যেখানে কৃষ্ণচূড়া এখনও ফোটে
Tuesday, June 2, 2026
বৈজয়ন্তীমালা
চিত্রা পাল
একটা সিনেমা পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম সেদিন। আজকাল সিনেমা পত্রিকা খুব একটা দেখি না। নাতনী কোথা থেকে নিয়ে এসেছে, বোধ হয় ফেরার পথে কোন স্টল থেকে বা ওর অফিসের কোন কলিগে কাছ থেকে,বাড়িতে ফিরে আমার হাতে দিয়ে বললো,এটা দেখতে পারো, ভালো লাগবে। ইংরেজি সিনেমা পত্রিকা, সবই উঠতি তারকাদের কাহিনী আর ছবি দিয়ে ভরা, আমি এদের সিনেমা দেখিনি,ওদের কার্যকলাপের সাথেও আমি পরিচিত নয়,কাজেই ওই ছবি দেখাটুকুই সার আর কিছু নয়।পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা পাতায় চোখ আটকে গেলো,দেখি, বৈজয়ন্তীমালা আর আমাদের অজিতেশ বন্ধোপাধ্যায় এর ছবি, খুব চেনা চেনা মনে হতে ভালো করে পড়তে চেষ্টা করে দেখলুম ওটা আমাদের সময়কার হাটেবাজারে সিনেমার ছবি। তখনকার সিনেমা, যেমন কাহিনীকার তেমন পরিচালক তেমন অভিনেতা অভিনেত্রী সবই উচ্চমানের।আর সব উৎকর্ষের সমাধানে ছবিও হতো চমৎকার। আমি আমার মেয়েকে বললাম এই ছবিটা দেখিয়ে, দ্যাখ, তখন বম্বে থেকে সব বাংলায় সিনেমা করতে আসতো। এখন তো উলটো দিকে যেতে চায় সবাই। আমার মেয়ে ছবি দেখে বললো, `মা, এতো বৈজয়ন্তীমালা। কোলকাতায় গিয়ে বাংলা সিনেমা করেছে?` হ্যাঁ,শুনে বলে, `তুমি একবার বলেছিলে না, তোমরা কার যেন নাম দিয়েছিলে বৈজয়ন্তীমালা?` আমি বললাম, `হ্যাঁ, তোর মনে আছে?আমার তো মনে আছে, সে তো কবেকার কথা।`
তখন সবে এসেছি উত্তরবঙ্গের এই জেলা শহরে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।একেবারে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্যে। থাকতাম এক কলেজ ক্যাম্পাসে। কলেজ ক্যাম্পাসের আবাসিকরা প্রায় সকলেই এখানে নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়া তরুণ বা যুবক।দু এক মাস অন্তর অন্তরই দক্ষিণ বঙ্গ থেকেকেউ না কেউ এখানে আসছে তখন কাজে যোগ দিতে। সে সময়টায় আবার বাংলা দেশ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে বেশ কিছু জন এ দেশে চলে আসছে। এসে নীচু জমি, জলা জায়গা এমন সব জায়গা কিনে,সেটাও আবার যাদের সঙ্গতি আছে এমন জন সব ঘর বাড়ি বানিয়ে থাকতেও শুরু করেছে।এমনই অঞ্চল থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে এলো একটি বউ।তাকে নিয়ে এলো এখানকারই এক বাড়িতে কাজ করে সে।তাকে আমি বলেছিলাম বলে।বৌটিকে আমি চিনিনা,জানি না।তার কথাবার্তা সবই ওদের জায়গার ধরণের। ঘরের কাজ যে কতটা জানে, তা জানি না, কিন্তু আমার খুব প্রয়োজন তাই তাকেই আমার ঘরের কাজে বহাল করলাম। কারণ, এক আমার মেয়ে তখন খুবই ছোট, কয়েক মাসের আর আমার স্বামীর একজন পরিচিত,কলকাতা থেকে আসছেন এখানে কাজে যোগ দিতে্।তিনি প্রথমে আমাদের বাড়িতে থাকবেন। এখন দুজন নতুন মানুষই এলো আমার সংসারে এক সঙ্গে।
প্রায় মাসখানেক পরে ও একবার দুদিনের ছুটি চাইলো। আমি বললাম,দুদিন আমার খুব অসুবিধে হবে গো, তুমি একদিন নাও,আমি কোন রকমে চালিয়ে নেবো। বলে ঠিক আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আসবে না ক্যানো গো? বলে আমার সোয়ামী আসবে যে বাংলা দেশ থেকে তাই। ওর যে আবার আসলেই সেবা নাগে। সব হাতে হাতে দিতে হয় তাই।
ও কিন্তু দুদিনই এলো না। এসেই অবশ্য বললো,কিছু কইওনা বৌদি,ওরে ফেলায়ে আসতে পারি নাই।আমি বললাম,দ্যাখোতো,বাচ্ছা নিয়ে আমিযে পেরে উঠতে পারি না। তারপরে নিজেই বলছে,এই যে আমি তোমার বাসায় কাম কাজ করি,দুইডা পয়সার জন্যি তো। তাও কতো কথা। আমারে কইসে, যে বাবুডা আইসে না, একা থাহে,ওর লগে এক্কেরে কথা কইয়ো না। আমি বললাম,ক্যানো?ও বলে, কি জান, ভালা না খারাপ কে কইতে পারে, তার ওপরে ওরে বাঁধ দেবার কেউ নাই,তাই কুনো কথাই কওনের দরকার নাই। আমি বললাম, ঠিক আছে, তোমার কাজ করো।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আমরা তিন জনে ওর এই সব কথা নিয়ে খুব হাসাহাসি করলাম। উনি শুনে বললেন, বাব্বা, কে একেবারে বৈজয়ন্তীমালা নাকি? সেই থেকেই আমরা ওর নাম দিয়েছিলাম বৈজয়ন্তীমালা। এটা ও নিজেও বুঝতো না, আর বাইরের কাউকেও বলিওনি।
বৈজয়ন্তী মালার আসল নাম কি জানি না। ওর পাঁচ ছেলেমেয়ে,লক্ষী মালতী দুই মেয়ে, তবে আমি ওকে লক্ষীর মা বলেই ডাকতাম।আর তিন ছেলে বড়টা মাধব সে সবার বড় আর ছেলে দুটো যমজ, নাম গৌর নিতাই।
বড় কষ্ট করে এখানে বসত করেছিলো ও। আমি বললাম, তুমি এইখানে এসে নিজে জমি কিনেছো?বলে, হ্যাঁ ।আমি কোনরকমে খোঁপার মধ্যি করে, মেয়ে দুডার চুলের মধ্যেকরে কিছুডা সোনাদানা আনছিলাম, সে সব বেচায়ে দিলাম। এমনকি ছেলে মেয়ের রুপার যা কিছু ছিলো, যা দুই চারটা পয়সা পাওয়া যায়, সব।বড় ছেলেটাকে আমাদের ওখানের চেনাজানা সে এখানে ছোট সোনা রুপার দোকান দিসে, ওর দোকানে বছর ভিতে কাজে দিসি।ওই যে মাধপের বাপ আইলো না, ত্যাখন এই জলা জমিটাই কিনসি। আমি বললাম সব বেচলেও তোমার জমির দাম হোলো? না সব হয় নাই। মাধপের বাপ কইছিলো, ছাড়ান দে। অত টা জমি লাগবোনা। কিন্তু আমি বলি, তুই বুঝিস না, জমি থেকে সব হবে,তাই মাধপের মালিকের কাছ থেকে অতি কষ্টে সুদে টাকা ধার নিয়ে ওর বাপটারে দিয়া কেনা করাইলাম।
মাস দুএক পরে ও আমার থেকে কিছু আগাম টাকা প্রায় জোর করেই নিলো। শুনলুম ও গরু কিনেছে। আমি বললাম, তুমি কখন দেখবে? বলে, চারটা ছেলেমেয়ে তো বাড়িতেই আছে,ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ইস্কুলে দিলাম, প্রায়ই ওরা যায় না। বরং গরু চরাক। আমি ভাবলাম,ওর যাই হোক এই বুদ্ধিটা ভালই, ছেলেমেয়েকে ও ওদের মতো করেকাজে ভিড়িয়ে দিয়েছে।এবারে ও করলো কি আমি ওকে যে জলখাবারটা দিতাম, সেটা ও বাড়ীতে নিয়ে যেতে শুরু করলো আমারথেকে একটা পুরনো দুধের কৌটো চেয়ে নিয়ে। আমি বললাম, তুমি কাজ করো, তোমার কিছু খাওয়া দরকার তো। ও বলে আমি বাড়ি থেকে দু গা পান্তা খ্যায়া আসি। ওইতেই হয়া যায় এইখানে আসিয়া চাটুক খাই, ওইতে বেশ চলে যায়।
কদিন পরে লক্ষীর মা এসে বললো, `বৌদি, তুমার দেওয়া খাবারটা খুব কাজে দিসে। আমি বলি কি করে? আমি গৌর নিতাইরে কইসি, তুরা গরুগুলা দেখভাল কর, আমি তোদের জন্যি দেখবি, কি সব আনবো। ওরা, না বউদি, গরুগুলাকে দেখে চরায়,কার ক্ষেতে জানি মুখ না দেয়,এইডা করে,আর আমি বাড়িতে ফিরত্ যাবার আগ দিয়ে বড় আস্তায় আসিয়া বসে থাকে। যেই গলিটুকু পার হয়ে বড় আস্তার উঁচাটায় উঠি, আমারে দেখতে পাইয়া,দুইজনে দৌড় পেড়ে আসিয়া এই কৌটা টা ছোঁ মারিয়া লইয়া যায়। তারপরে দুই ভায়ে মারপিট, কে আগে ডিবাটা নিবে।` আমি বলি তুমি তো ভালো ফন্দি করেছো।
বছরখানেক পরের থেকে ওর আসা-যাওয়া বড়ই এলোমেলো হতে থাকে। তিন চারদিন আসেনা, খোঁজও নেই। আমি ভাবছি ওকে বাদ দিয়ে দেবো,তখন হঠাৎ ওর উদয়। এসেই একেবারে মুখ কাঁচুমাচু করে খুব বিনীতভাবে দোষ স্বীকার করে বলে, `আমি আসতে চাইছিলাম। কিন্তু ওই মাধপের বাপে কইল ঘর করসি, এবার, একবার কেত্তন দিই।ওই সব কাজেতো কয়দিন গেলো,ও বৌদি একডা ভালা খবর আসে। এবার থেকে মাধপকে কিছু হাতে, দেবে ওরা। তয় একটা কথা কই,একদিন আমার ঘরটা কেমুন হইল একবার দেখবার আসেন। আমি বললাম,ঠিক আছে, সে হবেখন, তুমি এখন তোমার কাজ করো।`
প্রায়ই ওর ঘর বাড়ি দেখতে যাবার কথা বলে,আমার আর হয়ে ওঠে না। এক হেমন্তের দিনে আমার পাশের কোয়ার্টারের ছবিদিকে নিয়ে ওর বাড়ি দেখতে গেলাম। টিনের চালার দুখানা ঘর,তবে ভিতটা উঁচু করেছে বর্ষায় জল ওঠে বলে।ঘরের লাগোয়া রান্নাঘর আর তার দাওয়ায় জ্বালানি কাঠকুটো ডাঁই করা।একখানা ধান কোটা চিঁড়ে কোটা ছামও রয়েছে। বলে, `বৌদি এবার চিঁড়া কুটলে তোমারে দিবো। খায়া দেখো কি মিষ্ট সোয়াদ।` বেশ গোবর লেপা পরিষ্কার উঠোন, ওদিকে গোয়াল ঘর। আমার সবচেয়ে ভালো লাগলো ওদের বাড়ির গেটের দুধারে, অপরাজিতা আর মাধবীলতা লাগানো। গাছ দুটো গেটটাকে আলো করে আছে। গায়ের অলংকার চলে গেলেও ও আজ প্রতিষ্ঠার এক নতুন অলংকারে ভূষিত, সেটাই আজ ওকে আলোকিত করেছে এ বড় কম কথা নয়। এ যেন পুজোর পরে দেবতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা। সংগ্রাম এর পরে অস্তিত্ব রক্ষা।
এবারে বড় জব্বর শীত পড়েছে,তার ওপরে রোজ সকালে ঘন কুয়াশায় চারদিক লেপেপুঁছে একাকার। তার মধ্যে আবার শুরু হলো ওর না আসা। এতদিন ও বিরক্ত হতো, এবার আমি বিরক্ত।আমি ঠিক করলাম, লক্ষীর মা কে বিদায় জানাবো, আর পারা যাচ্ছে না। তিন দিন পরে ওর উদয় যেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রুটের বাস পাবার মতো। শুকনো মুখ, কোটোরগত চোখ জানান দিচ্ছে অনিয়ম আর ক্লান্তির কথা। যে জীবনটা সেজে উঠতে যাচ্ছিলো,সেখানে প্রতিবাদী মেঘের ছায়া।আমি সব রাগ জল দিয়ে স্লেট মোছার মতো মুছে ফেলে অত্যন্ত নরম গলায় বললাম, `কি হয়েছে তোমার?` কাঁদতে কাঁদতে বলে, `বউদি আমার লক্ষীরে আমি হারায়ে ফেলসিলাম।` আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি,` কি করে?` বলে, `এই তো তিন চার মাস হলো মেয়েটা ফুল পাইসে,এই কয়দিন কুথায় যে গেল।` পরে ওর কথায় যা শুনলাম, ওর মেয়েকে দু তিন দিন কোথাও খুঁজে পায়নি। ময়নাগুড়ি থানা থেকে খবর পেয়ে মাধব ওকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে এসেছে। এখানে আসার পরে বাড়িতে খুব মার খেয়েছে ওর কাছে। এতো কাঁদছে এখন সেটা মেয়েকে মেরেছে বলে না ফিরে পেয়েছে বলে বুঝতে পারিনি। কিন্তু চোখের জলের তোড়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে যাবে মনে হয়।
এরপর ট্রান্সফার হবার খবরে আমি যারপরনাই খুশী পুলকিত। আমি তখন নিজের ঘরের জিনিস গোছাতে ব্যাস্ত। দুমাসের মাথায় চলেও এলাম এদিকে,ভেসে গেলাম আপন্ ধারায়। বহু বছর বাদে আবার সুযোগ হলো ওই টাউনে আসার। এই শহরে এখন পুরনো ছবি মুছে ফেলার পালা।অনেকখানি খুঁজে পেতে যখন আন্দাজে ওর বাড়ির কাছে পৌঁছলাম তখন ভর দুপুর। লক্ষীর মা বলে খুঁজে না পেলেও গৌর নিতাই এর দেখা পাওয়া গেলো। তারা এখন ভরপুর যুবক। তাদের আমাকে চেনার কথাও নয়। আমি বললাম, `লক্ষীর মায়ের এই বাড়ি না?` আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। ওরা ঠিক চিনতে পারলো না। শুধু বলে, `ও এখানে না থাকে।` অবাক হয়ে বললাম, `কোথায় থাকে?` `ওই শশ্মানকালী মন্দির চত্বরে`,বলে উলটো দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলো।
ওখানে গিয়ে খুঁজে পেতে যখন ওর কাছে পৌঁছলাম, তখন বেলা দুপুর গড়িয়েছে। দেখলুম, ও ঠাকুরের পট, সিঁদুর এসব বিক্রি করে।ওকে দেখে চিনতে পারিনি। ওর চেয়ে ওর গলার স্বর আমাকে চিনিয়ে দিলো। আমি বললুম, `তোমার লক্ষীর খবর কি,তোমার গৌর নিতাই`? ও এককথা বলে, `সবাই ভালো আছে, মা নেওনা মা ঠাকুরের ছবিখান, এক খান সিদুর, তোমার ভালো হবে মা, তুমি খুব ভালো থাকবে।..` বুঝলাম,ওর অতীত এখন পর্দার পেছনের মতো,যেখানে কোন আলো নেই।
আমি হতাশ হয়ে ফিরে এসেছিলাম। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। সিনেমা ম্যাগাজিনের রঙচঙে ছবি্র আড়ালের আঁধারের মতো কিছু একটা গ্রাস করলো আমাকে। যে কষ্ট করে বাড়ীর ভিত পত্তন করলো,তারই সব চলে গেলো বিস্মৃতি অতলে । তবু একদিন জলা জমি ওর হাতে যে আবাদি হয়েছিলো সেই ছবিটাই রেখে দিলাম যত্ন করে, তার সঙ্গে ওর নামটাও।।
স্বপ্ন কী কখনও সত্যি হয় ?
হাওয়া বদল
ক্রমশঃ একাকী...
জয়িতা সরকার
দূরের নীল পাহাড়ে মেঘেদের নিঃশর্ত বন্ধুত্ব, আরব সাগরের নোনা বাতাসের খবর আনে সাদা-কালো মেঘের দল। হঠাৎ ছুটি কিংবা টানা তিনদিনের লং উইকেন্ড, দেশের আই টি রাজধানীর ট্রেন্ড ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া। কংক্রিটের শহর থেকে পালিয়ে ভিড় জমানো পশ্চিমঘাটের কোন এক নির্জনতায় কিংবা আরব-বঙ্গোপসাগরের বালুকাবেলায়। তবে সত্যি নিস্তব্ধতা খুঁজে পাওয়া অসাধ্য সাধন, চলতি হাওয়ায় গা না ভাসানো আমরাও মাঝেমাঝে ওই ভিড়ে পা মেলাই। লং উইকেন্ড ট্রেন্ডের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব রেখেই চলি। যা হোক অনেক ভূমিকা করেছি, এবার ফিরি মূল আখ্যানে। বহুদিন বন্ধুরা কোথাও যাইনি, অগত্যা সবার ছুটির কথা মাথায় রেখে ১ লা মে-র ছুটিতে প্ল্যান করা হল। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ছ'টা, ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে মাইসোর যাওয়ার রাস্তায় বিখ্যাত নাইস রোডে তখন প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন। বুঝলাম সকলেই ছুটছি আমরা। নাইস রোড ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর মাইসোর এক্সপ্রেসে ওয়েতে উঠতেই গাড়ির সংখ্যা বলছে আমাদের সকলের গন্তব্য প্রায় এক।
এবারের গন্তব্যে ব্যাঙ্গালোরবাসীর আনাগোনা অহরহ। আমাদেরও দ্বিতীয়বার, বন্ধুদের যে কতবার তা ওদেরও মনে নেই। শুরুতেই বলেছি এই জায়গার প্রধান বৈশিষ্ট্য মেঘের খেলা, হালকা বৃষ্টি, তবে বর্ষার ভয়াবহতা খবরের শীর্ষে থাকে ফি বছর। কোথাও যেতে হলে এই ভিড়ের মাঝে একটু আড়াল খোঁজার চেষ্টা চলে আমাদের। নিরাশ হয়েছি খুব কম, শান্ত প্রকৃতি ঠিক খুঁজে নেয় আমাদের। কফির রাজ্যের সেরার তালিকায় কুর্গ ছিল এবারে আমাদের গন্তব্য। তবে কফির উষ্ণতার থেকেও কুর্গের বাতাসে মিশে থাকে কালো মরিচ আর এলাচের গন্ধ। প্রকৃতি জুড়ে মশলার সুগন্ধি, শহর ছেড়ে একটু দূরে গেলেই গন্ধের নিবিড়তা আরও গাঢ় হয়। কফি থেকেও কুর্গের এই মশলা মেশানো বাতাস আমার ভীষণ প্রিয়। পশ্চিমঘাটের নিজস্ব একটা রং আছে, কুর্গও তার ব্যতিক্রমী নয়, পুরো পাহাড় যেন নীলচে সবুজে স্নাত। দূরের পাহাড় দেখলে মনে হয় কেউ যেন নীল রং ঢেলে দিয়েছে, নীল পাহাড়ের দেশ বললে অত্যুক্তি নয়।
ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে কুর্গের পরিচয় 'স্কটল্যান্ড অফ ইন্ডিয়া' হিসেবে। তুলনা না রূপের বিশেষণ তা নিয়ে তর্কে জড়ানো বৃথা, বরং বর্ষার কুর্গের একটা মোহময়ী রূপ আছে। বর্ষার কুর্গ রবি ঠাকুরের গানকে টক্কর কেটে বলতে পারে, 'আমি রূপে তোমায় ভোলাবো'। এক নীলচে সবুজ চাদরে নিজেকে মুড়ে ছোট বড় জলধারায় ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ উঠিয়ে নীচে নেমে আসা, পাহাড়ের গা জুড়ে বনফুলের বাহারি সৌন্দর্যে কুর্গ তখন অপার্থিব সুন্দরী। এবার খানিকটা গরম বাতাস থাকলেও কুর্গের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ভরা বর্ষায়। রাজা সিটের সিঁড়িতে দূরের মেঘ কাছে এল বৃষ্টি হয়ে, এমন অকৃত্রিম প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা অবর্ণনীয়৷ রাজা সিট- কুর্গের অন্যতম দ্রষ্টব্য, সারা বছর মেঘ রোদকে সঙ্গী করে ভিড় সামলে চলেছে নিয়ম মেনে। সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটাই কুর্গের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা। কোদাগু রাজারা এখানে বসেই নাকি প্রকৃতির রূপ উপভোগ করতেন। এমনকি মাইসোরের রাজাদেরও গ্রীষ্মাবকাশের অন্যতম স্থান ছিল কুর্গ।
কুর্গ মানেই ছোট বড় ঝরনার সাদা ফেনিল জলরাশি। শহর লাগোয়া বিখ্যাত জলরাশি আব্বে ফলস। কফি বাগানের মাঝ বরাবর সিঁড়ি নেমে গিয়েছে, বর্ষায় বেশ উচ্ছল, তবে সারাবছর এর ধারা বহমান। ভিড় এড়িয়ে যাওয়াই যেহেতু আমাদের লক্ষ্য, তাই লং উইকেন্ডে ওইমুখো আমরা হয়নি। দু'দিনের ঠিকানা যেখানে ছিল, ঠিক তার থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে কুর্গের অফবিট বলতে যা বোঝায় সেই কোটে আব্বে ফলস ছিল আমাদের দর্শনীয় স্থানের তালিকায়। কিন্তু এই ভিড় পৃথিবীতে অফবিট শব্দটাই থাকা উচিত কি না তা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণটা খুবই পরিষ্কার, লোক সমাগম এখানেও কম ছিল না। খানিকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা চললাম মান্দালপাট্টির দিকে। কুর্গের অফরোডিং রুট, এই মান্দালপাট্টিও সূর্যোদয় দেখার আর্দশ স্থান। ভোরবেলা স্থানীয় জিপ ভাড়া করে পৌঁছাতে হয় এখানে। সবুজ পাহাড়ের মাঝে প্রথম আলোকরেখা যা মনে থেকে যাবে অনেকদিন, সঙ্গে মনে থাকবে রাস্তার বীভৎসতা। শেষের পাঁচ কিলোমিটারের পর অপার সৌন্দর্য থাকলেও রাস্তা পরীক্ষা করবে আপনি কতটা স্ট্রং। এবার আমরা সে পথেও পা বাড়ায়নি। খানিকটা পথ গিয়ে ফিরে এলাম মাদিকেরী ফোর্টের সামনে। প্রথমবার ফোর্ট বন্ধ থাকায়, আর এবার শহরের ভিড় দেখে জানার চেষ্টাও করিনি ফোর্ট বন্ধ নাকি খোলা? যা হোক এক চক্কর শহর ঘুরে আমরা ফিরে এলাম হোম স্টে তে। বিকেলে আমাদের নতুন একটি জায়গায় সূর্যাস্ত দেখার পরিকল্পনা। হোম স্টে-এর মালিক তার জিপেই আমাদের নিয়ে রওনা হল স্বল্প পরিচিত কোটে বেট্টা-র পথে।
রাস্তা বলতে পাথুরে মাটির খাড়াই পথ। দক্ষ হাতে পাকদণ্ডীর গতিবিধি বুঝে জিপ গিয়ে থামল সানসেট পয়েন্টে। স্থানীয় লোকেদের আনাগোনার চিহ্ন স্পষ্ট হলেও ট্যুরিস্ট যে খুব বেশি আসেন না তা বোঝা গেল, আমরা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন দলের দেখা পেলাম না। আসলে কুর্গ শহর থেকে খানিকটা দূরে এই জায়গা। দূরে পাহাড়ের সারি, হালকা বাতাসে বুনো গন্ধ ভেসে আসছে, সামনে ঘন জঙ্গল, বেশ খানিকটা পথ হাঁটলাম, সামার লিলি ফুটে রয়েছে যত্রতত্র, নাম জানা আরও কিছু ফুলের রংয়ে মুগ্ধ হতে বাধ্য। পশ্চিমঘাট পর্বতে এলে এরকম নানা অজানা ফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। জঙ্গল ঘুরে অপেক্ষা করছি সূর্যাস্তের, কিন্তু আকাশের দখল নিয়েছে মেঘের দল, অগত্যা ফেরার পালা। হোম স্টে তে পৌঁছাতে সন্ধ্যে নেমে এলো। বন্ধুরা মিলে যাওয়া মানে আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, আমরাও ব্যতিক্রমী নই, কখন যে ঘড়ির কাঁটায় ১১ টা বেজে গেল, রাতের খাবার খেয়ে যে যার মত বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
এই তো হলো কিছুটা চেনা, খানিকটা অচেনা কুর্গ ভ্রমণের গল্প, তবে এখানেই শেষ নয়। কুর্গ মানে তালাকাবেরী, দক্ষিণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কাবেরীর উৎপত্তিস্থল, দর্শনীয় স্থানের তালিকায় প্রথম সারিতে। কুর্গ আর দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প সমনাম, হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আর্কষণের শীর্ষে। কুর্গ যেতে পেয়ে যাবেন নামড্রোলিং মনেস্ট্রি। দেশের অন্যতম টিবেটিয়ান শিক্ষাকেন্দ্র। বিরাট মনেস্ট্রি চত্বরে প্রতিদিন পর্যটকের ভিড়। কুর্গ বর্ষা সঙ্গে জলপ্রপাত একাসনে সমাসীন। বর্ষার কুর্গ যেমন মহোময়ী অপরূপা, তেমন অননুমেয়। কখন রুপের বীভৎসতা গ্রাস করবে পাহাড়ে ঘেরা এই ছোট শহরকে তা প্রকৃতিই জানে। তবে বর্ষা এলে কুর্গের তুলনা শুধু কুর্গ। শহর থেকে খানিকটা দূরে মাল্লালি ফলস এর সৌন্দর্য এককথায় নৈসর্গিক। অনেকটা পথ নীচে নেমে তবে পৌঁছতে হবে এই বর্ষা সুন্দরীর কাছে, যার রুপে মোহিত হয়ে সময়ের খেয়াল রাখা হবে না। ফিরতে হবে বর্ষাভেজা স্মৃতি নিয়ে। ঠিক তেমনি ইরুপ্পু ফলসের মোহময়ী রূপেও রয়েছে সেই এক মোহমায়া। জঙ্গলের মাঝে বয়ে চলা জলধারা বর্ষায় প্রাণবন্ত। শীত থেকে বর্ষা যে কোন ঋতুতেই কুর্গ অতুলনীয়।
শুধু প্রকৃতির রূপের আধিক্যে কুর্গের এই প্রতিপত্তি নয়, স্থানীয় মানুষের নিজস্বতায় কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর স্বমহিমায় প্রকাশিত। স্থানীয় মানুষ যারা কুর্গী (কোদাভাস) নামেই পরিচিত, তারা একসময় মাইসোর রাজাদের সৈন্যদলের সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতেও কুর্গ রেজিমেন্ট তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কোদাভু জনজাতির লোকসংখ্যা কম থাকায় পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সেই শৌর্য বীরত্বের ধারক বাহক তারা আজও। তাইত বিশেষ কিছু আর্মস নিজেদের কাছে রাখার জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না এই জনজাতির মানুষদের, শক্তিশালী ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়াতেই তাদের এই বিশেষ অনুমতি। কুর্গের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যা তাদের নিজস্বতা, সেটি কুর্গের প্রতীক। তিনটি অস্ত্র নিয়ে তৈরি এই প্রতীক কিছু বছর আগে ট্রেড মার্কও পেয়েছে। প্রতীকটির মধ্যে রয়েছে ওডিকাথি- এটি একটি বড় ফলার তলোয়ার, কোদাভু জনজাতির বীরত্বের চিহ্ন। পিচে কাথি- ছোট ছুরি, কোমরে গোঁজা যায়, রয়েছে রাইফেল। এই তিন অস্ত্রের মিলিত রূপ কুর্গের প্রতীক। প্রকৃতি থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি সবেতেই কুর্গ অনন্য। দক্ষিণের অন্যতম আকর্ষণ কুর্গ আসতে হলে ব্যাঙ্গালোর কিংবা ম্যাঙ্গালোর হয়ে পৌঁছে, বাসে অথবা ভাড়া গাড়িতে পৌঁছে যেতে হবে। গোটা কুর্গ জুড়ে সাধারণ থেকে লাক্সারি সব বাজেটের হোটেল, হোম স্টে রয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে এই মশলার সুগন্ধী শহরে দু-রাত কাটিয়ে সমুদ্র দর্শনেও যেতে পারেন অথবা রাজার শহর মাইসোর হয়ে উটির পথেও পা বাড়াতে পারেন। বর্ষা কিংবা শীত কর্ণাটকের এই পাহাড়ি শহর মন কাড়বে সব ঋতুতেই।
ছবি- কিংশুক সরকার
পুরাতত্বের নিদর্শন জটিলেশ্বরে একদিন
কবিতা বণিক
















.jpg)



.jpg)
.jpg)







