পুরাতত্বের নিদর্শন জটিলেশ্বরে একদিন
কবিতা বণিক
জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির চূড়াভান্ডার অঞ্চলের পূর্বদহে জটিলেশ্বর মন্দির অবস্থিত। কাছেই জলঢাকা নদী। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন এ মন্দির প্রায় দেড়হাজার বছরের পুরোন। মন্দির চত্বরে এক বেশ বড় পুকুর আছে। সেখানেই মাটি থেকে কয়েক ফুট নীচে জটিলেশ্বর শিবলিঙ্গ অবস্থিত। বর্ষায় তিনমাস জলে ডুবে থাকে শিবলিঙ্গ। ভক্তরা মন্দিরের ওপর থেকেই পূজো করেন। গর্ভগৃহে নামা যায় না। গর্ভগৃহের ওপরে নন্দী মহারাজ বিরাজিত আছেন। মন্দির ঘিরে চারপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক দের খননের ফলে পাওয়া কালো পাথরের অনেক দেব দেবী, নর্তকীর মূর্তি খোদাই করা দেওয়াল । কিন্তু শিব মন্দিরের চূড়ো পরে ইট, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দেওয়ালে অনেক ছোট ছোট গর্ত আছে। সেসব গর্তে মৌমাছি, সাপ ইত্যাদি থাকে। মৌমাছিদের বেশ বের হতে ঢুকতে দেখা যায়। মনে হল সত্যিই মহাদেবের কাছে সবাই সন্তান। পুরো মন্দির কে লোহার ব্যারিকেডে রাখা হয়েছে। বাবা জটিলেশ্বরের কাছে ও কোন ভক্ত তার জটিল বিষয়ের সমস্যা জানালে বাবা তা পূরণ করেন। সে কারণেই এখানে মহেশ্বরের নাম জটিলেশ্বর। কথিত আছে জটিলেশ্বরের মাথায় জল ঢেলে জল্পেশে পূজো দিলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
জটিলেশ্বর মন্দিরের চারপাশে খননের ফলে পাওয়া উঁচু পাথরের দেওয়ালে প্রচুর দেবদেবী, নৃত্যরত গণেশ, হনুমান মূর্তি, নর্তকীর খোদাই করা মূর্তি রয়েছে। মূর্তি গুলো অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও হনুমান মূর্তি, নৃত্যরত গণেশ মূর্তি বেশ বোঝা যায়। দেওয়ালের গায়ে মুখ্যদ্বারের দুইপাশে দ্বারপালের মূর্তি খোদিত দেখা যায়। মন্দিরের পিছনে পুকুর থেকে শিব, গণেশ, বিষ্ণু, চণ্ডী, বুদ্ধ মূর্তি পাওয় যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিষ্ণু মূর্তি ও দ্বারপালের খোদিত মূর্তি র সাথে গুপ্ত যুগের মিল খুঁজে পান। তাদের ধারণা ৩২০ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তৈরি এই মন্দির। এ সময়টাও গুপ্তযুগের সময়কাল।
গুপ্ত যুগের সাম্রাজ্য বলা হয় যে প্রাচীন ভারতের সমস্ত উত্তর ভারত জুড়েই ছিল। এই সভ্যতায় ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ , রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য চর্চিত। ৩২০– ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গুপ্ত যুগকে সুবর্ণযুগ বলা হয়।
প্রত্নতত্ত্ব হল প্রাচীন কালের মানুষের জীবন যাত্রা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস জানার একটা বিজ্ঞান। মাটির নীচে চাপা পড়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীন নিদর্শন— হাতিয়ার, মৃৎপাত্র, মুদ্রা, অলংকার এবং স্হাপত্য ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে খনন ও বিশ্লেষণ করে মানব সভ্যতার অতীতকে পুনর্নির্মাণ করে। প্রত্ন অর্থ পুরাতন এবং তত্ব অর্থ বিজ্ঞান।
জটিলেশ্বর মন্দিরের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব শান্ত ও মনোরম। অনেক বড় বড় গাছ প্রাচীন বটগাছ, পুকুর পাড়ে ভক্তদের বা দর্শনার্থীদের বিশ্রাম বা বসার জন্য ব্রেঞ্চ পাতা ,বাঁধানো সেড দেওয়া জায়গা করে দেওয়া আছে। পাশেই আছে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির বা কুণ্ডেশ্বরী মন্দির । কারণ এখানে গর্ভগৃহে পোড়ামাটির ইটের তৈরি কুণ্ড আছে কোন বিগ্রহ নেই। মা কামাখ্যাকেও এখানে দেবী মানা হয়। এখানে ভক্তরা মাকে স্মরণ করে ধূপ দীপ, সিঁদুর দান করেন। একটু দুরে , রাধাকৃষ্ণ মন্দির সেখানে মদন মোহনের বিগ্রহ , গৌর, নিতাই, ইত্যাদি আছে, পথ চলার সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। বাঁধানো প্রাচীন বটগাছে ভক্তদের ভক্তি পূর্ণ প্রণাম ও মনোস্কামনা জানিয়ে গাছের ডালে লাল সুতো বাঁধা , পরিবেশের এ দৃশ্য যেন স্বর্গীয় প্রেম পূর্ণ শান্তির বার্তা দেয়। যুগে যুগে কত কোটি কোটি ভক্তের পূজো নিয়েছেন তাদের মনোস্কামনাপূর্ণ করেছেন। তাইতো আজও তিনি জাগ্রত। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা সত্যি।
শ্রাবণ মাসে , শিবচতুর্দশী উপলক্ষে ফাল্গুন মাসে , চৈত্র মাসে বারূণী স্নান উপলক্ষে আজও প্রচুর ভক্তদের ঢল নামে।







No comments:
Post a Comment