Tuesday, June 2, 2026


 

যেখানে কৃষ্ণচূড়া এখনও ফোটে


দেবাশীষ বক্সী

 

এবারে, বসন্তটা ভারি রুক্ষ। শীতের পরে বসন্তকে ল্যাং মেরে বুঝি গ্রীষ্মের আগমন ঘটেছে। সকাল সকাল কাঠফাঁটা রোদ। জামা কাপড় ভিজে একসার হয়ে পরছে। প্রখর তপন তাপে বসন্তের দখিনা বাতাস বুঝি অন্তর্জলী যাত্রায়। কোকিল ডাকলেও মনে সুঁড়সুড়ি দিতে পারছে কই?

একটা সময় ছিল। বসন্তের এক অন্যরকম গন্ধ ছিল। শীতের শেষে, দখিনা বাতাস চুপি চুপি এসে আমার অন্তর ডাকবাক্সে পত্র ফেলে জানিয়ে দিত আমি এসে গেছি। যেন কোন কিশোরীর প্রেমপত্র। রঙীন হয়ে, চঞ্চল হয়ে উঠতো মন। শুধু প্রকৃতিতে নয়, শিমুল পলাশের রঙ লাগতো মনেও। উদাস মন প্রেমের জোয়ারে ভেসে যেত। রাস্তায় দেখা কোন মুখ কোন হাসি বা চোখের চাউনি সারাদিনের জন্যে আছন্ন করে তুলত। কল্পনার তো কোন লক্ষণরেখা নেই, বসন্ত বাতাস গায়ে জড়িয়ে সে আরও লাগামছাড়া হয়ে উঠতো।

আজ অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো—মানুষ আসলে বয়সে নয়, স্মৃতিতে বুড়ো হয়। মোবাইলের স্ক্রিনে একের পর এক নোটিফিকেশন উঠছে। মিটিং, বিল, EMI, বাজারের তালিকা। মেয়েটাকে টিউশনি থেকে নিয়ে যেতে হবে। কাল মঙ্গলবার। বজরাঙ্গবলির জন্য লাড্ডু কিনতে হবে। আজকালকার মেয়েরা মায়েদের মত লক্ষীপুজো, মঙ্গলচন্ডীর ব্রত ইত্যাদির আর করে না। নজরে পড়ল রাস্তার ডানদিকে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ আগুনে রঙে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক পলকে খিদে যেন মিটলো না, পুনরায় চোখ আটকে রইলো কৃষ্ণচুড়ায়। বুঝতে অসুবিধে হল না, অতিরিক্ত অ্যাড্রনালিন নিঃসরণে মন অন্য জগতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। হলোও তাই। মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠলো বহু পুরনো এক বিকেলে বেলা।

 গ্রাম্য পরিবেশ। আবছা নীল আকাশে শরতের সাদা মেঘ হয়ে বকেরা বাড়ি ফিরছে। সারাদিনের পরিশ্রমে দিনমণি বেশ ক্লান্ত। চণ্ডীতলার পাশে ঝাঁকড়া এক কৃষ্ণচূড়া। আগুনরাঙা ফুলগুলোর অন্তরালে ঝিরিঝিরি সবুজ পাতা বুঝি হারিয়ে গেছে। দিনান্তে দিনমণির স্নিগ্ধ হাসির পরশে তারা অনাবিল আনন্দে আরও মোহময়ী হয়ে উঠেছে। পরনে হালকা হলুদ জামা। দুই ঘাড়ে পুষ্ট দুই বেনুনী। পায়ে রুপার পায়েল। তর্জনীতে কোমরবন্ধনী জামার ফিতে আঙুলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আমার অপেক্ষায় সে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কাছে যেতেই অভিমানী গলায় তাঁর প্রশ্ন, “বিকেল গড়িয়ে গেল, কি বলবি, তাড়াতাড়ি বল?”

আসার আগে বহু পুরনো পায়ে কেটে যাওয়া ক্ষতকে ঘষে ঘষে জীবন্ত করে তুলেছি। একটু লেংচে পায়ের ক্ষতর দিকে নির্দেশ করে বলি, “আসতে গিয়ে সাইকেল থেকে পড়ে কী অবস্থা হয়েছে দেখ।”

 সে আঁতকে উঠে, দুই হাতে মুখটি ঢেকে বলে, “ভারি লেগেছে, তাই না রে।”

 আমি হেসে বলি, “ছাড়তো আমার কথা। তোকে কিন্তু আজ রূপবতী রাজকন্যার মত লাগছে।”

 আমি ওর বাঁধা উপেক্ষা করে গাছে উঠে কৃষ্ণচূড়া পেরে বেনুনীর গোড়ায় গুজে দিই। এবং চোখে চোখ রেখে বলি, “চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।”

 ও ছলছল চোখে বলে, “তোর কি প্রানের মায়া নেই। ব্যথা পা নিয়ে গাছে উঠলি?”

 - খুব ইচ্ছে হল, তোকে বসন্তের রঙে রাঙাতে।
- যদি পরে যেতিস?
- কী হোত, হাত বা পা-ই তো ভাঙত।
- আমি বারণ করলাম, তাও শুনলি না?
- তোর কথা শুনলে, মন যে ভাঙত। 

 এমন সময় চন্ডীতলার মন্ডপে সন্ধ্যা আরতি শুরু হয়েছে। শঙ্খ, কাঁসর ঘন্টার শব্দ আর ধূপের গন্ধে পরিবেশ প্রবিত্র হয়ে উঠেছে।

 আমার চোখে চোখ রেখে ইশারায় সে বলে, “চল মন্দিরে গিয়ে একটু বসি।”

 আমি বাধো বাধো কাঁপা গলায় বলি, “কিন্তু তোকে যে আমার কিছু বলার ………”

 আমার কথা থামিয়ে সে মিষ্টি হেসে, কোমল হাতে আমার হাতটি ধরে বলে, “কিছু কিছু কথার প্রয়োজন পড়ে না, হৃদয় আছে বলেই তোর সুর আমার বুকেও বাজে।”

সিগন্যাল সবুজ হলো। পিছন থেকে হর্ন বেজে উঠল। আমি চমকে বর্তমানে ফিরে এলাম। সামনে গাড়ির সারি এগোচ্ছে।

আমি গাড়ি চালালাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল—কোথাও একটা চণ্ডীতলা এখনও রয়ে গেছে, কৃষ্ণচূড়া এখনও ফুটে আছে, আর হলুদ জামা পরা মেয়েটি ……! জানিনা, জানিনা সে কোথায়, কেমন আছে।

 


 


   বৈজয়ন্তীমালা

    চিত্রা পাল 


একটা সিনেমা পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম সেদিন। আজকাল সিনেমা পত্রিকা খুব একটা দেখি না। নাতনী কোথা থেকে নিয়ে এসেছে, বোধ হয় ফেরার পথে কোন স্টল থেকে বা ওর অফিসের কোন কলিগে কাছ থেকে,বাড়িতে ফিরে আমার হাতে দিয়ে বললো,এটা দেখতে পারো, ভালো লাগবে। ইংরেজি সিনেমা পত্রিকা, সবই উঠতি তারকাদের কাহিনী আর ছবি দিয়ে ভরা, আমি এদের সিনেমা দেখিনি,ওদের কার্যকলাপের সাথেও আমি পরিচিত নয়,কাজেই ওই ছবি দেখাটুকুই সার আর কিছু নয়।পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা পাতায় চোখ আটকে গেলো,দেখি, বৈজয়ন্তীমালা আর আমাদের অজিতেশ বন্ধোপাধ্যায় এর ছবি, খুব চেনা চেনা মনে হতে ভালো করে পড়তে চেষ্টা করে দেখলুম ওটা আমাদের সময়কার হাটেবাজারে সিনেমার ছবি। তখনকার সিনেমা, যেমন কাহিনীকার তেমন পরিচালক তেমন অভিনেতা অভিনেত্রী সবই উচ্চমানের।আর সব উৎকর্ষের সমাধানে ছবিও হতো চমৎকার। আমি আমার মেয়েকে বললাম এই ছবিটা দেখিয়ে, দ্যাখ, তখন বম্বে থেকে সব বাংলায় সিনেমা করতে আসতো। এখন তো উলটো দিকে যেতে চায় সবাই। আমার মেয়ে ছবি দেখে বললো, `মা, এতো বৈজয়ন্তীমালা। কোলকাতায় গিয়ে বাংলা সিনেমা করেছে?` হ্যাঁ,শুনে বলে, `তুমি একবার বলেছিলে না, তোমরা কার যেন নাম দিয়েছিলে বৈজয়ন্তীমালা?` আমি বললাম, `হ্যাঁ, তোর মনে আছে?আমার তো মনে আছে, সে তো কবেকার কথা।`

তখন সবে এসেছি উত্তরবঙ্গের এই জেলা শহরে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।একেবারে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্যে। থাকতাম এক কলেজ ক্যাম্পাসে। কলেজ ক্যাম্পাসের আবাসিকরা প্রায় সকলেই এখানে নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়া তরুণ বা যুবক।দু এক মাস অন্তর অন্তরই দক্ষিণ বঙ্গ থেকেকেউ না কেউ এখানে আসছে তখন কাজে যোগ দিতে। সে সময়টায় আবার  বাংলা দেশ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে বেশ কিছু জন এ দেশে চলে আসছে। এসে নীচু জমি, জলা জায়গা এমন সব জায়গা কিনে,সেটাও আবার  যাদের সঙ্গতি আছে এমন জন সব ঘর বাড়ি বানিয়ে থাকতেও শুরু  করেছে।এমনই অঞ্চল থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে এলো একটি বউ।তাকে নিয়ে এলো এখানকারই এক বাড়িতে কাজ করে সে।তাকে আমি বলেছিলাম বলে।বৌটিকে আমি চিনিনা,জানি না।তার কথাবার্তা সবই ওদের জায়গার ধরণের। ঘরের কাজ যে কতটা জানে, তা জানি না, কিন্তু আমার খুব প্রয়োজন তাই তাকেই আমার ঘরের কাজে বহাল করলাম। কারণ, এক আমার মেয়ে তখন খুবই ছোট, কয়েক মাসের আর আমার স্বামীর একজন পরিচিত,কলকাতা থেকে আসছেন  এখানে কাজে যোগ দিতে্।তিনি প্রথমে আমাদের বাড়িতে থাকবেন। এখন দুজন নতুন মানুষই এলো আমার সংসারে  এক সঙ্গে। 

প্রায় মাসখানেক পরে ও একবার দুদিনের ছুটি চাইলো। আমি বললাম,দুদিন আমার খুব অসুবিধে হবে গো, তুমি একদিন নাও,আমি কোন রকমে চালিয়ে নেবো।  বলে ঠিক আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আসবে না ক্যানো গো? বলে আমার সোয়ামী আসবে যে বাংলা দেশ থেকে তাই। ওর যে আবার আসলেই সেবা নাগে। সব হাতে হাতে দিতে হয় তাই। 

ও কিন্তু দুদিনই এলো না। এসেই অবশ্য বললো,কিছু কইওনা বৌদি,ওরে ফেলায়ে আসতে পারি নাই।আমি বললাম,দ্যাখোতো,বাচ্ছা নিয়ে আমিযে পেরে উঠতে পারি না। তারপরে নিজেই বলছে,এই যে  আমি তোমার বাসায় কাম কাজ করি,দুইডা পয়সার জন্যি তো। তাও কতো কথা। আমারে কইসে, যে বাবুডা আইসে না, একা থাহে,ওর লগে এক্কেরে কথা কইয়ো না। আমি বললাম,ক্যানো?ও  বলে, কি জান, ভালা না খারাপ কে কইতে পারে, তার ওপরে ওরে বাঁধ দেবার কেউ নাই,তাই কুনো কথাই কওনের দরকার নাই। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমার কাজ করো। 

রাতে খাবার টেবিলে বসে আমরা তিন জনে ওর এই সব কথা নিয়ে খুব হাসাহাসি করলাম। উনি শুনে  বললেন, বাব্বা, কে একেবারে বৈজয়ন্তীমালা নাকি? সেই থেকেই আমরা ওর নাম দিয়েছিলাম বৈজয়ন্তীমালা। এটা ও নিজেও বুঝতো না, আর বাইরের কাউকেও বলিওনি।

বৈজয়ন্তী মালার আসল নাম কি জানি না। ওর পাঁচ ছেলেমেয়ে,লক্ষী মালতী দুই মেয়ে, তবে আমি ওকে লক্ষীর মা বলেই ডাকতাম।আর তিন ছেলে বড়টা মাধব সে সবার বড় আর ছেলে দুটো যমজ, নাম গৌর নিতাই।

বড় কষ্ট করে এখানে বসত করেছিলো ও। আমি বললাম, তুমি এইখানে এসে নিজে জমি কিনেছো?বলে, হ্যাঁ ।আমি কোনরকমে খোঁপার মধ্যি করে, মেয়ে দুডার চুলের মধ্যেকরে কিছুডা সোনাদানা আনছিলাম, সে সব বেচায়ে দিলাম। এমনকি ছেলে মেয়ের রুপার যা কিছু ছিলো, যা দুই চারটা পয়সা পাওয়া যায়, সব।বড় ছেলেটাকে আমাদের ওখানের চেনাজানা সে এখানে ছোট সোনা রুপার দোকান দিসে, ওর দোকানে বছর ভিতে কাজে দিসি।ওই যে মাধপের বাপ আইলো না, ত্যাখন এই জলা জমিটাই কিনসি। আমি  বললাম সব বেচলেও তোমার জমির দাম হোলো? না সব হয় নাই। মাধপের বাপ কইছিলো, ছাড়ান দে। অত টা জমি লাগবোনা। কিন্তু আমি বলি, তুই বুঝিস না, জমি থেকে সব হবে,তাই মাধপের মালিকের কাছ থেকে অতি কষ্টে সুদে টাকা ধার নিয়ে ওর বাপটারে দিয়া  কেনা করাইলাম। 

মাস দুএক পরে ও আমার থেকে কিছু আগাম টাকা প্রায় জোর করেই নিলো। শুনলুম ও গরু কিনেছে। আমি বললাম, তুমি কখন দেখবে? বলে, চারটা ছেলেমেয়ে তো বাড়িতেই আছে,ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ইস্কুলে দিলাম, প্রায়ই ওরা যায় না। বরং গরু চরাক। আমি  ভাবলাম,ওর যাই হোক এই বুদ্ধিটা ভালই, ছেলেমেয়েকে ও ওদের মতো করেকাজে ভিড়িয়ে দিয়েছে।এবারে ও করলো  কি আমি ওকে যে জলখাবারটা দিতাম, সেটা ও বাড়ীতে নিয়ে যেতে শুরু করলো আমারথেকে একটা পুরনো দুধের কৌটো চেয়ে নিয়ে। আমি বললাম, তুমি কাজ করো, তোমার কিছু খাওয়া দরকার তো।  ও বলে আমি বাড়ি থেকে দু গা পান্তা খ্যায়া আসি। ওইতেই হয়া যায় এইখানে আসিয়া চাটুক খাই, ওইতে বেশ চলে যায়। 

কদিন পরে লক্ষীর মা  এসে বললো, `বৌদি, তুমার দেওয়া খাবারটা খুব কাজে দিসে। আমি বলি কি করে? আমি গৌর নিতাইরে কইসি, তুরা গরুগুলা দেখভাল কর, আমি তোদের জন্যি দেখবি, কি সব আনবো। ওরা, না বউদি, গরুগুলাকে দেখে চরায়,কার ক্ষেতে জানি  মুখ না দেয়,এইডা করে,আর আমি বাড়িতে ফিরত্‌ যাবার আগ দিয়ে বড় আস্তায় আসিয়া বসে থাকে। যেই গলিটুকু পার হয়ে বড় আস্তার উঁচাটায় উঠি, আমারে দেখতে পাইয়া,দুইজনে দৌড় পেড়ে আসিয়া এই কৌটা টা ছোঁ মারিয়া লইয়া যায়। তারপরে দুই ভায়ে মারপিট, কে আগে ডিবাটা নিবে।` আমি বলি তুমি তো ভালো ফন্দি করেছো।

বছরখানেক পরের থেকে ওর আসা-যাওয়া বড়ই এলোমেলো হতে থাকে। তিন চারদিন আসেনা, খোঁজও নেই। আমি ভাবছি ওকে বাদ দিয়ে দেবো,তখন হঠাৎ ওর উদয়। এসেই একেবারে মুখ কাঁচুমাচু করে খুব বিনীতভাবে দোষ স্বীকার করে বলে, `আমি আসতে চাইছিলাম। কিন্তু ওই মাধপের বাপে কইল ঘর করসি, এবার, একবার কেত্তন দিই।ওই সব কাজেতো কয়দিন গেলো,ও বৌদি একডা ভালা খবর আসে। এবার থেকে মাধপকে কিছু হাতে, দেবে ওরা। তয় একটা কথা কই,একদিন আমার ঘরটা কেমুন হইল একবার দেখবার আসেন। আমি বললাম,ঠিক আছে, সে হবেখন, তুমি এখন তোমার কাজ করো।` 

প্রায়ই ওর ঘর বাড়ি দেখতে যাবার কথা বলে,আমার আর হয়ে ওঠে না। এক হেমন্তের দিনে আমার পাশের কোয়ার্টারের ছবিদিকে নিয়ে ওর বাড়ি দেখতে গেলাম। টিনের চালার দুখানা ঘর,তবে ভিতটা উঁচু করেছে বর্ষায় জল ওঠে বলে।ঘরের লাগোয়া রান্নাঘর আর তার দাওয়ায় জ্বালানি কাঠকুটো ডাঁই করা।একখানা ধান কোটা চিঁড়ে কোটা ছামও রয়েছে। বলে, `বৌদি এবার চিঁড়া  কুটলে তোমারে  দিবো। খায়া দেখো কি মিষ্ট সোয়াদ।` বেশ গোবর লেপা পরিষ্কার উঠোন, ওদিকে গোয়াল ঘর। আমার সবচেয়ে ভালো লাগলো ওদের বাড়ির গেটের দুধারে, অপরাজিতা আর মাধবীলতা লাগানো। গাছ দুটো গেটটাকে আলো করে আছে।  গায়ের অলংকার চলে গেলেও ও আজ প্রতিষ্ঠার এক নতুন অলংকারে ভূষিত, সেটাই আজ ওকে আলোকিত করেছে   এ বড় কম কথা নয়। এ যেন পুজোর পরে দেবতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা। সংগ্রাম এর পরে অস্তিত্ব রক্ষা।

এবারে বড় জব্বর  শীত পড়েছে,তার ওপরে রোজ সকালে ঘন কুয়াশায় চারদিক লেপেপুঁছে  একাকার। তার মধ্যে আবার শুরু হলো ওর না আসা। এতদিন ও বিরক্ত হতো, এবার আমি  বিরক্ত।আমি ঠিক করলাম, লক্ষীর মা কে বিদায় জানাবো, আর পারা যাচ্ছে না। তিন দিন পরে ওর  উদয় যেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রুটের বাস পাবার মতো। শুকনো মুখ, কোটোরগত চোখ জানান দিচ্ছে অনিয়ম আর ক্লান্তির কথা। যে জীবনটা সেজে উঠতে যাচ্ছিলো,সেখানে প্রতিবাদী মেঘের ছায়া।আমি সব রাগ জল দিয়ে স্লেট মোছার মতো মুছে ফেলে অত্যন্ত নরম গলায় বললাম, `কি হয়েছে তোমার?` কাঁদতে কাঁদতে বলে, `বউদি আমার লক্ষীরে আমি হারায়ে ফেলসিলাম।` আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি,` কি করে?` বলে, `এই তো তিন চার মাস হলো মেয়েটা ফুল পাইসে,এই কয়দিন কুথায় যে গেল।` পরে ওর কথায় যা শুনলাম, ওর মেয়েকে দু তিন দিন কোথাও খুঁজে পায়নি। ময়নাগুড়ি থানা থেকে খবর পেয়ে মাধব ওকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে এসেছে। এখানে আসার পরে বাড়িতে খুব মার খেয়েছে ওর কাছে। এতো কাঁদছে এখন সেটা মেয়েকে মেরেছে বলে না ফিরে পেয়েছে বলে বুঝতে পারিনি। কিন্তু চোখের জলের তোড়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে যাবে মনে হয়। 

এরপর ট্রান্সফার হবার খবরে আমি যারপরনাই খুশী পুলকিত। আমি তখন নিজের ঘরের জিনিস গোছাতে ব্যাস্ত। দুমাসের মাথায় চলেও এলাম এদিকে,ভেসে গেলাম আপন্ ধারায়। বহু বছর বাদে আবার সুযোগ হলো ওই টাউনে আসার। এই শহরে এখন পুরনো ছবি মুছে ফেলার পালা।অনেকখানি খুঁজে পেতে যখন আন্দাজে ওর বাড়ির কাছে পৌঁছলাম তখন ভর দুপুর। লক্ষীর মা বলে খুঁজে না পেলেও গৌর নিতাই এর দেখা  পাওয়া গেলো। তারা এখন ভরপুর যুবক। তাদের আমাকে  চেনার কথাও নয়। আমি বললাম, `লক্ষীর মায়ের  এই বাড়ি না?` আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। ওরা ঠিক চিনতে পারলো না। শুধু বলে, `ও এখানে না থাকে।`  অবাক হয়ে বললাম, `কোথায় থাকে?` `ওই শশ্মানকালী মন্দির চত্বরে`,বলে উলটো দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলো। 

ওখানে গিয়ে খুঁজে পেতে যখন ওর কাছে পৌঁছলাম, তখন বেলা দুপুর গড়িয়েছে। দেখলুম, ও ঠাকুরের পট, সিঁদুর এসব বিক্রি করে।ওকে দেখে চিনতে পারিনি। ওর চেয়ে ওর গলার স্বর আমাকে চিনিয়ে দিলো। আমি বললুম, `তোমার লক্ষীর খবর কি,তোমার গৌর নিতাই`? ও এককথা বলে, `সবাই ভালো আছে, মা নেওনা মা ঠাকুরের ছবিখান, এক খান সিদুর, তোমার ভালো হবে মা, তুমি খুব ভালো থাকবে।..` বুঝলাম,ওর অতীত এখন পর্দার পেছনের মতো,যেখানে কোন আলো নেই।  

আমি হতাশ হয়ে ফিরে এসেছিলাম। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। সিনেমা ম্যাগাজিনের রঙচঙে ছবি্র আড়ালের আঁধারের মতো কিছু একটা গ্রাস করলো আমাকে।  যে কষ্ট করে বাড়ীর ভিত পত্তন করলো,তারই সব চলে গেলো বিস্মৃতি অতলে । তবু একদিন জলা জমি ওর হাতে যে আবাদি হয়েছিলো সেই ছবিটাই রেখে দিলাম যত্ন করে, তার সঙ্গে ওর নামটাও।।

  


 

স্বপ্ন কী কখনও সত্যি হয় ?

শুভেন্দু নন্দী 

বিরাট হলঘর। আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনীর কক্ষে অনেক রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান মানুষের ভীড়। দর্শকবৃন্দ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছে হলঘরের চারিদিকে সুন্দর করে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে। এই ভীড়ের মধ্যে আছে অর্কদীপ সান্যাল।

কলকাতায় এসেছিল চাকরীর একটা ইন্টারভিউ দিতে। ছবি আঁকার নেশা তার ছোটবেলা থেকে। এই গোধুলীবেলায় সূর্যের শেষ আলোর ছটা সুনীল আকাশকে আরও রক্তিম করে তুলেছে । এই সব ভাবতে ভাবতে ও চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে রং ও তুলিতে ক্যানভাসে আঁকা একটা ছবির কাছে এসে দাঁড়ালো সে। একজন স্নেহময়ী জননী এক শিশুকে আদরে, সোহাগে, আলিঙ্গন করে বসে আছেন আর শিশুও যেন পরম নির্ভরতায় মাকে জড়িয়ে ধরেছে। মায়ের মুখে চওড়া হাসি।  "অনবদ্য," "অসাধারণ" বলে জোরে মন্তব্য করতেই পরক্ষণেই নিজেকে সংযত করলো। ছবির নীচে শিল্পীর নাম সুশান্ত আইচ।

এই ভীড়ের মধ্যে তাঁকে খোঁজা একটা অসম্ভব কাজ মনে করে ঘর থেকে সে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলো। দু`বছর কেটে গেছে। চাকরিতেও যোগদান করেছে। কিন্তু সেই ছবিটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছেনা। সারাদিন পরিশ্রমের শেষে রাতে নিদ্রাদেবীর কোলে ঢলে পড়লো অর্ক।  

- আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সুশান্ত আইচ। আপনার চোখে দেখা শ্রেষ্ঠ শিল্পী। যা সেদিন ভীড়ে আপনার ভালো লাগার স্পষ্ট অনুভূতি আমার চোখে ধরা পড়েছিলো নিবিড়ভাবে। মায়ের কত স্বপ্ন ছিলো আমায় ঘিরে। না ফেরার দেশে তিনি চলে গেছেন....

অর্ক শুধু মনে মনে ভাবতে বসলো " স্বপ্ন কী কখনও সত্যি হয় ?"


 

হাওয়া বদল

অণুশ্রী তরফদার
 

হাওয়া বদলে যাচ্ছে সাথে ভাললাগাও 
বোশোখের তিনভাগ চলে যায় মেঘ বাজিয়ে
আলো আর আঁধারের খেলায় সময় শঙ্কিত
হাওয়া এপাশ থেকে ওপাশে দৌড়ায়, 
বড়ই স্পর্ধা দেখিয়ে, 
আধভেজা কাপড়ও ভয়ে জড়োসড়ো 
হতেই পাতাদের ইতস্তত খেলার আশ।
স্বপ্ন ওড়ে, ঘুড়ি হয় পেটকাটি- চাঁদিয়াল লম্বা লেজ
সুখ দুঃখকে নিয়ে খুশহাল কবুতর! মনে হয়!
সব ওড়া প্রজাপতি, রঙিন পাখা-
কবি লিখে রাখেন, আমরা জলসায় মত্ত
হাওয়া একটু একটু করে রঙ বদলায়
কচি সবুজ থেকে পাকার পর্যায়, আরও চাই 
লাল হলে মন্দ হয় না!! ভীষণ রোমান্টিক।


 



স্থৈর্য

শিশির আজম


যুদ্ধ এসেছে
তারপর সময়মতো যুদ্ধ চলেও গেছে

মেয়েটা বসে আছে মহাজাগতিক স্থৈর্যে
মানুষ আর জন্তুজানোয়ারের হাড়গোড়গুলো সামনে করে

অথচ ঘরে ঘরে টেলিভিশনের আর খবরের কাগজের
আর অন্তস্ত শুদ্ধতম মিউজিয়ামের
সে কি দেশাত্মবোধ আর মিউজিক ফেস্টিভাল
আর কনফারেন্স ব্লু- ইকোনোমি

মৃত সৈনিকের দেশপ্রেমের ওপর
আমরা দেখছি হৃষ্টপুষ্ট কয়েকটা বহুজাতিক ঘোড়া হেঁটে বেড়াচ্ছে
কিন্তু ওদের পা অদৃশ্য
তাই নিয়মানুযায়ী আমরা অস্বীকার করবো
পরাবাস্তব ঘোড়াগুলোকে

যা হোক হাড়গোড়গুলো কতক্ষণ পড়ে থাকবে
ওভাবে
ওরাও তো কথাবার্তা শুরু করেছে
আর অস্বস্তি
গ্রিক ঐতিহ্যের গথিক খিলান হয়ে
বেঁচে থাকাটা
তেমন কাজের না


 

আদিম পাখি
তন্ময় কবিরাজ

আদিমতা ভাঙলে আমি পালিয়ে যাব ।
মন্দিরে দেবতা হোমের জন্য রাত জাগছে,
তোমার সুড়ঙ্গের ভেতর আলো নেই,
সুখের অভিযানে আমি সব চিনি -

দু পায়ের ভাঁজে রাস্তা 
আমাকে ক্লান্ত করে তোলে প্রাচীন খেলা
দাবানল শেষ হলে শান্তি পায় অন্ধকার।


 

মানবতা 
বিকাশ   দাশ 

আমরা যতটা হিন্দু কিম্বা মুসলমান  
ঠিক ততটা মানুষ না,  
আমরা ঠিক হিন্দুও না, ঠিক মুসলমানও না  
তাই, মানুষের জন্য দুঃখ এনে দিই। 

ধর্ম কোনোদিন মানুষ হতে শেখায় নি 
যতটা ধার্মিক হতে বলে,  
কোনো ধর্মই হাতে অস্ত্র তুলে দেয় না।  
তবুও প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয় রাজপথ, সবুজ ধান খেত 
ধর্মকে হাতিয়ার করে,  
আসলে সন্ত্রাসবাদীর কোনো ধর্ম হয় না।  

এত সন্ত্রাস চারিদিকে, এত হত্যালীলা  
তবুও বাড়ি ফেরৎ মানুষের পায়ে পায়ে  
উঠে আসে নদী,  
গোরুহীন গৃহস্থেও নেমে আসে গোধূলি।


 

ক্রমশঃ একাকী...

  মো হ ন

হা-মুখ সময়ের ভিতর ক্রমাগত  ঢুকি 
আর অবাক হয়ে পৃথিবীকে বারবার দেখি।
তৃষ্ণার চেয়ে বিতৃষ্ণাই বেশি জাগে
চুপচাপ, একা পথ চলা ভালো লাগে।

পথের দূরত্ব যত কমে আসে
যত কাছাকাছি পৌঁছে যাই শেষের,
ফেলে আসা পথের দিকে বারবার 
মুখ ফেরাতে ভালো লাগে ইচ্ছের।

প্রিয় সবকিছুর থেকে সরে সরে যাই
ভালোবাসার রঙ কেবল অভিমান, 
দু'চোখে একঘর অন্ধকার নামলে
জ্যোৎস্নায় ভরে ওঠে ব্যথার উঠান।

জানলায় হাওয়া আসে, যায় ধীরে ধীরে 
পথে নামা সকলেই অবশেষে ফেরে।

আমি যেন জানি না কোথায় আমার বাড়ি 
ইচ্ছেও করে না আর, কারও কাছে ফিরি!


 

আমরা ভিজছি, শুধু ভিজে যাচ্ছি 

উৎপলেন্দু পাল  


আকাশ জুড়ে কালো হরিণীর মতো একা মেঘ 
তার কন্ঠ থেকে নাভিকুন্ড, নিতম্ব পেঁচিয়ে ধরেছে সর্বগ্রাসী অজগর 
তার রুদ্ধ শ্বাসবায়ু ফেটে বের হচ্ছে চোখ বেয়ে অশ্রু ধারায় 
তার সম্ভ্রম লুন্ঠিত হচ্ছে অজগরের চিরাচরিত দানবীয় ধর্ষকামে  
বৃষ্টি নেমেছে তার দু'চোখ, ঠোঁট, চিবুক এমনকি গোপনাঙ্গ বেয়ে 
আমরা ভিজছি শুধু ভিজে যাচ্ছি মূক লতাগুল্ম, ঘাসের মতন 
আমরা ভেসে যাচ্ছি খড়কুটো, কচুরিপানার মতো অসহায় অবলম্বনহীন  
আমাদের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে সেই অজগরের অযুত সন্তান 
অজস্র কালোহরিনী মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরাবে বলে। 


 

রাজকীয় ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও হৃদয় বিদারক ইতিহাসের সাক্ষী  নম পেন শহর
 
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায় 

কম্বোডিয়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার  ইন্দোচীন উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ।দেশটি টোনলে সাপ হ্রদ ও মেকং বদ্বীপের চারপাশে একটি কেন্দ্রীয় প্লাবনভূমি নিয়ে গঠিত।এটি পাহাড়ি অঞ্চল দ্বারা বেষ্টিত একটি ঐতিহ্যবাহী দেশ। এই দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হল নমপেন। নমপেনের সমৃদ্ধ রাজকীয় ঐতিহ্য, খেমার সংস্কৃতি ও খেমার রুজ শাসন আমলের হৃদয়বিদারক ইতিহাস পড়ার পর থেকে শহরটিকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল।২০২৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সেই ইচ্ছা পূরণ হল। এটি ছিল আমাদের পারিবারিক আন্তর্জাতিক ভ্রমণ। আমার মেয়ে চার মাস আগেই অনলাইনে  ই.ভিসা ফ্লাইটের টিকিট হোটেল সব বুক করে রেখেছিল। এগারো তারিখ রাত সাড়ে বারোটার ফ্লাইটে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। ভোরে কুয়ালালামপুর পৌঁছে ফ্লাইট পরিবর্তন করে কম্বোডিয়ার ফ্লাইট ধরলাম। সকাল দশটায় নম পেন পৌঁছে দেখলাম এয়ারপোর্টের বাইরে আমাদের নাম লেখা ব্যানার নিয়ে হোটেলের গাড়ির ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে শহরের মাঝখানে রাজবাড়ির কাছাকাছি কিং গ্র্যান্ড হোটেলে পৌঁছালাম। ফ্রেশ হয়ে ঐ গাড়িতেই শহর পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লাম।




ওখানে টুকটুক ভাড়া করেও  শহরের সব ট্যুরিস্ট স্পট ঘোরা যায় তবে সেদিন প্রচন্ড গরম ছিল আর আমরা সারারাত জার্নি করে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তাই গাড়িতে ঘোরাই স্থির করলাম। দুপুর বারোটায় নমপেন শহরে জীবনযাত্রা আধুনিক ও গতিময়। জানলা দিয়ে দেখছিলাম দ্রুতগতিতে ছুটে চলা মোটরবাইক, ব্যস্ত স্থানীয় বাজার এবং হকাররা তাজা নুডলস থেকে শুরু করে ঝলসানো কলা ও ব্যাঙের পা পর্যন্ত সবকিছু বিক্রি করছে। 

আমাদের ড্রাইভার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে শহর সম্পর্কে অনেক কিছু ইনফরমেশন দিচ্ছিলেন। আজকের যাত্রায় তিনিই আমাদের ট্যুর গাইড। তাঁর নাম চান লিম। কম্বোডিয়ায় নিয়ম হল আগে টাইটেল পরে নাম।আমার মেয়েকে তিনি বললেন তাঁকে পউ বলে ডাকতে,কম্বোডিয় পউ শব্দের অর্থ কাকা।তাঁর কাছ থেকে জানলাম, এখানে একটি গল্প  প্রচলিত আছে পেন নামের এক বৃদ্ধা প্রাচীন কালে মেকং নদীর তীরে ভেসে আসা চারটি বুদ্ধ মূর্তি আবিষ্কার করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একটি পাহাড়ে স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে নমপেন বা পেনের পাহাড় নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই থেকে এই শহরের নাম নমপেন।মেকং, টনলে সাপ এবং বাসাক নদীর সঙ্গমস্থলে এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে, নমপেন ধীরে ধীরে একটি বড় শহরে পরিণত হয়। ১৮০০-এর দশকের শেষের দিকে ফরাসি শাসন আমলে শহরটি 'এশিয়ার মুক্তা' নামে খ্যাতি পেয়েছিল।




নমপেন শহরের আধ্যাত্মিক দিকটি মূলত থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম। প্রাত্যহিক জীবনের পাশাপাশি এখানকার সংস্কৃতি ও স্থাপত্যে আধ্যাত্মিকতার গভীর ছাপ রয়েছে। তাই গাইড প্রথমে আমাদের নিয়ে গেলেন এখানকার বিখ্যাত আধ্যাত্মিক বৌদ্ধ মঠ ওয়াট নম (Wat Phnom),শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি কৃত্রিম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এটি ১৩৭৩ সালে দাউন পেন নামে এক ধনী বিধবা নির্মাণ করেছিলেন, ৪৬ মিটার উঁচু এই মন্দিরটি নম পেন শহরের প্রধান মঠ ও শহরের নামের উৎস।স্থানীয় মানুষ এখানে সুখ, সমৃদ্ধি এবং ভালো ভাগ্যের জন্য প্রার্থনা করতে আসেন। কিন্তু মন্দিরটি বিশেষ প্রার্থনার কারণে  এক ঘন্টার জন্য বন্ধ থাকায় আমরা সিঁড়ি ভেঙে উঁচুতে আর উঠিনি।তবে  তোরণের দু পাশে দুটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার নজরে এল। দেখলাম একজন কম্বোডিয় গণক ঠাকুর, তিনি অনেকগুলি ধূপ জ্বালিয়ে রেখে বসে আছেন, পাশেই দান পাত্র, তাঁর সামনে একজন লোক ধূপগুলি হাতে তুলে মাথায় খানিকটা কাছে নিয়ে মনে মনে কি যেন প্রার্থনা করলো তারপর একটি ধূপ সেখান থেকে তুলে নিল।তখন গণক ঠাকুর সেই ধূপটি  নিজের হাতে নিয়ে তার ভাগ্যে কি আছে নিজের ভাষায় বলতে লাগলেন। অবশ্য  সেই ভাষা ও তার অর্থ আমি কিছুই বুঝিনি।

দ্বিতীয় ব্যাপারটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। গেটের পাশে অনেক  পাখি বিক্রেতা ছোট ছোট পাখিতে ভরা ছোট খাঁচা বিক্রি করছিলেন।এই খাঁচাগুলোর দাম ১০ ডলার আর প্রতিটিতে রয়েছে ১৫-২৫টি ছোট চড়ুই পাখি।সেখানে এই পাখি কিনে অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছে।এই চড়ুই পাখিগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার প্রথাটি হল নতুন আশীর্বাদকে স্বাগত জানানো আর অতীতের যেকোনো দুর্ভাগ্যকে বিদায় জানানোর প্রতীক।আমি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলাম কিন্তু ড্রাইভার এমন তাড়া দিলেন যে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়তে বাধ্য হলাম।





এখন আমরা চললাম অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  মঠে, এটির নাম ওয়াট উনালম (Wat Ounalom Monastery), এটি কম্বোডিয়ার বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র এবং সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর বাসস্থান। প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো এই মঠটিতে বুদ্ধের একটি ভ্রুর চুল সংরক্ষিত আছে।১০০০-এরও বেশি সন্ন্যাসীর আবাসস্থল এবং ৩০,০০০ বইয়ের বিশাল লাইব্রেরি সম্বলিত এই মঠটি খেমার রুজ আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে সুন্দরভাবে পুনরায় নির্মান করা হয়। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ ও বৌদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণে মন শান্ত হয়ে গেল। খুব ভালো লাগলো।

পথে যেতে যেতে ভাবছিলাম এদেশের ইতিহাস, সত্যি এখানকার ইতিহাস বহুস্তরীয় ও জটিল। প্রাচীন রাজ্যসমূহ ও আঙ্কোরের উত্থান থেকে শুরু করে ফরাসি শাসন এবং পল পটের অধীনে নৃশংস খেমার রুজ যুগ পর্যন্ত, এর ইতিহাসে জয় ও পরাজয়ের সংমিশ্রণ ঘটেছে।

উনিশ শতকে এদেশে ফরাসিরা আসে, এখানকার প্রশস্ত রাজপথ ও ঔপনিবেশিক ভিলাগুলোতে এখনও তাদের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু কম্বোডিয়ার ও বিশেষ ভাবে নমপেনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি আসে ১৯৭০-এর দশকে খেমার রুজের শাসনামলে।১৯৭৫ সালে খেমার রুজ কম্বোডিয়ায় ক্ষমতায় এলে তারা নমপেন শহরের সমস্ত বাসিন্দাদের গ্রামাঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়।১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামী বাহিনী কম্বোডিয়ায় আক্রমণ করে খেমার রুজকে উৎখাত না করা পর্যন্ত শহরটি কার্যত জনশূন্য ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে নমপেন শহরে ধীরে ধীরে পুনরায় জনবসতি গড়ে ওঠে। খেমার রুজরা কম্বোডিয়ার শিক্ষিত শ্রেণীর কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল তাই শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি দীর্ঘ ও কঠিন পুনরুদ্ধার পর্বের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এই সব নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল গাইড কাম ড্রাইভার মিস্টার লিমের সঙ্গে, তিনি এবার নিয়ে চললেন এই দেশের করুণ অথচ মূক ইতিহাসের নিদর্শন স্থল দেখানোর জন্য।

 আমরা পৌছালাম টুল স্লেং গণহত্যা জাদুঘর (এস-২১)।একসময় এটি ছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরে এই ভবনটি খেমার রুজ শাসনামলে এক কুখ্যাত কারাগারে পরিণত হয়েছিল।রুজ কারাগারের সংরক্ষিত কক্ষগুলো এবং প্রতিদিনের অত্যাচারের কাহিনীগুলো দেশটির অন্ধকারতম অধ্যায়ের এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরে। এস ২১এ  খেমার রুজের বাহিনীর অত্যাচারের বেশিরভাগ ভুক্তভোগী ছিলেন নমপেন শহরের  নিরীহ বাসিন্দারা, সৈন্য, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, শিক্ষক, ছাত্র, কারখানার শ্রমিক, ভিক্ষু, প্রকৌশলী সকলেই। পরবর্তী সময়ে, দলের নেতৃত্বের সন্দেহবাতিকতা তাদের নিজেদের দলের দিকেই ঘুরে যায় এবং দেশজুড়ে চালানো শুদ্ধি অভিযানের ফলে হাজার হাজার দলীয় কর্মী এবং তাদের পরিবারকে টুল স্লেং-এ নিয়ে আসা হয়, যেখানে তাদের হত্যা করা হয়। 




এখানে অডিও সহ জনপ্রতি টিকিটের মূল্য দশ ডলার বা ৮৪৫ টাকা। আমরা টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। মিউজিয়ামে চারটি প্রধান ভবন রয়েছে, যেগুলো বিল্ডিং  এ, বি, সি এবং ডি নামে পরিচিত। বিল্ডিং  এ-তে সেই বড় সেলগুলো রয়েছে, যেখান থেকে সর্বশেষ নিরীহ মানুষদের মৃতদেহগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। বিল্ডিং  বি-তে রয়েছে ছবির গ্যালারি। বিল্ডিং  সি-তে বন্দীদের জন্য ছোট ছোট সেলে বিভক্ত কক্ষগুলো রয়েছে। বিল্ডিং  ডি-তে নির্যাতনের সরঞ্জামসহ অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন রাখা আছে।অন্যান্য কক্ষগুলোতে কেবল একটি মরিচা ধরা লোহার খাটের কাঠামো রয়েছে, যার উপরে একটি সাদা-কালো ছবি টাঙানো আছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোতে পায়ের বেড়ি এবং নির্যাতনের সরঞ্জাম সংরক্ষিত আছে।এগুলোর সাথে রয়েছে প্রাক্তন বন্দী ভান নাথের আঁকা কিছু ছবি তার মধ্যে নির্যাতিত মানুষের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।দেখেছি ঘুরে ঘুরে তবে এই সব দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করা যায়না, ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট হচ্ছিল।অডিও সিস্টেমটি সঙ্গে থাকায় পুরো ঘটনা শুনতে পেলাম,মর্মান্তিক সেইসব ঘটনা।

বিল্ডিং এর বাইরে বাগানে একটি শান্তির প্রতীকী মূর্তি আছে।সেখানে বসে শান্তি প্রার্থনা করলাম। এর কিছু দূরে রয়েছে চোয়েং এক কিলিং ফিল্ড,বর্তমানে এটি একটি শান্তিপূর্ণ স্থান,এখানে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালে নির্মিত স্মৃতিস্তূপটির স্বচ্ছ কাঁচের প্যানেলগুলোর পেছনে খেমার রুজ আমলে নিহত মানুষের ৮০০০-এরও বেশি মাথার খুলি সংরক্ষিত আছে। তবে আমাদের সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় নি কারণ সেখানে নতুন সংস্কারের কাজ চলছিল। 

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য এখানকার সব থেকে বিখ্যাত পর্যটক প্রিয় জায়গা রয়্যাল প্যালেস বা রাজবাড়ি।১৮৬৬ সালে রাজা নরোদমের আমলে রাজধানী উদং থেকে নম পেনে স্থানান্তরিত হওয়ার পর বর্তমান রাজপ্রাসাদটি নির্মিত হয়। এটি আজও কম্বোডিয়ার রাজাদের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।১৯৭০-এর দশকে খেমার রুজ শাসনামলে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয় এবং রাজপরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যা বা নির্বাসিত হতে হয়।দীর্ঘ সংঘাতের পর ১৯৯৩ সালে সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজতন্ত্র ফিরে আসে। বর্তমান রাজা নরোদম সিহামোনি এখান থেকেই রাজকার্য পরিচালনা করেন।রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে কম্বোডিয়ার ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য এবং সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রধান প্রতীক।

 দূর থেকে দেখছিলাম শহরের আকাশরেখার বিপরীতে এর সোনালি চূড়াগুলো রৌদ্রের আলোতে ঝলমল করছিল, খুব সুন্দর সেই দৃশ্য। শুনলাম রাজা সবসময় এখানে থাকেন না যখন আসেন তখন নীল পতাকা উড়তে দেখা যায়।বিভিন্ন ভবনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী খেমার নকশার পাশাপাশি ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মিশ্রণ লক্ষ্যণীয়।

পর্যটকদের শুধুমাত্র সিংহাসন কক্ষ এবং এর আশেপাশের কয়েকটি ভবন পরিদর্শনের অনুমতি রয়েছে। সকল দর্শনার্থীকে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা শর্টস এবং কনুই পর্যন্ত লম্বা টি-শার্ট বা ব্লাউজ পরতে হবে অন্যথায় টিকিট কাউন্টার থেকে শরীর ঢাকার জন্য একটি উপযুক্ত লুঙ্গি কিনতে হবে। 

জনপ্রতি ৮৩৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আমরা বিশাল তোরণ দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।প্রাচীর দিয়ে এই চত্বরটি চারটি প্রধান প্রাঙ্গণে বিভক্ত। দক্ষিণ দিকে রয়েছে রৌপ্য প্যাগোডা, উত্তর দিকে খেমারিন প্রাসাদ,  কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণে রয়েছে সিংহাসন কক্ষ এবং পশ্চিমে রয়েছে ব্যক্তিগত এলাকা বা অন্তঃপুর। প্রাসাদের ভবনগুলো সময়ের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৬০-এর দশকেও কিছু ভবন ভেঙে পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছিল। কিছু পুরোনো ভবন ঊনবিংশ শতাব্দীর।

আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম, প্রথমে দেখলাম খেমারিন প্রাসাদ। এই প্রাসাদ কম্বোডিয়ার বর্তমান রাজা নরোদম সিহামোনির সরকারি বাসভবন। প্রাসাদের ভেতরের অংশে পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ, তবে বাইরের স্থাপত্যের সৌন্দর্য চমৎকার। ক্যামেরায় সেই সৌন্দর্য ধরে রাখলাম।

এরপরে চোখে পড়ল রাজবাড়ির বড় সম্পদ সিলভার প্যাগোডা।অসাধারণ এই কক্ষের সৌন্দর্য।এটি পান্না বুদ্ধের মন্দির নামেও পরিচিত। এর মেঝে ৫ টন ঝকঝকে রুপো দিয়ে ঢাকা থাকায় এর এমন নামকরণ হয়েছে রৌপ্য প্যাগোডা। প্রবেশপথের কাছে থাকা ৫০০০ টালির কয়েকটি মাত্র উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম, সুরক্ষার জন্য বেশিরভাগই ঢাকা ছিল। ভেতরে মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি সারি সারি জমকালো বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে।সিলভার প্যাগোডায় যাওয়ার সিঁড়িটি ইতালীয় মার্বেল পাথরে তৈরি। রুপালি মেঝের সাথে পাল্লা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পান্না বুদ্ধ, যা একটি চিত্তাকর্ষক সোনালি বেদীর উপর স্থাপিত এক অসাধারণ ব্যাকারাট-ক্রিস্টালের ভাস্কর্য। এখানে রয়েছে ২০৮৬টি হীরা দিয়ে সজ্জিত আরো কয়েকটি সোনার বুদ্ধ মূর্তি, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওজন ২৫ ক্যারেট।এছাড়া সিলভার প্যাগোডা ভবনের দেওয়ালে এবং এর ভিতরের ছোট জাদুঘরে রাজপরিবারের পোশাক, গয়না এবং ঐতিহ্যবাহী অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত আছে। আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে সেগুলি দেখলাম।

এরপরে চলে গেলাম আমরা সিংহাসন হলে,রাজপ্রাসাদ চত্বরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সিংহাসন কক্ষ , কক্ষটির শীর্ষে আংকর-এর বায়ন শৈলীর সমতুল ৫৯ মিটার উঁচু একটি মিনার রয়েছে। এর ছাদের সূক্ষ্ম খোদাই কাজ এবং ভেতরের রাজকীয় সিংহাসন দেখার মতো।এই কক্ষটি রাজ্যাভিষেক এবং কূটনীতিকদের পরিচয়পত্র পেশের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। একসময় এখানে প্রদর্শিত অনেক জিনিসপত্র খেমার রুজ ধ্বংস করে দিয়েছিল।

এরপরে নজরে পড়ল মুনলিট হল বা চাঁদনি প্যাভিলিয়ন,এটি একটি উন্মুক্ত প্যাভিলিয়ন এখানে অতীতে ও বর্তমানে সিয়াম শাস্ত্রীয় নৃত্যের মঞ্চ হিসেবে সজ্জিত আছে। এটি প্রাসাদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ভবন, কারণ প্রাসাদের প্রাচীরের একটি অংশের পাশেই নির্মিত হওয়ায় বাইরে থেকে সহজেই দেখা যায়। এটি এমন একটি প্যাভিলিয়ন যেখানে জনতার উদ্দেশে রাজার ভাষণ দেওয়ার মঞ্চ এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজকীয় ভোজসভা আয়োজনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০০৪ সালে রাজা নরোদম সিহামোনির রাজ্যাভিষেকের সময় প্যাভিলিয়নটি একটি ভোজসভা এবং নতুন রাজার জন্য মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ।

মূল ভবনের বাইরে আরও অন্যান্য অসাধারণ স্থাপত্যও রয়েছে। পূর্বদিকে সাদা ঘোড়ার উপর উপবিষ্ট রাজা নরোদমের মূর্তি ও সেটির উত্তরে গ্রন্থাগার। উত্তর-পশ্চিম কোণে ঘণ্টাঘর আর দক্ষিণে চারটি সুন্দর স্থাপত্য রয়েছে।পশ্চিম থেকে পূর্বে মহামান্য রাজা নরোদম সুরামরিত এবং রানী সিসোওয়াত কোসামাকের চেদি (স্তূপ), ধর্মশালা, রাজকুমারী কান্থা বুফার চেদি এবং পাহাড় মন্ডপের চমৎকার কারুকাজ এক কথায় বিস্ময়কর। স্থাপত্যগুলোকে ঘিরে থাকা দেয়ালটি রিয়ামকারের চমৎকার মহাকাব্যের চিত্র দিয়ে আবৃত, কিন্তু অযত্নের কারণে বছরের পর বছর ধরে চিত্রকর্মের নিচের অর্ধেক বিবর্ণ হয়ে গেছে।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তবু ও এখানকার স্থাপত্য শৈলী দেখে বার বার মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম ।

রাজবাড়ির অভ্যন্তরে সিলভার প্যাগোডা বা রৌপ্য মন্দিরের ঠিক সামনের বাগানে আঙ্করভাট মন্দিরের একটি চমৎকার ক্ষুদ্র সংস্করণ বা মডেল  প্রদর্শনীর জন্য রাখা আছে। এটি দেখে খুবই ভালো লাগলো ।
প্রাসাদের চারপাশের বাগানগুলো অত্যন্ত পরিপাটি ও সুন্দর। দুপাশে নানা ধরণের প্রদর্শনী, সোনার গাছ, পালকি ইত্যাদি দেখতে দেখতে তোরণ পার হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।





কাছেই কম্বোডিয়া জাতীয় জাদুঘর, আমরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম। শীততাপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ক্লান্তি দূর হল আর খেমার স্থাপত্য ও নকশার নিদর্শন দেখতে বেশ ভালই লাগছিল। জনপ্রতি ৮৪০ টাকার টিকিট কেটে নিয়মানুসারে বাম দিক থেকে দেখা শুরু করলাম। প্রথমে দেখলাম ব্রোঞ্জের শায়িত বিষ্ণু মূর্তির একটি বড় খণ্ডাংশ, যার মধ্যে তুলনামূলকভাবে অক্ষত মাথা, কাঁধ এবং দুটি বাহু রয়েছে,এটি ১৯৩৬ সালে আংকর ওয়াটের নিকটবর্তী পশ্চিম মেবন মন্দির থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর গেলাম দক্ষিণ প্যাভিলিয়নে সেখানে  রয়েছে প্রাক-আংকরীয় সংগ্রহ আর বিশেষ ভাবে দেখলাম ৬ষ্ঠ শতাব্দীর একটি চিত্তাকর্ষক আট-বাহুবিশিষ্ট বিষ্ণু মূর্তি এবং কম্পং থম প্রদেশের প্রাসাত আন্দেত থেকে প্রাপ্ত শিব ও বিষ্ণুর গুণাবলী সমন্বিত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা হরিহর মূর্তি।  শিবের বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় মূর্তি ও কুস্তিরত একজোড়া বিশাল বানরের মূর্তি দেখে বিস্ময়ের সীমা রইল না। এছাড়া মৃৎপাত্র ও ব্রোঞ্জের নিদর্শনের সঙ্গে একটি সুন্দর কাঠের রাজকীয় নৌকার মতো অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক শিল্পকর্মও সেখানে রয়েছে।

জাদুঘর ভ্রমণ শেষে আমরা চা পান করলাম ও হাল্কা টিফিন করে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে।  এরপরে আমরা গেলাম  সোনালি নৌকা মন্দির বা ওয়াট সম্পভ ট্রেইলাক মন্দির। এটিও একটি ঐতিহ্যবাহী থেরবাদী বৌদ্ধ মন্দির, এটি টোনলে স্যাপ এবং মেকং নদীর মিলনস্থলের কাছে চ্রোয় চ্যাংভার উপদ্বীপে অবস্থিত। মন্দিরটির মূল গঠন একটি সোনালী নৌকার  আকৃতিতে তৈরি। এর ব্যাতিক্রমী আকৃতি, শান্ত পরিবেশ ও সৌন্দর্যের  জন্য পর্যটকরা পছন্দ করেন।এর দু দিকের দুটি তোরণের কারুকার্য খুব সুন্দর।নৌকার ওপর মন্দিরের মূল উপাসনালয় বা প্যাগোডাটি অবস্থিত। এতে ঐতিহ্যবাহী খেমের স্থাপত্যের ছোঁয়া এবং  সোনালী রঙের চমৎকার কারুকার্য দেখে প্রশংসা করতেই হবে।মূল  মন্দিরটির দরজা বন্ধ থাকায় ভিতরে যেতে পারি নি।এর পিছনে অনেক বছরের পুরোনো বিশাল বট গাছ।পাশে আরেকটি  মন্দির তার মাথায় বড় নাগের ফণা। শুধু যে এই মন্দিরেই তা নয় রাজবাড়িতেও কয়েকটি প্যাভিলিয়নে সিঁড়ির দুপাশে নাগের ফনার ভাস্কর্য দেখেছি। নাগের ফণার ভাস্কর্যর কোন গুরুত্ব আছে কি না গাইডের কাছে জানতে চাইলাম, তাঁর আধভাঙা ইংরেজি শুনে মোটামুটি বুঝলাম যে নাগ হল বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র রক্ষক।খেমার স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরের প্রবেশদ্বার, সিঁড়ি এবং সীমানা প্রাচীরের রেলিংগুলো নাগের শরীর ও মাথার ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়।এটি বিশ্বাস করা হয় নাগ হল মর্ত্যলোক থেকে দেবলোকে যাওয়ার প্রতীকী সেতু।মন্দিরে প্রবেশ করার সময় এই নাগের মূর্তিগুলো যে কোনো অপশক্তি বা অশুভ বাতাসকেও ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।এছাড়া এখানকার লোককথা ও সংস্কৃতিতে নাগ বা সাপ হলো জল, বৃষ্টি এবং উর্বরতার প্রতীক। যেহেতু এই সোনালি  নৌকা মন্দিরটি নদীর অববাহিকায় একটি নৌকার আকৃতিতে নির্মিত, তাই নদীমাতৃক জীবনের সুরক্ষা ও বৃষ্টির দেবতার আশীর্বাদ কামনায় এখানে নাগের ভাস্কর্য বেশি মাত্রায় গুরুত্ব পেয়েছে। এরকম  বিস্ময়কর মন্দির আগে কখনো দেখিনি তাই দু চোখ ভরে দেখে নিলাম।

এবার মেকং নদীর ব্রিজের উপর দিয়ে শহরের দিকে গাড়ি ফিরছে। নদীর জলে শেষ বেলার সূর্যের আলো বড় মায়াময়। হোটেলের কাছে সেন্ট্রাল মার্কেটে নামিয়ে দিয়ে আমাদের  গাইড গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। একটি বিশাল আর্ট ডেকো গম্বুজের ভেতরে এই সেন্ট্রাল মার্কেট নমপেনের একটি জমজমাট  জায়গা। এখানে সোনার গয়না থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স, ফুল এবং স্যুভেনিয়ার পর্যন্ত সবকিছুরই দোকান রয়েছে। এছাড়াও, শহরের অন্যান্য অনেক বাজারের তুলনায় এটি বেশি খোলামেলা এবং এর ভেতরে ঘোরাঘুরি করাও সহজ।বাজারে ঘুরতে ভালোই লাগছিল,বেশ কিছু শপিং ও করলাম।
  
তারপর পায়ে হেঁটে চললাম হোটেলের দিকে,  ফেরার পথে আলোয় ঝলমলে রাতের নম পেন ও প্রাণবন্ত জনজীবন দেখে মনের বিষন্নতা একেবারেই চলে গেল। এখানকার  বাসিন্দারা নিশ্চয়ই পূর্ব পুরুষের ব্যাথা বেদনাকে ভুলে গতিময় আলোকিত জীবনকে উদযাপন করার চেষ্টা করছেন। হৃতসর্বস্ব মানুষদের মুখে হাসি ফুটেছে এটাই বড় আনন্দের। শুধু তাই নয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এই শহরের দ্রুত উন্নয়ন প্রশংসনীয় কারণ এখানে এখন আধুনিক প্রযুক্তি সহ ৩৮টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৬০টির বেশি উচ্চশিক্ষা বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী পড়াশোনা করছে আর শিক্ষার মান ও যথেষ্ট ভালো।

হোটেলে ফিরে গ্র্যাব থেকে খাবার আনিয়ে নিলাম। ক্লান্ত  শরীরের এবার বিশ্রাম নেবার সময়। পরদিন খুব ভোরে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। গাড়ি প্রস্তুত। এখন আমরা চললাম আঙ্করভাটের পথে। ভ্রমণের আনন্দ অনুভূতি নিলাম স্মৃতির ঝুলিতে আর বিদায় জানালাম নম পেন শহরকে ....



 কুর্গ- মেঘ পাহাড়ের দেশে

জয়িতা সরকার




দূরের নীল পাহাড়ে মেঘেদের নিঃশর্ত বন্ধুত্ব, আরব সাগরের নোনা বাতাসের খবর আনে সাদা-কালো মেঘের দল। হঠাৎ ছুটি কিংবা টানা তিনদিনের লং উইকেন্ড,  দেশের  আই টি রাজধানীর ট্রেন্ড ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া। কংক্রিটের শহর থেকে পালিয়ে ভিড় জমানো পশ্চিমঘাটের কোন এক নির্জনতায় কিংবা আরব-বঙ্গোপসাগরের বালুকাবেলায়। তবে সত্যি নিস্তব্ধতা খুঁজে পাওয়া অসাধ্য সাধন, চলতি হাওয়ায় গা না ভাসানো আমরাও মাঝেমাঝে ওই ভিড়ে পা মেলাই। লং উইকেন্ড ট্রেন্ডের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব রেখেই চলি। যা হোক অনেক ভূমিকা করেছি, এবার ফিরি মূল আখ্যানে। বহুদিন বন্ধুরা কোথাও যাইনি, অগত্যা সবার ছুটির কথা মাথায় রেখে ১ লা মে-র ছুটিতে প্ল্যান করা হল। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ছ'টা, ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে মাইসোর যাওয়ার রাস্তায় বিখ্যাত নাইস রোডে তখন প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন। বুঝলাম সকলেই ছুটছি আমরা। নাইস রোড ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর মাইসোর এক্সপ্রেসে ওয়েতে  উঠতেই গাড়ির সংখ্যা বলছে আমাদের সকলের গন্তব্য প্রায় এক।




এবারের গন্তব্যে ব্যাঙ্গালোরবাসীর আনাগোনা অহরহ। আমাদেরও দ্বিতীয়বার, বন্ধুদের যে কতবার তা ওদেরও মনে নেই। শুরুতেই বলেছি এই জায়গার প্রধান বৈশিষ্ট্য মেঘের খেলা, হালকা বৃষ্টি, তবে বর্ষার ভয়াবহতা খবরের শীর্ষে থাকে ফি বছর। কোথাও যেতে হলে এই ভিড়ের মাঝে একটু আড়াল খোঁজার চেষ্টা চলে আমাদের। নিরাশ হয়েছি খুব কম, শান্ত প্রকৃতি ঠিক খুঁজে নেয় আমাদের। কফির রাজ্যের সেরার তালিকায় কুর্গ ছিল এবারে আমাদের গন্তব্য। তবে কফির উষ্ণতার থেকেও কুর্গের বাতাসে মিশে থাকে কালো মরিচ আর এলাচের গন্ধ। প্রকৃতি জুড়ে মশলার সুগন্ধি, শহর ছেড়ে একটু দূরে গেলেই গন্ধের নিবিড়তা আরও গাঢ় হয়। কফি থেকেও কুর্গের এই মশলা মেশানো বাতাস আমার ভীষণ প্রিয়। পশ্চিমঘাটের নিজস্ব একটা রং আছে, কুর্গও তার ব্যতিক্রমী নয়, পুরো পাহাড় যেন নীলচে সবুজে স্নাত। দূরের পাহাড় দেখলে মনে হয় কেউ যেন নীল রং ঢেলে দিয়েছে, নীল পাহাড়ের দেশ বললে অত্যুক্তি নয়।



ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে কুর্গের পরিচয় 'স্কটল্যান্ড অফ ইন্ডিয়া' হিসেবে। তুলনা না রূপের বিশেষণ তা নিয়ে তর্কে জড়ানো বৃথা, বরং বর্ষার কুর্গের একটা মোহময়ী রূপ আছে। বর্ষার কুর্গ রবি ঠাকুরের গানকে টক্কর কেটে বলতে পারে, 'আমি রূপে তোমায় ভোলাবো'। এক নীলচে সবুজ চাদরে নিজেকে মুড়ে ছোট বড় জলধারায় ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ উঠিয়ে নীচে নেমে আসা, পাহাড়ের গা জুড়ে বনফুলের বাহারি সৌন্দর্যে কুর্গ তখন অপার্থিব সুন্দরী। এবার খানিকটা গরম বাতাস থাকলেও কুর্গের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ভরা বর্ষায়। রাজা সিটের সিঁড়িতে দূরের মেঘ কাছে এল বৃষ্টি হয়ে, এমন অকৃত্রিম প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা অবর্ণনীয়৷ রাজা সিট- কুর্গের অন্যতম দ্রষ্টব্য, সারা বছর মেঘ রোদকে সঙ্গী করে ভিড় সামলে চলেছে নিয়ম মেনে। সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটাই কুর্গের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা। কোদাগু রাজারা এখানে বসেই নাকি প্রকৃতির রূপ উপভোগ করতেন। এমনকি মাইসোরের রাজাদেরও গ্রীষ্মাবকাশের অন্যতম স্থান ছিল কুর্গ।



কুর্গ মানেই ছোট বড় ঝরনার সাদা ফেনিল জলরাশি। শহর লাগোয়া বিখ্যাত জলরাশি আব্বে ফলস। কফি বাগানের মাঝ বরাবর সিঁড়ি নেমে গিয়েছে, বর্ষায় বেশ উচ্ছল, তবে সারাবছর এর ধারা বহমান। ভিড় এড়িয়ে যাওয়াই যেহেতু আমাদের লক্ষ্য, তাই লং উইকেন্ডে ওইমুখো আমরা হয়নি। দু'দিনের ঠিকানা যেখানে ছিল, ঠিক তার থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে কুর্গের অফবিট বলতে যা বোঝায় সেই কোটে আব্বে ফলস ছিল আমাদের দর্শনীয় স্থানের তালিকায়। কিন্তু এই ভিড় পৃথিবীতে অফবিট শব্দটাই থাকা উচিত কি না তা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণটা খুবই পরিষ্কার, লোক সমাগম এখানেও কম ছিল না। খানিকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা চললাম মান্দালপাট্টির দিকে। কুর্গের অফরোডিং রুট, এই মান্দালপাট্টিও সূর্যোদয় দেখার আর্দশ স্থান। ভোরবেলা স্থানীয় জিপ ভাড়া করে পৌঁছাতে হয় এখানে। সবুজ পাহাড়ের মাঝে প্রথম আলোকরেখা যা মনে থেকে যাবে অনেকদিন, সঙ্গে মনে থাকবে রাস্তার বীভৎসতা। শেষের পাঁচ কিলোমিটারের পর অপার সৌন্দর্য থাকলেও রাস্তা পরীক্ষা করবে আপনি কতটা স্ট্রং। এবার আমরা সে পথেও পা বাড়ায়নি। খানিকটা পথ গিয়ে ফিরে এলাম মাদিকেরী ফোর্টের সামনে। প্রথমবার ফোর্ট বন্ধ থাকায়, আর এবার শহরের ভিড় দেখে জানার চেষ্টাও করিনি ফোর্ট বন্ধ নাকি খোলা? যা হোক এক চক্কর শহর ঘুরে আমরা ফিরে এলাম হোম স্টে তে। বিকেলে আমাদের নতুন একটি জায়গায় সূর্যাস্ত দেখার পরিকল্পনা। হোম স্টে-এর মালিক তার জিপেই আমাদের নিয়ে রওনা হল স্বল্প পরিচিত কোটে বেট্টা-র পথে।


রাস্তা বলতে পাথুরে মাটির খাড়াই পথ। দক্ষ হাতে পাকদণ্ডীর গতিবিধি বুঝে জিপ গিয়ে থামল সানসেট পয়েন্টে। স্থানীয় লোকেদের আনাগোনার চিহ্ন স্পষ্ট হলেও ট্যুরিস্ট যে খুব বেশি আসেন না তা বোঝা গেল, আমরা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন দলের দেখা পেলাম না। আসলে কুর্গ শহর থেকে খানিকটা দূরে এই জায়গা। দূরে পাহাড়ের সারি, হালকা বাতাসে বুনো গন্ধ ভেসে আসছে, সামনে ঘন জঙ্গল, বেশ খানিকটা পথ হাঁটলাম, সামার লিলি ফুটে রয়েছে যত্রতত্র, নাম জানা আরও কিছু ফুলের রংয়ে মুগ্ধ হতে বাধ্য। পশ্চিমঘাট পর্বতে এলে এরকম নানা অজানা ফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। জঙ্গল ঘুরে অপেক্ষা করছি সূর্যাস্তের, কিন্তু আকাশের দখল নিয়েছে মেঘের দল, অগত্যা ফেরার পালা। হোম স্টে তে পৌঁছাতে সন্ধ্যে নেমে এলো। বন্ধুরা মিলে যাওয়া মানে আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, আমরাও ব্যতিক্রমী নই, কখন যে ঘড়ির কাঁটায় ১১ টা বেজে গেল, রাতের খাবার খেয়ে যে যার মত বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।



এই তো হলো কিছুটা চেনা, খানিকটা অচেনা কুর্গ ভ্রমণের গল্প, তবে এখানেই শেষ নয়। কুর্গ মানে তালাকাবেরী, দক্ষিণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কাবেরীর উৎপত্তিস্থল, দর্শনীয় স্থানের তালিকায় প্রথম সারিতে। কুর্গ আর দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প সমনাম, হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আর্কষণের শীর্ষে। কুর্গ যেতে পেয়ে যাবেন নামড্রোলিং মনেস্ট্রি। দেশের অন্যতম টিবেটিয়ান শিক্ষাকেন্দ্র। বিরাট মনেস্ট্রি চত্বরে প্রতিদিন পর্যটকের ভিড়। কুর্গ বর্ষা সঙ্গে জলপ্রপাত একাসনে সমাসীন। বর্ষার কুর্গ যেমন মহোময়ী অপরূপা, তেমন অননুমেয়। কখন রুপের বীভৎসতা গ্রাস করবে পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট শহরকে তা প্রকৃতিই জানে। তবে বর্ষা এলে কুর্গের তুলনা শুধু কুর্গ। শহর থেকে খানিকটা দূরে মাল্লালি ফলস এর সৌন্দর্য এককথায় নৈসর্গিক। অনেকটা পথ নীচে নেমে তবে পৌঁছতে হবে এই বর্ষা সুন্দরীর কাছে, যার রুপে মোহিত হয়ে সময়ের খেয়াল রাখা হবে না। ফিরতে হবে বর্ষাভেজা স্মৃতি নিয়ে। ঠিক তেমনি ইরুপ্পু ফলসের মোহময়ী রূপেও রয়েছে সেই এক মোহমায়া। জঙ্গলের মাঝে বয়ে চলা জলধারা বর্ষায় প্রাণবন্ত। শীত থেকে বর্ষা যে কোন ঋতুতেই কুর্গ অতুলনীয়।


শুধু প্রকৃতির রূপের আধিক্যে কুর্গের এই প্রতিপত্তি নয়, স্থানীয় মানুষের নিজস্বতায় কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর স্বমহিমায় প্রকাশিত। স্থানীয় মানুষ যারা কুর্গী (কোদাভাস) নামেই পরিচিত, তারা একসময় মাইসোর রাজাদের সৈন্যদলের সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতেও কুর্গ রেজিমেন্ট তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কোদাভু জনজাতির লোকসংখ্যা কম থাকায় পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সেই শৌর্য বীরত্বের ধারক বাহক তারা আজও। তাইত বিশেষ কিছু আর্মস নিজেদের কাছে রাখার জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না এই জনজাতির মানুষদের, শক্তিশালী ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়াতেই তাদের এই বিশেষ অনুমতি। কুর্গের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাদের নিজস্বতা, সেটি কুর্গের প্রতীক। তিনটি অস্ত্র নিয়ে তৈরি এই প্রতীক কিছু বছর আগে ট্রেড মার্কও পেয়েছে। প্রতীকটির মধ্যে রয়েছে ওডিকাথি- এটি একটি বড় ফলার তলোয়ার, কোদাভু জনজাতির বীরত্বের চিহ্ন। পিচে কাথি- ছোট ছুরি, কোমরে গোঁজা যায়, রয়েছে রাইফেল। এই তিন অস্ত্রের মিলিত রূপ কুর্গের প্রতীক। প্রকৃতি থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি সবেতেই কুর্গ অনন্য। দক্ষিণের অন্যতম আকর্ষণ কুর্গ আসতে হলে ব্যাঙ্গালোর কিংবা ম্যাঙ্গালোর হয়ে পৌঁছে, বাসে অথবা ভাড়া গাড়িতে পৌঁছে যেতে হবে। গোটা কুর্গ জুড়ে সাধারণ থেকে লাক্সারি সব বাজেটের হোটেল, হোম স্টে রয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে এই মশলার সুগন্ধী শহরে দু-রাত কাটিয়ে সমুদ্র দর্শনেও যেতে পারেন অথবা রাজার শহর মাইসোর হয়ে উটির পথেও পা বাড়াতে পারেন। বর্ষা কিংবা শীত কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর মন কাড়বে সব ঋতুতেই।

ছবি- কিংশুক সরকার



 

পুরাতত্বের নিদর্শন জটিলেশ্বরে একদিন

 কবিতা বণিক




                                                                                                      
জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির চূড়াভান্ডার অঞ্চলের পূর্বদহে জটিলেশ্বর মন্দির অবস্থিত। কাছেই জলঢাকা নদী। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন এ মন্দির প্রায় দেড়হাজার বছরের পুরোন। মন্দির চত্বরে এক বেশ বড় পুকুর আছে। সেখানেই মাটি থেকে কয়েক ফুট নীচে জটিলেশ্বর শিবলিঙ্গ অবস্থিত। বর্ষায় তিনমাস জলে ডুবে থাকে শিবলিঙ্গ। ভক্তরা মন্দিরের ওপর থেকেই পূজো করেন। গর্ভগৃহে নামা যায় না। গর্ভগৃহের ওপরে নন্দী মহারাজ বিরাজিত আছেন। মন্দির ঘিরে চারপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক দের খননের ফলে পাওয়া কালো পাথরের অনেক দেব দেবী, নর্তকীর মূর্তি খোদাই করা দেওয়াল । কিন্তু শিব মন্দিরের চূড়ো পরে ইট, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দেওয়ালে অনেক ছোট ছোট গর্ত আছে। সেসব গর্তে মৌমাছি, সাপ ইত্যাদি থাকে। মৌমাছিদের বেশ বের হতে ঢুকতে দেখা যায়। মনে হল সত‍্যিই মহাদেবের কাছে সবাই সন্তান। পুরো মন্দির কে লোহার ব‍্যারিকেডে রাখা হয়েছে। বাবা জটিলেশ্বরের কাছে ও কোন ভক্ত তার জটিল বিষয়ের সমস‍্যা জানালে বাবা তা পূরণ করেন। সে কারণেই এখানে মহেশ্বরের নাম জটিলেশ্বর। কথিত আছে জটিলেশ্বরের মাথায় জল ঢেলে জল্পেশে পূজো দিলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। 




জটিলেশ্বর মন্দিরের চারপাশে খননের ফলে পাওয়া উঁচু পাথরের দেওয়ালে প্রচুর দেবদেবী, নৃত‍্যরত গণেশ, হনুমান মূর্তি, নর্তকীর খোদাই করা মূর্তি রয়েছে। মূর্তি গুলো অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও হনুমান মূর্তি, নৃত‍্যরত গণেশ মূর্তি বেশ বোঝা যায়। দেওয়ালের গায়ে মুখ‍্যদ্বারের দুইপাশে দ্বারপালের মূর্তি খোদিত দেখা যায়। মন্দিরের পিছনে পুকুর থেকে শিব, গণেশ, বিষ্ণু, চণ্ডী, বুদ্ধ মূর্তি পাওয় যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিষ্ণু মূর্তি ও দ্বারপালের খোদিত মূর্তি র সাথে গুপ্ত যুগের মিল খুঁজে পান। তাদের ধারণা ৩২০ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তৈরি এই মন্দির। এ সময়টাও গুপ্তযুগের সময়কাল।





 
গুপ্ত যুগের সাম্রাজ্য বলা হয় যে প্রাচীন ভারতের সমস্ত উত্তর ভারত জুড়েই ছিল। এই সভ‍্যতায় ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ , রাজনৈতিক ঐক‍্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন‍্য চর্চিত। ৩২০– ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গুপ্ত যুগকে সুবর্ণযুগ বলা হয়। 





প্রত্নতত্ত্ব হল প্রাচীন কালের মানুষের জীবন যাত্রা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস জানার একটা বিজ্ঞান। মাটির নীচে চাপা পড়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীন নিদর্শন— হাতিয়ার, মৃৎপাত্র, মুদ্রা, অলংকার এবং স্হাপত‍্য ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে খনন ও বিশ্লেষণ করে মানব সভ‍্যতার অতীতকে পুনর্নির্মাণ করে। প্রত্ন অর্থ পুরাতন এবং তত্ব অর্থ বিজ্ঞান। 




জটিলেশ্বর মন্দিরের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব শান্ত ও মনোরম। অনেক বড় বড় গাছ প্রাচীন বটগাছ, পুকুর পাড়ে ভক্তদের বা দর্শনার্থীদের বিশ্রাম বা বসার জন‍্য ব্রেঞ্চ পাতা ,বাঁধানো সেড দেওয়া জায়গা করে দেওয়া আছে। পাশেই আছে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির বা কুণ্ডেশ্বরী মন্দির । কারণ এখানে গর্ভগৃহে পোড়ামাটির ইটের তৈরি কুণ্ড আছে কোন বিগ্রহ নেই। মা কামাখ‍্যাকেও এখানে দেবী মানা হয়। এখানে ভক্তরা মাকে স্মরণ করে ধূপ দীপ, সিঁদুর দান করেন। একটু দুরে , রাধাকৃষ্ণ মন্দির সেখানে মদন মোহনের বিগ্রহ , গৌর, নিতাই, ইত্যাদি আছে, পথ চলার সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। বাঁধানো প্রাচীন বটগাছে ভক্তদের ভক্তি পূর্ণ প্রণাম ও মনোস্কামনা জানিয়ে গাছের ডালে লাল সুতো বাঁধা , পরিবেশের এ দৃশ‍্য যেন স্বর্গীয় প্রেম পূর্ণ শান্তির বার্তা দেয়। যুগে যুগে কত কোটি কোটি ভক্তের পূজো নিয়েছেন তাদের মনোস্কামনাপূর্ণ করেছেন। তাইতো আজও তিনি জাগ্রত। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা সত‍্যি।



শ্রাবণ মাসে , শিবচতুর্দশী উপলক্ষে ফাল্গুন মাসে , চৈত্র মাসে বারূণী স্নান উপলক্ষে আজও প্রচুর ভক্তদের ঢল নামে।