Tuesday, August 4, 2026


 

বিশ্ব আদিবাসী দিবস

মহঃ সানোয়ার 

প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। এই দিনটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। জাতিসংঘের উদ্যোগে দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন, মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতি সমানভাবে মূল্যবান এবং তা সংরক্ষণ করা মানবসমাজের দায়িত্ব।

আদিবাসীরা একটি দেশের প্রাচীনতম অধিবাসীদের অন্যতম। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও জীবনযাত্রা সংরক্ষণ করে আসছেন। বন, পাহাড়, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে তাদের জীবন গভীরভাবে যুক্ত। প্রকৃতিকে রক্ষা করে টেকসই জীবনযাপন কীভাবে সম্ভব, সে বিষয়ে আদিবাসী সমাজের অভিজ্ঞতা আজও সমগ্র বিশ্বের কাছে এক মূল্যবান শিক্ষা।

ভারত একটি বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে। সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, ভিল, গোঁড, লেপচা, টোটো, খাসি, গারো, নাগা, মিজোসহ অসংখ্য জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, লোকসংগীত, নৃত্য, উৎসব ও সংস্কৃতি আজও ধরে রেখেছেন। পশ্চিমবঙ্গেও সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, লোধা, টোটো, লেপচা, রাভা প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

আদিবাসী সমাজের অন্যতম বড় শক্তি হলো প্রকৃতির প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বনভূমি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ঔষধি উদ্ভিদ সম্পর্কে জ্ঞান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার—এসব ক্ষেত্রে তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান। বর্তমান বিশ্বে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আদিবাসী সমাজের জীবনধারা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।

সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে আদিবাসীদের অবদানও উল্লেখযোগ্য। কৃষিকাজ, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, হস্তশিল্প, বাঁশ ও কাঠের শিল্প, লোকসংগীত, লোকনৃত্য এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার মাধ্যমে তাঁরা জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের শিল্পকর্ম আজ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আজও বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। দুর্গম অঞ্চলে বসবাসের কারণে অনেক শিশু মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, বেকারত্ব, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে বনভূমি ও বসতি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এর ফলে তাদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পৃথিবীর বহু আদিবাসী ভাষা বিলুপ্তির পথে। একটি ভাষা হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সাহিত্য, লোকজ্ঞান ও ঐতিহ্য। তাই মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ভারতের সংবিধান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকনৃত্য, চিত্রপ্রদর্শনী, র‍্যালি এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিশেষ বক্তৃতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আদিবাসী সমাজ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং কোনো ধরনের বৈষম্য বা কুসংস্কারকে প্রশ্রয় না দেওয়া। উন্নয়নের মূল স্রোতে তাদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, তবে সেই উন্নয়ন যেন তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা, অধিকার এবং সুযোগ পাবে।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি মানবতা, সমতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের অভিজ্ঞতা আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও টেকসই করে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তাই তাদের অধিকার রক্ষা, সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

আসুন, বিশ্ব আদিবাসী দিবসে আমরা একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, যেখানে সকল মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও মর্যাদা সমানভাবে স্বীকৃত হবে। বৈচিত্র্যের মধ্যেই রয়েছে আমাদের শক্তি, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিশ্বের ভবিষ্যৎ।


 

নেতাজির টানে স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন  উত্তম কুমার 

বটু কৃষ্ণ হালদার


নেতাজি হলেন এক মহামানব,কারো চোখে ভগবান,জাতীয়তা বাদী দেশ প্রেমিক হিসেবে নেতাজির প্রেমে পড়েনি এমন ভারত বাসী বোধহয় খুব কম।বিশেষ করে দেশের যুব সমাজ তো নয়।তিনি এমন ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, যাঁকে হিটলার ও সমীহ করতেন এ তো কারো অজানা নয়।ঠিক তেমন তাঁর স্বদেশীকতা প্রেমে মত্ত হয়ে  মহানায়ক উত্তম কুমার স্বদেশী কথার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করতে থাকেন।

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় নায়কদের তালিকায় নিশ্চয়ই আসবে উত্তম কুমারের নাম।৭০_৮০ দশকেরই তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম রকস্টার।

চলচ্চিত্র জগতে বাঙালি’ এই কথাটি শুনলে সকলের মানসপটে সর্বপ্রথম যাঁর ছবি ভেসে ওঠে তা হল এক ঝাঁক কোকড়ানো চুল, ফর্সা, চ্যাপটা নাক,রাশভারী মুখ, চওড়া কপাল,মলিন হাসি।তিনি হলেন বাঙালির ম্যাটিনি আইডল।নিজের অভিনয় দক্ষতাকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন। রোমান্টসিজমে মুগ্ধ করেছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীকে।আজ পর্যন্ত বাংলা ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে তাঁর জায়গা নেওয়ার মতো দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পায়নি বঙ্গবাসী। তাইতো তাঁর স্থান আজও শূন্যে পড়ে। তাই আজও অনেকের মুখে বলতে শোনা যায়– বাংলা সিনেমায় নায়ক আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। কিন্তু মহানায়ক একজনই।

শুধু কি তিনি অভিনেতা।কিন্তু এসবের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় বাঙালির এই রোমান্টিক হিরোর জীবনের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। রক্তমাংসের অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের সকল চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের মতো এটিও যেনো চারিয়ে গেলো বাঙালির মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় সত্ত্বায়।তা হলো তাঁর— স্বদেশপ্রীতি।খুব ছোট থেকেই উত্তমকুমার থিয়েটার, নাটক ইত্যাদি করতেন। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আত্মপরিচয় প্রকাশ করা। পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানও লিখতেন তিনি। গোপনে যোগযোগ রাখতেন বিপ্লবীদের সঙ্গে। দেশপ্রেমিক এই মানুষটি বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘তাইতো’ নাটকটির রিহার্সাল চলাকালীন লিখে ফেললেন দেশের জন্যে একের পর এক গান। 

তিনি বিপ্লবীদের মত বন্দুক-পিস্তল দিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে লড়েননি, কিন্তু অভিনয় করতে করতে বারবার তাঁর মাথায় এসেছে একটাই প্রশ্ন – “দেশের জন্যে আমি কি করতে পারি?” এ দিকে তিনি পরিবারের বড় ছেলে।সংসারের ভার এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে। বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বাধ্য হয়ে এক সময় পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিও করতে শুরু করেন। কিন্তু দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতায় কোনও দিন খামতি ছিল না।

মহাত্মা গান্ধী  ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন।মেদিনীপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন ৬৬ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।দেশের পরিস্থিতি উত্তাল। ভবানীপুরে বসে দেশের এই সমস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন ১৬ বছরের এক কিশোর।নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তখনও ‘উত্তমকুমার’ হননি। বন্ধুবান্ধব নিয়ে তিনি নিজের মতো করে ব্রিটিশ অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আর দেশপ্রেমের বীজ রোপণ করছেন দেশবাসীর মধ্যে। তাই পরবর্তীতে উত্তমকুমার নিজের স্মৃতিচারণে বলেন—বন্ধুদের জুটিয়ে ভবানীপুরে প্রভাতফেরি করতেন তাঁরা মাঝেমধ্যেই। হাতে থাকত ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। আর দেশাত্মবোধক গান লিখে সুর দিতেন উত্তম নিজেই। পথে-পথে ঘুরে সবাই মিলে গাইতেন সেই গান।

দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে কলকাতার রাস্তায় বেরিয়েছে প্রভাত ফেরি। নেতাজিকে নিয়ে না শোনা একটি গান গেয়ে এগিয়ে চলেছেন একদল যুবক। গানের কথাগুলি ছিল ঠিক এরকম —

“সুভাষেরই জন্মদিনে গাইব নতুন গান

সেই সুরেতে জাগবে মানুষ,জাগবে নতুন প্রাণ।”

  প্রভাত ফেরির একেবারে সামনের সারিতে থাকা এক যুবক সুরেলা কণ্ঠে বাকিদের সঙ্গে গেয়ে এগিয়ে চলেছেন। তিনিই গানটি লিখেছিলেন এবং সুরও করেছিলেন। যুবকটির নাম অরুণ চট্টোপাধ্যায়। ভবানীপুর অঞ্চলে সকলেই তাঁকে চেনেন। পরবর্তীকালে গোটা যাঁকে দেশ চিনেছে উত্তম কুমার নামে।

এ থেকেই বোঝা যায়– অন্য পাঁচটা বাঙালির মতোই দেশপ্রেমিক মহানায়কেরও মনের মণিকোঠায় দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র অনেকটা জায়গা জুড়ে বিরাজ করতেন । তাইতো তিনি নিজের স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, “আমাদের একমাত্র সহায় তখন নেতাজী। আমরা তখন নতুন আশার বাণীতে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি। 

INA র বীর সৈন্যদের তখন বিচার চলছে দিল্লির লালকেল্লায়। নেতাজি বিমান দুর্ঘটনার নাটকীয়তায় হারিয়ে গিয়েছেন কিন্তু ততদিনে দেশবাসীর মনে তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছেন – দেশপ্রেমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ।‘দিল্লি চলো, চলো দিল্লি’ মন্ত্রে জেগে উঠেছে দেশবাসী। দেশের সর্বত্র নেতাজির INA সৈন্যদের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছে।দেশের এইরূপ পরিস্থিতিতে একদিন উত্তমকুমার সোজা চলে গেলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য বিপ্লবী সতীশচন্দ্র বসুর কাছে। তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি আপনাদের জন্যে কি করতে পারি বলুন?

সতীশচন্দ্র উত্তমকে কিছু আর্থিক সাহায্য করতে বলেন কারণ মামলার খরচ চালানোর জন্য তখন অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেই সময় উত্তমকুমারের উদ্যোগে লুনার ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি চ্যারিটি শো আয়োজিত হয়। সেই শো তে মঞ্চস্থ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস। সেই শো-এর টিকিট বিক্রি করে ১৭০০ টাকা জোগাড় করেছিলেন উত্তম কুমার। ১৯৪৬ সালে দাঁড়িয়ে এই টাকার মূল্য নেহাৎই কম কিছু ছিল না।সেই টাকা সতীশ চন্দ্র বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

সবশেষে বলি, ১৯৭৭ সালে ‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের’ ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে নির্মিত পিযুষ বসু পরিচালিত ‘সব্যসাচী’ সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতায় মানুষটি যেমন জয় করেছেন দেশবাসীর মনন, তেমনি নিজের সমগ্র জীবন দেশপ্রেমের বাতাবরণে ছেয়ে নির্মাণ করেছেন নিজ চরিত্রের সুদৃঢ় গড়ন।একদিকে তিনি মহা নায়ক অন্যদিকে হৃদয়ে বসিয়েছিলেন স্বদেশকে।তাঁর স্বদেশ নামক হৃদয়ে নিঃসন্দেহে ভগবানের আসন পেয়েছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।


 



স্বাধীনতার স্বাদ

 

প্রদীপ মুখুটী


স্বাধীনতার স্বাদ আমরা তেমন করে কেউ হয়তো পাইনি রক্তঝরা দিনগুলোর কথা ইতিহাসের পাতায় ছাপাসে সব যেন রক্ত দিয়েই ছাপা বলে মনে হয় এক-একজন মহান মানুষের বলিদান আজও মনে প্রশ্ন জাগিয়ে যায়

মাটিতে ঝরা রক্তের রং ছিল লাল, আর সেই রক্তে ভেজা মাটির গন্ধও ছিল এক তফাতটা পরে গড়ে উঠেছিল কারণ? কারণটা আজ নাই-বা তুলে ধরলাম

ইংরেজ ভারত ছাড়ো”,

তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—

এইসব পড়তে পড়তে সেই ছোট্ট মনটা একসময় বেশ স্বাধীনতা সংগ্রামী হতে চাইত অবুঝ মনের কোনো এক কোণে প্রতিবাদের বারুদ নাড়া দিত তাই এরকম বই পড়ার ইচ্ছের জোগান বাড়ির বড়দের কাছ থেকেই পেতাম

ছোটবেলার গল্পের বই কিংবা ইতিহাসের পাতায় রঙিন হয়ে থাকত সেই স্বাধীনতার কথা আর ইতিহাসের কথা বলতে গেলে স্কুলের কথা আসবেই

মাস্টারমশাইরা বলতেন

ইতিহাস তো গল্প! এই গল্পটা মনে রাখতে পারিস না?”

সেই সময় মাস্টারমশাই যতই বলুন, ইতিহাস গল্পমন সায় দিত না মাথায় যে ছিল শুধু পড়া আর পড়া সেই চাপই ছিল এক জুজু আর সেই জুজুই ইতিহাসকে গল্প বলে মনে করতে দিত না

সমাধান ছিল মুখস্থবিদ্যা আর সেই বিদ্যাকেই মাথা পেতে নিলাম

বেশ মনে আছে, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় কাগজ-কলমের কাজ সেরে বাবা আমায় বললেন— “এবার মাস্টারমশাইকে প্রণাম করো

আমি প্রণাম সেরে উঠতেই বাবা বললেন

আপনার ছেলে ছাত্র অন্যায় করলে বা পড়াশোনায় অবহেলা করলে বেত্রাঘাতে কার্পণ্য করবেন না

মাস্টারমশাই একটু হেসে বললেন

সে হবে, ক্ষণ

সেই ক্ষণেই স্কুলজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলাম

স্কুল ছিল শাসন অনুশাসনের এক মন্দির শিক্ষার সঙ্গে এই দুটিকে নিয়েই চলতে হতো অনুশাসন ছিল সময়ানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলার দীর্ঘ পথ আর শাসন? সে ছিল বেত্রাঘাত, ‘থ্রোয়িং দ্য ডাস্টার’—মানে, হুম, ডাস্টার ছোড়াআর প্রতিদিন কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা

এটাই ছিল প্রায় রোজকার নামতা

সেই সময় পিটুনি খাওয়ার পর মনে বিদ্রোহ জাগলেও সাহসে ছিল বড় টান শাসনটা ছিল বড়ই কঠিন তাই শাসনের কাছে নতিস্বীকার করেই একের পর এক ক্লাস পার করতে হতো

সঙ্গে ছিল খেলাধুলা স্পোর্টসের পাশাপাশি ছিল ড্রিল, প্যারেড, ব্রতচারীকিন্তু সেখানেও শাসন অনুশাসনের কোনো ছাড় ছিল না

মন তার ডানা মেলে উড়তে চাইত কিন্তু সেই ডানা মেলতে পারা ছিল বড় কঠিন ইচ্ছেগুলো জন্ম নিয়েই যেন মৃত্যুবরণ করত ডানার অব্যবহারে ছোট্ট মনের আকাশে দেখা স্বপ্নগুলো একসময় মনের বানে ভেসে যেত

এই পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পাওয়ারও যেন কোনো উপায় ছিল না জীবন-কাণ্ডারি বাবা-মা কিংবা পরিবারের কারও কাছে নিজের ইচ্ছের সমর্থন আদায় করতে গেলেই, আর এক দফা শাসনের দায়ভার নিতে হতো

তাই মনের মধ্যে সবকিছু চেপে রেখে একের পর এক ক্লাস পার করে বড় হতে লাগলাম ঘরে স্কুলে পড়াশোনার সম্মোহনে আবদ্ধ হয়ে পড়লাম

সময়ের সঙ্গে যেমন বাড়ল বয়স, তেমনই বাড়ল ক্লাসের সংখ্যা বেশ বড় হয়ে গিয়েছি তখন বয়সের হিসেবেও যেন দুই অঙ্কে পৌঁছে গেছিদশম শ্রেণিতে

তখন ঘরে-বাইরে দুটোই একটু একটু করে আলাদা হতে লাগল স্কুলে শাসনের ধরনটাও যেন একটু বদলে গেল এখন আর শুধু বেত্রাঘাত বা কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখার শাসন নয়এখন ফল ভালো করতেই হবে সবার নজর পড়ল সেদিকেই ঘরেও ঠিক তেমনই

সময়কে মূল্য দিতে শেখানো হচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা আবার সেই সময়েই নিজের পছন্দের খাবারের আবদারও রাখতে শুরু করেছি সঙ্গে বেশ গুরুত্বও পাওয়া যাচ্ছে সেই উপভোগটা ভালোই উপলব্ধি করছিলাম

শাসনের বাঁধন একটু হালকা হতেই বুঝতে পারলাম, আমার মনটাও বদলে গেছে শিক্ষকদের শাসন আর অনুশাসন আমাদের স্বাধীনতার স্বাদটাই যেন বদলে দিয়েছিল

বিদ্রোহ তার আসন বদলেছেসেখানে জন্ম নিয়েছে শ্রদ্ধা

যে মাস্টারমশাইরা একদিন শাসন করতেন, তাঁদের সেই শাসনের প্রতিই মনে মনে সম্মান জানাতে শুরু করলাম রাস্তায় দেখা হলে প্রণাম করা, সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়া, মাস্টারমশাইয়ের কাছে কিছু জানতে চাওয়া, কোনো আবদার করাইচ্ছেগুলো যেন আবার নতুন করে ডানা মেলতে শুরু করল

আর মাস্টারমশাইদের একটু কাছাকাছি পৌঁছাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তাঁদের লুকিয়ে থাকা আসল কষ্টটাও

আমরা যে একদিন এই স্কুল পেরিয়ে চলে যাবসেই কষ্ট তাঁরা যেন আমাদের চলে যাওয়ার অনেক আগেই নিজেদের মধ্যে বহন করতে শুরু করেছিলেন

জীবনের এক অসাধারণ উপলব্ধি তখন অনুভব করলাম

পরাধীনতার মাঝেও স্বাধীনতার কী অপূর্ব স্বাদ!

অনুভূতির স্পর্শে হৃদয়ের মধ্যে যে উপলব্ধির জন্ম হলো, তা আজও আমার সারাজীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে

আজ শরীর আর মনদুটোই বড় ভারী বয়সের ভার এসে চেপে বসেছে মনের ওপর আদর্শের সেই পথটাও যেন আর কোথাও খুঁজে পাই না প্রজন্মের চলার পথে কেবলই হোঁচট খাই মন আর সঙ্গ দিতে চায় না

তবু চলতে হবে, মানতে হবে, করতে হবে

পৃথিবীটা আজ অনেক বদলে গেছে প্রযুক্তির আশীর্বাদে পৃথিবী আজ সবার হাতের মুঠোয় শহর থেকে গ্রামসব বদলেছে বদলেছে সহনশীলতা ধৈর্য সবার কাছে আজ সময়টা হয়ে উঠেছে বড্ড ছোট

সমাজের অনেক কিছু ভুলে, অনেক কিছু বাদ দিয়ে আমরা আজ নতুন রূপ নিয়েছি

আজ আমরা তথাকথিত আধুনিক হয়েছি কিন্তু আধুনিক মানে শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয় আধুনিক মানে রুচিকে নষ্ট করা নয়

আধুনিকতা আগেও ছিল, আজও আছেমাঝখানে বদলেছে শুধু রুচিবোধ

আজ সরকারি স্কুলের তুলনায় বাণিজ্যিক স্কুল অনেক বেশি ঝাঁ-চকচকে স্কুলগুলো সহজেই নজর কাড়ে সরকারি স্কুলগুলো হয়তো সাদামাটা, কিন্তু শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই সেখানে আছে

এই সরকারি স্কুলে পড়েই আমাদের দেশের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গড়ে উঠেছিলেন তাঁদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীর কোণে কোণে

পরাধীনতার ব্যথা মাথায় নিয়েও তাঁরা জয় করেছিলেন সারা পৃথিবী

বাণিজ্যিক স্কুলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অনেক কিছু বদলে দিয়েছে সঙ্গে বদলে দিয়েছে অভিভাবকদের মানসিকতাও

আজ স্কুলে শাসন অনুশাসনের অনেক কিছুই নেই সকল ছাত্রছাত্রীকে স্বাধীন করে দেওয়া হয়েছে আর তার ফলস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের স্বাধীনতার মানসিক ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে, আর পরাধীনতার শিকল পরানো হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মানসিকতায়

আজ শিক্ষক-শিক্ষিকারা অসহায়

শাসন বলতে এখন তাঁদের কাছে ধৈর্যের পরীক্ষা শাসন করতে গেলে কর্তৃপক্ষ অভিভাবকেরা তেড়ে আসবেন কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে এমনও হয়, অভিভাবকেরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন

একবার ভাবুন তাঁদের কথা

তাই হয়তো তাঁরা মনে মনে বলেন

পরের ছেলে পরমানন্দ,

যতই যাক নিচেহোক অভিভাবকদের আনন্দ

আজকের পরিবেশ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের করেছে পরাধীন, আর ছাত্রসমাজকে করেছে স্বাধীন। আজ শিক্ষকরা তাঁদের অনেক অধিকার হারিয়েছেন নামটা ঠিক আছে, কিন্তু বাকি সবকিছু বদলে গেছে আজ শাসন নেই, অনুশাসন হারিয়ে গেছে পড়ে আছে শুধু শিক্ষা নামের ধারাপাত

সমাজজীবনের এই বদল দেখে মন বড় উদাস হয়ে পড়ে কারও কাছে নিজের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতে পারি নানিজের মানুষদের কাছেও নয়

এমনকি সন্তানের কাছেও যদি এসব ভাবনা ভাগ করে নিই, তবে হয়তো আমাকেই গুণ, বিয়োগ আর ভাগ করে দেবে!

তবে কি আবার পরাধীন?

নাকি

বিবেকের কাছে স্বাধীন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়তো জীবন কেটে যাবে

কারণ, স্বাধীনতা শুধু শৃঙ্খল ভাঙার নাম নয় কখনও কখনও শাসনের মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায় আবার কখনও স্বাধীনতার নামের আড়ালেও মানুষ নিজের বিবেকের কাছে পরাধীন হয়ে থাকে

তাই আজও মনে হয়

স্বাধীনতা আসলে কোথায়?

শাসনের বাইরে,

নাকি নিজের বিবেকের ভিতরে