"ওগো প্রিয় মোর, খোলো বাহুডোর"....
আজ নিয়ে ছ'দিন এলো মেয়েটি
তার চেম্বারে। প্রায় সেরেই গেছে
দেখলো আজ। প্রয়োজনীয় ঔষধ লিখে দিয়ে, প্রায়ই ওর সাথে একটু করে গল্প করে কল্লোল। মানুষের ভেতরে ঢোকার এই শিক্ষাটা তাকে ছোট থেকেই দিয়েছিলেন তার বাবা। কল্লোল বসু, ত্বক চিকিৎসক। বয়স বছর চল্লিশ,অকৃতদার। পসার ভালোই তার। সকালের দিকে ভীড় একেবারে উপচে পড়ে। তিনজন অ্যাসিস্টেন্টও তখন ভীড় সামলাতে হিমসিম খায়।বিকেলটা তুলণমূলক হালকা রাখে সে। বিকেলের দিকে ইউ-টিউবে গান শোনে, চেম্বারে মিউজিক সিস্টেম রাখা আছে, তাতেও গান শোনে...... গান শোনা কল্লোলের তীব্র প্যাশান। সুর-মূর্ছ্রনায় বুঁদ হয়ে
থাকে সে। আজ বিকেলে লেখানো নাম একটু কম ছিলো।
তাই বেশ হালকা লাগছিলো। মিউজিক সিস্টেমে বাজছিলো, "একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ..... "। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে
ঢুকেছিলো মেয়েটি। শ্যামশ্রী হাজরা, বয়স ত্রিশোর্ধ। রংটা বেজায় কালো,অনেকটা আফ্রিকান মেয়েদের মতো। কিন্তু নাক-চোখ খারাপ নয়। মেয়েটার প্রতি প্রথম দিন থেকেই একটা মৃদু আকর্ষণ অনুভব করে কল্লোল। নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে শ্যামশ্রী, চার বোনের সবচেয়ে ছোট। ফলে যা হয়, বড়ই হেলায় ফেলায় মানুষ সে। তার দিদিরা নাকি উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, তাই অল্প কিছু দিয়ে থুয়ে পার করা গেছে ওদের। কিন্তু শ্যামশ্রীকে আর পার করা যাচ্ছে না। বাবা মায়ের বড়ই বোঝা সে। তাই ত্বকের ওই বিশেষ রোগটির সাথে সাথে কঠিন এক হীনমন্যতার স্বীকার হয়ে তার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছিলো শ্যামশ্রী। দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকার সুবাদে কল্লোল খুব ভালো করে জানে ত্বক নিয়ে শ্যামশ্রীদের মানসিক অবসাদের পেছনে রয়েছে "সোশ্যাল ট্যাবু"। বিয়ের জন্য ফর্সা ত্বকের পাত্রীর বিজ্ঞাপন কিংবা সুন্দরের সংজ্ঞার সঙ্গে ফর্সা ত্বককে জড়িয়ে দেওয়ার জন্য কত যে শ্যামশ্রীরা এমন মানসিক অবসাদে ভোগে তা জানে কল্লোল। যাইহোক, পঁচিশতম পাত্রপক্ষের দ্বারা রিজেক্টেড্ হয়ে ফর্সা হবার মরিয়া চেষ্টায় ত্বকের ওই রোগটি বাঁধিয়েছিলো শ্যামশ্রী। ফর্সা হওয়ার ক্রিমে ব্যবহৃত অ্যাকটিভ কার্বণ কিংবা মাইক্রো
কার্বণের মধ্যে "ন্যানো কার্বণ" থাকে। এই ন্যানো কার্বণ আলো-
হাওয়ার সংস্পর্শে "অ্যাকটিভ অক্সিজেন"এ রূপান্তরিত হয়, যা
চামড়ার পক্ষে ক্ষতিকর, কারণ
এই রাসায়নিক উপাদান কোষ মেরে ফেলে। অ্যাকটিভ অক্সিজেনের প্রতিক্রিয়ায় শ্যামশ্রীর মুখের চামড়ায় ক্যান্সার দেখা দিয়েছিলো, সদ্যই শুরু হয়েছিলো। একদম প্রথমেই দেখাতে আসায় কল্লোল তার মুখের চামড়াটা বাঁচাতে পেরেছিলো। কিন্তু মনের চামড়ায় ধরেছিলো গভীর ক্যান্সার। ফলে
ত্বকের চিকিৎসার সাথে সাথে
সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং
-ও করতে হয়েছিলো শ্যামশ্রীর।
........শ্যামশ্রী যখন হন্তদন্ত ঢোকে সুরে সুরে ভরেছিলো চেম্বারটা, চোখ বুজে ছিলো কল্লোল। "আমাকে একটা কাজ জোগাড় করে দেবেন, ডাক্তারবাবু? আপনার
ডাক্তার বন্ধুদের তো কত চেম্বার, কত পলি-ক্লিনিক। আমাকে যদি
কেউ অ্যাসিস্টেন্ট রাখেন", বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে শ্যামশ্রীকে। উত্তরে কল্লোল বলে," আরে আগে বসুন তো। আবার কি হোলো? নতুন কিছু ঘটেছে নাকি আবার?" ভীষণ উত্তেজিত স্বরে
শ্যামশ্রী যা যা বললো তা হলো এই....... কোনো এক পাত্রপক্ষ তাকে পছন্দ করেছে....বুকের বাঁ দিকটায় একটু ধাক্কা খায় কল্লোল.... পাত্র একটু বয়স্ক, কাপড়ের ব্যবসা। অবস্হা
মন্দ নয়। সমস্যাটা হচ্ছে যে, সে রীতিমত দরাদরি করে নগদ চার লক্ষ টাকায় শ্যামশ্রীকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। শ্যামশ্রীর
বাবা এই পাত্র হাতছাড়া করতে
রাজি নন, তাই বসত বাড়ি বিক্রি করেও মেয়েকে পার করবার
পরিকল্পনা নিচ্ছেন। বাবা মাকে ছাদহীন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চায় না কালো মেয়ে শ্যামশ্রী। তাই সে গত্যন্তর না দেখে ডাক্তারবাবুর কাছেই ছুটে এসেছে.......
তারপরের দু-তিন বছর বছর কল্লোল হয়ে উঠলো 'খিদ্দা' আর শ্যামশ্রী হয়ে উঠলো 'কোণি'। কল্লোলেরও কেমন যেন একটা জেদ চেপে গেলো অদৃশ্য "সোশ্যাল ট্যাবু"টাকে ভেঙ্গে ফেলতে। কল্লোলের এক বন্ধুর পলি-ক্লিনিকে কাজ জুটে গেলো শ্যামশ্রীর। কল্লোলের পরামর্শেই সে "ওয়েষ্ট বেঙ্গল হেলথ্ ইউনিভার্সিটি" র অ্যফিলিয়েটেড্ "সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলিং" কোর্সে ভর্তি হলো। কোর্স শেষে শ্যামশ্রী চাকরি পেলো নামকরা বেসরকারি হসপিটালে.....প্রাণ ঢেলে কাজ করতে লাগলো। স্কুল ছাত্রছাত্রী থেকে বয়স্ক লোক, অপরাধপ্রবণ যুবক-যুবতী থেকে নেশাড়ু সবারই কাউন্সেলিং সে খুব দক্ষতার সাথে করতে লাগলো। মানুষের সংকটে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে শ্যামশ্রী পার্থিব তুচ্ছতার বাইরে বাঁচার ভিন্নতর এক মানে খুঁজে
পেলো। বাড়ির পরিবেশও গেলো পাল্টে । কেউ তাকে আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। শুধু বিয়ের কথায় তীব্রভাবে আপত্তি জানায় সে। ওদিকে ডঃ কল্লোল বসুর মনটা একটু যেন উদাস উদাস..... কিসের যেন একটা অভাবে বুকটা খালি খালি.......। শ্যামশ্রী নিয়ম করে প্রতি রোববার তার সাথে দেখা করতে আসে। কল্লোল আর শ্যামশ্রীর মধ্যে গড়ে ওঠে ভিন্নতর এক মানবিক সম্পর্ক......প্রেমের যেসব ছক বাঁধা আছে তার বাইরের সূ্ক্ষ্মতর এক মানবিক বোধ....যেন হঠাৎ পাওয়া এক সবুজ দ্বীপ। তেমনই এক বোরবারের পড়ন্ত বিকেলে শ্যামশ্রীর চোখে চোখ রেখে কল্লোল বলে, "তোমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে চাই, চিরদিনের জন্য। তোমাকে বিয়ে করতে চাই। যদি তুমি রাজি থাকো।" তৎক্ষণাত আগুন জ্বলে ওঠে শ্যামশ্রীর চোখের তারায়,"আমাকে বিয়ে? কেন? কি কারণে? ও, কালো মেয়েকে করুণা?" আহত স্বরে কল্লোল বলে, " যদি বলি ভালোবাসা
........।"এক মু্হূর্ত দাঁড়ায় না শ্যামশ্রী,কোন জবাব না দিয়ে চলে যায়.......অপলক তাকিয়ে তার চলে যাওয়া দেখে কল্লোল।
তা-র-প-র, এক মাস বাদে একদিন শ্যামশ্রীর কর্মস্হলে
গিয়ে কল্লোল জানতে পারে "ওড়িশা ইউথ ডেভেলপমেন্ট"
নামে একটি এন.জি.ও তে চাকরি নিয়ে ওড়িশার পার্বত্য জেলা কোরাপুটে চলে গেছে শ্যামশ্রী, দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিদের নিয়ে কাজ করতে। আর কল্লোলের জন্য রেখে গেছে একটি খাম। তড়িঘড়ি সেটা খুলে কল্লোল দেখে, তাতে একটি চিরকুটে লেখা দুটি লাইন,
"ওগো প্রিয় মোর, খোলো বাহুডোর /পৃথিবী আমারে যে চায়।"
একটি সুন্দর বিকেলের অপমৃত্যু
১
-আপনি অমন করে কাঁদছেন কেন
?
-আপনি !
-আমি এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম । নদীর তীরে দেখলাম , আপনাকে । এমন ভাবে কাঁদছেন , মনে
হচ্ছে নিকট আত্মীয়ের শোক বুঝি ! আমার মন দুমরে উঠল । আমি খুব দুঃখ বোধ করছি
। আপনার কান্না - আকাশ , সমান্তরাল বনভূমি , নদীর জলকে যতটাই প্রভাবিত করেছে
,ঠিক তেমনই আমার মনকেও এই দুঃখের স্রোত ক্লান্ত করেছে দিয়েছে । আমি দু’দিন
ধরে দেখছি এই সময় , যখন আকাশের মাঝখানে সূর্য স্থির হয়ে যায় , দিনের মধ্যভাগ
ছাড়িয়ে দুপুরের দিকে এগিয়ে চলে , তখনই
আপনি নদীর পাড়ে এই কদম গাছের তলায় বসে –বসে চোখের জল ফেলেন ! আপনার কান্না দেখে
আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছে । আমি আগন্তুক ,
তাই এই দুঃখের কারণ জিজ্ঞেস করবার অধিকার নেই ।
আপনার বলতে অসুবিধা হলে , আমি জোর করব না। আমি এতটুকু বলতে পারি , আমার কোন
অসৎ উদ্দেশ্য নেই । আপনি বিশ্বাস করতে পারেন ।
বছর কুড়ির যুবতি নদীর পাড়ে বসে আছে , কান্না থামিয়ে , রঙিন চুড়িতে ঢাকা হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছল । চুড়ির শব্দ
কানে আসছিল , আগন্তুক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ।
-আমি আর্যভূমির দক্ষিণ দিক থেকে আসছি । দাক্ষিণাত্যের নাম
শুনেছেন ?
মেয়েটি , অপরিচিত যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল
-আপনার পোশাক দেখে আর স্বর্ণ অলংকারের প্রাচুর্য দেখে মনে
হচ্ছে , আপনি রাজ পুরুষ হবেন । পিতার মুখে অবশ্য দাক্ষিণাত্যের নাম শুনেছি । বাবা
দু’বার ব্যবসার জন্যই গিয়েছিলেন। শুনেছি ,
সেই সব স্থানে এখনো রাক্ষস জাতির আধিপত্য !তারা নাকি ভীষণ রাগি আর অনাচারে লিপ্ত ?
-আপনি রাক্ষসকে ভয় পান ?
-কে না পায় ? আমাদের সকলের জীবনেই রাক্ষস থাকে ।
-দেখুন আমাকে ভালো করে ...
যুবতি দেখল । এতক্ষণ খেয়াল করেনি । এইবার ভালো করে লক্ষ্য করল । যে যুবকটি দাঁড়িয়ে আছে , তার বয়স
খুব বেশি হবে না। চকচকে কালো রঙের কাপড় নিম্মাঙ্গে পড়েছে । কোমরের উপরিভাগে কালো রঙের পোশাক । মাথায় সোনার মুকুট । যুবকটির
গায়ের রঙ মোষের মতন কালো , ঠোঁট ঢেকে দিয়েছে মোটা গোঁফে ; চোখ দুটো
লাল হয়ে আছে । ঘাড় ছাড়িয়ে কালো চুলের স্রোত নেমেছে ।
এই নদীর পাড়ে , দুপুরে সে একা বসে কাঁদছিল । মেয়েটি মনে –মনে ভাবল – এক বিপদের হাত থেকে বাঁচতে ,
আরেক বিপদ ডাকলাম ! সে ঠাকুমার মুখে রাক্ষসের যে গল্প শুনেছে , তার সাথে এই
চেহারার মিল আছে । মানে এই লোকটি নির্ঘাত দৈত্য !
তার মানে এক্ষুনি মুখ হাঁ করে খেয়ে ফেলবে ! মনে – মনে বলল - আমাকে ব্যাটা বেশ খেয়াল করেছে
, দু’ দিন ধরে। আজ একা পেয়ে খেয়ে
নেবে !
-কিছু ভাবছ ! আমি
তোমায় কিছুক্ষণ বাদেই গিলে খাব !
এই কথা বলে যুবকটি হাসতে শুরু করল । তার হাসি না অট্টহাসি ,
মেয়েটি বুঝতে পাচ্ছে না। সে কান্না শুরু করল । কান্না ভাঙা গলায় বলল
- তারমানে আপনি
রাক্ষস ? এখন আমাকে গিলে খাবেন ! একদিক
থেকে ভালোই এমনিতেই আমার জীবন এই মুহূর্তে
লাঞ্ছনায় ভরে উঠেছে । নিজের পরিবারের মুখে চুনকালি দিয়েছি । আমি এই নদীর জলেই ডুবে
মরতাম । আজ না হয় আপনি হত্যা করবেন । বেঁচে থেকে সবাইকে কষ্ট দেওয়ার থেকে মারা
যাওয়া ভালোই । আমি মরলে আমার পরিবার অন্তত প্রতিদিনের অপমানের হাত থেকে বাঁচবে ...
যুবকটি এই কথা শুনে হাসি
থামিয়ে দিল । যুবতিটির মাথায় হাত
বুলিয়ে বলল
-কেন বোন ? ছিঃ এই সব কথা বলতে নেই । আমি রাক্ষস জাতিভুক্ত এই কথা ঠিক । তাই বলে সব রাক্ষসই
নরমাংস খায় , এমন কথা তোমাদের এইদিকে প্রচার থাকলেও , সত্যতা নেই ।
যুবতির জলে ভরে থাকা চোখে , বিস্ময়ের ছায়া ! বলল
-আপনি আমায় বোন বলে
ডাকলেন !
-হুম ! আমায় বিশ্বাস করতে পারেন ।
মেয়েটি মনে –মনে বলল – সত্যিই এত মিষ্টি কথা বলছে ! মানে
লোকটার কোন মতলব আছে।
যুবকটি হাসতে –হাসতে বলল – আরে বাবাঃ এত ভয়ের কিছু নেই ।
আমি একজন ব্যবসাদার । আমার পিতার দাক্ষিণাত্যে গৃহপালিত পশুর ব্যবসা আছে । সেই
কারণেই এই এতদূর এসেছি । দেখুন বনের ওই পারে আমার তাঁবু আছে । ওইখানে সৈন্য সামন্ত
নিয়ে আমি আছি । সাথে আমার দাস-দাসী আছে । আমার এক প্রিয় দাসী প্রথমে আপনাকে দেখেছিল । তারপর , সে খবর দেয় আর তার
খবর পেয়েই আমি আপনার এই দুঃখের কারণ খুঁজে , তার সমাধান
করবার জন্য এসেছি ।
মেয়েটি হতভম্ব হয়ে গিয়েছে ।
-আপনার নাম ?
-যম । আমি দাক্ষিণাত্যের এক সামন্ত পরিবারের ছেলে । আপনি ?
-এই যে নদীটা দেখছেন , এই জলাধারের মালিক আমার বাবা । আমি
যমুনা ।
-নমস্কার ।
দু’হাত জড়ো করে
দু’জনেই শুভেচ্ছা বিনিময় করল ।
যুবতির গায়ের রঙ
ফর্সা , নাক টিকালো । দীর্ঘাঙ্গি বলা যায়
। দেখে অবস্থাপন্ন পরিবারের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে । যম বলল
-বোন , আপনি রাক্ষস জাতির সম্বন্ধে কেমন ধারণা মনে পোষণ
করেন ? আমাকে খুলে বলতে পারেন । আমাদের প্রতি আপনাদের ভাবনা , আমাকে জানতে হবে ।
-আমি ...
-বলুন লজ্জা পাবেন না ।
-আমি শুনেছি আপনারা খুব যুদ্ধ প্রিয় । অর্থের লোভে অন্যের ঘরের মহিলাদের অপহরণ করে নিয়ে যান । হত্যা করেন । অন্যের সম্পত্তি হরণ
করেন ... আর ছলনা করেন ।নর মাংস
ভক্ষণকারী আর সুরায় মত্ত থাকেন ।
-এই সব দোষ যার মধ্যে থাকবে যে অসুর ? রাক্ষস ? তাইতো ?
-হ্যাঁ । শুধু তাই নয় , রাক্ষসের মধ্যে নারীদের প্রতি
সম্মান দেওয়ার মানসিকতা থাকেনা ।
আ সব কিছু শুনছে ।
নিজের জাতির প্রতি এত বিদ্বেষমূলক কথা শুনেও , তার মুখ থেকে হাসির রেখা মুছে গেল
না । সে বলল
-যমুনা , আপনি যা বলেছেন , তা হয়ত আংশিক ঠিক । তাই বলে আপনার কথা পুরোপুরি সমর্থন
করছিনা । কেননা এমনটা কোন জাতির পরিচয় হতে পারে না।
-আমি এমনটাই শুনেছি যে...
-দেখুন । এতক্ষণ আমরা কথা বললাম । নিজেদের পরিচয় পরস্পরের
কাছে জানলাম । মানে আমার প্রতি আপনার যে ভয় ছিল , আশা করছি কেটে গিয়েছে । আমরা এখন
আর আগন্তুক নই ।
-সে ঠিক ।
-আমি কিছুটা হলেও পরিচিত আপনার ।
-হ্যাঁ ।
-আমি কিন্তু প্রথমেই আপনাকে বোন বলে ডেকেছি । সম্পর্কে
আমি তাহলে আপনার দাদা ।
-হ্যাঁ ।
-ভগিনীর কাছে বড় দাদা আর বাবার মধ্যে কোন ভেদ থাকা উচিত নয়
। আমিও চাইব আপনি মনে আমার প্রতি বিন্দু মাত্র সংকোচ রাখবেন না।
যমুনা হাসল । এতক্ষণ বাদে তার শুকনো ঠোঁটে হাসি দেখে , যম কিছুটা আশ্বস্ত হল
। মাথার উপরে রোদের রঙ পাল্টে গিয়েছে ।
দুপুর বিকেলের আলোয় মিশে যাচ্ছে । নদীর পার
, ফাঁকা প্রান্তর , দু’পাশে লম্বা
গভীর বন । এই সব কিছু এই সময় অদ্ভুত
সুন্দর হয়ে উঠেছে ! যম দাঁড়িয়ে দেখছিল । উল্টোদিকের বনের মধ্যে , তাঁবু পেতেছে
। গৃহপালিত পশুদের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে
।
-আপনি , বলতে পারেন আপনার যন্ত্রণার কথা । দেখা যাক না , আজ এক আর্য বোনের চোখের জল
, রাক্ষস দাদা মুছিয়ে দিতে পারে নাকি । আপনার মুখে হাসি মানায় । তাই আমি জানতে
চাইছি দুঃখের কারণ ।
যম হাত দিয়ে ,
যমুনার চোখের জল মুছিয়ে দিল ।
যমুনা কাপড় ঠিক করল । যম , নিজের গায়ে জড়ানো কালো কাপড়টি , যমুনাকে
দিয়ে দিল । জড়িয়ে নিয়ে , যমুনা বলল
-দাদা , আপনি যে বস্ত্রহীন হলেন !
-দাদার বস্ত্র তার ভগিনীর সম্মান । আমি এতটুকু বুঝতে পেরেছি
, নারীর সম্মানহানীই তাকে এমন ভাবে ভেঙে ফেলতে পারে । আপনার এই সম্মান ফিরিয়ে
দেওয়ার জন্য আমি চেষ্টা করব।
যমুনা হাসল ।
২
সে এক উৎসবের দিন । এই যে বয়ে চলেছে নদী , সেই নদীর তীরেই
বসেছিল উৎসব । আমরা বলতাম যমুনাতটের এই
উৎসব , আমাদের একবছরের সব দুঃখ শুষে নেয় । এই বছর আগের থেকে আরও প্রাচুর্য নিয়ে
উৎসবের আয়োজন করা হল । আমার বাবাই
করতেন । তিনি এই জলাধারের মালিক । এই নদী তার নিজের মেয়ের মতন । আমার নাম এই নদীর
নামেই । যমুনা উৎসবের প্রধান কারণ ছিল , পরিবেশে নদীর গুরুত্ব সম্পর্কে আশপাশের
জনপদ গুলোকে সজাগ করা । দ্বারকায় যাদবরা
ক্ষমতায় । তারা সমস্ত অঞ্চল দখলে আনতে পারলেও , বাবার কাছ থেকে কখনই যমুনা নদীর মালিকানা
আদায় করতে পারেনি । এর আগেও বহুবার সৈন্য দিয়ে চেষ্টা করেছিল । বাবা আর এখানকার
জনপদ গুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে , যাদবরা ফিরে যায় । এই নদীমাতৃক দেশে , নদী
যার দখলে ক্ষমতা তার হাতে । কেননা নদীর জল যেমন জনপদ গুলোকে শস্যশ্যামলা করত । আবার নদীর জলপথ বানিজ্যে ব্যবহার করা হত । যাদবরা একচ্ছত্র
ক্ষমতার অধিকারী হতে চেয়েছিল । এখান থেকেই শুরু হল লড়াই । তীব্র আক্রোশ । ছোট জনপদ গুলোকে পিষে
মারবার চক্রান্ত । কখনো এই যমুনা নদীর জল চক্রান্ত করে দূষিত করা হল । এর চারপাশের বাস্তুতন্ত্রকে নষ্ট করবার জন্য
বনভূমি দখল করা হল । তাতেও আমার বাবার মনোবল ভাঙা গেল না। এতদিন যেই সব জনপদ গুলো
যাদবদের ভয়ে চুপ করেছিল । তারাও মুখ খুলতে শুরু করল । প্রতিবাদ তৈরি হচ্ছিল ।
একমাস আগে , সকালে
বাবার কাছে যাদবদের তরফ থেকে দূত এসেছিল । যাদবরা তাদের পুত্রবধূ করতে চাইছে । যাদবদের বড় ছেলে বলরামের জন্য ।
আমি ওকে আগে একবার দেখেছিলাম । উজ্জ্বল বর্ণের , চওড়া বুক , পেশীবহুল দেহ । নাম
করা কুস্তিবীর ।
আমি সেই দিন থেকেই
তার প্রেমে পড়েছিলাম । বাবা বিয়েতে রাজি ছিলেন না । কেননা , বলরামের প্রজাদের তুলনায় সুরার
প্রতি টান ছিল বেশি । প্রায় সারাদিন নেশায় ডুবে থাকতেন । এত কিছুর
থেকেও লজ্জার ব্যাপার আমার বিয়ের জন্য পণ বাবদ যমুনা নদীর মালিকানা হস্তান্তরের
শর্ত রাখা হয়েছিল ! বাবা এমনটা করতে পারল
না , কেননা আমার অপমান আর যমুনার জল পেয়ে যেই সব জনপদ গুলো আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল
ছিল , তাদের পেটে ভাত জুটত । যমুনার মালিকানা যাদবদের হাতে চলে গেলে , তারা
অতিরিক্ত শুল্ক চাইত । ফলত জনপদ গুলো ধ্বংস হয়ে যেত ।
বাবা দূতকে ফিরিয়ে
দিল । আমি কেঁদেছিলাম । বলরামের জন্য সেই
দিন সারারাত ছটফট করেছিলাম । ওর শক্ত বুকে
নিজের মাথা ঘষতে চেয়েছিলাম । এক মুহূর্তে
সব কিছু শেষ হয়ে গেল !
দু’দিন আগে যমুনা উৎসবে বাবা পুরানো সব ঝামেলা ভুলে , সকলের স্বার্থে সব জনপদকে আমন্ত্রণ করেছিল । যাদবরাও এসেছিল । বলরাম নিজে তার সঙ্গী
সাথীদের সাথে যাদবদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিল ।
সব কিছুই ঠিক ছিল । আচমকাই উৎসবের মধ্যে বলরাম সুরায় এতটাই
মত্ত হয়েছিল যে , আমায় বলপূর্বক হাত ধরে
টানল । ঘামে ভেজা দেহে আমাকে জড়িয়ে , আমার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করল । আমি একে কুমারী , তার উপর নারী । সকলের সামনে বলরামের সাথে সহবাস করতে রাজি হলাম না । সে তখন
মাতাল হাতি । আমাকে পিষবেই । আমার নারীত্ব হরণ করলেই তার পুরুষত্ব তৃপ্তি পাবে । এমনটাই হল । সকলের সামনে , আমার
ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে ধর্ষণ করল !
যমুনা হাউমাউ করে কাঁদছে । পাশে যম বসে আছে । ওদের এক পাশে
গভীর বাকহীন নদী , সেও যে অসহায় মেয়ে । আরেকপাশে গভীর অরণ্য । রাতের অন্ধকারের সে
আরও চুপ হয়ে গিয়েছে । মনে হয় এক কালো রেখা বহুদূর চলে গিয়েছে ! পৃথিবীর শেষ
প্রান্তে সে গিয়ে মিশবে , যেখানে ক্ষমতায়ণের অজুহাতে নারীকে অপমান করা হয়না ।
নিষ্ঠুরতা , হিংস্রতা আর কাপুরুষতার
পাপকে বীরত্বের মিথ্যা স্তুতি রচনা করে ঢেকে রাখা হয়না , যুগ –যুগ ধরে ।
-দাদা , বাড়িতে বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা । বাবা
ভেবেছেন যাদবদের বিয়ের প্রস্তাব দেবেন , সাথে এই নদীর মালিকানার শর্ত দিয়ে দেবে । আমি জানি তাতেও আমাকে গ্রহণ নাও
করতে পারে । আমি খুব অসহায় বোধ করি । দুপুরে , এই নদীর কাছে এসে কাঁদছি । ছোটবেলায়
মা মারা যায় । মায়ের জন্য যখন খুব কষ্ট হত , এই নদীর কাছেই চলে আসতাম । এর নাম
যমুনা। আমাকে এই নদীর নামেই
লোকে চেনে । আমি নদী যমুনার
মেয়ে যমুনা । আজ ভেবেছি রাতে , নিজেকে এই
নদীতে ভাসিয়ে দেব । তাহলে বাবা অসম্মানের
হাত থেকে বাঁচবেন আর নদীটাও যাদবদের দিয়ে দিতে হবে না ।
এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে গেল , যমুনা ।
মাথায় গোল সাদা চাঁদ উঠেছে । চাঁদের আলোয় ভেসে গিয়েছে ,
যমুনার চরাচর । কদম গাছের গোঁড়ায় মাথা রেখে , কাঁদছে যমুনা । পাশে যম বসে আছে । বলল
-যমুনা , আপনি জানেন আজকের দিনটির পরিচয় ?
-না ।
-আকাশে তাকান । শুক্লাপক্ষ দ্বিতীয়া তিথি ।
-আমি এত কিছু খেয়াল করিনি ।
-কার্তিক মাস । হেমন্তের হাওয়া , এখন পৃথিবীতে বইবে ।
মানুষের ঘরে –ঘরে যাবে । ফিস –ফিস করে শোনাবে , শীত আসবার সময় হয়ে এসেছে । আপনি আমার বোন , প্রিয় বোন । আমি দাদা । এই
যমুনার পারের পলি আমার কপালের টিকা
করে দিন । আজ থেকে এই মুহূর্ত
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া । আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি , আপনার স্মমান আমি ফিরিয়ে দেব ।
-আপনি আমার দাদা । এই আমার কাছে অনেক বড় ।
- আমি জানি । আমি
রাক্ষস জাতি আমাদের কাছে , আমাদের মহিলাদের সম্মান সবার আগে । এখন থেকে যমুনা
হচ্ছে যমের বোন । তাই তার সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার দায় এই যমের , আমি তা রক্ষা
করবই । আমি দ্বারকায় যাচ্ছিলাম এই গৃহপলিত পশু গুলোর জন্য । দ্বারকাপতি আমাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ডেকেছেন । এই উন্নত মানের গবাদি পশু আপনাদের এখানে নেই ।
বুঝতেই পাচ্ছেন , যাদবরা নিজেদের স্বার্থে
আমার কথা শুনবে ।
-কী বলবেন ?
-যমুনা আমার বোন । তাকে বিবাহ করতেই হবে । এই বিবাহে
যাদবদের সম্মান বাড়বে । রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষিত হবে ।
-তারা এক নাম গোত্রহীন কন্যাকে গ্রহণ করবেন কেন ?
-করবেন । কারণ দ্বারকায় শ্রী কৃষ্ণ আছেন । উনি রাজনীতিটা ভালোই বোঝেন । উনি জানেন ক্ষমতা ধরে রাখবার জন্য সহিষ্ণুতাও
দরকার ।
-আর বলরাম ?
-তাকে রাজি করাবো ।
-কেমন করে ?
-আমার জীবনের এক সত্য ঘটনা বলে । যার জন্য আপনার কাছে আসা ।
-মানে ?
-আপনি আর আমি এক দুর্ভাগ্যজনিত পরিস্থিতির স্বীকার । আমরা দু’জনেই যে পূর্ব
পরিচিত । এক ভয়াবহ স্মৃতি আমাদের পূর্ব জন্ম থেকে তাড়া করে চলেছে । আপনার মনে নেই
।আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি । মন দিয়ে শুনবেন
...
৩
সত্যযুগের আগে আরেকটা যুগ ছিল । এই সময়কে সংহিতা যুগ বলা হত । সেই যুগে নারী ছিল স্বাধীন
। সে পুরুষের দাসত্ব তখনো গ্রহণ করেনি । যৌন স্বাধীনতা উপভোগ করত
। সমাজে তখনো নিয়ম তৈরি হচ্ছে । এই সব নিয়ম গুলো কখনো
ভাঙছে , আবার
নতুন করে তৈরি হচ্ছে । চাপিয়ে দেওয়া নীতি আমরা
রাক্ষস জাতিরা কখনই মেনে নিতে
পারিনি । কেননা আমাদের ভাষা , সামাজিক রীতিনীতির প্রতি আমরা দায়বদ্ধ । আমাদের সভ্যতা সেই যুগেও
ছিল মাতৃতান্ত্রিক । এই সংস্কার আমাদের কাছে গর্ভধারিণী , তাই কোন কিছুর বিনিময়ে আমরা একে
ছাড়তে পারব না । চিরকাল এক দর্শনের বিপরীতে সম্পূর্ণ
বিরোধী দর্শনের উত্থান দেখা গিয়েছে । এই উত্থান ঘিরে সেই সংহিতার
যুগেও শুরু হল লড়াই । তখন দেবতাপন্থী দর্শন ক্রমশই আমাদের বিরোধী হয়ে উঠতে লাগল । ইন্দ্র গোষ্ঠীর দেবতারা
অহেতুক আমাদের রাক্ষস জাতির শান্তি ভঙ্গ করতে শুরু করল । আমাদের উপাসনার জায়গা , খনিজ সম্পদ , জল সীমা ,
প্রাকৃতিক সম্পদ , লোকালয় আর হ্যাঁ আমাদের মহিলাদের প্রতি তাদের নজর গেল ! তাদের
কাছে রাক্ষস জাতির মহিলারা খুবই মূল্যবান সম্পত্তি হয়ে উঠল ।আমরা নারীদের আমাদের
সভ্যতার প্রান স্বরূপ মনে করি , ইন্দ্রপন্থী দেবতাদের কাছে তারা ছিল বিশেষ
ব্যবসায়িক দিক দিয়ে লাভবান পণ্য বিশেষ । এখান থেকেই আমাদের আর ওদের দর্শনগত সংঘাত শুরু হয়ে ছিল ।
এমনই পরিস্থিতি
চলছিল তখন । রাক্ষস জাতির হয়ে যিনি
নেতৃত্ব দিলেন , তিনি যম । যমের পরিচয় দিচ্ছি । ইন্দ্র গোষ্ঠীর বিপক্ষ
শিবিরের মধ্যে সূর্য শিবির ছিল । তাদের
প্রধান গোষ্ঠী পতির নাম সূর্য ছিল । এই গোষ্ঠীর কাজ পৃথিবীতে আলো আর অন্ধকারের উৎস
আকাশের সূর্যের গতিবিধি , উপযোগিতা আর সেই সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞানের চর্চা করা ।
ইন্দ্রের উগ্রতা আর একনায়কতন্ত্র এতটাই বাড়তে শুরু করল যে , সূর্য গোষ্ঠীর কাছে আর মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তারা ইন্দ্রের
বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামতেও পারছিল না। সূর্য
গোষ্ঠীর প্রধানকেও সূর্য বলা হত ।
তার একজন কন্যা সন্তান জন্মায় । দেব নারীর গর্ভেই সেই কন্যার নাম হয় যমী ।
এদিকে সূর্যের বহু দাসীর মধ্যে একজন খুব প্রিয় ছিলেন । তিনিই যমকে জন্ম
দিয়েছিলেন । পাছে এই রাক্ষস জাতির সন্তান দেবতাদের সিংহাসনে বসবে , এই নিয়ে যাতে
ভবিষ্যতে কোন ঝামেলা না হয় , তাই যমের জন্মের সাথে –সাথে প্রচার করা হয়েছিল যম আর
যমী যমজ ভাই –বোন । সূর্য অবশ্য চাইছিল
যমকে ইন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাতে ।
কেননা এতে রাক্ষস জাতির সাহায্য পাবে । একা কোন ভাবেই ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাজিত করা
সম্ভব নয় । ধীরে –ধীরে যম , যমীর সাথেই সূর্য মহলে থাকতে শুরু করল । যমকেও এক দেবতার মতনই সেবা করা হত । সমস্ত অস্ত্রের প্রয়োগ শেখানো হল
। সাথে , দেবতাদের একান্ত শিক্ষা ,
সংস্কার দেওয়া হল । এত কিছুর শেষেও যমের ভিতর থেকে রাক্ষস জাতির সত্ত্বা মুছে গেল
না । বরং ক্রমশই তার জনপ্রিয়তা , অতি অল্প বয়সেই
ইন্দ্রকে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দিল ! এখন সূর্যের স্বপ্ন সফল হবে । কেননা
ইন্দ্রের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে যম । রাক্ষস জাতির প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করল । সূর্য
ঠিক করে ফেলল , পরবর্তী গোষ্ঠীপতি যমকেই করা হবে ।
যম তখন যুবক । যমীও যুবতি
হয়ে উঠেছে । ওরা দু’জনেই নির্জন
দ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিল । সেই দিনও আকাশে
হাল্কা মেঘের খেলা চলেছে । পাখিদের গলার আওয়াজে , গাছের শাখা গুলো ভরে থাকত ।
দ্বীপের সীমা বরাবর সমুদ্রের এগিয়ে আসা আর পিছিয়ে যাওয়ার খেলা চলছিল । সমুদ্রের
জলের উচ্ছ্বাস যেন গিলে নেবে ! আবার মুহূর্তেই
তা ফিরে যাচ্ছে ! সূর্যের অনুপস্থিতিতে
যম আর যমী নিজেদের মতনই একান্তে এই দ্বীপে সময় কাটাবে । এই ইচ্ছা অবশ্য
যমীরই । তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হয়েছিল যমের । কেননা যতই সে ছোট বেলা
থেকে অনেক আদর আর বিলাসিতায় মানুষ হইয়েছিল , পরিণত বুদ্ধি হওয়ার সাথে –সাথে টের
পাচ্ছিল—তার সাথে সূর্যের পরিবারের সম্পর্ক
অনেক ক্ষেত্রেই মালিক আর প্রভুর । শুধু এমনই নয় , যমীর ব্যক্তিগত কাজের দায়িত্ব
পর্যন্ত যমকে দেওয়া হত ।
এক হেমন্তমুখরিত ভোরে , যম আর যমী একান্তেই সূর্যমহল ত্যাগ
করে দ্বীপের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল । তারা একটি দ্বীপে এসেছিল । যমী শক্ত বৃক্ষের ছাল নিজের দেহের নীচের অংশে পড়েছিল । কোমর থেকে বুক পর্যন্ত ঢাকা ছিল চামড়ার পোশাকে । খোঁপায় সাদা- সাদা
রঙিন ফুল । যমের পোশাকটি শুধুই কালো ষাঁড়ের
চামড়ায় তৈরি । এটাই তার খুব প্রিয়
পোশাক ছিল ।
যমী বলল – তুমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে ?
যম বলল – এই সমুদ্র গর্ভে কাঁকড়া প্রচুর পরিমানে আছে ।
চাইলে সমুদ্র মাছের ব্যবস্থাও করতে পারি ।
যমী আর যম মুখোমুখি বসে ছিল । সমুদ্রের গর্জন তাদের কান
গুলোকে মাতিয়ে রেখেছে । দু’জনেই হাঁটু
ভাঁজ করে বসে আছে ; নরম বালির উপর গর্ত হয়েগিয়েছে ।
-আমার চোখের দিকে তাকাও
-খুব সুন্দর !
-তাই ?
-হ্যাঁ , সমুদ্রের জলের মতনই আকর্ষণ করছে ।
যমী হাসল ।
-তোমার হাসি যেন , সমুদ্রের বুকে জমতে থাকা শুভ্র ফেনা !
-তাই যম !
-সত্যিই । আমি মিথ্যা বলিনা ।
-যম তুমি আমার ঠোঁট
, মাথা , চোখ দেখেছো । কখনো আমার বুক দেখেছো ? আমার থাই? আমার যোনি ?
এই সব শব্দ গুলো এই প্রথম শুনল ! যম বুক শব্দটা শুনেছে ।
বাকী কিছুই শোনেনি । এতটুকু বুঝতে পাচ্ছে , এই সব গুলোই নিষিদ্ধ । সবার সামনে
সূর্য মহলে যমী বলতেই পারত । এমন কিছু না করে , এই এত দূরে নির্জন দ্বীপে নিয়ে আসবার পিছনে রহস্য আছে ।
যমী হাসছে ।
-যম তুমি তোমার সব পোশাক খুলে ফেল ।
-কেন ?
যম ঘাবড়ে গেল । তার মুখে ঘাম জমে উঠছে ।
যমীর মুখে এতটুকু পরিবর্তন নেই ।
-তুমি পুরুষ । তোমার যৌনতায় এত অনীহা কেন ? আমি নারী হয়ে যদি আত্মসমর্পণ করতে রাজি
থাকি , কেনইবা তোমার এই ভীরুতা ।
-আমার মনে হচ্ছে , আমাদের মহলে ফিরবার জন্য প্রস্তুত হতে
হবে । আমি কিছু খাবারের সন্ধান করছি ।
যমী আচমকাই
বুকের পোশাকটি খুলে ফেলল ! যম দেখছে ,
দিনের আলোয় যমীর নগ্ন বুকের ভাস্কর্য ! দুটো নরম তুলতুলে বিভক্ত মাংস পিণ্ড । গোঁড়ায় গোলাপি আভায় মুড়ে
থাকা ক্ষুদ্র –ক্ষুদ্র ফুটকি ।
-যম , এই দুটো হচ্ছে স্তন । এই হচ্ছে স্তনবৃন্ত । তুমি ঘামছ কেন ?
-এই সব আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে । ফেটে যাচ্ছে ভিতরটা । যমী
তুমি কেন এমন করছ /
-তোমাকে আমার চাই । তুমি চাওনা ?
-জানিনা ।
-এসো এই খোল আকাশের তলায় আমরা , একে অন্যের শরীরে প্রবেশ
করি ।
-না।
কিছুক্ষণের জন্য যমীর কান যেনও , সমুদ্রের বিস্ফোরণ শুনল !
-মূর্খ । তুমি আমার দাস । মি যা চাইব , তা করতে বাধ্য ।
-আমি জানি , আমি
পিতার পালক সন্তান । আমরা দু’জনেই
যমজ ভাই বোন । পিতা তেমন ভাবেই লালিত করে এসেছেন ।
-তাই বলছি । মনিবের ঋণ শোধ করো । আমিও তোমার মনিব , আমাকে
সেবা দাও । আমাকে ঠাণ্ডা কর ।
-এমনটা আমি করতে পারব না। আমরা সম্পর্কে ভাই বোন । ভাই আর
বোন কখনই স্বামী –স্ত্রীর মতন সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারে না। এই অবস্থা তাদের কাছে পাপ
। অনৈতিক ।
-কাদের কাছে ?
-সমাজের কাছে ।
-কোন সমাজ ?
-যেখানে মানুষ বসবাস করবে ।
-যম ,দেবতারাই শেষ কথা বলবে । তুমি আমার দাস ।আর
দেবতারা দাসদের সম্পত্তির মতন ব্যবহার করবে । এটাই তোদের ভাগ্য...
যমীর ভাষার এই অদ্ভুত পরিবর্তনে যম ভীত হয়ে উঠল ।
-এমন ভাবে রেগে গেলে কেন ? আমি ভুলটা কী বলেছি ?
-নিজের মালিকের কথা না শোনাটাই , তোর অপরাধ ।
যম মাথা নামিয়েছে ।
-আমরা ভাই আর বোন । আমরা কেমন ভাবে সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারি !
এটা সম্ভব নয় ।
-কেন ? আমরা পরস্পরের কাছে পরিচিত । আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি
, পরস্পরকে এই আনন্দটুকু দিতেই পারি । আমাদের জন্মদাতা পৃথক নন । আমাদের দু’জনেরই
জন্ম মায়ের গর্ভে। মানে আমরা দু ‘জনেই মানুষ । এতে আপত্তি কেন ? আমার এটাই
আদেশ ।
যমী দু ‘হাত , যমের কাঁধের উপর দিয়ে নিয়ে মাথাটা ধরল । যমের
ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল
-এই নারী শরীররে স্বাদ এখনো পাওনি , মূর্খ । আমি তোকে এই
এখনই ভোগ করব । আমি এক দেবতার মেয়ে
। তোর চেয়ে উচ্চ বংশ আমার । আমাকে ভোগ করতে , দেবতারা প্রস্তুত ।
আমি সেই
সুযোগ তোকে দিলাম । আমার নরম আর কাঁচা মাটিতে প্রথম তুই হাল টানবি । তোকে
সেই সুযোগ দিচ্ছি ।
-আমি এমনটা করতে পারিনা । রাক্ষস জাতির অসম্মান হবে ।
-আমরা আমাদের রমণ , সুখ , খাদ্য আর সাম্রাজ্যের বিস্তার নিয়ে
ভাবি । রাক্ষস জাতির কিছু ভালো থাকতেই পারেনা । আয়...
যমী হাত ধরে যমের ঠোঁট , নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে নিল ।
মাথার উপরে আকাশ , সেখানে সেই সময়
দুপুরের রাগি রোদ হারিয়ে গিয়ে , বিকেলেরব নরম আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে ! সেই আলোয় যমের কালো পাথরের
মতন দেহটায় , আটকে আছে অপরূপ সুন্দরী যমী
। দু’জনের দেহে কোন কাপড় নেই । যমী জীবনে প্রথম কোন পুরুষের শরীর ভোগ করছে ।
সূর্য ডুবে যাওয়ার
যে সময় , তার কিছুটা আগে হবে । যমী আর যম পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে । যমী মুখের উপর হাত
রাখল । যমের বুক উঠছে আর নামছে ; সাথে
ঠাণ্ডা স্রোত মেরুদণ্ড থেকে বয়ে চলেছে । এক
রাক্ষস জাতির পুরুষ হয়ে সে দেবতার মেয়ের সাথে সঙ্গম করল ! এই খবর যদি ইন্দ্রের
কানে যায় – সে আরও অত্যাচার শুরু করবে অসহায় রাক্ষস জাতির উপর। সূর্যের মেয়ের সাথে
এই জঘন্য ব্যবহাররে জন্য , সেও সাহায্য
করবেনা । ভাই হয়ে বোনের সাথে পাপাচারে
লিপ্ত হল ! এই অবনতির জন্য যম নিজেই , নিজের কাছে ছোট হয়ে গেল ।
যমের দু’চোখ বেয়ে জলের রেখা নামছে ।
যমী হাত দিয়ে , যমের গালে বেয়ে নামা জল মুছে বলল – আমি জানি
, তোমার সাথে যেই ব্যবহার করেছি , তা উচিত হয়নি । আমি তোমায় ভালোবাসি । হতে পারে আমরা যমজ ভাই –বোন , তাই বলে ভালবাসতে বাধা কোথায় !
জীবনে যৌনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । হলামই বা যমজ আমরা , নিজেদের ইচ্ছা দমিয়ে
রেখে কিছু লাভ নেই । আমাদের গোষ্ঠীগত জীবন ধারায়
স্ব-গোষ্ঠীর মধ্যে যৌনাচারে লিপ্ত
হওয়া পাপ নয় ।
-আমার কাছে পাপ । আমি পাপী । আমার এই সময়েই মারা যেতে ইচ্ছা
করছে ,
যমী বল – তুমি বসো , আমি তোমার জন্য জলের ব্যবস্থা করছি ।
যমী দু’ হাতের তালুতে জল নিয়ে আসল । দেখল সামনে যম
লম্বালম্বি ভাবে শুয়ে আছে । যমী বলল – যম নাও , জল খাও সুস্থ হও ।
যমের মুখে কোন পরিবর্তন
নেই । লক্ষ্য করল নিঃশ্বাস নামছে –উঠছে না
! মাত্র কয়েক মুহূর্তে যেন পাল্টে গিয়েছে
! যম এখন মৃতদেহ !!
যমুনা অবাক হয়ে , তাকিয়ে আছে !
-যম মৃত্যুকে ডেকে নিল ।
রাত নেমেছে । চাঁদের আলোয় নদীর শান্ত জলধারা নিজের মতন বয়ে চলেছে । তারই পাশে বসে আছে দু’জন
মানুষ । নর আর নারী । যম আর যমুনা । যমুনা লাঞ্ছিত যাদবপতি বলরাম , তাকে জনসমক্ষে
ধর্ষণ করেছে । যম তার পূর্বজন্মের ঘটনা বলছিল । যমুনাকে বলল
-বোন , তুমি আর আমি
সূর্যের সন্তান । আমাদের মা পৃথক হলেও , পিতা একজনই । আমরা যমজ ভাই আর বোন ।
সেই সময় আমি তোমার সাথে এক অনৈতিক কর্মে
লিপ্ত হই । দেবতারা অভিশাপ দেয় । আমার বিনাশ হয়েছিল । আমার আত্মা ন্রকে
ঘুরছিল । দেবতারা আমাকে সুযোগ দিল । তারা জানাল , যেহেতু আমি পাপী আর নিজেই নিজেকে শাস্তি দিলাম , তা দেখে তারা খুশি
হয়েছে । আমি যদি পরের জন্মে এক কঠিন
তপস্যায় মগ্ন থেকে মৃত্যুবরণ করি ,
তখনইআমার মোক্ষ লাভ হবে । এমন ভাবেই আমি তপস্বী
হয়ে উঠলাম । এখন জন্মে আমি মৃত্যুর দেবতা হয়েছি ।
-আমি বিশ্বাস করতে পারছি না!
-সত্যিই । দেখছ না , আমি তোমার মনের কথা বুঝতে পারলাম ।
এমনটা শুধু মাত্র দেবতারা করতে পারে ।
আমি রাক্ষস জাতির দেবতা । আমার এই দৈব ক্ষমতার কথাই বলরামকে জানাবো । সাথে বলব , আমার পূর্বজন্মের
অপমৃত্যুর ইতিহাস । যে পুরুষ বল পূর্বক কোন নারীকে অপমান করে , তার সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয় ,
সে মহাপাপী । আমি হলাম মৃত্যুর
দেবতা । আমি তাকে নরকে প্রবেশ করাই । আমার কোপে তার সাম্রাজ্য , জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে । আমি কখনও ধর্মচ্যুত হইনি আর হবনা । বলরাম এই পাপে আগে থেকেই যুক্ত
হয়েছে । শাস্তি তাকে পেতেই হবে । তুমি আমার বোন , যমের বোন যমুনা । আমরা ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি । এমন অবস্থায় , সে যদি
তোমাকে রাণীর মর্যাদা দেয় , তবেই এই পাপ থেকে মুক্তি পাবে ।
যমুনা চেয়ে আছে , এই রাক্ষস জাতির দেবতা সত্যিই তার জীবনে
শিবের বর হয়ে এসেছে ! সে রাক্ষসদের সম্বন্ধে এতদিন যত কিছু শুনে ছিল , সবটাই মনে
হচ্ছে ভুল ! এত উদার আর ভদ্র , দয়ালু
দেবতা সে দেখেনি । এই প্রথমদার নিজেকে রাক্ষস জাতির কন্যা বলে ভাবতে ইচ্ছা
হল । বলল
-আমি রাক্ষস কন্যা । এই পরিচয় আমার কাছে যথেষ্ট ।
যম হাসছে
-প্রিয় যমুনা , কোন জাতিকেই তার খাদ্যাভ্যাস
, বর্ণ , ভাষা , পোশাক দিয়ে বিচার
করা যায়না। কেননা জন গোষ্ঠী তার নিজের মতন করে নিজেদের তৈরি করে । পৃথিবীতে কোন
সম্পূর্ণ নর গোষ্ঠী নেই , যারা বলতে পারবে তারাই শ্রেষ্ঠ । এই সেরার দাবি আসলে হাস্যকর । তুমি বলেছিলে রাক্ষসরা বলপূর্বক
নারীদের অপহরণ করে , ক্ষমতা দেখায় , যুদ্ধ করে , সম্পত্তির জন্য যে কোন কিছু করতে
পারে । ছলনা করতেও তাদের বুক কেঁপে ওঠে না ! বলরাম তোমার সাথে যে
ব্যবহার করেছে , তাতে বলা যাবে দেবতারাও কোন অংশে কম যায়না । আমরা তবু নারীদের
সম্মান করি , দেবতারা নারীদের ভোগ্য বস্তু
মনে করে । এই অসভ্য লোকটাকেই তোমাদের অনেকেই দেবতা মনে করো ! তার হয়ে স্তুতি
বন্দনা করো ! আমি এখানে এসে কৃষ্ণ আর তাঁর দাদা বলরামের ক্ষমতার কথা , দেবতা হয়ে
ওঠার কাহিনী শুনেছি । তোমার মুখে বলরামের
চরিত্রের কথা শুনলাম ।
যমুনা বলল – দাদা , যদি বলরাম তোমার কথা বিশ্বাস না করেন ।
যম আবার জোরে হেসে উঠল ।
-আমি মৃত্যুর দেবতা । আমি যম । আমাকে অস্বীকার করবে এমন কেউ
এই পৃথিবীতে নেই । তুমি বিশ্বাস করেছো ?
-হ্যাঁ ।
-যাদবরাও বিশ্বাস করবে । দেখো চারদিকে
ভোরের চিহ্ন দেখা দিচ্ছে । আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত মুছে , সরল আলোয় ভেসে
যাবে চরাচর , সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে । আমি তাঁবুতে যাচ্ছি । দাসীদের পাঠিয়ে দিচ্ছি । মুখ ধুয়ে , নতুন কাপড় পড়ে ,
যমের বোন রাক্ষস কন্যা যমুনা হয়ে আমার তাঁবুতে আসবে । মনে রেখো ,যে জীবন তুমি
কাটিয়েছ তা গত রাতের সাথেই অতীত । এই মুহূর্ত
থেকে , তুমি রাজকন্যা । মৃত্যুর
দেবতা যমের বোন যমুনা । ...
যম নিজে জানে , এই আর্যভূমিতে যাদবদের সাথে ব্যবসায়িক কারণ
ছাড়াও অন্য আরেক গোপন উদ্দেশ্য আছে । সেই উদ্দ্যেশ্যের জন্যই তাকে একটা কাহিনীর
বাস্তব রুপ দিতে হয়েছে। লোকে ভাবে যম হয়ত আগের জন্মের তপস্যার ফলে রাক্ষস থেকে
দেবতা হয়েছে । যমের পূর্বপুরুষ কোন সময় সূর্যের পালিত সন্তান ছিলেন । সে কয়েক
প্রজন্ম আগের কথা । তার আচমকাই নির্জন দ্বীপে
মৃত্যু হয়েছিল । সে নিজের বোনের সাথে সঙ্গমে রাজি ছিলনা , তাই নাকি নিজেই আত্মহননের রাস্তায় যায় ।
এটা কি যথার্থ কারণ ? অনেক প্রশ্নই থেকে যায় । নির্জন
দ্বীপে যম আর যমীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক
হয়েছিল । এই ব্যাবহার গোষ্ঠীবদ্ধ । সংহিতা যুগে খুব সাধারণ । আচ্ছা যদি সঙ্গম হয়েই
থাকে , তবে তারা নিজেদের থেকে দূরে চলে গিয়ে , এই গোপন ঘটনাকে ঢাকা দিতে পারত । তা
না করে , আত্মহত্যা কেন ? আর যদি সঙ্গম না হয়ে থাকে তাহলেই বা কেন আত্মহত্যা করবে
? সমাজের কোন দিক আর নীতি এই সম্মিলিত
খুনের পিছনে আছে ? এক রাক্ষস জাতি , যে ক্ষুদ্র মানুষ থেকে কোন মহিমায় দেবতা হয়ে
গেল ? ষড়যন্ত্র ... যমের মনে হল , তার এই বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত ‘মৃত্যু দেবতা’ র
স্থান, আসলে এক দেবতার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ । এর পিছনের খলনায়ককে খুঁজতেই হবে ।
যম দু’হাত কোমরে
রাখল , আর হাসল । মনে –মনে বলল , আগের দিন দুপুরে এসেছে আর গোটা রাত গিয়েছে
কেটে ! সে তার অমাত্যদের বলে এসেছিল , কেউ যেন বিঘ্ন না ঘটায় । যমুনা
নদীর মাথায় সুন্দর বিকেলের আলোয় , যে অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়ায়
, কথায় –কথায় তাও দেখা হয়নি । সেই সময় যমুনা তার গল্প শোনাচ্ছিল । এক বিকেলের
অপমৃত্যুর মুহূর্ত , মনে হচ্ছিল তারা উদযাপন
করছিল !
মৌসুমী ভৌমিক
ঝরে
ঝরে দিন ঝরে ক্ষণ ঝরে যায় সময়
আগলাতে হয় নিবিড়তা, নয়ত জীবন বিষময়।
ঝরে প্রেম ঝরে আদর ঝরে অভিমান
বুকের সিন্দুকে থরে থরে জমা জীবনের গান।
ঝরে বৃষ্টি ঝরে জল ঝরে যায় বিবর্ণ পাতা
ভবিষ্যতের পালকে লেখে নাম বর্তমানের খাতা।
ঝরে উষ্মা ঝরে প্রলাপ ঝরে প্রতিবাদের গান
দ্রোহের আগুনে ঝলসে যায় বিদ্রোহীর সম্মান।
ঝরে আশা ঝরে নিরাশা, সম্মুখে একাকীত্ব
বিষম সময় বিষম মনন, চতুর্দিকে দূরত্ব।
ঝরা পাতার ঝরা আগুনেও উষ্ণতা বলীয়ান
মুঠো করে রাখো আপনারে, হও নিঃশব্দে আগুয়ান।
রবীন সাহানা
আমি একা
জানিনা কেমনে পশিল এমনে দুঃখভরা অশ্রুজল।
আজকে প্রানের চিত্র হতে গোলাপি প্রেম রংবিরল।
হৃদয় মাঝারে পিরিতি পাঁচিরে কেমনে লাগিল দষ্যু ঝড় ?
করিলা মোরে ক্ষতবিক্ষত, আঁকি দিলা মনে থাবার আঁচড়।
প্রিয়া বিরহী যক্ষ হয়ে, সাঁতরে চলেছি নয়ন্ নীরে -
বার্তা কী মোর নিয়ে ধ্বয়ীর কাগজের পবনদূত?
কালিদাসের কালির ভাষায় বর্ষা প্রেমের বিরহশূল।
তবে কেন মোর হৃদয় হল হেমন্ত প্রথমে প্রিয়াব্যাকুল ?
দুঃখ ভরা হৃদয়েতে, এসব ভাবছি বসে ব্যালকনিতে।
হয়তো, তখন তুমি গুনছ্ প্রহর , আঁধার রাতে চাঁদের সাথে।
চাঁদকে ডেকে বলি আমি, শুনছ্ ওহে অন্তর্যামী,
মনের কথা প্রিয়ার কাছে দাওনা বলে নভঃস্বামী।
অশ্রুঝরা আমার দু-চোখ শুধুই চলে তোমার খোঁজে -
হয়তো কখনো ঠাঁই সে পাবে তোমার ওই হৃদয় মাঝে।
বাস্তবেরই জীবন পথে, সত্যি তোমায় হারাতে দেখে,
চিৎকার করে বলি, হাঁটবো আমি তোমার সাথে।
সুপ্রীতি বর্মন
ভালোবাসি ভালোবাসি
দীর্ঘায়িত ছায়ার প্রচ্ছদে, ঔদাসীন্য সময় প্রদাহে।
ভাসমান এলায়িত বক্ষ।
স্পন্দনহীন নিষ্প্রান নিথর পর্নমোচী,
উদভ্রান্ত পথিক ছন্নছাড়া, গাঁটছোলা বন্ধন সীমাহীন।
একরাশ গোলাপের প্রতীক্ষা।
মিশ্রিত আদুরে কায়া ভালোবাসি, ভালোবাসি।।
এলায়িত বিবস্ত্র কেশরাশি ভূলুন্ঠিত,
পরিপাটি প্রসাধন অতীতের ছায়া, দর্পনে দেখতে আর চাই না মুখ।
পেছন থেকে আগমনী প্রত্যাশা।
আমাকে মনের মতন সাজাবে তুমি,
দেখবে লোক করবে আহামরি।
বাড়বে গৌরবে আমার বুক।
আমার প্রশ্ন কেমন লাগছে আমায়? নির্লিপ্ত চাহনি স্মিত হাস্যে,
ভ্রমরের আগামী এঁটো স্বভাব,
বুঝে গেছি আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি।
একরাশ জনসমাগম মেলাপ্রাঙ্গন,
বিক্রীত পসরা হকারের গলাফাটা চীৎকার।
আকর্ষনে ঝকমারি যদি ক্রেতা সদয় হয়।
কানাকড়ির নেই অভাব, তবুও চাতকের বুকফাটা চীৎকার।পিপাসা, পিপাসা।
তুই যদি থাকতিস কিনে দিতিস নিজের হাতে করে।
মেঘফাটা একরাশ জলসমুদ্রের চুম্বনে,
তৃষ্ণার্ত ধরিত্রী হতো তৃপ্ত,
সম্মোহিত।অলিগলি আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে বহুদূর,
সান্নিধ্য গন্তব্যহীন অচল ধোঁয়াশা।
তবুও আকুন্ঠ বিগলিত চিত্তে, বলতে থাকি ভালোবাসি, ভালোবাসি।
আয়োজনের নেই ভ্রুক্ষেপ,
হাতের কাছেই রোগীর পথ্য, সেরে উঠার ব্যধি।
দিল কেউ যেন নজর।
ছাড়ে না রোগ হায় হায়, ভালোবাসি, ভালোবাসি।।
নজরে নেই তুমি,
রয়েছো হৃদয়ের আলোকে, সুখশয্যায় সহবাস।
কল্পলোক বাসর, অশরীরী একরাশ সিঁথি ভরা সিঁদুর,
চলনে ভ্রাম্যমান পথিক, নিত্য আসা যাওয়া।
স্থিতিশীল ছলনা,
তবুও বিনিদ্র রজনী অশ্রুমালা।
করবো আলিঙ্গন ভালোবাসি, ভালোবাসি।।
রয়েছি ডাক প্রতীক্ষায়,
কোন সদুত্তর ভারবাহী পিয়ন, অপ্রত্যাশিত চাহিদা।
চোখের তলায় কালি, অবসাদের চাপ।
উৎকন্ঠিত হৃদয়, উৎসারিত সেই চেনা পরিচিত ডাকনাম।কলমের কালি শুকিয়ে নিষ্প্রান ভাষার উচ্চবাচ্য।
হতে লেগেছে পর্নমোচী প্রতীক্ষায় আগামী প্রচ্ছদে বসন্ত।কোকিল পোড়ামুখী, মুখ করেছে কালি।
তবুও প্রানভরে বলতে চাই ভালোবাসি, ভালোবাসি।।
চিত্তরঞ্জন সাহা
লজ্জা কেমনে ঢাকি
তোমার দেশে তুমি হলে খুন
লজ্জা কোথায় রাখি,
বুকের ভেতরে সেই ক্ষতটা
কেমনে বলো ঢাকি।
যাদের করতে বিশ্বাস তুমি
বিশ্বাসঘাতক তারা,
তাদের হাতে ভায়াল রাতে
তুমি গেলে শেষে মারা।
ভাবতে গেলে গায়ে কাঁটা দেয়
চোখ জুড়ে জল নামে,
অাকাশের কোনে ঘন কালো মেঘ
দেথলে শক্তি থামে।
বাঙালির নামে ওরাতো জানি
কুলাংগারের জাত,
তোমাকে মারতে ওদের সেদিন
একটু কাঁপেনি হাত।
তোমার বুকে সেদিন ওরা
চালিয়ে ছিল গুলি,
তোমাকে হারানোর সেই ব্যথাটুকু
অামরা কখনো ভুলি ?
তুমি নেই তবু হৃদয়ে শক্তি
অামরা ফিরে পাই,
কোটি বাঙালির বুকের মাঝে
তুমিতো নিয়েছো ঠাই।
অনিমেষ
রাতের আকাশ
নিশ্চুপ রাতের তারা, বইতে থাকা হিমেল হাওয়া, চোখ ধাধানো আলেয়া, নিঃসঙ্গতার মিশ্রনে , অভিব্যক্ত করে যায় অনেককিছু৷ বহুদিনের পরিচিত সেই স্বর, যুগ বদলানোর কন্ঠে, ভেসে আসা শান্তশব্দের , শিৎকার৷ ধুলোপথে বেওয়ারিস ক্লান্তি, রজনীর আকাশ রেঙ্গেছে গোলাপী , সেই আভায় নিশির গগন , মেতেছে প্রেম পাগল ৷৷ হাতের নৈপুন্যে কে যেন , একে দিয়ে যায়, ক্লান্ত পথের পরিশান্ত
প্রলয়কুমার বিশ্বাস
বর্ষার শেষ গরম ও আর তেমন নাই,মানে ঋতু রানী শরৎএসেছে দোরগোড়ায়।চারিদিকে একটা খুশির আমেজ আর প্রকৃতি ও যেন রসপুষ্ট হয়ে সবুজাভ চাদরে নব রূপে সজ্জিত। আর এদিকে লক্ষীর ভাঁড়ে জমানো টাকায় কেনাকাটার দিন গোনা শুরু।পুকুরপাড়ে আর দূরে ক্ষেতের আল ছাপানো কাঁশফুলের হালকা শিশিরস্নাত শুভ্রতা ঝলমলে দিনের প্রথম আলোকে হৃদয়কে অনাবিল আনন্দ দেয়।ঋতুরানীর প্রসাদী শিউলি ফুলের সুবাসে মোহিত শরতের আকাশ-বাতাস। চঞ্চলতায় পূর্ণ হয় মন-প্রাণ।
পিতৃপক্ষের অবসান হয় মহালয়ার তর্পণে, সুচনা হয় দেবীপক্ষের। পুজো পুজো সাজ। তখন গ্রামাঞ্চলে টি.ভি, কম্পিউটারের প্রভাব আবিস্কার হয়নি।মহালয়ার দিন সাতসকালে রেডিও চ্যানেলের শোঁশোঁ আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে বাইরে বের হতেই দেখতাম-বাবা দাওয়ায় বসে আকাশ-বাণীকে ধরার চেষ্টা করছে,
আর পাশে জনাতিরিশেক বাড়ির আরপ্রতিবেশী ছোটো বড়ো জমায়েতহয়েছে। সকলে একসাথে আনন্দ করার আমেজটাই আলাদা।
শুরু হতো চণ্ডীপাঠ। বড়োদের থেকে কেউ কেউ বীরেন্দ্রকৃষ্ণভদ্রের চণ্ডীপাঠের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ কেউ বলতো সুরের নাকি এবারে কিছুটা বিচ্যুতি ঘটেছে। সত্যি কথা বলতে চণ্ডীপাঠের বিশেষ কিছু আমরা ছোটোরা বুঝতাম না,
বাকিরা বুঝতো কিনা জানিনা,
তবে আমি যেবুঝতাম না এটা নিশ্চিতভাবে বলতেপারি।তবে কেউ বোঝে কিনা সে ব্যাপারে কাউকে কখনও জিজ্ঞেসও করিনি। ক্রমে মহালয়ায় দুগ্গাদেবীর কাহিনী বর্ণিত হতে লাগলো।সকলেই নিশ্চুপ যেন ধর্মীয় কোনো রীতি মৌনতার সঙ্গে সকলে পালন করছে।আমি মাঝে মাঝে সকলের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চিত্তে তাকাতাম- মনে হত এইদিন সাতসকালে এটা শ্রবণে পাপমোচন হয়,
এমনটা আন্দাজ করেছি।
ক্রমে পুজোর দিন ঘনিয়ে আসত।বাড়িটা বাজার সংলগ্ন হওয়ায় দেখতে পেতাম সেই পুজোর আগের কয়েকটা দিন বাজারে প্রায় দ্বিগুনেরও বেশি লোকের আনাগোনা চলত।মহিলা বা ছোটরা বাজারে সেইসময় তেমন একটা না আসলেও এই কয়েক দিন দল বেঁধে কেনাকাটায় আসাটা অস্বাভাবিক বলে মনে হতো না।সব সুন্দর গুছানো মালপত্রে টাইটম্বুর দোকানগুলো ব্যস্ততার চরমে থাকতো।আর বাজারটা যেন দিনরাত একটা গমগম আওয়াজে পূর্ণ থাকতো। ক্রমে ষষ্ঠীর দিন উপনীত হলে ঘটবরণের পরে পাড়ার ছেলেরা সকলে ধুমধাম করে প্রতিমাআনত। তখন এতবে শি জায়গায় পুজো হতো না এখনকার মতো।একটা বা দুটো মন্দিরকে ঘিরে চলতো পুরো আনন্দের দূর্গোৎসব।সকলের নতুন পোশাক ছোটোদের হাতে থাকতো খেলনা বন্দুক আর রঙিন কত সব বেলুন। সারাদিন পুজো অঞ্জলি আর ঘোরাঘুরি,
রাতে মন্দিরে ঢাকের তালে ধুনুচিনাচ, আরতি প্রতিযোগিতা। হিন্দুমুসলিম সকল জাতি সকল বর্ণের মানুষের মেলবন্ধন ঘটত এই পুজোকে উপলক্ষ করে।প্রতিযোগিতা য়থা কতো উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি,
শাড়ীভাঁজ,
মোমবাতি প্রজ্বলন প্রভৃতি আর শেষে ঢাকিদের লড়াই।মন্দিরে ধ্বনিত হতো মিঠেল সুরে রবীন্দ্রসংগীত কিংবা নজরুলগীতি।
কবিতা
সুকন্যা সামন্ত
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া
আজ ভ্রাতৃদ্বিতীয়া –
আজ ভাইকে ফোঁটা দেবার দিন ,
ভাইয়ের প্রতি বোনের –
ভালোবাসা জানাবার দিন ।
ভাইয়ের সেই চিরাচরিত –
বোনকে স্মরণে রেখে ,
তাকে উপহার দেবার দিন ।
প্রতিবছর মা তুমি সবকিছু ভুলে ,
সবকিছু ফেলে দিয়ে চলে যেতে –
তোমার ভাইকে ফোঁটা দিতে ।
তোমার সেই ভালোবাসার কাছে ,
সেই টানের কাছে ,
পৃথিবীর সব সম্পর্ক যেন ,
তুচ্ছ হয়ে যেত ।
আজ সেই ভাতৃদ্বিতীয়া –
তোমার মুখে ছোট থেকেই ,
শুনেছিলাম তোমাদের –
ভাই-বোনের ভালোবাসার কথা ,
কীভাবে ইস্কুল থেকে ফেরার পথে ,
তোমরা খেলতে যেতে ,
আর সেই যে সকলের নজর এড়িয়ে ,
কেমন তোমরা যেতে আম কুড়াতে ।
পিঠে যে এক আধবার –
বড়োদের মার পড়তো না ,
এমন নয় ।
বড়োদের স্নেহে ,শাসনে –
বড়ো হয়ে উঠেছিলে তোমরা ।
তোমার ভাই বলতো –
“আমাদের ধমনীতে ,
একই রক্ত বইছে ,
আমরা পরিারের ,
একই ভালোবাসা পেয়ে ,
বড়ো হয়ে উঠেছি ,
তাই আমরা এক ।“
ভাইকে অত্যন্ত স্নেহ করতে বলে ,
তার শাসনকে তুমি –
মনে করতে আশীর্বাদ ।
তার ভালোবাসার –
কাঙাল ছিলে তুমি ।
সবকিছুকে তুচ্ছ করে দিতে ,
তার একটু ভালোবাসা –
পাবার জন্য ।
যেদিন তুমি বিয়ে করে ,
শ্বশুরবাড়ি গেলে –
সেদিন তোমার ভাইকে ধরে ,
তোমার সেই কান্নার কথাও ,
শুনেছিলাম দিদার মুখে ।
দিদা বলতেন –
“পৃথিবীর কোন শক্তিই –
ওদের আলাদা করতে পারবে না ।“
দাদু-দিদা মারা যাবার পর ,
সেই ভালোবাসায় একটা প্রশ্ন দেখা দিল ,
যদিও তুমি সেইদিকে কোনোদিনও ,
ভ্রূক্ষেপও করতে না –
এতটাই বিশ্বাস ছিল তোমার মনে ,
তোমার ভাইয়ের প্রতি ।
ভাই যে কোনোদিনও ঠকাবে না –
সে বিশ্বাস তোমার ছিল ,
তাই কোনোদিনও দাদাকে তুমি –
মুখফুটে সম্পত্তির ভাগ চাইতে না ।
মাঝে – মধ্যেই আমাদের জামা ,
কিনবার জন্য টাকা থেকে বাঁচিয়ে ,
তুমি তোমার ভাইয়ের পরিবারের জন্য –
নিয়ে যেতে উপহার ।
সে শুধু উপহার ছিলো না –
ছিল তোমার ভালোবাসার ,
ছোঁয়ায় ভরা স্মৃতি ।
তোমার দাদা – বৌদি কতটা ,
মর্যাদা দিত তোমার স্নেহ ভালোবাসার
তা বুঝতে পারতাম না ।
তবে খুব খুশি হয়ে ,
তা গ্রহণ করতো ।
ধীরে ধীরে আমরা বড়ো হয়ে উঠলাম ,
তোমার সংসারেও অভাব দেখা দিল ।
অর্থের প্রয়োজন দেখা দিলো তোমারও ।
তখন মনে পড়লো তোমার অধিকারের কথা ,
মনে পড়লো তোমার সম্পত্তি ভাগের কথা ,
অসুস্থ ছিলে তখন তুমি ,
তা সত্ত্বেও তুমি –
ভাইফোঁটা দিতে যেতে ভুলতে না ।
ফোঁটা দিয়ে তুমি দাদাকে চাইতে –
“দাদা আমার জমির টাকা দিয়ে ,
তুমি আমায় সাহায্য করো ।“
দাদা কোনদনই তা দেবার কথা –
অস্বীকার করতো না ।
প্রতিবারই তমি বড়ো আশা নিয়ে যেতে সেখনে ,
প্রতিবারই দাদা তোমাকে আশ্বাস দিতো ,
তুমি তাই বিশ্বাস করে চুপ করে থাকতে ,
ফিরে আসতে শূন্য হাতে ,
কিন্তু ফোঁটা দিতে যেতে ,
শুনতে না আমাদের বারণ ।
আজ সেই ভাতৃদ্বিতীয়া –
মা , আজ তুমি আর নেই ,
আমাদের মাঝে ,
তোমার ভাইকে আর ফোঁটা ,
দিতে যাবার মতো কেউ নেই ।
নেই কেউ তার কাছে –
নিজের প্রাপ্য চাইবার মতো ।
তোমার ভাই যে তোমার কথা ,
ভাবেনি একবারও তা নয় ,
এসেছিলো সে –
আমাদের বাড়িতে ,
শেষবারের মতো ,
টাকা দিতে নয় ,
তোমাকে শেষ বিদায় জানাতে –
তোমার শ্মশান-যাত্রী হিসাবে ।।
প্রতিভা দে
ঢেংঢেডাং
ঢেং ঢেডাং ঢেং ঢেং
আমরা নাচব তুলে ঠেং
আমরা করব নাকো ভয়
যে যত আমাদের শাসন করে কয়়
ওরে তোরা ঠিক হলে চল
করিস না এমন কিছু
যাতে মানুষের দুঃ হয়
করবিনা বিয়ে নিয়েপন.
চলবি নিজের ক্ষমতায়
প্রান আছে যতক্ষন
মানুষের মেয়েরে বিয়ে করে এনে
করবি না জ্বালাতন./
লাফিয়ে তারা বলে মানবনা আমরা
আমরা যা করার তা করব
আমার বোনটা মরে মরুক
আমরা উরুক্ক হয়ে চলব
দশ দিক প্রলয় করব/
কৌশিক কুমার রায়
আমার রাত্রি
রাত তখন বারোটা আট,
পালঙ্কে শুয়ে মুঠোফোনে নিবিষ্টতা l
হঠাৎ রিমঝিম বৃষ্টির নিনাদ,
মনে সোনালী ক্ষণের স্মৃতিকথা ......l
রাত যখন দুটো পাঁচ,
খিন্ন চোঁখে প্রতীক্ষা বার্তার l
বুজ্তেই অপারগ উষ্মান্বিত আঁচ,
তোমার আমার মাঝে কাঁটাতার .....l
এখন সবে ভোর পাঁচটা সাত,
মেঘের গর্জনে দিল সাড়া পাখির দল l
কলোসিটে খোলা চোঁখে একান্তের রাত,
অনেক হয়েছে,এবার ঘুমাবি চল .....l
মাম্পি রায়
চেনা পথের অচেনা মন
কল্প যত শত শত,
সুপ্ত নিজ মনে,
করিয়াছি দান,
পরার্থে পরাণ ;
মুক্তকচ্ছ রণে।।
পিপাসিত প্রাণ ;
অধরা স্বপন,
অভুগ্ন কায়াহীন;
নবীনা হৃদয়,
নব উল্লাসে;
সবুজ মরুদ্যান।।
শৌভিক কার্য্যী
চাওয়া-পাওয়া
কত কথা শুনে হয়েছি বড়ো
ছোট্টো থেকে মেয়েবেলায় ।
মেয়ে হয়েছে বলে মাকে
কাটাতে হত চরম অবহেলায় ।
কোনদিনও করেনি প্রতিবাদ
মুখ বুজে সব সয়ে যেত ।
রোজ রাতে দেখেছি বাবার হাতে
কত লাঠির আঘাত খেত ।
তবু রাতে স্বপ্ন বুনেছি
চোখের জলে ভেসে ।
মায়ের মতো লক্ষ্মী হবো
স্বামীর দ্বারে এসে ।
তবে পারিনি হতে আর
বাসর রাতে স্বামী দিয়েছে বেচে ।
অন্ধকার জগতের কুখ্যাত
নতুন এক দেশে ।
যেখানে কখনো আসেনা আলো
নেই কোন পালানোর পথ ।
অন্ধকুঠুরিকেই আকড়ে না জানি
কত মেয়ে নিয়েছে বাচার স্বপথ ।
লতা , ঝুমা , সোমা আজও
সবাই রয়েছে সাক্ষী ।
আমাদের মতো বাজারে বেচিত
কত কলঙ্কিনী লক্ষ্মী ।
সুস্মিতা দত্ত
স্মৃতির সন্ধান
তোমার সাথেই বেঁধেছিলাম আমি, আমার প্রাণ l
জীবনসাগর পাড়ি দিতেই আঁধার হলো ম্লান l
প্রথম দেখায় তোমার সেই মিষ্টি মুখের ছোঁয়ায় ,
সাতপাকের সেই সাতটি কথা মিশে আছে মায়ায় l
জীবন একাই দিচ্ছে পাড়ি তোমার স্মৃতি বয়ে ,
স্বপ্ন ; মনে বাজছে বড়ও, আজও তোমায় নিয়ে l
তুমি তো জানও ; সেই অজানা সাধনে ,
পেয়েছিলাম তোমায় আমি অক্লান্ত কাননে l
স্মৃতির বীণা বাজছে তবু , এ হৃদয়ের গোপনে ,
ছন্দমাতাল মন তা রেখেছে খুব যতনে l
তোমার অরূপ মূর্তিখানি আঁধার ও আলোতে ,
সে সাধনায় বাজাই বাঁশি ললিত বসন্তে l
সোনালী আভায় কাপে দিগন্ত ,অজানা উন্মাদনে ,
গানেরও তানে অচেনা ছোঁয়ায় ,তোমায় বেঁধেছি বাঁধনে l
তবু মন বলছে শুধু, নতুন সাজে সাজো ,
স্মৃতির বাঁশি নয়তো মনে বাজে বাজুক আজও l
সব হারিয়ে ফকির হয়ে কেনো পরশ খোঁজো ?
স্বপ্নমহল আশায় ভরা ! এবার চোঁখ মোছো l
মনকে না হয় বাউল করে একতারাতেই বাজো ,
স্মৃতির বাঁশি নয়তো মনে বাজে বাজুক আজও l