Monday, November 3, 2025


 


ভ্রমণ 


টিনটিনের দেশে এসে 

রণিতা দত্ত

সত্যি ই কি বড্ডো সাদামাটা ছিল আমাদের শৈশব, কৈশোর ? যারা ভাবেন তেমনটা, তারা ভীষণ ভুল ভাবেন। তখন হয়তো মস্ত এল সি ডির স্ক্রিনে বা মোবাইলফোনের ইন্টারনেটে এখন যা কিছু আছে তার বালাই ছিলনা। অথবা তখন যা ছিল, এখন অতিপাতি খুঁজেও তার হদিশ খুঁজে পাবেন না ।রিক্রিয়েষণ কি আমাদের ছিলনা? ছিল। বিনোদন বলতে ছিল সবুজ ঘাসে মোড়া খেলার মাঠে হুটোপুটি, সাদাকালো আখরে গল্পের বই। বরাদ্দ মাসিক কিছু পত্রিকা। শুকতারা, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা। বিশেষ পরিচিত জন কাকাবাবু সন্তু, প্রফেসর শঙ্কু, রুকু সুকু । মিথ্যে বলি কি করে ? সব থাকলেও আনন্দমেলার ঝলমলে কুড়ির পাতাটি মনকে সবচাইতে বেশি টানতো । দু'পাতা মাত্র। সে'জন্য সারা মাস অধীর আগ্রহের অপেক্ষা। রঙিন মন ছোঁয়া কমিকস স্ট্রিপে থাকতো টিনটিন।






ছোট্টখাটো চেহারার ইনভেস্টিগেটিং জার্নালিস্ট এই টিনটিন। ফরাসীরা উচ্চারণ করে ত্যাঁত্যাঁ| দেশ তার বেলজিয়াম বটে কিন্তু 'বোম্বেটে জাহাজ'এ চেপে 'লোহিত সাগরে হাঙ্গর' ধরতে ধরতে 'কৃষ্ণদ্বীপে' পৌঁছে যান রহস্য ভেদ করতে। কখনো বা 'মমির অভিশাপ' ভ্রষ্ট হয়ে 'সূর্য্যদেবের বন্দী' হয়ে যান। 'ওটোকারের রাজদন্ড' হাতে নিয়ে 'ফ্যারাও এর চুরুট' ফুঁকতে ফুঁকতে 'সোভিয়েত দেশে' গিয়ে পৌঁছান। হয়তো 'কালো সোনার দেশে' যাওয়ার পথে 'কঙ্গো' আর 'তিব্বত'ও ঘুরে নেন। মহাকাশের 'উল্কা' ছুঁয়ে 'চন্দ্রলোকে' পাড়ি জমান টিনটিন । কিশোরী মন। কমিকস এডভেঞ্চারে বুদ। দুপাতায় সন্তুষ্টি। ওদিকে অজানা ছিল তথ্য যে আমাদের"আনন্দ মেলা'র তৎকালীন সম্পাদক কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ই কিন্তু বাংলায় এই কমিকসের অনুবাদক। অনেকটা বড় হয়ে যখন জানলাম, তখন টিনটিন এডভেঞ্চারের এক একটা আস্ত বই ই পাওয়া যায়। আমাদের মত বাপ্ মা বই মেলায় উচ্ছসিত হয়ে কিনে দেন পরবর্তী প্রজন্মকে। আমরা পিছিয়ে যাই। প্রজন্ম এগোয়। বই চিৎপাত হয়ে কোথায় উল্টে পড়ে থাকে। চোখ তাদের আটকে থাকে টিভির কার্টুন শো তে। এখানে এসে এও জানলাম বাইকেলের মত হার্জের টিনটিন ও বহু ভাষায় অনুদিত বই । 







যুগ বিশ্বয়নের। ব্যক্তির স্থানিক অবস্থানটা খুব আপেক্ষিক। অতিসামান্য প্রয়োজন সাপেক্ষ্যে বদলে যায়। আমিই বা কিকরে এসে পৌছালাম বেলজিয়ামে। ব্রেসেলস । অদ্ভুত এক শহর। ফ্রান্স নেদারল্যান্ড আর জার্মানির ফোঁকোরে এমনি ভাবে ঢুকে আছে যে ডাচদের প্রভাব কোথাও রমরমে, কোথাও ফরাসিদের হম্বিতম্বী। জার্মানির সীমান্ত অল্প বলে ওরা খানিকটা নির্বিকার থাকে । টিনটিনের বাড়ির মার্লিন স্পাইক হলের ঠিকানাটা ভোলার নয় , 26, ল্যাব্রাডর রোড। তবে ব্রেসেলসের কোন কমিউনে এই রাস্তার অস্তিত্ব নেই মোটে। এদিকে আমার জামাতাটিও বেশ কার্টুন পাগল। ওর কাছেi জানলাম একটি গোটা মিউজিয়ামই নাকি আছে হার্জের কার্টুন ওয়ার্কের। সে খানিক দূরে এক ছোট্ট ছিমছাম শহরে ।একদিন সময় থাকতে লুভ্যেইঁ লা-নিউভ ( louvain-la-neuve) শহরের উদ্দেশ্যে বেরোলাম। ওখানে ই সেই 'আর জে' র সারাজীবনে আঁকা কার্টুন সযত্নে রাখা আছে। রাস্তার দুপাশে রঙ বেরঙের পাতার খেলা। বিচিত্র বর্ণে সেজে রয়েছে সারিবদ্ধ পর্ণমচি। অপেক্ষা রিক্ত শূন্যপত্র হয়ে শীতের ৱ্যাপার মুরি দেওয়ার। শুনলুম ডাচদের ছিল এই লুভ্যেইঁ শহর। ফরাসীরা জমিয়ে বসে নামের আগে জুড়ে দিলে 'লা নিউভ' অর্থাৎ নতুন লুভ্যেইঁ। মিউজিয়াম বিল্ডিংটি নিজেই নিজের মত সুন্দর । ইতিউতি বিচ্ছিন্ন কিছু ম্যাপেল বন সামনে। আর জে যাকে জর্জ রেমি বলে ঠিক কেউই চিনবেন না, মানে আমাদের হার্জের একটি মূর্তি সেখানে। নিবিষ্ট মনে বসে স্কেচ করছেন। এক পাশে টিনটিন সঙ্গে কুট্টুস। মিউজিয়ামে প্রবেশ পথে বিশাল কাঁচের দরজা। সসম্ভমে নিজে থেকে খুলে গেল। যেন অতিথি অভিবাদন করে অভ্যার্থনা জানাচ্ছে। টিকিট কাউন্ডারের সামনে ই রাখা নানা এডভেঞ্চারের সাক্ষ্যি সবুজ জিপ গাড়িটা । মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য মাত্র ২ ইউরো । সঙ্গে দিচ্ছে একটা করে অডিও ভিজ্যুয়াল ডিভাইজ। ল্যাঙ্গুয়েজ সেট করে নাও। তারপর শোনো,দেখ,ঋদ্ধ হও। ঋদ্ধ হওয়ার কথা কেন বললুম সে যখন মিউজিয়াম ছেড়ে ঘরমুখো হবো তখন আপনারাই বলবেন । মিউজিয়ামটি তিনতলা। টপফ্লোর থেকে প্রদর্শনী শুরু। টিনটিন যেন আর কেউ নন, স্রষ্টার নিজস্ব চরিত্রের চিত্রায়ন।প্রথম ঘরে ঢুকে ই হার্জে রেমির হাস্যজ্জ্বল একটি মুখ, যা ক্রমে মিলিয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠলো পেন্সিলের আঁকিবুকি। টিনটিনের স্কেচ। ওই ঘরের চতুর্দিকের দেওয়ালে আলোছায়ায় ছোটছোট বৃত্ত। বৃত্তে চলমান ছবি। একএক করে ছবি জীবন্ত হচ্ছে আবার মুহূর্তে পরিবর্তীত হচ্ছে। কখনো টিনটিন, কখনো ক্যাপ্টেন হ্যাডক, কুট্টুস তো আছেই তার পছন্দের হাড়ের টুকরোটি নিয়ে। আছেন আরও সব সঙ্গোপাঙ্গরা। সে এক বিচিত্র ঘোর লেগে থাকা মায়াময় পরিবেশ। এরপর থেকে যে ঘরে ই গেলাম সেখানে কাগজে আঁকা কমিকসের অরিজিনাল স্কেচ। কাঁচের শোকেসে কমিকসের গল্পানুক্রমে সযত্নে সংরক্ষিত। আমার গলায় ঝোলানো ডিভাইজে যে বিবরণী চলছে সে একই তথ্যচিত্র প্রতিটি ঘরের একটি দেওয়ালের স্ক্রিনে ও চলছে। প্রতিটি এডভেঞ্চার, তাদের প্রেক্ষাপট,সমসাময়িক থিম, আলোচনা সমালোচনা। এবারে দোতালায় এলাম। ওখানে ঘরের দেওয়ালে এক একটি চরিত্র ভিন্ন ভঙ্গিতে আঁকা। এই যেমন পাইপ ঠোঁটে টিনটিনের অভিন্ন হৃদয় নাবিক বন্ধুটি যিনি সিঙ্গেলমল্ট স্কচের প্যাশানেট সেই ক্যাপ্টেন হ্যাডক আছেন, আছেন গোলফ্রেমের চশমা নাকে ডগায় গুঁজে বেটেখাটো, কানেও বেশ খাটো, অথচ অংকে দর প্রফেসর ক্যালকুলাস।, মাথায় রাউন্ড ব্ল্যাক ক্যাপ, হাতে ব্যাঁকানো লাঠি এক্কেবারে অপদার্থ জোড়া গোয়েন্দা জনসন রনসনস গল্পে হাসির খোরাক জোগানো কাজ তাদের, আর ওই যে টিয়া পাখির ঠোঁটের মত নাক,কোকিল কন্ঠী মিলানের বিখ্যাত গায়িকা বিয়াঙ্কা কাস্তাফিওকা বা আর ক্যাপ্টেন হ্যাডকের বাড়ির হাউজহোস্টেজ নেস্টর কিংবা জেনারেল আলেকজেন্ডার এদের মুখের বিভিন্ন ভঙ্গিমার সারিবদ্ধ স্কেচ। যদিও এরা এডভেঞ্চার কাহিনীর সহায়ক চরিত্র তবু কি তারা পাঠকের চেনা নন ? হার্জের তৈরী সহায়ক চরিত্ররা অবশ্যই মূলচরিত্র থেকে পরিচিতিতে জনপ্রিয়তায় খুব একটা খাটো নন। এডভেঞ্চার কাহিনী রূপায়নে চারিত্রায়ন এতো সাবলীল, প্রাঞ্জল যে প্রত্যেকের উপস্থিতি যেন কাহিনীটিকে নির্ভরযোগ্য ভাবে সঞ্চালনার জন্য অপরিহার্য। মনে গেঁথে ছিল সকলের কথা।হার্জে এই কমিক স্ট্রিপ সিরিজটি আঁকতে লিন ক্লেয়ার (ligne claire) নামের শৈলী ব্যবহার করেছিলেন বলে জানলাম।




এতকাল বিনোদন হিসেবে কমিকস পড়েছি। তবে সেখানে ও পেন্সিল স্কেচের ব্যাকগ্রাউন্ডে আপাত স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে সমাজ, রাজনীতি অর্থনীতির মত মূল উপাদান যেগুলোকে এড়িয়ে গেলে কোন শিল্পকর্ম ই কালোজয়ী হতে পারেনা। প্রকাশিত হলো হার্জের প্রথম কার্টুন কাহিনী "সোভিয়েত দেশে টিনটিন'।বলশেভিক বিপ্লবের যুগ ।পশ্চিমা বিশ্ব 'লাল আতঙ্কে' তটস্থ। কখন বা বিপ্লব ঘটে। খেটেখাওয়া মানুষের দখলে যায় ক্ষমতা ! ।হার্জে কাহিনীর মধ্যে দিয়ে সমাজ তন্ত্রের নামে ভণ্ডামি তুলে ধরলেন।কার্টুন গল্পে দেখানো হলো মস্কোর রাস্তায় প্রকাশ্যে যারা নিজেদেরকে কমিউনিস্ট বলে স্বীকার করছে শুধু তাদেরকেই সরকারি ত্রাণ দেওয়া ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নইলে লাইন থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়া হচ্ছে। লিখলেন,"তুমি এমন আস্তানায় এসেছ যেখানে লেনিন, ট্রটিস্ স্তালিন সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বহু সম্পদ জমিয়ে রেখেছে।” হার্জে টিনটিনের মুখ দিয়ে কতটা শক্ত থাকলে এই সংলাপ তিনি লিখতে পারেন। কার্টুন কাহিনীতে আসন্ন যুদ্ধের বারুদের গন্ধ। জার্মানরা বেলজিয়াম দখল করেছে।যুদ্ধের আবহে লেখা হলো "কাঁকড়া রহস্য "দ্য ক্র্যাব উইথ গোল্ডেন ক্লোস"। ফ্যাসিবাদ বিরোধী ব্যঙ্গ আঁকাঝোঁকায় রূপ নিল কার্টুনে 'ওটোকারের রাজদণ্ড " কাহিনীতে। ক্রমে কলম পেন্সিল স্বাধীনতা হারালো। হার্জ যে সংবাদপত্রে কাজ করতেন, সেটি নাৎসি নিয়ন্ত্রিত । এই সময়ে টিনটিনের গল্পে কিছু পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন হার্জ । কমিকস থেকে রাজনৈতিক উপাদান ছেটে ফেলেন।বেশি মনোযোগ দেন চরিত্রায়ণ, কাহিনী এসব দিকে । তবে "কঙ্গোর জঙ্গলে "কাহিনীতে বর্ণবৈষম্য সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রকাশ পাওয়ায় হার্জকে সমালোচনার মুখোমুখি করে। চোরাচলানকারীর পিছু ধাওয়া করে টিনটিন এল মিশরে। কাহিনী "ফ্যারাও এর সিগারেট"। সেখান থেকে টিনটিন এল ভারতে। এরপর এল চীনের সাংহাই শহরে।কাহিনী 'ব্লু লোটাস'। চীনে জাপানি দখলদাররা কিভাবে পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছে চীনের জনগণের ওপর এ সত্য তুলে ধরে হার্জের কাহিনী হয়ে উঠলো চীনের এক অন্ধকার সময়ের দলিল।এভাবেই আলোচকদের বিশ্লেষণ চলছিল, সংশ্লিষ্ট তথ্য ও কিছু সমকালীন ছবি উপস্থাপনা চলছিল। যদিও একসাথে চোখে দেখা, কানে শোনা, দ্রুত ইংরেজি অনুধাবন কাজগুলো বেশ হেকট্রিক লাগছিলো। একটা গোটা দিন হয়তো প্রয়োজন ছিল ছোট্ট একরত্তি এই মিউজিয়ামটি বুঝে উঠতে। জানা ছিল না এমনি ভাবে কমিকস কাহিনীর প্রতিটি খুঁটিনাটি ঘটনার চুলচেরা পর্যালোচনা হয়।কিভাবে 





  বিকেল ৫:৩০, অ্যালার্ম বেজেছে। এবারে মিউজিয়াম বন্ধ হবে। সুভিনির শপ থেকে দুটো পোস্টকার্ড নিয়েছি। এখন আন্তর্জালের যুগ। যদিও এমনি খেয়ালগুলো মানুষের কমেছে তবে  বিলুপ্ত হয়ে তো যায়নি। মিউজিয়াম দেখে ভালো লাগলো এতো কি আর বলবো। সম্পূর্ণ অন্য স্টাইলে প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ সমালোচনা আর ঘন্টা সাড়ে চার পেরিয়েছে কখন খেয়াল করিনি। শুকনো পাতার গালিচায় পা রেখে এগোচ্ছি। মর্মর শব্দ শুনছি। যখন এসেছি তখনও পাতার মর্মর শব্দ নিশ্চই হয়েছে কিন্তু আলাদা করে কানে তো আসেনি অবচেতন আর সচেতন দুই অবস্থার মাঝে ফারাক এই এতটুকু ই মাত্র।


 

আমার লেহ লাদাখ ভ্রমণ
         ছবি ধর 

বিস্ময়কর সৌন্দর্যপূর্ণ  প্রকৃতি এবং ভারতে আমি যতগুলো জায়গা ঘুরেছি তার মধ্যে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর মনে হয়েছে লেহ লাদাখ।

চারদিকে পাহাড়ের দুর্গ, উড়ন্ত রঙিন প্রার্থনা পতাকা,সেনা শিবির, স্তূপীকৃত নুড়িপাথর, খুবানি বাগান, ছোট ছোট কাদামাটি ঘর,গোলাপি গালওয়ালা শিশু এবং আরও অনেক কিছু। লেহ লাদাখের আকাশের রঙ সবচেয়ে অপূর্ব সুন্দর ন্যাড়া পাহাড় তবুও যেনো বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।

লাদাখে সৌন্দর্যের বিশুদ্ধতম রূপ খুঁজে পাই এবং গন্তব্যের মতো ভ্রমণও উপভোগ করার জন্য যথেষ্ট।
লাদাখ খালি একটা ট্যুরিস্ট প্লেস নয় বেশিরভাগ মানুষের কাছে একটা স্বপ্ন। ঘন নীল আকাশ, মাঝে সাদা মেঘের ভেলা, রুক্ষ উষর এলাকা, লাল হলুদ, বাদামী রঙের ন্যাড়া পর্বতের সারি, নীল জলের বিশাল মায়াবী হ্রদ, সহজ সরল মানুষ, ও সুন্দর আথিথেয়তা,বৌদ্ধধর্ম,অসাধারণ এবং ভয়ঙ্কর সব রাস্তা, পৃথিবীর কিছু উচ্চতম পার্বত্য গিরিপথ এসব নিয়েই লাদাখ, এসবই লাদাখকে আমাদের পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরেছে, আর লাদাখ পর্যটনকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে বলিউড, আরো বলতে গেলে ২০০৯ সালের একটি সিনেমা, আমাদের সকলের পরিচিত "থ্রি ইডিয়টস্"।






লাদাখ যাওয়া অনেকের কাছেই স্বপ্ন থাকে, কিছু কিছু মানুষের স্বপ্ন থাকে লাদাখ বাইক ট্রিপ করা, কিন্তু ব্যাপারটা এত সোজা না। লাদাখ ভ্রমণ অন্য অন্য জায়গার মতো না। লাদাখ ভ্রমণের জন্য অনেকদিন আগে থেকে প্রচুর প্রচুর পরিকল্পনার প্রয়োজন।লাদাখ কিন্তু সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৪-১৫ হাজার ফিট উচ্চতায় তাই পরিকল্পনা ছাড়া গেলে কিন্তু সমস্যা পড়তে হতে পারে।  নিজেদের প্ল্যানে লাদাখ যাওয়া এমন কোনো কঠিন ব্যাপারও না,আমরা নিজে নিজেই প্ল্যান করে গেছি আমি মেয়ে আর হাসব্যান্ড তিন জন মিলে। 

নিজেদের প্ল্যানে ঘোরাতে আলাদা একটা স্বাধীনতা আছে, আপনি যেখানে নিজেই সর্বেসর্বা, এবং অনেক কম খরচে জায়গাগুলো ঘুরে আসা যায়। ভারতের যে কোনো স্থান থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লী আর দিল্লী থেকে লেহ এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট। হোটেলও বুকিং করেছি অনলাইনে আর লেহ থেকেই লোকাল ট্যুরের জন্য গাড়ি পাওয়া যায় হোটেল মালিকও গাড়ি ঠিক করে দেয়। বেশি দামাদামি না করাই ভালো। ওরা খুব বেশি চায় না। সহযোগিতায় ওরা বিশ্বস্ত। সারা বছরের মধ্যে খুব অল্প কটা মাস পর্যটক আসেন। তাই আতিথেয়তায় কোনো খামতি রাখে না।

কেন্দ্রশাষিত অঞ্চল লাদাখে একটি মাত্রই এয়ারপোর্ট যা লাদাখের রাজধানী লেহ শহরে অবস্থিত,যার নাম কুশক বকুলা রিমপোছে এয়ারপোর্ট, যেটা একটি সামরিক এয়ারপোর্ট হলেও সামরিক, অসামরিক দুধরণের বিমানই ওঠানামা করে, শ্রীনগর বা দিল্লী দুটো জায়গা থেকেই  একটু পরপর লেহ এর ফ্লাইট রয়েছে আসার ফ্লাইট ও একই ভাবে। ওয়েদার খুব খারাপ হলে বিমানযাত্রা দেরি হতে পারে। আমরা দু ঘণ্টা দেরিতে লেহ থেকে দিল্লি পৌঁছেছি। তবে টিফিন দেয় বিমান সংস্থা। 

শ্রীনগর হয়ে রাস্তা কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এবং মে মাসের প্রথম দিকে ওপেন হয়ে যায় একটা লেন দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মানালি হয়ে রাস্তা কিন্তু খুলতে আরো দেরি হয়। লাদাখ যাওয়ায় জন্য বেস্ট টাইম হবে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাস আবার সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর।

সেই সময় পুরো লাদাখ এলাকা হলুদ, লাল রঙের বাহারি পাতায় ভরে থাকে কি দারুণ লাগে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। 





লাদাখে ঘোরার জন্য পারমিট এর প্রয়োজন যাকে ILP বলে বা inner line parmit বিদেশীদের ক্ষেত্রে PAP বা protected Area permit। শ্রীনগর থেকে লেহ বা মানালি থেকে লেহ আসার ক্ষেত্রে কোন পারমিট এর প্রয়োজন নেই। পারমিট এর প্রয়োজন নুবরা ভ্যালি, খারদুংলা, প্যাংগং, সোমোরিরি, হানলে প্রভৃতি জায়গায়।পারমিট জন্য অনলাইন apply করতে পারেন।

লেহ DC অফিসে গিয়ে offline এ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হবে  ড্রাইভার কে বুক করে তাকে দিয়েই করান । ভোটার কার্ড whatsapp পাঠিয়ে দিলে তারাই করে দেবে।  একটু বেশি টাকা লাগবে কিন্তু ঝামেলা মুক্ত।

লাদাখে প্রধান যে সমস্যার সম্মুখীন হয় সেটা হলো Altitude Sickness বা যাকে আমরা Acute Mountain Sickness ।কারণ আমরা যে উচ্চতায় থাকি এখানে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় 100% কিন্তু  লাদাখের উচ্চতা ১৪-১৫ হাজার ফিট সেখানে কিন্তু অক্সিজেনের পরিমাণ ৫০%, সেই জন্য  মাথা ধরা, মাথা ঘুরে অজ্ঞান, জ্বর, বমি শ্বাস প্রস্বাসের সমস্যা এই সব হতে পারে। গাড়িতে যদি ছোটো একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার রেখে দেই তাহলে জরুরী ভিত্তিতে কাজে লাগতে পারে দামও বেশি না। তিন চারশো টাকার মতো।সমতল থেকে গাড়ি ওপরের দিকে ওঠার সময়ে আমাদের শরীরকে যতটা বেশি সংখ্যক ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে দিতে হবে। বেশী করে জল পান করা, বেশী দৌড়াদৌড়ি বা জোরে হাঁটাচলা বেশি  না করাই ভালো বিশেষ করে খারদুংলাতে।  ফ্লাইটে এলে ওই দিন টা পুরো হোটেলে রেস্ট। সাথে সাথে বাইরে বেরোলেই কিন্তু সমস্যা হতে পারে।

দুদিন পর তৃতীয় দিন লেহ থেকেই কয়েকটা প্রয়োজন মতো জলের বোতল গাড়িতে তুলে নিলে ওপরে উঠে গেলে দুতিন দিনের জন্য আর বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে না। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার বলায় আমরা কিনে নিয়ে গেছি। লেহতে ঠান্ডা যা পাবেন ওপরে তার থেকে অনেক বেশি শীতের প্রকোপ তাই গাড়িতে বেশি করে শীত বস্ত্র নিয়েই ওপরে উঠলে ভালো। 

এই সমস্ত কিছু যদি আপনি ফলো করেন তাহলে অনেকখানি সেফ থাকবেন।
খাওয়া দাওয়া ---
 লাদাখে খাওয়া দাওয়ার দাম কিন্তু প্রচন্ড বেশি। যদি রাস্তায় কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে খান তাহলে অবশ্যই দেখবেন যাতে সেগুলো পাঞ্জাবি ধাবা হয়। এই ধাবা গুলোতে নর্থ ইন্ডিয়ান খাওয়ার গুলো পাবেন এবং দামও হবে সাধ্যের মধ্যে। 
হাতে সময় থাকলে আমার মতে লাদাখ আসার ক্ষেত্রে বাই রোড আসাই সঠিক হবে এবং বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তার কারণ হচ্ছে রাস্তা দিয়ে এসে যখন আপনি লাদাখ পৌঁছোবেন তাতেই আপনার অর্ধেক লাদাখ দেখা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

লাদাখ পৌঁছোনোর দুটি রাস্তা আছে এক শ্রীনগর হয়ে দুই মানালি হয়ে। শ্রীনগর হয়ে গেলে দূরত্ব ৪১৮কি.মি এবং মানালি হয়ে গেলে প্রায় ৪৪০কি.মি, সময় আরো 2 ঘন্টা বেশি লাগবে। শ্রীনগর হয়ে গেলে ৩ টে মাউনটেন্ট পাস বাংলায় যাদের আমরা গিরিপথ বলি এবং তিব্বতী ভাষায় 'লা' পেরোতে হবে আর মানালি হয়ে গেলে ৫টে পাস পেরোতে হবে। শ্রীনগর হয়ে গেলে রাস্তায় আপনারা পাবেন জোজিলা,  ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের প্রধান কারণ নামিকা-লা, ফটুলা পাস। ফটুলা টপ শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে (NH-1) এর সর্বোচ্চ স্থান উচ্চতা ১৩৪৭৮ ফিট। আর মানালি হয়ে গেলে রোহতাং পাস তারপর বারালাচলা,নাকিলা সর্বোচ্চ স্থান মানালি-লেহ হাইওয়ের লাচুংলা,টাংলাংলা। আমার মতে শ্রীনগর হয়ে গিয়ে মানালি হয়ে ফিরে আসা লাদাখ ভ্রমনের ক্ষেত্রে আদর্শ হবে, বেশিরভাগ পর্যটকরাই তাই করে। অনেকে সময় বাঁচানোর জন্য ১টা দিক ফ্লাইটে করে। কারণ শ্রীনগর থেকে মানালি এই গোটা সার্কিটটা কভার করতে  ১০-১১ দিন সময় লেগে যাবে, তার ওপরে এতদিন ধরে এত হাইটে গাড়িতে জার্নি করা শরীরের ওপরেরও যথেষ্ট চাপ পড়ে। বেশিরভাগ পর্যটকরাই শ্রীনগর হয়ে গিয়ে মানালি হয়ে ফিরে আসে এর পেছনেও একটা বড় কারণ আছে। লাদাখ বা লেহ সমুদ্রতল থেকে ১১০০০-১৫০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত, আর আমরা প্রায় সমভূমি এলাকা থেকে এত উচ্চতায় যখন যাবো, তখন শরীরের একটা ভারসাম্য বা উচ্চতাকে মানিয়ে নেওয়া প্রয়োজন নাহলে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। বয়স্কদের জন্য বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

লাদাখ পৃথিবীর দ্বিতীয় শীতলতম স্থান। কারগিলের যুদ্ধ অনেকটা এখানকার টলোলিং পাহাড়ে হয়েছিলো তাই এখানে কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে,এই মেমোরিয়ালটা দেখতে একটু টাইম লাগবে। এরপর একদম সোজা কার্গিল।






লামায়ুরু মনাস্ট্রি, মুনল্যান্ড এখানে আসলে আপনার মনে হবে আপনি অন্য জগতে আছেন, একদম চাঁদের পাহাড়, এরপর একটি জায়গায় আসবে যেখানে রাস্তা একদম সোজা, ছবি তোলার পক্ষে আদর্শ জায়গা। তারপর পত্থর সাহিব গুরুদোয়ারা, ম্যাগনেটিক হিল, নিম্মোর সিন্ধু ও জাঁস্কার নদীর সংগমস্থল দেখে আপনারা লেহ শহরে ঢুকে পড়বেন। পত্থর সাহিব গুরুদোয়ারার একটা ইতিহাস আছে, এক পাথরের ওপরে গুরু নানকের পায়ের ছাপ আছে। ম্যাগনেটিক হিলে শোনা যায় গাড়ি নাকি স্টার্ট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ওপরের দিকে চলতে থাকে কিন্তু আমরা এরকম কিছু দেখি নি। এখানে করার মতো অনেক Activity আছে চাইলে আপনারা করতে পারেন। সেদিনকার মত লেহতে বিশ্রাম, পরের দিন লেহ লোকাল সাইটসিং।

লেহ মার্কেট, মল রোড, লেহ প্যালেস, শান্তি স্তূপা, লেহ ওয়ার মেমোরিয়াল। শান্তি স্তূপা, লেহ প্যালেসে বিকেলের দিকে গেলে ভালো কারণ এখান থেকে সানসেটটা দারুন লাগে।  সাইটসিং এর মধ্যে নিম্মোর সঙ্গম পয়েন্ট, ম্যাগনেটিক হিল গুরুদোয়ারা  লাদাখ ট্যুরের সবচেয়ে কঠিন কষ্টকর এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় জার্নি  এদিন পৃথিবীর সবচেয়ে উচু রাস্তার ওপর দিয়ে ট্রাভেল করেছি আর মনে হয়েছে স্বর্গ যেনো হাতের নাগালে! যারা ফ্লাইটে আসবেন তাদের একটু প্রব্লেম হলেও হতে পারে। তাই লেহ তে স্টে করতে হবে এক রাত । গন্তব্যস্থল হবে নুবরা ভ্যালি যাকে শীতলতম সাদা বালির মরুভূমিও বলে। নুবরা যেতে পার করতে হবে খারদুংলা পাস, যা পৃথিবীর উচ্চতম হাইওয়ে উচ্চতা 18000 ফিট, বর্তমানে দ্বিতীয় উচ্চতম। এই এলাকাটি পুরোটাই ইন্ডিয়ান আর্মির সিয়াচেন ওয়ারিওস্ এর কন্ট্রোলে, এই রাস্তাই যাচ্ছে নুব্রা হয়ে সিয়াচেন বেসক্যাম্পে। খারদুংলা পাসের আগেই একটি চেকপোস্ট পড়বে নাম নর্থ পুল্লু এখানে খারদুংলার পারমিট চেক হবে, এখানে আর্মি ক্যাম্প এবং কিছু খাওয়ার রেস্টুরেন্টও আছে। খারদাংলা পৌঁছে আমার একটু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকে গাড়ি থেকে নেমেই বমি মাথা ঘোরা এধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন দেখেছি।

খারদুংলা টপে পৌঁছে  বেশিক্ষণ এখানে না থাকা ভালো ১৫ মিনিট যথেষ্ট নাহলে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। বেশি হাঁটাহাটি না করাই ভালো এখানে একটা ক্যাফে আছে যেটা বিশ্বের উচ্চতম ক্যাফে। SBI এটিএমও রয়েছে।এরপর আবার যাত্রা শুরু নিচে নামার, পরের স্টপেজ আসবে সাউথ পুল্লু যেখানে  নুব্রার পারমিট চেক হবে।

নুব্রা ভ্যালিতে বাম্বো কটেজ গুলো তে রাত্রি যাপন করেছি। ওখানে  ডিনার আর চা কফি ব্রেকফাস্ট বুফেতে ছিল নানা রকম আইটেম।কটেজের ভেতরে সুন্দর বাগান ফুল দিয়ে সাজানো। আর উইলো পপলার গাছের সারি। কি অপরূপ দৃশ্য। সকাল নটায় পরের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম সাদা ইনোভা গাড়িতে উঠে আমরা তিন জন মিলে। ড্রাইভারের থাকার ব্যবস্থা কটেজের ভেতরেই ছিল।

এর পরের স্টপেজ আসবে খালসার যেখানে খাওয়ার মতো কিছু হোটেল পেয়ে  লাঞ্চটা এখানেই সেরে নিয়েছি। লাঞ্চ সেরেই চলে এলাম ডিস্কিটে, ডিস্কিট মনাস্ট্রি এবং ভগবান বুদ্ধের বিরাট মূর্তিটা দেখতে যেটা এখানকার প্রধান আকর্ষন,৩০ টাকা এন্টি ফি। ডিস্কিট মনাস্ট্রির ওপর থেকে পাশের শায়ক নদী দৃশ্য অপরূপ। নেক্সট গন্তব্যস্থল হলো হুন্ডার যেখানে সাদা বালিয়ারির মরুভূমি যেখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে এবং সূর্যাস্ত দেখেছি।প্রচুর কিছু আছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দু-কুচ যুক্ত ব্যাকট্রিয়ান উট সাফারি। এরকম ধরণের উট  আর কোথাও নেই। সুদূর চিনের গোবি মরুভূমি থেকে এই উট গুলো এসেছিল যখন প্রাচীনকালে এই এলাকা ওল্ড সিল্ক রুটের অংশ ছিলো। মাত্র ১৫ মিনিটের সাফারি চার্জ নেয় ৩৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। 

তুরতুকের সুন্দর সুন্দর কৃষিজমি, তাদের বাড়ি ঘর, ন্যাচারাল কোল্ড স্টোরেজ, যেটা এখানকার প্রধান আকর্ষন, আর প্রচুর Apricot ফলের গাছ, এই এলাকা গুলো Apricot এর জন্যই বিখ্যাত। রাস্তার ধারে ধারে দেখতে পেলাম আর্মি পক্ষ থেকে Apricot Shop খুলে রেখেছে। এখান থেকেও পাকিস্তান LOC দেখতে পেলাম কিন্তু থাঙের মতো এতো ভালো ভাবে নয়।

প্যাংগং পৌঁছে ঘন্টা দেরেক ছবি তুলে লেকের পাশের ক্যাম্প গুলো ভাড়া করে স্টে করা যায় আবার কেউ চাইলে আরো একটু এগিয়ে একটু নিরিবিলি জায়গায় থাকতে পারেন। আমরা দুর্বুক গ্রামের একটা হোমস্টেতে রাত্রি যাপন করেছি। রাতের খাবার রাজমা ডিম কষা ভাত রুটি সালাদ পাপড় আর আচার ছিল।

পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট নালা বয়ে যাচ্ছে কুল কুল করে। গ্রামের মানুষ গুলো হাসিখুশি ভাবে চাষ বাসের কাজ করছে। 

আমরা দুরবুক থেকে ভোরবেলা,চাংলা পাস পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম রোড কারু হয়ে লেহ পৌঁছেছি। এদিন ও দেখার মত ভালো স্পট আছে তার মধ্যে চাংলা পাস, এখানে প্রচুর বরফ পেয়েছি। আর লেহ শহর ঢোকার আগে দুটি স্পট, এক থিকসে মনাস্ট্রি এবং থ্রি ইডিয়টস্ স্কুল বা Rancho's School, যেখানে এই মুভির কিছু অংশের শুটিং হয়েছিলো। 

হানলের প্ল্যান করা যেতে পারে। আমরা একই জায়গা মাহেতে পারমিট চেক হয়ে হানলে গেছি ভিউ নিয়ে তো কোনো কথাই হবে না। আরো একটা উপরি পাওনা Indian Astronomical observatory center. হানলে তে বেশিরভাগ ফটোগ্রাফাররা অ্যাস্ট্রো- ফটোগ্রাফি করার জন্য যায়। 

সোমোরিরি লেক হানলেতে ,প্যাংগং লেক  নীল জলের লেক কিন্তু দুটোর মধ্যে একটু পার্থক্য আছে প্যাংগং কিন্তু নোনা জলের লেক কিন্তু সোমোরিরি মিষ্টি, প্যাংগং লেকের বেশিরভাগটাই কিন্তু চিনের দখলে, কিন্তু সোমোরিরি পুরো অংশই ভারতের ভূখন্ডে। সোমোরিরি লেকের রঙ কিন্তু আরো ঘন নীল। প্যাংগোং লেক  ভিউ অপূর্ব সুন্দর স্বচ্ছ নীল জলের নীচে কুচি পাথর গুলো বিভিন্ন মূল্যবান স্টোন মনে হবে। তবে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে আমরা ফিরে এসেছি লেকের ধারে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাসে কম্পন অনুভূত হওয়ার।আর সূর্য অস্ত যাওয়ার মুহূর্তটা খুব উপভোগ করেছি। লাদাখের প্রকৃতি বিশুদ্ধ পরিবেশে কটা দিন কাটিয়ে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। লাদাখ যেনো অন্য এক গ্রহ। এখানকার মানুষজন তাদের সরলতা এখনো বিদ্যমান।ঈশ্বরের আশীর্বাদ যেনো লাদাখের জন জীবনে ভরপুর। সুযোগ সময় পেলে আবারও লাদাখ যাওয়ায় ইচ্ছা রাখি।


 

মনজয়ী এক বিজয় নগর

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী


সদ্য সকাল পেরোনো রোদেলা এক দিনকে গায়ে মেখে ইতিহাসের গন্ধে ভরপুর হবার লোভে আমরা আগ্রা থেকে ফতেপুর সিক্রির ডাকে সাড়া দিয়ে এসে পৌঁছেছিলাম সেখানে।বিছিয়ে রাখা বিস্তীর্ণ ইতিহাসের পাতায় পাতায় চোখ রেখে কখনো আপ্লুত,কখনো আবেগপ্রবণ আবার কখনো বা চমকিত হয়ে উঠেছে মনের অলিগলি।

সেখানকার নিজস্ব গাড়িগুলি পর্যটকদের নিয়ে দলে দলে রওনা দিয়েছিল ফতেপুর সিক্রির মূল স্থাপত্যগুলির দিকে।পথের ধারে ধারে অতীতের খন্ডহারগুলি কিছু গল্প নিয়ে আজও অমলিন।ভাবতে অবাক লাগছিল যে একসময় পথের ধারের এই টাকশালে সোনা রূপো আর তামার কত হাজার হাজার মুদ্রা তৈরি হতো,যা কালের গর্ভে কোথায় হারিয়ে গেছে শুধু ভাঙাচোরা কাঠামোর স্মৃতিটুকু রেখে। 





মূল প্রবেশদ্বারের ভেতরে এসে দেখেছিলাম খোলামেলা সবুজের মাঝে লাল বাড়িটি নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।জেনেছিলাম এটিই দিওয়ান- ই- আম। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের এক সময় ফতেপুর সিক্রি ছিল মুঘলদের রাজধানী। সম্রাট আম জনতাদের সঙ্গে এখানে দেখা করতেন,তাঁদের কথা শুনতেন,অভিযোগ শুনতেন এবং কোনকিছু ঘোষনার জন্যও তিনি হাজির হতেন এখানে। গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা দিওয়ান- ই- খাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল এরপর। এর স্থাপত্য অবাক করবার মতো এবং এটির মূল আকর্ষণ অবর্ণনীয় সৌন্দর্যময় কেন্দ্রীয় স্তম্ভটি। এখানে সম্রাট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ও মন্ত্রীদের সঙ্গে শলা পরামর্শ করতেন ও দরকারী সিদ্ধান্ত নিতেন।আকবরের বসবার জায়গা থেকে শুরু করে সবই বিশেষ ভাবে বানানো এখানে। পাহারাদার হিসেবে বোবা কালা লোকেদের রাখা হতো,যাতে এখানকার কোনো আলোচনা বাইরে না পৌঁছোতে পারে। 






ফতেপুর সিক্রির পঞ্চ মহল এক অন্যতম দ্রষ্টব্য।মোহিত হতে হয় এটির সামনে দাঁড়িয়ে।পাঁচতলা অপরূপ এই মহলটি মূলত রাজার বিশ্রাম ও বিনোদনের আবাস ঘর হিসেবেই বানানো হয়েছিল।এখান থেকে আকবরের মুসলিম রাণী রুকাইয়া সুলতান বেগম চাঁদ দেখতেন,ধর্মের করণীয় নিয়মকানুন করতেন আর আকবরের হিন্দু স্ত্রী যোধাবাঈ সূর্য প্রণাম করতেন ও তুলসীকে স্নান করাতেন।আজ থেকে কত যুগ আগে একজন মুসলিম রাজা সমস্ত ধর্মের উর্ধ্বে উঠে সংস্কার মুক্ত মন নিয়ে জীবন কাটাতেন ভাবলেও মন ভালো হয়ে যায় এই পঞ্চ মহলের কাছে এসে। 

এই চত্বরে সম্রাট আকবরের মুসলিম,হিন্দু ও খৃষ্টান তিন পত্নীর পৃথক পৃথক প্রাসাদ রয়েছে যেগুলি নিজের নিজের মতো করে নজরকাড়া।রুকাইয়া বেগমের মাত্র ন' বছর বয়সে তাঁর সঙ্গে বিবাহের বন্ধনে জড়িয়েছিলেন সম্রাট।অপেক্ষাকৃত ছোট ভবনটি যেন সেই ছোটবেলা থেকে পরিণত বয়সের কতশত মুহূর্তের দলিল হয়ে অনেক বড় এক স্মৃতির সম্ভার হয়ে বিরাজমান আজও।রাণী ডোনা মারিয়া ( যদিও এনাকে নিয়ে মতান্তর রয়েছে) প্রাসাদটিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।গুজরাটি কারুকার্য খচিত যোধাবাঈয়ের সুদৃশ্য বিশাল প্রাসাদটি মুঘল স্থাপত্যের অতুলনীয় এক নিদর্শন। গরম ও শীতকালের জন্য আলাদা শয়নকক্ষ থেকে শুরু করে প্রার্থনা গৃহ, তুলসী মঞ্চ সবকিছু পরিপূর্ণ ভাবে এখানে বিদ্যমান। রাণীদের জন্য জন্য আমিষ ও নিরামিষ দুটি রান্নাঘরের দেখা মেলে এই চত্বরে।যোধাবাঈয়ের রান্নাঘরের দেওয়ালে তাঁর পরিহিত কানের দুলের ছাপ জায়গাটিকে আরো আকর্ষণীয় করেছে।যোধাবাঈয়ের জন্য একটি কৃষ্ণ মন্দির করে দিয়েছিলেন সম্রাট।যোধাবাঈয়ের দাদা মান সিংয়ের দেওয়া কৃষ্ণ মূর্তিটি সেই উপাসনা গৃহের দেওয়ালের সুদৃশ্য এক কুলুঙ্গিতে স্থান পেয়েছিল। সম্রাট আকবরের পরধর্মের প্রতি এই শ্রদ্ধা তাঁর প্রতি সম্মান জাগায় গভীর থেকে। 






মহল- ই- খাসের বিস্তৃত উঠোন জুড়ে এ সময় মীনা বাজার বসতো,যেখানে শুধুমাত্র মহিলাদের প্রবেশাধিকার ছিল। রাণীরা,তাঁদের দাসীরা খোলা মনে আনন্দ নিতেন এখানে। এককথায় এটি ছিল অভিজাত এক বাজার যেখানে বিভিন্ন রত্ন,রাজকীয় সাজ পোশাক ও বিলাস সামগ্রীর ক্রয় বিক্রয় চলতো। 

সম্রাট আকবরের নিজস্ব প্রাসাদটির কক্ষে অনেকটা উঁচুতে ওনার শোবার ব্যবস্থা ছিল।সংলগ্ন জানালা,হাওয়া চলাচলের বন্দোবস্ত সবই রয়েছে সেখানে।শূন্য শুধু সে আসনখানি যেখানে ধর্মীয় মলিনতা কোনো ছাপ রাখতে পারেনি,শূন্য শুধু সেই কুলুঙ্গিরা যেখানে মহানুভবতার প্রদীপ জ্বলে ওঠেনা আজ।প্রকৃত অর্থেই খোয়াব গাহ ছিল এটি, যেখান থেকে এক মুসলমান সম্রাট স্বপ্ন দেখেছিলেন দীন ই ইলাহীর মতো ধর্মীয় সহনশীলতার ও মিলনের,প্রশাসনিক, সামরিক, ধর্মীয় সবদিক থেকে সুসংহত এক রাষ্ট্রের। বিরাট এক জলাধারের দেখা মেলে এই প্রাসাদ চত্বরের এক কোণে,যেটির মধ্যে জমিয়ে রাখা গঙ্গাজল সম্রাট আকবরের তৃষ্ণার উপশম ছিল সে সময়কালে।সময়ের ধুলো গায়ে মেখে আজও সেই জলাধার রয়ে গেছে স্মৃতির চিহ্ন হয়ে। 





'মহল- ই- খাস- এর উঠোন ধরে এগোতে এগোতে এরপর মন প্রশান্তিতে ভরে উঠেছিল চারটি সেতু যুক্ত একটি জলাশয়ের সামনে এসে। এটিই সেই ঐতিহাসিক জলাশয় অনুপ তালাও।যেখানে বসে আকবরের রাজসভার নবরত্নের অন্যতম রত্ন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী তানসেন সুরের জাদুতে মোহিত করতেন শ্রোতাদের।কথিত আছে ধ্রুপদী সঙ্গীতজ্ঞ বৈজু বাওরার সঙ্গে এখানে তাঁর মনে রাখার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। অনুপ তালাও আসলে একটি উন্মুক্ত প্রেক্ষাগৃহ ছিল যেখানে বিভিন্ন মনোরঞ্জনকারী ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হতো। জলাশয়টির চারপাশে বসবার ব্যবস্থা ছিল দর্শক,শ্রোতাদের। সম্রাট আকবর ও তাঁর রাণীরাও ওনাদের নিজস্ব মহলের নির্দিষ্ট জায়গাগুলিতে বসে বিনোদনের শরিক হতেন। এটির মনোমুগ্ধকর শৈল্পিক সৌন্দর্যের থেকে চোখ ফেরানো দায়।দিঘির টলটলে জলে এখনও যেন ছায়া ভাসে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির, সেই সুরের মূর্ছনার,সমবেত সেই কথা,উচ্ছ্বাসের।প্রকৃত গুণের কদর করতে জানতেন যে সম্রাট সেই উদার, মহানুভব শাসকের স্থাপত্যের আঙিনায় দাঁড়িয়ে মন সত্যিই আশ্চর্য এক আবেশে ছেয়ে যায়।দেখা যেন শেষ হতে চায়না আর। তবুও ফতেপুর সিক্রির আরো কিছু আকর্ষণ তখনও দেখা বাকি। তাই পা চালাতে হয় সেই পথে। 
চটিজুতো জমা রেখে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকি সেলিম চিস্তির মাজারের পথে,যার বেশ খানিকটা আগে থেকেই বিশাল চত্বরটির আরো দুদিকে চোখে পড়ে বুলন্দ দরওয়াজা ও জামা মসজিদ।মাজারে যাওয়ার পথ জুড়ে শুধু কবর আর কবর। সাবধানে পা ফেলে ধীরে ধীরে পেছনের দিক এগোতে দেখা মেলে গোপন এক দরজার যার মাধ্যমে একসময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এই জায়গাটির যোগাযোগ ছিল। 

এই মসজিদ চত্বরেই আকবর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরের প্রেমিকা আনারকলিকে বন্দী করে রাখেন।সে জায়গাটিকেও পর্যটকদের দ্রষ্টব্যের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।তবে আনারকলি নামে গণিকার কাহিনীটি কল্পনাপ্রসূত বলেই ঐতিহাসিকদের বিশ্বাস।মুঘল আমলে এ নিয়ে লোকমুখে যে গল্প ছড়িয়েছিল তাতে রঙের পালিশ পড়তে পড়তে এক জীবন্ত কাহিনী হয়ে ওঠে কখন আর সত্য মিথ্যার তাৎপর্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মুঘলদের স্থাপত্যের মাঝেও জায়গা করে নেয়।

সুফিবাদের প্রতি অনুরাগী সম্রাট আকবর সুফী সাধক সেলিম চিশতির মৃত্যুর পর তাঁকে সম্মান জানাতে জামা মসজিদ প্রাঙ্গনে এই মাজারটি নির্মাণ করে তাঁকে এখানে সমাহিত করেছিলেন। ধবধবে সাদা মার্বেলের এই স্থাপত্য এককথায় অসামান্য ও আকর্ষণীয়। দেশ বিদেশের অগণিত মানুষ প্রতিদিন আসেন এখানে প্রার্থনা করতে, শায়িত সাধকের কাছে মনোবাসনা জানাতে,তাঁর সমাধিতে চাদর বিছিয়ে দিতে,তাঁকে স্মরণ করে মনোকামনার সুতোতে বিশ্বাসের গিঁট বাঁধতে।এত মানুষের মন জয় করেছিলেন যিনি এবং কত যুগ আগে থেকে সশরীরে না থেকেও কতখানি ছেয়ে আছেন এই চরম আধুনিক সময়েও তা এই দরগায় এসে না দেখলে বোঝা যাবে না।অকুণ্ঠ এক ভক্তি জাগে গভীর থেকে এখানে এলে। কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য তো ছিলই আকবরের সেই আধ্যাত্মিক উপদেষ্টার যাঁর দরবারে গোটা পৃথিবীর মানুষের ঢল,আশার ভিড়,ভিড় স্বপ্নের; তিনি শূন্য হাতে ফেরাবেন না কাউকেই এখানে দাঁড়িয়ে মন থেকে এই প্রার্থনাই জাগে।তাঁর আশীর্বাদে আকবরের প্রথম পুত্র জাহাঙ্গীরের জন্ম হয়েছিল।সবদিক থেকে পরিপূর্ণ,সফল এক সম্রাটের মনের গভীরে সন্তানের জন্য আকুল যে পিতার মন তার পরিতৃপ্তি হয়েছিল,স্বপ্নপূরণ হয়েছিল সেলিম চিশতির আশীর্বাদের স্নেহস্পর্শে। খুব যত্ন নিয়ে,নিখুঁত ভাবে এই দরগার প্রতিটি জায়গাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে সুন্দর নকশায়। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অন্যতম নিদর্শন,ভক্তি ও ভক্তের সমন্বয়ের আদর্শ এক তীর্থক্ষেত্র এই দরগাটি। 





বুলন্দ দরওয়াজার সামনে পৌঁছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সত্যি সত্যি ইতিহাসের পাতায় পড়া বিশ্বের উচ্চতম দরজাটির কাছে দাঁড়িয়ে আছি।আকবরের গুজরাট জয়ের স্বাক্ষর, ফতেপুর সিক্রির প্রধান প্রবেশদ্বার এই বুলন্দ দরওয়াজা।লাল- হলুদ বেলেপাথরের কাঠামোর প্রায় চুয়ান্ন মিটার উঁচু এই দরজাটির গায়ে সাদা- কালো মার্বেলের নকশা এটিকে অত্যন্ত সুদৃশ্য করেছে।দরজাটির গায়ে কোরানের কিছু আয়াত খোদাই করা আছে। খিলানগুলি আকবরের উদার ধর্মনীতি, গুজরাট জয়ের ইতিহাস এমন সব লিপিবদ্ধ কথা নিয়ে সমৃদ্ধ।ঐতিহাসিক এই মহান দ্বার মহার্ঘ্য এক স্মৃতি রেখে গেল নিঃসন্দেহে।
 
এই বিজয়নগর পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা এককথায় অসাধারণ বললেও কম বলা হবে। দিনের আলোয় হঠাৎ করেই যেন দিবাস্বপ্ন সত্যি হবার মতো করে একঝাঁক ইতিহাস খোলা আকাশের নীচে আলোয় আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল সেদিন। এর আনাচকানাচ জুড়ে ভাগে ভাগে এত দেখার জিনিস যে সেসবের কথা সংক্ষেপে বলতে গেলেও বড় হয়েই যায়।যে জায়গায় খাঁজে খাঁজে ইতিহাসের জীবন্ত সব দলিল,সেখানকার দেওয়ালে কান পাতলে কত কথাই না উঠে আসে।কিছু জানা আর বেশিটাই না জানা সেসব কথা ভাগ করে নেওয়াতেই আনন্দ সবচেয়ে বেশি।নিজের উপলব্ধির অনুভূতি থেকেও ইতিহাস এ প্রসঙ্গে অনেক বেশি গুরুত্ব দাবি করে।সম্মান জানানোর সে জায়গা থেকেই দ্রষ্টব্য স্থানগুলির ঐতিহাসিক অবতারণা করেছি হয়তো বা সামান্য ছুঁয়ে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতিকেও সঙ্গে করে। ফতেপুর সিক্রি দেখবার,জানবার ও মন্ত্রমুগ্ধ হবার সেরার সেরা হয়ে মনের মণিকোঠায় রয়ে যাবে আজীবন। 


 

ইতিহাসের আলোকে গঙ্গারামপুর

গৌতমেন্দু নন্দী

"গঙ্গারামপুর" ----এই নামের সাথে সাধারণ জনমানসে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি শব্দ হলো "দই"-----"গঙ্গারামপুরের দই"। স্বাদে, গন্ধে, মিষ্টত্বে এই উত্তরবঙ্গে যার  জুড়ি মেলা ভার।  শুধু তাই নয়, তাঁত শিল্প এবং নৌ-শিল্পেও এই মহকুমা শহরের নাম এই রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু চোখ নিয়ে এই শহর এবং তার আশপাশের এলাকাকে  খুব বেশি জন দেখেননি।

 
     দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার জেলা শহর বালুরঘাট  থেকে ৪৫ কিমি দূরে পুনর্ভবা নদীর পাড়ে অবস্থিত মহকুমা শহর গঙ্গারামপুরকে ঘিরে আছে এক ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সন্ধানে আজও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসাহী ব্যক্তিরা ছুটে আসেন। সেই আকর্ষণেই আমিও গিয়েছিলাম এবার। এই জনপদে যাকে ঘিরে রয়েছে বাণগড়, ধলদীঘি  কালদীঘি, তপন এর মতো ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ স্থান।

       গঙ্গারামপুর নামকরণের নেপথ্যেও রয়েছে  এক সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী------- 
 রামচন্দ্র একদিন গঙ্গা কে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই অঞ্চলে অদূরে বাণগড়ে( তখন নাম ছিল কোটিবর্ষ) এসে পৌঁছলে তিনি এক সুন্দরী বালিকার নৃত্য প্রদর্শন দেখে মুগ্ধ হন। সেই বালিকাটি রামচন্দ্রের চরণ দুটি স্পর্শ করলে রামচন্দ্র তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ ক'রে বালিকার নাম  রাখেন "পুনর্ভবা"। রামচন্দ্রের সঙ্গী গঙ্গা তাঁর জলধারা উপহার দেন পুনর্ভবা কে। সেই স্মৃতি, পুণ্যতোয়া গঙ্গা আর রামচন্দ্রের স্মৃতি কে ধরে রাখতে গঙ্গা এবং রামের নাম একত্রিত করে স্থানটির নাম হয় গঙ্গারামপুর-----এসবই পৌরাণিক কাহিনি। এরকমই  আরও নানা কাহিনী এই জনপদকে ঘিরে। 





         বর্তমানে এক লক্ষের অধিক জনসংখ্যার জমজমাট শহর গঙ্গারামপুরের প্রাণকেন্দ্র "ঘড়ি মোড়" থেকে প্রায় এক-দেড় কিমি উত্তরে ইতিহাসের গন্ধ নিয়ে,  ইতিহাসের স্বাক্ষ্য বহন ক'রে ভগ্নাবশেষের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে আজও পড়ে আছে বাণগড়ের  বিখ্যাত প্রত্ন কীর্তি।

        দিনাজপুর জেলার প্রত্ন কীর্তির জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলটি অতীতে পুন্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বলা হয় পুন্ড্রবর্ধন উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর ছিল। পঞ্চম শতক থেকে পাল-- সাম্রাজ্যের শেষ শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচশত  বছর পুন্ড্রবর্ধনের গৌরব ও মর্যাদা অটুট ছিল।

      বাণগড়ের পূর্ব নাম কোটিবর্ষ, পুনর্ভবা নদীর  পূর্ব পাড়ে গঙ্গারামপুর শহরের এক কিমি উত্তরে 
বর্তমানে রাজীবপুর মৌজায় অবস্থিত। বাণগড়ের নামকরণ নিয়েও একাধিক কাহিনীর অন্যতম হোল----পুরাকালে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা  ছিলেন বলি রাজা। কথিত যে,বলির মৃত্যুর পর  এই স্থানটি শাসন করতে থাকেন তাঁর পুত্র বাণ  এবং তাঁর নামে রাজ্যের নাম হয় বাণ রাজ্য এবং রাজধানীর নাম হয় বাণ নগর, বর্তমানের বাণগড়।

পুনর্ভবা নদীর তীরে রয়েছে বাণের কন্যা ঊষার ঘর যা "ঊষাতিটি"নামে পরিচিত। এই জনপদে বাণের  কন্যা ঊষা এবং শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরূদ্ধ কে নিয়ে প্রচলিত প্রেম কাহিনীও এখানকার আকাশ বাতাসে
ভেসে বেড়ায়। এইসব কাহিনী গঙ্গারামপুর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে "জ্যোতিষ ভূমি" রূপে 
আখ্যায়িত করে রেখেছে।
       
এই বাণগড় সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন----- দেবকোট, উমাবন,ঊষাবন শোনিতপুর, কোটিবর্ষ। এখানে খনন কার্য সম্পাদনের পর যেসমস্ত যুগের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল  তা হলো -----মৌর্য,  কুষান, শুঙ্গ থেকে আরম্ভ করে  মুসলিম যুগ পর্যন্ত।

    গঙ্গারামপুর শহরের এক কিমি দক্ষিণে  ধল দীঘির পাড়ে শাহ আতা -এর দরগাহ। সম্ভবত চোদ্দ শতকে নির্মিত হয়েছিল।এটি একটি ছাদবিহীন  কাঠামো যার নিচের অংশটি পাথর এবং বাকি অংশটি ইট দিয়ে তৈরি। মাজারটি মোল্লা আতর--উদ্দিন বা শাহ আতা -এর কবরকে আবদ্ধ করে।  প্রকৃতপক্ষে এটি কুলুঙ্গি সহ মসজিদ,দরগাহ নয়। দেয়ালে আরবি ভাষায় চারটি "ইনস্ক্রিপশন" খোদাই করা আছে। ধলদীঘি র পাড়ে এই স্মারকটি আজ "প্রাচীন স্মারক ও পুরাতাত্ত্বিক স্থল এবং অবশেষ আইন ১৯৫৮ তথা প্রাচীন স্মারক পুরাতাত্ত্বিক স্থল অনুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে 
ঘোষনা করা হয়েছে। ধলদীঘির পাড়ে দরগার মধ্যে ব্যবহৃত পাথরে  হিন্দু সংস্কৃতির কিছু কিছু চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।






        বাণগড়, ধলদীঘির ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন চাক্ষুষ ক'রে গঙ্গারামপুর থেকে টোটো রিকসায় চেপে ১৪ কিমি দূরে গঙ্গারামপুর শহরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে  চললাম তপন ব্লকের দিকে। প্রায় অর্ধেক দূরত্ব  অতিক্রম করে নয়াবাজারে এসে পৌঁছলাম। গঙ্গারামপুরের বিখ্যাত দই আসলে এই নয়াবাজারেই তৈরি হয়।  নয়াবাজার থেকে আধঘন্টা পর অর্থাৎ  গঙ্গারামপুর থেকে এক ঘন্টা পর এসে পৌঁছলাম তপন। পুনর্ভবা নদী এই এলাকাকেও পুষ্ট করে চলেছে। ইতিহাস খ্যাত তপন দীঘি এই থানার অন্তর্ভুক্ত। দৈর্ঘ্যে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় চার হাজার ফুট এবং প্রস্থে প্রায় এক হাজার ফুট এই দীঘির বর্তমান চিত্র হতাশাজনক। এই দীঘিকে ঘিরে সামনে অনেকটা পরিসরে গেস্ট হাউস সহ ফাঁকা জায়গা থাকলেও বিস্তীর্ণ দীঘির জল বর্তমানে সবুজ আগাছার আড়ালে সম্পূর্ণভাবেই অদৃশ্য। সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জায়গাটির প্রবেশ পথও বন্ধ।  হয়তো দীঘিটি সংস্কারের পর প্রবেশপথ  সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে। কথিত যে, বাণরাজা তাঁর রানির আদেশে এই দীঘিটি খনন করেন।  বাণ রাজা এই দীঘির পাড়ে তর্পণ করতেন বলে এই দীঘির নাম হয় তর্পণ দীঘি এবং সময়ের সাথে  পরিবর্তিত হয়ে "তপণ দীঘি" নামে পরিচিতি লাভ করে। 
     
হয়তো ধারাবাহিক খনন কার্যের ফলে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার জনপদগুলোতে ইতিহাসের আরও অজানা তথ্য মিলতে পারে।

     এখানে এলাম অথচ মিষ্টির স্বাদ নেবনা ---তা কি হয়! তাই একদিকে মিষ্টির দুর্দান্ত স্বাদ আর এক দিকে "ইতিহাসের স্বাদ" দুটোতেই সমৃদ্ধ হয়ে গঙ্গারামপুর  থেকে ফিরে এলাম বালুরঘাটে।
 
  


 

প্রবন্ধ 


উত্তরবঙ্গের নারী, নবজাগরণ ও রাজনীতি: কোচ রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

সোহম ভট্টাচার্য 



কোচ রাজবাড়ির নারী সদস্যাদের কথা বললেই, আম বাঙালির মনে প্রথমেই যাঁর ছবি ভেসে ওঠে তিনি কোচ রাজবাড়ির দীপ্তিময়ী রাজকন্যা গোয়ত্রীদেবী, যার নারীসুলভ সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশেছে, চারিত্রিক অভিজাত্যের দ্যুতি।

আবার যে বাঙালিরা, একটু কোচবিহারের প্রাচীন, ইতিহাস তথা বাংলার উনিশ শতকের ইতিহাস নিয়ে ওয়াকিবহাল, তাঁদের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী হিমালয়ের পাদদেশীয় জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট দেশীয় রাজ্যের রানী হিসেবে সেইসঙ্গেই মাথায় আসে, বিখ্যাত ব্রাহ্মসমাজসংস্কারক তথা নববিধান ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা, কেশব চন্দ্র সেনের জ্যেষ্ঠা কন্যা সুনীতি দেবীর কথা, রকমারি গাউনের সঙ্গে শাড়ির অত্যাধুনিক মেলবন্ধন হোক, কিংবা নারীদের জন্য কোচবিহারে স্কুল তৈরী, আবার পর্দাপ্রথা না মেনে ভোপালের রাজার সঙ্গে ডিনার পার্টি জয়েন করা হোক, কিংবা প্রথম ভারতীয় নারীর লেখা ইংরেজি আত্মজীবনি, সবেতেই এই কোচসম্রাজ্ঞীর নাম উজ্জ্বল।

আপনার হয়তো মনে হচ্ছে, এ আর এমন কী? এ তো যে কেও করতে পারে। আজ্ঞে না মশাই, সময়কালটা তো মনে রাখবেন, সেই ১৮৭৮ সাল, যেসময় বাঙালি মেয়েরা পড়াশুনো করার বিষয় তো দূর, পর্দাটুকু না নিয়ে কারোর সঙ্গে দেখা বারতেন না, মুখ ফুটে নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছেও বলতেন না।
আবার এই সঙ্গেই, এই আমার মতো অল্প ইতিহাস জানা কিছু লোক হয়তো বলবেন, আরে সুনীতি দেবী তো ব্রাহ্ম ছিলেন, ব্রাহ্মসমাজের মেয়েরা এমনিতেই খুব অধুনিকা ছিলেন, গোঁড়া হিন্দু মেয়েদের তুলনায়।

কিন্তু এখানেই বাঁধবে গোল, কারণ প্রামান্য দলিল যা বলে, তা খানিকটা অন্যরকম, কোচরাজবাড়ির অন্তঃপুরচারীনিরা, সুনীতিদেবীর আগ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিলেন গোঁড়া শৈব হিন্দু।

কিন্তু ভাবতেই অবাক লাগে, কোচরাজবংশের সেইসব অন্তঃপুরচারীনিরা কি ভীষন আধুনিকা ও রুচিশীলা ছিলেন। উত্তরবঙ্গের রাভা-মেচ-টোটো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ছোট্ট কোচ রাজ্যের নারীরা, উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের আলোয় কিভাবে আলোকিত হয়েছিলেন সময়ের আগেই, তা আমার-আপনার ভাবনারও অতীত।

সুনীতি দেবীর কথাই যদি প্রথমে ধরি, তবে রাজমাতা হিসেবে বেশ কিছু সময় কোচবিহার থেকে রাজ্য পরিচালনায় সাহায্য করেছিলেন তিনি, আধুনিক কোচবিহারের জনক মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণের যোগ্য স্ত্রী হিসেবে একাধিক প্রজাহিতকর কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত ছিলেন, শিক্ষা, সমাজনীতি, রাজনীতি, নারীশিক্ষা সর্বত্র ক্ষেত্রেই তাঁর ও তাঁর দাম্পত্যসঙ্গী কোচ মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ন ভূপ-বাহাদুরের অবদান, স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কোচ রাজার ভাই গজেন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী ছিলেন সাবিত্রী দেবী, সুনীতি দেবীর বোন ও কেশবচন্দ্র সেনের দ্বিতীয় কন্যা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই কোচ রাজপরিবারের সদস্যা, সাবিত্রী দেবীর লেখা আত্মকথা থেকে জানা যায়, কোচবিহারের সেসময়, ব্রাহ্মপল্লি, ব্রাহ্মবোর্ডিং স্থাপনা কেশবচন্দ্রসেনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্থাপিত বিনামুল্যে দৈন্যন্দিন দুবেলা সাধারণ মানুষদের খাদ্য প্রদান এর মতো কাজ করা শুরু হয়।

তিনি আরও জানান সুনীতি দেবীর আর্থিক আনুকূল্যেই ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি নীতি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে শিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত সকল নারী পুরুষরাই আসতেন। সুনীতি দেবী ও তাঁর কন্যা রাজকুমারী সুধীরা দেবীর আগ্রহেই সেখানে মেয়েদের হাতের কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়, জামা, কামিজ তৈরি করা শেখানো হয়, প্রসেসড ফুডের মধ্যে জেলি, আঁচার তৈরী ও তার টিনের কৌটায় বিপনন করার কৌশল শেখানো হতে থাকে। এসকল কর্ম শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েদের সবলম্বী করে তোলা।

সুনীতি দেবী ইংরেজি ভাষায় রচিত তাঁর আত্মচরিত ‘The Autobiography of an Indian Princess” শীর্ষক বইটিতে উল্লেখ করেছেন, কোচবিহারের নারীদের মানসিক ও আর্থিক দৈন্যতাই কোচবিহারের অন্যতম পিছিয়ে থাকার কারন। যার জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন, তাঁর স্বামী নৃপেন্দ্রনারায়নের আর্থানুকূল্যে "আনন্দবাজার" যেখানে মেয়েরা সপ্তাহের একটি দিন নিজেদের হাতে তৈরী নকশী কাঁথা, আসন, খোল, ধুপদানী, বেতের নানা জিনিস কেনা বেঁচা করতে পারতো।

‘আনন্দবাজার বিষয়ক’ একটি সেই সময়ের বিজ্ঞপ্তি কোচবিহার গেজেটে ১৪ই এপ্রিল ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়, সংবাদটি এরকম - 
"১৩২৬ সালের, ৬ই, ৭ই ও৮ ই বৈশাখ (১৯১৯ সালের ১৯-২০, ২১ এপ্রিল) শনিবার-রবিবার, সোমবারে, কোচবিহার স্থান ল্যান্সডাউন হলে অনন্দবাজার হইবে, পূর্ণবয়স্কদিগের প্রবেশমূল্য এক আনা বালক বালিকা দিগের দুই পয়সা, কোচবিহার নিবাসী যে কোন ব্যাক্তি ইচ্ছা করিলে উক্ত ঠিকানায় নিজস্ব দ্রব্য প্রেরন করতে পারিবেন। প্রতি দ্রব্যে মুল্যে ও প্রেরণকারীর নাম-ঠিকানাদেওয়া আবশ্যক নচেৎ বিক্রিত দ্রব্যের মূল্য বাড়ি পাঠাইতে কেহ দায়ী থাকিবেন না”
- বলাই বাহুল্য রাজকর্মচারী বহিরাগত কর্মচারীর পরিবারের মেয়েরা এতে যেমন অংশ নিতেন, সাধারণ প্রজারাও তাতে ধীরে ধীরে অংশ নিতে শুরু করে। যদিও স্থানীয় বহু মেয়েরাই রাজপরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমে ভক্তিভরে দূরত্ব বজায় রেখেও চলেছে।

সুনীতিদেবীকে, এসব থেকে সরিয়ে এনেও যদি বিশ্লেষন করা যায় তবে, প্রথমেই আসবে তার কৃতিত্বের যে দিকটি, তা হল সুলেখিকা ও আধুনিক কবি রূপে সুনীতি দেবী।
যার কলমে ফুটে উঠেচ্ছে, নিম্নোক্ত পঙতিটি -
“আমাদের কোনও ভৌগলিক সীমানা নেই,
কোন নদী নেই
নেই কোন মানুষ
নিজস্ব কিছুই ছিল না কখনো।” – (সুনীতি দেবী বইকথকতার গান, প্রকাশিত ১৯০০ সাল)
এই যে নিঃসঙ্গতা, নারীর কিছুই নিজস্ব না, এই বোধ থেকেই সুনীতিদেবীর বহু আগেই উত্তরণের পথ দেখিয়েছিলেন, কোচ-রাজ গৃহের অন্তঃপুরের নারীরা, দুর্বিষহ একাকীত্ব, সপত্নী যন্ত্রণা সব কিছু থেকে সরে এসে, কোচবিহারের মহারাজা নর-নারায়ণের (১৫৫৪-১৫৮৮ সাল) মহিষী ভানুমতী দেবী, অহম নৌ বহরের সঙ্গে কোচরাজাদের যুদ্ধে, নিজে তির ধনুক নিয়ে অংশগ্রহন করেছিলেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গেই পর্দাপ্রথা না মেনে অংশ নিতেন রাজকাজে। তাঁর দূরদর্শিতা, প্রজা হিতের পরিকল্পনা, শিক্ষানুরাগের কথা, আজও কোচবিহার ইতিহাসে আছে। নিজ পুত্রসহ বাকিদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষা দেবেন বলে, সংস্কৃত পণ্ডিত পুরুষোত্তম বিদ্যাবাগীশকে নিয়ে ‘প্রয়োগরত্নাবলী’ ব্যাকরন রচনা করেছিলেন, আজও যা পণ্ডিত মহলে আদৃত, গ্রন্থটির রচনাকাল ১৫৬৮ সাল, এ তথ্য আছে গন্ধর্ব নারায়নের বংশাবলীতে।
“নৃপতির প্রিয়তমা ভানু পাটেশ্বরী
ভট্টাচার্য আগে কথা কহিলা সাদরি,
পানিনির বর্ণক্রম গ্রন্থনে লিখিবা
মহেশের কৃত কলাপের ক্রমদিবা।”
এরপর, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ১৫৫৮ সালে, 'বেহারোদন্ত' নামে কবিতার ছন্দে একটি আত্মজীবনি মূলক ইতিহাস রচনা হতে দেখি, রচানাকার মহারানী বৃন্দেশ্বরী দেবী, কোচবিহার মহারাজ শিবেন্দ্র নারায়নের পত্নী তিনি (১৮৩৯-১৮৪৭ খ্রীঃ)।
গ্রন্থটিতে, নারীদের মানসিকতা, অনলঙ্কার প্রিয়তা, নানা ধরণের নারীশরীরের গোলযোগ, রূপচর্চার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে, এ বইটি বাংলা সাহিত্য চর্চায় আত্মজীবনীমূলক রচনার একটি বিশেষ স্থান পেয়েছে, এদিক থেকে তাকে প্রথম বাঙ্গালীনি মহিলা কবি ও আত্মজিবনীকার বললে অত্যুক্তি হয় না। 
আবার, এই এক রাজপরিবারেরই অন্য এক রাজবধু মহারানী উৎপলবর্না দেবী, মহারাজা মহিন্দ্রনারায়নের স্ত্রী, প্রবল শিবভক্ত হওয়ায় শিবপুরানকে (১৬৮০ সাল) রাজবংশী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, প্রবল বন্যাকালে, সাধারন মানুষদের জন্য তৈরি করেছিলেন “শিবনিবাস” নামক এক শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র।
মহারাজ শিবেন্দ্রনারায়নেরই অন্য এক মহির্ষী কামেশ্বরী দেবীর নির্দেশে মহারাজা নরেন্দ্রনারায়নের রাজত্বকালে "মহারাজ বংশাবলী" নামে একটি ইতিহাস লেখা হয়। প্রথমে এটি পুঁথি আকারে থাকলেও পরে তা মুদ্রিত হয়, গদ্যে লেখা এ ইতিকথার সে সময়ের বহুগুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। 

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য এরও বহুকাল আগে দেখা যায় কোচ মহারাজ মোদনারায়ন (১৬৫৫-১৬৮০ খ্রীঃ) এর স্ত্রী মহারানী মানময়ী দেবী প্রথম কোচবিহারের নারীদের বিবাহের জন্য ভাতা ও রাজ্যের গর্ভবতী মেয়েদের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে নিয়মিত হারে, একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বরাদ্দ করেছিলেন, সম্ভবত, তিনিই প্রথম কোচ সম্রাজ্ঞী যিনি তৎকালীন রাজ কাজে প্রয়োজনীয় দুটি ভাষা আরবি ও ফার্সিতে (মুঘল আমলে) সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন।

মহারানী মানময়ী দেবীরই পুত্রবধূ মহারাজ বাসুদেব নারায়ন (১৬৮০ খ্রীঃ-১৬৮২ খ্রীঃ) এর স্ত্রী, মহারানী বিদ্যুৎপ্রভা দেবী, মুঘল সৈন্যগণ কীভাবে, কোচবিহার আক্রমন করছেন, মুঘলদের উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন তার লেখা “কোচেশ্বরী কথন” বইটিতে। পয়ার ছন্দে রচিত এ বইটি ছিল, প্রাচীন কোচরাজ্যের ইতিহাস জানতে প্রযোজনীয় এক বই।

এই ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিকতাকেই সম্ভবত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন মহারানী সুনীতি দেবী, বলা যায় কোলকাতা কেন্দ্রিক নবজাগরনের মুক্ত পরিবেশকে সুদুর উত্তরবঙ্গে এনে, সমস্ত অধুনিকতার পালে হাওয়া লাগিয়েছিলেন তিনি, কবিগুরু রবি ঠাকুরের স্নেহধন্যা, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও সংস্কার মুক্ত সুনীতি দেবী পর্দাপ্রথা ভেঙেছিলেন সম্পূর্ণরূপে, সকলের জন্যে। ইংরেজি ও ফরাসি শিখিয়েছিলেন, বাকি সমস্ত কোচ রাজকুমারীদেরকে তাঁর স্বামী নৃপেন্দ্রনারায়নের বোন, কোচ রাজকুমারী অনন্দময়ী দেবী খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়ে, পুনরায় পিতৃগৃহে চলে এলে, তাঁর অবসর সময় অতিবাহিত করতে থাকেন, সুনীতিদেবীর তত্ত্বাবধানে, ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য শিখতে। তাঁর উল্লেখ, আনন্দময়ী দেবী করেছেন, তার নিজ আত্মকথা “দুঃখবতীর গীত” বইটিতে।

মহারানী সুনীতি দেবীর পরবর্তীতে, তাঁর পুত্রবধূ বরোদারাজা সায়োজিগাইকয়া এর কন্যা মহারানী ইন্দিরা দেবী, কোচবিহারের রাজকুমার জিতেন্দ্রনারায়ন ভূপ বাহাদুরকে বিয়ে করেন, পরবর্তীতে ১৯২১ সালে জিতেন্দ্রনারায়ন ভুপ বাহাদুরের মৃত্যুর পর, ইন্দিরা দেবীর ইচ্ছেয়, কোচবিহারে পানীয় জল সমস্যা মেটাতে জলাধার নির্মান ও শিশু উদ্যান নির্মানের মতো কাজ হয়।

তাঁরই শিক্ষায় শিক্ষিত তাঁর কন্যা বাজকুমারী গায়ত্রী দেবী (জয়পুররাজমাতা) জয়পুরের সাধারন মানুষের উন্নতিতে শিক্ষার প্রসারে প্রভুত সংস্কারমূলক কাজ করেন।

আবার সুনীতি দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র কুমার নিতেন্দ্রনারায়ণের স্ত্রী রানী নিরুপমা দেবী (১৮৯৫–১৯৮৪) প্রথমে কোচবিহার রাজপরিবারে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজকর্মী শিশিরকুমার সেনকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন এক প্রতিভাবান সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সমাজসেবী। ১৯২৩ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত তিনি ‘পরিচারিকা’ নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং কবিতা, গল্প, আত্মজীবনী ও অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন পার্বত্য পাদদেশীয় কোচবিহারে। 

এই সুপ্রাচীন সাম্রাজ্যের, শেষ সম্রাজ্ঞী ছিলেন মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ন এর স্ত্রী, মার্কিন অভিনেত্রী জর্জিনা নারায়ন বা জিনা নারায়ন, যার আমলেই কোচবিহার রাজ্যটি স্বাধীন ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।



তথ্যসুত্রঃ 
Suniti Devi. The Autobiography of an Indian Princess. London: John Murray, 1921.
→ মহারানী সুনীতি দেবীর আত্মজীবনী, যেখানে কোচবিহারের নারীশিক্ষা, সমাজনীতি ও তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ আছে।
Sabitri Devi. Atmakatha (আত্মকথা). (Unpublished Memoir, cited in secondary sources).
→ মহারাজা গজেন্দ্রনারায়ণের পত্নী, কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা সাবিত্রী দেবীর লেখা আত্মকথা, যেখানে ব্রাহ্মপল্লি, ব্রাহ্মবোর্ডিং স্থাপনা ও দুঃস্থদের খাদ্যদান সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়।
Brindeshwari Devi. Beharodonto (বেহারোদন্ত). Manuscript, 1558.
→ মহারানী বৃন্দেশ্বরী দেবীর রচিত কবিতার ছন্দে আত্মজীবনীমূলক ইতিহাস।
Gayatri Devi. A Princess Remembers: The Memoirs of the Maharani of Jaipur. New York: Rupa, 1976.
→ জয়পুরের রাজমাতা গায়ত্রী দেবীর স্মৃতিকথা, যেখানে তাঁর মা ইন্দিরা দেবীর শিক্ষা ও সুনীতি দেবীর প্রভাবের প্রসঙ্গ এসেছে।
Nirupama Devi. Editor, Paricharika (পরিচারিকা). 1923–1931.
→ কোচবিহারের পুত্রবধূ নিরুপমা দেবীর সম্পাদিত সাহিত্যপত্রিকা। তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদ রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখেন।
কোচবিহারের পরিক্রমা, সম্পাদক, কৃষ্ণেন্দু দে, নীরজ বিশ্বাস ও দিগ্বিজয় দে সরকার।
‘মহারানী কথা’ – মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস।


 

ভালো থাক সবুজ গালিচা তৈরির  অবহেলিত হিরোরা

মনোমিতা চক্রবর্তী

ঢাকে কাঠি পরা শুধু সময়ের অপেক্ষা। সকলের মনেই এখন  একটা খুশি খুশি আমেজ।শরৎ তার শুভ্রতার প্রতীক নিয়ে জানান দিচ্ছে মা দুর্গার আগমনের বার্তা। সমগ্র বাংলার সাথে আমাদের উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স তরাইয়ের চা বাগান গুলিতেও একটা সাজো সাজো রব।

 চা বাগান গুলিতে পুজো বোনাস পর্ব শুরু হলো বলে। সারা বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর এই বোনাসই তো সম্বল চা বাগানের শ্রমিক এবং বাবু স্টাফদের।

 দিনভর চলবে বোনাস পর্ব। হাসিমুখে সকলে ঘরে ফিরবেন বোনাসের টাকা হাতে নিয়ে। কিন্তু বাগানের আরেক শ্রেণীর কর্মচারী যাঁরা চা বাগানের এক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী-  ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজমেন্ট এর অন্তর্গত ম্যানেজার এবং সহকারি ম্যানেজার, চা শ্রমিকরা যাঁদের "সাহেব " বলে সম্বোধন করেন তাঁরা কিন্তু খালি হাতেই একটা দীর্ঘশ্বাস আর এক আকাশ মন খারাপ নিয়ে ঘরে অর্থাৎ নিজের বাংলোতে ফিরবেন। 

কোন কোন চা বাগানে ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষদের বোনাস ব্যবস্থা থাকলেও নব্বই শতাংশেরও বেশি  বাগানে ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষের তথা ম্যানেজার এবং সহকারী ম্যানেজারদের  কোনরকম বোনাসের ব্যবস্থা থাকেনা।

বাইরে থেকে চা বাগান দেখতে যতটা সুন্দর চা বাগানের ভেতরের কাহিনী কিন্তু মোটেও ততটা সুন্দর নয়। এক কাপ চা উৎপাদনে যাদের মেধা বা অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে বা যারা চা উৎপাদনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন সেই সাহেব বা সহকারী ম্যানেজারদের জীবনযাপন একটা সময় বেশ জাঁকজমকপূর্ণ থাকলেও বর্তমানে তার ছিটেফোটাও নেই। চা বাগানের এই সহকারী ম্যানেজারদের বাবু স্টাফদের মত নেই কোন সি এল বা এম এল এর মত ছুটির ব্যবস্থা। 

আমাদের উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সাহেবরা পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে বাধ্য হন । তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় কেটে যায় আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধব পরিবার ছাড়াই।

বৃষ্টিতে ভিজে , ভাদ্রের তালপাকা  রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরা শরীর নিয়ে তারা কাজ করে যান চা বাগানের জন্য। তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের কর্মজীবন কাটে নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বে। 

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতেও চা বাগানের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য চা বাগান থেকে বের হতেও পারেন না এই সাহেবরা।

কঠোর  পরিশ্রমী এবং দায়িত্বপূর্ণ এই সাহেবেরা সাধারণত চা বাগানের দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা করেন। শ্রমিকদের দ্বারা শুধু চা উৎপাদন নয় সঙ্গে শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান, বাগান রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রমিকদের দাবি, শ্রমিকদের অসন্তোষ সামলানো তথা বাগানে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খাওয়া এবং ঘুমের সময়টুকু ছাড়া  প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই তাদের অলিখিত  অন ডিউটি থাকতে হয়,যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর  প্রভাব ফেলে। চব্বিশ ঘন্টা অন ডিউটি থাকার পরও এনাদের জীবনে নিরাপত্তার কোনরকম ব্যবস্থা নেন না বাগানের মালিক কর্তৃপক্ষ ।তাইতো আমরা প্রায়ই দেখতে পাই ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষের ওপর শ্রমিকদের আক্রমণের ঘটনা ।সাহেবদের চাকরিরও কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই। মালিক তাদের যেকোনো সময় বরখাস্ত করতে পারেন।  

চা বাগানের সাহেবদের  কম বেতন এবং বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার একটা মানসিক চাপ সবসময় থাকে বলে তাঁদের মানসিক ভাবে শক্তিশালী হতে হয়। 

 একদিকে শ্রমিকদের দাবি অন্যদিকে মালিকদের চাপ দুই দিক সামলাতে গিয়ে সহকারী ম্যানেজাররা সব সময় মানসিক অশান্তির মধ্যে থাকেন।

পুজোর চারটে দিন বাগান বন্ধ থাকবে, সকলেই আনন্দে মেতে উঠবেন তাদের পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে। কিন্তু বাগান ছুটি থাকলেও ছুটি পাবেন না বাগানের ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজারেরা অর্থাৎ সাহেবরা ।

কোন প্রত্যন্ত এলাকায় নিরিবিরি চা বাগানের বাংলোতে বসে পূজোর স্মৃতির রোমন্থনে ডুবে রইবেন এই সাহেবেরা।

 সকালের  ঘুম ঘুম ভাব দূর করার এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা কিংবা বিকেলের ক্লান্তি ও মনের চাপ নিরাময়ক  এক কাপ  চা তুলে দেবার পেছনে সবুজ গালিচা তৈরির যে কারিগরেরা রয়েছেন তারা কিন্তু আজও রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালে ।শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল এই সাহেবদের জন্য ।ভাল থাক পর্দার আড়ালে থাকা গালিচা তৈরির এই হিরোরা । উত্তরের চা শিল্প আরও উন্নত হোক সাথে ভালো দিন ফিরে আসুক  সাহেবদের জীবনেও।


 

শ্রীকৃষ্ণের গুরুকূল  সান্দীপনি আশ্রম
জনা বন্দ্যোপাধ্যায় 

মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী স্টেশনে এই শহরের মাহাত্ম্যর কিছু দৃশ্য দেওয়াল-চিত্রে চোখে পড়ে! এই চিত্রগুলোর মধ্যে সান্দীপনি মুনির আশ্রম অন্যতম! এই আশ্রমে  সান্দীপনি মুনির কাছে কৃষ্ণ, বলরাম সহ কিছু বিদ্যার্থী শিক্ষা লাভ করছে এরকম চিত্র থেকে পর্যটকদের ধারণা জন্মায় এই শহর কতটা প্রাচীন! মহাভারতে না থাকলেও শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, অগ্নিপুরাণ,  ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ প্রভৃতিতে সান্দীপনি আশ্রমের উল্লেখ পাওয়া যায় l 

       সান্দীপনি মুনি এই আশ্রমে কাশী থেকে এসেছিলেন l এখানে কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা সহ দেশ-দেশান্তর থেকে অনেক শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটে l এই আশ্রমের একটি শিলাতে একটি অঙ্কের উল্লেখ আছে, বিশ্বাস করা হয় যে,  সান্দীপনি মুনি ওই শিলাতে অঙ্কটি লিখেছিলেন l 

        মহাকাল মন্দির এই আশ্রম থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত l সান্দীপনি আশ্রমে কুণ্ডেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি সম্পর্কে কথিত আছে শ্রীকৃষ্ণ এই মহাদেবকে পূজা করতেন! তাই এই মহাদেবকে তুলসী দ্বারা পূজা করা যায়! এরকম পূজা ভারতে বিরল! সবই শ্রীকৃষ্ণের লীলা! তাঁর বিদ্যালয়ে শিবের মন্দির থাকার অর্থ হল স্থানটি হরিহর ক্ষেত্র l সমস্ত দেবতা এই ক্ষেত্রটির কথা অবগত আছেন!

      সান্দীপনি আশ্রমে একটি জলাশয় আছে যা গোমতী কুণ্ড নামে প্রসিদ্ধ! গুরু সান্দীপনি এখানে স্নান করতেন l এছাড়া শ্রীকৃষ্ণ অঙ্ক মোছার জন্য স্লেট ধুতেন l স্থানটি এইজন্য অঙ্কপাত নামে প্রসিদ্ধ ছিল!

          সান্দীপনি আশ্রমের চারিপাশ শান্ত, নির্জন! অনেক গাছপালা চোখে পড়ে! এক পবিত্র ধ্যান যোগের স্থান! আশ্রমের গ্যালারিতে চৌষট্টিটি বিদ্যার চিত্র আছে! শোনা যায় এই প্রাচীন গুরুকূলে শ্রীকৃষ্ণ এগারো বছর সাতদিন বয়সে বিদ্যা শিক্ষা লাভ করতে এসেছিলেন l এখানে তিনি  আঠারো দিনে আঠারোটি পুরাণ, চার দিনে চারটি বেদ, ষোল দিনে ষোলটি কলা সহ চৌষট্টি দিনে বিদ্যাশিক্ষা অর্জন করেছিলেন!

       এই আশ্রমে কুণ্ডেশ্বর মহাদেবের মন্দিরের সামনে নন্দীর স্থাপত্যটি শুঙ্গ যুগের! এখানে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরু বল্লভাচার্য-র বৈঠক অনুষ্ঠিত হত! তাঁর চুরাশিটি বৈঠকের মধ্যে তিয়াত্তরটি বৈঠক এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল!

      প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় হয় এখানে! এই পৌরাণিক স্থান এই যুগেও এক ভক্তি রসের আশ্রয়স্থল রূপে সর্বজনবিদিত!