Sunday, September 1, 2024
কাঞ্চনজঙ্ঘা
পর্ণা চক্রবর্তী
চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই নিমাইয়ের দোকানে বেশ ভিড় লেগে গেল। ছাপা শাড়ি, ছিটের ব্লাউজ সেমিজ পাজামা পাঞ্জাবি এসব নানান জিনিস ভালোই বিক্রি হচ্ছিল অনেক দিন পর। ভিড় বাড়লে নিমাই একা সামলাতে পারছিল না বলে বড় ছেলেকে বলছিল দোকানে এসে বসতে। দীপু আগে গ্যাংটকের একটা হোটেলে চাকরি করতো ,ছোট হোটেল । ওদের পাড়ায় থাকত রমেন দত্ত, সেই লিজে হোটেলটা নিয়েছিল। দীপু বেশ সপ্রতিভ ছেলে , দেখতে ,টেখতেও ভালো। বিএ পাশ করে বসেছিল,চাকরি পায় নি। গরীব বাড়ির ছেলে,এরপর আর বেশিদূর এগোতে পারেনি। রমেনই তখন ওকে এই চাকরিটার কথা বলে।
শেষ দুবছর ধরে সারা পৃথিবীর মানুষ খুব খারাপ ছিল। রমেন হট করে মারা গেল , হোটেলও বন্ধ হয়ে গেল। দুবছর ধরে সেই ইস্তক বাড়িতেই বসে আছে দীপু । চাকরির চেষ্টা করছে কিন্তু এ বাজারে কে এখন ওকে চাকরি দেবে। একটা বাইক থাকলেও হত , ডেলিভারি ম্যানের কোনো চাকরি পেতে পারত। মনমরা হয়ে দোকানে বসে এই সব ভাবে। কদিন পরেই নব বর্ষ , বিক্রি বাটা ভালোই হচ্ছে। বড় রাস্তায় অনেক দিন পর গাজনের সঙ বেরিয়েছে। নিমাই বলল ,"আমাদের ছেলেবেলায় জেলেপাড়া থেকে সঙ বেরুত তখন। চড়কের মেলা হতো। বাবা নিয়ে যেত। কি সব দিন ছিল তখন, বুঝলি দীপু! তখন আমাদের দোকানটা বিক্রি হয়নি, তারপর.…..” বলেএকটু থামল নিমাই ।ওর ছেলে বেলার উৎসবের দিনগুলো মনে পড়ল হঠাৎ করে।এই দারিদ্র আর তার সাথে লাগাতার যুদ্ধ, সব রূপ,রস,গন্ধ যেন শুষে নিয়ে ওর জীবনটাকে ছিবড়ে করে দিয়েছে। শুধু দীপুকে দেখলে একটু বুকে বল পায়, মনে হয় আবার সব ফিরে পাবে।
একটু বেলা বাড়তেই ওদের দেখা যায়। নতুন কাপড় আর লাল গামছা গায়ে কিছু মহিলা পুরুষ মাটির মালসা হাতে নিয়ে ভিক্ষে করছে আর থেকে থেকে "বাবা তারক নাথের চরনের সেবা লাগে, মহাদেএ এ এ এ…..ব বলে ফুকরে উঠছে। শিব দুগ্গা,কালীরা রাস্তায় বেরিয়েছে। গৃহস্থের ঘর থেকে চাল ,আলু, টাকা এসব পায়। দোকানিরাও দেয়, যে যেমন পারে। দীপু দশ টাকা দিল। রোদ প্রখর , বাতাসে আদ্রতার হার বেশ বেশী। শিবের মুখের রঙে ঘামের দানা জমেছে। নিমাই বলে, "একটু জিরিয়ে যাও গো, জল খাবেন নাকি এক ঢোঁক। ফুটপাতের পেছনে দেওয়াল ঘেঁষে রঙচটা প্লাস্টিকের টুলে বসে এক চুমুকে জল শেষ করে মহাদেব একটু হাঁপান।তাঁর মুখটি শীর্ণ, চোখ দুটোতে জমেছে রাজ্যের ক্লান্তি। সারা শরীরে পাকে পাকে সাপের মত জড়িয়ে আছে করাল দারিদ্র্য।বিড়ি খাওয়া কালো ঠোঁট দুটো চেটে খসখসে গলায় বলে, "গত দুবছর এসব বন্দ ছিল,ভালো করি খাওয়া জোটে নি অনেক দিন, বেঁচে থাকব সে ভাবিনি কো। এবার দুটো পয়সা পাব বলে সেই কত দূর থেকে আলাম …, কিন্তু শরীলটা আর দিচ্চে নি ।" কালী বিড়ি ফুঁকতে, ফুঁকতে কার সাথে একটা খসাটে মোবাইলে কথা বলছিল। ফোনটা গোলাপী রঙের ঝলঝলে ব্লাউজের ভেতর চালান করে খড়খড়ে গলায় শিবকে বলল "ওটো দেকি একন, বসি ,বসি ওতো প্যাঁচাল পারতে হবে নি। এখনও অনেক দূর যাওয়ার লাগে।" থতমত শিব ত্রিশূল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, করুণ হাসে। নিমাই ওকে আরো দশ টাকা দেয়। টাকাটা নিয়ে ক্লিষ্ট হেসে মহাদেব হুঙ্কার তোলেন "ববোম ব্যম"। আশপাশের চিৎকার শোরগোলে সে আওয়াজ চাপা পড়ে যায়, শুধু দীপুর বুকের ভিতর সে চিৎকারের রেশ কান্না হয়ে বাজতে থাকে।
হোটেলের কাজটা দীপুর খুব পছন্দের ছিল।হাতের কাছেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। চারপাশটা কেমন ধোঁয়া,ধোঁয়া কুয়াশা মাখা। জঙ্গলে জড়ানো পাহাড়ের সারি আর একটানা ঝিম ধরা ঝিঁঝির ডাক। ওই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার মধ্যে সারাদিন খুব পরিশ্রম করতে হতো দীপুকে। কিন্তু কাজটা করতে ওর এতো ভালো লাগত যে পরিশ্রমটা গায়ে লাগত না। তাছাড়া রমেন ওকে বেশ ভালোও বাসতো। হোটেলটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল রমেনের দীপুও ওর সাথে থাকতে ,থাকতে স্বপ্ন দেখতে শিখছিল। কিন্তু সব হট করে বদলে গেল। গরিব ঘরের ছেলে দীপু, জীবনে সে ভাবে কিছুই পায় নি। হোটেলে কাজ করার সূত্রে কত রকমারী লোক, কত অদ্ভুত জীবন দেখল ও । তার ওপর অমন উদাত্ত প্রকৃতি, কি তার রূপ । সারাদিনের সব ক্লান্তি এক মুহূর্তে উধাও হয়ে যেত কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে দাঁড়ালে। জোৎস্না রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে প্রথম দেখে অনেকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দীপু । দরিদ্র পরিবারের ছেলে, জীবনে কখনো ভাবে নি এমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হবে । সেই পাহাড়ের বরফ চুড়োয় যখন ভোরের আলো ঝলকায়, সূর্যাস্তের সিঁদুরে লাল রং লাগে ,ওর যেন এক অলৌকিক অনুভব হয়। ওই মায়াবী মুহূর্তে বৃন্দাবন পাল লেনের এঁদো পুরোনো স্যাঁতসেঁতে বাড়িটা আর তার লোকগুলোর জন্য দীপুর মন কেমন করে ওঠে।
পৃথিবীটা যে কত বিশাল ,আর জীবন যে কত বড় হতে পারে, সে ভালো বুঝতে পারে দীপু। কিন্তু কি হল! ফুটপাতে বসে এখন জামা কাপড় বেচছে। প্রথম কটা দিন কান্না পেত ওর। সারাদিন ধরে অবিশ্ৰান্ত গাড়ি চলছে আর তারস্বরে হর্ন বাজছে, চিৎকার আর চেঁচামেচি। মাথায় ওর যন্ত্রনা হয় । অথচ দু বছর আগেও কি অদ্ভুত এক নৈঃশব্দের মধ্যে ওর দিন কাটতো। এর মধ্যে বসেই নিমাইরা এত বছর ধরে দোকান চালাচ্ছে যে কি করে কে জানে। নিমাইকে বললে ও বলে "সেই কবে থেকে এ কাজ করচি। সব হলো অব্যেস, বুঝলি না!" দীপুর কষ্টটা নিমাইও বুঝতে পারে, কিন্তু কি করবে। বড় হোটেলে কাজ করতে গেলে আরো পড়াশোনা লাগবে। পয়সা কোথায় পাবে নিমাই? বিকেল হলে রতনের দোকানে চা খেতে যায় দীপু। ট্রাম রাস্তাটা সোজা চলে গেছে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় অব্দি। নেতাজীর মাথার ওপরে চৈত্রের নীল আকাশে সাদা মেঘের মিনার ।সে দিকে তাকিয়ে থাকলে মেঘের ফাঁক দিয়ে যেন উঁকি মারে বরফঢাকা ছায়া ছায়া পাহাড়চূড়া। শেষ অস্তরাগের আলো পড়ে তার মাথার সোনার মুকুটখানা ঝলমল করতে থাকে। দীপু তখন চোখে ঝাপসা দেখে।
টাউন স্কুলের পিছন দিকে গলির ভেতর দীপুদের বাড়িটা অনেক পুরোনো । বহুদিন কোনো সংস্কার হয় নি। সে যাই হোক এবাজারে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তো বটে। দুতিন ঘর ভাড়া আছে বটে, তবে সেই নিমাইয়ের বাবার কাল থেকে আছে বলে ভাড়ার পরিমাণও নাম মাত্র। সেদিন রাত এগারোটা বাজল বাপ ছেলের বাড়ি ফিরতে। কনক বলল "বচ্ছর কার দিন, এক তারিখ একটু মাংস এনো না ,তবে একটু পোলুয়া করি। কত দিন এসব রান্না হয় না।" তপু,হিমি বেশ খুশি হয় । নিমাইকে বলে, "আনো না বাবা, সত্যি এই দুটো বছর তো কোন আনন্দই হয় নি।" নিমাইয়ের বিক্রি ভালোই হচ্ছে, মনটাও ভালো। সে হেসে বলল," হবে হবে।এ দুবছর ধার জমেছে কত সেগুলোও তো শোধ দিতে হবে ।" দীপু চুপচাপ বসে খায়। ওর মুখটা দেখে মনটা খারাপ লাগে নিমাইয়ের। রাতের বেলা স্বামী স্ত্রীতে আলোচনা করে কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পায় না। দীপুও খুব চেষ্টা করেছিল সিকিম না হোক আশে পাশে এমন আরো অনেক জায়গার কোনো হোটেলে যদি কিছু জুটে যায়। ড্রুকপা হোটেলে কাজ করার সময় কিছু জনের সাথে আলাপ হয়েছিল দীপুর। এ কদিন ধরে সবাইকে ফোন করল কিন্তু কেউ তেমন আশার কথা বললনা। দীপুর মনটা ভেঙে যাচ্ছে। বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে। পড়ার ক্ষতি হবে বলে ওকে দোকানে বসতেই দিত না নিমাই। কিন্তু আজকাল আর সবটা সামলাতে পারে না , বয়স হচ্ছে। ভালো টাকার কাজ না পেলে অত দূরে গিয়ে লাভের লাভ কিছু হবে না। দীপু অনেকরাত অব্দি জেগে থেকে নিজের ইচ্ছেগুলোর সাথে লড়াই করতে থাকে।
নিমাইয়ের অনেক দিনের ইচ্ছে ফুটপাথের দোকানটা তুলে একটা পাকা দোকান ঘর নেয়। বাবার দোকানটা ছিল একদম ট্রাম রাস্তার ওপর। তেমন এখন আর কোথায় পাবে তবে ফরিয়া পুকুরের কাছে ছোট একটা দোকান ঘরের সন্ধান পেয়েছে নিমাই। মালিককে চিনত, বিমলদা। ছেলেপুলে নেই, বিমলদার বউ চেনাজানা বিশ্বাসী লোক না পেলে দোকান ভাড়া দেবে না। একটু করে করে যা জমিয়েছিল, গত দুবছর সে সব বসে খেয়েছে। দীপুটার কাজটাও চলে গেল। রাতে ওরও ঘুম আসে না। কনককে বলে," ঘুমোলে?" সারাদিনের খাটা খাটনিতে ক্লান্ত কনক ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কি উত্তর দেয় স্পষ্ট বোঝা যায় না তবুও নিমাই বলে যায় ,"বুঝলে বৌদিকে বলতে হবে আর কটা দিন অপেক্ষা করতে। ভাড়াটা বড় বেশীই চাইছে। তার ওপর সেলামি আছে… নিজের মনেই বকতে থাকে নিমাই আর কনক কনকের মতো ঘুমতে থাকে। "দোকানে কিছু ভালো কোয়ালিটির শাড়ি রাখতে হবে আগের মত। আরো নানা ধরনের জিনিস যেমন ধরো, বেড কভার টেবিল কভার এসবও রাখতে হবে। দীপু যদি সাথে থাকে তাহলে দুবছরের মধ্যে কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিকই হবে, আমার মন বলছে।" মনের ভেতর খুব একটা আশা জাগে নিমাইয়ের। দুদিন পর নববর্ষ , নতুন বছরে সব ভালো হবে। "আগের মতো সব ঠিক হয়ে যাক মা," দেওয়ালে লাগানো মা ভবতারিণীর ছবির দিকে তাকিয়ে মিনতির সুরে প্রার্থনা করে নিমাই।
চড়কের মেলা লেগেছে ছাতুবাবুর বাজারে। পুরো লম্বা টানা রাস্তা ধরে নানান পসরা নিয়ে বসেছে দোকানিরা। সারাদিনই মোটামুটি ভিড় ছিল তবে সন্ধ্যাবেলায় মানুষের ঢল নামল। চারপাশের চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে আনমনে ঘুরে বেড়ায় দীপু। আজকে দোকানে তপু আর হিমি আছে নিমাইয়ের সাথে। মনটা ওর অস্থির একটু। গুল ওস্তাগর লেন দিয়ে ঢুকে এলোমেলো হাঁটে। বিডনরো ধরে হেঁটে, অলিগলি সব পেরিয়ে বড় রাস্তায় পৌঁছয়। চার পাশে বেশীর ভাগ দোকানগুলো সেজে গুজে কালকের হালখাতার জন্য তৈরি হচ্ছে। উৎসবের আনন্দটা জমাট বাঁধছে ধীরে ধীরে।
মনটা ভালো হলো দীপুর দোকানের কাছে এসে। সেই পুরোনো দিনের মতো ভিড় করে লোক জিনিস কিনছে। সব দোকানেই বিক্রিবাটা ভালো হচ্ছে। তবে নিমাইয়ের এই ব্যবসা দুপুরুষের, সে জন্য ওর পরিচিতিও কম না।নিমাই বলে এটাই নাকি ওর আসল মূলধন। হিমি তপু খুব ব্যস্ত। তাড়াতাড়ি কাজে লেগে যায় দীপু। নিমাই ওকে দেখে হেসে বলে, "ভাগ্যিস সকালে তারককে দিয়ে আরো মাল আনিয়ে ছিলাম । শাড়ি পাঞ্জাবি আর পাজামার কাটতিটা বেশ ভালো বুঝলি।" দরদর করে ঘামছে নিমাই। ওর খুশি মুখটা দেখে দীপুর কেমন স্নেহ হয় বাবার ওপর।
নববর্ষ পড়ল শুক্কুর বাড়ে। সকাল সকাল বেরিয়ে ঠনঠনে কালী মন্দিরে গিয়ে পুজো দিল কনক আর নিমাই। সকালে তারক গিয়ে আজ দোকান খুলবে। বাড়ি ফিরে চা বসালো কনক, ছেলে মেয়েকে ডাকল। নিমাই আসার সময় একটু মুরগির মাংস দই মিষ্টি নিয়ে এসেছে। মনটা বেশ ভালো লাগছে সবার। অনেক দিন পর প্রাণ ভরে শ্বাস নিল কনক। সকালের রোদেও যেন সোনা রং ধরেছে। দীপু ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে জানলা দিয়ে তিনকোনা আকাশটা দেখছিল। নির্মেঘ নীল আকাশ। সাদা মেঘের মিনারগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। আবছা পাহাড়, ওর সেই ছায়া ছায়া বরফ চূড়াটাও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। কনক বলে , "মুখ ধুয়ে আয় দীপু, চা খাবি না?" নিমাই ঘরে ঢুকে চুপ করে খানিক ছেলেকে দেখল। "আকাশের দিকে তাকিয়ে কি দেখিস বলত?" নিমাই দীপুর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। "কিছু না তো," অপ্রস্তুত হাসে দীপু। বলে ,"লাভের টাকা এবার থেকে কিন্তু কিছু করে করে জমাতে হবে বাবা। নতুন বছরে প্রথম দিন থেকেই বরং শুরু করে দি। তারপর বেশ কিছু জমলে চলো তোমাদেরকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়ে আনি।"
আধুনিকা
অমলকৃষ্ণ রায়
‘আর ভাল লাগে না। অনেক হয়েছে। এবার কোনওরকমে সংসার থেকে মুক্তি চাই।’ ছাদ থেকে শুকনো কাপড়গুলো তুলে নিতে নিতে তিথি আপনমনে কথাগুলো বলতে থাকে। ‘সৌরিণের আচার আচরণ আর কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।’ ফাঁকা বাড়ির ছাদ থেকে কাপড় হাতে নামতে নামতে তিথি এসবই বিড়বিড় করছিল। অমনি বে-খেয়ালে সিঁড়ির ধাপে পা পিছলে পড়ে গেল। তাতে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেল।
এই অবস্থায় বাড়িতে দ্বিতীয় কেউ নেই। সৌরিণ অফিসে। এসময়ে কেউ যদি ফ্রীজ থেকে এক টুকরো বরফ এনে দিত তো খুব ভাল হতো। কিন্তু দেবেটা কে? কুন্তুলা মাসী দুপুর গড়াবার আগেই হাতের কাজ সেরে বাড়ি চলে গেছে। তাছাড়া এ পাড়ায় তিথিরা নতুন এসেছে। গতমাসে সৌরিণ ভায়েদের থেকে আলাদা হয়ে নতুন বাড়িটাতে গৃহপ্রবেশ করেছে। পাড়ার লোকেদেরকে তাতে নেমন্তন্ন করা হয়েছিল। অনেকে এসেছিল। তারা খেয়েদেয়ে বাড়ির প্রশংসা করে চলে গেছে। তারপর থেকে কেউ আর আসেনি। তাই পাড়ার বউদের সঙ্গে সেভাবে পরিচয় হয়ে উঠেনি। এখন পায়ের ব্যথার জন্য পাশের বাড়ির দিদিকে চিল-চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি করতে তিথির সংকোচ হচ্ছে।
এই বাড়ি করার পিছনে সমস্তরকম প্ররোচনা অবশ্য তিথিরই। এই সংসারে বউ হয়ে আসার আগেই একদিন ফোনে সৌরিণের কাছে দাবি করে বসেছিল,
‘শোন। বিয়ের পর আর যাই করো। আমার কিন্তু একটা নিউক্লিয়ার ফেমিলি চাই। তোমার ঐ চৌদ্দগুষ্টির ভিড়ভাট্টায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে।’
‘আমায় তাহলে কী করতে হবে বলো? বাড়ির লোকজন সব তাড়িয়ে দিয়ে তোমায় নিয়ে থাকব। সেটাই বলতে চাইছ তো?’
‘এরকম একটা উদ্ভট দাবি কেন করতে যাব সৌরিণ?’
‘তাহলে?’
‘ইটস ভেরি সিম্পল। কোথাও একটা নতুন বাড়ি করে তুমি আমায় নিয়ে গিয়ে উঠবে। তাতে তোমার দাদা-বৌদিরাও ছেলেমেয়ে নিয়ে হাতপা ছড়িয়ে থাকতে পারবে। আমরাও আমাদেরও সন্তানকে সুবিধেমতো মানুষ করতে পারব।’
ব্যাপারটাতে সৌরিণ প্রথমে একটু গড়রাজি হয়ে গাইগুই করছিল। তিথি তখন হবুবরকে কথার প্যাঁচে ফেলে হারাতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছিল. শোন, ওরকম কত দেখেছি। আমাদের পাড়ার মৈত্রীবাড়ি। একসময় সারা গাঁয়ের নামকরা যৌথপরিবার ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, জায়ে-জায়ে মিল, ভায়ে-ভায়ে মিল। পাড়ায় কোনও বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হলে উদাহরণ টেনে বলতো, মৈত্রীবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে একঝলক দেখে এসোগে, যৌথ পরিবারে কী করে বাস করতে হয়। পাতের মাছের ঢেলাঢেলি, কার ছেলেমেয়েকে কে তেল মাখিয়ে, চান করিয়ে, খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি করে দিচ্ছে, কে আগে ছুটে গিয়ে বাসি কাপড় ছেড়ে চান করে ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়ছে, কে গিয়ে রান্নাঘরে সবার আগে ঢুকে রান্না বসিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে রীতিমতো হুড়োহুড়ি চলে।
সেই বাড়ির জায়েরাও একদিন ক্লান্ত হয়ে পৃথক বাড়ি করে করে সরে গিয়েছিল। আমার চোখের সামনে চার ভাই উঁচু দেয়াল তুলে চারচারটে বাড়ি করল। জায়েদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। তাই ওসব আদিখ্যেতা করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হবার আগে বরং সরে গেলে নিজেদের মধ্যে আজীবন একটা সৌহার্দপূর্ণ ভাব বজায় থাকবে।
তিথির কথার অকাট্য যুক্তির তোড়ে সৌরিণ সেদিন নিমেষেই ভেসে গিয়েছিল। তাই তিথির দাবিটা মেনে নিয়ে বলেছিল, ‘ঠিক আছে মহারানি। আপনার আদেশ শিরোধার্য। কথা দিচ্ছি বিয়ের কয়েকবছরের মধ্যেই আমার সাধ্যমতো একটা রাজপ্রাসাদ বানিয়ে আমরা রাজরানি সেজে সংসার শুরু করব।’ তারই ফলশ্রুতি হলো তাদের এই নতুন বাড়ি। গৃহপ্রবেশের পরে তিথি একদিন সৌরিণকে বলেছিল, তুমি আমার কথাটা রেখেছ বলে এখন ফাঁকা বাড়িতে কেমন বুক ভরে শ্বাস নিতে পাচ্ছি।
স্ত্রীকে সুখী করে পেরে সৌরিণও খুশি। একজোড়া কপোত-কপোতীর সংসার বেশ হেসে খেলেই চলছে। তিথি এরইমধ্যে একদিন তার দ্বিতীয় ইচ্ছের কথা জানাল। দুটি বা তিনটি নয়, কেবলমাত্র একটি সন্তানের মা হতে চায় সে। সে মেয়ে হোক কিংবা ছেলে। তাতে তার কোনও আপত্তি নেই। সৌরিণ তাতেও সম্মতি জানিয়েছে। তাই এ নিয়ে তাদের মধ্যে পরিকল্পনা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একজন হেলদি বেবির মা হতে গেলে কীভাবে এগোতে হবে, সেসব ব্যাপারে তিথি বান্ধবীদের কাছ থেকে পরামর্শও নিতে শুরু করেছে। সৌরিনও তার অফিসের কলিগ দাদাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছে।
এসবের পাশাপাশি তিথি আরেকটা কাজ করছে। সেটা হলো তার গেয়ো স্বামীকে আধুনিক করে তুলতে গিয়ে তার উপরে বেশকিছু শর্ত আরোপ করেছে— ইস্তিরি ছাড়া পোশাক কখনও পরবে না। কথায় গেয়ো টান একেবারেই নয়। শীগগীরই শহুরে সিলেবল আয়ত্ত করে ফেলতে হবে। অমুকের বরকে দেখেছ, কেমন মেপেঝেপে কথা বলে। কতটা স্মার্ট! নিজেকে শহুরে কালচারে মেশার উপযোগী করে তোল। কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে হ্যাবলার মতো আচরণ করবে না। এটিকেট, ভদ্রতা মেইনটেইন করতে শেখো। পার্টিতে গেলে কেউ যেন বলতে না পারে, ‘কীরে তিথি তোর বরটা অমন হাবার মতো থাকে কেন? কেমন যেন বোকাবোকা হাবভাব। ওকে কিছু শেখাতে তো পারিস।’
তিথিকে খুশি করতে গিয়ে সৌরিণ একজন ভাল ছাত্রের মতো অল্পদিনেই নিজের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন এনে ফেলেছে। তিথি তাকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি ভাবে গাইড করছে। তাকে সে চলনেবলনে অনেকটাই পালটে ফেলেছে। ক’দিন আগে তার গ্রামের এক দাদার সঙ্গে শহরে দেখা হয়েছিল। তিনি তাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, কীরে সৌরিণ, বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর থেকে দেখছি, তুই একেবারে নিজেকে অনেকটা পালটে ফেললি। এখন তোকে দেখে কে বলবে, তুই হলি শ্মশানখোলা গ্রামের সৌরিণ? তোর মুখে একসময় অজস্র ব্রণ আর দাগে ভর্তি ছিল। নিশ্চয়ই তোর বউয়ের কল্যানে এটা সম্ভব হয়েছে। সৌরিণ মৃদু হেসে দাদাকে বলল, আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন দাদা। বউ আমাকে ফেসিয়াল করে সব দাগ তুলে দিয়েছে। পোশাকাশাক ইস্তিরি, জুতো কালি করা সবইতো ও করে দেয়।
দু’জনের নতুন সংসার ভালোই জমে উঠেছিল। তারই মধ্যে আজ একটু তাল কেটে গেল। অবশ্য এই পা ফসকে পড়ে যাবার কারণ হলো তিথির অন্যমনস্কতা। আর সে অন্যমনস্কতা তার মধ্যে এসেছে সৌরিণকে নিয়ে উলটোপালটা ভাবতে গিয়ে। এরজন্য অবশ্য সৌরিণই দায়ী। যে তিথি তাকে পালটে দেবার জন্য এতকিছু করল, তাকে কিনা একদিন বলে বসল, তুমি ভীষণ ব্যাকডেটেট! তোমার দিনেদিনে জৌলুস কমে যাচ্ছে। আমাকে ফিটফাট রাখতে গিয়ে তুমি নিজের প্রতি আজকাল বেশ উদাসীন হয়ে পড়ছো।
শ্মশালখোলা গ্রামের সৌরিণের মুখ থেকে এহেন মন্তব্য শোনার জন্য তিথি মোটেই প্রস্তুত ছিল না। এক প্রান্তিক, অবহেলিত গ্রামের ছেলে সে। যে গ্রামে গুটিকয়েক মাত্র বাড়ির মধ্যে সৌরিণদের একটা বাড়ি। সারা গায়ের সব মরা তাদের বাড়ির কাছেই পোড়ানো হয়। বিয়ে হয়ে এসে সৌরিণের মুখ থেকে তিথি শ্মশানঘাটের মরা পোড়ানোর নানারকম স্মৃতিকথা ছাড়া আর কিচ্ছুটি শুনতে পায়নি। তাতে তিথির মনে হয়েছে এই মানুষটা সারাটা জীবন মানুষের লাশ দেখে দেখেই বড় হয়েছে। তার মুখে ভাল কোনও কথা নেই। শ্মশানকে নিয়েই যতসব কথাবার্তা। বিশেষ করে কমবয়সী ছেলেমেয়েদের রহস্য মৃত্যু কিংবা ফাঁসি মরার পোস্টপার্টাম করা সাদা কাপড়ে ঢাকা রক্তাক্ত দেহকে নিয়ে শববাহকদের কৌতূহল। সেই দেহের সাদা কাপড় সরিয়ে তাদের মধ্যে অ্যানাটমি বিষয়ক আলোচনা। সবই নাকি সৌরিণ ছোটবেলা থেকে শ্মশানের এককোণে দাঁড়িয়ে শুনত।
সেই সৌরিণকে তিথি নিজের হাতে পালটে দিয়েছে। তার জামা ইস্তিরি থেকে শুরু করে কবে কোন সেটটা পরে অফিসে যাবে সেটা পর্যন্ত তিথিই ঠিক করে দেয়। সংসার সামলে এসব করতে গিয়ে তিথি নিজের সম্পর্কে কিছুটা হয়তো উদাসীন হয়ে পড়েছে। তাবলে যার কাছে সে আধুনিকতার হাতেখড়ি পেল, তাকে সে কখনও বলতে পারে, আমাদের অফিসের অদিতি কত স্মার্ট। দারুণ সব কালারের শাড়ি পরে রোজ অফিসে আসে। ওর কালারের একটা শাড়ি তোমাকে কিনে দেব। তুমি পরে দেখো, তোমাকে কতটা স্মার্ট লাগবে। তার মানে সৌরিণের কথা থেকে কি এটা বোঝায় না যে, অফিসে গিয়ে কলম পিষতে পিষতে সারাক্ষণ সে ঐ অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শাড়ির প্রতিটি ভাঁজ, রঙ মোহিত হয়ে দেখে। এসবতো চরিত্রহীন পুরুষদের কাজ। তিথি অবশ্য সৌরিণকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, খবরদার তুমি তোমার ঐ অদিতির পরা শাড়ির কালারের কোনও শাড়ির আমার জন্য কিনে আনবে না।
‘কেন বলোতো? অদিতি কালারটা পরেছে বলে কি আর কেউ সেটা পরতে পারবে না।’ এসব নিয়েই দু’জনের মধ্যে ক’দিন ধরে চাপানউতোর চলছিল। সেই রাগগোসার জেরেই তিথির আজ পা ফসকালো।
কাপড়গুলো সিঁড়িতে রেখে ব্যথায় কাতরাচ্ছে তিথি। তার হাতের কাছে কোনও মোবাইল ফোনও নেই যে সৌরিণকে ফোনে ব্যাপারটা জানাবে। এখন মোটে তিনটে মতো বাজে। সৌরিণ অফিস ছুটির পর বাড়ি আসতে এখনও প্রায় ঘণ্টাতিনেক বাকি। এতক্ষণ এভাবে পড়ে থাকা কি সম্ভব! ভাবতে ভাবতে তিথি শরীরটাকে নিয়ে কোনওরকমে টেনে হিঁচড়ে তুলে সিঁড়িতে বসল। তারপর বহুকষ্টে হাতের উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে শরীরটাকে নিয়ে কোনওরকমে ঘরে এসে পৌঁছলো। এবার তাকে সেই কাপড়গুলো ইস্তিরি করে আলমারিতে তুলে রাখতে হবে— বিশেষ করে সৌরিণের শার্ট-প্যাণ্ট, রুমাল গেঞ্জি, যা পরে সে আগামীকাল অফিসে যাবে। ইস্তিরিটা হাতে নিয়ে রাগে-অভিমানে তিথির মধ্যে একটা প্রতিবাদী ভাব ফুটে উঠল। ঠিক করল, যে সৌরিণ তাকে এত বড় কথা বলতে পারে, তার জামাকাপড় আর কোনওদিন ইস্তিরি করবে না। সে কিভাবে অফিসে যাবে সেটা নিজেই ঠিক করে নিক। কথাটা ভেবেই তিথি কাপড়গুলো দলামোচড়া করে আলমারিতে ঢুকিয়ে দিয়ে ফ্রীজ থেকে একটুকরো বরফ বের করে কাপড় দিয়ে ব্যাথার জায়গাটা পেঁচিয়ে দিয়ে বিছানায় সটান শুয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল। একসময় ঘুমের ঘোরে শুনতে পেল কলিং বেল বাজছে। কাঁচা ঘুমে কোনওরকমে উঠে খুড়িয়ে খুড়িয়ে দরজাটা খুলে দিতেই দেখল, একটা প্যাকেট হাতে সৌরিণ দাঁড়িয়ে। তিথি কিছু বলার আগেই প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, তোমার জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছি। অভিমানী গলায় তিথি বলল,
‘নিশ্চয়ই অদিতির পছন্দের রঙের শাড়ি।’
‘না না। তুমি এখনও সেই অদিতি নিয়েই পড়ে রয়েছে!’
‘সেদিনতো তুমিতো নিজে মুখে সেটাই বললে। আমার জন্য তোমার অফিসের অদিতির পরা শাড়ির মতো একটা শাড়ি কিনে আনবে।’ মুচকি হেসে সৌরিণ বলল,
‘ওটা একটা কাল্পনিক নাম ম্যাডাম। আসলে আমার অফিসে এ নামে কোনও মেয়েই নেই।’
‘সত্যি বলছ?’
‘সত্যি-সত্যি-সত্যি। বিশ্বাস না হয় তুমি আমাদের অফিসের মনোজদাকে ফোন করে জেনে নিও।’
‘সে না হয় জানলাম, তা হঠাৎ একটা মেয়ের নাম ধরে কল্পনার আশ্রয় নিতে গেলে কেন শুনি?’
‘আরে ব্যাপারটা হলো আমাদের অফিসে একটা পার্টি হবে। তাতে ঠিক হয়েছে সবার বউদের জয়েন করাটা মাস্ট। সেখানে একটা ফ্যাশান শোয়ে সব বউদেরকে শাড়ি পরে রাম্পে হাঁটতে হবে। তারজন্য প্রাইজ-টাইজও থাকবে। তুমি আবার বাইরে বেরলে শাড়ি পরাটা মোটেই পছন্দ করো না। তাই ভাবলাম, অদিতির নাম ধরে যদি শাড়ির প্রতি তোমার একটা ভাল লাগা তৈরি করা যায়।’
‘শাড়ি আমি খুব একটা পছন্দ করি না ঠিকই। তবে বড় হয়ে না শাড়ি খুব একটা না পরলেও মেয়েবেলায় অনেক পরেছি। তাবলে একটা ফ্যাশান শোয়ের ডিমাণ্ড অনুযায়ী কেন পরব না?’
‘তাই নাকি! তুমি শাড়ি পরবে! তাহলে তোমার ফার্ষ্ট প্রাইজটা কে ঠেকায়। আগাম বলে দিলাম, সব বউদের মধ্যে তুমিই প্রথম হবে।’ সৌরিণের ভবিষ্যৎ বাণীকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে তিথি প্যাকেট খুলে শাড়িটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।
‘তোমার পায়ে ব্যাণ্ডেজ কেন? কী হয়েছে পায়ে!’ হঠাৎই তিথির পায়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সৌরিণ। তিথি মুখে খুশির ভাবটা ধরে রেখে বলল,
‘ও কিছু না। ছাদ থেকে নামতে গিয়ে একটু ব্যথা পেয়েছি।’
‘কী করে ব্যথা পেলে সোটাতো বলো!’ তিথি নিরুত্তর। ততক্ষণে শাড়ির একটা অংশের ভাঁজ খুলে নিজের সঙ্গে লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সৌরিণ এদিকে ব্যথার জায়গাটা দেখতে তিথির পায়ের কাছে বসে পড়েছে। তিথির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ পরে শাড়ি ছেড়ে কমমেটিকসগুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে বেশ আগ্রহভরে দেখতে লাগল।
আসলে ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশান ডিজাইনিংয়ের প্রতি তিথির ভীষণ একটা ঝোঁক ছিল। তার খুব মনে হতো সে যদি দূরদর্শনের পর্দায় দেখা সুন্দরী প্রতিযোগীতায় কোনওদিন অংশ গ্রহণ করতে পারত। সে ইচ্ছেটা তার কোনওদিনই পূরণ হয়নি। আজ সেটা কিছুটা হলেও বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে ভেবে তার ভিতরটায় একটা খুশির ঢেউ বইছে। তাতেই খানিক আগেকার তার ব্যথাতুর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়ে তিথির মনে হলো, সে সৌরিণের এই শাড়িটা পরে রাম্পে হাঁটছে। তাকে ঘিরে দর্শকাসনে বসে রয়েছে হাজার হাজার জনতা। তারা তার দিকে হাত নাড়িয়ে বলছে, হাই তিথি, ইউ লুক গর্জিয়াস!








