিকরা গণভোট বা রেফারেনডামের মাধ্যমে সরাসরি মতামত দেয় । একইভাবে কোন আইনের বিরুদ্ধেও তারা এভাবেই চ্যালেঞ্জ করে থাকে ।(২) সংসদীয় গণতন্ত্রে আইনসভা বা সংসদ সবচেয়ে প্রভাবশালী। প্রধানমন্ত্রী আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এই ব্যবস্থা লক্ষণীয়  ব্রিটেনে, জার্মানিতে ও কানাডায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের epicenter হল ব্রিটেন। ব্রিটেনে কয়েকশো বছরের বিবর্তন ও সংগ্রামের পথে এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল। ১২১৫ সালে রাজা জন ও বিদ্রোহী ব্যারনদের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'ম্যাগনা কার্টা'চুক্তির মধ্য দিয়ে । রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতা সীমিত হয়।
আইনের শাসন এবং জনগণের বিশেষত অভিজাতদের অধিকার স্বীকৃতি পায়। ১৬৮৮ সালে'গৌরবময় বিপ্লবে'র ফলে রাজা জেমস ক্ষমতারচ্যুত হন । রাজার দৈব ক্ষমতা বলে দেশ শাসন করতে পারবেন না। রাজার ক্ষমতা পার্লামেন্টের উপর নির্ভরশীল থাকবে।১৬৮৯ সালে পাশ হয় 'Bill of Rights' বলা হয় পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া রাজা কোন নতুন কর আরোপ করতে পারবেন না । পার্লামেন্টের সদস্যরা বাক্ স্বাধীনতা ভোগ করবে, নির্বাচন হবে অবাধ ও নিয়মিত । ১৭২১ সালে স্যার রবার্ট ওয়ালপোল ব্রিটেনের কার্যকরী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়েই রাজার হাত থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে ক্যাবিনেট ও পার্লামেন্টের হাতে আসতে শুরু করে । ব্রিটেনে ১৬৮৯ সালে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। Representation of the people act অনুযায়ী ১৯১৮ সালে নির্দিষ্ট শর্তে নারীরা এবং ১৯২৮ সালে সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সমান ভোটাধিকার লাভ করে। Reform act অনুযায়ী ১৮৩২ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরুষদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। বৃটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থাটি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে পরবর্তীকালে। ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি ৩০টির বেশি দেশ সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে বৃটেনের সংসদীয় কাঠামোকে অনুসরণ করে দেশ পরিচালনা করছে। (৩)রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান একজনই হন । ইনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। আইনসভা বা সংসদের কাছে তার কাজের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না। কারণ তিনি আইনসভার সদস্য নন। রাষ্ট্রপতি তার নিজের কাজের সহায়তার জন্য একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। আবার যেকোনো সময় তার পরিবর্তন করতে পারেন। এই ব্যবস্থা দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ব্রাজিলে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। (৪) সাংবিধানীক রাজতন্ত্রে রাজা বা রানী থাকলেও তার ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। মূলত এটি এক ধরনের সংসদীয় গণতন্ত্র। যেমন জাপানে সম্রাট রাষ্ট্রের প্রতীক, প্রকৃত ক্ষমতা জনগণের হাতে নির্বাচিত সরকারের হাতে। তেমনই নেদারল্যান্ড ও নরওয়েতেও রাজতন্ত্র নামমাত্র, শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক। (৫) সেমি প্রেসিডেন্সিয়াল গণতন্ত্রে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ভাগ করা থাকে। ফ্রান্স এমনই একটি মিশ্র শাসনব্যবস্থার উদাহরণ। ফ্রান্সের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা কে'fifth republic' বলা হয়। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, জরুরী ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ রাষ্ট্রপতি করেন। দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি, আইন প্রণয়ন, দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ, সংসদে সরকারের হয়ে জবাবদিহি, বিল পাস করানোর দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি বিরোধী দল হয় তখনো রাষ্ট্রপতিকে ওই বিরোধী দলের কোন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। ১৮৫৮ সালের পূর্বে ফ্রান্সে এ ব্যবস্থা ছিল না। তখন ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হতো। তাই জেনারেল শার্ল দ্য গোল এই ব্যবস্থা চালু করেন।  ফলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। ফ্রান্স ছাড়া রাশিয়া,  ইউক্রেন, শ্রীলংকা ও পর্তুগালে এই ব্যবস্থা আছে। এই মধ্যপন্থার জন্য এক দিকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার "স্থিতিশীলতা" এবং প্রধানমন্ত্রী দ্বারা শাসিত সংসদীয় ব্যবস্থার "জবাবদিহিতার"মেলবন্ধন ঘটে থাকে ।(৬) বর্তমান বিশ্বে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ব্যবস্থা বেশিরভাগ দেশে প্রচলিত। জনগণ সরাসরি দেশ পরিচালনা করার জন্য ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন । প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করেন। আইন সংশোধন করেন। ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিনিধি মূলক গণতন্ত্র। জনগণ দ্বারা সংসদ সদস্য এবং বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও একই পদ্ধতিতে গণতন্ত্র পরিচালিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরোক্ষ বা প্রতিনিধি মূলক গণতন্ত্রে জনগণ কংগ্রেস সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন । 
        
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কতটা গণতান্ত্রিক উপাদান বিদ্যমান ছিল আলোচনা করা যায়। বৈদিক যুগে সভা ও সমিতি নামে দুটি পরিষদ রাজার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করত । সভা ছিল গণ্যমান্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ছোট পরিষদ। যেখানে তারা বিচারকার্য ও পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতেন। সমিতি ছিল জনগণের একটি বড় সমাবেশ। এখানে সম্পদ বন্টন, যুদ্ধের প্রস্তুতি, জনসাধারণের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। সমিতির সদস্যরা সরাসরি রাজাকে  নির্বাচন ও পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখতেন। রাজা দায়িত্ব গ্রহণের সময় শপথ নিতেন প্রজাদের রক্ষা করবেন, আইন ও ধর্ম মেনে চলবেনা। বেদে 'গণ' বা জনপদের উল্লেখ আছে। গনের প্রধান কে বলা হয় 'গণপতি' । গণ অর্থাৎ গোষ্ঠী যারা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন। পূর্ববর্তী বৈদিক যুগে নারীরা সভা ও সমিতিতে অংশগ্রহণ করতেন, নিজেদের বলিষ্ঠ মতামত রাখতেন। ঋগ্বেদ ১০.১৯১.৩ বলা আছে "সমানো ও মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানীঃ" । অথর্ববেদ ৮.১২.১ বলা আছে " সভা চ মা সমিতিশ্চাবতাম্ প্রজাপতেরদুহিতরৌ সংবিধানে " অর্থাৎ সভা ও সমিতি প্রজাপতি এই দুই কন্যা যেন ঐক্যমাদের ভিত্তিতে আমাকে সুরক্ষা প্রদান করেন ।

                       খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ষোড়শ মহাজনপদে রাজতন্ত্রের পাশাপাশি প্রজাতান্ত্রিক জনপদের অস্তিত্ব ছিল। এগুলোকে "গণরাজ্য"বলা হতো। যেমন বৃজি, মল্ল, শাক্য,মোরীয় । এগুলোতে একক রাজবংশের শাসনের পরিবর্তে শাসনের মূল দায়িত্ব ন্যস্ত হতো একটি পরিষদের উপর। বৃজি বা লিচ্ছিবিদের কেন্দ্রীয় আইনসভা 'সাঁথাগারে' নাগরিক প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। কোন বিষয়ে মতবিরোধ হলে 'ভোট' বা 'ছন্দ' করা হতো। ভোট গণনার জন্য কাঠি বা 'শলাকা' ব্যবহার করা হতো। বিচার ব্যবস্থা স্বচ্ছ ছিল। বিচার বিভাগীয় কমিটি অর্থাৎ 'অষ্টকুলক'দোষী ব্যক্তিকে সাতটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিচার করতেন। যদি একটি স্তরেও নির্দোষ প্রমাণিত হতো তবে তাকে মুক্তি দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধ তাঁর বৌদ্ধ সংঘের নিয়মাবলী লিচ্ছিবিদের গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন। বুদ্ধদেব নিজে সাক্ষ্য বংশীয় প্রজাতান্ত্রিক পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। তাঁর শিষ্যদের জন্য গড়ে তোলা সংঘে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ ছিল না । সভার কাজ শুরু করার জন্য নূন্যতম সদস্যের উপস্থিতি বা কোরামের প্রয়োজন হতো । একে বলা হত 'গণপূরক' । মতভেদ হলে ভোট হতো শলাকা ব্যবহার করে ।'মহাপরিনির্বাণসূত্ত' অনুযায়ী বুদ্ধদেব পরবর্তীকালে বৃজিদের যে সাতটি নিয়মের কথা বলেন তা গণতান্ত্রিক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত---নিয়মিত জনসভা করা, একতাবদ্ধ হয়ে সভায় বসা ও কাজ করা, প্রচলিত আইনের শ্রদ্ধা এবং অপ্রয়োজনে কঠোর আইন না চাপানো, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা ও পরামর্শ গ্রহণ, নারী ও শিশুদের ওপর জোর জবরদস্তি না করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় স্থান ও ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা এবং জ্ঞানী ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান করা। বৌদ্ধ ধর্ম বর্ণপ্রথা বা বংশ মর্যাদার পরিবর্তে ব্যক্তির গুণ ও কর্মকে গুরুত্ব দিতেন। বৌদ্ধ নারী সন্ন্যাসিনীদের জন্য সংঘের ব্যবস্থা করেছিলেন। 

                  মধ্যযুগের ভারতে আজকের মতো রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল না ঠিকই তবে গণতান্ত্রিক উপাদানের উপস্থিতি ছিল বিশেষ করে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে। প্রাচীন যুগে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হর্যঙ্ক বংশীয় বিম্বিসার ও অজাত শত্রুর রাজতন্ত্রের পাশাপাশি বৃজির মতন যেমন গণরাজ্য ছিল তেমনি বিম্বিসারের সময় গ্রামের প্রধান বা গ্রামভোজকরাই স্থানীয় সমস্যা নিয়ে রাজার সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। নন্দ বংশের সময় মগধে মানুষের স্বাধীনতা ছিল না। মৌর্য যুগে বিশেষ করে অশোকের সময় বাক্ স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা লক্ষণীয়। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা'য় পৌর প্রশাসনের ভূমিকার কথা বলা আছে। কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের সময়ে ভারতে বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অনেক বেশি বিকশিত হয়। গুপ্ত যুগে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও নাগরিক স্বাধীনতা চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। গুপ্ত যুগে প্রাণদণ্ড বা কঠোর শারীরিক নির্যাতন ছিল না। প্রজাগণ রাজার অনুমতি ছাড়াই দেশের যে কোন জায়গায় যেতে পারতেন। হিউ ইন সাং এর বিবরণী থেকে জানা যায় হর্ষবর্ধনের আমলেও গুপ্ত যুগের স্বায়ত্তশাসন শাসন ব্যবস্থা অক্ষুন্ন ছিল । 

                  বাংলার স্বাধীন শাসক শশাঙ্কের (খ্রিস্টীয় ৫৯০-৬২৬) মৃত্যুর পর প্রায় একশত বছর বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন না থাকার ফলে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। সবল ব্যক্তিরা দুর্বলদের গ্রাস করতে থাকে ইতিহাস এই কাল খণ্ডকে "মাৎসান্যায়"বলে অভিহিত করেন। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে সেদিন বাংলার মানুষ যা করেছিলেন তা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য গণতান্ত্রিক ঘটনা। আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সাধারণ জনগণ, সামন্ত শ্রেণি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সম্মিলিত ভাবে আলোচনা করে গোপাল নামক এক যোগ্য সামরিক নেতাকে বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন ।
তার প্রমাণ পাল তাম্রশাসন 'খালেমপুর তাম্রপট' । এখানে উল্লেখ আছে "মাৎস্যন্যায় অপোহিতুং প্রকৃতিভিরলক্ষ্ম্যাঃ করং গ্ৰাহিতঃ শ্রীগোপাল ইতি " অর্থাৎ মাৎস্যন্যায় অবসান করার জন্য প্রকৃতি বা জনগণ গোপালকে লক্ষীর হাত বা রাজত্ব গ্রহণ করিয়েছিলেন। সেন আমলে কৌলিন্য প্রথার ব্যাপক প্রভাবে সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হয়েছিল। 

                ভারতের মাটিতে বহু পূর্বেই গণতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল । বহু বিবর্তনের পথ ধরে সেই গণতন্ত্র বর্তমানে মহীরুতে পরিণত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব শতকের গণরাজ্য, বৌদ্ধ সংঘ, প্রাচীন ও মধ্যযুগে গ্রামীণ স্তরে রাজার বদলে গ্রাম সভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আধুনিক যুগে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকালে ভারতীয়দের অধিকার সচেতনতা, জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার (১৮৮৫), মহাত্মা গান্ধীর ভারতব্যাপী গণ-আন্দোলন, মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার (১৯১৯)--আইনসভায় আসার এবং ভোট দানের অধিকার, ভারত শাসন আইন (১৯৩৫) এই আইন দ্বারা প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন চালু হয় এবং ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে ভারতীয়দের সরকার গঠনের অভিজ্ঞতা লাভ হয় । স্বাধীনতার পূর্বে 'গণপরিষদ' গঠন করে ভারতবাসীর জন্য সংবিধান তৈরীর কাজ শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩৮৯ জন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। মহিলা সদস্য ছিলেন ১৫ জন। যেমন সরোজিনী নাইডু, রাজকুমারী অমৃত কাউর, দুর্গাবাঈ দেশমুখ প্রমুখ । ডঃ বি আর আম্বেদকর ছিলেন সংবিধান খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান। ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৪৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ভারতের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালে ২৬ শে জানুয়ারী তা কার্যকরের মধ্য দিয়ে ভারত একটি "সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে । সংবিধানে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সমতা, দলিত ও শোষিতদের অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী-পুরুষ সকলের সমান ভোটাধিকার প্রভৃতি বিষয় উল্লেখিত থাকে। যেখানে আমেরিকা বা বৃটেনের মতো দেশেও নারী, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের ভোটের অধিকার পেতে কয়েক দশক লড়তে হয়েছিল । ১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ড. সুকুমার সেনের নেতৃত্বে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এভাবেই গণতন্ত্রের সকল পরীক্ষা হয় যা ভারতকে পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করে ।

                  মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীন ও মধ্যযুগ মূলত রাজতন্ত্র বা সামন্ততন্ত্র বা জমিদার তন্ত্রের একচ্ছত্র অধিকার। আধুনিক যুগে গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র প্রাধান্য লাভ করে। গণতন্ত্রের হাত ধরেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা প্রভৃতির চরম বিকাশ । রাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা রাজার হাতে থাকে, তিনি বংশানুক্রমিকভাবে ঐশ্বরিক শক্তির প্রতিনিধিত্বের দোহাই দিয়ে প্রজাদের উপর শাসন করতেন। প্রজাগণ এখানে রাজার অধীন। মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় জমির মালিক হতেন রাজা-বা জমিদারবর্গ । কৃষকেরা মূলত ভূমিদাস । 

                                আধুনিক যুগে প্রজাতন্ত্রে বা গণতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে চলে আসে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ দেশ শাসন করেন। জন প্রতিনিধিরা জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো স্বাধীনতা,সম্পদের রক্ষা,জীবনের সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়কেই প্রাধান্য দেন । নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সমান। গণতন্ত্রের হাত ধরেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের আগমন। গণতন্ত্রের বৃত্ত এখানেই সম্পূর্ণ হয়। 
              
ম্যাকিয়াভেলি 'The Prince' গ্রন্থে বলেছিলেন রাজাকে ছল,বল,কৌশল খাটিয়ে একনায়কতন্ত্র চালাতে হবে। মনে হতে পারে তিনি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের সমর্থক। কিন্তু তিনি মনে প্রাণে প্রজাতন্ত্র ও সীমিত গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। 'Discourses on Livy' গ্রন্থে প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রের প্রশংসা করে বলেছিলেন একজন রাজার চেয়ে সাধারণ জনগণ অনেক বেশি বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ । তিনি পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না "মিশ্র শাসন ব্যবস্থার"সমর্থক ছিলেন। তিনি মনে করতেন গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র হলো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নাগরিকদের সৎ, দেশপ্রেমিক ও আইন পরায়ন হতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না ।
                  
বিদেশি পর্যটক যারা ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের বিবরণীতে তৎকালীন সময়ের শাসনব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি অনেকটাই ফুটে ওঠে। প্রায় প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন এদেশে কেন্দ্রীয় স্তরে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও গ্রামীণ স্তরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বর্তমান ছিল। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' তার সাক্ষ্য দেয়। আল বিরুনী একাদশ শতকে তাঁর ' কিতাব-উল-হিন্দ' গ্রন্থে জাতিভেদের কঠোর সমালোচনা করলেও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেন। ইবনে বতুতা চতুর্দশ শতকে ' কিতাবুর রেহলা' গ্রন্থে বলেন গ্রামে স্বায়ত্তশাসন বজায় ছিল। সাধারণ মানুষ সুলতানের দরবার এসে রাজ কর্চারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারতেন । সপ্তদশ শতকে ফ্রাঁসোয়া বার্নিয় তাঁর "travels in the Mughal Empire' গ্রন্থে বলেন মুঘল যুগের সাধারণ মানুষের অধিকার ছিল না । কিন্তু আধুনিক যুগে তার ধারণা আংশিক ভুল ছিল বলে প্রমাণিত হয়। কারণ ভারতে কৃষকদের বংশানুক্রমিক জমির অধিকার ছিল । ইতালীয় পর্যটক নিকোলাও মানুচ্চি মুঘল 'দরবার-ই- আম' এর বর্ণনায় বলেন সম্রাট স্বৈরাচারী হলেও গরিব প্রজারা দরবার এসে অন্যায়ের বিচার চাইতে পারতেন। ১৮৩০ সালে চার্লস মেটক্যাফ ভারতের গ্রামগুলো দেখে তিনি এগুলোকে "little republics" বলেন। তাঁর বৃত্তান্তে লেখেন, 
"ভারতে একের পর এক রাজবংশের পতন ঘটেছে, বিপ্লব হয়েছে, হিন্দু, পাঠান, মোগল, মারাঠা--সবাই একে একে শাসন করেছে কিন্তু ভারতের এই স্বায়ত্তশাসিত গ্রামগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে । প্রতিটি গ্রাম যেন নিজের মধ্যে এক একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ।"

                   ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় খন্ডে ১২ থেকে ৩৫ নং ধারায় মৌলিক অধিকার গুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার খর্ব হলে ব্যক্তি ২২৬ নং ধারায় হাইকোর্টে ও ৩২ নং ধারায় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারেন। ছয়টি মৌলিক অধিকার আছে। ১৪ থেকে ১৮ নং ধারা সাম্যের অধিকার, ১৯ থেকে ২২ নং ধারা স্বাধীনতার অধিকার, ২৩ ও২৪ নং ধারা শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ২৫ থেকে ২৮ নং ধারা ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, ২৯ ও ৩০ নং ধারা সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার, ৩২ নং ধারা সংবিধানের প্রতিবিধানের অধিকার । আম্বেদকর ৩২ নং ধারাকে"heart and soul of the constitution"বলেছিলেন। তবে মনে রাখতে হবে মৌলিক অধিকারগুলো অবাধ বা চরম নয়। দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, জনশৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র এই অধিকার গুলোর উপর "যুক্তিযুক্ত নিষেধাজ্ঞা"জারি করতে পারেন । National emergency ঘোষিত হলে ২১ নং ধারা অর্থাৎ জীবনের অধিকার ছাড়া বাকি মৌলিক অধিকারগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করা যেতে পারে রাষ্ট্র । এখানেই গণতন্ত্রের নমনীয়তা,সৌন্দর্য এবং দীর্ঘস্থায়ীত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে। যা ছিল না রাজতন্ত্রে বা সাম্রাজ্যবাদে ।

No comments:

Post a Comment