Saturday, November 2, 2024



ব্যক্তিগত গদ্য 

দিনের পরে যায় দিন
অনিতা নাগ 

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হলো মণি। বাইরেটায় এই অসময়ে আঁধার নেমেছে। আকাশের মুখ ভার। বেশ জোর হাওয়া দিচ্ছে। আবার কোন এক সাইক্লোন আছড়ে পড়তে চলেছে।  শহুরে মানুষের  হাজার ব্যবস্থা। তাও মন ভ'রে না। সবসময়েই কি যেনো নেই,  কি যেনো পাওয়া হলো না , এই বিলাসিতাতে বাঁচতে ভালোবাসে। সুরক্ষিত বৈঠকখানায়, সোফায় গা এলিয়ে টিভিতে নিউজ আপডেট দেখতে দেখতে আহা উহু করা। এবার আবার নতুন এক শব্দ বন্ধ, নতুন এক পর্যটনের নাম শুনে অবাক মণি। সাইক্লোন টুরিজ্যিম। ভাবো কান্ড। যে তুফানের ভয়ে তটস্থ সকলে তা দেখার জন্য উদগ্রীব কিছু মানুষ।   রিল বানাবে, ভিডিও বানাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করবে।  লোক যতো দেখবে ততো লাভ। মণি ভাবে দিনে দিনে আর কতো দেখবে।
শরৎ কে বিদায় দিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় হেমন্তের দিনলিপি। অথচ প্রকৃতিতে তার বিন্দুমাত্র রেশ নেই। হেমন্ত মানেই একটা হাল্কা শীতের আমেজ। রাত বাড়লে হিমের পরশ। সকালে ঘাষের ডগায় শিশিরবিন্দু। ছোটবেলায় রাত বাড়লে হাল্কা শীত কাপড়ে কান মাথা ঢাকতে হতো। নাহলেই বড়দের বকুনি। এখন সবই গল্প কথা।  সাইক্লোনে বৃষ্টি হলো। নাজেহাল হলো কলকাতাবাসী। তারপর আবার সেই কটকটে রোদ। গ্লোবাল ওর্য়ামিং। যেহারে আধুনিকীকরণ আর সৌন্দ্যাযায়ন এর ধূম, তাতে প্রকৃতি আর করবে কি! 

জানলা দিয়ে  এক চিলতে আকাশ দেখা যায় এখনো। ক’দিন পর সেই টুকরো আকাশ হয়তো লুকিয়ে পড়বে কোনে ইমারতের আড়ালে। সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয় মণি। উঠোনের এক কোণে জল দিয়ে এঁটেল মাটি মাখছে তার মা। আটপৌরে শাড়ি,  একরাশ চুল হাতখোপ করে বাঁধা। ফর্সা মুখে কেমন এক পবিত্রতা মা'কে ঘিরে থাকতো। তখন চোখে পড়ে নি। এখন আকাশের কোণে মায়ের মুখটা বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে মণির।

মহালয়া, অষ্টমীতে গঙ্গাস্নান সেরে ফেরার সময় মাঝিদের থেকে এঁটেল মাটি নিয়ে আসতেন বাবা। সারাবছর উনুন নিকোতে মাটি লাগতো। আর কালিপূজোর আগে মা ওই মাটি দিয়ে প্রদীপ বানাতেন। এঁটেল মাটিকে জল দিয়ে মেখে হাত দিয়ে চেপে চেপে  প্রদীপ তৈরী করতেন মা। অনেক গুলো প্রদীপ। তারপর রোদে শুকোনো হতো। দুপুরে কাজ সেরে ঠাকুমা সলতে বানাতেন। পুরোনো ধুতি ছিঁড়ে, পাকিয়ে পাকিয়ে সলতে বানাতেন।  পাড়ার অনেক বাড়ীতে মোমবাতি জ্বলতো। কিন্তু মণি’দের বাড়িতে প্রদীপ জ্বলতো। সন্ধ্যেবেলায় মা'র সাথে ঘুরে ঘুরে প্রদীপ জ্বালাতো। বাড়ীর আনাচে, কানাচে, সব জায়গায় প্রদীপ দিতো। মা বলতেন ভূত চতুর্দশী তিথিতে প্রদীপের আলোয় সব অন্ধকার মুছে যাবে। সত্যি কি প্রদীপের আলোয় অন্ধকার দূর হয়! জানা নেই মণির। তবু সেই বিশ্বাস আজো বয়ে নিয়ে চলছে ।কার্তিক মাসে বাবা ছাদে লম্বা বাঁশের মাথায় একটা ছোট আলো লাগিয়ে দিতেন। আকাশপ্রদীপ। ঠাকুমা বলতেন এই সময় আকাশ প্রদীপ দিতে হয়। বিদেহী আত্মাদের আলো দেখাতে হয়। এখনো গ্রামে নিশ্চয় আকাশ প্রদীপ জ্বলে, হয়তো বা শহরেও জ্বলে আকাশ প্রদীপ। মণি কার্তিক মাস ভোর  একটা করে প্রদীপ জ্বেলে রাখে তুলসী তলায়।  সেই আলো কি পৌঁছোয় আকাশ পারে! জানা নেই।  তবু ছোটবেলার সেই সংস্কার আজও আঁকড়ে বাঁচে মণি। ভালো লাগে। জানে এরপর আর কেউ জ্বালবে না দীপ। আধুনিক আলোর বাহারে সাজছে শহর থেকে গ্রাম। সুইচ জ্বালালেই জ্বলে উঠে সারি সারি সাজানো প্রদীপ, মোমবাতি। হাওয়া এসে নিভিয়ে দিতে পারে না। হাতের আড়াল দিয়ে আগলে রাখতে হয় না প্রজ্জ্বলিত শিখাকে। স্হির হয়ে থাকে দীপ শিখাটি।  সাহসী, নিঃসংশয়।  মুঠোফোনে বন্দী হয় রঙীন মুহুর্তেরা। বিজন ঘরে টুংটাং আওয়াজে মুঠোফোনে ভেসে আসে সেই মুহুর্তগুলো। আলো ঝলমলে মুহুর্তেরা নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে না। বিজন ঘরে বসে সন্তানদের মঙ্গল কামনা করে মণি। সকলে ভালো থাক। আর থেকে থেকেই পুরোনো দিনগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। 





ঐ যে নীচের ঘরে মা নাড়ু বানাচ্ছেন।  কালিপূজোর দিন অলক্ষি বিদায়ের পূজো হবে যে। কতো কাজ। ঠাকুমা পূজোর বাসন মেজে ঘসে সাজিয়ে রাখছেন। বাজারের দায়িত্ব বাবার। উঠোনের একদিকে ছোড়দা বাজির মশলা তৈরী করছে। তুবড়ি বানাবে। রাতে পাড়ার সকলে একসাথে বাজি পোড়াবে। তখন কার তুবড়ি কতোদূর উঠলো সেই হিসেব হবে। রান্নাঘরে উনুনে তখন পেতলের হাঁড়িতে পূজোর নৈবেদ্যর আতপ চাল ফুটছে। মা সেই  ফুটন্ত চালে মটর ডাল বেটে গোল্লা গোল্লা করে দিয়ে দিচ্ছেন, সবার জন্য একটা করে। বাজির গন্ধের সাথে  সেই ফুটন্ত ভাতের গন্ধ আজও মিশে আছে। আজকাল বাসমতি, গোবিন্দভোগ, কতো রকমের চাল। কিন্তু সেই মোটা আতপ চালের ভাতের স্বাদ আর পাওয়া যায় না। সেই ভাতে মায়ের পরশ ছিলো যে! সবাই মিলে পিঁড়ি পেতে বসে খাওয়ার আনন্দ ছিলো। বেশ ছিলো দিনগুলো। কেনো যে ছোটবেলাটা হারিয়ে যায়! এই হেমন্তের দিনগুলোও তেমনি। বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। দুর্গা পূজো, লক্ষ্মি পূজো হয়ে গেলেই কেমন মন কেমন করে। ছোটবেলায় মনে হতো দিনগুলোকে যদি বেঁধে রাখা যায়! ছুটি শেষে আবার স্কুল, পড়ার চাপ। চিরকালের ফাঁকিবাজ ছিলো যে!
   হেমন্তের  সাথে সাথে শিউলি বিদায় নেয়। ধীরে ধীরে শীতকে তার জায়গা ছেড়ে দিয়ে কখন যেনো টুপ করে লুকিয়ে পড়ে হেমন্ত। ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু,  মাঠে মাঠে কচি ধানের লুটোপুটি। তবু সে যেনো আড়ালে থাকে। আঁচল বিছিয়ে আড়াল করে রাখে নিজেকে। তারপর একদিন টুপ করে হারিয়ে যায়। যেমন করে  আকাশের কোলে হারিয়ে যায় প্রিয়জনেরা।  পড়ে থাকে একরাশ স্মৃতি। মণি হাতড়ে বেড়ায় পুরোনো দিনগুলো। স্মৃতির ঝুলি থেকে লুকোচুরি খেলে তার ফেলে আসা দিনগুলো। এখন চুলে তার রূপোলী উঁকিঝুঁকি।  সে'দিনের ছোট মেয়েটা পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ পথ। সেই দীর্ঘ পথের বাঁকে বাঁকে কতো স্মৃতি। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ঘুরেছে। প্রত্যেক রাজ্যের উৎসবের রঙ আলাদা, সাজ আলাদা। কিন্তু কোথাও, কোনোখানে সব চাওয়া পাওয়া মিলে যেতো। অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তোরণের পথ আলাদা হলেও সব পথের একটাই চাওয়া শান্তি, সমৃদ্ধি,  আনন্দ।  
দিন বদলের গল্প গুলো বড্ড তাড়াতাড়ি পালা বদল করে। সিনেমার দৃশ্যপটের মতো জীবনে বদল আসে। ঋতু বদল হয়। হঠাৎ আকাশ পারে বিদ্যুতের ঝলকানিতে মণির চমক ভাঙে। দূরে হারিয়ে যায় আলপনা আঁকা লক্ষ্মির পা। মুঠোফোনে গান বেজে উঠে ‘আমার কিছু কথা আছে ভোরের বেলার তারার কাছে, সেই কথাটি তোমার কানে চুপি চুপি লও’।
মণি পরম যত্নে আগলে রাখে তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে।



 গল্প 


গল্প খোঁজা
সুজাতা কর

রিনি পাতিপুকুর বস্তি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় আসে। ন'টা থেকে তার ক্লাস। সে একটি বেসরকারি কলেজের BCA-এর ছাত্রী। সকালে তার কিছু খাওয়া হয়নি। বাড়িতে স্টোভ জ্বলেনি। গতকাল রাতে তার বাবা জুয়ায় মাস মাইনের সমস্ত টাকা হেরে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। সে সময় তার মা  চার বাড়ি কাজ সেরে সবেমাত্র তাদের জন্য ডিমের ঝোল- ভাত রাঁধতে বসেছে। আগামী সপ্তাহে রিনির কলেজের ফিস জমা করার শেষ তারিখ। না জমা করলে নাম কাটা যাবে। তার বাবা জ্যাম-সস তৈরির কারখানায় কাজ করে। বাবার মাইনেতে তাদের সংসার চলে। মায়ের চার বাড়ির রান্নার টাকা রাখা হয় রিনির কলেজের মোটা ফিসের জন্য। কিন্তু তার বাবা কোনো মাসেই মাইনের পুরো টাকা সংসারে দিতে পারে না জুয়ার নেশায়। ফলে মায়ের টাকায় হাত পড়ে। কাল আর মা ধৈর্য রাখতে পারেনি, ফুঁসে উঠেছিল, জোরে ধাক্কা দিয়েছিল বাবাকে। বাবা ঘুরে দাঁড়িয়ে সপাটে এক চড় কষেছিল মায়ের গালে। মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে বিছানার চাদর খাবলে ধরেছিল রিনি। কাল রাতে রিনি আরো দু'ঘন্টা বেশি পড়াশোনা করেছে। আজ সকালে রিনি দেখেছে মায়ের গালে কালশিটে। তার ওপরে বাসি চোখের জলের দাগ। আজ তাকে প্রোগ্রামিং নলেজের একটা বইও কিনতে হবে।

ছ'টা নাগাদ দুটো বাচ্চাকে পড়িয়ে রিনি বাস ধরে। বাঙ্গুর অ্যাভেনিউ-এর প্রবেশ রাস্তার সামনে ভি,আই,পি রোডে নামে। একটু এগিয়ে যায় সামনে। গাছপালা ঢাকা রাস্তাটা নির্জন, অন্ধকার। দুটো এলাচ মুখে দেয় রিনি। সকাল থেকে প্রায় না খাওয়া। মুখে বাজে গন্ধ হতে পারে। ব্যাগপ্যাক থেকে নতুন বইটা বের করে। সস্নেহে হাত বোলায়, গন্ধ নেয় বুক ভরে। বইটা ফের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। রাস্তার দিকে তাকায়। দূর থেকে একটা বাইক আসছে। রিনি সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সমস্ত ইন্দ্রিয় টানটান হয়ে ওঠে, একটু উত্তেজনা। আকাশের দিকে তাকায়, বিড়বিড় করে। বাইক চোখের দৃষ্টির সীমায়। উজ্জ্বল হলুদ শার্ট। রিনি আঙ্গুল ক্রস করে। বাইক সামনে এসে দাঁড়ায়, হেলমেট খোলে। রিনি দেখে তার খদ্দের আর কেউ নয়, পিসতুতো দাদা মনোজ। বিহ্বল রিনি গল্প খোঁজে।


 

গোমাতা
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য

কাশী। বেনারস। ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী শহরের দুটো ভাগ। প্রথমটি বেনারস রেল স্টেশন লাগোয়া নতুন আধুনিক বেনারস শহর, আর, দ্বিতীয়টি সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসা আদ্যিকালের রূপ রস গন্ধ মেখে আজও সগর্বে দণ্ডায়মান সর্বপাপহারিনী গঙ্গাপার্শ্ববর্তী পুরাতন বেনারস তথা কাশী। কাশীতে দেখার জিনিস দুটি, গঙ্গা আর বাবা বিশ্বনাথের মন্দির, এবং, এর বাইরে যা কিছু সবই এই দুটিকে ঘিরেই আবর্তিত। কাশীর সুদীর্ঘ গঙ্গাতীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মোট চুরাশিখানা ঘাটের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ঘাটটি হল দশাশ্বমেধ ঘাট, যা প্রধানত ব্যবহৃত হয় বেনারসের প্রাণেশ্বর বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিতে আসা স্থানীয় মানুষ বা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পুণ্যার্থীদের দৈনন্দিন স্নানকৃত্যাদিহেতু এবং ভোর ও সন্ধ্যার পবিত্র গঙ্গা আরতির জন্য। বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরের পুরোহিতকুল এবং ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সুসংগঠিত উপস্থিতি ও আয়োজনে ধূপধুনো বাদ্য ডমরু চামর সহযোগে বহুবিধ ভক্তিমূলক সঙ্গীত এবং শাস্ত্রসম্মত গঙ্গাবন্দনার সাথে সাথে সমবেত উদাত্ত কণ্ঠের গঙ্গাস্তোত্র, গোবিন্দভজনা এবং শিবনামের মধুর ধ্বনিতে সকাল সন্ধ্যে আলোড়িত হয়ে ওঠে গোটা ঘাট চত্বর। দেশবিদেশ থেকে আগত পুণ্যার্থীদের ভিড়ে ঘাটের ছড়ানো সুপ্রশস্ত এলাকা জুড়ে এইসময় যেন পা ফেলারও জায়গা থাকে না। রোজকার এই জমজমাট গঙ্গা আরতি দর্শন করতে স্থানীয় মানুষজনও আসেন নিয়মিত। যেমন, কাশীদেবী আর তাঁর বছর ছয়েকের একমাত্র নাতি মোহন। রোজ সন্ধ্যের আরতির একটু আগে এসে ঘাটের শেষ ধাপটিতে বসে একমনে মুগ্ধ হয়ে এই গঙ্গা আরতি দেখেন কাশীদেবী এবং আরতির পাট শেষ হলে ছোট একটি মাটির প্রদীপ জ্বেলে মা গঙ্গাকে প্রণাম করে জলে ভাসিয়ে দেন, আর তারপর, নাতি মোহনের হাত ধরে মন্থর পায়ে ঘাটের পর ঘাট পেড়িয়ে বাড়ির পথ ধরেন। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, কাশীদেবীর এই নিয়মের অন্যথা নেই। 

কাশীদেবী বেনারসেরই আদি বাসিন্দা। দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে ঈষৎ দূরে বামদিকে তাকালে আরও গোটা দশেক ঘাট পেড়িয়ে যে রেলের ব্রিজ দেখা যায়, সেই ব্রিজের কাছেই একটি বেশ সুসজ্জিত ঘাট হল দুর্গা ঘাট। সরু সরু পাথরের অসংখ্য ধাপওলা সিঁড়ি নিচের জল থেকে একেবারে খাড়া উঠে গেছে অনেকটা ওপরে। এই দুর্গা ঘাট দিয়ে ওপরে উঠে এসে দু’পাশের আকাশছোঁয়া শতাব্দী প্রাচীন গোটা কুড়ি বাড়ি ছাড়িয়ে সামনে এগোলে বামদিকের এক সূর্যালোকবঞ্চিত প্রায়ান্ধকার সরু কানাগলির একেবারে শেষপ্রান্তে কাশীদেবীর বাসগৃহ। চটলা ওঠা রঙহীন প্রায় ভেঙে পড়া তিনখানি ঘর নিয়ে বাড়িটি, যার অপেক্ষাকৃত ভাল ঘরদুটির একটি ব্যবহৃত হয় কাশীদেবী ও মোহনের থাকার জন্য, অন্যটি রান্নাঘর, এবং, উঠোনসংলগ্ন ছইঢাকা তৃতীয় ঘরটি বরাদ্দ এ বাড়ির সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ প্রাণী, রোহিণীর জন্য, যে কিনা এই ঠাকুমা নাতির এই দিন আনি দিন খাই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী উপায়! ধবধবে সাদা দুধেল গাই রোহিণীই কাশীদেবীর জীবনের পুরুষানুক্রমে প্রাপ্ত একমাত্র সম্বল। 

************

“ তাড়াতাড়ি কর বেটা! আর দেরি করলে সবাই চলে যাবে যে!”, উদ্বিগ্ন কাশীদেবীর গলা ভেসে আসে গোয়ালঘরের ভেতর থেকে।

দ্রুত মুখ চালায় মোহন। গোল লালরঙা বাতাসাটার শেষ টুকরোটি মুখে পুরেই ঢক ঢক করে তাড়াতাড়ি এক ঘটি জল খেয়ে নেয় সে। এখনও ভোরের আলো ফোটেনি। অন্যদিন এত সকালে কখনও মন্দিরে যায় না তারা। কিন্তু আজ শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার। বাবা বিশ্বনাথের পুজোর আজ বড় পুণ্যের দিন! আজ থেকে শুরু হয়ে গোটা শ্রাবণ মাসটাই এই হুড়োহুড়ি চলবে। প্রতি বছর এই সময়ে দিনরাতের ঠিক থাকে না তাদের। 

“ আসছিইইইইই!”, কোনমতে কমলা রঙের সাদা ছিট ছিট জামাটায় মুখটা চট করে মুছে নিয়েই এক দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় মোহন। কাশীদেবী ততক্ষণে বড় দুটো পাত্রে টইটম্বুর করে রোহিণীর মিষ্টি ঘন দুধ ভরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার গলিপথ ধরে রওনা দিয়েছেন। মোহন ছুট্টে গিয়ে তাঁর বামহাতটা ধরে নেয়। তারপর, আগে আগে চলতে থাকে।

গোটা মন্দির চত্বর আজ অন্ধকার থাকতেই গমগমে। ভোর চারটেয় মন্দিরের দোর খুলবে। আজ ঠাকুরের রাজবেশ। ফুলে ফুলে আজ ভরে উঠবে গর্ভগৃহ। ধূপধুনো, ফুল বেলপাতা, শুদ্ধ সুললিত মন্ত্রোচ্চারণ আর পুণ্যার্থীদের সমবেত কোলাহলে চতুর্দিক আজ ভোর না হতেই জমজমাট। অনেকে আজ নিজেরাই ঝুড়িভর্তি করে বাগানের ফুল আর বড় বড় পিতলের ঘড়া ভরে দুধ নিয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও সকাল হওয়ার আগেই কাশীদেবীর দুই পাত্রভর্তি দুধ নিঃশেষ। খুশিমনে খালি পাত্রদুটি নিয়ে মোহনের হাত ধরে কোনমতে ঠেলেঠুলে মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন কাশীদেবী। আজকের দিনে বাবার দর্শন না করলেই নয়! 

পুজো শুরু হয়ে গেছে। আহা, ঠাকুরের কি রূপ! ফুলে ফুলে চতুর্দিক সুরভিত, আর, ক্ষণে ক্ষণে একের পর এক পুণ্যার্থীর ক্ষুদ্র বৃহৎ পিতল মাটি আর রূপার ঘড়া থেকে বাবার ওপরে ঝরণার মতো সবেগে নেমে আসছে শুভ্র তরল অমৃতধারা। পবিত্র দুগ্দ্ধরাশির অনন্ত স্রোতধারায় বিরামহীন স্নান করেই যাচ্ছেন তিনি! আহা! কি বিরল এই স্বর্গীয় দৃশ্য! এ দৃশ্য দর্শনেও মহা পুণ্য! পরম আনন্দে বুক ভরে ওঠে তাঁর, তোবড়ানো গাল বেয়ে নোনাজলের স্রোত নামে নিঃশব্দে।

************

“নানি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”, খানিকক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে প্রশ্নটা করেই ফেলে মোহন।

কাশীদেবী রান্নাঘরের এক কোণে বসে দ্রুত হাতে রুটি সেঁকছেন। প্রতি রাত্রে মোট চারখানা করে মোটা মোটা চাপাটি বানান তিনি। আড়াইখানা তাঁর জন্য, আর, বাকি দেড়খানা মোহনের। সঙ্গে কোনও একটা সবজি, যখন যেটা সস্তায় পাওয়া যায়।

চাটুর উপর থেকে চোখ না সরিয়েই কাশীদেবী জিজ্ঞেস করেন,” কী?”

কয়েক মুহূর্তের জন্য হঠাৎই থমকে যায় মোহন। প্রশ্নটি শেষ অবধি করবে কিনা চট করে বুঝে উঠতে পারে না। কেমন করে যেন তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতেও সে অনুভব করে যে তার এই জিজ্ঞাসাটিতে যেন অনেকটা নিষেধ মিশে আছে! অথচ, সেই কাকভোরে যখন থেকে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকেছে, মনের ভেতরটায় যে বড় আকুলিবিকুলি করছে! প্রশ্নের উত্তরটা যে তার না জানলেই নয়! আর, কাকেই বা এ কথা জিজ্ঞাসা করবে সে! আর তো কেউ নেইও তার!

“ আচ্ছা, নানি বল না, আমরা কেন একটু দুধ খেতে পারি না! প্রতিদিন তুই সব দুধ মন্দিরের জন্য নিয়ে চলে যাস! কেন, আমার কি একটুও দুধ খেতে ইচ্ছে করে না! ওই রাম, সূরয, রাধা সবাই তো সকাল বিকেল দুধ খায়, আর, আমাদের নিজেদের গাই থাকতেও আমরা একটুও দুধ পেতে পারি না?”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলেই দারুণ হাঁফাতে থাকে মোহন। সেই সকাল থেকেই এ নিয়ে এক বিষম বিড়ম্বনায় ভুগছে সে। ব্যাপারটা সে আগেও দেখেছে, কিন্তু আজ যেন বাবার দুধস্নানের জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে তার! ঠাকুমার হাত ধরে অনেকটাই সামনে চলে গিয়েছিল মোহন আজ। উঃ, সে কি অলৌকিক স্বর্গীয় দৃশ্য! ঝর ঝর করে নিরন্তর স্রোতের মতো দুধের বর্ষণ হয়েই চলেছে বাবার মাথায়! বাবাকেও দেখা যাচ্ছে না, এতই নিশ্ছিদ্র সেই দুধের ধারাস্রোত! তাদের দুই পাত্র দুধও ওইখানেই কোথাও মিশে আছে, কিন্তু, কেমন যে ওই অমৃতধারার স্বাদ আজ অবধি জেনে উঠতে পারল না সে! ফেরার পথে সারা রাস্তা ঠাকুমার অলক্ষ্যে চোখের জল সামলাতে সামলাতে এসেছে সে! বেশি চাই না, কিন্তু, ওই অন্তহীন অমৃতের প্রাচুর্য থেকে এক বিন্দুও কি পাওয়ার ভাগ্য নেই তার! চোখ ফেটে আবারও জল আসে মোহনের। এ কেমন বিচার বাবার! 

কাশীদেবীর বুকটা ধরাস করে ওঠে। হে বিশ্বনাথ, এ কি বিড়ম্বনায় ফেললে তুমি আমাকে! গরম চাটুটা কাঁপা হাতে মেঝেতে নামিয়ে রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে বসে থাকা নাতির দিকে তাকান তিনি। মোহনের দু’চোখ ছলছল করছে। নিদারুণ তীব্র কষ্টে বুক ফেটে যায় কাশীদেবীর। তাঁর গোবিন্দ বেঁচে থাকতে সকাল বিকেল দু’বেলা ছোট এক ঘটি দুধ মোহনের জন্য বরাদ্দ ছিল, কিন্তু, ওর চলে যাওয়ার পর থেকে এই কষ্টের সংসারে মা মরা নাতিটার মুখে আর দুধ তুলে দিতে পারেননি তিনি। সময়ের সাথে সাথে ওই স্বাদ তাই ভুলেই গেছে ছেলেটা! অভাবের তাড়নায় সেই থেকে আর রোহিণীরও বিশেষ যত্ন হয় না, ফলে, খুব বেশি দুধ ওও দিতে পারে না এখন। তাই দুধ যেটুকু পাওয়া যায় তার পুরোটাই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন কাশীদেবী। তবু এই উপায়টুকু আছে বলে রক্ষা, নইলে, কাশীর ঘাটে বসে ভিক্ষাবৃত্তি করা ছাড়া তাঁর আর গত্যন্তর থাকত না।

কোনমতে ঢোক গিলে কম্পিত স্বরে কাশীদেবী বলেন,” বাবা মোহন, দুধ যে অমৃত! স্বর্গের জিনিস! সবাই কি তার ভাগ পায়!”

মোহন কান্না ভুলে নির্বাক হয়ে ঠাকুমার দিকে চেয়ে থাকে। তাঁর মুখনিঃসৃত শব্দগুলির ঠিক মর্মোদ্ধার করতে পারে না যেন!

কাশীদেবী বুকে খানিকটা বল পেয়ে এবার তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন,” ও যে ভগবানের জিনিস সোনা! আমরা তাঁর পায়ের তলায় থাকি, ও অমৃত যে ছোঁয়ারও অধিকার নেই আমাদের! একমাত্র বাবা বিশ্বনাথ আর তাঁর অনুরাগী ক’জন মহা ভাগ্যশালী মানুষেরই যে কেবলমাত্র সে অমৃত মুখে দেওয়ার অধিকার আছে! এ যে ভগবানেরই বিধান বাবা আমার, না মেনে কি উপায় আছে! অন্যথায়, মহাপাপ হবে যে! তাও তো কত ভাগ্যি, আমাদের রোহিণী আছে! ওর দুধে প্রতিদিন বাবাকে সেবা করার সুযোগটুকু অন্তত পাই আমরা, এটাই কি কম! এতেই যে মহা পুণ্য!”

কয়েক মুহূর্ত মোহন কোনও কথা বলতে পারে না। পাথরের মতো স্থির হয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে ঠাকুমার দিকে চেয়ে থাকে। খানিক পরে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে ওঠে,” তাহলে কি সত্যিই কোনদিনই দুধ খেতে পারব না আমি নানি! একটা ছোট্ট ফোঁটাও না!”

কাশীদেবীর বুকে যেন শেল বেঁধে। এত অসহায় এযাবৎ তিনি কদাপি বোধ করেননি। মাথার ভেতরটা উথালপাথাল করতে থাকে তাঁর। তারপর, হঠাৎই বিদ্যুতচমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে যায়! ঠিক তো, এটা তো অ্যাদ্দিন মাথাতেই আসেনি তাঁর! উঃ, সত্যি, কি বোকা তিনি! অন্তরের প্রবল ধুকপুকানি অতি কষ্টে চেপে রেখে দুরু দুরু বক্ষে এবার কাশীদেবী বলে ওঠেন,” একটা উপায় অবশ্য আছে! জানকীকে দেখেছিস তো! ওই যে, আজকাল সারাদিন দশাশ্বমেধ ঘাটে ঘুরে বেড়ায়!”

মোহনের চোখ জ্বল জ্বল করে ওঠে,” রঘুদের আগেকার গাইটা!”

সবেগে মাথা নাড়েন কাশীদেবী,” হ্যাঁ! ওরা তো গত বছর নতুন গাই নিল, জানকীকে তাই ঘাটে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ও বুড়ো হয়ে গেছে, ফলে ওর দুধে এখন আর বাবার সেবা ভাল করে হয় না। তাই দেবসেবায় যেহেতু আর লাগে না, চাইলে ওর দুধটুকু তুই এবার পেতে পারিস! এখন আর ওতে পাপ লাগবে না!”

এতক্ষণে মোহনের মুখের সব মেঘ কেটে যায়। যাক, অবশেষে একটা উপায় বের হল তবে! সত্যিই তাহলে এবার থেকে দুধ খেতে পারবে সে! বাবার কাজে না লাগুক, দুধ তো! আর, যে যাই বলুক, গোমাতার সব দুধই অমৃত সমান!

************


পরদিন অন্ধকার থাকতেই বৃদ্ধা কাশীদেবী তাঁর নাতির হাত ধরে বড় বড় ভারী দুটো দুধভর্তি পাত্র নিয়ে রোজকার মতো মন্থর পায়ে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আজ মোহনের ভারী আনন্দ। লাফাতে লাফাতে আগে আগে চলেছে সে। ঘাট থেকে রাস্তায় ওঠার আগেই সারা চত্বরে একবার ঝটিতি চোখ বুলিয়ে নেয় মোহন। জলের প্রায় কাছাকাছি একটা গোল উঁচু বেদীর গা ঘেঁষে আলস্যভরে বসে আছে জানকী। চোখদুটো চকচক করে ওঠে মোহনের। তাড়াতাড়ি করে কোনমতে ঠাকুমাকে মন্দিরের সামনে পৌঁছে দিয়েই এক ছুট লাগায় সে উল্টোপানে। আজ তার আর বাবার দুধস্নান দেখার ইচ্ছে নেই। আজ সে নিজেই এক ফোঁটা হলেও সেই অমৃতের ভাগ পাবে! অবশেষে, আজ তার নিজেরই স্বর্গ ছোঁয়ার দিন!


 

 

রাতের সওয়ারি

 চিত্রা পাল

                                                                                         

সেদিন সন্ধ্যে বেলায় খুব জমে গ্যাছে গল্প। একে শীতকাল, তার ওপরে অনেকে আজ ক্লাব ঘরে জমায়েত হয়েছে। পরবর্তি পিকনিক নিয়ে আলোচনাও বেশ জমে উঠেছে,কোথায় হবে,কত চাঁদা ধার্জ হবে সেসব নিয়ে তর্ক চলছে তুমুল। তার ওপরে ক্লাবের কেয়ারটেকার কাম চা সাপ্লাই করার ছেলে গদাই সবে এক রাউন্ড গরম চা দিয়ে গেছে,কথাবার্তা চলছে বাজারের ধেনুর দোকান থেকে গরম গরম বেগুনি আনানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা। আজ জহর কাকা বড় উদার হয়ে গেলেন যেন কেমন করে।বললেন,যা তো গদাই সবার জন্যে গরম বেগুনি নিয়ে আয়,বলে হাতে টাকা ধরিয়ে দিলেন,আর জটাদা বলে দিলো,আমার সাইকেলটা নিয়ে দৌড়ে যা,দেরি করবি না। গদাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে,শীতকাল বলে দরজাটাও টেনে দেওয়া হলো, এমন সময়ে ঝুপ করে আলো গেলো নিভে। খুঁজেপেতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আবার বসলো সবাই। মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় রাজাদা বলে উঠলো, আজ একেবারে ভুতের গল্পের পরিবেশ। হয়ে যাক ভূতের গল্প।তখন কেউই ঠিক বলতে চাইলো না ,জহর কাকা বললেন,আমি একটা কাহিনী বলছি,ঠিকভূতের নাও হতে পারে, তবে একেবারে সত্যি ঘটনা। 

  তোমরাতো সবাই জানো, এটা আমার পিসির বাড়ি, আগে থেকেই আসা যাওয়া আমিই বেশি করতাম এখানে। আমার পিসিমা আমাকে ভালো বাসতো খুবই। সেবার কি একটা দরকারে বাবা বললেন যে তুই একবার রাধার কাছে যেতে পারবি?রাধা আমার পিসিমার ডাক নাম।   তাহলে কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।আগে আমি বহুবার এসেছি, এখানে কতদিন থেকেছি, পিসিমার বাড়ীর পাড়ার লোকজন পর্য্যন্ত আমায় চেনে,আমি যেতে পারবো না, ঠিকপারবো। 

পাশ থেকে ভবানীদা জিজ্ঞেস করে, তখন তুমি কত বড়?কত আর বড়,এই নাইন টেনে পড়ি বোধ হয় ,বলে জহর কাকা আবার শুরু করেন।আমি রাজি হয়ে গেলাম। বাবা আমাকে বললেন,এই সামনেই বড়দিনের ছুটি সেই সময় গেলেই ভালো। বাবা আমাকে দার্জিলিং মেলের টিকিট কেটে দিলেন, আর বললেন,রাধাকে একটা টেলিগ্রাম করে দিই কত তারিখে তুই যাচ্ছিস।কারণ তখনকার দিনে তো এতো মোবাইলের রমরমা ছিলো না। এত কি বলছি,মোবাইলই তো ছিলো না।  সেই মত সব ব্যবস্থা পাকা হলো।আমারও খুব উত্‌সাহ যে আমি আবার পিসিমার বাড়িতে আসবো। 

   যেদিন আসবো,সেদিন ক্যানো য্যানো দার্জিলিং মেল শিয়ালদা থেকে ছাড়তেই দেরি করলো। ফরাক্কায় পৌঁছতেই প্রায় সন্ধ্যে। তখন আবার ফরাক্কা ব্রীজ হয়নি।আমাদের সব কিছু বিরাট বড় গাদা স্টিমারে করে এপারে আসতো। এপারে দুটো ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকতো,একখানা দার্জিলিং মেল আর  একখানা আসাম যাবার কামরুপ এক্সপ্রেস।আমার যেহেতু জলপাইগুড়িরোড যাবার টিকিট ছিলো, আমি কামরুপ এক্সপ্রেসে উঠে পড়লাম।উঠেই নিজের বিছানা পত্তর করে শুয়ে পড়লাম। শোয়ার পরেই একেবারে গভীর ঘুম। এতো ঘুমিয়েছি আমি ,যে কখন মালদা চলে গ্যাছে টেরই পাইনি।একেবারে ঘুম ভাঙ্গলো নিউ জলপাইগুরিতে এসে। যাই হোক সঙ্গে যা ছিলো, একটু খাবার দাবার খেয়ে হাত মুখ ধুয়ে বিছানাপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে বসলাম। ট্রেন ছেড়ে দিলো।এর পরের স্টেশনই জলপাইগুড়ি রোড।কিন্তু স্টেশন আর আসেই না। গাড়ি দু পা যায় আর থামে। এই করে  যখন জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে আমি নামলাম তখন রাত এগারোটা। কেউ কোত্থাও নেই।যে দুচারজন প্যাসেঞ্জার নামলো,তারা টুপটাপ কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।

চারদিকঘুটঘুটে অন্ধকার।মাইলের পরে মাইল নিকষ কালো। একমাত্র স্টেশন মাষ্টারের ঘরে একখানা হ্যাজাক জ্বলছে। আমি স্টেশন মাষ্টারের ঘরে  গিয়ে বললাম, আজ রাত্তিরটা এখানেথাকতে পারি? উনি বললেন,যাবেন, কোথায়?আমি বললাম, পান্ডাপাড়া। বললেন,ওদিকে এখন যাবার কিছুই নেই। রামদিন রাতে পাহারায় থাকে।আমি একটু পরেকাজ মিটিয়ে চলে যাব। ওকে বলে যাব। আমি ভাবলুম,একটা ব্যবস্থা তো হয়ে গেলো।এবার বাইরে গিয়ে দেখি তো একবারঅবস্থাটা কি,বলে বাইরে এলাম। এসে দেখি ,একখানা রিক্সা যেন দাঁড়িয়ে। রিক্সাওলা রিক্সার সিটে সারা গা মাথা মুড়ি দিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে। আমি বেশ জোরেই বললাম,ওভাই যাবে নাকি?ও আমার ডাক শুনে সীট থেকে নেমে রিক্সা নিয়ে আমার কাছে এলো। আমি বললাম, পান্ডাপাড়ায় যাব,যাবে? ও ঘাড় নেড়ে বললো, হ্যাঁ।ওর সারা গা মোটা চাদরে ঢাকা,মাথায় একখানা মাফলার একেবারে নাক মুখ বেড় দেওয়া । একে কালিগোলা অন্ধকার,তার ওপরে শীতকাল,কোনক্রমে তার মাথা নাড়াটা বুঝতে পারছি। আমি দৌড়ে গিয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে আমার লাগেজ  নিয়ে কোনক্রমে রিক্সায় উঠে পড়লাম। খানিকটা এসে দিনবাজারের কাছে প্রায়, আমার কি মনে হতে রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম,তুমি কি বিল্টু? অন্ধকারে কিছু বোঝা যায় না,তার ওপরে  মাথামুন্ডু সব ঢাকা আমার মনে হলো যেন ও  বললো হ্যাঁ।  আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে রইলুম।কারণ আমি জানি বিল্টু রিক্সাওয়ালা পিসিমার বাড়ির চেনা লোক। দরকারে অদরকারে ওকেই পিসিমার বাড়ির সবাই ডাকে। কখন যেন আমার একটু তন্দ্রা এসেছিলো, ঘুমের চটকা ভেঙে দেখি,আমি একেবারে পিসিমার বাড়ির দোরে। ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙিয়ে তবে সদর খোলা হলো। আমি ওকে বললাম,তুমি কাল সকালে একবার এসো।ও ঘাড় কাত করে চলে    গেলো।

পরের দিন সকালে সবাই আমাকে দেখে হৈচৈ করছে,এমন সময়ে পিসিমা বললেন,অত রাতে তুই এলি কি করে? আমি বললাম, ক্যানো, বিল্টুর রিক্সায়। এয়াঁ, সে কি রে, সে তো মাস ছয়েক আগে ওই কাছেপিঠেই রাস্তায় এক্সিডেন্টে মারা গ্যাছে। তুই ওর গাড়িতে কি করে এলি? আমিও মহা ধন্দে পড়ে গেলুম, আমি তাহলে কার রিক্সায় এলাম?ওকি বিল্টু না অন্য কেউ? সে যাই হোক আমার মনে হয় আজও যে ও বিল্টুই ছিলো না হলে ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিলো কী করে?

 জহর কাকার এই গল্পের পরে রাস্তায় কেউ নামতেই চায় না, কেননা, রাস্তাওযে লোডসেডিং-এর জন্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার।         

 

      


 

শোধ

সম্মিলিতা দত্ত


কলিংবেলটা তখন থেকে বেজেই চলেছে। কেউ যাচ্ছে না দেখে আমিই উঠে গেলাম দরজা খুলতে। দরজা খুলে দেখি ভাই দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখে চুপচাপ মাথা নীচু করে ঘরে ঢুকে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু একটাই কথা বলল, 'আজও হলো না।' বাবা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে এসেছে রে?' আমি বললাম,' ভাই এসেছে।'বাবা শুনে বললেন, 'ও, তো কিছু কাজকম্ম জুটলো কপালে? বলি আমারও তো বয়স হয়েছে। এভাবে বাপের হোটেলে পড়ে পড়ে আর কতদিন চলবে? সমাজে তো আমার একটা মানসম্মান আছে নাকি? এবার কিছু একটা কর। নাহলে সমাজে মুখ দেখাবো কেমন করে?'
ভাই হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে খেতে বসেছিলো। বাবার কথা শুনে উঠে পড়লো। বাবা চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন, 'নবাবপুত্তুর এসেছেন কিনা! এভাবে না খেয়ে কী বোঝাতে চাইছে ও? অকম্মার ঢেঁকি একটা। দেখ না পাশের বাড়ির সায়ন্তনকে। তোরই তো সমবয়সী। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর একদিনও বসে থাকেনি। কিছুদিন আগে প্রমোশন পেয়েছে, বাজার করতে গিয়ে শান্তনুবাবুর কাছে আজ শুনলাম। আচ্ছা আমি তোর কাছে একটাই কথা জানতে চাই। এভাবে আর কতদিন?' ভাই কিছু না বলে চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। কাজেই বাবাও রণে ভঙ্গ দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। ঘুম থেকে ওঠার পর মনে পড়লো আজ কেমিস্ট্রি পড়া আছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে ছয়টা প্রায় বাজে। উফ্, আজকে আবার লেট হয়ে গেলো। তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে বাবা - মাকে বলে বাড়ির থেকে বের হয়ে এলাম। ভাইকে অনেকবার ডাকলাম, দরজা খোলেনি। থাক, হয়তো ঘুমোচ্ছে।

টিউশন ছুটি হতে হয়ে সাড়ে নয়টা বেজে গেলো। তারমধ্যে স্যার আবার আজ পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল করে মোবাইলটাও বাড়িতে ফেলে এসেছি। অন্যদিন অটো বা টোটো ধরে বাড়ি চলে যাই। আজ রাস্তায় বেরিয়ে দেখি একটাও অটো নেই। রাস্তাটাও কেমন নির্জন। গা-টা কেমন ছমছম করে উঠলো। এদিকে সাথে ফোনটাও নেই যে ভাইকে ফোন করে বলবো এসে নিয়ে যেতে। ভাবলাম যে এটুকুই তো রাস্তা। কতক্ষন আর লাগবে! বড়জোর দশ মিনিট। হেঁটেই চলে যাই। জোরে জোরে পা চালালাম। কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো কে যেনো আমার পিছন পিছন আসছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি দুই - তিনটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে কীসব বলতে বলতে আসছে।সকলেরই মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা হঠাৎ আমার সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো। 'কি মামনি, এই রাতের বেলা কোথায় যাওয়া হচ্ছে একা একা? টিউশন থেকে ফেরা হচ্ছে বুঝি? আমাদের কথা শোনো আজ আর তোমাকে ফিরতে হবে না বাড়িতে কেমন?' আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। চিৎকার করে যে কাউকে ডাকবো সে উপায়ও নেই। ওরা আমার ওড়নাটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে গা থেকে খুলে নিয়ে আমার মুখ বেঁধে ফেললো। তারপর আমাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করলো রাস্তার ধারে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে ওদের মুখের দিকে তাকাতে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো ওদের মধ্যে একজনের চোখগুলো আমার খুব চেনা। কিন্তু ছেলেটা কে ?

জ্ঞান ফেরার পর দেখি মাথার কাছে একটা জটলা। সেই জটলার মধ্যে বাবাকেও দেখতে পেলাম। ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা দাঁড়িয়ে আছে, চোখমুখ একদম কাগজের মতো সাদা। বাবা তার জামা খুলে আমাকে জড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো। পথে একবারও জিজ্ঞেস করেনি কীভাবে কী হলো। বাড়িতে এসে ঢুকতেই ভাই বেরিয়ে এলো। বাইরে এত চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ও বেরিয়ে এসেছে। আমায় ওই অবস্থায় দেখে ও ততক্ষণে বুঝে গেছে যা বোঝার। বাবা নিজের ঘরে চলে গেলো। আর মা আমাকে তাড়াতাড়ি পোশাক এনে দিলো ঘর থেকে। 
আমি যখন নিজের ধরে বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদছি, ভাই এসে ঢুকলো ঘরে। বললো, ' কি হয়েছে আমাকে সব খুলে বল।' ভাইকে সব বললাম। কথা বলতে বলতে ভাইয়ের হাত লেগে হঠাৎ ফোনের গ্যালারিটা খুলে গেলো। সেখানে একটা ছবি দেখে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। এই সেই চোখ যা আজকে আমি দেখেছি। এ তো সায়ন্তন! কাঁপতে কাঁপতে ভাইকে বললাম, ভাই সায়ন্তন! ওকে আর কিছু বলার দরকার হলো না, আমার মুখ দেখে ও নিমেষের মধ্যে বুঝে গেলো। বললো, 'আমি একটু বেরোচ্ছি।'

রাত গড়িয়ে যাচ্ছে। ভাইয়ের আসতে এত দেরি হচ্ছে, কোথায় গেছে তাও বলে যায়নি। আবার বাবা মাকেও জানাতে না করেছে। এদিকে আমি যে বাইরে বের হয়ে দেখব সেই সাহস আর অবস্থা কোনোটাই আমার নেই। জেগেই ছিলাম। রাত তখন তিনটা বাজে। দরজায় নক করার শব্দ শুনে আইহোলে চোখ রেখে দেখলাম ভাই এসেছে। আমি দরজা খুলে দিতেই কিছু না বলে তাড়াতাড়ি করে নিজের ঘরে চলে গেলো। ওর জামাকাপড়ে লাল যে দাগ দেখলাম, ওগুলো কি রক্ত? আর মুখেও অদ্ভুত রকমের একটা প্রশান্তি লক্ষ করলাম। আমি ওকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে শুয়ে পড়লাম। সারারাত ঘুমোতে পারলাম না গতকালের ঘটনা মনে করে। পরেরদিন সকালে উঠে দেখি চারদিকে হইহই পড়ে গেছে। পাশের বাড়ির সায়ন্তন খুন হয়েছে! কে বা কারা নদীর ধারে ওকে ফেলে রেখে গেছে খুন করে। ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিয়েছে। সায়ন্তন-এর ইতিহাস ঘেঁটে ওর নামে উঠে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। ও এর আগেও অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছে, কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাচ্ছিল। তাহলে কি তার খুনি কি কোনো মেয়েই? যার সে আবার সর্বনাশ করেছে? 
আমার মনে পড়লো কালকে ভাইয়ের জামায় রক্তের দাগের কথা। ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।


 

আলোকীয় লাজবন্তী
প্রদীপ কুমার দে 

আকাশের রঙ আজ লাল!
গোধূলির বেলা।
তাই কি এই লাল রঙের মাখামাখি?
তবে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে -একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। 
প্রকৃতিতে এক মধুর সংগীতের মূর্ছনা সুর তাল লয়ের মিলিত প্রয়াসে আবদ্ধ।
দুটি নক্ষত্র জেগে ওঠে।
খসে পড়তে থাকে ভূমিতে। 
ভূমি ওদের স্বাগত জানায়।

নেমে আসে লাল পরী। লাল রঙ মাখানো তার শরীর। উজ্জ্বল বহির্লোক। নিরাভরণ দেহে এক জ্যোতির্ময়ী রূপসী! চোখ ধাঁধানো ঝিলিক -ঝিলিমিলি ডানাযুক্ত! তবুও যেন ডানাকাটা পরী!

শুভ্রবর্ণ অশ্বারোহী রাজকুমার লাগাম টানতে ব্যস্তবাগীশ! অশ্বযুগল উচ্চস্বরে লাফিয়ে ওঠে।
মোহগ্রস্থ  রাজকুমার অপলক দৃষ্টি ঘুরপাক খায় পরীর শরীর জুড়ে। নীলাকাশের নীলাম্বরী যে আজ লালচে লাজবন্তী, উন্মোচিত দেহেও।

সরু কটিদেশ, উন্নত নিতম্বের ভারী স্তনদ্বয় আর মোটা ঠোঁটের অধিকারিণী, সুগঠিত এবং সুগভীর নাভিমূলের সুগন্ধি রাজকুমারের কামনায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কামরূপ প্রেমের উদ্বেগে সে আত্মহারা  উন্মাদপ্রায়!

পরী ডানা মেলে। বাহুবন্ধনীতে জড়িয়ে পড়ে অশ্বিনীকুমারের। আনন্দের অলিন্দে মাতোয়ারা হয়। মিলনের চুম্বন দীর্ঘায়িত হয়!

রাজকুমারের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। কটিদেশ থেকে নির্গত তরবারি উন্মোচিত হয়। রাজকুমার উন্মাদের ন্যায় আঘাতের নিমিত্তে এগিয়ে যায়!

ততোক্ষণে দুজনার প্রেম মিলিত কামনার  উগ্রতায় এক আলোকীয় দুনিয়ায় পৌঁছে যায় যেথায় হিংস্রতা হার মানে।

আর তখনই এক উজ্জ্বল আলোকপাত ঘটে। পতিত দুই নক্ষত্ররাজি আলোকবর্ষে পুনরায় মিলিয়ে যায়! রয়ে যায় আলোকীয় অনুভূতি! 


 

আদর্শ শিক্ষক 
শুভেন্দু নন্দী 

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলেন অবিনাশবাবু। হাতে  ডাস্টার,চক ও একটা লিকলিকে বাঁশের লম্বা কঞ্চি। এ যুগের লোক হয়েও বিশ্বস করেন,"spare the rod, spoil the child"। বেশভূষার পারিপাট্যে  আভিজাত্যের মেজাজ। ছাত্র-দরদী । তবে প্রয়োজনে তিনি বেশ কঠোরও।  অংকের শিক্ষক।
ঘরে ঢুকেই তাঁর প্রশ্ন `কে জোরে গাইছিলো ? speak out, my child ?`
 এরপর টেবিলের ওপর  তাঁর ঘনঘন আঘাত। জনৈক ছাত্র আর একজনের ওপর আঙ্গুল নির্দেশ করে মজার ছলে বললো - ওই যে স্যার প্রদীপ! ওই গাইছিলো !
ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো প্রদীপ। 
- তুই গাইছিলি ?
-আর গাইবো না, স্যার ।
- কি বলছিস তুই ? আলবাত গাইবি। এত সুন্দর কন্ঠস্বর! তোরা থাকিস কোথায় ? বাবার নাম কি ?

নিম্ন স্বরে বলতে থাকলেন। সব তিনি জেনে নিলেন। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলো এক মুহুর্তে। ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজলো। শিক্ষক মহাশয় ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। শেষ পিরিয়ড। তাই ছুটি হয়ে গেলো। ওই ঘটনার পর থেকে প্রদীপ যেন রাতারাতি হিরো হয়ে গেলো। সবাই তাকে বিশেষ সমীহ করে কথা বলতে শুরু করলো। প্রদীপ গরীব ঘরের সন্তান।  তাই সে যেন হীনমন্যতায় ভুগতো। অন্যান্য সঙ্গীদের সাথে মেলামেশা বা কথা বলতে অকারণে অস্বস্তি বোধ করতো।

সন্ধ্যাবেলায় প্রদীপের বাড়ি এসে হাজির অবিনাশবাবু।
-কি সৌভাগ্য! মাস্টর মশাই, আপনি! আসুন ভেতরে।  বলে প্রদীপের বাবা সমরেশ হাত কচলাতে লাগলেন কিছুটা যেন সংকুচিত হয়ে। শীর্ণ,একহারা ক্ষয়াটে চেহারা। চোখে মুখে ক্লান্তির  ছাপ স্পষ্ট।  কিন্তু মুখের হাসিটি অমলিন। 
`প্রদীপ নিশ্চয়ই দুষ্টুমী করেছে`, বলে বাবা তার দিকে রোষ কষায়িত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।
-আরে ! সেসব কিছুই নয়। ওতো বেশ ভালো গায়।
অবিনাশবাবু বলে ওঠেন।
-তা ঠিক বলেছেন। তবে প্রথাগত কোনও শিক্ষা নেই। গানের স্কুলে ভর্তি করার মত আর্থিক সামর্থ্যও নেই। 
-আপনি কি করেন? 
-একটা অনামী ওষুধ কোম্পানীর medical representative. আমরা খুবই গরীব। এই তো সামান্য চাকরী। সম্বল বলতে এই ভদ্রাসনটুকুই।
অবনীশবাবু লক্ষ্য করলেন যে খড়ের ছাউনি আর টিনের চাল দেওয়া এই একতলা ঘর। মেঝেটা অবশ্য পাকা। তবে এবড়ো খেবড়ো। পুরনো আমলের সংক্ষিপ্ত কিছু আসবাবপত্র। একটা হাতল ভাঙ্গা চেয়ারে বসলেন মাস্টার মশাই। তারপর হঠাৎ তিনি বললেন," দেখুন।,গরীব হওয়াটা অপরাধ নয়। আপনি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের বই পড়েছেন কখনও?``
-হ্যাঁ হ্যাঁ। বিলক্ষণ। 
তিনি বলেছিলেন," দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ।  দারিদ্র্য, ব্যর্থতা-বড় সম্পদ, মহান সম্পদ।  সুখে সম্পদে ভরা,শুধু যেখানে না চাইতে পাওয়া, পরিবারে প্রাচুর্য্যের , বিলাসের মেলা। ভয়ানক সে
জীবন। আমরা যেন সুখসম্পদ ভরা,ধন সম্পদভরা জীবনকে ভয় করতে শিখি। `` 


 

মতামত 


ডাক্তারদের আন্দোলন থেমে  গেছে,অভয়া বিচার পাবে না 

বটু কৃষ্ণ হালদার 

হাসপাতাল হল সাধারণ, নিরীহ, মধ্যবিত্ত জনসাধারণের কাছে ধর্মীয় স্থান। ডাক্তাররা হলেন সেই ধর্মীয় স্থানের পূজারী। জীবনের সহায় সম্বলহীন আশাটুকু বুকে জড়িয়ে নিয়ে হাসপাতাল নামক মন্দিরে উপস্থিত হন ভক্তরা। শুরু হয় দৈনন্দিন রোজনামচা। লাইন দিয়ে টিকিট কাটা, ইমার্জেন্সি রোগী ভর্তি করানো, স্ট্রেচার বারের  জন্য দৌড়াদৌড়ি, রক্তের জন্য হুড়োহুড়ি, ডাক্তারবাবু ডাক্তারবাবু বলে চিৎকার, কেউ চোখের জল মুছে যায় কেউবা আবার হাসাহাসি করে,- প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য গুলো ফুটে ওঠে হাসপাতাল চত্বরে। সবকিছু সমস্যা সমাধানের প্রধান ডাক্তার। ভক্তদের আহ্বানে পূজারীরা যথাসাধ্য মনস্কামনা পূরণ করার চেষ্টা করেন। তাই হাসপাতালে সঙ্গে জনসাধারণের সম্পর্ক একেবারে নাড়ির সঙ্গে গাঁথা। এই দুই সম্পর্কের বাঁধনটাকে আরও মজবুত করেন ডাক্তাররা। বলে রাখা ভালো হাসপাতাল হল প্রতিদিনের লাইফ লাইন। এই হাসপাতাল দিয়ে তৈরি হয় মানব প্রেমের পূজারীরা। অর্থাৎ জুনিয়র ডাক্তার। আগামী ভবিষ্যতের মানব প্রেমের প্রকৃত পূজারী। বহু পিতা মাতা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নিজেদের সন্তানকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখে। সন্তান ডাক্তারি পাস করে মানব সেবায় নিযুক্ত হবেন।অথচ ভগবান রুপী  ডাক্তাররা বর্তমান সমাজে কসাই নামে পরিচিত হয়েছে। তার প্রধান কারণ হলো আরজিকর হসপিটাল-এর ঘটনা ও কিছু মানুষরূপী জানোয়ারদের কারণে।হাসপাতালে প্র্যাকটিস চলাকালীন রাজনৈতিক মদত পুষ্ঠ উধ্যতন কর্মচারীদের খুশি করতে হয় লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে, শারীরিক চাহিদা মিটিয়ে। নইলে মাঝপথে ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন ভরাডুবি হয়ে যায়। আর প্রতিবাদ করলেই তিলোত্তমার মত নৃশংস ভাবে খুন হতে হয়।এটাই সমাজের বাস্তব চিত্র।

প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত,দেশে বিদেশে জনগণ রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য। শুধু নরপশুদের শাস্তি নয়, হাসপাতালে যে অন্ধকারময় দুর্নীতি হচ্ছে তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে।কিন্তু সরকার এখনো অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর।পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জনগণকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছেন প্রশাসন। শিক্ষাব্যবস্থা আজ দাঁড়িপাল্লায় ওজন হয় রাজনীতির রং দিয়ে। ডাক্তারি পড়ার যোগ্যতা নেই অথচ অনেকেই ডাক্তার হয়ে যায় শুধুমাত্র  রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে। আবার যে প্রকৃতপক্ষে প্রতিভাবান বা দক্ষ, অথচ আর্থিক ভাবে অক্ষম  সে থেকে যায় উপেক্ষিত। এটাই এখন শিক্ষার মূল আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এবার আসা যাক প্রসঙ্গ যখন ডাক্তার।এরা কিভাবে সমাজের উপকারী বন্ধু? হাসপাতালে যখন একটা রোগী আসে তখন কোন ডাক্তার রাজনীতির রং দেখেনা। ধর্ম, জাতপাতের ভেদাভেদ ভুলে শুধু রোগীকে সেবা দিয়ে সারিয়ে তোলা যাদের একমাত্র লক্ষ্য। একজন রোগী  হাসপাতালে সুস্থ হয়ে উঠলে, একটা সফল অস্ত্রপাচার হলে, একটা সুস্থ সবল নবজাতককে মায়ের কোলে হাসিমুখে ফিরিয়ে দিলে সবথেকে বেশি আনন্দিত হয় ডাক্তাররা। যারা ভগবানের আরেক রূপ, বর্ণময় চরিত্রের মহাউপাখ্যান। তেমনই  একজন ডাক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। অথচ এই বাংলায় অনেকেই আছে যারা সব থেকে বেশি সরকারি হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা নেন, তাদের বেশিরভাগ কিন্তু রাস্তায় নামেনি। তারা এখনো বুঝিয়ে দিচ্ছেন হাসপাতালের এই সিস্টেমটা চালু থাকলে তাদের কোন অসুবিধা নেই।

মেয়েটির মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের জমি মাপামাপি করলেন। সেই সঙ্গে অপরাধীদের পরোক্ষ  ভাবে সাহায্য করে গেল দিনের পর দিন। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলের কোন ভূমিকা নেই, তারা নিরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, আবার জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বহু জনগণ জনগণ রাস্তায় নামলেও শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনে সুপ্ত আগুনে ঘি ঢেলে দাবানল হয়ে ওঠার অপেক্ষা করছে হাসপাতালে ডাক্তাররা। এর কারণ হলো পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাই ডাক্তারদের আন্দোলন একমাত্র ভরসা অপরাধীদের সাজা দেওয়ার জন্য। প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে নিজে কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ সাধারণ জনগণ সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মিথ্যা গুজব রটাচ্ছেন,মানুষ খেকো, যুব সমাজের স্বপ্ন চূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করা মানুষেরা। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার সব ডাক্তার কিন্তু কিন্তু কসাই নয়। মানবিকতার খাতিরে হাসপাতালে জরুরী বিভাগ পরিষেবা চালু রেখেছেন, সেই সঙ্গে নিহত জুনিয়র চিকিৎসকের নামে বিভিন্ন জায়গায় অভয়া ক্লিনিক খুলে পরিসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও ডাক্তারদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা গুজব রটিয়ে  সাধারণ জনগণকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, ডাক্তারদের আন্দোলনের ফলে সারা রাজ্যে প্রচুর রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।

এর থেকে বড় মিথ্যা আর হয় না, মালদার এক সরকারি ডাক্তারের মতে,-সারা রাজ্যে সরকারী ও বেসরকারি, ছোট ও বড়ো মিলিয়ে প্রায় ৩০০০ হাসপাতাল। জুনিয়র ডাক্তার, হাউস স্টাফ, পিজিটি একমাত্র মেডিকেল কলেজগুলোতেই আছে। এখন প্রতি জেলায় একটি করে মেডিকেল  কলেজ, যাদের অনেকেরই প্রথম ব্যাচ বেরোয়নি, তাই intern তো অনেক দূরের কথা। পশ্চিমবঙ্গে  স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনুযায়ী PHC, BPHC, RH মিলে মোট ১২৫৭- টি,যেখানে কোনো জুনিয়র ডাক্তার  নেই, ফলে সারা রাজ্যে আন্দোলন হলে ও এখানে চিকিৎসায় ব্যাঘাত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পশ্চিমবঙ্গে তালিকায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনুযায়ী বাংলার জেনারেল ও সাব ডিভিশন হাসপাতাল মিলে মোট ৭০ টির মতো, যেখানে ও কোনো জুনিয়র ডাক্তার নেই, ফলে সারা রাজ্যে আন্দোলন হলে ও এখানেও চিকিৎসায় ব্যাঘাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, পশ্চিমবঙ্গ রেকর্ডে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারি হাসপাতাল যেমন রেলওয়ে ই এস আই মিলে মোট ৬০ টির মতো, যেখানে ও কোনো জুনিয়র ডাক্তার  নেই, ফলে সারা রাজ্যে আন্দোলন হলে ও এখানেও চিকিৎসায় ব্যাঘাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সারা রাজ্যে যে পৌরসভা ও কর্পোরেশন হাসপাতাল আছে তাদের ও কোনো জুনিয়র ডাক্তার নেই ফলে সারা রাজ্যে আন্দোলন হলে ও এখানেও চিকিৎসায় ব্যাঘাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, প্রাইভেট হাসপাতাল তো রয়েছেই, যেখানে এখন স্বাস্থ্যসাথী সুবিধা নিয়ে ও চিকিৎসা চলছে, তাও বন্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।   তাহলে, কটি হাসপাতাল রইল, যাদের পরিষেবা জুনিয়র ডাক্তারদের জন্য বিঘ্নিত হতে পারে সবমিলিয়ে ১৪ থেকে ১৬ টি হাসপাতাল, যা মোট হাসপাতালের 0.৫২%। সেখানেও একদিন নয়, এক ঘন্টার জন্য ও কোনো পরিষেবা বন্ধ হয়নি। গুজবে কান দেবেন না, সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবা আগের মতোই ২৪ ঘন্টা ৩৬৫ দিন আগের মতই  চালু আছে।

তবে ডাক্তারদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো অভয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের জমি পাকা করে নিতে ব্যস্ত। কারণ সব রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের গতি প্রকৃতি মূল কেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাত দখল,দিন দখল,ফুটপথ  দখল, রাস্তা দখল, প্রতিবাদী গান, কবিতা, পথনাটিকা মিটিং মিছিল হওয়ার পরেও আন্দোলন উদ্দেশ্য বিহীন হয়ে পড়ছে।
তাই অভয়ার বিচার পেতে হলে ভরসা কিন্তু ডাক্তারদের আন্দোলন। মেয়েটি হাসপাতালে দুর্নীতি নামক বিষাক্ত অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিল। হাসপাতাল দুর্নীতিমুক্ত হলে সাধারণ জনগণের সবথেকে বেশি পাবেন। অথচ মেয়েটি মারা যাওয়ার ফলে সবাই কিন্তু রাস্তায় নামেনি। তাই সবার প্রথমে ডাক্তারদের পরিষেবা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিনামূল্যে অভয়া ক্লিনিকে পরিষেবা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তবেই সব জনগণ রাস্তায় নামবে। আর সব জনগণ রাস্তা নামলে বিচার অতি দ্রুত হবে। নইলে ভবিষ্যতে এমন ভাবে ডাক্তার মারা যাবে আর সাধারণ জনগণ শুধু নিজেদের সুবিধাটুকু বুঝে নেবে এটা মেনে নিলেই আগামী ভবিষ্যতে ডাক্তারদের উপর চরম শাস্তির খাঁড়া নামতে পারে। ডাক্তারদের আন্দোলন পূর্ণ সমর্থনযোগ্য। তারা ও একটা পরিবারের মত। সেই পরিবারের একজনকে কর্তব্যরত অবস্থায় নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে,তাই সুবিচারের আশায় তারা পরিষেবা বন্ধ করতে পারে করতেই পারে, দিনের পর দিন রাস্তায় নেমে অনশন করতেই পারে। আর এমন জঘন্য অপরাধের সমাজের কখনো বন্ধু হতে পারে না। আরে কঠোর শাস্তি হলে সমাজ থেকে কিছু জঞ্জাল পরিষ্কার হবে।আর লড়াইটা হল শিক্ষিতদের সঙ্গে অশিক্ষিত মূর্খ ছুঁচো সভ্যতার সঙ্গে। সে বিষয়টা মাথায় রেখে সবাইকে ডাক্তারদের আন্দোলনকে চালিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করুন।

(মতামত ব্যক্তিগত)


 
কবিতা 

উলঙ্গ নামাবলী
অশোক কুমার ঠাকুর



আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো, তুমি উলঙ্গ
বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে দেখো তুমিই  বঙ্গ
মুখোশ খুলে দেখো তুমি নিতান্ত এক কঙ্কাল
যতই সুগন্ধী মাখো মুখে, বুকে স্তূপ জঞ্জাল।

নাচো গাও ফুর্তি করো অতঃপর দিন শেষে
অতলে ডুব দাও, কাঁদো, অচেতন আবেশে।
















ছবি- অশোক কুমার ঠাকুর


 

ক্রীড়নক

মাথুর দাস


মেরুদন্ড কবেই শিথিল, নমনীয়,

কমনীয় খেলাঘর ঘিলুর ঘোলায় ;

ধূসর বস্তুটি আজ সফেদ রমণীয়

বন্ধক রেখেছি তা রিপুর ঝোলায় ।


হয়ে গেলে কোনক্রমে মগজ ধোলাই

তুমি ক্রীড়নক, কারো হাতের পুতুল ;

অঙ্গুলিহেলনে থামে যে বোল-বোলাই,

তোমাকে নিমিত্ত রেখে ফায়দা উসুল ।


জীবন জীবিকা বা ক্ষুধা নিবারণে

এখন এমনই চালু সে রেয়ার্ আর্ট,

ইচ্ছেতে বদল হয় কারণ অকারণে

ধোলাই মগজের যে স্পেয়ার্ পার্ট ।



 

আকাশ অন্ধকার করে

সজলকুমার টিকাদার



আকাশ অন্ধকার করে ভারী বৃষ্টি আসে;
তার ভিতরে থাকে আবার, দস্যু হাওয়া!

এপাড়ায় রয়েছে আমার দুর্বল বাড়িঘর।
যার একদিকে ছোট্ট ফুলের বাগান
কয়েকটি প্রিয় পোষ্য...
তারা সব আ-মূল কাঁপে। এবং
গা-বেয়ে, ভিজে কান্নার মতো
জল-স্রোত গড়িয়ে নামে

আমি ওদের সবাইকে, স্নেহে 
জাপটে ধরে বলি,

'ভয় কী, আমি তো আছি!'


 

ভিলানেল্‌ : স্মৃতিমুকুর

লিপিকর 

তাদের যৌনটানকে এড়াতে কখনো থেকেছি মৌন সলাজ

আবছা সেসব মানুষের ঝাপসা সেসব আনন

অতীতচারণী সময়সারণী রচেছে তাদের কোলাজ্‌।

 

অষ্টাদশী ভাগীরথী, সহকর্মিণী রামধনু, বিভুঁইয়ের শেহ্‌নাজ্‌

মিলেমিশে একাকার, একদা অনন্যারা নিছকই আজ অ্যানন্‌

তাদের যৌনটানকে এড়াতে কখনো থেকেছি মৌন সলাজ

 

কল্পগল্পের হূরীপ্রায়, তাদের ছিল এক পৃথক এক সমাজ

আমার তরে আত্মগ্লানিতে রুদ্ধদ্বার বিচরণের সে মনন

অতীতচারণী সময়সারণী রচেছে তাদের কোলাজ্‌।

 

কজনকেই বা চিনবো দেখে যদি ফেলি কাল-আজ

কারেও কি পুনর্বার করবো প্রাত্যহিকে আবাহন?

তাদের যৌনটানকে এড়াতে কখনো থেকেছি মৌন সলাজ

 

সামান্যা যারা কনক-কাঙ্ক্ষায় সয়েছে মার-গালাজ

বিনোদন-বিপণনে বিশ্রুত তাদের হব না বিস্মরণ

অতীতচারণী সময়সারণী রচেছে তাদের কোলাজ্‌।

 

গিয়ে সব স্নেহ, আছে শুধু দেহ, এসেছে একাল এমন

ত্যজিয়া কুসুম, বেছেছি ক্ষুধানাশী আউশ-আমন

যাদের যৌনটানকে এড়াতে কখনো থেকেছি মৌন সলাজ

অতীতচারণী সময়সারণী আজকে রচেছে তাদের কোলাজ্‌।


 

অরণ্যের  ডাক

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 


উত্তপ্ত শরতের সোনা রোদ্দুর, 
মুচকি হাসে রুপালি চাঁদ। 
সাদা মেঘের সারিতে অনিয়ন্ত্রিত শব্দ রাশি,

এলোমেলো চিন্তারা জমাট বাঁধে না..
হিমশৈল্য গলে যায় চটুল চিৎকারে,
নদীরা দিচ্ছে হাঁক বানভাসি হয়ে..
ফিরে আসুক সেই অরণ্যের ডাক।।


 

পোশাকের পরিচয় 
কেতকী বসু 

রূপের কথা বলতে গেলেই অরূপের কথা মনে পড়ে
পোশাকের ওপর লেগে থাকা দাগ দেখে তার গভীরতা মাপা হয়নি কখনও 
সুন্দর চোখের দুফোঁটা কাজল দেখে 
খুচরো টাকায় কিনতে পারি নি সময় 
তাই ফেলে রাখা পোশাকে পুরানো গন্ধ খুঁজি রোজ
আর ভাবি যত্নের থেকে অযত্নের গুণ অনেক বেশি।

ঘষে মেজে নতুন করতে যে সময় চলে যায় 
তাতে অবাঞ্ছিত দাগের সংখ্যা থেকে যায়
তাই সেই সব  দাগ পড়ার আগেই যত্ন করি পোশাকের
আমিও আজ বিচ্ছিন্নতার দাবি নিয়ে খুঁজে চলি অরূপের বাস্তবতাকে
পরিষ্কার প্রচ্ছন্ন  পোশাক তুলে রাখি আলমারিতে
কোনো এক আগন্তুক সময় এলে হিসেব করব রূপ আর অরূপের পার্থক্য
ততদিন পর্যন্ত আগলে রাখি আমার সমস্ত অপরিষ্কার পোশাক
আর রোজ একবার করে গন্ধ নিই পুরানো সেই পোশাকের।


 

আপন আলো

রীনা মজুমদার 


হেমন্তিকার আঁচলে নিখাদ আলো
জ্বালবে আলো, গভীর আলো।

গাছের পাতায় পাতায় সবুজ আলো 
গাছ লাগাও, বাঁচবে প্রাণের আলো।

আকাশে সূর্য তারা, ধ্রুবতারা, উজাড় করা আলো
ভেঙে দাও সীমানা, আসবে মুক্ত আলো।

মানুষের মাঝে সুপ্ত আলো, হিংসার আলো
গুড়িয়ে দাও লালসা ভেদাভেদ, ভরবে মনুষ্যত্বের আলো।

হারিয়ে যায়নি আলোর তেজ
অন্তরের একটিই দীপশিখা, করতে পারে 
   পৃথিবীকে আলোকিত..

দাও দ্বার খুলে, পণ করি আঁখি তুলে 
" দীপালিকায় জ্বালাও আলো, আপন আলো.."