Thursday, July 2, 2026



বর্ষা মেঘে ভেসে ভেসে/ যাই ছুটে মেঘ-পাহাড় দেশে 

গৌতমেন্দু নন্দী


 "মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর 

        মন খারাপের দিস্তা 
        মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়
        ব্যাকুল হলে দিস্তা......."

    চারচাকা "আই-টেন" গাড়িটি খাপরাইল মোড় থেকে মিরিকের দিকের রাস্তায় চলতে চলতে শিমুল বাড়ি এসে মিরিকের রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে রোহিনী র দিকে বাঁক নিতেই দূর পাহাড়ের নিসর্গতায় মুগ্ধ হয়ে গুনগুন করে গেয়ে ফেললাম উপরোক্ত চারটি লাইন। এমন মেঘলা দিনে পাহাড়ি পথে কুয়াশাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চলতে আমাদের ডুয়ার্স বাসীদের এর থেকে প্রাসঙ্গিক কথা ও সুরে সমৃদ্ধ গান আর কী হতে পারে!  




       কয়েক বছর আগেও পাহাড়ের কোলে অযত্নে পড়ে থাকা ছোট্ট জনপদ রোহিনী হয়ে কার্শিয়াং , দার্জিলিং যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই জনপদ রোহিনী আজ  কার্শিয়াং-দার্জিলিং যাওয়ার সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয় পথের মাঝে এক জনপ্রিয় পাহাড়ি জনপদ।  বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন হোমস্টে, হোটেল ও রেস্তোরাঁ নিয়ে দিন দিন জমজমাট হয়ে ওঠা এই রোহিনী এখন কার্সিয়াং, দার্জিলিং পর্যটকদের কাছে রাত্রি যাপনেরও ঠিকানা হয়ে উঠছে। রোহিনী লেক এবং রোহিনী ঝোরা (ওয়াটার ফলস্) ইতিমধ্যেই বেশ পর্যটক প্রিয় হয়ে উঠেছে।  




       
বর্ষায় পূর্ণরূপে ও সশব্দ গর্জনে পাহাড়ের মাথা থেকে আছড়ে পড়ছে রোহিনীর এই জলপ্রপাত।  চড়াই পথের পাশে নজরকাড়া এই দৃশ্যকে পাশে রেখে পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পথ ধরে যখন কার্শিয়াং  ঢুকছি তখন বাঁদিকে পাহাড়ের কোলে শহরের নাগরিক চিত্র প্রায় পুরোটাই  ভাসমান মেঘের আড়ালে। কার্শিয়াং ঢুকতেই দৃশ্যমান সেই বহু দেখা উঁচু টাওয়ারটির প্রায় পুরোটাই ভাসমান মেঘের আগ্রাসনে।  শীর্ষ দেশের কিছুটা অংশের সাথে  মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতেই কার্শিয়াং স্টেশনের কাছে চলে এলাম। স্টেশনের ব্যস্ততাকে  পাশে রেখে একটু এগিয়েই দার্জিলিংএর দিকের হিলকার্ট রোড ছেড়ে ডানদিকে পাহাড়ি চড়াইপথ ধরলাম। বৃষ্টি, যানজট আর সংকীর্ণ পথের  প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়েই আমার গাড়ির চালক  শান্ত স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সাবধানে উঠতে লাগল ডাউহিল পাহাড়ের দিকে। শহর ছেড়ে নির্জনতার দিকেও  বাইক, স্কুটার আর চার চাকার তীব্র যানজটে ঝুঁকিপূর্ণ  যাত্রাপথ বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! আর সময়ের সাথে সাথেই নগরায়নের কোপে উধাও দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। কংক্রিটের জংগল এই  পথেও দেখতে পাব ভাবিনি। কার্সিয়াং থেকে প্রায়  দশ-বারো কিঃমিঃ এই খাড়া পথের অর্ধেকের বেশি  পথ অতিক্রম করার পর অবশেষে সেই কাঙ্খিত প্রকৃতির সন্ধান পেলাম। কংক্রিটের জংগল উধাও হয়ে দুই পাশে আবির্ভূত হতে লাগলো  ফার,পাইনের প্রত্যাশিত সবুজ প্রকৃতি! মাঝে মাঝে ঝুলন্ত মেঘের দল এসে কেড়ে নিচ্ছে সেই সবুজতা। তখন মনে হচ্ছে যেন এক মায়াবী সবুঝ-ধুসরের  জগতে প্রবেশ করছি। যত এগোচ্ছি ততই পাইন-ফার  আর দোদুল্যমান মেঘের খুনসুটি যেন বাড়তে লাগল  আর গ্রাস করতে লাগল এক সবুজ নৈঃশব্দ্য। ঝিরঝির বৃষ্টি, নির্জন-নিস্তব্ধতার মধ্যে চারপাশের পাইনের জংগল এক মায়াবী রহস্যময় হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম এইজন্যই কি ডাউহিল "হন্টেড প্লেস"?! এই গা ছমছমে ভৌতিক পরিবেশের জন্যই কি এই পাহাড়ি এলাকা নিয়ে এতো প্রচলিত গল্প! 




কার্শিয়াং থেকে প্রায় ২০০০ ফুট এই উচ্চতায়  একসময় নাকি স্থানীয় ভাষায় "ডাও" নামে কোন পাখির ডাকে জায়গাটি মুখরিত থাকত। সেই "ডাও"থেকেই নাকি এই জায়গার নাম "ডাওহিল" বা  "ডাউহিল"। মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশার এই রহস্যাবৃত পরিবেশের মধ্যেই দেখলাম এখানকার বিখ্যাত সরকারী স্কুল---ডাউহিল উচ্চবিদ্যালয়। শিল্প-স্থাপত্যে দৃষ্টিনন্দন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মেয়েদের জন্য। এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও এর কাছেই ছেলেদের জন্য তৈরি  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান "ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাইস্কুল"-এ বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যার নেপথ্যে ও সেই  মনগড়া ভৌতিক গল্প। এই অপপ্রচার কারীদের রুখতেই নাকি এখন এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে  সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ।




       
রহস্যময় এই পাহাড়ি পরিবেশের আলোছায়া পথ ধরে টিকিট কেটে ঢুকে গেলাম পাইন জঙ্গলের আরণ্যক গভীরতায়। ঘন পাইনের অরণ্য পথ ধরে মাথার উপর ঝুলন্ত মেঘদের নিয়ে প্রায় পুরোটাই চড়াই পথে দুই কিলোমিটার অরণ্য পথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছোলাম আরও গভীর নিবিড়তায় এক পার্কে। প্রায় জনশূন্য সেই উদ্যানেও দেখলাম "সেল্ফি জোন" নীল রংয়ের বড় বড় অক্ষর ব্লকে লেখা সেই চিরপরিচিত শব্দবন্ধ --" I LOVE  DOWHILL.."--আজকাল প্রায় সমস্ত পর্যটন স্থলেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী,---এই "ভালোবাসা"র চিহ্নটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। গা ছমছমে আবহের মধ্যেও এই সেল্ফি জোন দেখে  কিছুটা " জনপদের  আলো " যেন খুঁজে পেলাম। 

       পাইন ফরেস্টের ঘন অরণ্যে  দিনের বেলাতেও কুয়াশাময় অকাল সান্ধ্য নির্জনতায় স্বাভাবিক ভাবেই অরণ্য পথ হয়ে যায় "ডেথ রোড" বা মৃত্যু উপত্যকা।খুব অনায়াসেই তৈরি হয়ে যায় গা ছমছমে "স্কন্ধ কাটা" ভূতের গল্প বা "রক্ত চোখ"এর ভীতি প্রদর্শন ! "ডাউহিল" বা "মর্গান হাউস" এর "টি আর পি" এতে বাড়ে বৈ কমে না।  পাইন,ফার, দেবদারু ঘেরা এক  অসাধারণ বিস্তীর্ণ পাহাড়ি সবুজ পরিসরের নির্জনতার বিজ্ঞাপন থেকে কেন এগিয়ে থাকবে ভয়,সংস্কার যুক্ত মিথ্যে ভৌতিক গল্পের কাল্পনিক "মিথ"?! সত্যিই ভাবতে হয়!




 ফেরার পথে এলাম বর্তমানে কার্শিয়াংএর  সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্ট ---" হনুমান টপ"এ।
২০২১-এ এখানে নয়াবস্তি এলাকায় চা বাগানের মধ্যে হনুমান জয়ন্তী তে জি. টি. এ . দ্বারা নির্মিত হয় ৪০ ফুট উঁচু বিশাল হনুমানের মূর্তি। এই মূর্তি ঘিরেই এই উচ্চতায় এই ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে পুরো কার্শিয়াং এর "প্যানারোমিক ভিউ" অনবদ্য!  চারপাশে বিস্তীর্ণ চা বাগান যেন প্রাকৃতিক "গ্যালারি"। পেছনে প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা কার্শিয়াংএর  রংবেরং এর সারি সারি অসংখ্য ঘরবাড়ির অনবদ্য  ল্যান্ডস্কেপ। মাঝে মাঝে সেই ক্যানভাস ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে ভাসমান মেঘ। বাগানের বুক চিরে মসৃন পিচ রাস্তা যেন উপর থেকে নিচে এঁকে বেঁকে নেমে যাওয়া কোন বিশাল পাহাড়ি পাইথন। যার মাথার উপর দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে উড়ে যাচ্ছে বর্ষা মেঘের দল। অসাধারণ এই প্রাকৃতিক কোলাজকে সঙ্গে নিয়ে  সেই পথ ধরেই নেমে এলাম কার্শিয়াং-এর সমতলে।  ততক্ষণে মেঘমুক্ত আকাশে বেলা শেষের আলোয়  আবার উদ্ভাসিত সেই চিরচেনা কার্শিয়াং নাগরিক চিত্রের ব্যাকড্রপ চিত্রাভাস।




 

দুই পৃথিবী

ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য

 

 " দিদি রে, বিষ্টিইইইই!"

 চমকে উঠে সামনের রাস্তায় তাকালেন সুশোভনবাবু সেই ছেলেটা! রুগ্ন উদোম বুক জুড়ে পাঁজরের হাড় ফুটে বেরোচ্ছে শতচ্ছিন্ন রঙচটা একখানা ঢলঢলে হাফপ্যান্ট পরনেআত্মহারা হয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তাটা জুড়ে খালি পায়ে এলোপাথাড়ি দৌড়চ্ছে, লাফাচ্ছে, খেলছে

 দু এক মুহুর্ত মাত্র, তীরবেগে ছুটে ভাইয়ের পাশটিতে এসে উপস্থিত হল দিদিটি মেয়েটিও রোগা, গলার কণ্ঠা উঁচনো তবে মুখখানা বড় মায়াময়ভাইটার মতোইবুকের মধ্যেটায় হঠাৎই একটা চাপ অনুভব করলেন সুশোভনবাবু

 তুমি কি পাগল হলে?”, রাগে সারা মুখ লাল হয়ে উঠেছিল সমুর,” ওদের সঙ্গে আমার তুলনা? শোনো বাবা, পাড়ায় বাধ্য হয়ে দু ঘর বস্তির লোকের সঙ্গে থাকি বলেই ওরা আমাদের প্রতিবেশী হয়ে যায় না আমার ছেলে বাথটাবেই খেলবে ওদের সঙ্গে রাস্তার নোংরা জলে লাফাঝাঁপা করে বৃষ্টির আনন্দ পেতে হবে নাআফটার অল, ওর পৃথিবী আর ওই রাস্তার ছেলেপিলেদের পৃথিবী তো এক নয়!”

গ্রীলঘেরা নিরাপদ ব্যালকনির ধার ঘেঁষে বসানো লম্বাটে নীল হলুদ রাবারের দামী বাথটাবটার দিকে তাকালেন সুশোভনবাবু বাথটাব ভরা পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত জলের মধ্যে হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলছে তাঁর একমাত্র নাতি গোগোলগ্রীলের ফাঁকফোঁকড় দিয়ে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির ছাঁট কখনও ছিটকে এসে লাগছে ওর নিষ্পাপ চোখে মুখে তাতেই খুশিতে খিলখিলিয়ে উঠছে !

একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে এল সুশোভনবাবুর যাক! আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি নাহয় এভাবেই মিলিয়ে দিক দুই পৃথিবীকে!


 

ঘুমের  ঘোরে

  চিত্রা পাল 


অনেকবার ডাকছে ওকে,দিদা ও দিদা ওঠো অনেক বেলা হয়ে গেলো উঠবে না,চা খাবেতো।বাসন্তী শুনতে পাচ্ছে,সাড়াও দিচ্ছে, কিন্তু এদিকে চাঁপা শুনতে পাচ্ছে না। ও শুনছে কেমন একটা ঘড় ঘড় শব্দ। অন্য কেউ হলে ভয় পেয়ে যেতো, কিন্তু না, চাঁপা ভয় পায়নি, সেই জন্যে বারবার ও ডেকে চলেছে। বেশ কয়েকবার ডাকার পরে বাসন্তী চোখ মেললো। চোখ মেলে চাঁপাকে দেখে একবার ফিক করে হেসেও ফেললো।চাঁপা বুঝতে পারলো সে হাসিটা সজ্ঞানে নয়, এখনও ঘুম লেপ্টে আছে চোখে মুখে,ঘুমের ঘোরে। 

এইবার চাঁপাএকটু জোর গলায় বলে, কি শুয়ে আছো এখনও, ওঠো দেকি। এবার আড়মোড়া ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি উঠে বসতে যায় বাসন্তী।চাঁপা বলে, দাঁড়াও, তড়বড় করবে না,পড়ে গেলে আর এক ঝঞ্ঝাট হবে। তুই ছাড়্‌তো, বলে নিজেই উঠে বসে। চাঁপা ওকে রেখে চা করতে যায়।

প্রতিদিন সকালে চাঁপার সঙ্গে বাসন্তীর কিছু খিটিমিটি হয়,আর হবেও। কেননা চাঁপা ওনার সব কাজ করে দিতে যায়,আর উনি এখনও নিজের সব কাজ করে নেবার মত শক্তপোক্ত বলে নিজেই নিজের কাজ করে নিতে চান, আর সেটাই জারি রাখেন আর সে নিয়েই চাঁপার সঙ্গে মাঝে মাঝে তর্কাতর্কি লেগে যায়। আবার ভাব হয়ে যেতেও বিলম্ব হয় না। 

চা খেতে খেতে ওনার খবরের কাগজ পড়ার স্বভাব, তখন আবার চাঁপাকে চাই,কেননা এমন শ্রোতা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কত যে খবর পড়ে যান উনি, আর বলেন,দ্যাখ ,কি কপাল, অমন লাদাখের মতো দুর্গম জায়গায়  হেলিকপ্টার পড়ে গেলেও কেমন তিনজন মিলিটারি বেঁচে গেল, সবই কপাল।  চাঁপা বলে কি করে বাঁচলো বলতো? বাসন্তী বলে ওই কপাল।  পড়ে গিয়ে আবার দরজা খুলে বেরিয়েও এলো, এই দ্যাখ না ছবিও দিয়েছে। চাঁপা ছবি দেখে বলে হ্যাঁ, তাইতো। আসলে চাঁপা একটু লেখাপড়া জানে,ওই ক্লাস সেভেন এইট অব্দি পড়েছে। বাংলা খবরের কাগজ ভালই পড়ে,ইংরেজি অক্ষরগুলোও চেনে জানে। ও খবরটা পড়ে, উনি যখন অন্য কিছু পড়েন বা নিজের কাজে চলে যান।  

বাসন্তীর একমাত্র ছেলে চাকরি করে দিল্লীতে। বিয়ের পরে ছেলে দিল্লীবাসী তো হবেই, তাতে বাসন্তীর ও কিছু মনে হয়নি।বরং ওরা নিজেরা সংসার পেতে ভালই আছে, এদিকে এনারাও কত্তাগিন্নী ভালই ছিলেন। নাতি হলো মনের সাধ পুরিয়ে আমোদ আহ্লাদ করেছেন, নাতির সঙ্গে খেলাধুলো সবই হয়েছে। কিন্তু বাদ সাধলো ওনার কত্তার চলে যাওয়াটা। কাজকর্ম সেরে দিল্লী ফিরে যাবার সময়ে ছেলে মাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলো। কিন্তু দিল্লী গিয়ে ওনার মন টেঁকে না। ব্যাপারটা হল, উনি এ বাড়ি ছেড়ে যেতে চাননি মোটেই। ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন, ছেলে বলে, তোমাকে এখানে একা রেখে আমি কি করে ওখানে থাকবো? অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক হল যে উনি এখন যাচ্ছেন, পরে যখন মন হবে তখন চলে আসবেন এখানে। 

একমাস যেতে না যেতেই ওনার হল মন উচাটন।কিছুতেই ওখানে থাকতে ওনার মন চাইছে না। এক তো হিন্দিভাষী অঞ্চল, বাইরে যান, পার্কে যান, বসে থাকেন কিছুক্ষণ তারপরে ঘরে ফিরে আসেন।কিন্তু সেখানেও নিজের চেনা ঘরের পরিবেশ নেই।কি যেন অভাব মনে হয়। এবার উনি ঠিককরলেন,নিজের বাড়িতেই ফিরে আসবেন। অনেক খুঁজে পেতে চাঁপাকে পাওয়া গেলো,সারাদিন থাকবে,ওনার যা দরকার সব করে দেবে।চাঁপা যখন আছে, তখন রান্নাটা দুজনে মিলেই করবেন,সেটা যেন বজায় থাকে।তাহলে রান্নার মাসি বাদ দিতে হয়।  অনেক চিন্তা ভাবনা করে ছেলে রাজি হয়।ঠিক আছে, এভাবেই চলুক।  এবার ওফিরে  যাবে দিল্লীতে।  বেরোবার জন্যে তৈরি হতে ছেলেকে বললেন, গলার কবচটা  পরে নিবি। 

এটার একটা কাহিনী আছে। একবার ছেলে খুব অসুস্থ হয়। দীর্ঘদিন ভুগেছিলো। ডাক্তার ট্রিট্মেন্ট সবই চলছিলো,কিন্তু কিছুতেই ভাল হচ্ছিল না।তখন ওনার দিদি ওনাকে নিয়ে মন্দিরে এক সাধুর কাছে নিয়ে যায়। দিদি বলেছিলো যে ট্রিট্মেন্ট যেমন হচ্ছে হোক,তুই একবার বাবার কাছে চল, উনি কিন্তু একেবারে ধন্বন্তরী। মনে ভাবলেন, গিয়েই দেখা যাক,এখনও ছেলেটা সেরে উঠছে না।এই ভেবে ওই সাধুর কাছে গেলেন।  দিদি সব বলেই রেখেছিলেন,এখন বাসন্তীর মুখে আবার সব শুনে উনি একটা কবচ দিয়ে বললেন, এই টা যেন সব সময় ওর শরীরে থাকে,তাহলে বিপদ থেকে দূরে থাকবে। আরও ভালো লাগলো যে উনি কোন দান দক্ষিণা গ্রহণ করেননি। বলেছিলেন, এক বছর পরে এসে মায়ের পায়ে প্রণাম জানিয়ে যাবেন। সত্যি বলতে কি ওর বাবা চলে যাবার পরে উনি ছেলেকে নিয়ে মনে মনে আতঙ্কে থাকতেন,এই কবচ তাঁর মনে সাহস জুগিয়ে ছিলো।ছেলেও ওনার সামনে অন্তত পরে থাকতো অবহেলা করতো না।

সেবার ও মায়ের কথামত পরেওছিলো,কিন্তু কখনযে ওটা ওর গলা থেকে খুলে পড়ে যায় ও সেটা টের পায়নি।সেটাস্টেশনে আসার সময়ে টোটোতেই পড়েছে না,দিল্লিতে আসার সময়ে গাড়িতে পড়েছে টের পায়নি। কিন্তু এখন ওটা ওর কাছে নেই।তাও ও আগে বলেনি। ওর মা যখন জিজ্ঞেস করে,হ্যাঁরে, কবচটা ঠিক আছে তো? তখন বলে, মা ওটা নাহারিয়ে ফেলেছি। সে কি রে?কোথায় হারালিরে বাবা? বলে, খুব সম্ভব, টোটোতে, নাহলে এখানকার ট্যাক্সিতে। 

তারপর থেকে ছেলের একটা না একটা ধাক্কা আঘাত লেগেই আছে।একবার ছুরিতে বেশ খানিকটা আঙুল কেটে গেল, এতোটাই যে সেলাই দিতে হল। একবার মাথায় এমন ধাক্কা খেলো যে কপাল ফুলে আলু। একবার তো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে এমন গড়িয়ে পড়লো, কোন ক্রমে পাশের রেলিং ধরে  রক্ষে পেয়েছিলো, না হলে গড়াতে গড়াতে কি যে হতো বলা যাচ্ছে না। যখনই শোনে তখনই মনে হয়,  ওই কবচ হারানোর কথা।বাসন্তী এত কবচ তাবিজ কোনদিন বিশ্বাস করেনি। বরং কেউ মানলে বলতো,ও সব মনের দুর্বলতা। কিন্তু ছেলের ব্যাপারে ও নিজেই এখন বড় বেশি দুর্বল,তাই মনে করছে  কবচ ছিলো ওর রক্ষা কবচ। সেটা হারিয়েই এমন সব দুর্ঘটনায় পড়ছে, না হলে পরপর এত ঘা খাবে ক্যানো। সেই থেকে ওনার একটা কাজও বেড়েছে, যত কপালজোরে বেঁচে যাওয়া, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার খবরই খবরের কাগজে নিয়মিত খুঁজে খুঁজে পড়েন।আর মনের কোনে কোথায় যেন আশা রাখেন হয়তো ওটা ফিরেও পাবেন।   

আজ সকালে কিন্তু পরিষ্কার  দেখেছিলেন,একজন টোটোওলা কবচটা ওর টোটোতে পেয়েছে,সে অনেককে বলেছে,যার হয় যেন সে ওর কাছ থেকেনিয়ে যায়। কেননা,ও নিজে এসব খুব মানে,তাই ওর মনে হয়েছএসব জিনিস যার যার তার তারভালো।খুঁজে খুঁজে এবাড়িতে এসে্ছে,কেননা ওরমনে হয়েছে, হ্যাঁ বেশ কদিন আগে এ বাড়ি থেকেই তো দুপরে ভাড়া নিয়েগিয়েছে,তাই। কবচটা বাসন্তীকে দেখাতেই চিনতে পারে, এটা সেই কবচ। তাই দ্বিরুক্তি না করে বলে, হ্যাঁ এটা আমার ছেলের। এটাদিয়ে আমার খুব উপকার করলে। তুমি বস বাবা, একটু মিষ্টিমুখ করে যাও। এই বলে মিষ্টি আনতে ভেতরে  যাচ্ছেন এমন সময় চাঁপাটা ডাকলো যে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো।

  চাঁপা যখন বলছে,ও দিদা ওঠো, তখন উনি প্লেটে মিষ্টি সাজাচ্ছেন,গ্লাসে জল ভরছেন,আর বলছেন, আসছি আমি, একটু বসো।  আর ভাবছেন, কে বলে, হারিয়ে গেলে জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না,এই তো পাওয়া গেলো। এবার ছেলেটাকে জোর করে বলতে হবে, এটা তুই খুলবি না গলা থেকে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি, মা এর আদেশ, ব্যাস। 

এখন ভাবছেন, কত্ কি তো সম্ভব হয়,ঘুমের মধ্যে দেখা এই ভাবনাটা কি সম্ভব হবে না। আজ কাগজ পড়তে পড়তে সারাদিন এটাই মাথায় ঘুরতে থাকে, আর ভা বতে থাকেন যদি হয়।      


 

মুক্তি 

উৎপলেন্দু পাল  


তপনের আজকাল ঠিকঠাক ঘুম হয়না। ওর স্ত্রীর সেই ব্যামোটা বেশ বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এতদিন দরজায় ছিটকিনি দিতে দিতোনা, আজকাল দরজাই বন্ধ করতে দেয় না। 
আসলে তপনের বাড়ির কোনও দরজায়ই ছিটকিনি কিংবা খিল নেই। বাড়ির মূল দরজা অর্থাত গেটে কখনোই তালা পড়েনা। তালা সংস্কৃতি ওর বাড়িতে নেই। এমনকি বাথরুমেও ছিটকিনি নেই।  

বিয়ের আগে ধৃতি ছিল ওদের গ্রামের বাড়িতে। বাবার একমাত্র আহ্লাদি মেয়ে ধৃতিকে বিয়ে করার পর ধীরে ধীরে তপনের ঝামেলার শুরু। সে কিছুতেই ওই শহরের বাড়িতে থাকতে চায় না। 

ধৃতিদের বাপের বাড়ির মাঝখানে বিরাট উঠোন। চারদিকে ঘর। পুবের ঘর, পশ্চিমের ঘর, উত্তরের ঘর, দক্ষিণের ঘর। তার পেছনে টিউবওয়েল, গোয়াল ঘর, আরেক দিকে রান্নাঘর। তার পেছনে গাছপালা, তারই এক কোণে পায়খানা। টিউবওয়েলের পাশে স্নান ঘর, প্রস্রাবখানা, মানে টিনের বেড়ার আড়াল। 

ধৃতি ঠিক খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনা শহরে। ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। সবসময়ই সে মুক্ত বাতাস খোঁজে। ঘরের দরজা বন্ধ করেনা, তপন বন্ধ করলে ছিটকিনি দিতে দেয়না। জোর করে বন্ধ করতে চাইলে ও চিৎকার করে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়, গা ঘেমে যায়। এক দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে চায়। তার মনে হতে থাকে যে সে দমবন্ধ হয়ে মরে যাবে। 
তপন এখন সইয়ে নিয়েছে সব। সে নিরুপায়। ধৃতি ঘুমিয়ে পড়লে সে চুপিসারে গেট বন্ধ করে আসে আবার ও ওঠার আগেই গেট খুলে রাখে। এ নিয়ে কম ঝামেলা হয়নি। স্নানঘর, পায়খানারও দরজা আটকায়না ধৃতি। অনেকবার বিচ্ছিরি ঘটনাও ঘটে গেছে। বাচ্চারাও জেনে যায় মা বাথরুমে, সুতরাং ওদিকে যাওয়া মানা। 

ব্যাঙ্কের সামনে বিরাট লাইন। আধার কার্ড সংশোধন চলছে। ছেলের আধার সংশোধন করাতে হবে। 
 ধৃতি লাইনে। মেয়েদের লাইনটা ছোট বলে ধৃতি দাঁড়িয়েছে। তপন ছেলেকে নিয়ে আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। বেলা দুটোর মধ্যে লাইনে না থাকলে সেদিন আর কাজ হবেনা। 
ঠিক দুটোয় যারা লাইনে ছিল তাদের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে গেটকিপার সামনের শাটার বন্ধ করে দিল। 

ধৃতি আচমকাই চিৎকার করে উঠলো," গেট খোলো, গেট খোলো "। 
গেটকিপার খুললো না। সে বললো," গেট খোলা যাবে না। সময় শেষ"। 
ধৃতি ছটফট করছে দেখে তপন গেটকিপারকে অনুরোধ করলো,"দাদা, একটু খুলে দিন। ওর একটু সমস্যা আছে। প্লিজ!" 
গেটকিপার বিরক্ত হয়ে বললো," আপনারা কি বেরিয়ে যাবেন?" 
"না"। 
"তাহলে? ওভাবে আপনি চাইলেই খোলা যাবেনা। বেরিয়ে যেতে হলে পেছনের গেট দিয়ে বেরোন"। 
"দাদা, প্লিজ!" 

এদিকে ধৃতি শাটার তোলার চেষ্টা করছে আর চিৎকার করে যাচ্ছে," খোলা, খোলা, খোলো"। 
ভেতরের সব লোকজন অবাক। স্টাফেরা কাজ ছেড়ে তটস্থ হয়ে উঠেছে। গার্ড এসে ধৃতিকে সরে যাবার অনুরোধ করছেন। ধৃতি ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে বিকৃত আচরণ করছে। তপন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ধৃতিকে টেনে সরাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কের ভেতর এক অরাজক অবস্থা। ম্যানেজার তপনকে অনুরোধ করছেন ওনাকে পেছনের গেট দিয়ে বের করে নিয়ে যেতে। বাইরে লোকজনের ভিড়। তপন ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছেলেটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ওকেই বা সামলায় কে? 

ধৃতির নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে, প্রশ্বাস আটকে যাচ্ছে, কে যেন তাকে সজোরে চেপে ধরেছে দু-হাতের আলিঙ্গনে বুকের সাথে পিষে দিচ্ছে। তার ঠোঁট, গলা, বুক, পেট, নিতম্ব পেঁচিয়ে অজগর গিলে খাচ্ছে তাকে। কে যেন ধর্ষকাম দানবীয় শক্তি প্রয়োগে তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত।  
ধৃতি প্রলাপের মতো কিন্ত উচ্চৈস্বরে বলে যাচ্ছে," আমাকে ছেড়ে দাও, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।" তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সে চিৎকার করছে, "ছেড়ে দাও কাকু, দরজা খোলো। ছাড়ো আমাকে কাকু, আর চাপ দিয়োনা, আমার সব হাড় ভেঙে যাচ্ছে কাকু। আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দা---ও।" 

সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ধৃতি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বন্ধনমুক্ত হতে চাইছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে তার পোশাক। সে মরিয়া হয়ে উঠেছে নিজেকে ছাড়াতে। 
"বাঁচাও, বাঁচা--ও, বাঁ-----চা--ও"। মুক্তির জন্য কি করুণ আর্তি! 
জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল ধৃতি। তারপর সব শান্ত। 


 

তিস্তা- তোর্সায় একটা রাত

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

সে বার তিস্তা তোর্ষা  তে নিমতিতা স্টেশন এ একদল ডাকাতের মুখে পড়েছিলাম। এখন  যেমন সন্ধ্যা আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে নিমতিতা ষ্টেশন পার হয়ে  যায়, সে বার  জঙ্গীপুরের লাইনের কাজ চলাতে, রাত পৌনে তিনটায় দুম দাম শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

ট্রেনের বডির পাত খোলার শব্দে যাত্রীরা আতংকিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। কে বা কারা নাকি স্মাগলড গুডস ট্রেনের মধ্যে করে পাচার করছে। অন্য একদল ডাকাত সে খবর পেয়ে,  সেইসব জিনিস আআত্মসাৎ করতে চাইছে।                   

ছোট বেলায় গ্রামে  যে ডাকাতি হয়েছিল। তার সাথে এর কোন মিল নেই। গ্রামের সেই ডাকাতি তে গুলি চলেছিল, বোমা পড়েছিল, সুশীল ঘোষের দুই ছেলে জখম হয়েছিল। টাকা, সোনাদানা মিলে দু লাখ টাকা নিয়ে গিয়ে ছিল ডাকাত দল।সেই দলের এক ইনফরমার ধরা পড়লেও, ডাকাত বা ডাকাতির মাল, কিছুই পাওয়া  যায় নি। ইনফরমার কে সুবীর সাহার বোম্বাই আম গাছের ডালে, ওপরে পা, নিচে মাথা করে দড়ি দিয়ে বেঁধে, পা য়ে সুঁচ ফুটিয়ে ও কারো হদিস পাওয়া না গেলে, গাঙ্গুলি জেঠুর বকুনি তে পাড়ার দাদা রা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। তা না হ'লে  যে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটত, তা বলাই বাহুল্য। 

আমার ছাত্রী র স্বামী, রেলের টিকিট পরীক্ষক ছিল। ছাত্রী এম,এ পড়ত। পরীক্ষার আগে আমার মত পাস কোর্সের গ্রাজুয়েট এর কাছে,ইংরেজি শব্দের মানে উদ্ধার করত। ছাত্রী টির স্বামী অলক, মারা গেল। কি একটা অ সুখ ছিল। 

জলপাইগুড়ি, শিয়ালদাতে কখনও তিস্তায়, কখনও উত্তর বংগ এক্সপ্রেস এ সে আমাকে মাংস ভাত খাওয়াত। ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক আমার অনুজ প্রতিম ভাই, এটা দেখে অনেক সহযাত্রী ই ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ত।

আজকের  যাত্রা তে, টিকিট পরীক্ষক কে দেখে, বার বার অলকের কথা মনে এল। ভদ্রলোক কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার সহকর্মী, টিকিট পরীক্ষক,  অলক কর্মকার কে চিনতেন? , 
বিলক্ষণ,  অলক আপনার কে হ'য়? 
আমার বিশেষ পরিচিত। 

তারপর নানা কথায় ডাকাতির প্রসঙ্গে এলাম। নিমততা স্টেশনের ডাকাতি র কথা বলতে, বললেন, এখন তারা আর ডাকাতি করে না। তাদের ছেলে-মেয়েরা এখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। ডাকাত রা এখন নেতা। আড়াই ভরির চেন, দুহাতে আটটা আংটি, স্করপিও গাড়ী,  সে দিন ই পাঞ্জাবি পরে ভাষন দিচ্ছিল। তিন ঘন্টায়, একটা ওয়াগন সাফ করে দিত। এখন আর ও সব কাজ করবে না।

টিকিট পরীক্ষক  যখন এ সব বলছিলেন তখন আমার বগির সহ যাত্রিরা,  মোবাইলে র, "তেরে বিনা জিন্দেগী সে কয়ি.....সিকোয়া নেহী" গান বন্ধ করে, ' ডাকাত -কাহিনী' হাঁ করে গিলছিল।

ফারাক্কা আসাতে উনি বললেন, চলুন চা খেয়ে আসি। সকালে বেড়গুম থেকে ভারতী বৌদির দেওয়া মাছ ভাত নষ্ট হয়ে   যাবে বলে নৈহাটিতেই সাবাড় করে দিয়েছি। পেট টা ভরা ভরা কিন্তু নিমতিতা থেকে জলপাইগুড়ি তে পুতুল কে  যখন জানালাম, রাতে আর খাব না। স্বভাব সিদ্ধ শাসনের সুরে বলল, " একদম উপোস করবে না, অবশ্যই মালদা থেকে খেয়ে নেবে।"

স্টেশনের স্টলে পৌছতেই দেখি চারটি প্লেটে ব্রেড-টোস্ট, ওমলেট, এক গ্লাস  গরম কফি। আপত্তি  জানানোর আগেই বললেন, " তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, আমি এখানেই নেমে  যাব। মালদা থেকে অন্য টিটি (সুভাষ বাবু) উঠবেন।  নিউ জলপাইগুড়ি তে উনি আপনাকে চা খাওয়ার ব্যাবস্থা করবেন। "

ট্রেনে ওঠার সময় দেখলাম, এক ভদ্রলোক, হাসি মুখে ষ্টল মালিক কে আমাদের বিলের বাবদ পাঁচ 'শ টাকা বাড়িয়ে দিলেন। নেতা গোছের এই ভদ্রলোক এর সোনার চেন,হাতের আংটি দেখে,  আমার কফি- ওমলেট গলায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। তিস্তা - তোর্ষা তখন কোমর  দুলিয়ে চলতে শুরু  করেছে।


 

ইমিগ্রেশনের ওপারে

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী


ফুন্টশোলিং ইমিগ্রেশন সেন্টারের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক মেয়ের ওপর। গাঢ় নীল কিরা পরা, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি। একবার চোখাচোখি হতেই মেয়েটি মৃদু হাসল। সেই হাসি অর্ণবের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে রইল। ভুটানে ঢোকার পরও সে মেয়েটিকে ভুলতে পারল না। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। সন্ধ্যায় হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অর্ণব অবাক হয়ে দেখল— পাশের বাড়ির উঠোনে সেই মেয়েটি! মেয়েটিও তাকে দেখে হাত নাড়ল।


পরদিন কথা হল। তার নাম পেমা। তারপর একসঙ্গে কফি, পাহাড়ি রাস্তা, প্রার্থনা-পতাকার নিচে হাঁটা।

কয়েকদিনের মধ্যেই অর্ণব বুঝল— সে প্রেমে পড়েছে।


আর এক সন্ধ্যায় পেমা বলল,

— "আমিও তোমাকে ভালোবাসি।"

অর্ণবের মনে হল, পৃথিবীর সব পাহাড় যেন হঠাৎ ফুলে ঢেকে গেছে।

কিন্তু শেষ রাতে পেমা তাকে নিয়ে গেল পাহাড়ের মাথায় এক পুরোনো মঠের কাছে।

সেখানে একটি পাথরের ফলক।

ফলকে খোদাই করা—

"পেমা দর্জি (১৯৯৮–২০২২)"

অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।

— "এটা...?"

পেমা হাসল।

— "এটাই আমার কবর।"

অর্ণব স্তব্ধ।

পেমা আকাশের দিকে তাকাল।

— "চার বছর আগে পাহাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলাম। তারপর থেকে মাঝে মাঝে ইমিগ্রেশন সেন্টারে যাই।"

— "কেন?"

— "কারণ আমি জীবনে কাউকে ভালোবাসতে পারিনি।"

ঠান্ডা বাতাসে প্রার্থনা-পতাকাগুলো কাঁপছিল।

পেমা অর্ণবের হাত ধরল।

— "তুমি প্রথম মানুষ, যে আমাকে দেখেছ।"

তারপর ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো কুয়াশার মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল।

অর্ণব মরিয়া হয়ে তাকে আঁকড়ে ধরতে গেল। পারল না।

পেমা মিলিয়ে যাওয়ার আগে শুধু বলল—

— "সব প্রেম একসঙ্গে থাকার জন্য জন্মায় না। কিছু প্রেম জন্মায় মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য।"

পরদিন সকালে অর্ণব ভারতে ফিরে এল। ইমিগ্রেশন অফিসার তার পাসপোর্ট ফেরত দিতে দিতে বললেন,

— "মজার ব্যাপার জানেন? গত চার বছরে অন্তত সাতজন পর্যটক একই মেয়ের খোঁজ করেছেন।"

অর্ণব কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

— "তারপর?"

অফিসার হেসে বললেন,

— "কেউ তাকে আর খুঁজে পায়নি।"

অর্ণব কিছু বলল না।

কারণ তার শার্টের পকেটে তখনও রাখা ছিল পেমার দেওয়া ছোট্ট নীল প্রার্থনা- পতাকা—

যেটা অসম্ভব হলে থাকার কথা নয়।


 

হারায় নি  কিছুই

শুভেন্দু নন্দী

তারাভরা নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে মন্থর গতিতে হেঁটে চলেছেন জ্যোতিপ্রকাশ। একসময়ে তিনি যেন অতীতে হারিয়ে গেলেন। ..... কী ভালোই না বাসতেন ফুটবল খেলতে! বাঁ- পায়ে ছিল দুরন্ত গতি। সবাই বলতো তিনি না কী ড্রিবলিং এ ছিলেন তুখোড়। জেলা স্তর থেকে একেবারে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলায় দিয়েছিলেন তিনি নেতৃত্ব।

কতবার যে তাঁর দুরন্ত শটে বল গোলপোস্টের জাল ভেদ করে বাইরে চলে যেতো, তার ইয়ত্তা নেই।  জাতীয় স্তরে খেলবার সময় প্রতিপক্ষের এক ফুটবলারের সাথে  খেলোয়াড় সুলভ সংঘর্ষে পড়লেন ছিটকে একবার মাঠের  একধারে। তারপর তাঁর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান হতেই দেখলেন হাসপাতালের বেডে।  অস্ত্রোপচারের পরেও বা -পা দুর্বল ও অশক্তই রয়ে গেলো।

... সকালবেলা। কলিংবেলের আওয়াজে সবাই সচকিত হয়ে উঠলো। আলোকা,জ্যোতির স্ত্রী, দরজা খুলে অবাক হয়ে বলে
উঠলেন, " আরে! প্রবীরদা.......?" 
- খবর নিতে এলাম, তোমাদের।
-আরে! ভালো আছিস তো, প্রবীর?
 
জ্যোতির মুখে যেন প্রবীরের আগমনে একরাশ চাঁপাফুলের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ল । তাঁর নিস্তরঙ্গ জীবন যেন মন্দাকিনীর জোয়ারে ভেসে উঠলো, 
-হ্যাঁ ভালো আছি। তোর কথা আমরা মানে আলোক,মধু,বিপুল সবার কথাই ভাবিরে। আমাদের আড্ডার স্থলের কথা মনে আছে তোর?
-আমার কথা বলে, তারা? 
-বিলক্ষণ। তুই মানসিক অবসাদে ভুগছিস মনে হচ্ছে?
- সবাই তো এখন আমরা সংসার সমুদ্রে ভাসছি। আমি আজ উঠি। আর একদিন এসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে,কী বলিস।
জ্যোতির সহসা উপলব্ধি "সময়ই শুধু বদলেছে। হারায়নি কিছুই।"


 

অন্ধকার এবং শুভ্রা 
তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য 

জানালারটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রা। ঘরের বাইরে অন্ধকারে আষাঢ় মেঘে বৃষ্টি ঝরছে আর ঘরের ভেতরে অন্ধকার নিবিড় ভাবে জমে আছে।যখন তখন ঝরে পড়বে কান্না হয়ে।সেই বিষাদঘন অন্ধকারে শুভ্রা উদাস মনে গুনগুন করে উঠলো, ‘আকাশ কাঁদে হতাশসম,নাই যে...’ কথা গুলিয়ে,চোখ ভারী হয়ে এলো শুভ্রার। গান আর বেড়ালো না, বেড়িয়ে এলো চোখ গড়িয়ে একরাশ হতাশা আর অন্ধকার।
শুভ্রার বয়স আঠাশ পেরিয়ে পালাচ্ছে। প্রেম,সে তো এলোই না।শরীরে অন্ধকার জমে জমে এমন ক্ষত করে দিয়েছে, বিয়ের সম্বন্ধগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করছে। আর চাকরি-বাকরি, সেখানেও প্রত্যাখ্যান।শেষ ইন্টারভিউয়ে ডেমোটা এমন ভাবে ছড়িয়ে এসেছে শুভ্রা,সেই আফশোষ তাকে চেপে ধরছে বারবার।
বাবা-মা পাশে দাঁড়ায়, এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে।অথবা এই মেয়েকে টানতেই হবে, ভেবে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছে সব। প্রতিবেশীদের ফিসফিস আর কানে নেয় না শুভ্রা। শুধু সব দুঃখ-প্রত্যাখ্যান-না পাওয়া গুলো,অন্ধকার হয়ে জমে থাকে ওর ঘরটায়। আর সেই অন্ধকার-অবসাদ গায়ে জড়িয়ে,রক্তশূন্যতায় ভোগা সাদাটে মেয়েটা দিনযাপন করে।ওর ‘শুভ্রা’ নাম থেকে যেন সব শুভ্রতা গুলোই পালিয়ে যাচ্ছে। 
তবে আজ শুভ্রা নিজেও পালাবে বলে ঠিক করেছে। তাই তো সিলিং ফ্যানটায় কাঁথাস্টিচের ওড়নাটা ঝুলিয়েছে। জানালা থেকে এবার সেদিকে এগোবে শুভ্রা।জমে থাকা সব অন্ধকার থেকে আজ সে মুক্ত হবে, কাঁথাস্টিচের ওড়নাটার ফাঁসে।
হঠাৎ অন্য ঘর থেকে ভেসে এলো একটা ডাক,‘শুভ্রা...?’ মায়ের ডাক।শুভ্রার আর কাঁথার ওড়নাটায় গলা দেওয়া হলো না, খুলে ফেললো সেটা‌।ওই যে আগে বলা হয়েছিল,মা-বাবা পাশে দাঁড়ায়। শুভ্রার মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় মা বলতো, ‘শুভ্রা আমার শুভ্রতা ছড়ায়, শান্তি ছড়ায়,সব কালো,সব অন্ধকার দূর করে দেয়।’ এই দুটো মানুষ তো ওর দিকেই চেয়ে আছে,ওদের অন্ধকারে ফেলে কিভাবে পালাবে শুভ্রা!
চোখ মুছে অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শুভ্রা, সব অন্ধকার সয়ে নিয়ে একদিন সত্যিই হয়তো আলোর স্ফটিক হয়ে শুভ্রতা ছড়াবে সেই আশায়।


 

অসুস্থ মন 
তাপসী ঘোষ 



বিশের বিষ। অমবস্যার  মতো জীবন ও জীবকা অন্ধকার। সবার জীবনে  করোনার আতঙ্ক।

বিশের বিষ মানুষের শরীরে শুধু নয় কর্মক্ষেত্রও বসিয়েছিল থাবা।  মানুষের সাথে ছিলো  মানুষের সামাজিক দূরত্ব রাখার নিয়ম। তবুও সেই নিয়ময়ের  গন্ডি কেটে কিছু মানুষ  দেখিয়েছিলো সেবা আর সাহায্যের মানবিক ধর্ম  ও সাহস।

কলেজ ছাত্রী রিদিমা দেখেছে বিষের বিশ্ব , দেখেছে   অনেকের মতো ওর বাবাও কর্মহীন । 
রিদিমাদের পরিবার যখন একসাথে কোবিডে আক্রান্ত  তখন রিদিমা দেখেছিলো তাদের বাড়ির সাহায্যকারী মিনতি মাসির মানবিক ধর্ম।  বাসাবাড়ির  কাজ থেকে বিতাড়িত মিনতি মাসি  রেশনের আটার রুটি আর চালের  ভাত  রোজ এসে দিয়ে যেত তাদেরকে। 

কোবিড যখন  জীবন  ও জীবিকা স্তব্ধ করে অদৃশ্য তখন মানুষ জীবিকা  আর প্রয়োজনে বাসস্থান  বদল করা শুরু করলো।  মিনতিও তার বাসস্থান বদল করেছিলো, ফলে রিদিমাদের পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে  গিয়েছিলো।

বছর  ঘুরে বছর  এলো, মেঘ মুক্ত আকাশের মতো মানুষ কোবিড মুক্ত। তারই মাঝে একদিন রিদিমার মা সুদেষ্ণার মোবাইলে মিনতির ফোন, ও গ্রাম থেকে শহরে এসেছে স্বামীর চিকিৎসা করাতে। লাস্ট ট্রেন মিস করে রাতের আশ্রয় চায় সুদেষ্ণার কাছে।   আলাদা রুম নেই তাই জায়গা দিতে পারবে না বলে ফোনটা কেটে দেয়  সুদেষ্ণা।

 রিদিমা  বুঝতে পারলো, পৃথিবী  করোনা মুক্ত হলেও কিছু মানুষ এখনও মানবিক ধর্মের দিক থেকে অকৃতজ্ঞ  এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ। 
মায়ের বারণ সত্ত্বেও মিনতি মাসির জন্য সাহায্যের  হাত বাড়িয়ে দিলো।



 

জারুলের নেশাগ্রস্থ ভালবাসা

প্রাণেশ পাল 

সন্ন্যাসী গ্রীষ্মের ধ্যানমগ্ন দগ্ধতা 
মাল, কুর্তি, মুর্তির বুক চিরে যাওয়া
সপ্তদশ জাতীয় সড়ক....
নিস্তব্ধতার ক্যানভাস জুড়ে মহা সমারোহ,
জারুলের সৌন্দর্য্য,  বিমুগ্ধ প্রকৃতি !

অনাবিল স্নিগ্ধতা, মায়াময় আবেশ
ডুয়ার্সের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জুড়ে
বেগুনি, গোলাপি আভার মাদকতা....
যৌবনের চিত্রকল্পে নৈঃশব্দের অহংকার 
ছুঁয়ে যায়....
জারুলের নেশাগ্রস্থ ভালবাসা !

আষাঢ়ের প্রথম বর্ষার নৈসর্গিক ছোঁয়া
ডুয়ার্সের সোঁদা মাটির গন্ধ 
জারুলের আঘ্রাণে তোমার শরীরের 
চিরস্থায়ী ঘ্রাণ......
ধামসা, মাদলে উদ্বেলিত যৌবন !


 

মায়াবাড়ি

 তন্ময় কবিরাজ


আমার জন্মান্তরে আমি তোমার কথাই বলতে পারি
অন্ধকারে দেখি ভোর, মনিকর্নিকার শিখায় 
আমি দেখি স্মৃতি থেকে জেগে উঠে শৈশব হাসছে -

আমার ক্লান্তি নেই,
তোমার মায়াবী চোখের কোণে যে সংসারে 
আমার ভাঙা স্বপ্নের হাত শক্ত হয় ক্রমশ
আমি সে মৃত্যুর পাশে ঘুমিয়ে কথা বলতে পারি -

স্তব্ধ রাত মায়াবী জোৎস্নায় সাড়া দিল হঠাৎ
তোমারই পাশে খেলা করে  আমার জন্মান্তর।



 

ছায়া পথ আঁকি নখে নখে

দীপাঞ্জন দত্ত

আমার হাত-পা বাঁধো। বেঁধে ফ্যালো।
কেবল মাথার উপর থাকুক ছারপোকা
খুলি থেকে চুষে খা'ক জমাট রক্ত।
স্নায়ু হালকা হোক।
কাঁকর গেঁথে জব্দ হোক পায়ের পাতা।
ধমনী দিয়ে প্লাবিত হোক, লোহিত কনার নদী স্রোত।

অতল অতল আভূমি জলে।
শুধু ছায়াপথ আঁকি নখে নখে।
আমার হাত-পা বাঁধো। চোখ বেঁধে ফ্যালো।
আয়নায় নিজের করুণতা সহ্য হয় না আর।