Friday, May 1, 2026


 

বিশেষ বাছাই গল্প  

লস্ট ফেদার

শৌনক দত্ত


জীবন আর পথের বড় মিল।পথের মতো জীবনেও পিছনে ফেলে আসতে হয় চেনা অচেনা মানুষ। শেষ রাত্তিরে ফুঁ দিয়ে জীবন উড়িয়েছি পাঁচ আঙ্গুলে করুন দহন সারা সন্ধেবেলা, এখন দুপুর দুটো।কয়েক মাইল শূন্যতার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মাঝবয়সী ভুল। এই স্বপ্নের সাথে সেই স্বপ্নের মিল নেই! জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছালাম চুংথাং। এখানেই লাচেন চু এবং লাচুং চু হাত ধরাধরি করে তিস্তা হয়ে গেছে।ভাল লাগছেনা আমার, এভাবে কত আর পিছু টান?পাহাড়ে অন্ধকার নামছে।আমি হারিয়ে যাচ্ছি। ডুবে যাচ্ছি।

সন্মোহন কে মনে পড়ে।যদিও আজ এইখানে এসে তাকে মনে করার কোন মানে হয় না! একটা লোহার ব্রিজ পেরিয়ে লাচুং ঢুকছি আমি।আমার আস্তানার প্রধান দরজায় ঝুলছে বিরাট বড় সুদৃশ্য কারুময় পিতলের কড়া।আজকাল সোনা আর পিতলের তফাৎ বোঝা বেশ কঠিন। বিশেষ করে আমার মতো মানুষের জন্য সোনা না পিতল সনাক্ত করা বেশ শক্ত কাজ।মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারাতে নেই, বোঝার পর থেকে আমি তাইতো পিতলকেও সোনা ভেবে বিশ্বাস করি হরদম।আমি ঘুমুবো। একটি শব্দকে বুকে ধরে খুব ঘুমুবো, রাত্রি হলো। রাতভর দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। কিছুটা জিরো পয়েন্ট যাওয়ার উত্তেজনায়,কিছুটা ভোরে যদি ঘুম না ভাঙ্গে সেই টেনশনে। টেনশন আমাকে কখনোই ছুঁতে পারেনি,মেঘলার বিয়েতে সন্মোহনের চাউনি যেভাবে ছুঁয়েছিলো সেভাবে কেউ কখনো দৃষ্টিতে ফালাফালা করেনি আমায়।যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে শব্দ স্বর-তোমার চোখের কাছে আমার কনক ঋণ!আমার জন্মদাত্রী মা আমাকে অনাথ আশ্রমে রেখে গেছিলো শুনেছি।তার পরিচয় জানার ইচ্ছে করেনি কখনো জন্ম আমার কাছে ঋণী থাকলো নাকি আমি জন্মের কাছে?আজ ভাবতে ভাল লাগে আমার যদি কোন সন্তান হতো তাকে আমি কখনো অনাথ আশ্রম দিয়ে আসতাম না।কিন্তু আমি কোন সন্তান জন্ম দিতে পারিনি।সেই না পারাটা আজ আর সত্যিই কোন অর্থ বহন করে না।লাচুং নদীর পাশে বসে এবং শুয়ে প্রকৃতির সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে দিতেই মনে হলো নারী মানেই তিস্তা কিংবা ঐ দূরের পাহাড়।সন্মোহন আজ নিশ্চয় খুব ভাল আছে। ছোটবেলা থেকেই আমি ডাইরী লেখি,ম্যাডাম দরথী আমার জন্মদিনে তালা দেয়া একটা ডাইরী উপহার দিয়ে বলেছিলেন-‘রোজকার কথা এখানে লিখে রাখবে,নিজেকে কখনো একা লাগবে না।’আমি যে আদতে একা সেটা আমি সেদিনই বুঝেছিলাম।তার পরের বছর আমার জন্মদিন বদলে গেলো,আমাকে দত্তক নেয়া মা বাবার সাথে আমি নতুন করে শুরু করলাম।আমার নতুন নাম হলো,পদবী পেলাম।নতুন সব কিছুর মাঝে থেকে গেলো শুধু পুরোনো ডাইরী। লাচুং থেকে বেরিয়ে রাস্তা ক্রমশ পাথুরে,বোল্ডারময়। কাছে এবং দূরে বিভিন্ন আকারের পাহাড়ের রঙ ধূসর থেকে বাদামী হয়ে ক্রমশ কালো। অন্যান্য পাহাড়ী পথের মতোই  এঁকেবেঁকে কেবল উঠতে থাকি আমি। কিন্তু এই পথ রুক্ষ। পথের দুপাশে রডোডেনড্রন গাছের চিহ্ন আছে বটে, কিন্তু ফুলের কোন অস্তিত্বই নেই। অন্য যেকোন সময় হলে আমি সব লিখে রাখতাম ডাইরীর পাতায় আজ আর কিচ্ছু লিখছি না আমি। পাহাড়ী এই পথের মতো জীবনটাও যে এমন রুক্ষ হতে পারে কয়েকমাস আগেও কেউ বললে আমি হয়ত বিশ্বাস করতাম না। সন্মোহনেরও যে আমায় ভাল লেগে ছিলো তা বুঝতে আমার সময় লাগলো সাতদিন। সেদিন বাইরে উঁচু নিচু রোদ, মেঘলার নম্বরটা ভেসে উঠলো মোবাইলে। সমতল বিকালে মেঘলার সাথে আমার বাড়ী এলো সন্মোহন সঙ্গে তার মা বাবা আর বোন।আমি ইয়ুমথাং এর দিকে যাচ্ছি,রাস্তার ধারে বরফ পড়ে আছে।দূরে পাহাড়ের গা থেকে ঝুলে পড়ছে বরফায়িত ঝরনা।চোখে পড়লো পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে চলা কিপ ছঅ নদী।তার পান্নাসবুজ জলের বুকে সাদা বরফের চাদর।আমি ভূগোলের ছাত্রী, ভ্রমণ আমার খুব পছন্দ। দেখা অদেখার চাদর সরিয়ে সন্মোহনদের ব্যবসায়ী পরিবার, বিয়ের প্রস্তাব মেনে নিলেন আমার মা বাবা।বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।সেই প্রথম আমরা মিট করলাম কফিশপে।মনে পড়ে আমি সেইদিন অনেকটা আগেই পৌঁছে গেছিলাম।অনেক কটা মিনিট পরে সন্মোহন এসেছিলো,তার হাতে মোড়কে মোড়া উপহার। কফি অর্ডার করে পাশে এসে বসলো সন্মোহন।আমি তখন মোড়ক খুলে ডুবে গেছি কবিতায়। নতুন কবি, আগে কখনো পড়া হয়নি,অথচ কি সাবলীল,সহজ কথায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন বোধের জাদু যেমন করে গ্রাস করছে আমাকে সন্মোহন! দুপাশে পাহাড়,পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা মনোরম ঝরনা আর ছোট বড় অজস্র বোল্ডার। ইয়ুমথাং ঢুকে দুচোখ ভরে গেলে লাচুং চু-র শুকনো নদীখাতে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বাহারী রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগে। সন্মোহনের সাথে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে বিয়েটা হয়ে গেলো, চোখে রঙীন স্বপ্ন গ্রাম্য আকাশের মত,প্রাচীন ঠান্ডায় জমে থাকা হাত শীত থেকে বসন্তের দিকে যেতে যেতে দাড়ি কমা ছড়াচ্ছে। একদিন খেলনা পুতুলের বিয়ে দিতে গিয়ে যেমন সংসার পাততাম বন্ধুদের সাথে তেমনি আজ সংসার পেতে বসেছি, তবে এ খেলা নয়। প্রতিটি নারীর স্বপ্ন জুড়ে থাকে নিজের সংসার সেই পুতুল খেলার দিন থেকে যার শুরু। আমিও স্বপ্ন দেখেছি এতদিন নিজের ঘর, নিজের মানুষ, নিজের একটি নিটোল সংসারের। দূরে পাহাড়ের বুকে তুষারের আস্তরণ। এখান থেকে পাওহুনরি এবং শুনদু শেনপা পাহাড়ের চূড়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো  দূষনহীন ঘন নীল আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে মহাপৃথিবীর লক্ষ বছরের বোবা অহংকার যেন পাহাড়ের চূড়ায় সেজে থাকা বরফের আলপনা। নারী জন্মে নারীর বোধ হয় কিছুই নিজের হয়না, এমনকি ভাবনাও না। মনে পড়ে,হানিমুনে আমরা সমুদ্রে গেছিলাম, সেই প্রথম আমার সমুদ্র দর্শন,সমুদ্রকে এর আগে বহুবার মনে মনে ছুঁয়েছি, সেদিন বুঝিনি পুরুষমানুষ আদতে সমুদ্র, তাতে যত খুশি ভাসো, সাঁতার কাটো কিন্তু ডুবতে পারবে না তার গহীনে, পারে সে ফেরাবেই। আমার ডাইরীর পাতা খুব দ্রুত ফাঁকা হচ্ছিলো। কুড়িদিন ডাইরীর পাতায় কিচ্ছু লেখা হয়নি। হানিমুনের প্রথমদিন কাটলো পলকে, মনে পড়ে কুড়িদিন পরে ডাইরীর পাতায় শুধু লিখেছিলাম, একটি নিঃশ্বাস ঘন পৃথিবীতে আমি বার বার যাই, বার বার শুধু হারিয়ে যাই! ইয়ুমথাং থেকে কিছু দূরেই ইউমেসেমডং। আমি এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। চারপাশ অ্যাজালিয়া ফুলের গাছে ভর্তি।জায়গাটা জুড়ে তার সুবাস ঘিরে আছে।পাশেই চিনা সীমান্ত।ব্যবসায়ীক স্বার্থে আমি আর সন্মোহন পরিবার ছেড়ে অন্য শহরে থাকি। সময় নিরন্তর হাঁটে,সন্মোহনের খুব ইচ্ছে আমি চাকরী করি,তাই একটা চাকরী করছি, যদিও আমি সংসারটাই করতে চেয়েছি কিন্তু নারী তো তাই আশা বেঁধে রাখি যদি এটা করলে সুখ ফেরে, চাকরী করলে যদি সন্তান নেবার যোগ্য হতে পারি। সন্মোহন-কে সুখী করতে পারি না, যতবার তার কাছে মা হবার প্রস্তাব রেখেছি এখন নয় বলে সে ফিরিয়ে দিয়েছে। মাসের পর মাস আমার সেলারি তার হাতে দিয়ে আমি নিঃস্ব  থেকেছি এমন কি আমায় একা রেখে সে যখন অন্য শহরে ফিরে গেছে তখনো।আমার ডাইরীর পাতা ভরে উঠছে চাকরী,অত্যাচার আর অবজ্ঞার শব্দ স্বরে। আয়নায় মুখোশের নীচের মুখ ভেসে ওঠছে রোজ। ডাইরীর পাতায় তবু স্বপ্ন বুনেবুনে ভালবাসা লিখে রাখি। সন্মোহনের বাবা মা আর বোন কাচের চুড়ির মতো ভাঙছে শ্রদ্ধা। সন্মোহনও মদের নেশায় চুর হয়ে ছুঁড়ে মারছে ফুলদানী। কবিতা বলা মুখে উচ্চারণ করছে গালিগালাজ। আমি আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পাই, নিজেকে দেখতে ভয় পাই। সন্মোহনের কি মিথ্যে মনে হয় আগুনকে সাক্ষী রেখে বলা মন্ত্রের সব অর্থ? নাকি আমিই সেই নারী যে আদতে প্রাচীন বিশ্বাস আঁকড়ে বেঁচে আছি? আর দু কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই জিরো পয়েন্ট।ইউমেসেমডং এই শেষ বসতি। আর্মি এরিয়ার সুন্দর করে সাজানো পাথরের ঘরগুলো ছেড়ে এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়লো বরফজমা নদী। পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকিয়ে অনুভব করলাম পুরনো কফির মগ, মৃত অর্কিড, সাহসী সড়ক পথ, যেখানে ঠাঁই নেই দাঁড়িয়ে থাকার, সেখানে নিঃসঙ্গ নগ্ন বনানী!

আমার সকল দুঃখ উড়ছে উড়ে যাচ্ছে,সংসার থেকে গ্রীবার দিকে, সব স্বপ্নই একদিন নীরবের জল, সব নারী জলের মত জমে থাকা কাদা! বরফের নিচে এক কাঁদো কাঁদো নদী। আমাকে খুব বোকা মনে হচ্ছে।ডরোথি ম্যাডামের কথা বলেছিলাম তিনি ডিভোর্স নিয়েছিলেন, মেঘলাও তো একাই থাকে। আমিও হয়ত পারতাম ডিভোর্স নিয়ে নিতে। কিন্তু আমি সংসার করতে চেয়েছিলাম। ভালবাসা নিজের স্বপ্নের কাছে বড়,সমাধান নয় জানি তবুও এই ডাইরীর পাতাই কাল সংবাদ হবে। পথ থেমে আছে, শূন্য আর শূন্যের মাঝে হলুদ সংবাদ ধারন করেছে গোঁজামিলের অধর। হেঁটে হেঁটে আমার ক্লান্তি আসে, নতুন বৃক্ষের নিচে কয়েকটি এটোঁ স্বপ্ন কুকুর হয়ে পথ দেখায়...


 

গল্প 

ঝামা

মৌসুমী চৌধুরী


_টিং টং... টিং টং...
এত সকালবেলায় আবার কে রে বাবা!
এই সময়ে দুই ছেলেই অফিসে থাকে, বাড়িতে তিনি একা। এই সময় বিশেষ কেউ এ বাড়িতে আসে না। কলিং বেল শুনে ধীরে ধীরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বিভাবতী। গত রাত থেকে বাতের ব্যথাটা আবার বেড়েছে। তাই তাড়াতাড়ি হাঁটতে চলতে পারছেন না। আবার _ টি টং...টিংটং...
_ " আসতাছি রে বাবা। আসি...কে অত 
 ঘুড়ায় জিন দিয়া আইচ ... খাড়াও ..."
    দরজা খুলে বিভাবতী দেখলেন কিছু উঠতি বয়সের ছোকরা, তাঁদের পাড়ারই ছেলে। মুখগুলো চেনা। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘোরে ফেরা করে। কিন্তু কোন্ দল এই মুহুর্তে ঠিক মনে করতে পারলেন না তিনি। 
   ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বেশ ধোপদুরস্ত পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। হাত জোর করে মুখে বিনয়ের হাসি ফুটিয়ে তুলে বলতে শুরু করল,
_ " মাসীমা, আমাকে চিনেছেন তো? আমিই এই ওয়ার্ডের পৌরপিতা।"
এবার ছেলেটাকে ঠাওর করতে পারলেন বিভাবতী। গতবারও ভোট চাইতেই এসেছিল, জোড়া ঘুঘু চিহ্নের প্রার্থী হয়ে। 
_" মাসীমা, আমর কথা তো সব জানেনই। আমি আপনাদের ড্রেন সংস্কার করেছি মানে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন তৈরি করে দিয়েছি, বিশুদ্ধ পানীয় জল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছি, প্রতি সপ্তাহে এই এলাকার প্রতিটি বাড়ির আনাচে কানাচে, ড্রেনে ড্রেনে মশা মারার ঔষধ দেবার ব্যবস্থা করেছি। ডেঙ্গুদমনে আমিই সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছি বলতে পারেন। 
 _ ' তা তো বুঝলাম। কিন্তু... "
বিভাবতীকে শেষে করতে না,দিয়ে ছেলেটি আবার বলা শুরু করে, 
-- "তারপর এই তো আপনাদের মতো প্রবীণ নাগরিকদের কাছে বার্ধক্য ভাতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ইত্যাদি সরকারের সমস্ত জনকল্যাণমূলক পরিষেবা তো আমিই পাঁচ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে পৌঁছে চলেছি। ঠিক কিনা, বলুন? হে হে ... একেবারে একশ শতাংশ কাজ আমি করে দিয়েছি ... হে হে... সবাই তো জানেন এসব, মাসীমা নতুন কিছু নয়।"
 এক নাগাড়ে নিজের কাজের খতিয়ান দিয়ে একটা কিনলের বোতল খুলে গলায় জল ঢালল ছেলেটি।

       এবার তার সঙ্গের এক ছোঁরা বিভাবতীর হাতে চারটি ছোট ছোট ছাপান চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলল,
_" নিন মাসীমা, আপনার বাড়ির চারটে ভোটই কিন্তু আমাদের। আবদার জানিয়ে গেলুম ...আর কিছু দরকার হলে আমাদের ডাকবেন, পাবেন পাঁচ বছরভর।"
   ওদের হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে
নজর বুলিয়ে বিভাবতী তো থ'। এতে কই ঘু ঘু চিহ্ন? নেই তো ! তার বদলে বড় একটা সম্পূর্ণ ফোটা গোলাপফুল আঁকা!
_ " একি? ঘুঘুর ছবি নাই ক্যান? গতবারে তো..."
_ " গতবারের কথা ভুলে যান মাসীমা।
    আবার মুখ খুলল সেই প্রার্থী ছেলেটি।
_ " ক্যান? ক্যান ভুইল্যা যাইতে হইব ? "
  অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন বিভাবতী।

_ " না মানে মাসীমা, ওদের সঙ্গে আর কাজ করতে পারছিলাম না আমি। দলে আমার কোন গুরুত্বই ছিল না। মানে..."
স্মার্ট ভঙ্গিতে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ছেলেটি।
 তার আগেই সঙ্গের এক চ্যালা কীর্তনের দোহারের মতো কতা ধরে,
  _" দাদা এখন আমাদের দলে যোগদান করেছেন, মাসীমা। দাদা আর ওদের দলে নেই, ওরা ওঁকে যোগ্য মর্যাদা দিতে পারেনি। দাদাকে এবার টিকিট দেওয়া হয়নি। তাই এবার তিনি আমাদের হাত শক্ত করেছেন। এই গোলাপ-ই এখন দাদার চিহ্ন...এতেই বোতাম টিপবেন, কেমন?"

_ " অ... বুজলাম। তা অগো লগে কাম করতে পারতাছিলা না কইলা, কিন্তু এই
যে এতক্ষণ ধইরা যে এত এত এত কামের খতিয়ান শুনাইলা! শয় শতাংশ কাম কইরা ফেলাইছ কইলা। তয় এই কামগুলান কিভাবে করলা?"
 " নাহ্... মানে, মাসীমা, শুনুন...মানে..."
_" আরে মানে মানে করতাছ ক্যান? শুননের কি আছে আর? অহন তুমরা আসো। আমার ম্যালা কাম পইড়া আছে। তুমি দল বদলাইছ। তয় নতুন বছরে আমিও এইবার আমার পছন্দ বদলামু... বুঝলা কিনা।"
 _ " না মানে মাসীমা... একটা কথা শুনুন...."
   দড়াম করে মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দেন বিভাবতী।
_ "যইত্তসব!!! আবোধা ছাতা!"


 

গল্প 

স্বীকারোক্তি 

অমলকৃষ্ণ রায়

বন্ধ ঘর। আলো নেই। ঘরটাও অচেনা। কোনওদিন এখানে এসেছি বলে মনে পড়ছে না। একা আমি। আলোহীন আবছায়ায় আন্দাজ করতে পারছি, ঘরে খাবার-দাবার রয়েছে। পানীয় জলও আছে। টয়লেটও দেখতে পাচ্ছি। এরকম একটা বিচ্ছিন্ন ঘরে কবে থেকে আছি। কিছুইতো মনে পড়ছে না। ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ বাইরের কিছু মানুষের গলা শুনে জেগেই এসব দেখছি। এরকম অবস্থায় আটকে রয়েছি বুঝতে পেরে ভয়ে গলা শুকিয়ে এল। কোনওরকমে হাতড়ে জলের জগটা নাগালে নিয়ে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিলাম। তাতে ঘুমচোখের তন্দ্রাভাব অনেকটাই কেটে গেল। মনে করার চেষ্টা করলাম, আমি ঠিক কোথায়? কী করে এলাম এখানে? কে বা কারা আমায় ধরে এনে এখানে আটকে রাখলো?’ যদিও একা থাকতে আমার মন্দ লাগে না। আমার মতে একা থাকার অনেক সুবিধে। নিজের সঙ্গে একান্তে কথা বলা যায়। নিজেকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে পারি। বাইরের জগতে সারাদিন কাটালে দিনের বেশির ভাগ সময় লোকজনের সঙ্গে কথা বলতেই তো কেটে যায়। নিজের কথা ভাবার মতো তেমন ফুরসত পাই না। তাছাড়া একা থাকা অবস্থায় আমায় কবিতা লেখা, গল্পের প্লটের ভাবনা বেশ পেয়ে বসে। তখন কলম চালিয়ে অনায়াসেই কিছু না কিছু লিখে ফেলতে পারি। ভাবছি, এই অবস্থায় যদি সাহিত্যের কোনও ভাবজগতে ঢুকে পড়ি, তাহলে সেটা লিখব কী করে। একে তো ঘরটা অন্ধকার। তারমধ্যে খাতা-কলম-ল্যাপটপ, এই সব তো কিচ্ছু নেই মনে হচ্ছে। মনে লেখার ভাব আসার পর লিখতে না পারলে তখন আরও বেশি কষ্ট হয়। রাস্তায় একা চলতে চলতে যখন কিছু লেখার ভাব মাথায় চলে আসে, তখন চিন্তায় পড়ে যাই, এইরে! এতগুলো লাইন মনে পড়ে গেল। এখন এসব লিখব কী করে? বাড়ি ফিরে লিখতে বসতে বসতে তো সবই প্রায় হারিয়ে যাবে।
বাইরে থেকে আবারও কিছু মানুষের গলা কানে এল। মনে হচ্ছে কাছেপিঠেই তারা রয়েছে। কী নিয়ে তারা আলোচনা করছে। নিশ্চয়ই আমায় নিয়ে নয়। আমায় নিয়ে কেনইবা আলোচনা করবে? চুলোয় যাক, এই অবস্থায় কেন এলাম, অযথা তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই সুন্দর একটা একাকিত্ব উপভোগ করাটাকে নষ্ট করব কেন। আমি বরং আমাতেই ডুবে যাই না, যেমন আর পাঁচটা দিন একা থাকার সময় নিজেকে নিজের মধ্যে হারিয়ে ফেলি। তারপর ভাবনা আকাশে পাখনা মেলে কিছুক্ষণ উড়ে বেরিয়ে গাঙচিলের মতো যদি কিছু তুলে নিতে পারি তো ভাল, না পারলেও হারানোর তো কিছু নেই। তাই বন্ধ ঘরের একাকিত্ব ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করতে লাগলাম। ভুলেই যাচ্ছি, কখন দিনশেষে রাত আসে, কখন আবার রাত শেষে ভোর আসে। আমার কাছে কোনও ঘড়ি নেই, মোবাইল ফোন নেই বলে সময়টাও জানতে পাচ্ছি না। ঘরটা রাতের মতো অন্ধকার বলে কখন রাতদিন আসছে কখন দিন আসছে বুঝতেও পাচ্ছি না। তবে পুরোপুরিভাব বুঝতে না পারলেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারি যে দিন ফুরিয়ে সন্ধে নেমে রাত আসছে। রাত ক্রমশ গভীর হতে হতে চারিদিকের লোকালয়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে সেটাও বুঝতে পারি। তারপর আবার নিশুতি রাতের আবেশ কেটে গিয়ে কাকভোরের পাখির ডাকও কানে আসছে। এরইমধ্যে বেশ আছি আমি; খিদে পেলে খেয়ে নিচ্ছি। পিপাসা পেলে জলপান করছি। ঘুমের ক্লান্তি এলে চোখ বন্ধ করে নিথর হয়ে পড়ে থাকছি। সাহিত্যে কখনও পেয়ে বসলে মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে মনে মনে বলছি, এখন নয়, অন্য সময় এসো। ঘুমের মাঝেও নানারকম স্বপ্নাচ্ছন্নে ডুবে যাচ্ছি। এক অন্য জগতে একপাক ঘুরে অবচেতনতার মেঘ কাটিয়ে জেগে ওঠার পর আবার সজ্ঞানে ফিরে বুঝতে পারছি, এখনও সেই বন্ধ ঘরটাতেই বন্দি রয়েছি।
এসবের মাঝে একবার মনে হলো, আমি বোধহয় কোনও জেলখানায় রয়েছি। হয়তো কোনও সামাজিক অপরাধ করে ফেলেছিলাম। সেজন্যই আমার এ শাস্তি। আর বাইরে যাদের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, তারা হয়তো পুলিশ। আমায় নিয়েই দরবার করছে, কেসের ঘুঁটিটা কী করে সাজাবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। পরক্ষণেই ভাবি, আমার মতো একটা নির্লোভ, সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত মানুষ কেনইবা অপরাধ করবে, থানা-পুলিশের খপ্পরে কেন পড়বে, সেটা নিয়ে কোর্ট-কাছারির পর বন্দি জীবন আসবে। হুট করে তো একটা লোককে ধরে জেলে আটকে রাখতে পারে না। সমাজের চোখে সত্যিই যদি কোনও অপরাধ করে থাকি, তার তো কতগুলো ধাপ রয়েছে। সেসব পেরোবার পর খালাস কিংবা হাজতবাস হবে। এতকিছু হলে আমি কিছুই জানব না, কিছুই মনে থাকবে না, সেটা কখনও হয় নাকি। নাকি কেউ আমায় এমন ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বেহুঁশ করে রেখেছিল যে কয়েকদিন ধরে সে ঘুমের রেশই কাটছে না। এই যে আমি এখন জেগে রয়েছি, এখনও তো খানিকটা ঘুমের আবেশ চোখে রয়েছে। মনে হচ্ছে চোখ বুজলেই ঘুমিয়ে পড়ব। নিজেকে নিয়ে মনে অনেক প্রশ্ন জাগলেও কোনওটারই নিশ্চিত কোনও উত্তর খুঁজে পেলাম না।
এরইমধ্যে আমার বন্দিজীবনে মানসপটে একটা পরিবর্তন দেখা দিল। নিজের মধ্যেই দ্বৈত সত্তার সৃষ্টি হল। আমি বনাম আমি; এ দুয়ের মাঝে মত-বিনিময়, তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়াঝাটির তুমুল ঝড় বয়ে যেতে লাগলো। অন্তর্মুখী আমি বনাম বহির্মুখী আমি। আমি জানি আমার একটা অন্তর্মুখী আমি আছে। যে কিনা ভীষণ মুখচোরা। সেই আমিটা নিজেকে যুক্তিতর্কে কখনও জিতে আসতে পারে না। আত্মপক্ষ সমর্থন করে অকাট্য কোনও যুক্তি খাড়া করতে পারে না। তারজন্য অকারণে ভিতরে ভিতরে কষ্ট পায়, হেরে গিয়ে লজ্জায় ভিতরে ভিতে কেঁদে ওঠে, কখনও নিজের প্রতি নিজেরই ঘেন্নায় রাগ হয়, অভিমানী হয়ে কষ্ট পায়। আর যে বহির্মুখী আমি, সে দোষ করুক গুণ করুক, সবেতে গলাবাজি করে ঠিক জিতে বেরিয়ে আসে। সেই দ্বৈত সত্তা মিলে কখনও দ্বিমত পোষণ, কখনও সহমত পোষণের প্রক্রিয়া চলতে থাকলো। এসবের মাঝে এক নিরপেক্ষ আমি জেগে উঠে কোনও খেলার রেফারির মতো মাঝে ফোড়ন কেটে বলি, আমরা কি কোনও বোর্ড মিটিং ডেকে জীবনের নানারকম সমস্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চলেছি।
এসবের মাঝে কখনও মনে হয়, সত্যিই কি আমি এখানে একা, নাকি আমায় ঘিরে কিছু ভূতুড়ে মানুষ রয়েছে। তাদের হয়তো দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে তারা নির্ঘাত ঘরটার দেয়াল, ছাদ, মেঝে সর্বত্র আত্মগোপন করে রয়েছে। সম্বিত ফিরে পেলে আমার মধ্যে যে এসব উদ্ভট ভাবনাগুলো চলছিল, বিশ্বাসই করতে পারি না। তখন মনে হয়, পাগলের মতো সব ভুলভাল ভেবে চলেছিলাম। দেওয়াল, ছাদ, মেঝের আড়ালে আবার কখনও কেউ থাকতে পারে নাকি! এসব অবাস্তব, অবান্তর কিছু ভাবনার একটাই কারণ হতে পারে। হয়তো এই একাকিত্ব আমার মগজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
এভাবে কটা দিন কেটে যাবার পর ধীরে ধীরে আমার খাবারের প্রতি অনীহা আসতে শুরু হল। ঘরের অন্ধকারে রাখা খাবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনা সে নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠলাম। মনে হতে লাগল, এভাবে কবে থেকে এসব পড়ে রয়েছে, সেটা কি এখনও খাবারের উপযুক্ত রয়েছে নাকি এতদিনে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খেলেই শরীর খারাপ হতে পারে। তাতে প্রাণহানির আশঙ্কার প্রবল। তাই অকারণে অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো খেয়ে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব না। তার চেয়ে অভুক্ত থাকাই শ্রেয়।
এভাবেই অন্ধকার কুঠুরিতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে কাটতে একবার এক অভিনব উপলব্ধি শুরু হল। ঘরের দেওয়ালে অদ্ভুতরকম কিছু চিহ্ন ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে কোনও লিপি, যা আগে কোনওদিন দেখিনি। যার অর্থ আদৌ জানা নেই। লিপির মতো দেখতে আঁকিবুঁকিগুলো দেয়ালের একপ্রান্ত থেকে চোখের সামনে এসে অন্যপ্রান্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। এসব অক্ষর আমার পরিচিত নয়। একবার মনে হলো এসব কি তাহলে এলিয়েনদের ভাষা। কিংবা পৃথিবীর বাইরের অন্য কোনও জগতের প্রাণীকূলের লেখ্য ভাষা। বোবা সব এলিয়েনরা এসবের মাধ্যমে এ জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে। তাই বেতার তরঙ্গের মতো ভাষাগুলো আকাশগঙ্গা পেরিয়ে এই অন্ধকার কুঠুরিতে চলে এসেছে। অক্ষরগুলো আমায় কিছু বলতে চায়।
 একদিন আমার মনে সম্দেহ জাগলো আমি কি বেঁচে আছি। নাকি প্রাণের সত্তা হারিয়ে এলিয়েন হয়ে উঠেছি। তাই তারা আমায় স্বাগত জানাতে ছুটে এসেছে। এসব নানারকম পরাবাস্তবতার আঁধারে ডুবে যেতে যেতে একদিন মনে হল, ক্রমশ যেন ভাববার মতো শক্তিও হারিয়ে ফেলছি। ওসব এলিয়েনকেন্দ্রিক ভাবনাও আর মনে আসছে না। দিনেদিনে ক্রমশ শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। হাত-পা শরীরের কোনও অংশ নড়ানোর মতো শক্তি হারিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয়, সেইসঙ্গে নিজের আমিত্বকেও হারিয়ে ফেলছি। সোজা কথা যে অবস্থায় এসে পড়েছি, সেটা মনে হচ্ছে বাঁচা-মরার মাঝামাঝি কিছু। কিংবা জীবন-মৃত্যুর মাঝে দোলাচলে দোল খাচ্ছি; এই আছি, এই নেই অবস্থা আমার। বিদ্যুতের জমকের মতো আমার মধ্যে কখনও জীবন তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। পরক্ষণেই হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় মোমবাতি নিভে যাবার মতোই সে জীবনের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে; এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। এই অবস্থায় কখনও মনে হল সজোরে আর্তনাদ করে কেঁদে উঠি, কখনও মনে হয় ঘরদোর কাঁপিয়ে কাঁদার চাইতে বরং পৈশাচিক হাসি হেসে উঠি। হাসির শক্তি কান্নার চাইতে অনেক জোড়ালো। কারণ আমি জানি, হাসি শরীরের দুঃখ-কষ্টের কেমিক্যাল কর্টিসল নিঃসরণ কমিয়ে সুখের কেমিক্যাল ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। যাকিনা জীবনকে সহজেই স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। এসব ভাবতে গিয়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমি কী করব, কাঁদব নাকি হাসব। অবশেষে যা হলো, বহু চেষ্টা করেও গলা থেকে কোনও রা বের করতে পারলাম না। পাথরের মতো নিশ্চুপ, নির্জীব অচল হয়ে পড়ে রইলাম। তারপর আর কিছু জানি না।
যখন সম্বিত ফিরলো, দেখলাম, ঘরভরতি আলো। নানারকম যন্ত্রপাতির মাঝের একটা বেডে আমি শুয়ে আছি। পাশে এক ডাক্তারবাবু আমার পালস ধরে বসে মনিটর স্ক্রিণের দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। একসময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, চিন্তার কোনও কারণ নেই। সব প্যারামিটারই ধীরে ধীরে নর্মাল হয়ে আসছে। ভাগ্যিস, সময়মতো আইসিইউতে আনা হয়েছিল। ডাক্তারবাবুর বন্ধু জানতে চাইলেন, ‘তাহলে কী সিদ্ধান্তে আসা গেল? একজন সুস্থ মানুষ না ঘুমিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে পারে?’ গম্ভীর ভারী গলায় ডাক্তারবাবু বললেন, ‘এগারোদিন। এরচেয়ে বেশিদিন নির্ঘুম কাটালেই নির্ঘাত মৃত্যু।’ ডাক্তারবাবুর কথায় বুঝলাম, আমি বর্তমানে একটা মেডিক্যাল কলেজে ঘুম নিয়ে গবেষণারত কিছু ডাক্তারি গবেষকদের পাল্লায় পড়েছি। একজন মানুষ কতদিন না ঘুমিয়ে কাটাতে পারে সেটা জানতেই তারা আমায় ব্যবহার করেছে।
ডাক্তারবাবুরা চলে যাবার পর একজন নার্স এসে আমায় বললেন, আপনার আজ ছুটি। বাড়ির লোক এলেই ছেড়ে দেওয়া হবে। তখনও বুঝে উঠতে পারছি না, কোথায় আমার বাড়ি, কেইবা আমার আপনজন। ভাবলাম, সে যাই হোক, সবচাইতে স্বস্তির কথা হল, তারা তো তাদের গবেষণার গিনিপিগ-শিকারটিকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি দিচ্ছে। মানসপটের নির্জীবতার ঘোর ক্রমশ কেটে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে আমার পরিবার, স্বজন, বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। বিমলা আমার স্ত্রী। সদ্য বিয়ে করে একটা পর্যটকের দলের সঙ্গে পাহাড়ে ঘুরতে বেরিয়ে দলছুট হয়ে কোনও খাদে বসে বিমলা—বিমলা-- বলে ডাকাডাকি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।
‘কেমন আছো?’ বিমলা এসে হাজির। তার কথার উত্তর দেবার আগেই একজন ক্যামেরাম্যান এসে আমার একটা ছবি ক্লিক করলো। পরিচয় জানতে চাইলে বললেন, তিনি একজন মেডিক্যাল জার্নালিষ্ট। আগামী মাসে তাদের পত্রিকায় আমার ছবিসহ একটি গবেষণা পেপার্স প্রকাশিত হবে।


 

গল্প  

চৈত্রের শেষে 

পর্ণা চক্রবর্তী


নীলু এসে ডাকল, “ও মা ..মা..”

 দুপুর গড়িয়ে গেছে।  পায়রাগুলো সকাল থেকে ডেকে ডেকে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।  নীলু  আকাশটা  দেখে নিল  একঝলক। রবিন ব্লু রঙের   ওপর  টুকরো  সাদা মেঘ  ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর মন খারাপ হলে  একবার  আকাশটা দেখে নেয়। ছোটোকাকা বলতো আকাশ দেখলে নাকি  বুকের ভেতর সে  ঢুকে পড়ে দুঃখ কষ্টগুলো শুষে নেয়। “আমার কি মন খারাপ?,ভাবতে ভাবতে নীলু আবার ডাকল , “মা কি গো…”

পূরবী  দুপুরের ভাত ঘুম দিচ্ছিলেন আরাম করে। নীলুর চিৎকারে কাঁচা ঘুমটা ভাঙল। 

 নীলু  চেয়ার টেনে পূরবীর সামনে  বসল, “ছোড়দি আসছে সামনের সপ্তাহে ,একটু আগে ফোন   করেছিল।”  ঘুম থেকে ওঠার পর পূরবীর সব গুলিয়ে যায়। 

ছোড়দিটা কে, মনে করতে টাইম লাগল।

“কি গো,  বুঝলে ?”

“অ মনু আসবে ? সে তো বাইরে কোথায় যেন থাকে।” 

“আগে  থাকত বেলজিয়াম। বললাম না সেদিন, এখন কিছু  মাস হলো দিল্লিতে থাকছে।” পূরবী খুশি হলো। ছোটো ভাসুরের ওই একটাই মেয়ে মনু। পূরবীকে ভালোবাসত খুব। বাপ মা মারা যেতে অনেক বছর হলো কলকাতায় আসেনা।  

নীলু বেরোচ্ছিল। “

“ তুই যাচ্ছিস কোথায়?”

“যাই একটি ঘুরে আসি। কালী বলেছিল আজকে টাকা দেবে।”

কোভিডের  সময় চাকরি যাওয়া ইস্তক নীলু আর কোনো কাজই ঠিক করে করল না।এখন বাড়ির দালালি করে। কলকাতার উত্তরে এখন  অনেক বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে।   সে সব ফ্ল্যাট বিক্রি, ভাড়া থেকে কিছু রোজগার হয়। পৈতৃক যা আছে তাতে  চলে যায় দুজনের। নীলু বিয়ে করতে চায় না। বলে, “রোজগারের ঠিক নেই বিয়ে করে শেষে আরেক ঝামেলা।” রায় বাড়ির অবস্থা আগের মতো আর নেই।কর্তারাও কেউ  বেঁচে নেই কিন্তু  ছেলেপুলে নাতি নাতনিরা বছরে একবার সব আসে।সবাই মিলে টাকা খরচ করে  বাড়িটাকেও মোটামুটি ভালোই রেখেছে। ওপরতলার ঘরগুলো বন্ধ থাকে। নিচের তলায়  থাকেন পূরবী আর নীলু। পেছনের দিকে একটা ভাড়া রেখেছেন সবার সম্মতিতে।  ভাড়ার  টাকাটা পূরবী জমিয়ে রাখেন। কোনো পুজো পার্বণে, কারুর বিয়ে,পৈতে এসব কাজে দিতে লাগে।  


 পূরবী ভেতরের  দালানে এসে বসলেন। সামনের  বিশাল উঠানটা একলা পড়ে আছে। আজকের মতো রোদ  ছোটো হয়ে  বাড়ির কোণে ঘুপচিতে  ধীরে ধীরে  মিলিয়ে যাচ্ছে। আগে হলে কত লোকজন

হাঁকাহাঁকিতে জায়গাটা ভরে থাকত। দোতলার বারান্দা জুড়ে পায়রাদের ডানার ঝাপটে একটা বিষন্ন সন্ধ্যা চুপিচুপি রায়দের তিনতলার বিশাল বাড়িটাতে ঢুকতে লাগল।ভাড়াটের ঘরে শাঁখ বাজল। রাতের রুটি কটা করে পূরবী সিরিয়াল দেখতে বসবেন। খানিকক্ষণ ভুলে থাকবেন  রোজের বেঁচে থাকার যন্ত্রণা।

পয়লা বৈশাখের তিনদিন  আগে মনু চলে এলো।  পূরবী লোক ডেকে দোতলার  ঘর,বারান্দা সব পরিষ্কার করিয়ে রেখেছিলেন আগে থেকে। 

মনু  উবার থেকে নেমেই পূরবীকে জড়িয়ে ধরল। 

“ছোটমা তুমি কতো রোগা হয়ে গেছ” নীলু বলল “আর তুই মোটা।”

পূরবী হাসলেন , “বয়স হচ্ছে রোগাই ভালো।” মনু এসেই সারাবাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগল। কতদিন পর যেন প্রিয়জনের সাথে দেখা হলো।খালি পুরোনো কথা বলে।

 “তোর মনে আছে নীলু, ছাদে আমরা সবাই চড়ুইভাতি করলাম? তোর পড়ে গিয়ে দাঁত ভাঙল আর মা এসে আমাকে পেটালো। তোকে খুব ভালোবাসত রে।” মনুর চোখ  ছলছল করে। “সেই মা মারা যাওয়ার পর আর আসাই হলো না।” 

“কেন হলো না ছোড়দি? নীলু মনুর পাশে এসে  বসল। 

“অত দূর থেকে আসা… ওদের স্কুল আমার কলেজ  আর…”

“তোর বর পারমিশন দেয়নি সেটাই বল।”

মনু  ফিকে হাসলো,”সে ছাড়।

তুই কবে বিয়ে করবি ?সেই যে  অখিল কাকুর মেয়েটা কি যেন নাম?” “আমার জন্য বসে থাকবে? কবে বিয়ে হয়ে গেছে।” মনু একটু অবাক হলো, তাই? যাকগে ,ভালো থাকুক।”

মনু খানিক আনমনা। নীলু শব্দ করে হাসল। “সে আর সম্ভব নয়,বেঁচে  থাকলে না হয়…. যাকগে তুই বল,কি কি মাছ খাবি, চট করে একবার বাজারটা ঘুরে আসি।”

  নীলু একঘর শূন্যতা ছড়িয়ে চলে গেল। পূরবী বলল, “কোভিডের  সময় মারা গেল। নীলু যে কতদিন  ভালো করে ঘুমোতে  পারেনি ।”

মনু চোখ  মুছল, “সব যেন কেমন বদলে যাচ্ছে,তাই না ছোটোমা?”


রাতে মনু পূরবীর সাথেই শুলো। বলল, “কত বছর পর এলাম।দোতলায় একা একা শোবোনা।”একবার ছাদে গেল। তিনতলা, দোতলার ঘরগুলো খুলে খুলে দেখল। কোনটা রাঙ্গাকাকার ঘর, বড়জ্যেঠু , ফুলঠাকুমা , ওর পড়ার ঘর,সব যেন মনুকে দেখবে বলে এতদিন বসেছিল। দক্ষিণের বারান্দাটার চারপাশ ঘিরে দিয়েছিল ছোটোকাকা। মনুদের পুতুল ঘর। বারান্দার দেওয়ালে পলেস্তরা খসে পড়ে কতগুলো মুখ তৈরি হয়েছে।  তাদের আবছা গালে, ঠোঁটের  রেখায় কত বছরের  দুঃখ যেন আলগা লেগে আছে। মনু  আলতো হাত রাখতেই কতগুলো বাচ্চার সতেজ  হইচই  উঠে এলো যেন চারপাশ থেকে,  “ও কুমির তোর জলকে নেমেছি…” মনু  বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে রইল চুপ করে । ছাদের ওপর ভীড়  করেছে ছেলের  দঙ্গল। আকাশে  লাল, নীল  ঘুড়ি  উড়ছে  পতপত  করে। 

ভো কাট্টা….সমবেত  চিৎকার  ছাদ থেকে বেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে গেল। নিঝুম  দালান । মনুর চারপাশে স্মৃতিরা সাঁতার কাটে। পায়রাগুলো কথা বলে ওর সাথে,

“মনু, মনু কতদিন পর এলে …” .

ওদের বকবকম শব্দটা একটা 

ঘুমপাড়ানি গান গাইতে থাকে। কারা যেন  ছায়া হয়ে ওর চারপাশে ভিড় করে। কে পাশে বসল , চুড়ি বেজে উঠল। বাতাসে জবাকুসুমের  গন্ধ। “কে ,বড়মা ?” চুরুটের গন্ধ মেখে বাবা এসে দাঁড়ায়।

“ফুলঠাকুমা কি দিচ্ছ?” রাধামাধবের প্রসাদের জন্য হাত পাতে মনু।  

মা রান্নাঘর থেকে ডাকছে,

“এবার খেতে আয় মনু। পূরবী,

বাচ্চাগুলোকে ডাক।”

মনু ঘুমের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। বাইরের অলস  দুপুরে পাড়া জুড়ে হাঁক ওঠে, বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগে, মহাদেএ এ.. ব..

ছোট্ট মনুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে  ফুটফুটে এক কিশোর।

“গাজনের সং বেরিয়েছে,দেখবি না?”হাত ধরে টানে মনুর। 

“রাঙ্গাদা তুই তো বেঁচে নেই।” মনু ডুকরে কেঁদে  উঠতে গিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখে নীলু ওর পাশে বসে  হাত ধরে টানছে।

“কি রে ছোড়দি বারান্দায় বসে ঘুমোচ্ছিস,আর আমি খুঁজে খুঁজে হদ্দ হলাম,চল,খেতে চল।”


খেতে বসে মনু কাঁদছিল।সারাজীবন ধরে শুধু সবার সাথে মানাতে গিয়ে কতকিছু যে হারিয়ে ফেলেছে ,টেরই পায়নি।। নীলু বলল “কাঁদবি না।  আমরা তো আছি। প্রতিবছর ওই একটা দিন তোর কথা সবাই বলে। ভাবি এইবার তুই ঠিক আসবি,আসিসনা। ফোনও ধরিস না তখন। বড়দা আর ফুলদি বলবে পরেরবার ঠিক আসবে। সেই পরেরবার আর আসে না।”

মনু চুপ করে রইল। কি বলবে?  ভাস্কর ,ওর ছেলে মেয়ে, যে যার বৃত্তে নিজের মতো থাকে।মনুকে ওদের আর কোনো প্রয়োজন নেই সে কথা কি কাউকে বলা যায়?

  

গোটা পাড়াটাই যেন বদলে গেছে।  নতুন ফ্ল্যাটে নতুন মুখ। পুরোনো লোকজন নেই প্রায়। যারা আছে, তাদের বাড়ির মতো তারাও কেমন বদলে গেছে। বেরং, স্মৃতির ভারে জরজর। শেঠদের  মাঠে ক্রিকেট খেলা,শীতের রাতে ব্যাডমিন্টন। সেই ছোটবেলার মাঠটাকে লম্বা একটা বাড়ি কবেই গিলে খেয়ে নিয়েছে। সন্ধ্যাবেলায় চড়কের মেলায় গেল নীলুকে নিয়ে। “মাটির রাজাপুতুল ,রানিপুতুল কোথায় রে নীলু ? আর ওই বেতের ঝুড়ি ?”  

খুঁজে পেলোনা মনু। নীলু হাসছে,

“তুই আর বড় হলিনা ছোড়দি, তিরিশ বছর আগেকার জিনিস খুঁজছিস?”  মনুর সব কেমন অচেনা লাগে।

নেতাজীর তেলেভাজা কিনে বাড়ি ফেরার সময় এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক একগাল হেসে সামনে দাঁড়ালেন,  “কেমন আছিস রে ছুটকি ? বড়দার বন্ধু বাদলদা।”

ছুটকি….. বড়দা ডাকত।কত বছর  হলো যেন বড়দাকে দেখেনি ?


 রাতে নীলু পনিরের কোফতা আর বাসন্তী পোলাউ করে মনুকে একদম চমকে দিল। 

“তুই এত ভালো রান্না করিস কবে থেকে রে?”নীলু লজ্জা পেয়ে হাসে। 

“তাহলে একটা খুলেই ফেলি রেস্তোরাঁ কি বলিস।”মনুর মুখ ঝলমল করে।  “মনেই ছিলনা, তুই তো আমাদের বাড়ির ফুড টেস্টার ছিলি ,ভালোমন্দ রান্না হলেই তোর ডাক পড়ত।”

“বাড়ির সামনের জায়গাটা নিয়ে শুরু করব, বুঝলি।প্রথমে ইন্ডিয়ান ক্যুজিন থাকবে,তারপর….”

সারারাত ধরে  আলোচনা চলে।

“ টাকা কত লাগবে ?” 

“সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।জমানো কিছু আছে, বড়দা,ফুলদি সবাই বলেছে  টাকার চিন্তা না করতে।”

 ভোর  হয়ে আসছে…. মনু বলে “ছাদে যাবি?"


পূবের আকাশটাতে  হালকা আলো লেগেছে। গোটা পাড়াটা গভীর ঘুমে। একটা রিক্সা গেল ঠনঠন করে।  একটা লোক  হনহনিয়ে হেঁটে গেল। “চিনতে পারছিস? বিলটুর ছোটো কাকা।”

 মনু বলল, “এত সকালে ?”

“গঙ্গাস্নানে।” 

“সেকি রে,এখনো ?”  

“সানি মারা যাওয়ার পর থেকে মাথাটা একটু .. যখন তখন গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসে থাকে।”

“ সানি…”,মনু আর্তনাদ করে উঠল, “জন্মাতে দেখলাম।” নীলু মাথা নাড়ল “ওদের গোটা বাড়ি গাভাস্কারের অন্ধ ভক্ত ছিল, মনে আছে?  বাবা- ই তো দিয়েছিল ‘সানি’ নামটা।”

ছাদের কোণে পুরোনো সিমেন্টের বেদীটার ওপর মনু ধপ করে বসে পড়ল । মনু ভাবে কত মানুষের কত দুঃখ তবুও তারা বেঁচে আছে। 

“তুই দিল্লিতে না থেকে কলকাতায় চলে আয় না। এখানে এখন অনেক প্রাইভেট কলেজ খুলেছে। একটা না একটা ঠিক পেয়ে যাবি।”

মনু হাসে, ইতস্তত করে। 

“ছোড়দি সকলের কিছু না কিছু দুঃখ আছে। দুঃখ কি তোর একার ? আমার নেই ? তুই খালি লুকোস। আমরা তোর আপন জন ছোড়দি,” নীলু মনুর  মাথায় হাত রাখে,  

“তুই ফিরে আয়। এবার একটু নিজের মতো করে বাঁচ। ওদের জন্য নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিলি।কি লাভ হলো ?”

মনু ডুকরে ওঠে, “তোরা জানিস?” “বড়দা  দু,একবার ভাস্করদাকে ফোন করেছিল। তখন খানিকটা আন্দাজ করেছিলাম আমরা।”

মনু বলল, “জানিস না, কিচ্ছু জানিসনা। রাকা কানাডায় একটি নরেজিয়ান ছেলের সাথে লিভিংএ থাকে,ছেলেটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছিল। রনি জার্মানিতে, তার পার্টনার একটি জার্মান ছেলে। ভাস্কর হঠাৎ করে বেলজিয়ামে  চলে গেল,সেখানে  কি কি যে করে বেড়ায়…”মনু যন্ত্রণায় ছটফট করে। “আমি বেলজিয়ামে গিয়ে থাকতে পারিনি। বেশ ছিলাম শিকাগোতে । ডিভোর্সও দেবেনা,টাকা দিতে হবে বলে।”

নীলু মনুর সামনে গিয়ে ওর হাত দুটো ধরল। “তুই এত ভালো  ছাত্রী ছিলিস আবার শুরু কর। ছোটো জ্যেঠু তোর জন্য যা রেখে গেছে যথেষ্ট । তুই যদি এখানে প্রাইভেটেও ইকোনমিকস পড়াস ,প্রচুর স্টুডেন্ট পাবি  কিন্তু।” 

মনু একটু হাঁপায়,“হ্যাঁরে  সব্বাই জানে?” নীলু  ভারি কোমল হাসে । মনু যেন একটা ছোট্ট মেয়ে।

“সবাই তোকে খুব ভালোবাসে ছোড়দি। তোর জন্য আমাদের চিন্তা  হতো,কষ্ট হতো।”

 নীলু আকাশ দেখে। আকাশে রং লাগতে শুরু করেছে।

মনু ফিসফিস করে বলে, “তোর রেস্তোরাঁর বিজনেসে আমাকে নিবি নীলু? অনেক রকমের রান্না জানি, কন্টিনেন্টাল রান্নাও।”  

নীলু হাঁ করে তাকিয়ে রইল খানিক,

তারপর নরম গলায় বলল, “তোকে এটাই বলতে চাইছিলাম.. তুই থাকবি আমার সাথে? তাহলে  আরো অনেক ভালো করে…”নীলুর গলা বুঁজে আসে।

 মনু হাউ হাউ  করে কেঁদে ওঠে। 

“মন ভরে কাঁদ। তোর ভেতরের সব কষ্ট দুঃখগুলো ধুয়ে যাক। নতুন বছরে নতুন জীবনের শুরু, তোর আমার জয়েন্ট ভেঞ্চার।”  একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিল নীলু। লাল রং মেখে সূর্য উঠছে, আলো ছড়িয়ে গেল  বিডনস্ট্রীটের আকাশ জুড়ে।  রায়বাড়ির আনাচ,কানাচ ছুঁয়ে বছরের নতুন রোদ, টানা বারান্দাগুলোতে আলপনা এঁকে   নিচে নেমে পুরোনো কালো ছাপধরা উঠোনটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। 

 নীলু বলল, “ছোড়দি আকাশটা দেখ, ছোটকাকা বলতো মনে আছে?”

নীলু আর মনু ঘাড় হেলিয়ে হাঁ করে আকাশ দেখতে লাগল ছোটবেলার  মতো।



 

গল্প 

দোলের দিন

লীনা রায়

‘হোলি খেলে রঘুবীরা অবধ মে
হোলি খেলে রঘুবীরা’

ঘুম ভেঙে বুবলি বুঝতে পারে বাড়ির সামনের মাঠ থেকে গান ভেসে আসছে। কাল অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। পিসিনের এনগেজমেন্ট পার্টি শেষ করে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল। ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে তারপর ঘুমিয়েছে। সকালে বিছানা ছাড়তে একটুও ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু বাবার ডাকাডাকিতে শেষ পর্যন্ত উঠতেই হল।

আজ দোল। কৃষ্ণচুড়া গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে কোকিলটা ডেকেই চলেছে কু…..কুউ… কু..কুউ…কুউউ। ঝকঝকে রোদে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। কোকিলের ডাক, সোনালি রোদ, দোলের রং –সব মিলিয়ে মন কেমন করা পরিবেশ। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। ব্যালকনির দিকের পর্দাটা হাওয়াতে উড়ছে। মাঠে বসন্ত উৎসবের প্যান্ডেল থেকে গান ভেসে আসছে। উৎসবের আবহাওয়াতেও বুবলির মন খারাপ। আজ বাবা চলে যাবে। তার জন্য কি? নাকি- যে কারণটা ও একদম ভুলে যেতে চায় সেজন্য?

কিন্তু আজ যে দোল। এই একটা দিন আর রিভু – ওর সঙ্গে এঁটুলির মত লেপ্টে থাকে। ভুলতে চাইলেও ভুলতে দেয় না। জানালার পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। আর তার ফাঁক দিয়ে চোখ চলে যায় ব্যালকনি ছাড়িয়ে রাস্তার ওপারে। সামনেই সেই কৃষ্ণচুড়া গাছ। সেদিনও তো এই গাছের নিচেই ওরা সবাই ছিল। সামনে পরীক্ষা, তবুও ও গিয়েছিল। পরীক্ষার সময় বুবলি কোথাও যায় না। সেদিন এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। কেন রাজি হয়েছিল? সেদিন কেন মানা করেনি?

ভাবনায় ছেদ পড়ে। বাবা এসে ওর চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলে,
–হ্যাঁ রে, মাঝে তো আর ক’টা দিন। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তাই না?
বুবলি বাবার দিকে তাকিয়ে হাসে। বাবা এসে ওর পাশে বসে। হাতটা মুঠোয় নেয়। বুবলি বাবার কাঁধে মাথা রাখে। আর কিছুক্ষন। তারপর আবার অপেক্ষা। তবে এবার মাঝে মাত্র কিছুদিন। পিসিনের বিয়ের সময় তো বাবা আসছেই। খানিকক্ষন বসে থেকে বাবা উঠে পড়ে। এয়ারপোর্টে যাবার সময় হয়ে এলো। তৈরি হতে হবে।

মাত্র পাঁচ দিন আগেই তো বাবা এসেছিল। পিসিনের এনগেজমেন্টের জন্য। এসে থেকেই ছুটোছুটি লেগেই ছিল। নেমন্তন্ন, কেনাকাটা – সব একা হাতে সামলেছে। কাল রাতে বেশ জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছে। আত্মীয় স্বজন, পিসিনের বন্ধু, বাবার বন্ধু, পাড়া পড়শী অনেকেই এসেছিল। বুবলির বন্ধুরাও এসেছিল। খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটে যাবার পর গান, গল্প, নাচে জমে গিয়েছিল পার্টি। বুবলি ওখানে থেকেও বার বার হারিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিদিন ভালো থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে বুবলি। ওই দিনটি যদি ক্যালেন্ডারে না থাকত বুবলির জীবনটা কি অন্যরকম হত?

সেই দিন থেকে বুবলির বন্ধুরা ওকে আগলে রেখেছে। বুবলি ওদের সঙ্গে থেকেও থাকে না। ওরা হয়ত বোঝে। তবুও আসে। গতকাল নীল আর অনি ডান্স করেছে। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওদের দেখছিল। বুবলি কিন্তু রিভুকে মিস করছে খুব। রিভুও তো ওদের সব অনুষ্ঠান একাই মাতিয়ে রাখত। খুব অভিমান হয় বুবলির। কেন যে এভাবে সব বদলে যায়!

বাবা কিছুক্ষনের মধ্যে তৈরি হয়ে বুবলির ঘরে আসে। ওকে আদর করে। তারপর দুজনে ঠাম্মামের ঘরে আসে। ঠাম্মমকে প্রণাম করে বাবা বেরিয়ে যায়। 

সাড়ে এগারোটায় ফ্লাইট। বাবা চলে যাবার পর বুবলি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নরম নরম সাদা মেঘ – ভারি সুন্দর। হাত বাড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। পাড়ার সবাই একে একে মাঠে আসছে। প্রতিবারের মত এবারও বসন্ত উৎসব হবে। নাচ, গানের সঙ্গে জমিয়ে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। আর সঙ্গে দেদার হোলি খেলা। 

পিসিন কিন্তু এখানে থাকবে না। রাহুল আঙ্কেল নিতে এসেছে। বন্ধুদের সঙ্গে ডায়মন্ড হারবার যাচ্ছে ওরা। ওখানেই ওদের হোলি পার্টি। ফিরতে রাত হবে। এনগেজমেন্টের পর পিসিনকে যেন আরো বেশি সুন্দরী লাগছে। আজ ওরা দুজনেই সাদা টি -শার্ট পরেছে। সাদা আউটফিটে দুজনকে বেশ মানিয়েছে।

আজকাল হোলিতে সাদা ড্রেস পরার চল। কিন্তু সেবার ওরা সব বন্ধুরা কালো টি শার্ট পরেছিল। সেটাও রিভুর প্ল্যান ছিল। বুবলি শুনেছে কালো রং নাকি অশুভ। আচ্ছা, কালো না পরলে কি সব অন্য রকম হত সেদিন? বুবলি তো জানত। তবুও কেন পরেছিল?

ঠাম্মাম ডাকছে। ঘরে এসে দেখে নারকেল তেল, বডি লোশন নিয়ে বসে আছে ঠাম্মাম। প্রতিবার দোলের দিন বুবলির চুলে তেল আর গায়ে লোশন লাগিয়ে দেয় ঠাম্মাম। বুবলির চুলে তেল লাগাতে একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু ঠাম্মামকে মানা করতে পারে না। তেল, লোশনের পর্ব চুকলে বুবলি নিজের ঘরে আসে। আলমারি থেকে সেই কালো টি শার্টটা বের করে। একদম সেদিনের মতো করে সাজে।বাবার এনে দেয়া আবিরের প্যাকেটগুলো ব্যাগে ভরে নেয়। শুধু লাল আবিরের প্যাকেটটাকে ড্রেসিং টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে।

আবার এসে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। এবার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা। ওরা এলে সবাই মিলে মাঠে যাবে। সবাই তিতলির বাড়িতে জড়ো হবে। তিতলিদের বিশাল বাড়ি। ওদের বাড়িতেই স্কুটি , বাইক রেখে তারপর একসঙ্গে মাঠে আসবে। তার আগে বুবলিকে ডেকে নেবে।

সেদিনও ও অপেক্ষা করছিল। একই রকম ভাবে, এখানে দাঁড়িয়ে। বার বার সময় দেখছিল। ফোন করছিল রিভুকে। সেটাই যে রিভুর সঙ্গে ওর প্রথম হোলি। তর সইছিল না বুবলির। আসতে একটু দেরি হয়েছিল বলে রাগ করে কথা বলেনি অনেকক্ষন।
সেদিন যদি বুবলি রাগ না করত, সাবধানে রাস্তা পার হত, তাহলে কি সব কিছু অন্যরকম হত? অথচ আজ বুবলি অপেক্ষা করছে– কোন তাড়া নেই, বিরক্তি নেই। হাতে ফোন অব্দি নেই। বন্ধুরা আসবে তাই ওকে যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই।

ঠাম্মামের হাঁটুতে ব্যথা। কষ্ট হয় হাঁটতে। তবুও ব্যালকনিতে আসে। হাতে আবির। বুবলির কপালে আবির ছুঁইয়ে দেয়। তারপর বুবলিকে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
–শুধু শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ঘরে এসে বস। ওরা এলে ঠিক ডেকে নেবে। তোকে ফেলে কিছুতেই যাবে না।

ঠাম্মাম খাটে বসে। বুবলিকে বসতে ইশারা করে। ঠাম্মামের গা ঘেঁষে বসে বুবলি। ঠিক ছেলেবেলার মতো। ঠাম্মাম বুবলির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কত কথা বলে। আগে দোলের দিনে কী রান্না হত, বুবলি ছেলেবেলায় রং দেখে কেমন ভয় পেত –সেসব গল্প। অনেকবার শুনেছে যদিও , তবুও বড় ভাল লাগছে শুনতে। বুবলি ভাবে সেদিন যদি ও এমনি করে ঠাম্মামের কাছে বসে থাকত, তাহলে সব কিছু সত্যিই অন্য রকম হত।

প্রতিবার দোলের রঙের সঙ্গে বুবলির মন খারাপ জড়িয়ে যায়। আজ পাড়ায় সব্বাই কত মজা করবে। অথচ বাবা আজই চলে গেল। একদিন বেশি ছুটি নিলে কী এমন ক্ষতি হত! অফিসের কাজের চাপ, বাবার ছুটির অভাব –– এত কিছু বুবলি বোঝে না। বুঝতেও চায় না। শুধু এটা বোঝে বাবা কাছে থাকলে মন খারাপটা খানিকটা হলেও দূরে থাকে। কাছে খুব একটা ঘেঁষতে পারে না।

সেই দোলের দিনের কথা। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে আসার পর বেডের পাশে বাবাকে দেখেছিল বুবলি। উস্কো খুশকো চুল, লাল চোখ। বাবাকে এমন অগোছালো আগে কোনদিন দেখেনি বুবলি। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
––কী হয়েছে বাবা?
বাবা কোন কথা বলেনি। শুধু ওকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। ঠাম্মাম, পিসিন, ওর বন্ধুরা সবাই ওকে দেখতে এসেছিল। আসেনি শুধু রিভু। বন্ধুদের কাছে রিভু কোথায় জানতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা এড়িয়ে গেছে। এরপর বাবা, ঠাম্মাম, পিসিন সব্বাইকে জিজ্ঞেস করেছে। বন্ধুদের মতোই ওরা সবাই এড়িয়ে গেছে। অথচ কেবিনের কাঁচের দরজার ওপারে মাঝে মাঝে রিভুর মুখ ও দেখেছে। এ কথা যখনই বলেছে সবাই অদ্ভুত চোখে ওকে দেখেছে। সেটা ভয়, না অবিশ্বাস সেটা অবশ্য বুবলি বোঝেনি।

তারপর একদিন ডক্টর আঙ্কেল ওর কাছে সেই দোলের দিনের গল্প শুনতে চায়। কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে ওদের জমায়েত অব্দি বুবলি বলেছিল। ডক্টর আঙ্কেল তারপর কী হয়েছিল জানতে চেয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে বাকি আর কিছু মনে পড়েনি বুবলির। ডক্টর-এর কাছেই জেনেছিল চলন্ত গাড়ির সামনে থেকে রিভু ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল। হিরোর মতো ওকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারেনি রিভু।

বুবলি বিশ্বাস করেনি। এরপর সবাই বলেছে। রিভুর মা, বাবা হাসপাতালে ওকে দেখতে এসে একই কথা বলেছে। আচ্ছা, কারো বাবা, মা ছেলেকে নিয়ে এত বড় মিথ্যে বলতে পারে? বোধহয় না।

কিন্তু বুবলি যে মাঝে মাঝেই রিভুকে দেখে। আর এটা কেউ বিশ্বাস করে না। সেজন্য ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে বাড়ির লোকেরা। ঠাম্মাম ওর হাতে লাল সুতোয় তাবিজ বেঁধে দিয়েছে। আরও কত কিছু। শেষ পর্যন্ত বুবলি এটা বুঝেছে ওকে চুপ থাকতে হবে। রিভুর কথা ও আর কাউকে বলবে না। রিভু আছে সেটা প্রমান করার দায়িত্ব ওর নয়।

বুবলি রিভুকে নিয়ে আর কিছু বলে না। রিভু ওর সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু ওকে দেখতে পায় বুবলি। রিভুর জন্য পড়াশুনোটা আর এগোল না ওর। পড়তে বসার পরেই রিভুকে মনে পড়ে। জানালার বাইরে ওকে খোঁজে। বই খোলা থাকে, পড়া আর হয়ে ওঠে না। কিন্তু ও যখন ছবি আঁকে, রিভু লক্ষ্মী ছেলে হয়ে পাশে বসে থাকে। কিন্তু লাল রং দেখলেই ওর গা গুলোয়। সেজন্য শুধু পেন্সিল স্কেচ করে। সেদিন যদি বুবলি ঘরের বাইরে পা না রাখত তাহলেও কি রিভু এভাবে লুকিয়ে থাকত?

কিছুক্ষনের মধ্যেই দল বেঁধে সবাই চলে এলো। এর মধ্যেই রং মেখে সব ভুত! বুবলি নিচে নামতেই হই হই করে ওকেও সবাই রং মাখিয়ে দেয়। বুবলি ব্যালকনির দিকে তাকায়। দেখে ঠাম্মাম ওদের দেখে হাসছে। বুবলিও হাসে।

রাস্তা পেরিয়ে মাঠে আসে। মাঠের ঘাসে পা দিয়েই বাড়ির দিকে তাকায় বুবলি। ঠাম্মাম ঘরে চলে গেছে। রাস্তা দিয়ে একদল ছেলে প্রচন্ড গতিতে পর পর বাইক নিয়ে আসছে। বুবলি স্পষ্ট দেখে রিভু মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। এক ঝটকায় সেই দোলের দিনের সব কথা মনে পড়ে যায় বুবলির। আবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তফাৎ শুধু সেদিন ও রাস্তায় ছিল। আর রিভু ছিল রাস্তার এ পাশে। বুবলি আর কিছু ভাবতে পারে না।

 ও ছুটে গিয়ে রিভুকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। ঠিক যেমন তিন বছর আগে রিভু ওকে সরিয়ে দিয়েছিল।
এবার রিভুর মতোই বুবলিও নিজেকে সরাতে পারে না। বাইকের ধাক্কায় ছিটকে মাটিতে পড়ে যেতে যেতে বন্ধুদের চিৎকার কানে আসে। উঠতে চেষ্টা করে। পারে না। মাথা থেকে গরম জলের মত কিছু গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর সারা শরীর। চোখ খুলতে চেষ্টা করে। সেটাও পারে না। চারদিকে বড্ড চিৎকার, চেঁচামেচি। ওর নাম ধরে কেউ কি ডাকছে? 

ধীরে ধীরে সব শব্দগুলো হারিয়ে যায়। বসন্ত উৎসবের গান, বন্ধুদের চিৎকার – সব কিছু। আর কী আশ্চর্য, তিন বছর ধরে জমে থাকা কষ্টটা হঠাৎ করেই ভ্যানিশ হয়ে যায়। পালকের মত হালকা লাগছে নিজেকে। বুবলির চোখ ঘুমে ভারি হয়ে আসে। গাঢ় ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে স্পষ্ট দেখতে পায় রিভুকে। এলোমেলো চুল, কালো টি শার্ট গায়ে। রিভু হাসছে। ওর দুধ সাদা দাঁতে সোনালি রোদ পিছলে যাচ্ছে। হাসতে হাসতে বুবলির দিকে এগিয়ে আসছে রিভু।


 

গল্প 

খিদে

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী


বেবি ওয়ার্ডে ঢুকে নিজের অজান্তেই চোখটা চলে গেল সেই বাচ্চাটার দিকে। কদিন ধরে ভর্তি আছে এখানে। দিন দশেক আগে যেদিন নাইট ডিউটি ছিল, সবকিছু সেরে গভীর রাতে রেস্ট রুমে যেতে না যেতেই নারী কন্ঠের তীব্র কান্নার আওয়াজে চারিদিকের স্তব্ধতা কেঁপে উঠেছিল যেন। ওরা তিনজনই ছুটে এসেছিল এমার্জেন্সিতে।

রাতে সরকারি এই হাসপাতালের ছবি দিনের চাইতে পুরোটাই আলাদা। চেনা জায়গাগুলো, চেনা মানুষগুলো সবই কেমন অচেনা হয়ে পড়ে হঠাৎ করে। দিনে যে ডাক্তার স্নেহময়, যে ওয়ার্ড বয়ের 'দিদি' সম্বোধনে যথেষ্ট সমীহ থাকে, পেশেন্ট পার্টির লোকজন ভদ্রতা টুকু বজায় রেখে কথা বলে বেশিরভাগ সময়ই, তাদের সবকিছু অদলবদল হয়ে যায় কেমন রাত বাড়তে থাকলে। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও ডাক্তার, ওয়ার্ড বয়, পেশেন্টের সঙ্গে আসা পুরুষ মানুষ সকলেরই চোখের দৃষ্টি তখন এক। অকারণেই যখন তখন ডেকে নেন ডাক্তার, ভদ্রতার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে অকারণ কথা বলতে বলতে গায়ে গা ঠেকায় রোগীর সঙ্গে আসা লোকগুলো।শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলের চোখেই সর্বগ্রাসী খিদে। তারমধ্যে পেটে তরল চালান হলে তো কথাই নেই।

                                  যাদের সঙ্গে ডিউটি পড়ে আলোর,  সেই পঁচিশ ছাব্বিশ বয়সী ওরা বেশিটাই একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করে  সবাই মিলে। এমনকি টয়লেটে তিনজন একসঙ্গে ঢোকে বড় কোনো বিপদ এড়াতে। আধো আলো আধো অন্ধকার প্যাসেজগুলো হাত ধরে নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে পার হয়।
বাবার চোখে এক অন্য খিদে দেখেছিল। মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার খিদে, নিজের পায়ে দাঁড় করানোর খিদে। সারাজীবন নিজের স্কুলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ভালো মানুষ বাবার এটুকুই তো চাওয়া। বিশেষ করে এর দাম দিতেই সায়েন্সের ভালো বিষয়ে মাস্টার্সের পরেও শিক্ষাক্ষেত্রের চাকরির দরজাগুলো যখন মুখের সামনে বন্ধ হয়ে যেতে বসল, তখনই নার্সিং  প্রফেশনকে বেছে নেওয়া আলোর।

মাত্রা ছাড়ানো জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছিল সেদিন এই ছোট ছেলেটা। চার পাঁচ বছরের ক্ষীণ শরীরটায় মুখটাই কেবল টুলটুলে। অত রাতে রাস্তার কোনো একটা মালবাহী গাড়ির ড্রাইভারকে কোনমতে দাঁড় করিয়ে ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত একটি চা- বাগানের রাস্তা থেকে জেলা সদরের হাসপাতালে পৌঁছেছিল ওরা কোনমতে। জন্ম থেকে থ্যালাসেমিয়ার শিকার শিশুটি আর বন্ধ চা বাগানে দারিদ্র্য, অনাহারের শিকার তার বাবা- মা তাকে জন্মাবধি অপুষ্টি,অসুখবিসুখ আর খিদের যাতনা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। এ'কদিনের মধ্যে যখন যেভাবে ডিউটি পড়েছে, বাচ্চাটার প্রাথমিক সংকট কেটে যাবার পর ওকে  দুর্বল হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার চেষ্টা করতে দেখেছে আলো। ডাক্তার বাবুদের হাতে পায়ে ধরে ওর বাবা মায়ের আকুতি দেখেছে।

সহকর্মী সোমা বলছিল ডাক্তার বসু নাকি বলেছেন বাচ্চাটার বাঁচার আশা খুব কম। কাছে গিয়ে আলো দেখল ওর বাবা- মা মনমরা হয়ে বসে আছে নির্জীব শিশুটির সামনে। ছোট্ট বুকটা তিরতির করে ওঠানামা করছে ছেলেটার। কপালে হাত দিয়ে দেখল বেশ জ্বর আছে এ মুহূর্তে। শুনল,খানিক আগেই ডাক্তার দেখে গেছেন।

প্রতিদিনের মতোই এরপর নানারকম কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হলো আলোকে। রোগীদের দুপুরের খাবার নিয়ে ট্রলিগুলো তখন ওঠানামা করছে এ তলা -ও তলা জুড়ে। প্যাসেজ ধরে এগিয়ে আসতে আসতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। আরো কিছু রোগী ও অন্যান্য মানুষদের ভিড়ে সেই বাচ্চাটা। মেঝেতে বিছোনো কম্বলে ওর প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া নিথর শরীর। কিছু মাছি ভনভন করছে ছোট্ট সেই শরীর ঘিরে। পাশে ওর বাবা-মা হাসপাতালের দেওয়া খাবার গোগ্রাসে খেয়ে চলেছে নিজেদের মধ্যে প্রায় কাড়াকাড়ি করে। যেন জীবনে শেষ বারের মতো পেট ভরে খেয়ে নিতে চাইছে এখান থেকে ফিরে যাবার আগে। ওদের কালশিটে পড়া চোখের কোলে ছেলে হারানোর অশ্রুবিন্দু আর ঘোলাটে চোখের তারার খিদে মেটার স্বস্তি একসঙ্গে জ্বলজ্বল করছে যেন। মৃতের শরীর ছেড়ে মাছিরা তখন উৎসাহী সেই মনোযোগী খাবারের থালার ওপর।

অনেকগুলো মুখ, অনেকরকম খিদে একসঙ্গে উঁকি দিয়ে গেল নিমেষেই। চেনা কিছু স্বার্থপর মানুষজনের লোক ঠকিয়ে সর্বস্ব আত্মস্থ করার খিদে, আলোর সত্যিকারের ভালো বাবা মাকে প্রতিনিয়ত ছোট প্রতিপন্ন করে পরিবারের কিছু চালাক লোকজনের সকলের চোখে ভালো সাজার খিদে, মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে স্কুল কলেজের কোনো স্যার ও বাবা কাকার বয়সী লোকগুলোর মিষ্টি মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলে শরীরের কদর্য, বিকৃত খিদে মেটানোর প্রস্তাব....  সারা শরীর গুলিয়ে বমি উঠে এলো ......

সামনের এই দৃশ্যটার কাছে, চরম অনটন, পেটের খিদের জ্বালা যা সন্তানের মৃত্যুকেও হার মানে, তার সামনে দাঁড়িয়ে সবটাই বড় শূন্য লাগছিল আলোর। অসহায় লাগছিল। জায়গাটা ঘিরে ভিড় বাড়ছিল ক্রমশ। সেই সুযোগেও গায়ে গা ঘষে নিতে এগিয়ে আসছিল নোংরা কিছু লোক ভনভন করা ওই মাছি গুলোর মতোই। নিজের নরমসরম খোলস ভেদ করে রুখাসুখা  এক সিস্টার দিদি বেরিয়ে পড়ল হঠাৎ। বাধ ভাঙা ব্যর্থ চোখের জলগুলোকে ফেরত পাঠিয়ে লাল টকটকে চোখ পাকিয়ে নার্সের স্বভাবসিদ্ধ কঠিন গলায় চিৎকার করে উঠল, 'তফাৎ যাও.... '


 

গল্প 


আচারের কৌটো

তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য

পাকদন্ডী পথ ধরে সকালের প্রথম গাড়িটা এসে থামলো ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটার ওই তিন-চারটে দোকান নিয়ে গড়ে ওঠা বাজারটায়। সেই চালসা থেকে কালিম্পং জেলার প্রত্যন্ত এই গ্রামটিতে হাতে গোনা কয়েকটি গাড়িই আসে সেগুলোই পরিবহনের ভরসা এখানকার মানুষদের।আর আসে পর্যটকদের গাড়ি,তবে খুব কম। এই নির্জন পাহাড়ী গ্রামটা এখনো সেভাবে পর্যটকমহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।তবু ওই যে কজন আসে,তারাই হয়ে ওঠে এই বাজারটিতে খাবারের দোকান চালানো নিমা দিদির হাসিমুখের কারণ। স্থানীয়রা তো খায়,তবে পর্যটক এলে রোজগারটা একটু ভালো হয়। 

নিমা দোর্জে। স্বামীর চাবাগানের কাজটা চলে যাওয়ার পর সংসারে দায়িত্ব সামলেছেন এই দোকানটা চালিয়েই। কয়েক বছর হল স্বামী গত হয়েছে, এখন তিনি একাই এই দোকান নিয়েই হাসিমুখে থাকেন বোধিসত্ত্বের আশীর্বাদে। নিজের বাগানে ডাল্লে, টুকটাক সবজি করেন আর সেগুলোই ব্যবহার করেন তার তৈরি মোমো কিংবা থুপ্পাতে আবার নিজের হাতেই আচার বানিয়ে বিক্রি করেন। কতো পর্যটক নিয়ে গেছে নিমা দিদির ডাল্লের আচার। আর দ্বিতীয়বার এলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন নিমা দিদিকে। আর সে আনন্দ নিমা দোর্জে ভুলে থাকেন তার সকল দুঃখ।

আজ চালসার গাড়িটায় শহর থেকে ফেরা গ্রামবাসীদের পাশাপাশি নেমে এলো এক অর্বাচীন ছেলে।নিমা তাকেই লক্ষ্য করছিল। কলেজে পড়ে হয়তো,দিব্যি একটা ব্যাগ কাঁধে একা বেড়িয়ে পরেছে। সে গাড়ি থেকে নেমেই গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে নিমার দোকানেই এসে বসলো। নিমা যত্নসহকারে সকলকে পছন্দের খাবার পরিবেশন করার তোরজোড় শুরু করে দিল।মোমো খাওয়া শেষ হতেই ছেলেটি একমুখ হাসি নিয়ে নিমার সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করলো। অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নে সে নিমাকে বিদ্ধ করে চলেছিল। তার বাগান নিয়ে,তাদের সংস্কৃতি নিয়ে, জীবনচর্চা নিয়ে আরো কতো কী নিয়ে। এটাই নাকি ছেলেটার পড়াশোনা। পাহাড়ের প্রত্যন্ত একটা গ্রাম,হাতে গোনা কয়েকটা মানুষের বাস, পর্যটন আর চাবাগানের কাজ যাদের নুনের জোগান, তাদের নিয়ে পড়াশোনা।নিমার ভারী অদ্ভুত লাগছিল আর সঙ্গে একটু বিরক্তিও। তবু নিমা হাসিমুখে ছেলেটির সাক্ষাৎকারের অংশী হল।ছেলেটির চোখের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে,সে মায়ার সামনে নিমার বিরক্তি উবে যাচ্ছিল। এরপর সে ছেলে বেড়িয়ে পড়লো গ্রামের পথে, বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে চললো প্রশ্ন দিস্তি হাতে আর নিমা বিস্ময় চোখে দোকান পড়ে রইল।

দূরের পাহাড় যখন মেঘে ঢেকে বেলাশেষের ছায়া পড়ে আসছিল বাজারটা,তখন সে ছেলে তার অনুসন্ধান সেড়ে আঁকাবাঁকা গ্রামের পথ ধরে নিমার দোকানে হাজির হল।তার কাজ অনেকটাই হয়ে গেছে, এবার তার ফেরার পালা। সে নিমাকে একটা মিষ্টি করে ধন্যবাদ দিয়ে, মোড়টায় অপেক্ষা দাঁড়ালো চালসা ফিরতি গাড়ির। সে অপেক্ষায় বিকেলে গড়ালো,গাড়ির দেখা নেই। এদিকে নিমার দোকান গুটিয়ে ফেলার পালা।নিমা লক্ষ্য করলো সে ছেলের মায়ার চোখে অন্ধকার নেমেছে,আর নিমাই বা কিভাবে এই মায়ার চোখ দুটিকে অন্ধকারে ফেলে ঘরে ফেরে। বোধিসত্ত্বের অনুসারী নিমা,এই নিরাশ্রয়কে ঠাঁই না দিয়ে পাড়ে।সে ছেলেকে নিমা নিয়ে গেল তার ঘরে। আজ নিমার নিজের ছেলেটা বেঁচে থাকলেও তো এর বয়সী বা একটু বড় হয়তো।নিমার ডাল্লের বাগান আর আঁচার নিয়ে সে ছেলের কৌতুহল আর প্রশ্নে রাত পার হয়ে চলেছিল নিমার ঘরে।আর নিমার মনে ধাক্কা দিয়ে চলেছিল তার নিজের ছেলেটার মুখটা।এই কয়েক ঘন্টা আগে পরিচিত ছোট্ট ছেলেটি পঞ্চাশ উর্ধ্বে নিমা দোর্জের মনে অনুরণিত করেছিল তার ছেলে-স্বামী নিয়ে সংসারের দিনগুলোকে,যে দিনগুলো হারিয়ে গেছে ভাগ্যচক্রে।

পরদিন সকালে সেই মায়ার চোখের ছেলেকে বিদায় জানাতে গিয়ে নিমার চোখে নেমে এসেছিল ঝরনাধারা। কিন্তু সে ছেলেকে তো ফিরতেই হবে নিজের ঘরে আর নিমা থেকে যাবে এই পাকদন্ডীর পথের ধারে দোকান নিয়ে। চালসার গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার আগে নিমা ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল তার নিজের হাতে তৈরি একটা ডাল্লের আচারের কৌটো। সে ছেলে মিষ্টি হেসে বলেছিল, তুমি আমায় হাতে হাতে লঙ্কা দিলে, লঙ্কা দিলে তো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।আর নিমা বলেছিল, কিচ্ছু হবে না,এই লঙ্কার আচারের কৌটোটাই তোকে মনে করিয়ে দেবে পাহাড়ের ছোট্ট গ্রামটার মায়ের সম্পর্কে। সেদিন ছেলে-মায়ের চোখের জল প্রবাহে দূরের পথে ভেসে গিয়েছিল গাড়িটা।

নিমা দোর্জের সে কথাই সত্যি হয়েছে। আচারের কৌটোটা এতবছর পরেও মনে করায় তার কথা সেই ছেলেটাকে। তাই তো সে লিখতে বসে আচারের কৌটো নিয়ে, নিমা দোর্জেকে নিয়ে।