বিশ্ব আদিবাসী দিবস
Tuesday, August 4, 2026
নেতাজির টানে স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন উত্তম কুমার
বটু কৃষ্ণ হালদার
নেতাজি হলেন এক মহামানব,কারো চোখে ভগবান,জাতীয়তা বাদী দেশ প্রেমিক হিসেবে নেতাজির প্রেমে পড়েনি এমন ভারত বাসী বোধহয় খুব কম।বিশেষ করে দেশের যুব সমাজ তো নয়।তিনি এমন ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, যাঁকে হিটলার ও সমীহ করতেন এ তো কারো অজানা নয়।ঠিক তেমন তাঁর স্বদেশীকতা প্রেমে মত্ত হয়ে মহানায়ক উত্তম কুমার স্বদেশী কথার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করতে থাকেন।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় নায়কদের তালিকায় নিশ্চয়ই আসবে উত্তম কুমারের নাম।৭০_৮০ দশকেরই তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম রকস্টার।
চলচ্চিত্র জগতে বাঙালি’ এই কথাটি শুনলে সকলের মানসপটে সর্বপ্রথম যাঁর ছবি ভেসে ওঠে তা হল এক ঝাঁক কোকড়ানো চুল, ফর্সা, চ্যাপটা নাক,রাশভারী মুখ, চওড়া কপাল,মলিন হাসি।তিনি হলেন বাঙালির ম্যাটিনি আইডল।নিজের অভিনয় দক্ষতাকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন। রোমান্টসিজমে মুগ্ধ করেছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীকে।আজ পর্যন্ত বাংলা ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে তাঁর জায়গা নেওয়ার মতো দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পায়নি বঙ্গবাসী। তাইতো তাঁর স্থান আজও শূন্যে পড়ে। তাই আজও অনেকের মুখে বলতে শোনা যায়– বাংলা সিনেমায় নায়ক আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। কিন্তু মহানায়ক একজনই।
শুধু কি তিনি অভিনেতা।কিন্তু এসবের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় বাঙালির এই রোমান্টিক হিরোর জীবনের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। রক্তমাংসের অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের সকল চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের মতো এটিও যেনো চারিয়ে গেলো বাঙালির মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় সত্ত্বায়।তা হলো তাঁর— স্বদেশপ্রীতি।খুব ছোট থেকেই উত্তমকুমার থিয়েটার, নাটক ইত্যাদি করতেন। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আত্মপরিচয় প্রকাশ করা। পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানও লিখতেন তিনি। গোপনে যোগযোগ রাখতেন বিপ্লবীদের সঙ্গে। দেশপ্রেমিক এই মানুষটি বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘তাইতো’ নাটকটির রিহার্সাল চলাকালীন লিখে ফেললেন দেশের জন্যে একের পর এক গান।
তিনি বিপ্লবীদের মত বন্দুক-পিস্তল দিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে লড়েননি, কিন্তু অভিনয় করতে করতে বারবার তাঁর মাথায় এসেছে একটাই প্রশ্ন – “দেশের জন্যে আমি কি করতে পারি?” এ দিকে তিনি পরিবারের বড় ছেলে।সংসারের ভার এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে। বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বাধ্য হয়ে এক সময় পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিও করতে শুরু করেন। কিন্তু দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতায় কোনও দিন খামতি ছিল না।
মহাত্মা গান্ধী ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন।মেদিনীপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন ৬৬ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।দেশের পরিস্থিতি উত্তাল। ভবানীপুরে বসে দেশের এই সমস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন ১৬ বছরের এক কিশোর।নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তখনও ‘উত্তমকুমার’ হননি। বন্ধুবান্ধব নিয়ে তিনি নিজের মতো করে ব্রিটিশ অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আর দেশপ্রেমের বীজ রোপণ করছেন দেশবাসীর মধ্যে। তাই পরবর্তীতে উত্তমকুমার নিজের স্মৃতিচারণে বলেন—বন্ধুদের জুটিয়ে ভবানীপুরে প্রভাতফেরি করতেন তাঁরা মাঝেমধ্যেই। হাতে থাকত ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। আর দেশাত্মবোধক গান লিখে সুর দিতেন উত্তম নিজেই। পথে-পথে ঘুরে সবাই মিলে গাইতেন সেই গান।
দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে কলকাতার রাস্তায় বেরিয়েছে প্রভাত ফেরি। নেতাজিকে নিয়ে না শোনা একটি গান গেয়ে এগিয়ে চলেছেন একদল যুবক। গানের কথাগুলি ছিল ঠিক এরকম —
“সুভাষেরই জন্মদিনে গাইব নতুন গান
সেই সুরেতে জাগবে মানুষ,জাগবে নতুন প্রাণ।”
প্রভাত ফেরির একেবারে সামনের সারিতে থাকা এক যুবক সুরেলা কণ্ঠে বাকিদের সঙ্গে গেয়ে এগিয়ে চলেছেন। তিনিই গানটি লিখেছিলেন এবং সুরও করেছিলেন। যুবকটির নাম অরুণ চট্টোপাধ্যায়। ভবানীপুর অঞ্চলে সকলেই তাঁকে চেনেন। পরবর্তীকালে গোটা যাঁকে দেশ চিনেছে উত্তম কুমার নামে।
এ থেকেই বোঝা যায়– অন্য পাঁচটা বাঙালির মতোই দেশপ্রেমিক মহানায়কেরও মনের মণিকোঠায় দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র অনেকটা জায়গা জুড়ে বিরাজ করতেন । তাইতো তিনি নিজের স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, “আমাদের একমাত্র সহায় তখন নেতাজী। আমরা তখন নতুন আশার বাণীতে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি।
INA র বীর সৈন্যদের তখন বিচার চলছে দিল্লির লালকেল্লায়। নেতাজি বিমান দুর্ঘটনার নাটকীয়তায় হারিয়ে গিয়েছেন কিন্তু ততদিনে দেশবাসীর মনে তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছেন – দেশপ্রেমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ।‘দিল্লি চলো, চলো দিল্লি’ মন্ত্রে জেগে উঠেছে দেশবাসী। দেশের সর্বত্র নেতাজির INA সৈন্যদের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছে।দেশের এইরূপ পরিস্থিতিতে একদিন উত্তমকুমার সোজা চলে গেলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য বিপ্লবী সতীশচন্দ্র বসুর কাছে। তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি আপনাদের জন্যে কি করতে পারি বলুন?
সতীশচন্দ্র উত্তমকে কিছু আর্থিক সাহায্য করতে বলেন কারণ মামলার খরচ চালানোর জন্য তখন অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেই সময় উত্তমকুমারের উদ্যোগে লুনার ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি চ্যারিটি শো আয়োজিত হয়। সেই শো তে মঞ্চস্থ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস। সেই শো-এর টিকিট বিক্রি করে ১৭০০ টাকা জোগাড় করেছিলেন উত্তম কুমার। ১৯৪৬ সালে দাঁড়িয়ে এই টাকার মূল্য নেহাৎই কম কিছু ছিল না।সেই টাকা সতীশ চন্দ্র বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
সবশেষে বলি, ১৯৭৭ সালে ‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের’ ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে নির্মিত পিযুষ বসু পরিচালিত ‘সব্যসাচী’ সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতায় মানুষটি যেমন জয় করেছেন দেশবাসীর মনন, তেমনি নিজের সমগ্র জীবন দেশপ্রেমের বাতাবরণে ছেয়ে নির্মাণ করেছেন নিজ চরিত্রের সুদৃঢ় গড়ন।একদিকে তিনি মহা নায়ক অন্যদিকে হৃদয়ে বসিয়েছিলেন স্বদেশকে।তাঁর স্বদেশ নামক হৃদয়ে নিঃসন্দেহে ভগবানের আসন পেয়েছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।
স্বাধীনতার স্বাদ
প্রদীপ মুখুটী
স্বাধীনতার স্বাদ আমরা তেমন করে কেউ হয়তো পাইনি। রক্তঝরা দিনগুলোর কথা ইতিহাসের পাতায় ছাপা—সে সব যেন রক্ত দিয়েই ছাপা বলে মনে হয়। এক-একজন মহান মানুষের বলিদান আজও মনে প্রশ্ন জাগিয়ে যায়।
মাটিতে ঝরা রক্তের রং ছিল লাল, আর সেই রক্তে ভেজা মাটির গন্ধও ছিল এক। তফাতটা পরে গড়ে উঠেছিল। কারণ? কারণটা আজ নাই-বা তুলে ধরলাম।
“ইংরেজ ভারত ছাড়ো”,
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—
এইসব পড়তে পড়তে সেই ছোট্ট মনটা একসময় বেশ স্বাধীনতা সংগ্রামী হতে চাইত। অবুঝ মনের কোনো এক কোণে প্রতিবাদের বারুদ নাড়া দিত। তাই এরকম বই পড়ার ইচ্ছের জোগান বাড়ির বড়দের কাছ থেকেই পেতাম।
ছোটবেলার গল্পের বই কিংবা ইতিহাসের পাতায় রঙিন হয়ে থাকত সেই স্বাধীনতার কথা। আর ইতিহাসের কথা বলতে গেলে স্কুলের কথা আসবেই।
মাস্টারমশাইরা বলতেন—
“ইতিহাস তো গল্প! এই গল্পটা মনে রাখতে পারিস না?”
সেই সময় মাস্টারমশাই যতই বলুন, ইতিহাস গল্প—মন সায় দিত না। মাথায় যে ছিল শুধু পড়া আর পড়া। সেই চাপই ছিল এক জুজু। আর সেই জুজুই ইতিহাসকে গল্প বলে মনে করতে দিত না।
সমাধান ছিল মুখস্থবিদ্যা। আর সেই বিদ্যাকেই মাথা পেতে নিলাম।
বেশ মনে আছে, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় কাগজ-কলমের কাজ সেরে বাবা আমায় বললেন— “এবার মাস্টারমশাইকে প্রণাম করো।”
আমি প্রণাম সেরে উঠতেই বাবা বললেন—
“আপনার ছেলে ও ছাত্র। অন্যায় করলে বা পড়াশোনায় অবহেলা করলে বেত্রাঘাতে কার্পণ্য করবেন না।”
মাস্টারমশাই একটু হেসে বললেন—
“সে হবে, ক্ষণ।”
সেই ক্ষণেই স্কুলজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলাম।
স্কুল ছিল শাসন ও অনুশাসনের এক মন্দির। শিক্ষার সঙ্গে এই দুটিকে নিয়েই চলতে হতো। অনুশাসন ছিল সময়ানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলার দীর্ঘ পথ। আর শাসন? সে ছিল বেত্রাঘাত, ‘থ্রোয়িং দ্য ডাস্টার’—মানে, হুম, ডাস্টার ছোড়া—আর প্রতিদিন কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা।
এটাই ছিল প্রায় রোজকার নামতা।
সেই সময় পিটুনি খাওয়ার পর মনে বিদ্রোহ জাগলেও সাহসে ছিল বড় টান। শাসনটা ছিল বড়ই কঠিন। তাই শাসনের কাছে নতিস্বীকার করেই একের পর এক ক্লাস পার করতে হতো।
সঙ্গে ছিল খেলাধুলা। স্পোর্টসের পাশাপাশি ছিল ড্রিল, প্যারেড, ব্রতচারী—কিন্তু সেখানেও শাসন ও অনুশাসনের কোনো ছাড় ছিল না।
মন তার ডানা মেলে উড়তে চাইত। কিন্তু সেই ডানা মেলতে পারা ছিল বড় কঠিন। ইচ্ছেগুলো জন্ম নিয়েই যেন মৃত্যুবরণ করত। ডানার অব্যবহারে ছোট্ট মনের আকাশে দেখা স্বপ্নগুলো একসময় মনের বানে ভেসে যেত।
এই পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পাওয়ারও যেন কোনো উপায় ছিল না। জীবন-কাণ্ডারি বাবা-মা কিংবা পরিবারের কারও কাছে নিজের ইচ্ছের সমর্থন আদায় করতে গেলেই, আর এক দফা শাসনের দায়ভার নিতে হতো।
তাই মনের মধ্যে সবকিছু চেপে রেখে একের পর এক ক্লাস পার করে বড় হতে লাগলাম। ঘরে ও স্কুলে পড়াশোনার সম্মোহনে আবদ্ধ হয়ে পড়লাম।
সময়ের সঙ্গে যেমন বাড়ল বয়স, তেমনই বাড়ল ক্লাসের সংখ্যা। বেশ বড় হয়ে গিয়েছি তখন। বয়সের হিসেবেও যেন দুই অঙ্কে পৌঁছে গেছি—দশম শ্রেণিতে।
তখন ঘরে-বাইরে দুটোই একটু একটু করে আলাদা হতে লাগল। স্কুলে শাসনের ধরনটাও যেন একটু বদলে গেল। এখন আর শুধু বেত্রাঘাত বা কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখার শাসন নয়—এখন ফল ভালো করতেই হবে। সবার নজর পড়ল সেদিকেই। ঘরেও ঠিক তেমনই।
সময়কে মূল্য দিতে শেখানো হচ্ছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা। আবার সেই সময়েই নিজের পছন্দের খাবারের আবদারও রাখতে শুরু করেছি। সঙ্গে বেশ গুরুত্বও পাওয়া যাচ্ছে। সেই উপভোগটা ভালোই উপলব্ধি করছিলাম।
শাসনের বাঁধন একটু হালকা হতেই বুঝতে পারলাম, আমার মনটাও বদলে গেছে। শিক্ষকদের শাসন আর অনুশাসন আমাদের স্বাধীনতার স্বাদটাই যেন বদলে দিয়েছিল।
বিদ্রোহ তার আসন বদলেছে—সেখানে জন্ম নিয়েছে শ্রদ্ধা।
যে মাস্টারমশাইরা একদিন শাসন করতেন, তাঁদের সেই শাসনের প্রতিই মনে মনে সম্মান জানাতে শুরু করলাম। রাস্তায় দেখা হলে প্রণাম করা, সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়া, মাস্টারমশাইয়ের কাছে কিছু জানতে চাওয়া, কোনো আবদার করা—ইচ্ছেগুলো যেন আবার নতুন করে ডানা মেলতে শুরু করল।
আর মাস্টারমশাইদের একটু কাছাকাছি পৌঁছাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তাঁদের লুকিয়ে থাকা আসল কষ্টটাও।
আমরা যে একদিন এই স্কুল পেরিয়ে চলে যাব—সেই কষ্ট তাঁরা যেন আমাদের চলে যাওয়ার অনেক আগেই নিজেদের মধ্যে বহন করতে শুরু করেছিলেন।
জীবনের এক অসাধারণ উপলব্ধি তখন অনুভব করলাম—
পরাধীনতার মাঝেও স্বাধীনতার কী অপূর্ব স্বাদ!
অনুভূতির স্পর্শে হৃদয়ের মধ্যে যে উপলব্ধির জন্ম হলো, তা আজও আমার সারাজীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে।
আজ শরীর আর মন—দুটোই বড় ভারী। বয়সের ভার এসে চেপে বসেছে মনের ওপর। আদর্শের সেই পথটাও যেন আর কোথাও খুঁজে পাই না। প্রজন্মের চলার পথে কেবলই হোঁচট খাই। মন আর সঙ্গ দিতে চায় না।
তবু চলতে হবে, মানতে হবে, করতে হবে।
পৃথিবীটা আজ অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তির আশীর্বাদে পৃথিবী আজ সবার হাতের মুঠোয়। শহর থেকে গ্রাম—সব বদলেছে। বদলেছে সহনশীলতা ও ধৈর্য। সবার কাছে আজ সময়টা হয়ে উঠেছে বড্ড ছোট।
সমাজের অনেক কিছু ভুলে, অনেক কিছু বাদ দিয়ে আমরা আজ নতুন রূপ নিয়েছি।
আজ আমরা তথাকথিত আধুনিক হয়েছি। কিন্তু আধুনিক মানে শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়। আধুনিক মানে রুচিকে নষ্ট করা নয়।
আধুনিকতা আগেও ছিল, আজও আছে—মাঝখানে বদলেছে শুধু রুচিবোধ।
আজ সরকারি স্কুলের তুলনায় বাণিজ্যিক স্কুল অনেক বেশি। ঝাঁ-চকচকে স্কুলগুলো সহজেই নজর কাড়ে। সরকারি স্কুলগুলো হয়তো সাদামাটা, কিন্তু শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই সেখানে আছে।
এই সরকারি স্কুলে পড়েই আমাদের দেশের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গড়ে উঠেছিলেন। তাঁদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীর কোণে কোণে।
পরাধীনতার ব্যথা মাথায় নিয়েও তাঁরা জয় করেছিলেন সারা পৃথিবী।
বাণিজ্যিক স্কুলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। সঙ্গে বদলে দিয়েছে অভিভাবকদের মানসিকতাও।
আজ স্কুলে শাসন ও অনুশাসনের অনেক কিছুই নেই। সকল ছাত্রছাত্রীকে স্বাধীন করে দেওয়া হয়েছে। আর তার ফলস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের স্বাধীনতার মানসিক ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে, আর পরাধীনতার শিকল পরানো হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মানসিকতায়।
আজ শিক্ষক-শিক্ষিকারা অসহায়।
শাসন বলতে এখন তাঁদের কাছে ধৈর্যের পরীক্ষা। শাসন করতে গেলে কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকেরা তেড়ে আসবেন। কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। এমনও হয়, অভিভাবকেরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন।
একবার ভাবুন তাঁদের কথা।
তাই হয়তো তাঁরা মনে মনে বলেন—
“পরের ছেলে পরমানন্দ,
যতই যাক নিচে—হোক অভিভাবকদের আনন্দ।”
আজকের পরিবেশ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের করেছে পরাধীন, আর ছাত্রসমাজকে করেছে স্বাধীন। আজ শিক্ষকরা তাঁদের অনেক অধিকার হারিয়েছেন। নামটা ঠিক আছে, কিন্তু বাকি সবকিছু বদলে গেছে। আজ শাসন নেই, অনুশাসন হারিয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু শিক্ষা নামের ধারাপাত।
সমাজজীবনের এই বদল দেখে মন বড় উদাস হয়ে পড়ে। কারও কাছে নিজের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতে পারি না—নিজের মানুষদের কাছেও নয়।
এমনকি সন্তানের কাছেও যদি এসব ভাবনা ভাগ করে নিই, তবে হয়তো আমাকেই গুণ, বিয়োগ আর ভাগ করে দেবে!
তবে কি আবার পরাধীন?
নাকি—
বিবেকের কাছে স্বাধীন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়তো জীবন কেটে যাবে।
কারণ, স্বাধীনতা শুধু শৃঙ্খল ভাঙার নাম নয়। কখনও কখনও শাসনের মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায়। আবার কখনও স্বাধীনতার নামের আড়ালেও মানুষ নিজের বিবেকের কাছে পরাধীন হয়ে থাকে।
তাই আজও মনে হয়
স্বাধীনতা আসলে কোথায়?
শাসনের বাইরে,
নাকি নিজের বিবেকের ভিতরে ।


