Sunday, September 1, 2024


 

কলকাতা তিলোত্তম শহরের জীবন বড্ড উত্তাল
বটু কৃষ্ণ হালদার

এত দিন জানতাম পশ্চিম বঙ্গ কাঠমানি,শিক্ষা দুর্নীতি, কয়লা গরুর রেশন চুরি, সন্ত্রাসবাদী, বোমাবাজি, অযোগ্য অশিক্ষিত নেতাদের আখড়া। সেই খবর ছাড়িয়ে এবার সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এলো আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ কান্ড। ঘুমের মধ্যে এক তরুণী চিকিৎসকের উপর শারীরিক নির্যাতনের পর চালানো হলো হাড় হিম করা পাশবিক অত্যাচার। ভেঙে ফেলা হয় গলার হাড়,দুই চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে সারা শরীর জুড়ে রয়েছে ক্ষতের চিহ্ন,যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত,ঝরছে তাজা তাজা রক্ত। হাসপাতালে তরুনী চিকিৎসকের উপর যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে তা দিল্লির নির্ভয়া কান্ডের ছায়া পরিষ্কার। এখন প্রশ্ন কোন সভ্য সমাজের মানুষ দ্বারা এমন নৃশংসতা ঘটানো সম্ভব?যে এমন কান্ড ঘটিয়েছে সেই অপরাধীর বেঁচে থাকার কি কোন অধিকার আছে?

২০১২ সালে ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লির বুকে চলন্ত বাসের মধ্যে কলেজ পড়ুয়া তরুণীকে ধর্ষণ করার পর নির্মমভাবে হত্যা করে চলন্ত বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে ফেলে দিয়েছিল সভ্য সমাজের বুকে এক শ্রেনীর রক্তচোষা হায়নারা দল।যে মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনায় অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল সমগ্র ভারতবর্ষের জনগণ। ভারতবর্ষে জুড়ে মোমবাতির মিছিল নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল।দফায় দফায় আন্দোলনের ফলে প্রায় দীর্ঘ সাত বছর পর অপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হয়। তাতেও নারীদের উপর  শারীরিক ও পাশবিক অত্যাচারের সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে। ২০১২ সালে নির্ভয়া ধর্ষণ  ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত হলেন আইনের রক্ষাকারী হিসাবে পরিচিত এক সিভিক ভলেন্টিয়ার। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে আইনের রক্ষাকারী যদি রক্ষক হয়ে ওঠে তাহলে সাধারণ নিরীহ জনগণ কোথায় আশ্রয় নেবে?কথায় আছে বন্যেরা বনে সুন্দর/শিশুরা মাতৃক্রড়ে।ঠিক তেমন ভাবে জনগণের সুরক্ষার দায়িত্ব আইন রক্ষাকারীদের হাতে। কিন্তু আইনের রক্ষাকারী ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। দিনে দিনে কোথায় নামছে আমাদের সমাজব্যবস্থা?

ডাক্তার হলো ভগবানের এক রূপ। দেশের লক্ষ কোটি জনগণ ডাক্তারের ছোঁয়ায় দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে নতুন জীবন লাভ করে। অথচ শিক্ষা, দীক্ষা,সভ্য সাংস্কৃতির মিলনস্থল তিলোত্তমানগরী কলকাতার বুকে আরজিকর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের উপর শারীরিক ও পাশবিক অত্যাচারে সমাজের বুকে পুনরায় হাজার প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে গেল?

আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা নমনীয় ও ভঙ্গুর তা বারবার প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা জঘন্যতম অপরাধীদের মনে এতোটুকু ভয় ধরাতে পারেনি। কারণ এই দেশের আইন ব্যবস্থা বড় লোকদের কাছে যেমন খোলা আকাশ, তেমনি গরিবদের কাছে মাকড়সার জাল। জঘন্যতম অপরাধ ও ধর্ষণের মতো অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েও রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা-নেত্রীদের প্রশ্রয়ে  বেড়ে ওঠা হায়নারা টাকার জোরে ছাড়া পেয়ে যায়। আর মাকড়সার যাঁতা কলে পিষে মরতে হয় ধনঞ্জয়দের মত নিরীহ,গরিব অপরাধীদের। যাবজ্জীবন জেল খাটার পরেও ধর্ষণে অভিযুক্ত ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বের সংবিধানে বিরল ঘটনা।এক্ষেত্রে আরো প্রমাণ হয়ে যায় আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা একদিকে যেমন  বজ্র আঁটুনি, তেমন অপরদিকে ফোসকা গেরোর মত।

পশ্চিমবাংলার হতদরিদ্র অসহায় জনগণের কাছে সরকারি হাসপাতাল হল  লাইফ লাইন অন্যদিকে আতঙ্কের এক নাম। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরম পর্যায়ে সাধারণ জনগণকে বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে যেতে হয় চিকিৎসা করানোর জন্য। সরকারি হাসপাতাল মানে ফ্রিতে পরিষেবা।নেতা-মন্ত্রীদের ইশারায় দালাল চক্রের আধিপত্যে টিকিটের লাইন থেকে শুরু করে রোগী দেখানো,ওষুধ নেওয়া,বেড পাওয়া এমন কি অপারেশন হওয়া পর্যন্ত হাজার হাজার টাকার খেলা চলে। শিক্ষা ক্ষেত্রে যেমন টাকা দাও আর চাকরি নাও, ঠিক তেমনি সরকারি হাসপাতালে টাকা দাও আর লাইন ছাড়াই ডাক্তার দেখাও এমন নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করবেন কাকে? নিচতলা থেকে শুরু করে হাসপাতাল সুপার পর্যন্ত সবাই দুর্নীতির বেড়াজালে ডুবে আছে।তার উপর আছে নেতা,মন্ত্রীদের চোখ রাঙানো।যারা দালাল চক্রকে খুশি করতে পারেনা রোগী নিয়ে এ হাসপাতাল থেকে সে হাসপাতাল ও টেবিল থেকে এ টেবিল ঘুরতে ঘুরতে বহু রোগী এভাবে বিনা চিকিৎসা মারা যায়। সরকারি হাসপাতালগুলোকে সুপার মডেল তকমা দেওয়া হলেও কোন নেতা,মন্ত্রী কিংবা তাদের পরিবারের কাউকে  দেখেছেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে? জনগণের টাকা লুটপাট করে বেসরকারি হাসপাতালে নিজেরা চিকিৎসা করান  আর জনগণকে বলেন যমপুরি নামক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে।

বিগত ১০-১৫ বছরের পরিসংখ্যানটা দেখলে বোঝা যায় পশ্চিমবাংলার বুকে প্রতিভাবান ছাত্র-ছাত্রীদের উপর অত্যাচারের সংখ্যা যেমন বেড়েছে। নির্ভয়া কাণ্ডের মতো হাজার হাজার তরুণী থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া স্বপ্নদ্বীপের মৃত্যু আমাদের বিবেকবান সমাজের ভিত কে নড়িয়ে দিতে পারেনি আজও। অথচ বলা হচ্ছে যুবসমাজ দেশের উজ্জল ভবিষ্যৎ। আগামীর কান্ডারী।যাদের চিন্তাধারায় দেশের পরিকাঠামো বদলাবে, দেশ উন্নত হবে এবং বিশ্বের কাছে দেশের উন্নত,উজ্জ্বল পরিকাঠামোর জন্য গর্ববোধ হবে।

স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু অফিস ঘাট,কলকাচারি, জল, স্থল, অন্তরীক্ষে এমনকি দেশের হয়ে পদক জেতা পর্যন্ত নারীদের অবদান একেবারেই অনস্বীকার্য। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন:_  বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। বর্তমানে যেভাবে সমাজের বুকে নারী ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে তাতে এ বাণী  খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ পড়েছে।যে নারী কুমারী রূপে পূজিত হয়, সেই নারী আজ প্রতি পদে পদে ধর্ষিত,লাঞ্ছিত,উপেক্ষিত অত্যাচারিত। আজ দুধের শিশু থেকে মাঝ বয়সী,এমনকি ষাটউর্ধ্ব নারী ও আজ বেয়াব্র। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার নারীদের জন্য হাজার প্রকল্প তৈরি করেছে। কিন্তু নারী সুরক্ষার ব্যবস্থায় আজও কোনরকম সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। পারবে কি করে? শুধু আইন ব্যবস্থায় নয় রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের দ্বারা ও নারীরা লাঞ্ছিত,ধর্ষিত। যারা দেশের জনগণের সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তারা কিভাবে ভক্ষক হয়ে ওঠে? যেভাবে আমাদের ভারতবর্ষে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে শুরু করেছে তাতে ভারতবর্ষের জনগণ যদি বাংলাদেশের মতো রাস্তায় নামতে বাধ্য হয় তাহলে সে আগুনের শিখায় হাজার হাজার অত্যাচারী, ক্ষমতাশীল প্রভাবশালী আইনের রক্ষাকারী হোক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রী পুড়ে মরবে তা বলা বাহুল্য।মনে রাখবেন সব অত্যাচারের একটা শেষ সীমারেখা আছে। আর দেশের জনগণ যদি একবার রাস্তায় নেমে আসেন তাহলে কোন প্রধানমন্ত্রী,রাষ্ট্রপতি পুলিশি ব্যবস্থা একেবারেই অকেজ হয়ে যাবে। তার জ্বলন্ত নমুনা এই মুহূর্তে বাংলাদেশ।

আর জি করের ঘটনায় সমস্ত হাসপাতালগুলো জুড়ে ডাক্তাররা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে। তার প্রভাব হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার দেখাতে যাওয়া অসহায় মানুষগুলোর উপর পড়বে তা বলা বাহুল্য। তবে তাদের প্রতিবাদ করাটাই স্বাভাবিক। রাজ্যের সমস্ত ডাক্তাররা একটা পরিবারের মত। আজকে একজন জুনিয়ার ডাক্তারের সঙ্গে এমন ঘটেছে আগামীকাল অন্য কারো সঙ্গে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে কি? সেই সঙ্গে যারা এই মুহূর্তে ডাক্তারি পড়ার চিন্তাভাবনা নিয়েছেন তারাও কিন্তু আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে? কোন পিতা-মাতা সন্তানদের জীবনের সঙ্গে আপোষ চাইবে না নিশ্চয়ই। আতঙ্কের কারণে যদি কেউ ডাক্তারি পড়তে না চায় তাহলে বুঝতে পারছেন কি অবস্থা হতে পারে? তাই কঠোর নিরাপত্তার বিষয়টা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাতেই হয়তো ফিরবে গণতান্ত্রিক সচল অবস্থা।

তবে এই ঘটনার একটা সুস্থ সমাধান হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অপরাধীদের কঠিনতম শাস্তি পাওয়াটা খুবই জরুরী।নইলে ডাক্তাররা যদি দীর্ঘদিন এভাবে কর্ম বিরতির ডাক দিয়ে থাকেন তাহলে সমাজ কিন্তু উল্টো পথে হাঁটবে,সেই সঙ্গে কলকাতা লাশের নগরীতে পরিনত হবে। দোষীদের কঠিন শাস্তি হোক,এমনটা আমরা সবাই চাই। তবে শুধু আরজিকরের ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি দিলেই সমাজ ধর্ষণমুক্ত হবে এমনটা নয়। কারণ আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে এমন বহু ধর্ষক ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের চিহ্নিত করা খুবই প্রয়োজন।এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার নির্ভয়া কান্ডে দোষীদের ফাঁসি হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে।


 

আমার শহর
অনিতা নাগ 

ট্রেনের ফার্ষ্টক্লাস কুপে তখন তারা দু'জন।  দুর্রন্ত গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন। জম্মুতাওয়াই এক্সপ্রেস। জানলায় চোখ রেখে আনমনা সেই মেয়ে। বহুদিনের বহু বাধা পার হয়ে তাদের বিয়ে। কতো লড়াই,  কতো বিরোধ,  কতো বাধা। শেষ পর্য্যন্ত জয়ী হয়েছে তাদের ভালোবাসা। এখনো স্বপ্নের মতো লাগে। হাতের শাঁখা-পলা, সিঁথির সিঁদুর মনে করিয়ে দেয় আজ এটাই সত্যি। আজ তারা দুজন চলেছে তাদের জীবনের নতুন সফরে। তার প্রিয় শহর কলিকাতা থেকে অনেক দূর, সুদূর উত্তরপ্রদেশের এক ছোট জনপদে। হ্যাঁ, তখন সেই শহরের নাম ছিলো কলিকাতা। তখনো পিনকোড যোগ হয় নি। বাড়ীর ঠিকানায় বড় বড় করে লিখত কলিকাতা।

অন্য শহর সম্বন্ধে অতো জানা ছিলো না সেই মেয়ের। জানার ইচ্ছেও ছিলো না। তার প্রিয় সেই শহরে প্রাণ ছিলো, গান ছিলো, খোলা হাওয়া ছিলো। পাড়ায় কাকা, জেঠা, দাদুরা ছিলেন। জেঠী, কাকী, ঠাম্মারা ছিলেন। শাসন ছিলো, সোহাগ ছিলো। গাদী,  পিট্টু খেলা ছিলো,  তেঁতুল চুরি করে খাওয়া ছিলো। দাদাদের সাথে সূতোয় মাঞ্জা দেওয়া ছিলো, লাটাই ধরা ছিলো, তুবড়ির মশলা করা থেকে পোড়া বাজি তুলে এনে সেই মশলা দিয়ে ছূঁচো বাজি করে পোড়ানো, সবটা ছিলো। দুর্গা পূজোর প্যান্ডেলের বাঁশ পড়লেই সব খেলা ভুলে প্যান্ডেল তৈরী দেখা ছিলো, বাঁশ ধরে দোল খাওয়া ছিলো। আরো কতো কিছু ছিলো কলিকাতা শহরে। ভাদ্রের এমন দিনে শরতের আকাশ সেদিন’ও এমন আলো হয়ে থাকতো, কখনো এক পশলা মেঘ এসে ভিজিয়ে দিতো চারদিক। শরতের আকাশে তুলোর মতো মেঘ জমতো। ছোটবেলায় ভূগোলে  অনেকরকম মেঘের কথা পড়েছিলো। এই তুলোট মেঘের কথা কখনো ভুল হতো না সেই মেয়ের।

কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। নিমেষে দূরে হারিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে গ্রাম। সবুজ গালচের মতো শষ্যক্ষেতকে পিছনে ফেলে ছুটে চলছে ট্রেন। ট্রেন যতো এগোচ্ছে ততো দূরে চলে যাচ্ছে তার শহর কলিকাতা। আজন্ম লালিত পালিত এখানে। তার প্রাণের শহর। বাংলা তার প্রাণের ভাষা। প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। তিনিও তো রয়ে গেলেন আলমারীর তাকে। পড়ে রইলো হারমোনিয়াম,  ঘুঙুর, প্রিয় গল্পের বই, রয়ে গেলেন মা, বাবা, বন্ধুরা।

ট্রেনের কুপে কেউ বিরক্ত করার নেই।  একটা রঙচঙে ট্রাঙ্ক, তিনটে সুটকেস, একটা হোল্ডঅল, জলের জায়গা,  এই সব নিয়ে সেই মেয়ে চলছে নতুন সংসার সাজাতে।  পথটা অনেক দূর তার শহর থেকে।   ক্রমশঃ তার শহর দূরে সরে যাচ্ছে। কতো শহরকে ছুঁয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন। নতুন  নতুন শহর। নতুন ভাষা। যতো দূরত্ব বাড়ছে তার শহর থেকে,  ততোই সেই মেয়ের বুকের মধ্যে উথাল পাথাল করছে। তার প্রিয় শহর, হাওড়া ব্রীজ, গঙ্গা, তাদের বাড়ীর ছাদ সব যেনো জড়িয়ে ধরছে সেই মেয়েকে।  সন্ধ্যেবলায় তুলসীতলায় প্রদীপ হাতে তার মা’র চেহারাটা সামনে এসে দাঁড়ালো। কতো কথা হুড়মুড় করে জড়িয়ে ধরলো সেই মেয়েকে। নতুন সংসারের স্বপ্ন আর দু'চোখে হাজার প্রশ্ন নিয়ে এগিয়ে চললো নতুন যাত্রাপথে। শুরু হলো সেই মেয়ের জীবনের নতুন পর্ব।

সেই প্রথম তার নিজের শহর থেকে দূরে যাওয়া সেই মেয়ের। নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলা। মনে পড়ে প্রথম যখন তার শহরে ফিরলো সেই মেয়ে খড়্গপুর আসার পরে অপেক্ষা আর শেষ হয় না। তারপর ট্রেনের জানলা দিয়ে হাওড়া ব্রীজ দেখে সে কি আনন্দ। তার প্রিয় শহরকে যেনো নতুন করে পেয়েছিলো।

তারপর দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। ততোদিনে কতো পালাবদল ঘটেছে প্রিয় শহরের। কলিকাতা থেকে কলকাতা হয়েছে। পিন কোড যোগ হয়েছে।  হারিয়ে গেছে পোষ্টকার্ড, ইনল্যান্ড এর রূপকথারা। হারিয়ে গেছে ট্রাঙ্ককল, টেলিগ্রামের জমানা। ল্যান্ডফোন প্রায় অবলুপ্তির পথে। নতুন প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ছুটে চলা। চৌত্রিশ বছর পর যে শহরে ফিরলো সেই মেয়ে, তা একেবারে আমূল বদলে গেছে। বদলটা এতো বেশী যে নিজেকে মানিয়ে নিতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিলো সেই মেয়েকে। সেই বদলে যাওয়া শহরে কেটেও গেলো বেশ অনেকগুলো বছর। ইচ্ছে হলেও জায়গা বদলের উপায় নেই। সবই আছে, তবু আজ  ভালোবাসার শহরে দম বন্ধ হয়ে আসে। কান পাতলে নিঝুম রাতে কল্লোলিনীর কান্না শোনা যায়। গুমরে কাঁদে আজ তার ভালোবাসার শহর কলকাতা। এতো জাঁকজমক, এতো আভরণের আড়ালে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। চারদিকের কংক্রীটের ভীড়ে আকাশকে ছুঁতে পারেনা। কল্লোলিনী আজ নিজেকেই চিনতে পারে না। বদলে যাওয়া জীবনের চাপে, রঙ মেখে, সঙ সেজে সে বয়ে নিয়ে চলে আমার ভালোবাসার শহরকে।  যা হারিয়ে যায় তাকে সযতনে আগলে রাখে সেই মেয়ে। কল্লোলিনীর কানে কানে বলে ভালো থেকো আমার প্রিয় শহর। জগত সভা আবার তোমার আলোয় আলোকিত হবে একদিন। সেই অপেক্ষায় থাকে সেই মেয়ে।


 

শহর ও গ্রাম : এক অদৃশ্য কাঁটা তারের বেড়া 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

আপনি মন্দিরের ওপরে উঠুন বাবু,  সেখান থেকে ভালো ছবি তুলতে পারবেন। 

 পিছনে ফিরে দেখলাম আশি উর্ধ একজন বয়স্ক মানুষ, তার দুই চোখে জলের ধারা।
জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ীতে চলছে মনসাপূজার মেলা রাজবাড়ীর দুর্গোৎসবের মতোই জনপ্রিয় এই মনসাপূজা। রাজবাড়ী দিঘির ধারেও শিবের মন্দির সংলগ্ন   অম্বিকা মায়ের মন্দিরেও মা মনসার মূর্তি রয়েছে। সেখানেও চলছে মনসাপূজা।  বৈকুন্ঠপুরের প্রধান আরাধ্য দেবতা হলেন বৈকুন্ঠ দেব অর্থাৎ দেবাদিদেব মহাদেব বা শিব। শিবের মানস কন্যা পদ্মাই হলেন মা মনসা। প্রায় পাঁচ'শ বছর ধরে শ্রাবণী সংক্রান্তিতে এই পুজো হয়ে আসছে। মহাদেবের বড়ো কন্যা নেতা। এই মন্দিরে তাঁর বিগ্রহ ও সাড়ম্বরে পুজো করা  হয়। 

শহর, শহরতলী এবং দূর দুরান্ত গ্রাম থেকে মানুষ আসেন এই মেলায়। প্রায় সাত দিন ধরে চলে এই মেলা তবে  তিন দিন খুবই জমজমাট থাকে এবং ভিড় উপচে পড়ে। 
দূর্গা দেউল সংলগ্ন মনসা মন্দিরের চাতালের ওপরে বেহুলা লখিন্দরের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।  মনসা মঙ্গলের গানের তালে তালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে  বিয়ের অনুষ্ঠান। শ'য়ে শ'য়ে মানুষের ভিড় ঠেলে   মন্ডপে উঠে দেখলাম আমি ছাড়া সবারই চোখে জল। তারা সবাই আবেগঘন মুহুর্তের আবেশে ডুবে রয়েছেন।  আমি গোটা কয়েক ছবি তুলে নামতেই দেখা হল মন্দিরের পুরহিত শিবু  ঘোষালের সাথে।  তিনি জানালেন আজ এখানে উপস্থিত  সকলেই বেহুলা লখিন্দরের বিয়ে উপলক্ষে পাত পেড়ে খেয়েছে। ভিড়ের মধ্যে একজন বলে উঠলো, "আপনারা শউরে বাবু এর মর্ম বুঝিবেন না হয়।" 

ইতিমধ্যে এককাপ ধূমায়িত চা আমার সামনে চলে এসেছে। সেটা কার ঈশারায় বলতে পারব না। ধীরে ধীরে মেলায় জনসমাগম হচ্ছে।চলছে আদর্শলিপি, বর্ণ পরিচয় ধারাপাত থেকে  ঘর গৃহস্থালীর নানান সামগ্রী।  জলপাইগুড়ি  রাজবাড়ীর যে দিকটায় জনশূন্য এবং হোয়াইটওয়াস করা হয় না, সেখানে একটা চেয়ারে বসে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন আমরা নিয়ম মেনে  মনসা পুজোর উপোস করি। কিন্তু শহরের মানুষ আজ বেশি করে  বিরিয়ানি খাবে। সব থেকে বড়ো কথা  শিবচতুর্দশীর  দিন "রাজি বিরিয়ানির " দোকানে রাত ১২ টায়ও একবার বিরিয়ানির হাঁড়ি চাপাতে হয়। আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। ভদ্রলোক বললেন আমরা গ্রামের মানুষ টেলিভিশন দেখি না। কারণ টেলিভিশন বড়ো লোকের। টেলিভিশনের খবরে কখনো দ্রব্য মূল্য নিয়ে খবর হয় না। অনেক জটিল কুটিল গল্প নিয়ে ধারাবাহিক আর দামী দামী ভোগের জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধের খবরে আমাদের মতো গরীব মানুষের কি লেনা দেনা? এই যুদ্ধ  চলাকালীন বাজারের পঁচাত্তর টাকার ছাতুর প্যাকেট নব্বই টাকা হয়ে গেল। সরষের তেলের প্যাকেট কেউ নিচ্ছে একশো দশ টাকা তো কেউ নিচ্ছে একশো চল্লিশ টাকা। কেউ জানতে চায় না জিনিসপত্রের  দাম এমন উর্ধমুখি কেন। কেন এক দোকানের ৩৫ টাকার জিরের গুড়ো অন্য দোকানে ৪৯ টাকা। আমরা সারাদিন ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গতর খাটিয়ে ৩০০ টাকা পাই। ঢেকি শাক রান্নার জন্য তেল জোটে না। ছেঁকা পলকা, সিদ্ধ খাই। আমরা চায়ের পাতা সিদ্ধ করে সেই ঝোল দিয়ে ভাত খাই। আর শহুরে বাবুরা চা পাতার নির্জাস থেকে তৈরি ফেস ওয়াস দিয়ে মুখ পরিস্কার করে। শহরে  শপিং মলগুলোতে ভোগ্যপণ্য উপছে পড়ছে। আমরা মেলায় কেনাকাটা করি। এই মেলাই আমাদের মল।  আমি অবাক হয়ে তার গ্রাম শহরের এই অদৃশ্য কাঁটা তারের বেড়া নতুন করে উপলব্ধি করলাম। মন্দিরে গান গেয়ে চলছে ,  "মাঝ রাতে কাল নাগিনী দংশায় লখিন্দরে রে...." জানি না কখন যেন আমারও চোখের পাতা ভিজে উঠেছে।


 

প্রিয় শহর এই জীবন 
                জয়তী ব্যানার্জী 

     "  এই শহর জানে আমার 
             প্রথম সবকিছু ,
       পালাতে চাই যত ,
             সে আসে আমার পিছু পিছু".....


           প্রিয় ভাষিনী শৈল রানী; আমার তোমার সকলের প্রিয় শহর দার্জিলিং। তিব্বতি ভাষায় যার নাম ডোরজে লিং অর্থাৎ দর্জি কথার অর্থ হলো থান্ডার বোল্ড এবং লিঙ্ শব্দের অর্থে ভূমি .....যা কিনা বজ্রপাতের দেশ। ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছিল ।তার আগে দার্জিলিং সিকিমের একটা অংশ ছিল এবং নেপালের সাথে একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গঠিত হয়েছিল বন্ধন। 
                 এ তো হল দার্জিলিং এর বুৎপত্তিগত অর্থ। মৌনি শৃঙ্গ ধবলগিরি হিমালয়ের সাথে যে এক পরমাত্মিক সংযোগ গড়ে উঠেছিল সেই ছোটবেলা থেকেই।
            এই শহরটি ৬৭১০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। বার্ষিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৪.৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং সর্বনিম্ন ৪.১° সেন্টি গ্রেড, বৃষ্টিপাত ৩০৯২ মিলিমিটার। মার্চ মাস থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর শৈল রানী নব বধুর সাজে অপেক্ষমান থাকে বরমাল্য যথাস্থানে নিবেদনের জন্য।
               " যে শহরটি সমস্ত মানুষ দেখতে চায় , যাকে একবার এক ঝলক দেখেও সেই আভাস পৃথিবীর বাকি অংশের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, সে যে রয়েছে চির শান্তিতে হিমালয়ের কোলে।"
            মার্ক টোয়েনের এই অনুভূতি এমন, যে ....কেউ তার জীবনে একবার দার্জিলিং গেলে, তার রূপ রহস্য আত্মগত করলে ,নতুন রস আস্বাদন করতে পারবে। অনন্ত আকাশের ওপর চকচকে মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘার পর্বতমালা---- যাকে বলা হয় পাহাড়ের রানী ,যারা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে চাই তাদের জন্য তৈরি হয় অসাধারণ এক তোরণ। প্রকৃতি যেন রূপের ডালি নিয়ে বসে আছে। সারা বিশ্বজুড়ে সমাদৃতদের দ্বারা শ্রদ্ধেয় দার্জিলিং চায়ের গন্ধযুক্ত স্বাদের দেশ এটি। এটি যে বিশ্ব ঐতিহ্যে মহান। আবার দার্জিলিং- হিমালয়ান রেলওয়ের সদর দপ্তর ,যেখানে শতাব্দী পুরনো ক্ষুদ্রাকৃতির বাষ্পীয় ইঞ্জিন এখনও দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ল্যান্ড রোভারদের সাথে ছুটে চলেছে মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার জন্য। বারবার যেন মন ছুটে  যেতে চায় ওই কু ঝিকঝিক কু ঝিকঝিক শব্দের দেশে। পাহাড় জুড়ে লাল, গোলাপি ,সাদা রড ড্রেনড্রন আর ম্যাগনোলিয়া গাছের অপূর্ব মেলবন্ধন। শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি'-র লাল সাদা হলুদ সবুজ পতাকা যা কিনা এই অসহিষ্ণু পৃথিবীতে জানান দিচ্ছে ___
     "বরিষ ধরা মাঝে 
           শান্তির বারি"
       এই হল আমার তোমার সকলের দার্জিলিং। যেখানে এখনো নেই পাশবিক নারকীয়তা; যেখানে বোনেদের পূর্ণ সম্মান রক্ষার্থে ভাইরা ,দাদারা সবসময় সদা ব্যস্ত; নেই কোন ইভটিজিং এর কলুষতা।
          বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যিক অনুভূতির সাথে এর অপরূপ সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন 
        " ফুলের বাগানের 
    ঠান্ডা শীতল সমীরনে
        সূর্য প্রায় সারাদিনই 
        আমাদের সাথে 
             করে লুকোচুরি"...
১৮৩৯ সালে ক্যাম্পবেল সাহেব তার স্বপ্নকে ত্বরান্বিত করতে এসে পৌঁছেছিলেন এই চা বাগিচায় ।সেই থেকেই এর বিস্তার। এবার আসি, আমার জীবনসঙ্গী দার্জিলিং কে নিয়ে কিছু কথায়। জলপাইগুড়ি রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর স্নাতক বিভাগের ডিগ্রী লাভ করার অভিপ্রায়ে আমার দার্জিলিং এর সাথে সখ্যতা, সেই কবেকার কথা ----১৯৯১... প্রথম দর্শনেই শহরটাকে যেন ভীষণ আপন করে নিয়েছিলাম ।দার্জিলিং সরকারি মহাবিদ্যালয়----সে যেন এক অপূর্ব কলেবর সমৃদ্ধ সরকারী মহাবিদ্যালয়। মফ:স্বল শহরের মেয়ে আমি, বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা। দামাল পাগলাঝোড়ার অশনি সংকেত; তিনধরিয়ার ছোট্ট রেল ঘুমটি পার হয়ে আমাদের বাস যখন ক্রমশ এগোচ্ছে হিমালয়ের শীর্ষে উঠবার জন্য --আমার মনও কেমন যেন এক ভয় মিশ্রিত আনন্দে অবগাহন করতে চলেছে ।বারবার মনে হয় গানটা গেয়ে উঠতে মন চাইছিল-----
      টাইগার হিল থেকে 
                  সূর্য ওঠা.....
সেই ঘুমের দেশ পার করে বাস এসে থামলো দার্জিলিং বাসস্ট্যান্ডে। কলেজে ঢোকার মুখেই যেন একটু হোঁচট খেয়েছিলাম। প্রথমেই মনে হয়েছিল পাশ্চাত্যের অনুকরণ আর অনুরণনটা হয়তোবা একটু বেশি ই। আরও চমক অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। ব্রিটিশদের তৈরি লাল রঙের বিশাল বাড়ীটি ধাপে ধাপে ওপরে উঠে গিয়েছে ।প্রচুর তার শাখা-প্রশাখা ;কাঠের সিঁড়ি পাহাড়ের ঢাল দিয়ে গুটি গুটি পায়ে এসে পৌঁছলাম ভূগোল বিভাগে--- সেখানে নাম নথিভুক্ত করার পর শুরু হল আস্তানা খোঁজার পালা। দার্জিলিং সরকারি মহাবিদ্যালয়ের তিনটি আবাসিক হোস্টেল, যার একটিতে আমার ঠাঁই হল ।তার নাম স্নো ভিউ। আরেকটি ক্যাসেলটন ---সেটা আবার রবীন্দ্রনাথের বাড়ি।  কলেজের দলিলে হস্তান্তরের সময় গুরুদেবের সই নাকি সেখানে আছে। মেঘমেদুর পরিবেশে মনটা যেন উড়ে গেল সেই শিলং পাহাড়ে 'লাবণ্য'র দেশে____ এরা যেন দুই সহোদরা। ডিপার্টমেন্টের পাশে চা আর গোলাপ গাছের সংমিশ্রণে গজিয়ে ওঠা ঝকঝকে ক্যামেলিয়া ;রবি কবি কি একে দেখেই লিখেছিলেন, "নাম তার ক্যামেলিয়া"...
            দুর্বল পাক যন্ত্রের পরিবর্তনের জন্য ক্যাসেলটনের বসবাসের শেষ দিনে গুরুদেবকে দেওয়া  তনুকার  এই সেই ছোট্ট উপহার____
        "একটা জিনিস দেবো 
               আপনাকে ,
       যাতে মনে থাকবে 
আমাদের কথা..... একটি 
                   ফুলের গাছ ।
.............
       দামি দুর্লভ গাছ,
এদেশের মাটিতে অনেক যত্নে বাঁচে,
সে বললে ;
      নাম তার ক্যামেলিয়া।"
          তারপর শুরু হল আমার নতুন জীবন ।আমার নতুন পরিচয় দার্জিলিং সরকারি মহাবিদ্যালয়ের আবাসিকা। পাশ্চাত্যের অনুকরণে আবৃতা শহরটিকে নিজের করে নিতে বেশ কিছু সময় লেগেছিল জানো, কিন্তু কখন যে ওদের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম জানি না। হোস্টেলে পাহাড়িয়া দের সংখ্যাই ছিল বেশি কিন্তু কখনোই তা মনে হতো না। আস্তে আস্তে আপদে বিপদে ওরাই হয়ে গেল নিজের লোক ।আজও কিন্তু সকলের সাথে না হোক অনেকের সাথেই রয়েছে নাড়ির টান। এ বন্ধন অমর অটুট ।পাহাড়িয়া রা জানে কিভাবে বিদেশিনীদের কাছে টেনে নিতে হয়। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বোস  তার রায় ভিলাতে অনেক  বিদগ্ধ লোককে করেছিলেন আপ্যায়িত।  তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বানিয়েছিলেন রিসার্চ সেন্টার। আবার চিত্তরঞ্জন দাসের সুন্দর বাড়িটি অনেক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। রায় ভিলাতে ভগিনী নিবেদিতা আজও ঘুমিয়ে আছে শান্তিতে নীরবে ।পাহাড়ের আরেক প্রান্তে ক্যাসেলটনের কাঠের ঘরের কাঁচের জানালায় বসে রবীন্দ্রনাথ গাইছেন----
         " তোমারও অসীমে প্রান মন লয়ে,
যত দূরেই আমি ধাই ই"....
          সিঙ্গালীলা পর্বতের প্রতিটি খাঁজে খাঁজে তা বোধহয় জানান দিয়ে যাচ্ছে। আবার পদ্মজা নাইডু পার্কের সেই সাইবেরিয়ান লেপার্ড টি ও বোধহয় আমাদের মতই বিদেশিনী। তাকেও তো শৈল রানী আপন করে নিয়েছে। সে তো আর ফিরে যায় না ,সে জানে----
  " ছেঁড়া শিকড় পাবে কি আর 
পুরনো তার মাটি"....
       তাইতো আগুন্তক,
     দার্জিলিং আমার অনেকটা ।এই শহর আমার প্রথম সবকিছু। জলপাইগুড়ি রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয় যদি আমার চলার পথের হাতে খড়ি হয় ;তবে দার্জিলিং সরকারি মহাবিদ্যালয় আমার পথ চলার পাথেয়..... ভালো থেকো শৈলশহর।
           আর আমার আত্মজা কে তোমার মত দৃঢ় অথচ নমনীয় কমনীয় করে তুলো। সে যেন বজ্র দীপ্ত কন্ঠে উন্নত শিরে তোমার থেকে জীবনের রসদ সংগ্রহ করে যুগিয়ে নিতে পারে তার আগামীর দিন চলার পাথেয়। 
ভালো থেকো।


 

এই শহর এই জীবন
বেলা দে

জলশহর, মানে আমার শহর জলপাইগুড়ি। এ শহরে আমার স্থায়িত্বকাল ৫২ বছর, জন্মস্থানে নারী জীবনের মেয়াদ খুবই কম, বলতে গেলে এক চতুর্থাংশ। তাই জন্মস্থান ধর্ত্যব্যের মধ্যেই পড়ে না,
শশুরঘর স্বামীর সংসার মেয়েদের পাকাপোক্ত বসত। এমন একটা সময় আসে যেদিন সে হয়ে ওঠে সেখানে সর্বময় কর্তী পুত্রকন্যা নাতি নাতনি বেষ্টনীর মধ্যে চরম আবদ্ধ। কলেজ পড়তে এসেছি এই শহরে ১৯৭১ এ, ইতিপূর্বে দার্জিলিঙে গভমেন্ট কলেজে পরে এখানে আসা। ১৯৭৪ সালে গাটছরা
এই শহরেই  বাঁধা পড়ে। বসবাস এশহরের প্রাণকেন্দ্রে, বড্ড বেশি ভালবেসে ফেলেছি শহরটাকে, হয়তো নিজের চেয়েও। তাই বুঝি তার বদনাম একেবারেই সহ্য করতে পারি না। এমন প্রানবন্ত সংস্কৃতিপ্রিয় জনপদ আর কোথাও দেখিনি জানি যার যার নিজের শহর অতিপ্রিয় তার কাছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এখানে সাহিত্যপ্রিয়  মানুষজন খেলাধূলা নাটক নাচ গান আবৃত্তি যেনো  নিত্যকার চালচিত্র, প্রতিটি জীবনে মজ্জ্বায় মিশে আছে, রান্নাবান্না গৃহস্থালি চুলোয় যাক। শিল্পকলা  বারমাস সেজেই আছে। আমাকে যেটুকু দিয়েছে এ শহরটাই। আমার পান্ডাপাড়া এলাকায় বাড়ি সেদিন যখন পাড়ায় ঢুকেছি বিয়ের পরে সমস্ত বাড়িঘর মোটামুটি টিনের চাল কাঠের বেড়ায়, আমার শশুর বাড়িটাও তাই। বেশ কয়েক বছরের মধ্যেই দেখতে দেখতে দোতালা তিনতলা চারতলা অবধি উঠে গেল, ঢেকে গেছে আকাশের চাঁদ তারা এমনকি সূর্য দেব অব্দি। প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকা থেকেও এখানে এসে মাথা উঁচু ম্যানসন তৈরী করে ফেলেছে, ইমারত ঢাকা এই শহরটাকে বড় অচেনা লাগে সময় সময়।

আমি ডুয়ার্সের এক পল্লী শহর থেকে আসা, সেই শ্যামলছায়া এখনো লেগে আছে মননে যাপনে প্রাণের গহীনে। চাই শস্যশ্যামল রঙের মাখামাখি,  বাড়িতে তাই ফুলবাগানে ঘিরে আছি। অফুরান জমিজমা সেদিন মানুষের, কেউ বিক্রি করে দিয়েছে কেউ প্রমোটারের হাতে তুলে দিয়েছে কেউবা ফুলচাষ করে শান্তিলাভ করছে, আমার শশুরবাড়ি ১৫ কাঠায় ছিল যৌথ পরিবার, সবাইকার জন্য একটা ভগ্নাংশ করে পরেছে। আমাদের বাড়ির এক কি মি পথ পেরিয়ে শুধুই ধানক্ষেতে ছয়লাপ আর ঘন জঙ্গল রাতে সমবেত শিয়াল কুকুরের ডাক, টাউনশিপ এখন এতটাই বেড়েছে যে এর শেষটাও আমরা চিনি না।নিত্যনতুন গজিয়ে উঠেছে শপিং মল, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সাইবার কাফে আর অজস্র দোকান অথচ মাছি মারছে সবাই। ভাবতাম এই শহরটা আমার হাতের চেটোয় ধরা, সে ধারণা  ভুল প্রমাণিত, এলাকার পথঘাট এখন যেন চিনতেই পারি না। শুধু বসে গেল পুরাতন সিনেমা হলগুলো বেকার হল কতিপয় খেটে খাওয়া কর্মী জীবন। এস পি রায়, বি সি ঘোষ,এবং রাহুতবাড়ির মতো রক্ষনশীল চা শিল্পপতিরা ওদের চা বাগান সব বিক্রি করে এ প্রজন্মের সবাই চলে গেছে কলকাতায়, রাহুতদের কয়েকটি বাগান এখনো আছে টলমল অবস্থায়। যখন বারোয়ারী  পূজা সংখ্যায় খুব কম আমাদের ভিড়ভাট্টায় পুজার
আনন্দ জমায়েত সব বাগিচা শিল্পপতিদের বাড়িতে। এখনও ওদের বাড়ির কাছাকাছি গেলে মন ভেঙে যায়, বাঙালির শিল্প কোথায় গেল। এ শহরে যা বহুলাংশে বর্ধিত হয়েছে তা হল মানুষের সংস্কৃতি ও কলম চাষের ইচ্ছা। আমাদের এ বাড়িতেও আগে নিয়মমাফিক চর্চা ছিল, শাশুড়ি পিসিশাশুড়ি ননদ, আমার কর্তা বেহালাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গায়ক আবার বাগিচাশিল্পীও বটে। বাড়ির নিশানাই ছিল ফুলবাগান বাড়ি। আমার একমাত্র কন্যাকেও আমি নাচ,গান, অঙ্কন, সবরকম শিক্ষাই দিয়েছি। কলম পেশা আর নাটক অবশ্য ওর নিজের ভিতরকার। এই শহরটা না হলে হয়তো ওকে এতটা প্রাপ্তি এনে দিতে পারতাম না। মোটমাট নিজের বাড়ি থেকে ওর প্রথম প্রেরণা, ওর ঠাকুমা ছিলেন গায়িকা, সেলাই  শিক্ষিকা, মহিলা সমিতির কার্যকরী সদস্য। এ শহরে শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত সব  মেয়েরাই স্বচ্ছন্দে সর্বক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে পুরুষের সাথে।সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি ফ্রাষ্টফুডের দোকান চলে রমরমিয়ে, কেউ নেই বসে শুয়ে। খুব গর্ব অনুভব করি আমি আমার জলপাইগুড়ি শহরটা নিয়ে। আমি নিজেও  আজ যা হয়েছি যতটুকু সম্ভব জীবন চিনতে পেরেছি  সবটা এশহরের অবদান।


 

এই শহর, এই জীবন
শুভেন্দু নন্দী 

 "জীবনটা ভাই রেলের গাড়ি,
আমরা সবাই যাত্রী যে।"
সত্যিই তাই।  দৈব বিধানেই তো এক স্থান থেকে আর এক স্থানে জীবন প্রবাহে ভেসে বেড়ানো। তাঁর ইচ্ছেতেই বা নির্দেশে আমাদের চলাফেরা। তিনিই তো ঘটন-অঘটন পটিয়সী।..... ফেলে আসা শৈশবের যে শহরে বা জন্মভূমিতে ছিল শিকড় বা নাড়ীর টান ,তা স্বীকার না করা মানেই তো অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত,সুখ,দুঃখ, আনন্দ, ব্যথা,বেদনা ইত্যাদিতে যেখানে শৈশরকাল থেকে স্কুল, কলেজ অধ্যয়ন পর্য্যন্ত অনেকটা সময় কেটেছে-সেই স্বর্ণ যুগকে ভুলি কি করে ? যেখানের আকাশ, বাতাস, গাছপালা,বাড়িঘর,সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল,সবুজ বনানী, বিদ্যায়তন আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদির সঙ্গে অনেককাল   পর্য্যন্ত নিবিড় সখ্যতা গড়ে উঠেছিল,বাবামায়ের স্নেহ, ভালবাসা,আদর ও শাসনে বড় হয়েছিলাম ও বিভিন্ন গুণীজন ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসেছিলাম- তাঁদের কথা প্রতি মুহুর্তে মনে পড়ে কর্মসূত্রে এই নতুন শহরে আগমনের সময়। সে সময় ছোট্ট প্যারামিটারেের মধ্যে জীবন আবদ্ধ ছিল। শুধু পড়াশোনা। কোনও দায় দায়িত্ব ছিলোনা। এখানে এসে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসা,  আর নিজস্ব পরিবারের গুরু দায়িত্ব পালন করা। তবে এই শহর বেশ ঝাঁ চকচকে। সাবেকী আমলের একতলা বাড়ির সংখ্যা খুবই  কম এখানে। আছে বহুতল বিশিষ্ট ফ্ল্যাট।  বাসস্থানের সমস্যা মেটাতে ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে ফাঁকা জায়গা বা পুকুর ভরাট করে এই ব্যবস্থা। খোলামেলা,মুক্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ আছে পূর্বের শহরের মত এখানেও -এটা বোধ করি বলা যাবেনা। তবে সবুজের হাতছানি আছে।  এখানে সৌন্দর্যায়ন বা নগরায়নের দিকে প্রবনতা বেশী -যার জন্য বনজ সম্পদ কিছুটা নষ্ট হয়েছে বা হচ্ছে। প্রকৃতিও তাই সর্বংসহা নন আজ। প্রতিশোধ স্পর্ধী -যার জন্য খরা,অনাবৃষ্টির মত প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে মাঝে মধ্যে। এখানেও আছে cultural heritage. আছে প্রচুর জ্ঞানী,গুনী মানুষের সমাবেশ। ওখানকার মত এখানেও নিয়মিত বিভিন্ন occasion এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পূজোপালা পার্বন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে এখন digitalএর যুগ। সে সময়ে ছিল অবসর বিনোদনের জন্য শুধু রেডিও বা ট্রানজিসটর। এখন টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে রকমারী অনুষ্ঠান দেখার মত আনন্দ আছে ,তার সাথে  আছে মুঠো বা স্মার্ট ফোনের মত latest invention. আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথা চালাচালি বা কুশল সংবাদ, শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়াও ও অন্যান্য multipurpose serve করার মত device. বলা বাহুল্য, আগে এর প্রচলন বা প্রয়োগ ছিলোনা। তাতেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। আর এখন এতেই......। পূর্বের এবং বর্তমান- দুই শহরই অনেক কিছু দিয়েছে আমায়। দুই শহরই নিজস্ব গুণে অনন্যা। যেহেতু বর্তমানে এখানেই আমার বাসস্থান।  তাই এই শহরই আমার এখন প্রিয়। তবে কি পেয়েছি বা কি পাইনি "তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজী"

 



কাঞ্চনজঙ্ঘা

পর্ণা চক্রবর্তী

চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই নিমাইয়ের দোকানে বেশ ভিড় লেগে গেল।  ছাপা শাড়ি, ছিটের ব্লাউজ সেমিজ  পাজামা পাঞ্জাবি এসব নানান জিনিস  ভালোই বিক্রি  হচ্ছিল অনেক দিন পর। ভিড় বাড়লে নিমাই একা  সামলাতে পারছিল না বলে  বড় ছেলেকে  বলছিল দোকানে এসে বসতে। দীপু আগে  গ্যাংটকের একটা হোটেলে চাকরি করতো ,ছোট হোটেল । ওদের পাড়ায় থাকত   রমেন দত্ত, সেই লিজে হোটেলটা নিয়েছিল। দীপু বেশ সপ্রতিভ ছেলে , দেখতে ,টেখতেও ভালো। বিএ পাশ করে বসেছিল,চাকরি পায় নি। গরীব বাড়ির ছেলে,এরপর  আর বেশিদূর এগোতে  পারেনি। রমেনই তখন ওকে এই চাকরিটার কথা বলে।

শেষ দুবছর ধরে সারা পৃথিবীর  মানুষ খুব খারাপ ছিল। রমেন হট করে মারা গেল , হোটেলও বন্ধ হয়ে গেল। দুবছর ধরে সেই ইস্তক বাড়িতেই বসে আছে দীপু । চাকরির চেষ্টা করছে কিন্তু এ বাজারে কে এখন ওকে চাকরি দেবে।  একটা বাইক থাকলেও হত , ডেলিভারি ম্যানের কোনো চাকরি  পেতে পারত।  মনমরা হয়ে দোকানে বসে এই সব ভাবে। কদিন পরেই নব বর্ষ , বিক্রি বাটা ভালোই হচ্ছে।  বড় রাস্তায় অনেক দিন পর গাজনের  সঙ  বেরিয়েছে।  নিমাই বলল ,"আমাদের ছেলেবেলায় জেলেপাড়া থেকে সঙ বেরুত তখন। চড়কের মেলা হতো। বাবা নিয়ে যেত। কি সব দিন ছিল তখন, বুঝলি দীপু! তখন আমাদের দোকানটা বিক্রি হয়নি, তারপর.…..”  বলেএকটু থামল নিমাই ।ওর ছেলে বেলার উৎসবের দিনগুলো মনে পড়ল হঠাৎ করে।এই দারিদ্র আর তার সাথে লাগাতার যুদ্ধ, সব রূপ,রস,গন্ধ যেন শুষে নিয়ে ওর জীবনটাকে ছিবড়ে করে দিয়েছে। শুধু দীপুকে দেখলে একটু বুকে বল পায়, মনে হয় আবার সব  ফিরে পাবে। 

একটু বেলা বাড়তেই ওদের দেখা যায়। নতুন কাপড় আর লাল গামছা গায়ে কিছু মহিলা পুরুষ মাটির মালসা হাতে নিয়ে ভিক্ষে করছে আর থেকে থেকে  "বাবা তারক নাথের চরনের সেবা লাগে, মহাদেএ এ এ এ…..ব  বলে ফুকরে উঠছে। শিব দুগ্গা,কালীরা রাস্তায় বেরিয়েছে। গৃহস্থের ঘর থেকে চাল ,আলু, টাকা এসব পায়। দোকানিরাও দেয়, যে যেমন পারে।  দীপু দশ টাকা দিল।  রোদ প্রখর , বাতাসে আদ্রতার হার বেশ বেশী।  শিবের মুখের রঙে ঘামের দানা জমেছে। নিমাই বলে, "একটু জিরিয়ে  যাও গো, জল খাবেন নাকি এক ঢোঁক। ফুটপাতের পেছনে  দেওয়াল ঘেঁষে রঙচটা প্লাস্টিকের টুলে বসে এক চুমুকে জল শেষ করে  মহাদেব একটু হাঁপান।তাঁর   মুখটি শীর্ণ, চোখ দুটোতে জমেছে রাজ্যের  ক্লান্তি। সারা শরীরে পাকে পাকে  সাপের মত জড়িয়ে আছে করাল দারিদ্র্য।বিড়ি খাওয়া কালো ঠোঁট দুটো চেটে  খসখসে গলায়  বলে, "গত দুবছর এসব বন্দ ছিল,ভালো করি খাওয়া জোটে নি  অনেক দিন, বেঁচে থাকব সে  ভাবিনি কো। এবার দুটো পয়সা  পাব বলে সেই কত দূর  থেকে আলাম  …, কিন্তু  শরীলটা আর দিচ্চে নি ।" কালী বিড়ি ফুঁকতে, ফুঁকতে  কার সাথে  একটা  খসাটে মোবাইলে কথা  বলছিল।  ফোনটা গোলাপী রঙের ঝলঝলে  ব্লাউজের ভেতর চালান করে  খড়খড়ে গলায়  শিবকে বলল  "ওটো দেকি একন,  বসি ,বসি ওতো প্যাঁচাল পারতে হবে নি। এখনও অনেক দূর যাওয়ার লাগে।"  থতমত শিব ত্রিশূল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, করুণ হাসে। নিমাই  ওকে আরো দশ টাকা দেয়। টাকাটা  নিয়ে ক্লিষ্ট হেসে মহাদেব  হুঙ্কার তোলেন "ববোম ব্যম"। আশপাশের  চিৎকার শোরগোলে সে আওয়াজ  চাপা পড়ে যায়, শুধু  দীপুর বুকের ভিতর সে  চিৎকারের রেশ কান্না হয়ে বাজতে থাকে।  

 

হোটেলের কাজটা দীপুর খুব পছন্দের ছিল।হাতের কাছেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। চারপাশটা কেমন  ধোঁয়া,ধোঁয়া কুয়াশা মাখা।  জঙ্গলে জড়ানো পাহাড়ের সারি আর একটানা  ঝিম ধরা ঝিঁঝির ডাক।  ওই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার মধ্যে  সারাদিন খুব পরিশ্রম  করতে হতো দীপুকে। কিন্তু কাজটা করতে ওর  এতো ভালো লাগত যে পরিশ্রমটা গায়ে লাগত না। তাছাড়া  রমেন ওকে বেশ ভালোও বাসতো। হোটেলটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল রমেনের দীপুও ওর সাথে থাকতে ,থাকতে  স্বপ্ন দেখতে শিখছিল। কিন্তু সব হট করে  বদলে গেল। গরিব ঘরের ছেলে দীপু, জীবনে সে ভাবে কিছুই পায় নি।  হোটেলে কাজ করার সূত্রে কত রকমারী লোক, কত অদ্ভুত জীবন দেখল ও । তার ওপর অমন উদাত্ত প্রকৃতি, কি তার  রূপ । সারাদিনের  সব ক্লান্তি এক মুহূর্তে উধাও  হয়ে যেত কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে দাঁড়ালে।  জোৎস্না রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে প্রথম দেখে  অনেকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দীপু । দরিদ্র পরিবারের ছেলে, জীবনে কখনো ভাবে নি এমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা  হবে । সেই  পাহাড়ের বরফ চুড়োয়  যখন   ভোরের আলো  ঝলকায়,   সূর্যাস্তের সিঁদুরে লাল রং লাগে ,ওর যেন এক অলৌকিক অনুভব হয়।  ওই মায়াবী মুহূর্তে  বৃন্দাবন পাল লেনের এঁদো  পুরোনো  স্যাঁতসেঁতে বাড়িটা আর তার লোকগুলোর জন্য দীপুর  মন কেমন করে ওঠে।


পৃথিবীটা যে কত বিশাল ,আর জীবন যে কত বড় হতে পারে, সে ভালো বুঝতে পারে দীপু। কিন্তু কি হল! ফুটপাতে বসে  এখন  জামা কাপড় বেচছে। প্রথম কটা দিন কান্না পেত ওর। সারাদিন ধরে অবিশ্ৰান্ত গাড়ি চলছে আর তারস্বরে হর্ন বাজছে,  চিৎকার আর চেঁচামেচি। মাথায় ওর যন্ত্রনা হয় । অথচ দু বছর আগেও কি অদ্ভুত এক নৈঃশব্দের মধ্যে ওর দিন কাটতো। এর মধ্যে বসেই নিমাইরা এত বছর ধরে দোকান চালাচ্ছে যে কি করে কে জানে। নিমাইকে বললে ও বলে "সেই কবে থেকে এ কাজ করচি। সব হলো অব্যেস, বুঝলি না!"  দীপুর কষ্টটা নিমাইও  বুঝতে পারে,  কিন্তু  কি করবে। বড় হোটেলে  কাজ করতে গেলে  আরো পড়াশোনা  লাগবে।  পয়সা কোথায় পাবে নিমাই? বিকেল হলে রতনের দোকানে চা খেতে যায় দীপু। ট্রাম রাস্তাটা  সোজা চলে গেছে   শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় অব্দি। নেতাজীর মাথার ওপরে চৈত্রের নীল আকাশে সাদা মেঘের মিনার ।সে দিকে তাকিয়ে থাকলে  মেঘের  ফাঁক দিয়ে যেন উঁকি মারে বরফঢাকা ছায়া ছায়া পাহাড়চূড়া। শেষ অস্তরাগের আলো পড়ে তার মাথার সোনার মুকুটখানা ঝলমল করতে থাকে। দীপু তখন চোখে ঝাপসা  দেখে।  

টাউন স্কুলের পিছন দিকে গলির ভেতর দীপুদের বাড়িটা অনেক পুরোনো । বহুদিন কোনো সংস্কার হয় নি। সে যাই হোক এবাজারে  মাথা  গোঁজার একটা ঠাঁই তো বটে।  দুতিন ঘর ভাড়া আছে বটে, তবে সেই নিমাইয়ের বাবার কাল থেকে আছে বলে ভাড়ার পরিমাণও নাম মাত্র। সেদিন রাত এগারোটা বাজল  বাপ ছেলের বাড়ি ফিরতে। কনক বলল  "বচ্ছর কার দিন, এক তারিখ একটু মাংস এনো না ,তবে একটু  পোলুয়া করি। কত দিন এসব রান্না হয় না।" তপু,হিমি বেশ খুশি হয় । নিমাইকে বলে, "আনো  না বাবা, সত্যি  এই দুটো বছর তো কোন আনন্দই হয় নি।"  নিমাইয়ের বিক্রি ভালোই হচ্ছে, মনটাও ভালো। সে হেসে বলল," হবে হবে।এ দুবছর ধার জমেছে কত সেগুলোও তো শোধ  দিতে হবে ।"  দীপু চুপচাপ বসে খায়। ওর মুখটা দেখে মনটা খারাপ লাগে নিমাইয়ের।  রাতের বেলা স্বামী স্ত্রীতে আলোচনা করে কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পায় না। দীপুও খুব চেষ্টা করেছিল  সিকিম না হোক  আশে পাশে এমন আরো অনেক  জায়গার  কোনো হোটেলে যদি কিছু জুটে যায়।  ড্রুকপা হোটেলে কাজ করার সময়  কিছু জনের সাথে আলাপ হয়েছিল দীপুর। এ কদিন ধরে সবাইকে ফোন করল কিন্তু কেউ তেমন আশার কথা বললনা।  দীপুর  মনটা ভেঙে  যাচ্ছে। বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে। পড়ার ক্ষতি হবে বলে ওকে দোকানে বসতেই দিত না নিমাই। কিন্তু  আজকাল আর সবটা সামলাতে পারে না , বয়স হচ্ছে। ভালো টাকার কাজ না পেলে  অত দূরে গিয়ে  লাভের লাভ কিছু হবে না। দীপু অনেকরাত অব্দি জেগে থেকে নিজের ইচ্ছেগুলোর  সাথে লড়াই করতে থাকে।  

   

 নিমাইয়ের অনেক দিনের ইচ্ছে  ফুটপাথের দোকানটা তুলে  একটা পাকা দোকান ঘর নেয়। বাবার দোকানটা ছিল একদম ট্রাম রাস্তার  ওপর। তেমন এখন  আর কোথায় পাবে তবে ফরিয়া পুকুরের কাছে  ছোট একটা দোকান ঘরের  সন্ধান পেয়েছে নিমাই।  মালিককে চিনত, বিমলদা।  ছেলেপুলে নেই, বিমলদার বউ চেনাজানা বিশ্বাসী লোক না পেলে দোকান  ভাড়া দেবে না।   একটু করে করে যা জমিয়েছিল, গত দুবছর সে সব বসে খেয়েছে। দীপুটার কাজটাও চলে গেল। রাতে ওরও ঘুম আসে না। কনককে বলে," ঘুমোলে?" সারাদিনের খাটা খাটনিতে ক্লান্ত কনক ঘুমিয়ে  ঘুমিয়েই  কি উত্তর দেয় স্পষ্ট বোঝা যায় না  তবুও নিমাই  বলে যায় ,"বুঝলে বৌদিকে বলতে হবে আর কটা দিন অপেক্ষা করতে। ভাড়াটা বড় বেশীই  চাইছে।  তার ওপর  সেলামি আছে… নিজের মনেই  বকতে থাকে নিমাই আর কনক  কনকের মতো ঘুমতে থাকে। "দোকানে  কিছু  ভালো কোয়ালিটির শাড়ি রাখতে হবে আগের মত। আরো নানা ধরনের জিনিস যেমন  ধরো, বেড কভার টেবিল কভার  এসবও রাখতে হবে। দীপু যদি সাথে থাকে তাহলে দুবছরের মধ্যে  কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিকই হবে, আমার মন বলছে।"   মনের ভেতর খুব একটা আশা জাগে নিমাইয়ের।  দুদিন পর নববর্ষ , নতুন বছরে সব ভালো হবে।  "আগের মতো সব ঠিক হয়ে যাক মা,"  দেওয়ালে লাগানো  মা ভবতারিণীর  ছবির দিকে তাকিয়ে মিনতির সুরে প্রার্থনা করে নিমাই।

  

 চড়কের মেলা লেগেছে ছাতুবাবুর বাজারে। পুরো লম্বা টানা রাস্তা ধরে  নানান পসরা নিয়ে বসেছে দোকানিরা। সারাদিনই মোটামুটি ভিড় ছিল তবে  সন্ধ্যাবেলায় মানুষের ঢল নামল। চারপাশের চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে আনমনে ঘুরে বেড়ায় দীপু। আজকে দোকানে  তপু আর হিমি আছে নিমাইয়ের সাথে। মনটা ওর অস্থির একটু। গুল ওস্তাগর লেন দিয়ে ঢুকে এলোমেলো হাঁটে। বিডনরো ধরে হেঁটে, অলিগলি সব পেরিয়ে বড় রাস্তায় পৌঁছয়।  চার পাশে বেশীর ভাগ দোকানগুলো  সেজে গুজে কালকের  হালখাতার জন্য তৈরি হচ্ছে। উৎসবের আনন্দটা জমাট বাঁধছে ধীরে ধীরে।


মনটা ভালো হলো দীপুর দোকানের কাছে এসে। সেই পুরোনো দিনের মতো ভিড় করে লোক জিনিস কিনছে। সব দোকানেই  বিক্রিবাটা ভালো হচ্ছে। তবে নিমাইয়ের এই ব্যবসা  দুপুরুষের, সে জন্য ওর পরিচিতিও কম না।নিমাই বলে এটাই নাকি ওর আসল মূলধন।  হিমি তপু খুব ব্যস্ত। তাড়াতাড়ি  কাজে লেগে যায় দীপু। নিমাই ওকে দেখে হেসে বলে, "ভাগ্যিস সকালে তারককে দিয়ে  আরো মাল আনিয়ে ছিলাম ।  শাড়ি পাঞ্জাবি আর পাজামার কাটতিটা বেশ ভালো  বুঝলি।" দরদর করে ঘামছে  নিমাই।  ওর খুশি মুখটা দেখে  দীপুর কেমন স্নেহ হয় বাবার ওপর। 

 

 নববর্ষ পড়ল শুক্কুর বাড়ে।  সকাল সকাল বেরিয়ে  ঠনঠনে কালী মন্দিরে  গিয়ে পুজো দিল কনক আর  নিমাই। সকালে  তারক গিয়ে আজ  দোকান খুলবে।  বাড়ি ফিরে চা বসালো কনক, ছেলে মেয়েকে ডাকল। নিমাই আসার সময় একটু মুরগির মাংস  দই মিষ্টি  নিয়ে এসেছে।  মনটা বেশ ভালো লাগছে সবার। অনেক দিন পর প্রাণ ভরে শ্বাস নিল কনক।  সকালের রোদেও যেন  সোনা রং ধরেছে।   দীপু ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে জানলা দিয়ে  তিনকোনা  আকাশটা দেখছিল। নির্মেঘ নীল আকাশ। সাদা মেঘের মিনারগুলো  আর দেখা যাচ্ছে না।  আবছা পাহাড়, ওর সেই ছায়া ছায়া বরফ চূড়াটাও  যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।  কনক বলে ,  "মুখ ধুয়ে আয় দীপু,  চা খাবি না?" নিমাই  ঘরে ঢুকে চুপ করে খানিক ছেলেকে দেখল।  "আকাশের দিকে তাকিয়ে কি দেখিস বলত?"  নিমাই দীপুর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।  "কিছু না তো," অপ্রস্তুত হাসে দীপু।  বলে ,"লাভের টাকা এবার থেকে কিন্তু  কিছু করে করে জমাতে হবে বাবা। নতুন বছরে প্রথম দিন থেকেই  বরং  শুরু করে দি। তারপর বেশ কিছু জমলে চলো তোমাদেরকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়ে  আনি।"   


 






 

আধুনিকা

অমলকৃষ্ণ রায়

‘আর ভাল লাগে না। অনেক হয়েছে। এবার কোনওরকমে সংসার থেকে মুক্তি চাই।’ ছাদ থেকে শুকনো কাপড়গুলো তুলে নিতে নিতে তিথি আপনমনে কথাগুলো বলতে থাকে। ‘সৌরিণের আচার আচরণ আর কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।’ ফাঁকা বাড়ির ছাদ থেকে কাপড় হাতে নামতে নামতে তিথি এসবই বিড়বিড় করছিল। অমনি বে-খেয়ালে সিঁড়ির ধাপে পা পিছলে পড়ে গেল। তাতে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেল। 

এই অবস্থায় বাড়িতে দ্বিতীয় কেউ নেই। সৌরিণ অফিসে। এসময়ে কেউ যদি ফ্রীজ থেকে এক টুকরো বরফ এনে দিত তো খুব ভাল হতো। কিন্তু দেবেটা কে? কুন্তুলা মাসী দুপুর গড়াবার আগেই হাতের কাজ সেরে বাড়ি চলে গেছে। তাছাড়া এ পাড়ায় তিথিরা নতুন এসেছে। গতমাসে সৌরিণ ভায়েদের থেকে আলাদা হয়ে নতুন বাড়িটাতে গৃহপ্রবেশ করেছে। পাড়ার লোকেদেরকে তাতে নেমন্তন্ন করা হয়েছিল। অনেকে এসেছিল। তারা খেয়েদেয়ে বাড়ির প্রশংসা করে চলে গেছে। তারপর থেকে কেউ আর আসেনি। তাই পাড়ার বউদের সঙ্গে সেভাবে পরিচয় হয়ে উঠেনি। এখন পায়ের ব্যথার জন্য পাশের বাড়ির দিদিকে চিল-চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি করতে তিথির সংকোচ হচ্ছে।

 এই বাড়ি করার পিছনে সমস্তরকম প্ররোচনা অবশ্য তিথিরই। এই সংসারে বউ হয়ে আসার আগেই একদিন ফোনে সৌরিণের কাছে দাবি করে বসেছিল, 

‘শোন। বিয়ের পর আর যাই করো। আমার কিন্তু একটা নিউক্লিয়ার ফেমিলি চাই। তোমার ঐ চৌদ্দগুষ্টির ভিড়ভাট্টায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে।’

‘আমায় তাহলে কী করতে হবে বলো? বাড়ির লোকজন সব তাড়িয়ে দিয়ে তোমায় নিয়ে থাকব। সেটাই বলতে চাইছ তো?’

‘এরকম একটা উদ্ভট দাবি কেন করতে যাব সৌরিণ?’

‘তাহলে?’

‘ইটস ভেরি সিম্পল। কোথাও একটা নতুন বাড়ি করে তুমি আমায় নিয়ে গিয়ে উঠবে। তাতে তোমার দাদা-বৌদিরাও ছেলেমেয়ে নিয়ে হাতপা ছড়িয়ে থাকতে পারবে। আমরাও আমাদেরও সন্তানকে সুবিধেমতো মানুষ করতে পারব’ 

ব্যাপারটাতে সৌরিণ প্রথমে একটু গড়রাজি হয়ে গাইগুই করছিল। তিথি তখন হবুবরকে কথার প্যাঁচে ফেলে হারাতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছিল. শোন, ওরকম কত দেখেছি। আমাদের পাড়ার মৈত্রীবাড়ি। একসময় সারা গাঁয়ের নামকরা যৌথপরিবার ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, জায়ে-জায়ে মিল, ভায়ে-ভায়ে মিল। পাড়ায় কোনও বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হলে উদাহরণ টেনে বলতো, মৈত্রীবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে একঝলক দেখে এসোগে, যৌথ পরিবারে কী করে বাস করতে হয়। পাতের মাছের ঢেলাঢেলি, কার ছেলেমেয়েকে কে তেল মাখিয়ে, চান করিয়ে, খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি করে দিচ্ছে, কে আগে ছুটে গিয়ে বাসি কাপড় ছেড়ে চান করে ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়ছে, কে গিয়ে রান্নাঘরে সবার আগে ঢুকে রান্না বসিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে রীতিমতো হুড়োহুড়ি চলে। 

সেই বাড়ির জায়েরাও একদিন ক্লান্ত হয়ে পৃথক বাড়ি করে করে সরে গিয়েছিল। আমার চোখের সামনে চার ভাই উঁচু দেয়াল তুলে চারচারটে বাড়ি করল। জায়েদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। তাই ওসব আদিখ্যেতা করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হবার আগে বরং সরে গেলে নিজেদের মধ্যে আজীবন একটা সৌহার্দপূর্ণ ভাব বজায় থাকবে। 

তিথির কথার অকাট্য যুক্তির তোড়ে সৌরিণ সেদিন নিমেষেই ভেসে গিয়েছিল। তাই তিথির দাবিটা মেনে নিয়ে বলেছিল, ‘ঠিক আছে মহারানি। আপনার আদেশ শিরোধার্য। কথা দিচ্ছি বিয়ের কয়েকবছরের মধ্যেই আমার সাধ্যমতো একটা রাজপ্রাসাদ বানিয়ে আমরা রাজরানি সেজে সংসার শুরু করব।’ তারই ফলশ্রুতি হলো তাদের এই নতুন বাড়ি। গৃহপ্রবেশের পরে তিথি একদিন সৌরিণকে বলেছিল, তুমি আমার কথাটা রেখেছ বলে এখন ফাঁকা বাড়িতে কেমন বুক ভরে শ্বাস নিতে পাচ্ছি।

স্ত্রীকে সুখী করে পেরে সৌরিণও খুশি। একজোড়া কপোত-কপোতীর সংসার বেশ হেসে খেলেই চলছে। তিথি এরইমধ্যে একদিন তার দ্বিতীয় ইচ্ছের কথা জানাল। দুটি বা তিনটি নয়, কেবলমাত্র একটি সন্তানের মা হতে চায় সে। সে মেয়ে হোক কিংবা ছেলে তাতে তার কোনও আপত্তি নেই। সৌরিণ তাতেও সম্মতি জানিয়েছে। তাই এ নিয়ে তাদের মধ্যে পরিকল্পনা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একজন হেলদি বেবির মা হতে গেলে কীভাবে এগোতে হবে, সেসব ব্যাপারে তিথি বান্ধবীদের কাছ থেকে পরামর্শও নিতে শুরু করেছে। সৌরিনও তার অফিসের কলিগ দাদাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছে। 

এসবের পাশাপাশি তিথি আরেকটা কাজ করছে। সেটা হলো তার গেয়ো স্বামীকে আধুনিক করে তুলতে গিয়ে তার উপরে বেশকিছু শর্ত আরোপ করেছে— ইস্তিরি ছাড়া পোশাক কখনও পরবে না। কথায় গেয়ো টান একেবারেই নয়। শীগগীরই শহুরে সিলেবল আয়ত্ত করে ফেলতে হবে। অমুকের বরকে দেখেছ, কেমন মেপেঝেপে কথা বলে। কতটা স্মার্ট! নিজেকে শহুরে কালচারে মেশার উপযোগী করে তোল। কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে হ্যাবলার মতো আচরণ করবে না। এটিকেট, ভদ্রতা মেইনটেইন করতে শেখো। পার্টিতে গেলে কেউ যেন বলতে না পারে, ‘কীরে তিথি তোর বরটা অমন হাবার মতো থাকে কেন? কেমন যেন বোকাবোকা হাবভাব। ওকে কিছু শেখাতে তো পারিস।’

তিথিকে খুশি করতে গিয়ে সৌরিণ একজন ভাল ছাত্রের মতো অল্পদিনেই নিজের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন এনে ফেলেছে। তিথি তাকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি ভাবে গাইড করছে। তাকে সে চলনেবলনে অনেকটাই পালটে ফেলেছে। ক’দিন আগে তার গ্রামের এক দাদার সঙ্গে শহরে দেখা হয়েছিল। তিনি তাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, কীরে সৌরিণ, বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর থেকে দেখছি, তুই একেবারে নিজেকে অনেকটা পালটে ফেললি। এখন তোকে দেখে কে বলবে, তুই হলি শ্মশানখোলা গ্রামের সৌরিণ? তোর মুখে একসময় অজস্র ব্রণ আর দাগে ভর্তি ছিল। নিশ্চয়ই তোর বউয়ের কল্যানে এটা সম্ভব হয়েছে। সৌরিণ মৃদু হেসে দাদাকে বলল, আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন দাদা। বউ আমাকে ফেসিয়াল করে সব দাগ তুলে দিয়েছে। পোশাকাশাক ইস্তিরি, জুতো কালি করা সবইতো ও করে দেয়।

 দু’জনের নতুন সংসার ভালোই জমে উঠেছিল। তারই মধ্যে আজ একটু তাল কেটে গেল। অবশ্য এই পা ফসকে পড়ে যাবার কারণ হলো তিথির অন্যমনস্কতা। আর সে অন্যমনস্কতা তার মধ্যে এসেছে সৌরিণকে নিয়ে উলটোপালটা ভাবতে গিয়ে। এরজন্য অবশ্য সৌরিণই দায়ী। যে তিথি তাকে পালটে দেবার জন্য এতকিছু করল, তাকে কিনা একদিন বলে বসল, তুমি ভীষণ ব্যাকডেটেট! তোমার দিনেদিনে জৌলুস কমে যাচ্ছে। আমাকে ফিটফাট রাখতে গিয়ে তুমি নিজের প্রতি আজকাল বেশ উদাসীন হয়ে পড়ছো 

শ্মশালখোলা গ্রামের সৌরিণের মুখ থেকে এহেন মন্তব্য শোনার জন্য তিথি মোটেই প্রস্তুত ছিল না। এক প্রান্তিক, অবহেলিত গ্রামের ছেলে সে। যে গ্রামে গুটিকয়েক মাত্র বাড়ির মধ্যে সৌরিণদের একটা বাড়ি। সারা গায়ের সব মরা তাদের বাড়ির কাছেই পোড়ানো হয়। বিয়ে হয়ে এসে সৌরিণের মুখ থেকে তিথি শ্মশানঘাটের মরা পোড়ানোর নানারকম স্মৃতিকথা ছাড়া আর কিচ্ছুটি শুনতে পায়নি। তাতে তিথির মনে হয়েছে এই মানুষটা সারাটা জীবন মানুষের লাশ দেখে দেখেই বড় হয়েছে। তার মুখে ভাল কোনও কথা নেই। শ্মশানকে নিয়েই যতসব কথাবার্তা। বিশেষ করে কমবয়সী ছেলেমেয়েদের রহস্য মৃত্যু কিংবা ফাঁসি মরার পোস্টপার্টাম করা সাদা কাপড়ে ঢাকা রক্তাক্ত দেহকে নিয়ে শববাহকদের কৌতূহল। সেই দেহের সাদা কাপড় সরিয়ে তাদের মধ্যে অ্যানাটমি বিষয়ক আলোচনা। সবই নাকি সৌরিণ ছোটবেলা থেকে শ্মশানের এককোণে দাঁড়িয়ে শুনত। 

সেই সৌরিণকে তিথি নিজের হাতে পালটে দিয়েছে। তার জামা ইস্তিরি থেকে শুরু করে কবে কোন সেটটা পরে অফিসে যাবে সেটা পর্যন্ত  তিথিই ঠিক করে দেয়। সংসার সামলে এসব করতে গিয়ে তিথি নিজের সম্পর্কে কিছুটা হয়তো উদাসীন হয়ে পড়েছে। তাবলে যার কাছে সে আধুনিকতার হাতেখড়ি পেল, তাকে সে কখনও বলতে পারে, আমাদের অফিসের অদিতি কত স্মার্ট। দারুণ সব কালারের শাড়ি পরে রোজ অফিসে আসে। ওর কালারের একটা শাড়ি তোমাকে কিনে দেব। তুমি পরে দেখো, তোমাকে কতটা স্মার্ট লাগবে। তার মানে সৌরিণের কথা থেকে কি এটা বোঝায় না যে, অফিসে গিয়ে কলম পিষতে পিষতে সারাক্ষণ সে ঐ অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ, রঙ মোহিত হয়ে দেখে। এসবতো চরিত্রহীন পুরুষদের কাজ। তিথি অবশ্য সৌরিণকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, খবরদার তুমি তোমার ঐ অদিতির পরা শাড়ির কালারের কোনও শাড়ির আমার জন্য কিনে আনবে না।

‘কেন বলোতো? অদিতি কালারটা পরেছে বলে কি আর কেউ সেটা পরতে পারবে না।’ এসব নিয়েই দু’জনের মধ্যে ক’দিন ধরে চাপানউতোর চলছিল। সেই রাগগোসার জেরেই তিথির আজ পা ফসকালো।

কাপড়গুলো সিঁড়িতে রেখে ব্যথায় কাতরাচ্ছে তিথি। তার হাতের কাছে কোনও মোবাইল ফোনও নেই যে সৌরিণকে ফোনে ব্যাপারটা জানাবে। এখন মোটে তিনটে মতো বাজে। সৌরিণ অফিস ছুটির পর বাড়ি আসতে এখনও প্রায় ঘণ্টাতিনেক বাকি। এতক্ষণ এভাবে পড়ে থাকা কি সম্ভব! ভাবতে ভাবতে তিথি শরীরটাকে নিয়ে কোনওরকমে টেনে হিঁচড়ে তুলে সিঁড়িতে বসল। তারপর বহুকষ্টে হাতের উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে শরীরটাকে নিয়ে কোনওরকমে ঘরে এসে পৌঁছলো। এবার তাকে সেই কাপড়গুলো ইস্তিরি করে আলমারিতে তুলে রাখতে হবে— বিশেষ করে সৌরিণের শার্ট-প্যাণ্ট, রুমাল গেঞ্জি, যা পরে সে আগামীকাল অফিসে যাবে। ইস্তিরিটা হাতে নিয়ে রাগে-অভিমানে তিথির মধ্যে একটা প্রতিবাদী ভাব ফুটে উঠল। ঠিক করল, যে সৌরিণ তাকে এত বড় কথা বলতে পারে, তার জামাকাপড় আর কোনওদিন ইস্তিরি করবে না। সে কিভাবে অফিসে যাবে সেটা নিজেই ঠিক করে নিক। কথাটা ভেবেই তিথি কাপড়গুলো দলামোচড়া করে আলমারিতে ঢুকিয়ে দিয়ে ফ্রীজ থেকে একটুকরো বরফ বের করে কাপড় দিয়ে ব্যাথার জায়গাটা পেঁচিয়ে দিয়ে বিছানায় সটান শুয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল। একসময় ঘুমের ঘোরে শুনতে পেল কলিং বেল বাজছে। কাঁচা ঘুমে কোনওরকমে উঠে খুড়িয়ে খুড়িয়ে দরজাটা খুলে দিতেই দেখল, একটা প্যাকেট হাতে সৌরিণ দাঁড়িয়ে। তিথি কিছু বলার আগেই প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমার জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছি। অভিমানী গলায় তিথি বলল,

‘নিশ্চয়ই অদিতির পছন্দের রঙের শাড়ি।’

‘না না। তুমি এখনও সেই অদিতি নিয়েই পড়ে রয়েছে!’

‘সেদিনতো তুমিতো নিজে মুখে সেটাই বললে। আমার জন্য তোমার অফিসের অদিতির পরা শাড়ির মতো একটা শাড়ি কিনে আনবে।’ মুচকি হেসে সৌরিণ বলল,

‘ওটা একটা কাল্পনিক নাম ম্যাডাম। আসলে আমার অফিসে এ নামে কোনও মেয়েই নেই।’    

‘সত্যি বলছ?’

‘সত্যি-সত্যি-সত্যি। বিশ্বাস না হয় তুমি আমাদের অফিসের মনোজদাকে ফোন করে জেনে নিও।’

‘সে না হয় জানলাম, তা হঠাৎ একটা মেয়ের নাম ধরে কল্পনার আশ্রয় নিতে গেলে কেন শুনি?’

‘আরে ব্যাপারটা হলো আমাদের অফিসে একটা পার্টি হবে। তাতে ঠিক হয়েছে সবার বউদের জয়েন করাটা মাস্ট। সেখানে একটা ফ্যাশান শোয়ে সব বউদেরকে শাড়ি পরে রাম্পে হাঁটতে হবে। তারজন্য প্রাইজ-টাইজও থাকবে। তুমি আবার বাইরে বেরলে শাড়ি পরাটা মোটেই পছন্দ করো না। তাই ভাবলাম, অদিতির নাম ধরে যদি শাড়ির প্রতি তোমার একটা ভাল লাগা তৈরি করা যায়।’ 

 ‘শাড়ি আমি খুব একটা পছন্দ করি না ঠিকই। তবে বড় হয়ে না শাড়ি খুব একটা না পরলেও মেয়েবেলায় অনেক পরেছি। তাবলে একটা ফ্যাশান শোয়ের ডিমাণ্ড অনুযায়ী কেন পরব না?’

‘তাই নাকি! তুমি শাড়ি পরবে! তাহলে তোমার ফার্ষ্ট প্রাইজটা কে ঠেকায়। আগাম বলে দিলাম, সব বউদের মধ্যে তুমিই প্রথম হবে।’ সৌরিণের ভবিষ্যৎ বাণীকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে তিথি প্যাকেট খুলে শাড়িটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।  

‘তোমার পায়ে ব্যাণ্ডেজ কেন? কী হয়েছে পায়ে!’ হঠাৎই তিথির পায়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সৌরিণ। তিথি মুখে খুশির ভাবটা ধরে রেখে বলল, 

‘ও কিছু না। ছাদ থেকে নামতে গিয়ে একটু ব্যথা পেয়েছি

‘কী করে ব্যথা পেলে সোটাতো বলো!’ তিথি নিরুত্তর। ততক্ষণে শাড়ির একটা অংশের ভাঁজ খুলে নিজের সঙ্গে লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সৌরিণ এদিকে ব্যথার জায়গাটা দেখতে তিথির পায়ের কাছে বসে পড়েছে। তিথির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ পরে শাড়ি ছেড়ে কমমেটিকসগুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে বেশ আগ্রহভরে দেখতে লাগল। 

আসলে ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশান ডিজাইনিংয়ের প্রতি তিথির ভীষণ একটা ঝোঁক ছিল। তার খুব মনে হতো সে যদি দূরদর্শনের পর্দায় দেখা সুন্দরী প্রতিযোগীতায় কোনওদিন অংশ গ্রহণ করতে পারত সে ইচ্ছেটা তার কোনওদিনই পূরণ হয়নি। আজ সেটা কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে ভেবে তার ভিতরটায় একটা খুশির ঢেউ বইছে। াতেই খানিক আগেকার তার ব্যথাতুর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়ে তিথির মনে হলো, সে সৌরিণের এই শাড়িটা পরে রাম্পে হাঁটছে। তাকে ঘিরে দর্শকাসনে বসে রয়েছে হাজার হাজার জনতা। তারা তার দিকে হাত নাড়িয়ে বলছে, হাই তিথি, ইউ লুক গর্জিয়াস!

            

 



জীবন যেমন 

জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ শহরের অডিটোরিয়ামে কবিতা পাঠের আসরে  দীপশিখা সেন কবিতা শুনতে গেছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় এনজিও কর্মী হেমন্ত রায়ের সঙ্গে। হেমন্ত কবিতার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। হেমন্ত দীপশিখার ফোন নম্বর নেন। মাঝে মাঝেই গল্প হয় দুজনের। ক্রমশঃ গড়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক। দীপশিখা নিজের ছেলে টুবলুর কথা হেমন্তকে বলেছেন। হেমন্ত টুবলুকে দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। 
           দীপশিখা তাঁর স্বামী সমীরণের ইচ্ছা মতো ঘরোয়া স্ত্রী হতে পারেননি। প্রায় দশ বছরের বিবাহিত জীবন তাঁদের। দীপশিখা শুধু কবিতা শুনতে ভালবাসেন না, একটু আধটু লেখেন। নার্সিং পাশের পর দীপশিখার বৃদ্ধ বাবা চেয়েছিলেন মেয়ের বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে। সমীরণের ব্যাটারির দোকান, নিজস্ব ব্যবসা। পাড়ায় খবর নিয়ে জানা গেছিল চরিত্র ভালো। সমীরণ পাত্র হিসাবে হয়তো খারাপ নন, কিন্তু দীপশিখার সঙ্গে রুচি ও মানসিকতার খুবই তফাৎ। দীপশিখা পেশায় নার্স। তাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে। একদিন সমীরণকে দীপশিখা সরাসরি বলেন," আমাদের মধ্যে শুধু দূরত্ব বেড়ে চলেছে। তুমি চাইলে আমরা আলাদা হতেই পারি।"
সমীরণ যে এত তাড়াতাড়ি রাজী হয়ে যাবেন ভাবতে পারেননি দীপশিখা। সমীরণের বেঁটে ছোটখাটো চেহারা, সে তুলনায় দীপশিখার ছিপছিপে লম্বা গড়ন। পাশাপাশি দুজনকে মানায় না এ কথা ভেবেই সমীরণ দীপশিখার সঙ্গে কোথাও যেতে চাইতেন না! একটা হীনমন্য ভাব কাজ করতো। তবু পুরুষ ইগো কম নেই!
কিছু মাসের মধ্যে ডিভোর্সের পর হেমন্তের সঙ্গে একই শহরে নতুন সংসার পাতেন দীপশিখা। হেমন্ত রায়ের শৌখিন রুচির পরিচয় দীপশিখা আগেই পেয়েছেন। ব্যালকনিতে নানান ক্যাকটাসের টব। হেমন্তর বয়স বছর পঁয়ত্রিশ, দীপশিখার থেকে দু বছরের ছোটই হবেন হয়তো। সমীরণ যতটা রুক্ষ স্বভাবের ছিলেন, হেমন্ত ততটাই রোমান্টিক স্বভাবের মানুষ! বেশ স্মার্ট, ফিটফাট থাকা পছন্দ করেন।
        দীপশিখার প্রথম পক্ষের ছেলে আট বছরের টুবলুও কবিতা ভালবাসে। কোর্টে টুবলুকে নিজের কাছে রাখার কথা দীপশিখাই বলেছিলেন। সমীরণ আপত্তি করেননি। তবে দীপশিখা টুবলুকে মাঝে মধ্যে সমীরণের কাছে পাঠান। এটা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করেন।
      সারা বাংলা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় টুবলু অংশ নেয় এবং প্রথম হয়। স্টেজে পুরস্কার নিতে উঠে টুবলু হেমন্ত রায়ের উৎসাহ দানের কথা বলে স্টেজে হেমন্তকে ডাকে। দীপশিখার আনন্দাশ্রু বাধ মানে না! দীপশিখা টুবলুকে হেমন্তকে কাকু ডাকতে শিখিয়েছেন।
                 দেখতে দেখতে টুবলুর বয়স ষোল পেরিয়ে সতেরো। সংসারের খরচ বেড়েছে। কিন্তু হেমন্তের কোনও ভাবোদয় নেই। আর একটু বেশী সংসার খরচ দেবার কথা দীপশিখা তাঁকে নিজে মুখে বলতে পারেন না। একতলা বাড়িটা হেমন্ত রায়ের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। তাঁর এক বোন আছে। মুম্বাইতে বিয়ে হয়েছে। হেমন্তর বাবা বাস দুর্ঘটনায় মারা যান। কোর্টে চাকরি করতেন। এর পর মাও বেশী দিন বাঁচেননি। রক্তাল্পতা গ্রাস করেছিল। ব্যালকনির ক্যাকটাসগুলোর দিকে তাকিয়ে দীপশিখা ভাবেন শুরুটা ঠিকঠাক হলেও তার সাজানো সংসার ধীরে ধীরে  আধুনিক কবিতার মতো বিমূর্ত হয়ে যাচ্ছে, স্পন্দন হারাচ্ছে। ব্যালকনি থেকে ধূসর পৃথিবীটা দেখেন দীপশিখা! সত্যি মানুষ কত বদলে যায়! সমীরণকে দীপশিখা বুঝতে পারতেন। সমীরণের হীনমন্যতার কারণ জানতেন। কিন্তু হেমন্তকে দীপশিখা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না! হেমন্ত যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। আজকাল কবি সভায় আমন্ত্রণ পেলে কোনও না কোনও অজুহাতে দীপশিখার সঙ্গে যেতে চান না! হেমন্ত টুবলুকেও যেন এড়িয়ে চলেন। ব্যাপারটা টুবলুর চোখে পড়ায় একদিন দীপশিখাকে সরাসরি বলে," কাকু হয়তো আর আমাদের ভালোবাসে না!"
দীপশিখা টুবলুকে বুঝতে দিতে চান না। টুবলুর সুকুমার মুখের দিকে চেয়ে হেসে বলেন," না, না, এরকম কিছু ভাবিস না।"
টুবলুর মায়ের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হয়। সারাদিন হাসপাতালে খাটনির পর ক্লান্ত শরীরে ফিরে রান্না ঘরে ঢোকেন দীপশিখা। মাকে একদিন টুবলু লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছে। 
            দীপশিখা যে হাসপাতালে চাকরি করেন, সেখানে সমীরণ ভর্তি হন। গলায় ক্যান্সার, লাস্ট স্টেজ। সমীরণ নিজের জমানো কিছু টাকা টুবলুর নামে লিখে দিয়েছেন। দীপশিখা সমীরণকে ক্ষমা করে দেন। নিজের ভাগ্যকেই সব কিছুর জন্য দায়ী করেন। সমীরণের শীর্ণ চেহারা দেখে চেনা যায় না।  দু কামরার ভাড়া বাড়িতে কেউ দেখার নেই। নিজের প্রতি অযত্ন শুরু করেছিলেন। দু সপ্তাহ পর দীপশিখার চোখের সামনেই সমীরণ ইহলোক ত্যাগ করেন। টুবলু মুখাগ্নি করে। 
       কালের নিয়মে কয়েকটা মাস দ্রুত কেটে যায়। দেশে ভোট হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। উষ্ণায়ন বাড়ে। কিছু কলকারখানায় উন্নত প্রযুক্তির মেশিন বসায় কিছু লোকের চাকরীও যায়। হেমন্তর চাকরীটা থাকলেও এত বছরে মাইনের সেরকম পরিবর্তন হয়নি। দীপশিখার থেকে ডিভোর্স চান হেমন্ত। তিনি দীপশিখার হাত ধরে বলেন,"শিখা,আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা মরে গেছে। আমার সীমিত আয়। সংসারে বিশেষ টাকা দিতে পারিনি। তুমি প্রায় পুরো দায়ভার বহন করতে করতে বদলে গেছো। আমাদের কি আর একসঙ্গে থাকা উচিত? টুবলুও কেমন মন মরা হয়ে থাকে। ওর জন্য কিছুই করতে পারলাম না! তোমাকে বিয়ের আগে, তোমার টুবলুর দায়িত্ব নেবার আগে আমার বোঝা উচিত ছিল! সমীরণ আমাকে ক্ষমা করেছে কিনা জানি না!"
             দীপশিখাকে তাঁর বিবাহিত জীবনের দুটো অধ্যায়  হতাশা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি! কিন্তু টুবলুর জীবন তো পড়ে আছে। ছেলেকে নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন দীপশিখা। বাহান্ন বছরে এক অদম্য শক্তি নিয়ে চলেছেন তিনি। জীবনের ঢেউ আর কত আলোড়িত হবে জানেন না! তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে যে শিরীষ গাছটা দেখা যায়, সেই গাছে প্রতিদিন কত পাখির আনাগোনা, তার পাশের পার্কে কত মানুষের হেঁটে চলা! জীবনের নিয়মে দিন কেটে গেলেও গ্লানি কি কাটে! দীপশিখা হেমন্তকে সহজেই ডিভোর্স দেন। হেমন্তের মতো দুর্বল প্রকৃতির মানুষ দীপশিখা দুটো দেখেননি। আসলে জীবন যে মুহূর্তে যেমন ভাবে ধরা দেয়,মানুষ সেরকম ভাবেই তাকে গ্রহণ করে! চেনা সুর কখন অচেনা হয় তা বোঝা যায় না!