Friday, September 4, 2026


 

বোধন
দেবযানী চক্রবর্ত্তী 

টি, ট্যুরিসম আর টিম্বার অর্থাৎ  3T-এর ঠিকানা উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স। আর হাট --- হ্যাঁ হাট হল ডুয়ার্সবাসীর জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ডুয়ার্সবাসী হয়ে আমার জীবনেও হাটের ভূমিকা অপরিসীম।  সেই ছোট্টবেলা থেকে বাবার হাত ধরে আমি হাটে যেতাম।  তখন থেকেই বিকিকিনির সূত্রে আমার হাতেখড়ি।  
জাতীয় সড়কের একধারে আমাদের বাড়ি মানে আমার বাবার বাড়ি আর বাড়ির গেট খুলে হাইওয়ে পেরোলেই সেই হাট।  খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল মাথার উপর টানিয়ে মুক্ত এক বিশালাকার আঙিনায় চেনা অচেনা মানুষের ভিড়ে বেচাকেনার এক চলমান জীবন প্রবাহ। আর আমি বাবার বাড়ি আসবো অথচ রবিবারের হাটে যাব না, এ তো হতেই পারে না। সপ্তাহের ওই রবিবার দিনই কাছে পিঠের চা বাগান, ছোট বড় গ্রাম, বনবস্তীগুলি থেকে অধিবাসীরা বাজার করতে আসতো বা এখনো আসে এই হাটে। সারা সপ্তাহের জীবনধারণের রসদ নিয়ে যায় ক্রেতারা। কি পাওয়া যায় না এই হাটে ! শাকসবজি, ফলমূল, ধান, চাল, চিরে মুড়ি , পুজোর সাদা কমলা বাতাসা, কদমা, মুদি দোকানের সমস্ত সামগ্রী, মাছ, মাংস, ডিম, গরু ,ছাগল ,ভেড়া , বাসন-কোসন, মেয়েদের চুরি,  প্রসাধন সামগ্রী, কাপড় জামা সব সব পাওয়া যায় এই হাটে। দীর্ঘদিন পর এবার বাড়িতে এসে এই হাটেই আমি বোনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শাকসবজি কিনতে। অনেক পুরনো মানুষের সাথে দেখা হল।  সবজি কিনতে কিনতে হঠাৎ করে পেছনে আঁচলে টান পরাতে মুখ ঘুরিয়ে দেখি এক সৌম্য দর্শনা বয়স্ক মহিলা।

তার সঙ্গে দুটো বাচ্চা। মহিলার মুখে মৃদু হাসি আর চোখে আবিষ্কারের আনন্দের ঝিলিক। আমি দিলাম ঝাঁপ -- স্মৃতির অতলান্ত গভীরে। আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছি, মনে করেও যেন মনে করতে পারছি না।  মহিলা বলে উঠলো, "কিরে মিলু চিনতে পারলি না? আমি বুধনী দিদি, এই দেখ আমার দুই নাতি " l এবার যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল আমার মস্তিষ্ক জুড়ে l স্মৃতি আমার হাত ধরে নিয়ে চলে গেল সেই বালিকা বেলায় ...... l একে একে ঘটনার স্রোত যেন উজানে বইতে শুরু করল। 

উঠোনে চিৎকার চেঁচামেচি চলছে চার ভাই বোনের মধ্যে মঙ্গল, কোরিও, পাউরুটি আর বিলি।  মঙ্গলবার জন্ম বলে ভাইটার নাম মঙ্গল আর পাউরুটি খেতে খুব ভালোবাসতো বলে তিন নম্বর বোনটার নাম পাউরুটি।  ওরা আসলে পাঁচ ভাই বোন, বুধনী ওদের সবার বড় দিদি যে চা বাগানের হসপিটালে কাজ করে l ওদের মা ফুলমণি মাসি l ওরা চার ভাই বোন চা আর রুটি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল l মা ওদের প্রত্যেককে জলখাবার দিতেন চা , গুড় অথবা তরকারি আর রুটি l ভোর ছটায় এই সাঁওতাল পরিবারটি আমাদের বাড়িতে চলে আসত।  ফুলমণি মাসি র সময়lনুবর্তিতা , আনুগত্য , পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান ছিল প্রশ্নাতীত। আমার মা স্কুলে চাকরি করতেন, তাই ফুল মণি মাসি সকালে এসে বাসন মাজা , কাপড় কাঁচা ,ঘর মোছা ,উঠুন ঝাড় দেওয়া, গরুর গোয়াল পরিষ্কার করে তারপর চা রুটি খেয়ে চলে যেত চা বাগানে l ওখানে মাসি চাগাছ থেকে পাতা তোলার কাজ করত l বুধনি দিদি বিকেলের দিকে আসত আমাদের বাড়ি l আমার মা ওকে আদর করে বোধন বলে ডাকতেন l মা ওকে খুব স্নেহ করতেন , আমি তা পরিষ্কার বুঝতে পারতাম l খুব ধীর , স্থির , মৃদুভাষী ১৮-১৯ বছরের এই কৃষ্ণাঙ্গী মেয়েটির ঠোঁটে সব সময় মিষ্টি হাসি লেগেই থাকত l আমার থেকে ছয়- সাত বছরের বড় ছিল ও l প্রায় ৫ ফিট পাঁচ / ছয় ইঞ্চির বেতের মতো সুঠাম সুদেহী বুধনি দিদি কোমরে আঁট করে শাড়ি পরত , ওর পরনের হাট থেকে কেনা সস্তার সুতির  ছাপা শাড়ি গুলি ছিল কোনটা লাল কোনটা নীল আবার কখনো হলুদ ফুল কাটা l পিঠের উপর ঢেউ খেলানো আজানু কেশ কখনো হাত খোঁপা হয়ে ঘাড়ের কাছে আলতো করে ঝুলে থাকতো আবার নয়তো লম্বা বিনুনি হয়ে সাপের মতো পিঠে যেন ফনা তুলে ঝুলতো। এই অষ্টাদশীর মুখমণ্ডল ---- সে যেন হাজার নক্ষত্রের আলোয় উজ্জ্বল জোৎস্নার আকাশ l যেন চাঁদ হেরিছে চাঁদ মুখ তার সরসীর আর্শিতে l ভগবান তার অবসর সময়ে অনেক যত্ন নিয়ে বানিয়েছেন এই কৃষ্ণকলি কে l নিটোল নাক , ধনুক ভ্রু , স্বপ্ন ভরা মায়াবী কালো ভ্রমর চোখ , পাতলা লাল গোলাপি ঠোঁট , কোঁকড়া চূর্ণ কুন্তলে ঢাকা কপাল , চিকন চিবুক এর মেয়েটি যেন আদিম অরণ্য কন্যার প্রতি মূর্তি ! রুপোর নকশা কাটা নেভরি পরা পায়ে ও যখন আমাদের ঘরে , উঠোনে ধীর কিন্তু দৃপ্ত পদক্ষেপে কাজ করে বেড়াতো ওকে দেখতে তখন আমার ভারি ভালো লাগতো l এ যেন ছিল এক উদ্ভিন্নযৌবনা বনদেবীর প্রতি এক কিশোরী বালিকার নিবিড় নিরীক্ষণ পর্ব l 

বিকেলে মা স্কুল থেকে ফিরলে ওর কাজ ছিল মাকে চা আর টিফিন তৈরি করে দেওয়া l বিকালের ঘরের টুকিটাকি কাজ বোধন-ই করে দিত। আমার স্কুলের বই এর বাক্স খুলে টেবিলে বইগুলো খুব যত্ন নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতো ও l কখনো কখনো দেখতাম আমার বাংলা , ইংরেজি বই খুলে ছবিগুলি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে l আমি মাঝে মাঝে ওকে বইয়ের গল্পগুলি শোনাতাম , কবিতা আবৃত্তি করতাম l খুব মন দিয়ে চুপ করে ও শুনত l কতটা বুঝতো সে পরের কথা কিন্তু আমি এমন অনুগত মনোযোগী ছাত্রী পেয়ে যারপরনাই আনন্দে আহ্লাদিতবোধ করতাম l বোধন ঠিক ততটাই আন্তরিকভাবে আমার সঙ্গে ডাক্তার -- রোগী খেলা খেলতো l আমি প্লাস্টিকের খেলনা স্টেথোস্কোপ দিয়ে ওকে রুগী বানিয়ে পরীক্ষা করতাম l ওর নাক চোখ কান গলার টেস্ট করতাম l এই অবুঝ নাছোড় বালিকার অত্যাচার ও মুখ বুজে সহ্য করত l এখন বুঝি ও মননে , চিন্তনে ওর পারিবারিক , সামাজিক পরিবেশ থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিল l আমার এই পড়া -- পড়া , ডাক্তার -- রোগী খেলা ও খুব উপভোগ করতো l কে জানে , ওর মনের তালা বন্ধ চোর কুঠুরিতে হয়তো উন্নত জীবনযাপনের সুপ্ত ইচ্ছা ঘুমিয়ে ছিল ! 

মাঝে বছর দুই কাটল l একদিন বিকেলে ফুলমণি মাসি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে এসে বসে পড়ল l এত কান্না যে ঠিক মত কথাই বলতে পারছে না | ফুলমণি মাসির সঙ্গে আমার মা ওদের সাদ্রী ভাষাতেই কথা বলতেন l দাদু চাকরি করতেন ডুয়ার্সের এক চা বাগানে l সেখানেই মা , মাসি , মামাদের জন্ম , পড়াশোনা , বড় হওয়া l কাজেই আমার মা আর মামা মাসিরা সাদ্রী ভাষায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারতেন l আমিও অল্প স্বল্প শিখে ফেলেছিলাম বোধন , পাউরুটি , বিলিদের সঙ্গে কথা বলে বলে l মা আর ফুলমণি মাসির কথায় যেটুকু আমি উদ্ধার করতে পেরেছিলাম তাতে বুঝলাম বোধনের কোন এক ছেলের সঙ্গে পূর্বরাগ পর্ব চলছে l এবং সে ফুলমণির মাসির জাতিভুক্ত নয় l ব্যাস , এখানেই যত গন্ডগোল l

 ফুলমণি মাসি মায়ের প্রায় পায়ে পড়ে বলছিল , ওদের পরিবারটাকে বাঁচাতে l ও আতঙ্কে ভুগছিল যে বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারটাই হয়তো শেষ হয়ে যাবে l বিলির জন্মের পরে ওদের বাবা অসুখে মারা যায় l অনেক কষ্ট করে , অনেক পরিশ্রম করে ফুলমণি মাসি এই পাঁচ ছেলে মেয়েকে মানুষ করেছে l মাসির মা এই চা বাগানে কাজ করত l পরবর্তীতে মাসিকে কাজটা দেওয়া হয় , সাথে বোধন ও কাজ পেয়ে যায় হাসপাতালে l কিন্তু বোধনের এমন আচরণে মাসি ইতিমধ্যে রীতিমতো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিল l মা আর ফুলমাসির এই কথোপকথন চলাকালীনই মায়ের নজর পরে আমার দিকে l আমি ওদের কথা মন দিয়ে শুনছি দেখতে পেয়ে মা এবার আমাকে ওখান থেকে বকা দিয়ে সরিয়ে দিলেন ফলে আমার আর জানা হলো না বোধনের ভালোলাগা বা ভালোবাসার মনের মানুষটি কে ?
এরপর আমিও মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম l একে একে মাধ্যমিক পরীক্ষা , উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা , কলেজে , ইউনিভার্সিটি পড়ার ক্রসবারগুলি পার হতে হতে আমার মনের পরিসরের ব্যাপ্তি ঘটছিল | ফলে বোধনেরা আমার মস্তিষ্ক থেকে প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল l

চাকরি , সংসারের চাপে বাবার বাড়িতে ঘন ঘন আর আসতে পারতাম না l শেষে বাবা মা চলে যেতেন নাতনির টানে আমাদের ওখানে lএবার বাবা-মার কাছে এসে উপরি পাওনা হিসেবে পেলাম বুধনি দিদি ওরফে বোধন কে l মজার ব্যাপার হল , এই চিরপুরাতন চিরনূতন হাট আজ আমার বালিকাবেলার অসমবয়সী সাথীটিকে ফিরিয়ে দিল | ওকে জিজ্ঞেস করাতে রাঙ্গামুখে উত্তর দিল , সেদিনের সেই প্রেমিক ই ওর স্বামী l পরবর্তীতে ফুলমণিমাসী ওদের প্রেমের কাছে হার মেনেছিল | ছেলেটি চা বাগানের প্রাইমারি স্কুলের টিচার l এই বিয়ে বোধন আর ওর পরিবারের জন্য যেন আশীর্বাদ স্বরূপ ছিল।  ওরা এক উন্নততর জীবন যাপন করা শুরু করলো | কোরীয় , বিলি , পাউরুটি প্রত্যেককে স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিল।  পড়াশোনা শেষ করে মঙ্গল চা বাগানে অফিসের সাব স্টাফ-এর চাকরি পেয়ে যায় l বাকি তিন বোনও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ওই চা বাগানে কাজ শুরু করে l একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বুধনি দিদি কে ঠিক চিনতে পেরেছিলেন , তার ভেতরকার সুপ্ত আলো ও চেতনা র জাগরন ঘটিয়ে সমস্ত পরিবারকে এক সমৃদ্ধ জীবন উপহার দিতে পেরেছিলেন  . আমার মনেহয় বুধনিদিদির নাম মা যে বোধন রেখেছিলেন তা যথার্থভাবেই সার্থকতা লাভ করেছিল। 

No comments:

Post a Comment