ধর্ম ও বিজ্ঞান
সঞ্জয় কুমার মল্লিক
পুরান মতে জলকে বলা হয় গঙ্গা।গঙ্গা যেদিকে বয়ে যায় তাকে বলছে গঙ্গা নদী।এখানেও নাম নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বলি গোদাবরী নদীকেও দক্ষিণের গঙ্গা বলা হয় । জলে হাত পা ধুয়ে নিলে বা স্নান করলে শরীর পবিত্র হয়ে যায়।এখানে পবিত্র হয়ে যায় মানে, নোংরা বা জীবাণু মুক্তের কথাই বলা হয়েছে।
বিজ্ঞান মতে প্রায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক জিনিসে ছোঁয়া লাগলে জলে ধুয়ে নিলে তার ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।কারন জলে দ্রবীভূত হওয়া।আবার জীবাণু থাকলে তা জলে ধোয়া হয়ে যায়।
এবার আসি জলের উৎস নিয়ে।পুরান মতে জল বা গঙ্গা তিনপ্রকার আকাশগঙ্গা,মর্তের গঙ্গা ও পাতাল গঙ্গা। বিজ্ঞান মতে জল বাষ্প আকারে মেঘ হয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, পৃথিবীর উপরিভাগের জলস্তর ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর।বেশীর ভাগ সময় পাহাড় চূড়ায়(কৈলাশ পর্বতে শিবের জটায়) মেঘ জমে বরফ হয় ও সেই বরফ গলে নদী(ভাগীরথী,ভগীরথ শঙ্খ বাজিয়ে মর্তে বা সাগরের নিয়ে যায়, ও গঙ্গা ) আকারে সাগরে গিয়ে মিশে যায়।
কাউকে পুরান দিনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা মাথায় রেখে এই লেখাটি নয় বরং জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইন্টাইনের নিম্নলিখিত উক্তিটির কথা মাথায় রেখে এই লেখাটি লিখতে ইচ্ছে করল।
"Science without religion is lame, religion without science is blind." Albert Einstein
নিথর দেহ
শম্পা সামন্ত
হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্তান,তবু আজও তারা মাটির নিচে শায়িত।শুধুমাত্র বিচারের আশায়, দুই মা বুকে পাথর চেপে তাদের মৃত সন্তানদের কবর আঁকড়ে বসে আছে।
কি হয়েছিল সেদিন, স্কুল থেকে কেন ফিরলো তাদের মৃত দেহ?এর কোনো উত্তর কারোর জানা নেই। তবে সেইদিন সবাই কেন চিৎকার করে বলেছিল আমরা এর বিচার চাই!যে দল এই ঘৃন্য অপরাধ করেছে তাদের শাস্তি চাই, এমনকি দিনের পর দিন ধর্মঘট চললো। আজ এক পার্টির লোকেরা এসে বলে আমরা তোমাদের পাশে আছি, কাল আর এক পার্টির লোক বলে অপরাধীরা শাস্তি পাবে।
মৃত সন্তানের বাবা-মা নির্বাক হয়ে তাদের মুখপানে তাকিয়ে অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকে।আর চিৎকার করে বলে,"ঈশ্বর এ কোন অপরাধের শাস্তি"!!!
তবে প্রশ্ন হল, জনগণের সেবায় যারা নিয়োজিত সেই পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও স্কুল প্রাঙ্গণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা কিভাবে ঘটলো।
অনেক দিন হয়ে গেল কিন্তু আর কেউ আসেনা সেই স্থানে যেখানে বিষাক্ত বোমায় নীল হয়ে গিয়েছিল দুই তাজা প্রাণ। বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে তাদের শরীর থেকে বয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। হয়তো সেখানে অনেক আগাছাও গজিয়ে উঠেছে।
সবাই ভুলে গেছে কিন্তু সেই মৃত সন্তানদের বাবা-মা,আজও শুনতে পায় কবর থেকে কারা যেন বলতে থাকে,"মা আমি তো কিছু করিনি, তবে কেন..?"
কোথায় গেল মুখোশ পরা মানুষের দল ...
গল্প
"আহ্বান"
শম্পা চক্রবর্তী
( মফস্বলের অনিন্দ্য ভালোবেসেছিল সল্টলেকের সুলগ্নাকে। আট বছরের নিটোল প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিল ওরা। ভাস্কর অনিন্দ্য মূর্তি গড়তে গড়তে অগোছালো জীবন বেছে নিয়েছিল।শিক্ষিতা ও সুন্দরী সুলগ্নাকে বাধ্য হয়ে বাড়ির কথামতো মালাবদল করতে হয়েছিল অপছন্দের এক পাত্রের সঙ্গে। ও এখন বিবাহসূত্রে মার্কিন নাগরিক। সানদিয়াগোর স্বচ্ছল পরিবারের গৃহিণী এবং তিন সন্তানের জননী। আপাত সুখের সংসারে নিমজ্জিতা।ওদিকে অনিন্দ্য অবিবাহিত। বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে বাস। কয়েকবার ঠিকানা জোগাড় করে চিঠিও লিখেছিল সে কিন্তু সাড়া দেয়নি সুলগ্না। প্রায় পঁচিশ বছর পর ফেসবুকে একে অপরকে খুঁজে পায়। অন্তত একবারের জন্য হলেও এই পড়ন্তবেলায় অনিন্দ্য কাছে পেতে চায় সুলগ্নাকে। ই-মেইলে একদিন হঠাৎ সে সুলগ্নাকে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তারপর…..)
সুলগ্নাঃ- ভাঙাচোরা সময়ের হাত ধরে এই স্তিমিত বেলায় চুপিচুপি আবার কেন এলে? কতবার আমাকে জাগাবে অনিন্দ্য? যতবার জাগিয়েছ ততবার আমার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে নদীর দীঘল বাঁকে কিশোরী পাতাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া আমাদের বল্গাহীন বিগত যৌবন।
অনিন্দ্যঃ- জাগানো নয় সুলগ্না, দুরন্ত আহ্বান। হয়তো শেষবারের মতো।কুয়াশা ভেঙে ভেঙে যে পথ চলে গেছে তারাখসা দিগন্তের দিকে, সে পথে এখন বেদনার ভারে নত অলকানন্দার সপ্তস্বরা রাগিনীর মূর্চ্ছনা।আঁজলা ভরে জল তুলি।জলের ভিতরে নেফারতিতির মতো চেয়ে থাকো তুমি।
একেক সময় মনে হয় তোমার হৃদপিন্ডের ভিতর ভালোবাসার পতাকাটা ওড়াতে চেয়েও পারিনি। ভাবতাম পতাকা উড়ছে—আমি স্বর্গরাজ্য জয় করেছি কিন্তু সে ভাবনা ছিল ভুল। তাই হয়তো ছিন্ন সুতোয় নিজেকে গেঁথে মৎস্যগন্ধা কিংবা শঙ্খচিল হয়ে চলে গেছো সানদিয়াগোয়। তোমাকে প্রতিদিন ছুঁয়ে যায় সমুদ্রসৈকত— অনন্তজল। আমাকে দিয়ে গেছো সূর্যডোবা অগাধবিকেল।
সুলগ্নাঃ- ভুলিনি কিছুই। সবটুকু জড়িয়ে রেখেছি মেহগনি জ্যোৎস্নায়।আষাঢ়ের মেঘবৃষ্টিতে ভিজে বুকের কলস ভরে শূন্যতা রেখেছি শুধু। ইচ্ছে করছে তেইশের বর্ষার মতো একবার….. আরো একবার…… সেই মধ্যদুপুর— ঘাসডোবা জল— থইথই মেঠোপথ— আকাশভাঙা বৃষ্টির নিচে হাতের পরে হাত। আলিঙ্গনে শরীর বেয়ে সুগন্ধী নীলজল— তোমার অবগাহন— কাগজের নৌকায় ভেসে যাওয়া আমাদের ঠিকানা। মনে আছে বাড়ি ফিরে ইনফ্লুয়েঞ্জা, বিছানায় ঘর।অনিন্দ্য, তুমি কি আজও বৃষ্টিভেজা ধূ ধূ বালুচর?
অনিন্দ্যঃ- আগের মতোই কবিতার শাড়িতে মোড়া রয়েছ দেখছি। বদলাওনি একটুও।বয়স বেড়ে গেছে আমাদের তবুও অকারণ হাসি থেকে অভিমানী কান্না— আগলে রেখেছি সব।এখনো চিলেকোঠার ঘরে থরেথরে সাজানো দুপুরের ডাকে আসা সাদা-নীল খাম— ভিতরে তীব্র দহন— পাট পাট করে তুলেরাখা আমার ধূলোঝড় জীবন।
থাক ওসব।
হাসি-গান, আলো, কাজ সব নিয়ে তোমার গোছানো গৃহকোণের গল্প বলো।
সুলগ্নাঃ- গৃহকোণের গল্পে যে একটাও বৃষ্টির ফোঁটা নেই নিজেকে ভেজাবার। একটাও নদী নেই নিজেকে ভাসাবার।অথচ… অথচ জানো অনিন্দ্য, প্রায়ই জানলা খুললেই ভিজে অন্ধকারে শুনতে পাই জীবনের জল কেটে ছপ্ ছপ্ করে এগিয়ে চলা দাঁড়ের শব্দ।কোথা থেকে কোথায় যে ভেসে যায় কার সুরের সাম্পান জানিনা (দীর্ঘশ্বাস)।ভেসে যায় কোন এক জনহীন ঘাটের কাছে !!
অনিন্দ্যঃ- নির্জনতার ভিতরেই তো বয়ে চলে দীর্ঘ একটা নদী আর তার নিচে পড়ে থাকে বিচিত্র সম্পর্কের নুড়িপাথর।ছুঁতে চাওয়ার এবং ছুঁতে না পারার সম্পর্ক।
সুলগ্নাঃ- ওসবে আমি বিশ্বাস করি না। বেশিরভাগ সম্পর্কই জীবনের শেষপ্রান্তে গিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়, ধূলো হয়ে মিশে যায় হেমন্তের সন্ধ্যায়। সম্পর্কের গভীরে থেকে যায় বিবর্ণ শালিখের শব্দহীন ডানার ঝাপট। সে বড় কষ্টের।তার চেয়ে সম্পর্কহীন জীবন ঢের ভালো।
অনিন্দ্যঃ- ভুল। মস্তবড়ো ভুল সুলগ্না। সম্পর্কহীন জীবনের রঙ পাংশুটে, নিস্প্রভ।মানুষ নিজের অজান্তে নিজেরই মধ্যে বিষাদের ও আনন্দের, বিনিসুতোয় সম্পর্কের গাঢ় নকশা বোনে— সে সম্পর্ক ভালোই হোক আর মন্দই হোক, কাছেরই হোক বা দূরের।
সুলগ্নাঃ- এবার সম্পর্কের কথা না হয় থাক। জায়মান ভালোবাসার কাছে সমর্পণের প্রত্যাশায় ক্রমশ ভাঙতে থাকে যে জীবন তার গল্প বলো।
অনিন্দ্যঃ- ধূলোয় ধূলো ওড়া সেই লালপাহাড়ের গল্প বলি তাহলে ? যোগীমারা গুহা…..যোগীমহেশ্বরের মন্দির….. যেখানে খোদাই করা— "সুতনুকা নাম দেবদাসিক্য ত্বং কাময়িত্থ বালানশেয়ে দেবদিন্নে নাম লুপদকখে।" (দেবদাসী সুতনুকা তরুণ রূপদক্ষ দেবদিন্নকে ভালোবেসেছিল।)
সুচারুদার বাড়িতে কিন্তু দারুণ আড্ডা জমতো এদের নিয়ে। মনের মধ্যে দেবদিন্ন উঁকি দিত। সেদিন আড্ডা শেষ…... জ্যোৎস্নাভেজা ত্রয়োদশীর চাঁদ ..……হাস্নুহানার গন্ধ…... আচ্ছা, তোমার পিঠের সেই জরুলটা এখনো সেরকমই আছে?
সুলগ্নাঃ- কেবলই ফেলে আসা স্মৃতি-মঞ্জুষার আবরণ উন্মোচন !! কেবলই টুকরো টুকরো আবেগের ভাস্কর্য নির্মাণ !! দুষ্টু কোথাকার।
অনিন্দ্যঃ- দুষ্টুমি করার সুযোগ দিলে কোথায়? তার আগেই তো রাজপুত্তুরের পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চেপে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পারে চলে গেলে আরেকটা বর্ণিল জীবনের আশায়।
সুলগ্নাঃ- যেতে চাইনি। বাধ্য হয়েছিলাম । চলতে চলতে কখন যে ভিড়ের মধ্যে হাত ছেড়ে দিয়েছিলে !! হারিয়ে গিয়েছিলাম। খোঁজোনি।
অনিন্দ্যঃ- ইচ্ছে করে হারিয়ে ফেলেছিলাম বলেই খুঁজিনি। কারণ তোমাকে রাখার উপযুক্ত ঘর আমার ছিল না।
সুলগ্নাঃ- সিংহাসন চাইনি তো, চেয়েছিলাম স্বপ্নে মোড়া একটা খড়কুটোর বাসা। না হয় ঝড়ে সে বাসা ভাঙত, আমরা সব নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়তাম, তারপর ডানার আদরে নতুন বাসা বাঁধতাম। খুব কি ক্ষতি হোত অনিন্দ্য? চাওনি সে জীবন?
অনিন্দ্যঃ- চেয়েও চাইনি।
সুলগ্নাঃ- কেন?
অনিন্দ্যঃ- বাসা বাঁধার জীবন আমার নয় সুলগ্না।
তোমার বিয়ের খবর পেয়েছিলাম প্রতীকের কাছে। তারপর থেকে আমিও ভালো থাকিনি। ওয়ার্কশপ্ , এক্সহিবিশন্ সব—স-অব উপেক্ষা করেছি। একটা অসম্পূর্ণ মূর্তি তৈরী করেছিলাম যার প্রতিটি খাঁজে তোমার আঁচলখোলা রৌদ্রস্নাত যৌবন।রেখায় রেখায় আলিঙ্গনের অঙ্গীকার ও স্বপ্নের প্রত্যাশা। চিবুকে দুঃসাহসিক প্রেম।
সুলগ্নাঃ- আজও বুকের ভিতর এক অযুত ভালোবাসা নিয়ে বসে আছো তুমি!! এখন বুঝি বাসার ছোট পরিসরে তোমাকে ধরে না।তুমি যে শিল্পী।
অনিন্দ্যঃ- সুলগ্না, আর একটিবার সুতনুকা হও। শেষবারের মতো তোমার মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে শিহরিত হই, তোমার মৃত্যুঞ্জয়ী মূর্তির নিচে হাঁটুমুড়ে বসি।নিরাবরণা হয়ে একবার এসে দাঁড়াও আমার সামনে।আঘাতে আঘাতে গড়ে তুলি অহঙ্কারবিহীন অলঙ্কারে মোড়া তোমাকে যাতে আলো থাকবে কিন্তু দহন থাকবে না।
সুলগ্নাঃ- হয়তো কিছুই থাকবে না, হয়তো বা থাকবেও। আমারও যে ইচ্ছেহয় এই অবেলায় আমার তৃষিত ঠোঁটে প্লাবন হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো, অবিরাম স্রোতের মতো সন্তর্পণে মিশে যাই জলের ভিতর।
অনিন্দ্যঃ- এখনো— বিশ্বাস করো— প্রতি পলে তোমার ছবি আঁকি, মুছি। ভেনাসের মূর্তির মতো তোমাকে গড়ি, আবার ভাঙি। কখন যেন রাত নামে। শিশিরের জলে ঘাসফুল যৌবনবতী হয়। সপ্তপর্ণী ঝরে পড়ে গভীর স্তব্ধতায় আর আমি নক্ষত্র ছুঁতে যাওয়া ব্যর্থ প্রেমিকের মতো শূন্যে ঝুলে থাকি।
সুলগ্নাঃ- ভাঙব বললেই কি সবটুকু ভাঙা যায় অনিন্দ্য? কিছুটা অস্তিত্ব পড়ে থাকে বৈকি।
জীবন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। বাকি সময়ে সেই অস্তিত্বটুকু সঙ্গে নিয়ে আমরা কি পারিনা পরিব্রাজকের জীবনবৃত্তে মিশে যেতে? পারিনা ছড়িয়ে দিতে প্রেম ও বিশ্বাসের নিখাদ নির্যাস?
অনিন্দ্যঃ- পারব বলেই অন্ধকার দেশ ছেড়ে শব্দহীন জলস্রোতে অনেকটা ভেসে এসেছি।এখন শুধু তোমার সান দিয়েগোর "সান ক্লিফট্" এ দাঁড়িয়ে গোধূলির আলোয় ভিজতে চাইছি যেমন করে বকেরা ভেজে।
সুলগ্নাঃ-
"প্রগাঢ় মুগ্ধতা দিয়ে ধুয়ে দেব অপেক্ষার দিন
এসো আজ চোখ রাখো চোখের ভিতর
সমুদ্র উঠুক কেঁপে জলের ডানায়
ডেকে নিক জলোচ্ছ্বাস আমাদের সামান্য জীবন।"
-------------+++-----------++----------
কবিতা ঋণ— কবি রেহান কৌশিক।
বিচার
মৌসুমী চৌধুরী
তখন তার বয়স ছিল বছর দশ। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। নন্দিতার ঊনত্রিশ, সদ্য যোগদান করছে বিদ্যালয়ে। প্রথম থেকে সে মেয়েটির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করত। অদ্ভুত এক চোরা টান যেন!
এ বছর মেয়েটি ছিল নবম শ্রেণিতে।
--"কি রে খেয়েছিস?"
আড়ষ্ট মুখখানি নীচু। মাটিতে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে। একেবারে নীরব, আরক্ত মুখ।
--"সকালে প্র্যাকটিসে গিয়েছিলি?"
মুখ নিচু। নিচু স্বরে উত্তর দিল, " না।"
-"কেন?"
মাথা যেন একেবারে মিশে যেতে যেতে চাইছে
মাটিতে, "মা বারণ করেছে। তাই লুকিয়ে যাই প্র্যাকটিসে।"
--"কেন? কেন?"
উত্তর আসে, "ওসব নাকি ছেলেদের খেলা।"
অসহায় গলায় নন্দিতা জিজ্ঞেস করে, "তোর খেলতে ইচ্ছে করে না?"
মাথাটা একেবারে নব্বই ডিগ্রী ঘুরে গেল, "হ্যাঁ--আ--তো!"
--"বেশ, এখন বাড়ি যা। আজ বিকেলে তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলব ছুটির পর। নে, এখন এই খামটা ধর।"
--"এর ভেতরে কি আছে, দিদিমণি?"
---"কিছু টাকা। এটা দিয়ে কলা, ডিম, দুধ, চিকেন কিনে খাবি একটু। বলবি মাকে। মনে রাখিস, এ বছর তুই জেলা মহিলা ফুটবল দলে চান্স পেয়েছিস।"
মাথা নেড়ে নীরবে সম্মতিসূচক ভঙ্গি প্রকাশ করে চলে গিয়েছিল বিপাশা। চলার ছন্দে খুুশির ঝিলিক। যেন বিপাশা একটি তরঙ্গিনী নদীর নাম।
ঘন সবুজ মাঠে বিপাশা যখন ফুটবল খেলতে নামত চোখ জুড়িয়ে যেত নন্দিতার। অসাাধারণ একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। ট্যাকলিং, ড্রিবল, শ্যুট, পাসিং-এ অত্যন্ত দক্ষ।একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার খেলোয়াড়ের মূল দায়িত্ব হল নিজ দলের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এমনকি বিপক্ষকে গোল দেওয়াও। তাই বিপাশা মাঠে নামা মানেই ছিল অন্য পক্ষকে গোল দিয়ে হারিয়ে ভূত করে দেওয়া।
খবরের কাগজে, পত্রপত্রিকায়, টিভিতে বুঁদ হয়ে মেয়েটা শুধু খুঁজতে থাকত ফুটবলের খবর। বর্তমান সময়ের সেরা অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সেস ফ্যাব্রিগাস, ডেভিড সিলভা, লুকা মাদ্রিচ -- এইসব নামগুলো শুনলে মুখ চকচক করে উঠত। বিপাশার স্বপ্ন ছিল ওঁদের উচ্চতাকে ছোঁওয়ার।
বিপাশাদের গ্রামে সেদিন "এম.পি কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট"-এর সাজো সাজো রব। সকাল থেকে ছটফটে হরিণীর মতো আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছিল বিপাশা। বিভিন্ন ব্লকের বহু ক্লাব অংশ নিয়েছিল সেই ফুটবল প্রতিযো- গিতায়। দিন-রাতের খেলা। খেলা শুরু হয়ে- ছিল বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ। খেলাকে কেন্দ্র করে সেখানে বহু বহিরাগতর সমাগম হয়েছিল। আর ছিল এম.পি তহবিলের বদান্যতায় মাঠের পাশে স্টল। সেখানে ঢালাও খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন --- চিকেন পাকোড়া, কফি, কুলফি ইত্যাদি। তাই গোটা এলাকায় ছিল থিকথিকে ভীড়। খেলার বিরতিতে বিপাশা গিয়েছিল পাকোড়া খেতে। সেখান থেকে ভীড়ের মধ্যে মুখ চেপে তাকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছিল নিজের গ্রামেরই একজন যুবক আর তার ষাট বছর বয়সের বাবা।
পরেরদিন পুলিশ এসে বাবা-ছেলেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কিছুদিন পর তাদের জামিনও হয়ে যায় । ষাট বছর এখন নাতির হাত ধরে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। আর, তার পঁয়ত্রিশ বছরের ছেলেটি সপরিবারে পুরী ভ্রমণে যান ।
ফি-মাসে সুবিচারের আশায় আদালতের দোরগোড়ায় চক্কর কাটে বিপাশার মা-বাবা। পাড়ার রাজনৈতিক দাদারা ঝামেলায় না গিয়ে কেস তুলে নেবার পরামর্শ দেন। বিপাশার ধর্ষণকারীরা গ্রামের প্রতিপত্তিশালী পরিবার। তাই বিপাশাদের রাজ্যে পুলিশ এনকাউন্টারে নয়, মহামান্য আদালতের দীর্ঘসূত্রী ন্যায় বিচারের ওপর ভরসা রাখেন।
আর ফি-সপ্তাহে নন্দিতা বিপাশাকে দেখতে যায় অন্তরা হোমে । ধর্ষিতা, রক্তাক্ত বিপাশা দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর, এখন সরকারী হোমে দিব্যি বেঁচে আছে। একটা ঝোলা নিয়ে সে সারাদিন ঘুরে বেড়ায় হোমের যত্রতত্র। আর, খবরের কাগজ থেকে খেলার খবরগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে জমিয়ে রাখে ঝোলার ভেতর। মুদির দোকানের ঠোঙা, চপ-সিঙারার ঠোঙা সবকিছুতেই খুঁজতে থাকে ফুটবল খেলার খবর। শুধু কাউকে আর চিনতে পারে না ফুটবল পাগল সেই উচ্ছ্বল মেয়েটি। নন্দিতাকেও না।
তারপর পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিকগতি চলতে থাকে ভৌগোলিক নিয়ম মেনেই।
ঋণশোধ
রীতা মোদক
আজ ছোট্ট তুলসীর হাত থেকে সুধার সখের কাপটি পরে ভেঙ্গে গেলো।কাপ ভাঙতেই তুলসী থতমত খেয়ে গেল।শব্দ পেয়েই সুধা দৌড়ে এলো -- আরে একি কান্ড! কি সর্বনাশ করলি? আমার এতো সুন্দর কাপটা তুই ভেঙ্গে দিলি? বের হ ছোটলোকের বাচ্চা? সকাল সকাল এতোগাল খেয়ে তুলসী ভেঙ্গে পড়লো।তাকে যদি সুধা মা কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়, তাহলে তুলসীর ভাইএর কি হবে? ভাইকে যে এবার স্কুল এ পাঠাতে হবে।তুলসীর মা মারা যাওয়ার সময় তুলসীকে বলেছিল -- তুই যদি আমার দূধ খেয়ে থাকিস, তাহলে ভাইকে বড় করে আমার ঋণ শোধ করিস।
কথাটা মনে পরতেই তুলসী সুধা মার পা দুটো জড়িয়ে ধরলো।বলল -- সুধা মা,আমাকে ছেরো না।আমার ভাই বড় হলে তোমাকে এর চেয়ে সুন্দর কাপ কিনে দেবে।আমি তোমার সব কাজ করে দেবো।সুধামার মনটা একটু ঠাণ্ডা হলে বলল, -- ঠিক আছে কাজে মন দে।কিন্তু কথাটা যেনো মনে থাকে।
প্রায় পনেরো বছর পর।তুলসী সুধা মার বাড়িতে কাজ করে রাতে সেলাই মেশিন এ কাজ করে।
তুলসীর ভাই বিক্রম শ্রমিক কল্যাণ দপ্তরে চাকরি পেয়ে ছে। এপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে বিক্রম চিৎকার করে বলছে -- দিদি দিদি আমি চাকরী পেয়ে গেছি।তোর আর কারো বাড়িতে কাজ করতে হবে না। আমি তোর বিয়ে দেবো। তোর সুন্দর একটা সংসার হবে।
দিদি আনন্দে আত্মহারা হয়ে মায়ের ছবির কাছে গিয়ে বলছে -- মা আমি পেরেছি তোমার ঋণ শোধ করতে।আজ ভাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে।
তারপর ভাইএর কাছে গিয়ে বলছে -- ধূর পাগল ছেলে, আমাকে এ বয়েসে কে আর বিয়ে করবে?
তার থেকে ভালো হয় তোর জন্য একটা সুন্দর বউ ঘরে আনবো। ছেলে পুলে হবে ,তাদের বড় করতে হবে না? শোন, সুধা মার বাড়িতে আমার একটা ঋণ রয়ে গেছে, তুই আমাকে একটা সুন্দর দেখে কাপ কিনে দিবি?
পরের দিন তুলসী এক বাক্স সুন্দর কাপ নিয়ে
সুধা মার বাড়ি গেলো।সুধামা একসাথে এতগুলো কাপ পেয়ে চোখ দিয়ে আনন্দে জল পরছে, আর মনে মনে বলছে -- মেয়েটা সুধে আসলে সব ঋণ শোধ করে দিয়ে গেলো।