Friday, May 2, 2025


 

নববর্ষ তোমাকে 
কেতকী বসু

সকালের নতুন সূর্যের তাপ ছড়িয়ে পড়ে

ঘুম ভাঙা মোবাইলের সাথে

হাতের আঙুলের ভিতরে তখন
টাইপ এর বন্যা,সাজানো কারুকাজের ভিতর
তখন নিজেকে দেখার উৎসাহে
নির্মল আনন্দ হারিয়ে গিয়েছে
আমাদের সাজানো ঘরে
বাতাসের গুমোট অভ্যেসে

ভোরের উঠোনে তখনও কিছু ফুল ফুটে  থাকলেও
দেখার সুযোগ হারিয়ে চোখ চলে যাচ্ছে সমালোচনায়
আত্ম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাচ্ছে পড়ে থাকা বাসী থালা
উড়ো চিলের গলায় তখনো একই সুর
নৈব নৈব  করে পুজোর প্রস্তুতি সেরে
সাইরেন বাজে বি বি সি নোটিফিকশনে

আমরাও খুঁজে যাই সেই ছোট বেলার

নববর্ষকে।


 

রবি ঠাকুর

মাথুর দাস


রবি ঠাকুরের গানের সাথে

ঝিংকা ঝিকা নাচ,

হুল্লা হুলু আওয়াজ তুলে

ভঙ্গিমা কী ধাঁচ !


পর্দা ফাটে কানগুলির, আর

জর্দা খাওয়া ঠোঁটে

রবি ঠাকুরের গানের কলি

বিকৃতিতে ফোটে ।


এই তো এখন সংস্কৃতি আজ,

ইতি রবিয়ানার,

শুধু বাণিজ্যটি তাঁকে নিয়েই,

দিন গিয়েছে জানার ।


 

শুভ নববর্ষ 

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী (অমিত আভা)


পহেলা বৈশাখে নবপজ্ঞিকা হাতে 
          ছুটছেন পুরোহিত,
তার হাতেই একুশ শতকের ভাগ্যরেখা;

নিরাপত্তাহীন মেধার শরীরে জন্মাচ্ছে কালো ছত্রাক, 
অনিশ্চয়তার নীতির নয়া মোড়ক;

চিৎকার, রাগ, অভিমান সব মুছে গিয়ে 
শুধু পড়ে আছে ভয়;
ক্ষমতার আস্ফালনে নিশ্চিহ্ন মানবতার শিশু;

একে একে নিভছে আলো……

তবুও চৈত্র সেলের বাজারে শুভ নববর্ষ।



আমি সাতষট্টি কোটির কেউ নই 

উৎপলেন্দু পাল  



আমি সাতষট্টি কোটির কেউ নই 
নরকের দ্বারে যে দেখা হবে বাকিদের সাথে আমি নিশ্চিত  
যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থেকে থাকে 
আবার চুরাশি লক্ষ যোণি পরিভ্রমণ শেষ করে কোনো একদিন 
হয়তো এসে দাঁড়াবো প্রয়াগ সঙ্গমে 
হয়তো দেখা হয়ে যাবে এ জন্মের অবশিষ্ট কোনো পরিচিত মুখের 
আবার ভিড় বাড়াবো মোক্ষ প্রত্যাশায় 
তখন কত কোটির পেছনে লাইনে দাঁড়াবো কে জানে 
যদি একখানা ডুব দেওয়া হয়ে যায় 
স্বর্গের দ্বারে নিশ্চিত দেখা হবে এবারের সাতষট্টি কোটি মুখেদের সাথে। 


 

বৈশাখের দুই পাতা
এরশাদ 

আজ পহেলা বৈশাখ—
নতুন সূর্যের মলাটে লেখা
একটি অসমাপ্ত পৃষ্ঠা।

আমার বৈশাখ—
সব স্বপ্ন তিস্তায় ধুয়ে যায়,
কাঁদে রাত্রির মতো, নিঃশব্দে।

তোমার বৈশাখ—
আলপনায় আঁকা উজ্জ্বল সকাল,
মিঠে হাসিতে গন্ধ ছড়ায় শিউলি-স্মৃতি।

আমার বৈশাখ—
ধ্বংসের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া
একটা শিশু গাজার মাটি চেনে,
যার চোখে নেই রঙ,
শুধু ধোঁয়া আর ছিন্নপত্র বিস্ময়।

তোমার বৈশাখ—
কত রঙিন, কত হালকা…
কত স্বপ্ন, জ্যোৎস্নায় গড়া খামারে।

আমার বৈশাখ—
ফিলিস্তিনের নামহীন পথে
হেঁটে চলে যুদ্ধের ছায়া।

তবু আমি বৈশাখে ফিরে আসি—
একটি ফুল, একটি শান্তি,
একটি মানবিক সূর্য খুঁজতে।





 

আশ্রয়

অর্পিতা মুখার্জী


জীবনের সমস্ত পাওয়া-না পাওয়ার 
গোলমেলে হিসেব গুলো
কোনো এক অজানা কারণ হয়ে
নিঃসার্থে দেওয়ার কাছে আশ্রিত থাকে।
কিছু অস্পৃশ‍্যসম অদৃশ‍্য দাতারা কখনও 
কর্মের ক্লান্তিতে ফুরিয়ে যায় না...
দেওয়ার শেষে হিসেবের খাতা বন্ধ করে...
চোখের পাতায় ডেকে নেয় নীরবতাকে।
প্রতিটি ব‍্যর্থতাভরা দিনের প্রচেষ্টাগুলো 
প্রশ্নোত্তরহীন এক অন্তিম বিরতি চায়-
আঁধারঘেরা রাতের সান্নিধ‍্যে এসে
খুঁজে নেয় একান্ত নির্জনতা।
প্রতিটি নতুন উদীয়মান ভোরের আলো যেন
হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নপথের সবুজ দিশা হয়ে ওঠে,
ভেঙে যাওয়া আশাগুলো জুড়ে দিয়ে 
হয়ে ওঠে নতুন উদ‍্যমের প্রেরনাদাতা।
জীবনের পালাবদলের প্রতিটি সন্ধিক্ষনের 
অমূল‍্য সাক্ষী হয়ে থেকে যাওয়া
গুটিকয়েক সোনালী মুহুর্তযাপনের স্মৃতির কাছে 
মন বেঁচে থাকার আশ্রয় খুঁজে চলে বারবার...
পরম সেই মুহুর্ত বিজড়িত অনুমেয় চরিত্রগুলোই 
কখন যেন ধীরে ধীরে আপন ছায়ার মত
 হয়ে ওঠে একমাত্র এবং অন্তিম আশ্রয়দাতা।


 

লক্ষ্য 
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

বৈশাখী উৎসব এসে গেছে !
এবার আদিবাসী গ্রামের মেয়ে 
বউদের প্রস্তুতি সেরকম নেই!
বাস্তুহারার ভয়ে সবাই গড়ে 
জোটবদ্ধ প্রতিবাদ!
মাথার ছাদই যদি না রইল 
উৎসবের কি মূল্য!
বাতাসে দূষণের ইঙ্গিত 
উপেক্ষা করে চলে সরকারী 
জঙ্গল কাটার উদ্যোগ!
কয়লা খনি খোঁড়া হলে 
কাজ পাবার আশ্বাসে 
কিছু লোভীর মন ওঠে নেচে!
অন্যরা তাদের বোঝায় 
সবই ষড়যন্ত্র!
গাঁয়ের মোড়লের নেতৃত্বে 
সকলে গলা মেলায়!
এবার বৈশাখকে তারা বরণ 
করে নেবে নিজেদের পরিবেশ 
ও গৃহরক্ষার শর্তে!
উৎসব হবে সতর্ক জনগণের 
সংহতির লক্ষ্যে!

উৎসবের দিন যত বেশী মাদলের 
তাল বাজে, সরকারী তৎপরতা তত বাড়ে!
শাল মহুয়ার পাতায় পাতায় 
আদিবাসীদের অনুভূতি ছড়িয়ে আছে!
জঙ্গলের গভীরে  সম্মোহিত 
আদিম পরিবেশ ঘিরে 
সরকারী ব্যস্ততা! এক অবুঝ কিশোরী 
 তার বাবাকে বলে," গাছ, মাটি কেটে 
লেবে যারা, তুমি আগেই তাদের মাথাটো উড়াইয়ে দাও! 
এতে পাপ হবেক লাই! মাটি বাঁচালে 
আশীর্বাদ জুটবে!" 
বাপ মেয়ে দুজনেই ছল ছল চোখে চায়!
 দুপুরে ঝড় ওঠে!
মাটি ঢেকে যায় পাতায়! ধুলোর গাঢ় আবরণ
যেন আজ জঙ্গল, মাটির পরিত্রাতা!


 

নতুন ভোর

প্রাণেশ পাল 


বর্ষশেষের তপ্ত দহন 
বাঙালি খোঁজে শান্ত ছায়া,
গাঁয়ের ওই কৃষক বধূ,শ্রমিক মেয়ে,
বর্ষশেষের হিসেব কি আর রাখে ?
পথের ধারে করিম চাচা, কমলা মাসি,
নতুন বছরে কি এসে যায় !
লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত মেয়েটি
নতুন পোশাকে কি ঢাকবে ?

কালবোশেখীর হঠাৎ ঝড়,ক্রমশ অস্পষ্ট 
কর্মসংস্থান,সুখী গৃহকোণ !
অনিশ্চয়তার চাদরে জীবন, জীবিকা,
রাজপথে অনশন, অবস্থানে যোগ্য,অযোগ্য !

মানুষ হাঁটছে ধর্মের মিছিলে
স্বার্থান্বেষী ধর্মগুরুর হাতে সমাজের ভবিষ্যত, 
শিক্ষা,স্বাস্থ্য,উন্নয়ন,কর্মসংস্থানের মিছিল
মন্দির,মসজিদ,গীর্জা,গুরুদ্বার অভিমুখে !
প্রতিবেশীর বর্ণহীন রক্তে মানুষের উল্লাস, 
রাজনীতির মায়াজালে আবদ্ধ সমাজ,সভ্যতা,ভবিষ্যত !

বর্ষবরণের নতুন ভোরে খুঁজি
আমাদের বিবেক,মনুষ্যত্ব,চেতনা, 
মানুষের হাতে হাত রেখে মানুষের মিছিল
খুঁজে ফিরি নতুন বছরের নতুন ভোর !


 

কাঁদে প্রহ্লাদ 

আশুতোষ বর্মন


সব কিছু সরে গেলে

পরে থাকি বিন্দুতে।

আমার হাজার ভুলে

সব জল শেষ হলো

গালেরই রক্ত ধুতে।


আমারই তীব্র ভুলে

বিশ্বাস স্তম্ভ ভাঙে

তীক্ষ্ণ নখর তুলে

নৃসিংহ হয়ে উঠি

নিজেরই বক্ষ চিড়ে

সত্যের জানুতে।


সন্দেহ কুড়ে খায়

বধ করে সে আমায়

বেদনা রক্তপাত 

বিশ্বাস প্রহ্লাদ

অসহায় কেঁদে যায়

অসহায় কেঁদে যায়


 

বর্তমান পরিস্থিতি 
পাঞ্চালী দে চক্রবর্তী

চারদিকেতে  দেখছি  যে  আজ  প্রবল  হৈ-চৈ,
এই  অসময়ে  সৎ  মানুষেরা  চলে  গেলেন  কৈ?
মূল্যবোধের  অবক্ষয়ে জীবন  টালমাটাল ,
প্রতিকূল   পরিস্হিতিতে  জীবন  আর  চলবে  কত  কাল?
মুখোশধারীর  ছলা -কলায়  বিপদ  বাড়ছে  রোজ—
সৎ  মানুষকে  জড়ো  করতে  চলছে  তারই  খোঁজ।  
শিক্ষা-দীক্ষা,ন্যায় -নীতি   দিয়ে  বিসর্জন  ,
অসৎ  পথে  অর্থ  অনেক  করেছি  উপার্জন।  
মান  সম্পর্কে  হুঁশ   নেই  আমার -আমি  আবার  মানুষ !
মূল্যবোধকে  উড়িয়ে  দিয়েছি   ভরে  দিপালী  রাতের  ফানুস । 
যাকে  তাকে  যখন  তখন  দিতে  পারি  লাথি-
দুর্নীতি বাজ  গুন্ডাগুলোই  এখন  আমার  সাথী । 
ঠগবাজ ,প্রতারকদের  পাতা  সেসব  ফাঁদে,
অমূল্যধন  হারিয়ে  মানুষ  আজ  পথে  বসে  কাঁদে। 
সততা  আর  পরিশ্রমের মূল্য  যদি চাও—
মেরুদন্ড  সোজা  রেখে  নিজের  কাজটি করে  যাও। 
দুর্নীতি তে    জর্জরিত   জীবন  যখন  ক্লান্ত,
ন্যায়ের  কথা  মাথায়  রেখো,জীবন  হবে  শান্ত। 


 

নতুন বছরের অঙ্গীকার

কবিতা বণিক 


নতুন বছর নতুন ভাবে শুরুর হোক অঙ্গীকার।
দুঃখ-বেদনা হতাশার চিহ্ন মোছার হোক অঙ্গীকার।
সোহাগী আদর স্নেহস্পর্শে আগলানোর হোক অঙ্গীকার।
রঙিন জীবন আলোয় ভরা জীবনের হোক অঙ্গীকার।
শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের যন্ত্রণা লাঘবের হোক অঙ্গীকার।
সুস্থ মানসিকতা সুস্থ পরিবেশ রক্ষার হোক অঙ্গীকার।
আমরা নদী গাছপালা মাটিকে রক্ষার করছি অঙ্গীকার।


 

অযোগ্য 

মহঃ সানোয়ার 

ঝরে যাওয়া নিমফুল 
সময়ের কাল স্রোতে ভেসে যাওয়া
বর্তমান ও ভবিষ্যতের আর্তনাদ। 
যারা বঞ্চিত, যারা পীড়িত
তারা সবাই কি অযোগ্য?

এতগুলো বছর যারা
সমাজের চোখে সম্মান
নিয়ে বেঁচে ছিল, হঠাৎ করে
তাদের ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিলো।

মানুষ কি শুধুই খেলনা ? 
মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের কোন দাম নেই ?
রাজনীতির নোংরা কূটনীতির
বেঁড়াজালে বন্দী ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের জীবন!


 

শিল্পী- অলিপ্রভা পাটোয়ারি 





 

তোমার হাতে

মোহিত ব্যাপারী


তোমার চোখে প্রভাতবেলার সূর্য হাসে।
তোমার কন্ঠে প্রভাতফেরির সুর বাজে।
তোমার হাতে কান্না হাসির জাদু আছে।
তোমার হাতেই আমার সুখী জীবন সাজে।
রোদ বৃষ্টি ঝড় বাদলে যুঝছে জীবন,
শুকনো পাতায় যেমন বাতাস লাগে।
চোখ যখন বুজে আসে ধুলোর ঝড়ে
তখনও তুমি একলা দাঁড়িয়ে আমার পাশে।
পদ্ম যেমন পাঁকের গভীর থেকে মাথা তোলে
ফুল ফোটায় সে স্বচ্ছ জলে,
তেমনি তুমি জীবনটাকে সাজিয়ে দিলে
অনেক যুগের ধুলো ঝেড়ে।
এই জীবনের হাল ধরেছ 
পাগলা ঝোরার পথ এঁকেছ।
তোমার চোখে স্বপ্ন আঁকা তারার মেলা।
তোমার ঠোঁটে ছবি আঁকে অস্তরাগের গোধূলিবেলা।


 

ভালো থেকো

মিষ্টু সরকার


নেই-এর মাঝে আছে যতো আপন ;
তাকে নিয়েই থাকুক ভালো জীবন । 
নতুন ভোর নতুন সূর্য - চাঁদ ,
দিনশেষে বলে ভালো থাক ।
এ জীবন সুখ - দুঃখের ঘড়ঘড়া ,
নিশ্বাস আসে প্রশ্বাস যায় ছাড়া ।
ছাড়াছাড়ি বড়ই যেনো আপন 
ফেরার টানেই যেনো ছোটে জীবন 
ভালো আছি ! ভালো থাকার রণ ;
জীবন মানে, ভালো থাকার পন ।
গেছে যেদিন সেদিন ছিল ভালো, 
আগামীর পথে জোনাক জ্বেলে দিও।
থাকবো ভালো জীবন যেনো জল 
কচুর পাতা; হেমন্তে টলটল 
খুঁজতে থাকি অমল ভোরের তল, 
পায়ের গোছায় শিশির ধোয়া জল ।
যে পথ গেছে আলের রেখা বেয়ে 
অঘ্রাণে ধান মরশুমী নাম নিয়ে
কণায় কণায় লেখা জীবন পাত 
নবান্ন নাম আশার উৎসব ।
বিপরীতস্রোতে ভেসে চলে যায় যারা !
অলক্ষে ভাবি ! ওরা কি লক্ষ্য হারা?
এ জীবন ততোটা উপলক্ষের নয়
স্থির লক্ষ্যে অর্জুন মুখী হয় !
স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে দিলাম তরী
সুরের নাড়া বাঁধা সে দরবারী 
ভূমিকা আছিলায় পাওয়া জীবনটুকু ,
খুদকুঁড়ো হয়ে গাঁটছড়া বাঁধা শুধু ।
জয়তু জীবন ! ভবতু জীবন !
জীবনের হোক জয় !
হও জীবন রথের সারথী 
আজ নিজেকে  করো জয় ।।




কালনাগের ছোবল

রণজিৎ কুমার মুখার্জি 


বাংলার কথা ভাবলে 

ইচ্ছে করে মুখ অন্ধকারে লুকোতে ,
কারণ কবে থেকে শুরু হয়েছে 
ধ্বংসের ছন্দে পেট ভরানো বসন্ত উৎসব ।

হায়রে অতীশ ,দীপঙ্কর ,খনা ,বরাহ 
আর্যভট্ট ,মিহির ,বিবেকানন্দের সোনার বাংলা, সব অহংকার আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ ,
বঙ্গোপসাগরের তলায় ।

কাকে বলি এ লজ্জার কথা ?
কাল নাগের ছোবল খেতে খেতে,
আকন্ঠ বিষ পান করতে করতে 
আমরা আজ নীলকন্ঠ হয়ে গেছি ।

কাউকে হিন্দিতে বলবো ?
ইয়ে মেরা বংগাল অচ্ছা হায়?
সব আদমি ধোওয়া তুল্ সী পাতা ?

আজ আঠাত্তরের দরজায় দাঁড়িয়ে 
আত্মহত্যার স্পৃহা জাগে মনে,
 এত দুর্নীতিতে ভর্তি হয়ে যাবে
আমার বাংলা মায়ের আঁচল, ভাবিনি মাগো।


 

 দশক ঘুরে
 জুলি আখতরী

খুব বেশি নয়,

এক দশক'ই হবে!

মনে পরে খুব বছরের শেষ দিন।
কত তোড়জোড় আরম্বরহীন ।
নতুন কিংবা পুরানো পোশাক-আশাক।
বিকেলের সেই দল বেঁধে তোলা শাক।
গামছা কোমরে জড়িয়ে পরিপাটি ।
বেজোড় সংখ্যায় শাক তুলি আঁটি আঁটি।
তুলে ফিরতাম বাড়ির আনাচে কানায়।
কাকা দাদুদের যত্নে লালিত মাচায়।
নরম হাতে ডাল কুঁড়ি সব ছিঁড়ি
নাম না জানা কতনা গাছের কুঁড়ি।
মাঠের পরে ছড়িয়ে থাকা গাছগাছালি ।
মনে পরে আজও দুহাত ভরে নেয় তুলি।
শাসন বারন ছিলনা তেমন খুব বেশি।
গাছের পাতা যে যার মতো নেয় খুশি।
দশক ঘুরে অন্য রকম রূপের বাহার ।
যে যার জমি আগলে রাখে গড়ছে পাহাড়।
মাচার ডগায় ঝুলছে বড়ো লোহার তালা।
ঘেষলে কাছে পাহাড়াদারের খুব জ্বালা।
মা এখন আর রাঁধে না সেই শাক।
গরম ভাতে পান্তা ভাতের আশ।
সবাই এখন যে যার মতো করে।
নতুন বছর  আরম্ভর ভরে।
গায়ে নতুন জামা জুতোর রেশ।
দেখতে লাগে সবাইকে বেশ।


 

বৈশাখী উৎসব 
মজনু মিয়া 

তরু পল্লবে সবুজ কচি পাতার সমারোহ 
নববর্ষের নয়া বৃষ্টি ধারায় সবুজাভ ধরা,
স্মৃতির পাতায় বৈশাখ আমার খেলা করে 
পাতার বাঁশি টমটম নাগরদোলাতে চড়া।

মাঠে ঘাটে হাঁটে বৈশাখী মেলা বসে বিস্তর
হাতি ঘোড়া মুখোশ পরে আলোর নাচন,
আনন্দ আমোদে মেতে উৎসব কলরবে
বৈশাখী সাজে মানুষের জনজীবন বাঁচন।


 

 নতুনের ডাক
 প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী 

 নতুন সূর্য আলো দাও, 
 দিগন্তরেখায় নতুন ছন্দ; 
 বেঁচে থাকার নতুন আশা,
  নবারুণের আলোকে; 
  পুরোনো জীর্ণ দীর্ণ ঝরাপাতা
        সময় থেমে নেই-
  কোনো আতিশয্য বিনা,
  অগ্রগতির চাকাকে সচল করে,
          চলো সবাই,
        নতুনের ডাকে ।।


আঁধার পেরিয়ে বর্ষ বরণ
কনক চক্রবর্তী 

দুরভিসন্ধির নাগপাশে আবদ্ধ দমবন্ধ পরিবেশ
বাকসর্বস্ব চাতুরির মায়াজালে আচ্ছন্ন নবপ্রকাশ 
স্নেহসিঞ্চনে দুর্নীতির মহীরুহ আকাশ ছোঁয়া ।
নররূপী পোষ্যেরা আজ উদ্দাম লাগামছাড়া।
মৌন পৃথিবী - গুরু গম্ভীর,ম্লান,বিষন্ন !
কে সাজাবে বরণডালা ?
কি করে হবে বর্ষবরণ!
কলঙ্ক কালিমালিপ্ত বিগত নিশার তাণ্ডবে
দলিত মথিত যে ফুলের দল
সে ফুলমালায় হয় কি বরণ সফল!
যে ফুল অকালেই ঝরে গেল 
যে আশারা দুর্নীতির বেড়াজালে -
বেঁচে থাকার স্বপ্ন হারালো 
পারবে কি করতে স্বপ্ন পূরণ?
সফল হবে কি আর একটা বর্ষবরণ ?
তবু তুমি এসো -হে নববর্ষ 
চতুর্দিকে বাজুক তোমার জয়ডঙ্কা 
বিষাণে লাগুক প্রতিবাদী সুর 
কেঁপে উঠুক ধরার যতো অসুরের দল।
ধারা বর্ষণের প্লাবনে ভাসিয়ে নিয়ে যাও 
 মিথ্যা প্রতিশ্রুতি,অন্যায় অত্যাচারের আবর্জনা
প্লাবন বিধৌত নব মৃত্তিকায় 
অন্ততঃ একটি নাম না জানা 
সাদা ফুল প্রস্ফুটিত হোক 
অশ্রুজলে যার হবে না বিসর্জন
থাকবেনা কান্নার বেগ, রক্তের লাল দাগ,
দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা !
নতুন করে সাজবে তোমার বরণডালা
থাকবে সততার শ্বেত শুভ্র শঙ্খ 
প্রতিজ্ঞার উজ্জ্বল মঙ্গলদীপ
করবী চাঁপার সৌরভে নব পটভূমি ।
বিপ্লবের দীক্ষায় করবে তোমায় বরণ !

 

Saturday, April 5, 2025


 

হরিমাধবদার সান্নিধ্যে 

   দীপায়ন ভট্টাচার্য 


কিশোর বয়স থেকেই যখন কোচবিহারের বিশিষ্ট নাট্যজন নীরজ বিশ্বাস, কানন মজুমদার, ষষ্ঠী ভৌমিক এঁদের সংস্পর্শে এসেছিলাম, তখনই উত্তরবঙ্গের নাটকের আলোচনার সূত্রে বালুরঘাট ত্রিতীর্থের প্রাণপুরুষ হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের কথা বারবার উঠে আসত। তখনও নাটমঞ্চে তাঁর দেখা পাইনি — সে সুযোগ এসেছিল আরও পরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পর ১৯৮৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি আয়োজিত `নাট্য প্রশিক্ষণ শিবিরে` সুযোগ পেয়ে গেলাম শিক্ষার্থী হিসেবে। এর আগে আমাদের নাট্যসংস্থা ইন্দ্রায়ুধ-এর নিজস্ব পরিসরে কোনো কোনো বিশিষ্ট নাট্যজনের কাছে নাট্যচর্চার খুঁটিনাটি বোঝবার সুযোগও হয়েছিল, কিন্তু নাট্য আকাদেমির প্রশিক্ষণ শিবিরের অভিজ্ঞতা ছিল আরো বিস্তৃত। কোচবিহার, অবিভক্ত জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, তখনকার পশ্চিম দিনাজপুর এসব জেলার নাট্যশিক্ষার্থীদের নিয়ে সেই শিবির আয়োজিত হয়েছিল শিলিগুড়ির নবনির্মিত দীনবন্ধু মঞ্চে । তখনকার বাংলা থিয়েটারের মহীরুহদের অনেকেই প্রশিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন সেই শিবিরে। তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন সদাপ্রসন্ন হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। 

শুরু থেকেই সব প্রশিক্ষকের সাথে আমাদের গড়ে উঠেছিল দাদা-ভাইয়ের আন্তরিক সম্পর্ক। হরিমাধবদার নাট্যমেধা, নাটকের জটিল বিষয়কে সরল করে পরিবেশন করবার নৈপুণ্যের পরিচয় তখনই পেয়েছিলাম। ওই ভরাট গলায় নাটক পাঠ, তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মর্মবস্তু বিশ্লেষণ তখনই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলেছিল। সেই নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জোনের, সম্ভবত আরও তিনটি প্রশিক্ষণ শিবির থেকে, বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির কেন্দ্রীয় নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির হয়েছিল কোলকাতার গিরিশ মঞ্চে। সেখানে নির্বাচিত হয়ে আবার সুযোগ পেলাম বাংলার নাট্যনক্ষত্রদের কাছে নাটকের তত্ত্ব -তথ্য ও প্রয়োগের গভীরতর পাঠ নেবার। আবারও পেলাম হরিমাধবদাকে, গিরিশ মঞ্চেই দেখলাম বালুরঘাট ত্রিতীর্থ প্রযোজনা (সম্ভবত) "মন্ত্রশক্তি" নাটকে হরিমাধবদার মনোজ্ঞ নির্দেশনা ও অভিনয়। গ্রামীণ জীবনের নানা মিথ ও রিচ্যুয়ালের খুঁটিনাটি নিপুণভাবে উঠে এসেছিল সেই প্রযোজনায়। আর ছিল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মোক্ষম আঘাত — যা আজকের সমাজেও একটি প্রয়োজনীয় কৃত্য — উত্তরের থিয়েটারের অগ্রপথিক অভিভাবক হিসেবে হরিমাধবদা যে পথের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করিয়েছিলেন। 

এরপর চলে আসি ১৯৯১ সালের কথায়। সে বছর ২৭শে অক্টোবর থেকে ৪ঠা নভেম্বর কোচবিহার রবীন্দ্রভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির ও কোচবিহার জেলা নাট্যোৎসব। তখনও প্রশিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন হরিমাধবদা। আমি ছিলাম আয়োজকের একজন। সেই উপলক্ষে ৩রা নভেম্বর কোচবিহার জেলা পরিষদ হলে “সাম্প্রতিক বাংলা নাটকের গতিপ্রকৃতি” বিষয়ক আলোচনা সভায় সর্বশ্রী অরুণ মুখোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, হরিমাধব মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দন সেন, নৃপেন্দ্র সাহা, ড. দিগ্বিজয় দে সরকার প্রমুখের পাশাপাশি আমিও ছিলাম আলোচক হিসেবে। মনে পড়ে, সেই আলোচনায় তিনি এবং আমি মূলত উত্তরবঙ্গের নাট্যচর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। সেবার এঁদের কারও কারও সাথে হরিমাধবদা আমার বাড়িতেও এসেছিলেন। নিজগুণে অর্জন করেছিলেন আমার বর্ষীয়ান মায়ের স্নেহমিশ্রিত সম্ভ্রম। এরপর হরিমাধবদার সঙ্গে আবার আলোচনার টেবিলে দেখা হল ১৯৯৫ সালে আকাশবাণী শিলিগুড়ি কেন্দ্রে  “বাংলা থিয়েটারের দুই শো বছর” বিষয়ক আলোচনায়। অনুষ্ঠানটি অনেকের ভাল লাগার মূলে হরিমাধবদার বাচনিক নৈপুণ্য।

২০১১ অথবা ২০১২ সালে শিলিগুড়ি সংলগ্ন ফুলবাড়ি দূরদর্শন কেন্দ্রে আনন্দ ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় আমি আর হরিমাধবদা আলোচনায় আবার মগ্ন হলাম বাংলার থিয়েটার নিয়ে। সেই সময় প্রকৃতির সহজতার সঙ্গে থিয়েটারকে মিশিয়ে দেবার এক আগামী ভাবনার সংকেত তাঁর কথায় ধরা পড়েছিল। কিন্তু তার পূর্ণতার ছবি আর আমাদের দেখার সুযোগ হল না। হয় তো বয়সের প্রসারণ আরও  এগিয়ে যাওয়ার পথ আটকে দাঁড়াল। দীর্ঘদিন যাবৎ উত্তরবঙ্গের নাট্যচর্চার তথ্যানুসন্ধানের সূত্রে ২০১২ সালের ২৮শে অক্টোবর আমি নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলাম বালুরঘাট ত্রিতীর্থ নাট্যদলের প্রাণকেন্দ্র গোবিন্দ অঙ্গনে। হরিমাধবদা স্বয়ং সস্নেহে মধুর হেসে স্বাগত জানালেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন সংস্থার সম্পাদক কমল দাসের সঙ্গে। কাজ শুরুর আগেই ভরপেট জলযোগের আয়োজন করতে ভুললেন না। উৎসাহিত করলেন।  তারপর দীর্ঘ তথ্য সংগ্রহের মুখড়া ধরিয়ে দিয়ে তিনি মগ্ন হলেন নাটকের অন্য কাজে। অনুজ নাট্যযাত্রীকে কীভাবে উদ্দীপ্ত করতে হয় সেই প্রকরণ তিনি জানতেন। 

তাঁর চলে যাবার পর আমরা সেকথা বুকে ধরে রাখব। নাটকের সংগঠন, নির্দেশন, কথন, লিখন সব বিষয়েই সহজাত দক্ষতা ছিল তাঁর। তারই সাক্ষ্য বহন করে তাঁর নির্দেশিত ও বালুরঘাট ত্রিতীর্থ প্রযোজিত বিশে জুন, মন্ত্রশক্তি, দেবাংশী, জল, দেবীগর্জন প্রভৃতি নাটক। তাঁর কলমে নির্মিত আগাথা ক্রিস্টির রচনা অবলম্বনে দশপুতুল, মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে জল, এছাড়াও দেবাংশী, মাতৃতান্ত্রিক, পত্রশুদ্ধি, গোধূলি বেলায় প্রভৃতি নাটক সৃজনশীলতায় তাঁর কুশলতার কথা বহুদিন ধরে আমাদের বলবে। শুধু নিজস্ব সংস্থাতেই তো নয়, দুই দিনাজপুরের বা অন্য জেলার আরো কিছু নাট্যসংস্থার সম্পদ ছিল তাঁর রচিত বা নির্দেশিত কিছু নাটক। তিনি আজ আমাদের হাত ছেড়ে দিয়ে অজানা গন্তব্যে গেলেও, আমাদের অন্তর ধরে নেবে যে তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন, পাশে আছেন। 

Thursday, April 3, 2025


 

মুনা 

অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১


সম্পাদকের কথা 

কথায় বলে  ``The show must go on` পত্রিকা প্রকাশও সেই show-এর অন্তর্গত। নইলে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রের এই কালো দিনে পত্রিকা প্রকাশ করবার ইচ্ছে আদৌ ছিল না। কিন্তু মুজনাইয়ের অগণিত  প্রিয় পাঠককূল এবং শ্রদ্ধেয় লেখক-কবিরা অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই এই উদ্যোগ ইতিহাসের এক অন্যতম বিরল  দিনে।  এইভাবে এক লহমায় প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে যাওয়ার নিদর্শন এই বঙ্গে কোনও কালে ছিল না। কিন্তু মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আজ সেই দিনটিও দেখতে হল। এই ঘটনার জন্য কে দায়ি তা নিয়ে যথারীতি শুম্ভ-নিশুম্ভের বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমরা, সাধারণ মানুষরা, মনে করি, কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না। তবে ভাল কিছু ঘটলে যেমন তার কৃতিত্ব যায় শাসককূলের দিকে,  তেমনি খারাপ কিছু হলে তার দায় তাদের ওপরেই বর্তায়। নিঃসন্দেহে চাকরি নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। এই বিষয়ে কোনও বিতর্ক নেই। অন্যায় কাজকে ঠিক করবার উপযুক্ত সময় ও সুযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও কিছুই হয়নি। আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে যোগ্য প্রার্থীদের। চাকরি খোয়াতে হল তাদেরও। এখানেই সব চাইতে বেশি খারাপ লাগা। মর্মাহত হওয়া। কিন্তু তারপরেও রাজনীতির অলীক কুনাট্য দেখে ঘৃণা হচ্ছে। দেশের কাছেও যেমন রাজ্যের মুখ পুড়েছে, তেমনই আয়নায় নিজেদের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগছে। 


 মুনা 

অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১



রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


    এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা


বেলা দে,  শ্যামলী সেনগুপ্ত, অনিতা নাগ, বুলবুল দে, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, 

উদয় সাহা, দেবদত্তা বিশ্বাস,  গৌতমেন্দু নন্দী, মনোমিতা চক্রবর্তী, প্রদীপ কুমার দে, 

অন্বেষা মিত্র, শুভেন্দু নন্দী, আকাশলীনা ঢোল, শাশ্বত ভট্টাচার্য, তন্ময় ধর, 

নাহিদ সরদার, বর্ণজিৎ বর্মণ, জয়তী ব্যানার্জী, শ্যামল বিশ্বাস লামশ্যা,

প্রতিভা পাল, মাথুর দাস, অভিজিৎ সেন, উৎপলেন্দু পাল, শ্রাবণী সেনগুপ্ত,

তুহিন  কুমার  চন্দ,  সুপ্রভাত মেট্যা, মোঃ আব্দুল রহমান, প্রাণেশ পাল,

অর্পিতা মুখার্জী, দীপাঞ্জন দত্ত, সুনন্দ মন্ডল, পাঞ্চালী  দে  চক্রবর্তী,

চন্দ্রানী চৌধুরী, পাপড়ি দাস সরকার, মহঃ সানোয়ার, তপন মাইতি,

সৌরভ দত্ত, নবী হোসেন নবীন, মোঃ সৈয়দুল ইসলাম, 

আশীষ  কুমার  বিশ্বাস, প্রানতোশ রায়, মহসিন আলম মুহিন




অনলাইন চৈত্র  সংখ্যা ১৪৩১

 


 


স্মা র ক 

উদয় সাহা


আরো একটা চৈত্র ! শেষ দৃশ্য প্রায়। হাতের কাছেই সংক্রান্তি। অল্প কিছু দিন আর। ঘুলঘুলি দিয়ে নরম রোদ। আজ কেন ২০০১ সালের কথা গান হ'লো। মাধ্যমিকের বাধ্য ছেলে আমি। সামান্যতেই ঠান্ডা লাগার ধাঁচ। টিউশনি যাই বাবার কালো হাফ সোয়েটার পরে। বড়ো মামা একটা হাফ সোয়েটার দিয়েছে। সাদা। উলের। হাতে বোনা। ওটা পরে পরীক্ষা দিতে যাই। খুব শীত পড়লে স্কুলে যাইনা। বাবার সোয়েটার বড়ো হয়। মামার সোয়েটারও তাই। ভাবনাটা এমন ছিল যে, যত বড়ো সোয়েটার তত বেশি উষ্ণতা। আরাম। 

দেরাজে পুরনো পশম। দূরে বন। তারও দূরে বনপথ। যেটুকু আবছায়া, ততটুকু জুড়ে ফেলে আসা স্মারক। সোয়েটার। আরও সরু হয়ে আসা কৌণিক। চৈত্র মাসে রোদের অতিথি ওরা। যে রোদে লাল শাড়ি , যে রোদে খোলা চুলের দীঘল, সে রোদে লালন গান। ঐশ্বর্য। 



 

বেরুবাড়ী ও একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ

দেবদত্তা বিশ্বাস


 স্বাধীনতা পরবর্তী ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্র অঙ্কনে নিঃসন্দেহে জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত বেরুবাড়ী এলাকার ভারতভুক্তির আন্দোলন এক অনন্য জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের পাতায়।

        কোচবিহারের ভারতভুক্তির পর র‍্যাডক্লিফ লাইনের পার্শ্ববর্তী ছিটমহল গুলির অবস্থান ধীরে ধীরে এক জাতীয় সমস্যার আকার ধারণ করে।জলপাইগুড়ি জেলার বৃহত্তম মৌজা বেরুবাড়ীতেও দেখা যায় একই সমস্যা।১০ নং নগর বেরুবাড়ী ও ১১ নং খারিজা বেরুবাড়ী ছাড়া ১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নের অবস্থান এমন দাঁড়ায় যে চিলাহাটিকে যদি পূর্ব পাকিস্তান নিজের দখলে নেয় তবে ভারত থেকে ঢোকার একমাত্র পাকা রাস্তাও পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাবে।১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নে চারটি ছিট মহল যুক্ত হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের লোলুপ দৃষ্টি এই অঞ্চলে বাড়তে থাকে।এদিকে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত 'ব্যাগে ট্রাইব্যুনালে' অন্যান্য অঞ্চলের নাম উল্লেখ থাকলেও বেরুবাড়ী অঞ্চলের সীমান্ত সমস্যার উল্লেখ হয়নি।স্বভাবত,পাকিস্তান একসময় 'লড়কে লেঙ্গে বেরুবাড়ী' বলে হুমকি দেয়।এবং ১২ নং বেরুবাড়ী ইউনিয়নকে নিজের বলে দাবি করে।পূর্বতন চার হাজার ও উদ্বাস্তু হয়ে উঠে আসা আট হাজার নাগরিকের নাগরিকত্বের সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়ায়।এদিকে ঐতিহাসিক নেহেরু নুন চুক্তিতে বেরুবাড়ী সমস্যার সমাধান হয়েছে বলা হলেও কিছু বিতর্কিত বিষয় সামনে উঠে আসে।যার ফলে সমস্যা সমাধানের চাইতে নাগরিকদের মধ্যে বিভিন্ন মতামতের সৃষ্টি হয়।

            এমত অবস্থায় ১৯৫৮ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর,১২ নং বেরুবাড়ীর মানিকগঞ্জে নেহেরু নুন চুক্তি বাতিলের দাবিতে তৈরি হয় বেরুবাড়ী প্রতিরক্ষা কমিটি।জনমত নির্বিশেষে সবদলের লোক একসাথে মিলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একই মঞ্চ থেকেই নিজেদের দাবিতে সোচ্চার হোন।ঐতিহাসিক বেরুবাড়ী আন্দোলনের প্রথম পর্বে(১৯৫৮ থেকে ১৯৭৪ সাল)ভারতীয় সংবিধানের ব্যাখ্যা,ভারতীয় নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা,পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা ও লোকসভার ভূমিকা,জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বেরুবাড়ী হস্তান্তর স্থগিত হয়ে যায়।

             ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে।বেরুবাড়ী আন্দোলনের ইতিহাসে যুক্ত হয়ে এক পালক।ইন্দিরা মুজিব চুক্তির মাধ্যমে বেরুবাড়ীকে ভারতের সাথে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

             ইন্দিরা মুজিব চুক্তিতে বেরুবাড়ীর প্রতিকূল এলাকাগুলির অবস্থান নির্দিষ্ট করে বলা হলেও বাস্তবে তার রূপায়িত হয়েছিল না।১৯৮৯ সালে দক্ষিণ বেরুবাড়ীস্থিত প্রতিকূল অবস্থান গুলিতে বাংলাদেশ খুঁটি স্থাপনের মাধ্যমে এগুলিকে নিজের এলাকার অন্তর্ভুক্ত করায় দক্ষিণ বেরবাড়ীর নাগরিকবৃন্দ আবার আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন।এতে আবার নাগরিকবৃন্দের ভিটে মাটি হারানোর প্রশ্ন দেখা দেয়।তাছাড়াও কিছু সরকারি সম্পত্তির চিহ্নিতকরণ দুই দেশের মধ্যে অনির্দিষ্ট হয়ে যায়।এরপর বছরের পর বছর এই নিয়ে চলতে থাকে নানা আন্দোলন।বেরুবাড়ী আন্দোলনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।একটি ছিল ভারতীয় ভূখণ্ড পাকিস্তানকে না দেওয়ার প্রসঙ্গ দ্বিতীয়টি ছিল বাংলাদেশের মানচিত্রে দখলিকৃত ভূখণ্ড গুলিকে পুনরায় ভারতে অন্তর্ভুক্তির দাবি।

           এরপর ২০০৫ সাল ,২০০৬ সাল, ও ২০১১ সালে নানা সময় কেন্দ্র থেকে প্রতিনিধি দল ও মন্ত্রীরা আসেন এবং এই অঞ্চল পরিদর্শন করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।বেরুবাড়ী প্রতিরক্ষা কমিটির সাথেও আলোচনায় বসেন।

           অবশেষে ২০১১ সালের ছয় সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয় দেশের অন্যান্য সমস্যা সহ ছিটমহল বিনিময়, প্রতিকূল অবস্থান এলাকা নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন।ভারতের পক্ষে বিদেশ মন্ত্রী শ্রী সালমান খুরশিদ, বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রী শ্রীমতি দীপু মনি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মিলিত হয়ে ভারত বাংলাদেশ স্থল সীমানা বিষয়ে 'মনমোহন হাসিনা' চুক্তিকে অনুমোদন দেন।এর ফলে ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল ও প্রতিকূল অবস্থান সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান হয়।জলপাইগুড়ি জেলার প্রশাসনিক মানচিত্রে ঘটে একটি বিরাট পরিবর্তন।

            সার্থক হয় বেরুবাড়ী আন্দোলন।বেরুবাড়ী আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় ইতিহাসে চলা সংগ্রামী নাগরিকদের অসাধারণ অবদান।বেরুবাড়ী ইউনিয়ন অধুনা দক্ষিণ বেরুবাড়ীর ভারত অন্তর্ভুক্তির আন্দোলন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বহু যুগ ধরে।