মায়ের আগমনে
মায়ের আগমনে
সাঁঝবাতি
সায়ন্তন ঘোষ
:প্রথম অংশ:
অসিতবাবু সন্ধ্যাবেলায় হাট থেকে ফিরে বাইরে উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন সবে। সারাদিন ক্লান্তির পর একটু চোখ বুঁজে জিইয়ে নেওয়ার পালা। বউমা এসে পাশে একটি ঘটিতে জল দিয়ে বললো, "বাবা আমি তুলসী তলায় সাঁঝবাতি জ্বালিয়ে এসে আপনাকে খাবার দিচ্ছি। আপনি ততক্ষণ চোখে জল দিয়ে একটু বিশ্রাম করুন।" বলেই কুয়োরপাড়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে চলে গেলো। অসিতবাবু বউমাকে সাবধানে কাজ করতে বললেন, কারণ সে গর্ভবতী। চার বছর হলো তার স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলে পুলিশের চাকরি করে, সারাদিন ডিউটি করে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই বউমার সুবিধা অসুবিধা দেখার দায়িত্ব শ্বশুরমশাইয়ের ওপরেই বর্তায়। যাই হোক, কুয়োরপাড় থেকে ঘরে গিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরে, হাতে পূজার থালা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে বউমা। তুলসীতলার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে প্রণাম করে প্রদীপ, ধূপ দেখালো এবং শাঁখ বাজালো। প্রতিদিনের মতো ওই এক সময়েই একসাথে গাঁয়ের আসে পাশের বাড়ি থেকে বা যতদূর পর্যন্ত শ্রবণশক্তি প্রখর থাকে ততদূর থেকে শঙ্খধ্বনি শোনা গেলো। অসিতবাবু মাথা তুলে হাতজোড় করে প্রণাম করলেন। ঠিক এমন সময়ে গাঁয়ের দৃশ্য পরিবর্তিত হয়। মেঠো পথ দিয়ে রাখাল বালক ফিরে যায় গরুর পাল নিয়ে। পাখিরা তাদের বাড়ি ফিরে আসে। ছোটো ছোটো পুকুর থেকে হাঁসগুলো উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে আসে গ্রামে। সোনালী, রিয়া, ইমরান, বিট্টুরা মাঠ থেকে ঘরে যায়। তাদের এখন বই খুলে 'অ'-এ অজগর আসছে তেড়ে বা এক এক্কে এক, দুই এক্কে দুই পড়ার সময় হয়েছে। সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে যেন প্রাণ টা জুড়িয়ে যায় অসিতবাবুর, সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
সন্ধ্যা নামতেই তাদের বাড়িতে যেনো আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। হঠাৎ তার ছেলে এসে আনন্দে চিৎকার করে বাবাকে তার প্রমোশনের সংবাদ দেয়। অসিতবাবুর ছেলে অমল পুলিশের এএসআই। সে এখন এসআই হয়ে শহরে পোস্টিং পেয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে সেখানে জয়েন করতে হবে। অতএব অমল শহরে গিয়ে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে সপরিবারে থাকবে বলে মনস্থির করে। চাকরিসূত্রে যেতেই হবে, আর অমল একা থাকতে চায় না, তাই মন থেকে না চাইলেও ছেলের কথা ভেবে অসিতবাবু গ্রাম ছেড়ে যেতে রাজী হলেন। চার দেওয়ালের দম বন্ধ পরিবেশ, চারিদিকে কোলাহল, শব্দদূষণ, জনসমুদ্রের কথা ভেবে মনে কালো মেঘ জমেছে ঠিকই কিন্তু তবুও তো যেতেই হবে। অবশেষে সেসব অতিক্রম করে তারা তাদের ফ্ল্যাটে পৌঁছলেন।
:দ্বিতীয় অংশ:
(ছয় বছর পরে)
অসিতবাবু দুপুরের খাবার খেয়ে চারতলার ব্যালকনিতে বসে আছেন। নিচে তাকিয়ে দেখলেন তার নাতি স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। এসেই দাদুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই কয়েক বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। শহরে এসে অমলের ছেলে হলো, এখন সে বড় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। তার বউমা এখন শহুরে মেয়েদের মতই জিন্স ধরেছে। নাতির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সাথে পাল্লা দিতেই নাকি তার এই পরিবর্তন। সেই অমল এখন অনেকটাই পরিবর্তিত। এই তো সেদিন শরীরটা খারাপ লাগছিল। দূর থেকেই বললো বয়স হলে এমন হয়। মনে মনে কষ্ট হলো, এতটা দূরে চলে গেছি? হয়তো শহুরে জীবন এমনই হয়। তবে মানসিক শান্তি মেলে যখন একমাত্র নাতি এসে বুকে জড়িয়ে দাদু বলে ডাকে, যেন পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে, বুকে ছড়িয়ে যায় গ্রামের হিমশীতল হাওয়া। আজ তুলসীতলা দেখে মনে হয় ছোটো হতে হতে লুপ্তপ্রায়। সেখানে সন্ধ্যায় সাঁঝবাতি আর জ্বলেনা। তার বদলে ইলেকট্রিকের প্রদীপ জ্বলে সারারাত ধরে। রাখাল আর গরু নিয়ে রাস্তায় বের হয় না। পাশের ফ্ল্যাটে অ-এ অজগর এর পরিবর্তে A for Apple শোনা যায়। সেদিন পাশের ঘরের ছোটো শিশুকে অ-এ অজগর চেনাতে গিয়ে তার মায়ের কাছে শুনতে হলো 'বোকা বুড়ো'। ওসব নাকি এখানে চলেনা, ওসব এখন backdated হয়ে গেছে। আসলে অসিতবাবু এখন বাতিল হওয়া বুড়োর দলে। হয়তো এটাই, শহুরে জীবন।
একদিন সন্ধ্যায় কৃত্রিম প্রদীপ জ্বালাতে এসে তার নাতি বলছিলো, "দাদু, তুমি সকালে মা কে বলেছিলে না আজকে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাতে। মা খুব রাগ করেছিলো। আমি জ্বালিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমায় বলো what is সাঁঝবাতি?" অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো এটাই পরিবর্তন, এটাই পার্থক্য, শহর আর গ্রামের। মনে মনে ভাবলেন, অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি, কারণ বর্তমান প্রজন্মকে সাঁঝবাতি চেনাতে পারিনি। দাদু তার নাতিকে আকাশের দিকে দেখিয়ে বললেন, সাঁঝবাতিরা এখন অনেক দূরে চলে গেছে। ওই যে মিটমিট করছে, ওটাই সাঁঝবাতি।
আমার ছেলেবেলা
অতনু মৈত্র
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ছেলেবেলার কিছু ঘটনা থাকে যা আমৃত্যু পর্যন্ত মনে থেকে যায়। ছেলেবেলার স্মৃতি বড়োই সুখকর হয়ে থাকে। আমার জীবনের সেইরকম কয়েকটি ভুলে না যাওয়া সাধারণ ঘটনাই এখানে রোমন্থন করছি।
আমার বয়স তখন সাত-আট বছর হবে, আমাদের বাড়ির কিছুটা দূরে একটা পুকুর ছিল। ঐ পুকুরের পাড়ে একটা বড়ো মাটির ঢিবি ছিল। মাঝে মাঝে আমরা বন্ধুরা মিলে যেতাম ঐ ঢিবির উপরে ডিকবাজী খেতে। ডিকবাজী খেতে খেতে গড়িয়ে ঢিবির নীচে আসার মজাটাই আলাদা ছিল। মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো, কে সবার আগে গড়িয়ে ঢিবির নীচে নামতে পারে। ঢিবির মাঝে বরাবর কয়েকটি ছোট ছোট গর্ত ছিল। যদিও আমরা কোনদিন দেখার চেষ্টা করিনি ঐ গর্তের ভিতরে কি আছে? এইরকমই একদিন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ডিকবাজীর প্রতিযোগিতা চলছিল। গড়িয়ে নিচে নামতে নামতে অনুভব করলাম পিঠে ঠান্ডা কি একটা স্পর্শ করলো। ডিকবাজী খাওয়ার আনন্দে তখন কিছুই মনে হয়নি। নীচে আসার পর উপরে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। দেখলাম প্রায় দেড় হাত লম্বা একটা সাপ যন্ত্রণায় ছটপট করছে। আমার এক বন্ধু ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করে "সাপ সাপ"। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কিছুটা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, আমাদের চিৎকার শুনে তিনি ছুটে আসেন। কাছে এসে তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন "কি হয়েছে?" এক বন্ধুর কাছে তিনি পুরো বর্ণনা শুনে ঢিবির উপরের দিকে তাকান। সাপটিকে দেখে তিনিও ভীতি প্রদর্শন করেন। বলেন "আরে এটা তো শাঁখামুটী সাপ, তোমাদের কাউকে কামড়ায়নি তো?" আমরা সমস্বরে উওর দিলাম "না"। জবাব শুনে তিনি বললেন "তোমরা আজ বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছো, ঐ সাপ কামড়ালে আর রক্ষে থাকতো না। আর কোন দিন এদিকে এসো না"। সত্যি সেদিনের পড়ে আর কোনদিন সেই মাটির ঢিবিতে আর খেলতে যাইনি।
আরোও একটু বড়ো হলাম, তখন আমার বয়স বারো কি তেরো বছর হবে। বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন ছিল। তারপর একমাসের লম্বা ছুটি। তাই মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল। কয়েকজন বন্ধু সাইকেলে করে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরছিলাম। ফেরার পথে একটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাগান দেখলাম। বাগানের একপাশে একটা পেয়ারা গাছ ছিল। গাছটিতে পাকা পাকা পেয়ারা ফলে রয়েছে। দেখে বড়ো লোভ হলো, বন্ধু দের বললাম "চল পেয়ারা পাড়ি"। যেই বলা সেই কাজ, সাইকেল গুলো ব্যাগ সমেত পাঁচিলের পাশে রেখে, পাঁচিল টপকে গাছে উঠে আনন্দে পেয়ারা খেতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে অবশ্য একজন বলেছিল, যদি কেউ দেখে নেয় তাহলে কি হবে? আমি তখন তাকে বলেছিলাম "এই ভরদুপুরে কে তোকে দেখবে?" সেই সুপক্ক পেয়ারার স্বাদই আলাদা ছিল। আমরা পেয়ারা পাড়তে এতটাই মশগুল ছিলাম, আশে পাশে কে কি করছে সেটা নজরে আসেনি। আমার এক বন্ধু কয়েকটি পেয়ারা পেড়ে ব্যাগে রাখতে দিয়ে দেখে, আমাদের সাইকেল গুলো আছে কিন্তু ব্যাগগুলো নেই। সে চিৎকার করে আমাদের ডাকলো। তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে দৌড়ে ছুটে এসে দেখলাম সত্যি সাইকেল থেকে ব্যাগ গুলো উধাও। দূরে দেখলাম লাইট পোষ্টের গায়ে দাঁড় করানো একটি সাইকেলের উপরে আমাদের ব্যাগ গুলো ঝোলানো। আর তার পাশে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের বুঝতে বাকি রইলো না, তিনিই সেই বাগানের মালিক। চুড়ির আনন্দ, ধরা পড়ে যাওয়ার ভীতিতে বদলে গেলো। ভদ্রলোকটির কাছে গিয়ে বললাম "কাকু এই ব্যাগগুলো আমাদের"। ভদ্রলোক একটু মুচকি হেসে বললেন "তোমরা স্কুলে গিয়ে কিছু্ই শেখোনি, তাই এই ব্যাগগুলো আমার কাছেই থাক। ওগুলো তোমাদের স্কুলের হেডমাস্টার মশাইকে জমা দিয়ে আসবো। তোমরা উনার থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে নিও। যাও এখন পেয়ারা পারো। " এটা শুনে আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলাম, বললাম "কাকু আর হবে না। প্লিজ ছেড়ে দিন"। এসব শোনার পর, ভদ্রলোক একটু মুচকি হেসে ব্যাগ সমেত সাইকেল নিয়ে হাঁটা দিলেন। আমরাও গেলাম তার পিছনে। কিছুটা দূরে পাঁচিল দেওয়া একটি বাড়িতে তিনি ঢুকলেন। বুঝলাম এটা উনার বাড়ি। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভদ্রলোক বাড়িতে ঢুকতেই উনার মা বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন "এতোগুলো ব্যাগ কোথা থেকে আনলি?" তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন “এঁরা কারা?" ভদ্রলোক জবাব দিলেন " তুমি পড়াশোনা করবে তাই নিয়ে এলাম, আর ওরা আমাদের বাগানে পিয়ারা পারছিল।" এইকথা শুনে বয়স্কা ভদ্রমহিলা সব বুঝতে পারেন। একটু মুচকি হেসে তিনি বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন। তখন ভদ্রলোকটি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন "তোমারা দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও পেয়ারা পারো, না হয় বাড়িতে যাও"। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম, একজন বন্ধুতো আবার কান্না জুড়ে দিলো। আমরা সমবেত ভাবে ভদ্রলোকটিকে বিভিন্ন অনুনয় বিনয় করতে লাগলাম। এমন সময় সেই বয়স্কা ভদ্রমহিলা বেড়িয়ে এলেন। তাঁর দুই হাতে একথালা মিস্টি এবং একজগ জল। আমাদের তিনি ডাকলেন। ভদ্রলোকটি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন "যাও মা তোমাদের ডাকছেন"। আমরা গেট খুলে তাঁর কাছে যেতেই তিনি বললেন "এগুলো খেয়ে নাও, স্কুল ছুটির পর তো কিছুই খাওয়া হয়নি। এটাই তোমাদের শাস্তি। না বলে কারো বাগান থেকে কিছু নিলে, সেটাকে চুড়ি বলে। আর কোনদিন এরকম কাজ করোনা"। তারপর উনি তাঁর ছেলেকে উদ্যেশ্য করে বললেন "তুইও পারিস বটে, কটা পেয়ারাই তো নিয়েছে। ব্যাগগুলো দিয়ে দে"। ভদ্রলোক তখন বাধ্য ছেলের মতো ব্যাগগুলো ফেরত দিয়ে বলেছিলেন "যখন পেয়ারা খেতে ইচ্ছে করবে আমার কাছে আসবে। ওভাবে গাছে উঠবে না, আঘাত লাগতে পারে"। মিষ্টিগুলো খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিলাম সেদিন। ঘটনাটি খুবই সাধারণ, কিন্তু ভদ্রলোকটির শিক্ষা দেবার পদ্ধতি এবং ঐ বয়স্কা ভদ্রমহিলার অমায়িক মিষ্টি ব্যবহার মন ছুঁয়ে গেছিলো সেদিন।
আর একটু বড়ো হলাম, পাড়ার ক্রিকেট এবং ফুটবল টিমের নিয়মিত সদস্য হয়ে উঠলাম। পাড়ার পূজা পার্বণ, আচার অনুষ্ঠান সমস্ত রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতো। মহালয়ার আগের দিন পাড়ার ক্লাবে বন্ধুদের সাথে রাতজেগে পিকনিক, তারপর চলতো চুরি। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন চুরি। কারো গাছের ডাব-নারিকেল, কারো আখের ঝাড় কেটে সাফ্, আবার কারো গাছের বাতাবি লেবু ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক সময় যেই বাড়িতে চুরি করতে যেতাম, সেই বাড়ির কূলপ্রদীপও আমাদের সাথে থাকতো। তবে বছরে ঐ একটা দিনই আমরা এসব কাজ করতাম। পাড়ার বড়োরাও এসব জানতেন। কখনো ধরা পড়লে একটু ভৎসনা করে ছেড়ে দিতেন।
কোন এক মহালয়ার রাতের একটা চুরির ঘটনাই আজ বলবো। এক বাড়িতে নারিকেল গাছে উঠেছি ডাব পাড়তে। গাছটা একটু উঁচু ছিল, আর পাঁচিলের ধারে ছিল। আমি গাছের ওপর থেকে পাঁচিলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন বন্ধুকে ডাব চালান করছিলাম। তারাও সেগুলো নীচে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের চালান করছিল। অকস্মাৎ একটা ডাব আমার হাত ফসকে নীচে মাটিতে পড়ে যায়। সেই আওয়াজে বাড়ির মালিক আলো জ্বেলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। নীচের সবাই ততোক্ষণে যে যার মতো পগাড় পাড়। কিন্তু এই অধম গাছের উপর আটকে পড়লাম। নিজেকে যথেষ্ট আড়াল করার চেষ্টা করেছিলাম, তবুও ভদ্রলোক টর্চের আলোয় আমার একটি পা দেখে নেন। আর তৎক্ষণাৎ তাঁর চিৎকার শুরু হয়ে যায়। বেগতিক দেখে কয়েকটি দোমালা নারিকেল ভদ্রলোকটির চারিপাশে ছুড়তে লাগলাম। এতে উনি খুব ভয় পেয়ে যান। তারপর উনি দৌড়ে বাড়ির বারান্দায় ঢুকে চিৎকার করতে থাকেন। সেই সুযোগে কোনরকমে গাছ থেকে নেমে পালিয়ে বেঁচেছিলাম সেদিন। বুকে অনেকটা কেটে গেছিলো, তবু ধরা না পড়ার আনন্দ সেই কষ্টকে ছাপিয়ে গেছিলো।
আর একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। ঘটনাটি ঘটেছিল কোন এক শীতের সন্ধ্যায়। মাধ্যমিক পাশ করে science নিয়ে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছি। তখনকার সমাজ বলাবাহুল্য এখন কার মতো এতোটা প্রাপ্ত বয়স্ক ছিল না। দুটি কিশোর কিশোরী পাশাপাশি হেঁটে গেলে পাশ দিয়ে গুঞ্জন শোনা যেতো। যাদের কিশোরী জুটতো তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতো, আর যাদের জুটতো না। তারা ছিল ঐ আঙুর ফল টকের দলে। আমি তখন ঐ দ্বিতীয় দলেই পড়তাম। এক শীতের সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশনি করে সাইকেলে করে ফিরছিলাম। আমার কিছুটা সামনে একজোড়া রোমিও, জুলিয়েট সাইকেলে করে পাশাপাশি যাচ্ছিল। জুলিয়েটের ডান হাত রোমিওর সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে ছিল। রাস্তাটা একটু সরু ছিল। উল্টো দিক থেকে একটা বেরসিক মারুতি চলে এলো। অগত্যা জুলিয়েট রোমিওর সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিল। কারন দুজনে এভাবে পাশাপাশি গেলে মারুতি যেতে পারবে না। জুলিয়েট সামনে চলে গেলো, রোমিও তার পিছনে। আর এই অধম ছিলাম ঠিক রোমিওর পিছনে। আমার একটু তাড়া ছিল, তাই মারুতি চলে যাবার পর, রোমিওকে পাশ কাটিয়ে যেই জুলিয়েটকে পাশ কাটাতে যাবো। তখনই দূর্ঘটনা ঘটে গেলো। জুলিয়েট খপ্ করে আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো "বাড়িতে গিয়ে এখন তুমি কি করবে?" । প্রথমে একটু অবাক হলেও পরোক্ষনেই বুঝতে পেরেছিলাম, আসল ব্যাপারটা। উত্তর দিলাম "একটু ছোটবাইরে যাবো "। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অবাক দৃষ্টিতে জুলিয়েট তাকাল আমার দিকে। আমি মুচকি হেসে সেদিন জুলিয়েটকে জবাব দিয়েছিলাম "wrong number, আমি না পিছনে আসছে"।
আমি মেয়ে বলে!
আপরোজা খাতুন
জীবনের ভালোবাসা
নিত্য রঞ্জন
আর আসিবো না
মাতালের মতন করে এই শরৎ আকাশে
সাদা সাদা মেঘ নীল আকাশে
বুঝিনি নিজের কাছে
এই নদী আমারে চেনে না
গভীরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়
কি নিয়ে যায় জানি না নিজের গভীরে কে করে
নিজের কাছে নিজেরে বেঁধেছি
বিচারের আদালতে কাঠগড়ায় জীবন দাঁড়িয়ে
আমি যে মুচির মতন চেয়ে আছি
আকাশের দিকে, ভেবেছি জীবন কি নিয়ে
মাপা যায় আলো আসে আমারে ডাকে
আমি যে আমারে ডাকি না
কিবা আছে দাম হাজার জেলখানা
হাত বাড়িয়ে থাকে কিছু না পায়
ভোরের জোৎস্না আমারে কাঁদায়
কেঁদে কি হবে! ভালোবাসার ফুল গেছে একা-একা ঝরে
বুঝিবার কেউ নয় হৃদয়ের ঘরে মন করে চুরি
জানি না এ জীবনের কি খেলা কবে হবে শেষ
আঁধারে শেষ দেখা তারাদের আকাশে
ছবির মতো আঁকা, আপন ঘরে শিশু খেলা করে
সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে কে তুমি নারী
আপনারে ছাড়ি বাড়িয়ে দিলে হাত
বলিলে মৃদু স্বরে ভালোবাসি হৃদয়ে আছে তরি
ডুবিয়ে দিয়ো না
কৃষকের ফসলের খেতের মতো
কাকতাড়ুয়া একা-একা দাঁড়িয়ে আছে
সারা জীবন দাঁড়িয়ে আছে
থাকিবে দাঁড়িয়ে জীবনের তাড়া তাড়িয়ে
মনের মন করে খেলা দূরে আছি বেঁচে আছি
ভালোলাগার গান গেয়ে
উঠানে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার জোৎস্না বুকের
এক তাড়াটা বাজে
আজ যে তার সুর তারাটা গেছে ছিঁড়ে।
খুশির ঢেউ দেখে যা
আমি অ্যামাজনের ঘাস
প্রভু হে
আমায় কেউ মনে রাখেনি
বর্তমান
বিজয়কৃষ্ণ সরকার
মহামায়ার নানান রূপ
মাম্পী রায়
উৎসব শুরু।
মুজনাই অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা অনলাইন উৎসব সংখ্যা ১৪২৭