Friday, May 1, 2026


 

বিশেষ বাছাই ভ্রমণ 

রাখিগোড়ি: এক ঐতিহাসিক স্থান

               চিত্রা পাল 


রাখিগোড়ি হরিয়ানার হিসার জেলার এক নাম না জানা গ্রাম যাকে দুদশক আগেও কেউ চিনতো না।ঊসর মরুভূমির মতো এ জায়গা পড়েছিলো শতকের পর শতক। কিছু বছর আগে  খোঁজ পাওয়া যায় এখানে মাটির নীচে লুকিয়ে আছে আস্ত একখানা শহর।সে খোঁজ পাওয়া গিয়েছিলো বটে কিন্তু আমি তখনও জানতাম না,আমার কর্ণোগোচর হয়নি। গতবছরে শুনেছিলাম একবার, তাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।এবার সুযোগ হলে আর হাত ছাড়া না করে এক সকালে বেরিয়েপড়লাম, সঙ্গে আমার ইতিহাস পাঠরতা নাতনী কাজেই একেবারে সোনায় সোহাগা।

সকাল সকাল বেরিয়েও পৌঁছতে আমাদের এগারো সাড়ে-এগারোটা হয়ে গেলো। সূর্য প্রায় মাথার ওপরে,অন্য সময় হলে তার বিভায় আমাদের করে শেষ করে দিতো,এদিন কি কারণে জানিনা,তার বিভা থাকা সত্ত্বেও, হাওয়া ছিলো ঠান্ডা,মনোরম, তাই ওই দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি প্রায় প্রান্তরে  আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি।

রাখিগড়ি বা রাখিগড়াই ভারতের হরিয়াণা রাজ্যের হিসার জেলার একটা গ্রাম। দিল্লী থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার বা আরেকটু বেশি হয়তো দূরে উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। এটি সিন্ধু সভ্যতার সময়কার এক বসতি স্থান যা প্রায় ৬,৫০০খৃষ্টপূর্বাব্দে গড়ে উঠেছিলো।

এ জায়গাটায় খনন কার্য চলেছে বলে এখানে সবই অস্থায়ী। একটা মিউজিয়াম আছে।,শুনলাম আগে ছিলো না এখন হয়েছে সেটাও অস্থায়ী, সেখানেই আগে গেলাম।এখানকার প্রত্নত্তাত্বিক খননের থেকে পাওয়া সব জিনিসের একটা প্রদর্শনী কক্ষ।এখানে পোড়া মাটির জিনিস পত্রই বেশি।  পোড়ামাটির কি নেই, সব আছে। সংসারের ব্যবহার্য তৈজসপত্র থেকে ঘর সাজানোর জিনিস পত্র গহনাগাঁটি সব। একটা মানুষের কঙ্কালও দেখলাম।পাঁচ ছয়হাজার বছর আগে সে হয়তো এ চত্বরেই ঘুরে বেড়াতো।   

রাখিগড়িতে সাতটি ঢিবির এক চত্বর রয়েছে।আরও আশেপাশে অনেকগুলো ঢিবি আছে। সব একসঙ্গে নির্মিত নয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আরও কিছু আবিষ্কারের ফলে এটি সিন্ধুসভ্যতার  সবচেয়ে বড় স্থান হয়ে উঠলো। আমরা দেখলাম কি ভাবে মাটি খুঁড়ে বসত বের করেছে। জায়গাটা খুবই অসমতল। আমার পক্ষে হেঁটে ঘোরা অসুবিধেজনক। তবুও দেখার চেষ্টা করলাম।  একটা যন্ত্রের সাহায্যে আগে ভূপৃষ্ট থেকে বোঝার চেষ্টা করা হয় নীচে কিছু আছে কিনা। তার সংকেত থেকে ক্রমে ক্রমে ভূ গর্ভে এগিয়ে যাওয়া। একটা প্রশ্বস্ত চত্বরে আয়তাকার জায়গা জুড়ে সাদা দড়ির সীমানা করা।সেই জায়গাটা আর একটা দড়ি দিয়ে দাবা খেলার ঘরের মতো খোপ কাটা, আর তাতে এক দুই করে পরপর সংখ্যা লেখা।সেই সংখ্যার তলায় একটা নাম লেখা। আমি জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারলাম,এই যে শ্রমিকরা কাজ করছে,তাদের প্রত্যেকের কাছে নাম্বার আর নাম লেখা চাকতি আছে। ওরা অনেকেই নিজেদের লেখা নাম পড়তে পারে না। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে কেউ যদি কিছু পায়,তাহলে তার নম্বর তো চেনে,সেই নম্বর লেখা খোপে রেখে দেবে।তাহলে কে কোথায় এই জিনিস পেয়েছে তা সহজেই বোঝা যাবে।এখানে চারদিকে পোড়ামাটির জিনিস্ পত্রের টুকরো ছড়ানো।সেখান থেকে আমি গোটা কয়েক তুলে আমার কুক্ষিগত করে নিই। 

ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে থমকে গেলাম। এখানে  বড় আকারের খনন কার্য হয়েছে।এর মাথায় বেশ বড় করে ছড়ানো টিনের আচ্ছাদন কাঠের খুঁটির ওপরে করা। সেখানে দেখা গেলো সেই কত হাজার বছর আগেকার ঘর। গাইড আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, এইটা খুব সম্ভব একটা দোকান ঘর ছিল।এই উঁচু জায়গাটায় বেচা কেনা চলতো। পাশে লম্বা মত বসবার জায়গা। সেখানে লোকজন এসে বসতো। আমরা কল্পনা করে নিলাম হাজার হাজার বছর আগে এখানে কেমন লোক জন এসে আড্ডা দিতো। এখানে  জলের পাইপ বা লাইন সব পোড়া মাটির পাওয়া গ্যাছে। তখন তো ধাতুর ব্যবহার ছিলো না। সাধারণ সব কাজে পোড়া মাটির ব্যবহার খুব ছিলো। 

রাখিগড়ি জায়গাটা  প্রাগৈতিহাসিক দৃষদ্বতী নদীর উপত্যকায় অবস্থিত, যার উত্‌পত্তি শিবালিক পাহাড়ে। এর আকার ও অনন্যতাকে বিশ্বজুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা গুরুত্ব দিয়েছে।.২০১২ সালের মে মাসে  গ্লোবাল হেরিটেজ ফান্ড একে এক ঐতিহ্যবাহী স্থান বলে ঘোষণা করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা, এই জায়গাটায় ঠিক মতো পাহারাদারি নেই। খনন থেকে বের করে আনা জিনিসপত্র স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে সহজে। 

দিনের আলো নেভার আগে হাজার হাজার বছরের পুরোনো শহর থেকে বেরিয়ে এলাম আমার বর্তমান জগতে। তবে কল্পনা পাক খেতে লাগলো সেইসময় জুড়ে।।     






 

ভ্রমণ 

সুইডেনে 

মিত্রা রায়চৌধুরী

প্রথমবার বিদেশ ছেলে থাকার কারনে আমার কয়েকবার সুইডেন যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রথমবার বিদেশে যখন যাই, দুরুদুরু বক্ষে গিয়েছিলাম।  নিয়ম-শৃঙ্খলার বাঁধনে পড়ে যাতে পথে কোন অসুবিধায় না পড়তে হয়, সে ব্যাপারে আমরা স্বামী-স্ত্রী এবং আমার ছেলেও খুব চিন্তিত ছিলাম। সেই সময় ভিসার জন্য আমাদের দিল্লী গিয়ে ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। পক্স হওয়ার কারণে ভিসা বাতিলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। যাইহোক সব প্রস্তুতি শেষ করে আমরা দমদম থেকে দুবাই হয়ে সুইডেনের একটি শহর "উপশালা"-তে পৌঁছাই। তখন ছেলে ওখানেই থাকতো।

উপসালা সুইডেনের একটি বড় শহর ও শিক্ষা কেন্দ্র বহু ছাত্র-ছাত্রী ওখানে পিএইচডি এবং পোষ্টডক করতে যায়। খুব ভালো লেগেছিল দেখে কলকাতার এক বাঙালি দম্পতির তত্ত্বাবধানে বহু ছাত্র-ছাত্রী ওখানে পোস্ট ডক করছে।। অনেক গল্প হয়েছিল তাদের সাথে এবং আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম ওনাদের কাছ থেকে। সব প্রশ্নই ছিল ওই দেশ ওখানকার অধিবাসীদের সম্বন্ধে। 

প্রথমেই বলি ওই দেশটি সম্পর্কে কয়েকটি কথা। প্রকৃতির মধ্যে বসবাস করে ওখানকার মানুষেরা, শহরের কোলাহল থেকে দূরে গাছপালা বেষ্টিত স্থানে এদের বসতবাটি। সুইডিসরা খুব নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলে। প্রকৃতিকে এরা সযত্নে রক্ষা করে। ঘাসকেও ওরা পদদলিত করে না। যেসব গাছপালাকে আমরা আগাছা বলে কেটে ফেলি সেগুলি দিয়েই তারা বাড়ির বাউন্ডারি তৈরি করে। নিয়মিত বাগানের ঘাস কাটা বাধ্যতামূলক। যন্ত্রপাতির সাহায্যে সব কাজ এরা নিজেরাই করে। এরা পশু প্রেমিক।  এক এক জনের বাড়িতে দুই তিনটি করে বিড়াল কুকুর থাকে। এদেরকে এরা নিজেদের সন্তানের মত মানুষ করে ও যত্ন ভালোবাসায় লালন-পালন করে। কোথাও বেড়াতে গেলে এদের হয় নিয়ে যায় সাথে, অথবা ক্রেসে রেখে যায়। প্রত্যেকের বাড়িতে গাড়ি থাকলেও এরা সাইকেল চড়তে খুব ভালোবাসে এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে।

উপশালা থেকে আমরা ডেনমার্ক ভ্রমনে গিয়েছিলাম দ্রুত গতি সম্পন্ন বুলেট ট্রেনে। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম ওই পথে ট্রেনটি বেশ কিছুটা পথ সমুদ্রের তল দিয়ে গিয়েছিল। ডেনমার্কের জাতীয় বাহন সাইকেল। স্টেশনে একটি বিরাট সাইকেল দেওয়ালে রাখা আছে ওর নিদর্শন হিসাবে। সুইডেন এবং ডেনমার্কের অধিবাসীরা খুবই ভদ্র। ওদের থেকে জেনে নিয়ে আমরা অনেক পথ হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছি এবং দেশটাকে দেখেছি কখনোই  ওরা আমাদের ভুল পথনির্দেশ দিয়ে হয়রান করেনি। সিঙ্গেল ফেয়ার ডবল জার্নি এই বিষয়টা ডেনমার্কের চালু আছে আমরা সেটা জানতামই না কিন্তু যতবার আমরা বাসে যাতায়াত করেছি ড্রাইভার আমাদের এটা মনে করিয়ে দিয়েছে, ভিনদেশী বলে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে এবং ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়েছে।

এরপর টাইটানিক-এর মত একটি বড় জাহাজে করে আমরা গিয়েছিলাম ফিনল্যান্ড। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি ছিল আমাদের গন্তব্য। সারা দিন ওখানকার দর্শনীয় সব দেখে এবং কিছু কেনা কাটা করে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম-এ ফিরে আসি পরের দিন। জাহাজে প্রচুর আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল। আমরা শুধু মাত্র দর্শক ছিলাম। অবাক বিস্ময়ে  দেখেছি কেবল। কিছুতেই অংশগ্রহন করিনি।

শীতের তীব্রতা সহ্য করতে কষ্ট হবে বলে প্রতিবারই গরমকালে আমরা গেছি সুইডেনে। দেখেছি অপূর্ব ফুলের সমারহ। বাড়ি,রাস্তার ধারে, স্টেশন চত্বরে সব জায়গায় বর্ণময় ফুলের সমারহ। সাজানো গোছানো ছবির মতন সব শহরগুলি। লোক সংখ্যা কম বলে কোথাও যানজট নেই। রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম খুবই সুন্দর। যারা হেটে যায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সবই গৃহপালিত পশু তাই রাস্তা কখনো নোংরা হয় না। ইউরোপের অনেক জায়গা দেখে আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও এক ভাগ স্থল কথাটা খুব সত্যি।  অনেক নদী রয়েছে সেখানে। বাল্টিক সমুদ্র সেখানে শান্ত স্থির। বিশাল সমুদ্র নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। 

এবার আসি সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম শহরে বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গে। প্রথমবার গেলাম উপসালা থেকে যেতে এক ঘন্টা লাগে।তখন আমার ছেলের গাড়ি ছিল না। নতুন গেছে বিদেশে। আমাদের বাসের টিকিট কেটে দিয়েছিল আর বলেছিল কি কি দেখে আমরা ফিরে আসব। র্পৌছালাম স্টকহোম।ইতস্ততভাবে এদিক ওদিক ঘুরে রাজবাড়ী আর মিউজিয়াম  দেখলাম কিন্তু বুঝলাম ঠিক মতো দেখা হচ্ছে না। তখন  টিকিট কেটে উঠে বসলাম একটি টুরিস্ট বাসে। যার নাম "হপ অন হপ অফ "মাথা খোলা বাসটিতে বসে খুবই আনন্দ পেলাম। সব দর্শনীয় স্থান দেখে যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানেই আবার নামলাম। কিন্তু সেদিন আসল স্থানটি দেখা হয়নি। পরে আসছি সেই বিষয়ে। মজা হল ফেরার সময় বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি উপশালার  বাস নেই সেখানে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম চার তলায় যেতে হবে। ওখান থেকেই টিকিট দেবে এবং উপশালার বাস ছাড়বে। ভাবতেই পারিনি যে বাস স্ট্যান্ড আবার চারতলা হয়।উপরে উঠলাম দেখলাম লোকটা সঠিক তথ্য দিয়েছে যাক নিশ্চিন্ত হলাম।

এইভ্রমণ কাহিনীর একবারে শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। এবার লিখব আমার অসাধারণ অনুভূতির কথা যেখানে গিয়ে আমি সবচাইতে বেশি আনন্দ পেয়েছি। এবার ছেলে আমাকে নিয়ে গেল রাজধানী স্টকহোম-এর নোবেল মিউজিয়াম দেখাতে। মিউজিয়ামে ঢুকতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। রবীন্দ্র সংগীত বাজছে কণিকা ও সুচিত্রা মিত্রের কন্ঠে, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিশাল ছবি। গাইড নেওয়া হলো। গাইড আমাদের পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখালেন। কোথায় নোবেল প্রাইজ দেয়, কোন কোন বিষয়ের উপর দেওয়া হয়, কার নামে দেওয়া হয় সবকিছু বিস্তারিত বললেন। নোবেল প্রাইজ দেওয়ার দিন যে কক্ষে গ্র্যান্ড ডিনার হয় সেটাও দেখলাম। মহা মূল্যবান ধাতুতে তৈরি ডিনার সেটে খাবার পরিবেশন করা হয় সেই সেটগুলো দেখার মত। এখন পর্যন্ত যারা নোবেল পেয়েছেন তাঁদের ছবি পর্দায় ভেসে উঠছে। এক এক করে নিচে মেঝেতেও সমস্ত নোবেল লরিয়েটদের ছবি খোদাই করা আছে। আমাদের প্রিয় কবির প্রতিকৃতি দেখে আর তার লেখা গান শুনে চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। পরের বারও গিয়ে ছেলেকে বললাম ওখানে আবার যাব। ওটা আমার তীর্থক্ষেত্র। 



 

ভ্রমণ 

ব্যাঙ্গালোরে কয়েক দিন 

চন্দ্রানী চৌধুরী 

ব্যাঙ্গালোরের ঘোরার জায়গা বলতে বেশির ভাগই পার্ক। কিন্তু আমার প্রিয় বিষয় যেহেতু ইতিহাস, সেজন্য আমি ঐতিহাসিক স্থান খুঁজে বের করার  চেষ্টা করেছি। 

আমরা প্রথম দিন গেলাম ব্যাঙ্গালোর প্যালেস দেখতে। ও হ্যাঁ আগেই জানিয়ে রাখি আমরা যেখানে ছিলাম সেই জায়গাটির নাম কেম্পাগৌরা রোড, মাইসোর ব্যাঙ্ক সার্কেল; ভূমিকা থিয়েটারের একদমই কাছে। এই জায়গাটি সেন্ট্রাল ব্যাঙ্গালোরে। ওখান থেকে ব্যাঙ্গালোর প্যালেস মাত্র ৩ কিলোমিটার। 

ওখানে পৌঁছে দেখি লোকে লোকারণ্য। শুনলাম এখন প্যালেসের একটি অংশ বিয়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। সেদিন বিয়ের বিশাল আয়োজন চলছিল। আমরা টিকিট কেটে পাশের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। 
বেঙ্গালুরু প্যালেস বেঙ্গালুরু শহরের প্রধান আকর্ষণ। ভারতের কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে ইংল্যান্ডের উইন্ডসর প্রাসাদের অনুকরণে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদ। প্রবেশদ্বার থেকে এক সুবিশাল লন পেরিয়ে মূল প্রাসাদে পৌঁছালাম। প্রথম দেখাতেই উঁচু টাওয়ার আর রঙিন কাঁচের খোলা অংশগুলো দেখে মনে হচ্ছিল আমি উইন্ডসর দুর্গের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। প্রাসাদটি টিউডর এবং স্কটিশ গথিক স্থাপত্যের একটি মিশ্রণ। এটি ১৮৭৪ সাল থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে মহীশূরের তরুণ মহারাজা চামরাজেন্দ্র ওয়াদিয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি মূলত ওয়াদিয়ার রাজবংশের বসবাসের জন্য বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল হাই স্কুলের প্রথম অধ্যক্ষ রেভারেন্ড জন গ্যারেটের মালিকানাধীন একটি এলাকায় তৈরি করা হয়েছিল । 
ওয়াদিয়াররা কাগজে কলমে কেবল মহীশুরের শাসক ছিলেন। প্রকৃত প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতেই ছিল।  প্রকৃতপক্ষে, তারা ছিলেন নাবালক রাজার জন্য নিযুক্ত অভিভাবক এবং তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন।

প্রাসাদটিতে মোট ৩৫টি ঘর আছে। এটি কাঠ ও গ্রানাইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। প্রাসাদটিতে দরবার হল, বলরুম, এবং থ্রোন রুম সহ বিভিন্ন কক্ষ রয়েছে, যা রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হতো।রাজবংশের লোকেদের ব্যবহৃত জিনিস এখানে রাখা হয়েছে। প্রাসাদে রাজ পরিবারের সদস্যদের কয়েক হাজার ছবি রয়েছে। মহীশূরের মহারাজা একটি প্রতীকী অস্ত্র দিয়েছিলেন। প্রতীকটিতে ওয়াদিয়ারদের প্রতীক রয়েছে যা গন্ডা ভেরুন্ডা নামে পরিচিত। এটি কেন্দ্রে দুই মাথাওয়ালা পাখি। এছাড়া আছে হাতির মাথা এবং সিংহের দেহ ইত্যাদি মহারাজার শিকার করা নানা প্রানী।

বেঙ্গালুরু প্রাসাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল এর বলরুম। এর কাঠের সিলিং এ রয়েছে সুন্দর ঝাড়বাতি । বলরুমটি তার রঙ এবং আলোর মিশেলে বেশ চিত্তাকর্ষক।ওপরে যাবার জন্য আছে একটি সাধারণ কাঠের সর্পিল সিঁড়ি। তবে এর ওপরে সুন্দর জিনিসপত্র রয়েছে। এককোণে রাখা হয়েছে সুন্দর ল্যাম্প এবং প্রাচীন ফুলদানি। প্রাসাদের বিশেষ আকর্ষণ হল দরবার হল। এটি সত্যিই খুব সুন্দর। এর অসাধারণ ঝাড়বাতি, হলুদ ও সোনালী কাজ, রঙিন কাচ এবং রাজকীয় আসবাবপত্র সব মিলিয়ে অপূর্ব লাগছিলো। তবে এটিকে পাশ থেকে দেখতে হবে। কারণ এখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এখানেই রঙিন কাচের জানালাগুলো দেখা যায়। দরবার হলে মহিলাদের জন্য পর্দা দিয়ে ঢাকা একটি বিভাজন ছিল।

প্রাসাদের করিডোরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবারের রঙিন বা সাদা কালো ছবি আছে। সেই সাথে আছে মহারাজদের আঁকা নানা ছবি। এর মধ্যে রয়েছে রাজা রবি বর্মার আঁকা মূল্যবান ছবি। নানারকম সাইড টেবিল, ড্রেসিং টেবিল,  মহারাজার কয়েকটি লেখার ডেস্ক সেখানে রয়েছে। প্রশস্ত খোলা গথিক এবং টিউডর স্টাইলে খোদাই করা করিডোর গুলো দৃষ্টিনন্দন। প্রাসাদের মহারানীর মহলে উঠোনের মাঝখানে একটি ঝর্ণা আছে । তবে বর্তমানে সেটা শুকিয়ে গেছে। করিডোরে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে রাজ পরিবারকে দেওয়া নানা উপহার রাখা আছে। এছাড়া ওয়াদিয়ার বেঙ্গালুরু প্রাসাদে অনেকগুলো রঙিন ঝাড়বাতি রাখা আছে। এই ঝাড়বাতিগুলো বেঙ্গালুরু প্রাসাদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও মহারাজার অফিস, রাজপরিবারের পোশাক, তাদের নানা রকম উৎসবের পোশাক,  প্রাসাদের সামনের মনোরম বাগান ঘুরে ঘুরে দেখতে পাওয়া যায়। ঘরগুলি সরকারি এবং বেসরকারি দুই ভাগে বিভক্ত। বাঁ দিকের প্রবেশদ্বার দিয়ে জনসাধারণ টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। ডানদিকের অংশটি মহারাজা এবং তাঁর পরিবারের বসবাসের জন্য। তবে এটি ভিতর থেকে প্রাসাদের জনসাধারণের এলাকার সাথে যুক্ত। চিত্তাকর্ষক এই প্রাসাদটি ২০০৫ সাল থেকেই  জনসাধারণের জন্য  খুলে দেওয়া হয়েছে। তার আগে এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ব্যাঙ্গালোর প্রাসাদ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি বেঙ্গালুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক এবং দক্ষিণ ভারতের রাজকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি প্রতীক। বেঙ্গালুরু প্যালেস গ্রাউন্ডে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে।বেঙ্গালুরুতে ওয়াদিয়ার প্যালেসে অনেক জনপ্রিয় সিনেমার শুটিংও  হয়েছে।

ব্যাঙ্গালোর প্রাসাদের বর্তমান মালিক হলেন ওয়াদিয়ার রাজবংশের বংশধর শ্রী যদুবীর কৃষ্ণদত্ত চামরাজ ওয়াদিয়ার। তবে প্রাসাদের তত্ত্বাবধান এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রমোদ দেবী ওয়াদিয়ার যিনি মহীশূরের বিখ্যাত রাজপরিবারের বংশধর। প্রাসাদের মালিকানা নিয়ে কিছু আইনি বিতর্ক রয়েছে, তবে বর্তমানে এটি ওয়াদিয়ার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

পরদিন আমরা সকালেই বেড়িয়ে গেলাম টিপু সুলতানের সামার প্যালেসের উদ্দেশ্যে। ব্যাঙ্গালোরের স্থাপত্য গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজের কাছে কৃষ্ণ রাজেন্দ্র মার্কেট মেট্রো স্টেশনের একদম কাছেই অবস্থিত 'টিপু সুলতানের সামার প্যালেস' বা "গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ"। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে টিপু সুলতান সামার প্যালেসের দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। 

এটি ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি গ্রীষ্মকালে মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের জন্য শীতল আরামদায়ক বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হত। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এই প্রাসাদটিকে ইংরেজরা তাদের সচিবালয় হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।  টিপু সুলতানের সামার প্যালেসের ইতিহাস খুবই উল্লেখযোগ্য। টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলি ওয়াদিয়ারদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর প্রশাসনিক কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য বেঙ্গালুরু চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই ১৭৭৮  খ্রীষ্টাব্দে  তিনি বেঙ্গালুরু দুর্গের দেওয়ালের ভেতরে প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন।  কিন্তু প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

পরবর্তী কালে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে টিপু সুলতান এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন এবং এখানে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম হত। আবার অনেকের মতে টিপু সুলতান এটিকে গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। প্রাসাদের চারপাশে একটি মনোরম বাগান রয়েছে। সামনের বিশাল লন পেরিয়ে আমরা মূল প্রাসাদে পৌঁছালাম।  প্রাসাদের সামনের অংশটি কর্নাটক সরকারের উদ্যান পালন বিভাগ রক্ষনাবেক্ষণ করে।

দোতলা আয়তাকার প্রাসাদটি সম্পূর্ণ সেগুন কাঠের তৈরি। এটি একটি নীচু পাথরের প্ল্যাটফর্মের ওপরে নির্মিত প্রাসাদ। এখানে সুন্দর খিলান, স্তম্ভ, বারান্দায় খোদাই করা নানা ছবি রয়েছে যা সে যুগের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন। প্রাসাদের ছাদে ও দেয়ালগুলিতে কাঠের খোদাই করা সুন্দর ফুলের নকশা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং যুদ্ধের ছবি দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে।  তবে এখন সেগুলো অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপরের তলায়  পূর্ব ও পশ্চিম দিকে খোলা বারান্দা আছে যেখানে টিপু সুলতান দরবার পরিচালনা করতেন। নীচ তলায় চারটি ছোট ছোট ঘর সম্ভবতঃ সেগুলো মহিলাদের জন্য আর একটি বড় হলঘর রয়েছে। রয়েছে বিশাল সিঁড়ি যা মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের বিশেষ নিদর্শন। প্রাসাদে মোট ১৬০ টি কক্ষ রয়েছে । টিপু সুলতানের তৈরি একটি বিশাল সিংহাসনের ছবি রয়েছে। সোনার চাদর ও  মূল্যবান পান্নায় মোড়া এই সিংহাসন রাজা টিপু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেই  ব্যবহার করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর, ইংরেজরা সিংহাসনটি ভেঙে ফেলে এবং এর অংশগুলি নিলামে বিক্রি করে। এই প্রাসাদটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে টিপু সুলতানের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। 

সামার প্যালেসে নীচতলায় একটি জাদুঘর আছে যেখানে টিপু সুলতান হায়দার আলি এবং তার পরিবারের ব্যবহৃত পোশাক, মুদ্রা, অস্ত্র, রূপার পাত্র, মুকুট রয়েছে। এছাড়াও আছে দুশো বছরের পুরোনো তৈলচিত্র, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের চিত্র যা টিপু সুলতানের রাজকীয় জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। রাজাকে দেওয়া বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ও সেখানে রাখা হয়েছে। এখানে রাখা ফ্রেস্কো গুলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে টিপু সুলতান এবং হায়দার আলির  যুদ্ধের বর্ননা দেয়। টিপু সুলতানের ডিজাইন করা একটি বাদ্যযন্ত্র আছে । এটাতে বাঘের নাম লেখা আছে যা একজন ব্রিটিশ সৈন্য কে হত্যা করে। এটাতে ফুঁ দিলে বাঘের গর্জন আর ইংরেজ সৈন্যর কাতর কন্ঠস্বর ভেসে আসে।  অবশ্য এখানে অরিজিনাল বাদ্যযন্ত্র টি নেই। অরিজিনাল বাদ্যযন্ত্র টি লন্ডনের জাদুঘরে রাখা আছে। 

টিপু সুলতানের সামার প্যালেস থেকে বেরিয়েই দেখি পাশেই বিশাল বালাজি মন্দির। কিন্তু মন্দিরের গেট সন্ধ্যেবেলায় খুলবে। কিন্তু আমরাও সন্ধ্যে পর্যন্ত থাকতে পারবো না। তাই এদিক ওদিক হাঁটতে লাগলাম। কিছুটা গিয়েই দেখলাম ব্যাঙ্গালোর মেডিকেল কলেজ। ছবি তুলে রাখলাম। মোবাইল খুলে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম কাছেই ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট। ব্যস গুগল ম্যাপ খুলে রওনা দিলাম। টিপু সুলতান সামার প্যালেসের থেকে ফোর্টের দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটার। আমরা সহজেই পৌঁছে গেলাম।

ষোড়শ শতকে নির্মিত ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের সাক্ষী। ১৫৩৭ সালে ব্যাঙ্গালোর ফোর্টটি মাটির দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন আধুনিক ব্যাঙ্গালোরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া প্রথম। মাটির দুর্গটির চারপাশে একটি পরিখা এবং নয়টি বড় দরজা ছিল। কেম্পে গৌড়ার শাসন কালে এই দুর্গটি খুবই সমৃদ্ধ ছিল। এই দুর্গের চারপাশের এলাকাকে বেঙ্গালুরু পিট হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন যা তার রাজধানী  ছিল।

১৭৬১ সালে রাজা হায়দার আলি মাটির দুর্গকে পাথরের দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলেন। এবং ১৮ শতকে তার ছেলে টিপু সুলতান এটির আরও উন্নতি করেন।  টিপু সুলতানের আমলে ইংরেজরা এই দুর্গের কিছু অংশ নষ্ট করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে টিপু সুলতান দুর্গ টি পুনর্নিমান করেন। পরবর্তী কালে তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা আবার বেঙ্গালুরু দুর্গ অবরোধ করে। তখন এই দুর্গ ছিল টিপু সুলতানের একটি শক্ত ঘাঁটি। মহীশূর সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ সত্ত্বেও প্রায় ২০০০ মহীশূর সৈন্যের মৃত্যু হয়। এমনকি এই যুদ্ধে টিপু সুলতানের ও মৃত্যু হয়।  ব্রিটিশরা দিল্লী গেটের কাছে এসে দেয়াল ভেঙ্গে এটি দখল করে এটিকে সামরিক ঘাঁটি ও কারাগার হিসেবে ব্যবহার করে। 

আজ আছে শুধু দুর্গের দিল্লী গেট আর দুর্গের একটি অংশমাত্র। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যেখানে ব্রিটিশরা দুর্গের দেওয়াল ভেঙ্গেছিল তার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আছে একটি মার্বেল পাথরের ফলক। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত  দুর্গটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্বাধীনতার পর এই দুর্গটিকে স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ব্যাঙ্গালোর ফোর্ট প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এটি একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ যা ঘুরে দেখে আমরা সুদূর অতীতে ফিরে গেলাম। 

দুর্গটি ডিম্বাকৃতির আর এটি মোট ১৮ একর এলাকাজুড়ে পুরু দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত। এর দুটি প্রধান গেট রয়েছে। একটি দিল্লী গেট আরেকটি মহীশূর গেট। দিল্লী গেট হল মেইন গেট যেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। এর গায়ে লোহার কাঁটাযুক্ত একটি কাঠের দরজা রয়েছে। মহীশূর গেটটি ছোট। এই দরজা দিয়ে প্রধানতঃ রাজপরিবারের সদস্য ও সেনাবাহিনীরা যাতায়াত করতেন। দুর্গটিতে ২৬ টি ঘাঁটি রয়েছে যেগুলো প্রতিরক্ষা ও নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হত। এখানে কতগুলো ওয়াচ টাওয়ারও রয়েছে যেখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়।

আমরা দুর্গে প্রায় আধ ঘন্টা ছিলাম। ঐতিহাসিক স্থাপত্য কলার প্রতি আমার আকর্ষণ সবসময়ই। তাই ওখানে গিয়ে ভেতরের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করার সাথে সাথে এই দুর্গের ইতিহাস নানা জনের কাছে জানার চেষ্টা করছিলাম। দুর্গের ভেতরে একটি গনেশ মন্দির আছে যা কেম্পেগৌড়া প্রথম নির্মাণ করেছিলেন। এই মন্দির টি শহরের পুরোনো মন্দির গুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোয়ের আয়োজন করা হয় যেখানে একটুকরো অতীত ইতিহাস মনকে নাড়া দিয়ে যায়। ফোর্ট থেকে বেড়িয়ে পাশেই কৃষ্ণ রাজেন্দ্র মার্কেট মেট্রো স্টেশন। ব্যস এবার মেট্রোতে উঠে পরের স্টেশন চিকপেট মেট্রো স্টেশনে নেমে গেলাম। ওখান থেকে বিশাল সিল্ক মার্কেট ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম।

পরের দিন আমরা প্রথমেই গেলাম লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে। আমাদের হোটেল থেকে দূরত্ব ৫.৫ কিলোমিটার। এখান থেকে সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন নাদাপ্রভু কেম্পেগৌড়া স্টেশন (ম্যাজেস্টিক) আমরা মেট্রোতে করে পৌঁছে গেলাম লালবাগ। মেট্রো স্টেশনের একদম পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেন। একটু হেঁটেই পৌঁছে গেলাম ওখানে। পৃথিবীর বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলোর মধ্যে একটি হলো "লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন"। এটি ৪.৫ কিলোমিটার লম্বা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটি দক্ষিণ ভারতের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন হল দক্ষিণ বেঙ্গালুরুর ২৪০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি বাগান যা প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো। ১৭৬০ সালে এটি মহীশূরের রাজা হায়দার আলী ৪০ একর জমি নিয়ে একটি প্রাইভেট রাজকীয় বাগান তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী কালে টিপু সুলতান এই বাগান তৈরি করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ১৮৫৬ সালে ইংরেজরা এটিকে আরো বড় করে ১২০ একর জমির ওপরে বোটানিক্যাল গার্ডেন করেন।  তবে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর এটি তৈরি করার কাজ শেষ করেন ব্যাঙ্গালোরের প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া। ষোড়শ শতকে বেঙ্গালুরুর প্রতিষ্ঠাতা কেম্পে গৌড়া একটি ওয়াচ টাওয়ারের পাশে এটি তৈরি করেছিলেন। ডঃ এম এইচ মারিগৌরার সময় থেকে এটি ২৪০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। 

বাগানটি তৈরি করতে ২২ বছর সময় লেগেছিল। বাগানটি এখনোও যত্ন সহকারে রক্ষনাবেক্ষণ করা হয়। এই বাগানটি মুঘল রীতিতে নকশা করা হয়েছিল। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে চারটি প্রবেশদ্বার। আমরা ৪নং গেট দিয়ে বাগানে ঢুকেছিলাম। পরে বুঝতে পারলাম ১ নং বা ২ নং গেট দিয়ে বাগানে ঢুকলে ঘুরতে সুবিধে হয়। ওখানে পুরো বাগান ঘুরে দেখার জন্য ব্যাটারি চালিত গাড়ি থাকে। আরাম করে পুরো বাগান ঘুরে দেখা যায়। বাগানে এক হাজারেরও বেশি নানা রকম গাছ, বনসাই গাছ, নানা প্রজাতির পাখি রয়েছে। এখানে নানা ধরনের মশলা ও রেশমের গাছ রয়েছে, ওখানে একটি উঁচু টিলা আছে যার ওপরে একটি মন্দির রয়েছে।  খুব বেশি উঁচুতে নয় বলে হেঁটেই মন্দিরে পৌঁছোনো যায়। টিলার উল্টোদিকে রয়েছে বনসাইয়ের বাগান। সেখানে অজস্র বনসাইয়ের গাছ রয়েছে। আমরা সেখানে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে এলাম।

এই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর এবং দর্শনীয় স্থান হল গ্লাস হাউস। অনেক দিন আগে একবার দক্ষিণ ভারত ঘুরতে এসে অল্প সময়ের জন্য ব্যাঙ্গালোরের শুধু গ্লাস হাউস দেখেছিলাম। এবার ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ফটো তুললাম। এটি লন্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেসের অনুকরণে তৈরি। ছবি তোলার জন্য সেখানে ভিড় জমে উঠেছিল।  এর কাছেই রয়েছে বাসস্ট্যান্ড। আরেকটু এগিয়ে গেলেই দেখা যায় লোহার ফ্রেমের ওপরে গাছে মোড়ানো নানা পশু, পাখি। রয়েছে লালবাগ লেক, অনেক পুরোনো গাছ। এখানে কাঠবেড়ালিরা  এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছুটে বেড়াচ্ছে, লেকের পাশের রাস্তায় ধারে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গাছ ফুলে ভরে আছে; সেখানে সুদৃশ্য বসার জায়গা রয়েছে। আমরা পুরো বাগান টা হেঁটে হেঁটেই ঘুরে ছিলাম। মনমুগ্ধকর এই বাগানে হেঁটে ঘুরলে ভালো মতো উপভোগ করা যায়।

লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বের হয়ে আমরা মেট্রোতে চলে গেলাম কুব্বন পার্ক। "গার্ডেন সিটি" ব্যাঙ্গালোরের একটি জনপ্রিয় পার্ক হল কুব্বন পার্ক। একে চামারাজেন্দ্র পার্ক ও বলা হয়। এটি ব্যাঙ্গালোরের একটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক। প্রায় ৩০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে সবুজের সমারোহে সাজিয়ে তোলা এই প্রাকৃতিক পার্ক। এটি শহরের একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। পুরো পার্কটি ঝর্ণা, মূর্তি, ফুলের গাছ এবং সবুজে ভরা।  কুব্বন পার্ক ব্যাঙ্গালোরের একটি ঐতিহাসিক পার্ক। বিধান সৌধ, হাইকোর্ট ও বেঙ্গালুরু গল্ফ ক্লাবের কাছেই এটি অবস্থিত। এই পার্কটি সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে অবস্থিত যার মধ্যে রয়েছে বিধান সৌধ , কুব্বন পার্ক, কুইন্স পার্ক, ছোটদের জন্য পার্ক, বাঁশবাগান আর আইনসভার হোম গার্ডেন। এখানে স্টেট লাইব্রেরি আছে যা সুন্দর লাল গথিক কাঠামোয় তৈরি শেষাদ্রি আইয়ার মেমোরিয়াল হলের ভেতরে রয়েছে।

১৮৭০ সালে মহীশূর রাজ্যের কমিশনার স্যার জন মিডের সময়ে ১০০ একর এলাকাজুড়ে এই পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল। তাই তার নামে এই পার্কটির নাম রাখা হয়েছিল মিডস পার্ক। পরবর্তীকালে এর আয়তন প্রায় ৩০০ একর করা হয়। ১৮৭৩ সালে তখনকার  কমিশনার স্যার মার্ক কিউবনের নামে পার্কটির নাম রাখা হয় কুবন পার্ক। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে, ২৬শে জুলাই প্রয়াত মহারাজা শ্রী চামরাজরেন্দ্র ওয়াদেয়ারের সম্মানে পার্কটির নামকরণ করা হয় "শ্রী চামরাজেন্দ্র পার্ক", কিন্তু এটি কুব্বন পার্ক নামেই বিশেষ ভাবে পরিচিত। কুব্বন পার্ক একটি পাবলিক পার্ক। এখানে  খোলা লন, হাঁটার জন্য পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং খেলার মাঠ রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবার জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান যা মর্নিং ওয়াকারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এখানে পাথরের সুন্দর স্ট্যাচু, ঢাল, ঐতিহাসিক স্থাপত্য কলার নিদর্শন দেখা যায়। শেষাদ্রি আইয়ার মেমোরিয়াল হলের মধ্যে অবস্থিত একটি লাল গথিক কাঠামোর গ্রন্থাগার। 

ছোটদের জন্য আছে একটি পার্ক যেখানে বিভিন্ন রাইড এবং টয় ট্রেনে চড়া যায়। এখানে আছে টয় মিউজিয়াম, আছে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। আমরা ওখানে না ঢুকলেও পাশ দিয়ে যাবার সময় বাবা মায়ের সাথে আসা কচিকাঁচাদের ভিড় দেখতে পেলাম। পার্কের মাঝখানে একটি ব্যান্ড স্ট্যান্ড রয়েছে। একসময় ব্রিটিশরা তাদের সামরিক ও পুলিশ ব্যান্ড প্রদর্শনের জন্য এই ব্যান্ড স্ট্যান্ডটি তৈরি করেছিল। এখানকার স্থানীয় মানুষের কাছে শুনলাম মাঝে অনেক দিন বন্ধ থাকার পর এখন আবার এখানে প্রতি রবিবার সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আমরা রবিবারে যায়নি। তাই এই অনুষ্ঠান মিস করে গেলাম।

কুব্বন পার্কের ভেতরের শর্ট রুট দিয়ে জিজ্ঞেস করতে করতেই আমরা চলে এলাম বিধান সৌধে।
কর্ণাটক রাজ্যের শক্তির প্রতীক বিধান সৌধ একটি বিখ্যাত স্থাপত্য। এটি ব্যাঙ্গালোরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। বিধান সৌধ কথাটির অর্থ হলো আইনসভার ঘর। এটি বেঙ্গালুরু শহরের দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সমগ্র দেশের বৃহত্তম আইনসভা ভবন।এই ভবনটি বেঙ্গালুরুর সাম্পাঙ্গি রামানগরের কাছে আম্বেদকর বিধিতে অবস্থিত। এর উল্টোদিকেই কর্ণাটক হাইকোর্ট। ৬০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত গ্রানাইট পাথরে তৈরি গম্বুজাকৃতি বিধান সৌধ রাজস্থানী, দ্রাবিড় আর ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্যের এক অত্যাশ্চর্য নিদর্শন। 

বেঙ্গালুরুর সমস্ত ভবনগুলো ইউরোপীয় ভবন। তাই ১৯৫২ সালে মহীশূরের মুখ্যমন্ত্রী কেঙ্গাল হনুমানথিয়া বিধান সৌধ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। যদিও ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন যখন মহীশূরের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কে সি রেড্ডি। পরবর্তী কালে মুখ্যমন্ত্রী কেঙ্গাল হনুমানথিয়া ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে বিধান সৌধের নির্মাণ করেছিলেন। বিধান সৌধে যাবার পথটি খুব সুন্দর।  এর মাটির উপরে ৪ টি তলা আর মাটির নীচে একটি তলা রয়েছে।  ভেতরে ঢোকার জন্য ৪৫টি ধাপ উঠতে হবে। ঢোকার পথে ৪০ ফুট উঁচু ১২টি গ্রানাইট স্তম্ভসহ লম্বা বারান্দা রয়েছে। আর সেই বারান্দায় পৌঁছোনোর জন্য রয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনের অনুকরণে তৈরি চওড়া সিঁড়ি।  সামনের দিকে জাতীয় পতাকা উড়ছে। ভবনের সামনে গ্রানাইট স্তম্ভের চূড়ায় মেটালের তৈরি চারটি সিংহ মূর্তি রয়েছে। বিশাল গম্বুজের উপরে সোনালী  রঙের জাতীয় প্রতীক রয়েছে। সেখানে  "Government work is Gods work" লেখা আছে। আইনসভার বেশিরভাগ দরজাই চন্দন কাঠের তৈরি। ভবনটি সারি সারি গম্বুজের মতো ল্যাম্পপোস্ট দিয়ে সাজানো। রাতের বেলায় ভবনটি আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে। একদিকে কেনেগাল হনুমন্তিয়ার মূর্তি আর অন্যদিকে ডঃ আম্বেদকর এবং জওহরলাল নেহেরুর মূর্তি ভবনের বিশেষ আকর্ষণ। ভবনটি একটি সুদৃশ্য পার্ক দিয়ে ঘেরা যা সামনের ডবল রোড পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

এখানে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অন্য কয়েকটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র। দেশ বিদেশ থেকে পর্যটকরা এর অপূর্ব স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য দেখার জন্য এখানে আসে। তবে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পাস প্রয়োজন।  সাধারণ মানুষেরা এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলেও বিধান সৌধের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমার এক ঝলক দেখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে একটি। অনেক ঘুরেছি আর ফটো তুলেছি। তাই আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।  এবারে ফেরার পালা। এখানকার মেট্রো স্টেশনের নাম ডক্টর বি আর আম্বেদকর স্টেশন। আমরা মেট্রোতে উঠে  নাদাপ্রভু কেম্পেগৌড়া স্টেশনে ফিরে এলাম।‌ এবারে হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম। 

আরও  অনেক জায়গা ঘোরা বাকী রইলো। সেসব পরের বারের জন্য তোলা থাক।


 

বিশেষ বাছাই কবিতা 


প্লেসমেন্ট

শ্যামলী সেনগুপ্ত 


দড়ি ও ঘন যামিনী 
যেন সোদর ভাই 
যামিনী ঘন হলে
দড়ি বাঁধা ও খোলার ভাবনারা
পার্টি করে
আদর-সাদর নরম-গরম
হৃদয় আর বুক দাবার বোর্ড খোলে
চেক মেট বলার আগেই 
কারও ঝুলে পড়া।

কারও ঝুলন...


 

কবিতা 

ওরা কারা ?!

গৌতমেন্দু নন্দী 


সমাজ,পরিবেশ বৃত্তের পরিধির মধ্যে 
     অবস্থানরত ওরা সদা ঘুর্নায়মান ----
ওদের সঠিক অবস্থান জানা নেই
     জানা নেই ওদের সঠিক অবয়ব
প্রতিনিয়ত যারা ছুঁড়ে ফেলতে চায়
     ---প্রতিবাদী মুখদের 
দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে চায় 
   তাদের সামাজিক অবস্থান 
ধ্বংস করতে উদ্যত তাঁদের সৃজনশীলতা 
     অর্থ, ক্ষমতার অপব্যয় আর ঔদ্ধত্যে ----
                ওরা কারা-----?
বলপূর্বক আলোকিত পরিসর থেকে 
    টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে চায়----- 
 পরিধির বাইরে,সমাজ বৃত্তের বাইরে 
    ওরা কারা----?
 সুস্থ চিন্তা, চেতনা, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের
  অভিজ্ঞান ধ্বংস করতেই কি উদযাপিত হয় 
   গণতন্ত্রের উৎসব?
ওরাই পূজারী, ওরাই, ওরাই ... ওরাই 
    ওরা কারা......?!


 

কবিতা 

অভিমুখ মহাকাল 
দীপায়ন ভট্টাচার্য 


চারদিকে অন্ধকার মেলেছে মৃত্যুর মত ডানা 
অবহেলা ছুঁয়ে আছে শেষের বিছানা 
এই চৌখুপিতেই মহাকাল করে পায়চারি 
ক্লান্তিতে নজর হয় ভারি। 

জানালা কোথায় গেল? বাইরে উঠেছে নাকি রোদ ? 
পাখিরা কি গান গায়? লোকে করে আমোদ প্রমোদ?
 আমার দু'চোখ ভিজে। স্মৃতিতেই কাটছি সাঁতার—
আজ-কাল মিলে একাকার।

কে আসে কে খোঁজ নিতে? কাতরায়? নাকি পায় ভয়? 
ঝর্ ঝর্ ঝরছে সময়। 
সময় শালের বনে — পাহাড়ের ভাঙছে চড়াই
কাজের অকেজো সুতো, কত ওঠা-পড়ার লড়াই 
সবটা কেন্দ্রীভূত সুনিশ্চিত আঁধারের দিকে 
জলবিন্দু হয়ে পড়ে ফিকে।

সব ঠিক — সব কিছু ঠিকঠাক চলবেই কাল 
একটি মানুষ যাবে — যার অভিমুখ মহাকাল।


 

কবিতা 

জলছাপ
সন্তোষ ভট্টাচার্য 

ধূসর ক্যাসেটে খসে পড়া অযথা যৌনতা
অস্পষ্ট পিক্সেলের আড়ালে শাঁসের শরীর
শরীরের ভাঁজ, উফ কি বিভৎস আওয়াজ 

স্মৃতির কার্নিশে শুয়ে শুয়ে একমুঠো স্বপ্ন দেখে ধুলো
নিয়তি নির্মম, কর্কশ কার্নিশ, লুটোয় স্বপ্নের মেশিন 

পুরনো লেন্স, লেন্স পুরু হয় 
ঝাপসা হয় চেনা মুখ
বর্ষার বয়ামে আঁকা চোখ 
বোজে নিজেদের 

মুছে যায় ক্যালিগ্রাফি
কাগজের ভাঁজে
মৃদু গন্ধ হয়ে বেঁচে থাকে অবহেলা

এক চিলতে পোড়া পিক্সেল 


 

কবিতা 

ভয় 

অর্পিতা গুহ মজুমদার


বসের অপমানের কোনও প্রতিবাদ না করে 
ঘাড় নিচু করে প্রতিক্রিয়াহীন থাকি,
কারণ প্রতি মুহূর্তে বরখাস্ত হবার ভয়.....
দেখে ফেলেছি বাল্যবন্ধু রাহুলের 
সাথে বউয়ের গোপন চ্যাট, 
আমি দিব্যি হেসে রাহুলের সাথে চা খাই ; 
কারণ আদালত,মামলা, সন্তান হারানোর  ভয়। 
পরিশ্রম  অর্জিত স্বাচ্ছন্দের ভাগ কেটে 
পাড়ার ক্লাব সেক্রেটারির হাতে মোটা অংকের 
চাঁদা তুলে দিই মুখে হাসির প্রলেপ মাখিয়ে,  
দুর্নীতির প্রতিবাদ না করে  ঝান্ডা নিয়ে মিছিলে হাঁটি, 
আমার মাছভরা পুকুরে বিষ ঢেলে দেবার ভয়।

এরকম হাজারও ভয়ের চক্রব্যূহে অভিমন্যুর মতো পথ খুঁজি, 
প্রকৃত ' আমি' -কে উন্মুক্ত করবার জন্য।
কিন্তু মায়াভরা পৃথিবীতে নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার লোভে, 
ভয়ের  পঙ্কিল চোরাবালি আমায় গ্রাস করে.....


 

কবিতা 

তোমার জিত, আমার হার
সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)

হেরেই গেছি অনেক খেলার শুরুতে,
হারের মাটি জমেই হলো ঐ পাহাড়।
এখন তোমার বুকের থেকে বেশ দূরে
কবর খুঁড়লে খুঁজে পাবে লাশ আমার।।

অনেক স্মৃতিই কাচের মতই ভাঙবে আজ,
চোখের জলেই পড়বে ঢাকা অপরাধ।
গোলাপ ফুলের পাপড়ি ঝরার গল্পতে
আমার দৃশ্য একেক করে দিও বাদ।।

মুঠো হাতে পাপের কালি বীভৎস,
অনেক আগেই লেখা ছিল ইস্তেহার।
এখন তোমার চোখের আলোর বেশ দূরে
অস্তি খুঁজলে পেয়ে যাবে ছাই আমার।।


 

কবিতা 

জীবন্ত লাশ
অশোক কুমার ঠাকুর



গোটা সমাজ যদি লাশে পরিনত হয়
আমি কি জীবন্ত থাকতে পারি?
তখন আমিও একটি লাশ, আত্ম বোধোদয়
নিশ্চিত, ওপারে দিয়েছি পাড়ি।

সমাজের প্রতিটি স্তরে, মৃত মানুষেরা
উন্মত্ত উল্লাসে করে নৃত্য
আমরা তো পরজীবি, ভীত মানুষেরা
পরভৃৎ থেকে হই পরভৃতও।


 

কবিতা 


ভোটের আমি 

উৎপলেন্দু পাল  


পঞ্চবার্ষিক আসক্তি জড়ো করে 
যাবতীয় ঘৃণা যাবতীয় লোভ ক্ষোভ আশা মাখামাখি 
অনুরক্তি বিরক্তির রসসিক্ত মন্ড তৈরী করি 
তারপর ভোটবাক্সে করি গণতন্ত্রের পিন্ডদান  

উৎসবে মাখামাখি ঘাম রক্ত গুলি বারুদ 
আবহে ভারি বুটের শব্দ শ্লোগান গালাগাল  
ক্ষমতার ব্যবহার অপব্যবহার অতিব্যবহার 
তারপর বাতাসে আবির, ধোঁয়া আর রক্তের ছিটে 

পঞ্চবার্ষিক গণসংকীর্তন শেষে 
আমি জনৈক কৌপিনধারী সুশীল নাগরিক  
নিজের জন্মসিদ্ধ কবচকুন্ডল দান করে দিয়ে 
বসে থাকি পরবর্তী পূর্ণকুম্ভে ডুব দেবার প্রত্যাশায়। 



 

কবিতা 


দ্বিধাহীন ভাবে তুমি আসো

প্রাণেশ পাল 


অথচ দ্বিধাহীন ভাবে তুমি আসো
যেভাবে পর্যায়ক্রমে বসন্ত আসে
গাঢ় শিমুল পলাশে চাপা 
অবিশ্বাসের নীরব যন্ত্রণা
বাতাসের কলস্বনে
প্রাক্তন সম্পর্কের মৌন অনুভূতি....

তবুও অযোধ্যা পাহাড় জুড়ে
পলাশ পরব, ধামসা মাদলে মহুয়ার নেশা
ভালবাসার আক্ষেপ মিশে থাকে
আদিবাসী নৃত্যের মাতাল বিভঙ্গে....

চৈত্র বৃদ্ধ হলে
বসন্তের আয়ু ফুরিয়ে আসে
মনের ক্ষেত্রফল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে
বসন্তের ভাঙাচোরা নিশ্চল অভিমান 
অথচ দ্বিধাহীন ভাবে তুমি আসো


 

কবিতা 


এক পশলা বৃষ্টির জন্য 
আকাশলীনা ঢোল 

লেখনী আজ আবারও চঞ্চল 
তোমারই কথা ভেবে,
নগরীর উপকন্ঠ ডানা মেলেছে 
চাতকের মতো, 
এক পশলা বৃষ্টির অপেক্ষায়। 
তোমারই জন্য চৈত্র বিকেলে 
বৈশাখী ঝড়, সাগরে ঘূর্ণাবর্ত -
তোমারই জন্য চোখের পাতা 
ভিজেছে শ্রান্ত পথিকের।
তোমার জন্য ফুটপাতে ভিড়,
রাস্তায় যানজট -
অগণিত মাথা ঠাঁই খুঁজছে 
গরম চায়ের কাপে।
আশ্রয়হীন মানুষ-পাখি ডানা 
ঝাপটায় আজ, প্লাবিত পৃথিবী 
তোমারই জন্য 'মল্লার' রাগ ধরে।
আমার কলমও আজ কেবলই 
তোমার প্রতীক্ষায় -
বুকের ভেতর ঝমঝম করে 
পশলা বৃষ্টির গান।


 

কবিতা 


আমাদের কথা

সজল কুমার বসু 


অপলকে চেয়ে চাঁদ 
নদীর চোখে পড়ে চোখ 
লজ্জায় মুখ লুকায় চাঁদ
তবুও বলতে পারে না ভালবাসি 
আমাদের কথা এমনই নির্বাক।

রোজ রাতে আমি তোমাতে নামি 
তোমাকে ছোঁবার পিপাসায় 
খুঁজি তোমার হারানো হিয়ার প্রতিবিম্ব 
গভীর নীলাভ জলে অদ্ভুত নীরবতায় 
তবু বলতে পারি না ভালবাসি 
আমাদের কথা এমনই নির্বাক।

তুমি হাসো নিভৃত আকাশলোকে 
ঠোঁটে গোপন গান 
আমার হৃদয়তন্ত্রীতে তোমার আলোর রেণু 
গহন নৈশব্দে একান্তের নিশিযাপন।
তবু কেউ কাউকে বলতে পারি না ভালবাসি 
আমাদের কথা এমনই নির্বাক।


 

কবিতা 

গিয়ে যাওয়ার লড়াই 
তীর্থঙ্কর সুমিত 



ইচ্ছের বাহুবন্ধনে 
পুরোনো না লিখে রাখা ইতিহাস 
এখন আরও পুরোনো 
যত মুছে যাওয়া মুখ 
এখন বিবর্তনে বিবর্তনে পাল্টে গেছে 
ধুলোমাখা বাড়ি ঘর নতুন রঙে 
কিম্বা সিমেন্টের প্রলেপে টিকিয়ে রাখার লড়াই 
যত চাই আরও চাওয়া 
যত পাই আরও পাওয়া 
নতুনের ইতিহাস 
ক্রমশঃ 

শুধু এগিয়ে যাওয়ার লড়াই...


 

কবিতা 


যুগলসন্ধি

অর্পিতা পাল সাহা



কে জানে কতটা নিঃসঙ্গতায় কতটা বেখেয়ালে 
এই অবাধ্য ঝাউবনে এসেছে মুক্তোর ঋতু।
আমার যাজক শরীরের সূক্ষ্ম আঁচড়ে যেন ভীষণ স্পষ্ট 
তোমার আর্দ্র ঠোঁটের স্বীকারোক্তির শিলালিপি।
এই এক জীবনে তোমাকেই শুধু চাই ......
পাইবা না পাই জীবন শুধু তোমারই অপেক্ষায়।
অপ্রাপ্তি আর অপূর্ণতায় তো কাটলো এতোকাল.....
আজকে যদি মনের মাঝে মাতাল জোয়ার এলো,
এসো না দুজনে প্লাবিত হই সুখবিয়োনি ভোরে।
ব্যাকুল শর্তবিহীন প্রেমে নিরাভরন সখ্য হবে যুগল,
তুমিও তোমার ঔপন্যাসিক অন্ত্যমিলের ঘনত্বে 
তামাদি করে দিও ভালোবাসার প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিচিহ্ন।


 

কবিতা 

কেঁচো জীবন 

    রীনা মজুমদার 

  কোথায় যাব ?
চারিদিকে অট্টহাসি ধাক্কা খায় দেওয়ালে 
ঘরে ঢুকে পড়েছে জোকারের মুখোশ।

অমেরুদণ্ডী প্রাণী কেঁচোও 
মাছধরা নৌকোর কষ্টের মতো 
  গর্ত খুঁড়ে যায় নিঃস্বার্থে,  
সততা, উর্বরতা ও উপকারিতা 
  বয়ে চলে লাল রক্তে
   মেরুদন্ডহীন তবুও
 রাখে সোজা মেরুদন্ডের চেতনা।

  কোথায় যাব ?
সর্বহারা তপ্ত দুপুরে ঢুকে পড়ি
কেঁচোর গুহায়, সময় পিছিয়ে যায় 
চোখের সামনে অক্ষরসম্ভার, মহামানব 
 সেই সময়কার সরল মানুষজন

সর্বনাশী সময় হাতরায়, কেঁচো জীবন 
   সাম্যের সুর ও ঐক্যের গান।


 


কবিতা


সর্বাঙ্গ স্মৃতি

মনোজ ঘোষ


ঘামে  সোঁদা শরীরের গন্ধ যেন চন্দন  অগুরু

চাৱ দেয়ালের কোলে ছিটিয়ে থাকা জামাকাপড়

 সিগারেট  শিঙ্ঘিত ধোঁয়ার কুয়াশা লঘু গুরু 

জাপটাজাপটি সেই  স্পর্শী ভালোবাসা এখন অসাড়


 ঘন হয়ে থাকা সেই বহুনাদ সর্বাঙ্গ স্মৃতি 

রোমন্থন এখনো দিনযাপনেৱ কী মহার্ঘ্য রীতি

 ত্বকের স্পর্শ লেগে থাকা ঘনিষ্ঠ শরীরেৱ মায়া 

 উদ্ভ্রান্ত ঘটনার পটে উদাসী মনের আলোছায়া 


জীবনবিমার প্রিমিয়াম অদৃশ্য উপার্জন থেকে 

 আপনাআপনি জমা হয়  বিকল্প তহবিলে

 অতীতের দিনগুলো এখন  নগরসীমান্তের গহন অরণ্যে 

লাগামছাড়া সেই ধনরত্নের সন্ধান করেই চলে


 

বিশেষ বাছাই ছবি

শিল্পী- তৃষিতা রায় 






 


ছবি 

শিল্পী- বাবুল মল্লিক 





 

ছবি 


শিল্পী- তিথি পাল