Saturday, October 31, 2020


 

 

 

 

 

 

 

 

 মায়ের আগমনে

       কমলেশ মণ্ডল

  মায়ের আগমনী সুর বাঁধা এই ধরাধামে। 
দশভূজা রূপে অবতীর্ণ হয়ে ভরিয়ে তুলেছে দশদিক। ভয়াবহ মহামারীর দিনেও খুশির রঙ ধরেছে সবার চোখে, মনের দরবারে।মনে হয় মার আগমনে,মার ডাকে মহামারীও ঠিক বিলুপ্তির পথে। সকলেই বাঁচার আসা খুঁজে পেয়েছে।মনে একটু শান্তি, আশ্বাস নেমে এসেছে। পুজোমন্ডপে সাজের বাহার, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নানান রকমারি কারুকার্য। নিত্যনতুন চমক দেখা মেলে পুজো মন্ডপে ও বিভিন্ন ক্লাবে ক্লাবে।নব যুবক, যুবতী, বয়স্ক ও নবদম্পতির হৃদয়ে ধরেছে ডানা। সকলেই কর্মের মধ্যে ব্যস্ত থেকেও যেনো তাদের মধ্যে একটা অকৃত্রিম আনন্দ জেগে উঠেছে। কেউবা মায়ের ভোগ কিংবা বিভিন্ন পঞ্চব্যঞ্জন স্বাদে ভরা খাবার,নাড়ু,পায়েস,পিঠে তৈরিতে সদা করেছে নিয়োজিত। জিবন হয়ে উঠেছে ঠিক প্রানবন্ত।মাকে কাছে  পেয়ে নতমস্তকে জীবন সকলেই করেছে অর্পন। পুজোর ডালা নিয়ে সকলেই মায়ের পদতলে ঠাঁই নিয়েছে। চারিদিক যেনো শুভ শুভ ভাষা বয়ে চলেছে। করজোড়ে ঢাকের তালে সব্বাই হয়েছে মাতোয়ারা।

         মা এবার সকলের কায়মনোবাক্য পূর্ণ করবে নিশ্চয়।যে যার ইচ্ছে সব কিছুই চেয়ে নিয়েছে মনের আঙিনায়।
প্রেমরাশি প্রস্ফুটিত হয়েছে হৃদয় কাননে। পৃথিবীতে নেমেছে শান্তিছায়া,প্রকৃতি ভাসিয়ে দিচ্ছে অবিরত প্রেম। সমিরন,গগন,খোলামাঠ , চন্দ্র, সূর্য,
জোতিস্ক, নক্ষত্র সকলেই যেন একাকার হয়ে মায়ের সরণাগত। তাই ধরিত্রীর উঠোন অমলীন সুখে বিরাজমান।।


 

 

 

 

 

 

 

 

 

সাঁঝবাতি

সায়ন্তন ঘোষ

:প্রথম অংশ:

          অসিতবাবু সন্ধ্যাবেলায় হাট থেকে ফিরে বাইরে উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন সবে। সারাদিন ক্লান্তির পর একটু চোখ বুঁজে জিইয়ে নেওয়ার পালা। বউমা এসে পাশে একটি ঘটিতে জল দিয়ে বললো, "বাবা আমি তুলসী তলায় সাঁঝবাতি জ্বালিয়ে এসে আপনাকে খাবার দিচ্ছি। আপনি ততক্ষণ চোখে জল দিয়ে একটু বিশ্রাম করুন।" বলেই কুয়োরপাড়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে চলে গেলো। অসিতবাবু বউমাকে সাবধানে কাজ করতে বললেন, কারণ সে গর্ভবতী। চার বছর হলো তার স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলে পুলিশের চাকরি করে, সারাদিন ডিউটি করে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই বউমার সুবিধা অসুবিধা দেখার দায়িত্ব শ্বশুরমশাইয়ের ওপরেই বর্তায়। যাই হোক, কুয়োরপাড় থেকে ঘরে গিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরে, হাতে পূজার থালা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে বউমা। তুলসীতলার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে প্রণাম করে প্রদীপ, ধূপ দেখালো এবং শাঁখ বাজালো। প্রতিদিনের মতো ওই এক সময়েই একসাথে গাঁয়ের আসে পাশের বাড়ি থেকে বা যতদূর পর্যন্ত শ্রবণশক্তি প্রখর থাকে ততদূর থেকে শঙ্খধ্বনি শোনা গেলো। অসিতবাবু মাথা তুলে হাতজোড় করে প্রণাম করলেন। ঠিক এমন সময়ে গাঁয়ের দৃশ্য পরিবর্তিত হয়। মেঠো পথ দিয়ে রাখাল বালক ফিরে যায় গরুর পাল নিয়ে। পাখিরা তাদের বাড়ি ফিরে আসে। ছোটো ছোটো পুকুর থেকে হাঁসগুলো উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে আসে গ্রামে। সোনালী, রিয়া, ইমরান, বিট্টুরা মাঠ থেকে ঘরে যায়। তাদের এখন বই খুলে 'অ'-এ অজগর আসছে তেড়ে বা এক এক্কে এক, দুই এক্কে দুই পড়ার সময় হয়েছে। সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে যেন প্রাণ টা জুড়িয়ে যায় অসিতবাবুর, সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়।

          সন্ধ্যা নামতেই তাদের বাড়িতে যেনো আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। হঠাৎ তার ছেলে এসে আনন্দে চিৎকার করে বাবাকে তার প্রমোশনের সংবাদ দেয়। অসিতবাবুর ছেলে অমল পুলিশের এএসআই। সে এখন এসআই হয়ে শহরে পোস্টিং পেয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে সেখানে জয়েন করতে হবে। অতএব অমল শহরে গিয়ে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে সপরিবারে থাকবে বলে মনস্থির করে। চাকরিসূত্রে যেতেই হবে, আর অমল একা থাকতে চায় না, তাই মন থেকে না চাইলেও ছেলের কথা ভেবে অসিতবাবু গ্রাম ছেড়ে যেতে রাজী হলেন। চার দেওয়ালের দম বন্ধ পরিবেশ, চারিদিকে কোলাহল, শব্দদূষণ, জনসমুদ্রের কথা ভেবে মনে কালো মেঘ জমেছে ঠিকই কিন্তু তবুও তো যেতেই হবে। অবশেষে সেসব অতিক্রম করে তারা তাদের ফ্ল্যাটে পৌঁছলেন।

:দ্বিতীয় অংশ:

(ছয় বছর পরে)

          অসিতবাবু দুপুরের খাবার খেয়ে চারতলার ব্যালকনিতে বসে আছেন। নিচে তাকিয়ে দেখলেন তার নাতি স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। এসেই দাদুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই কয়েক বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। শহরে এসে অমলের ছেলে হলো, এখন সে বড় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। তার বউমা এখন শহুরে মেয়েদের মতই জিন্স ধরেছে। নাতির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সাথে পাল্লা দিতেই নাকি তার এই পরিবর্তন। সেই অমল এখন অনেকটাই পরিবর্তিত। এই তো সেদিন শরীরটা খারাপ লাগছিল। দূর থেকেই বললো বয়স হলে এমন হয়। মনে মনে কষ্ট হলো, এতটা দূরে চলে গেছি? হয়তো শহুরে জীবন এমনই হয়। তবে মানসিক শান্তি মেলে যখন একমাত্র নাতি এসে বুকে জড়িয়ে দাদু বলে ডাকে, যেন পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে, বুকে ছড়িয়ে যায় গ্রামের হিমশীতল হাওয়া। আজ তুলসীতলা দেখে মনে হয় ছোটো হতে হতে লুপ্তপ্রায়। সেখানে সন্ধ্যায় সাঁঝবাতি আর জ্বলেনা। তার বদলে ইলেকট্রিকের প্রদীপ জ্বলে সারারাত ধরে। রাখাল আর গরু নিয়ে রাস্তায় বের হয় না। পাশের ফ্ল্যাটে অ-এ অজগর এর পরিবর্তে A for Apple শোনা যায়। সেদিন পাশের ঘরের ছোটো শিশুকে অ-এ অজগর চেনাতে গিয়ে তার মায়ের কাছে শুনতে হলো 'বোকা বুড়ো'। ওসব নাকি এখানে চলেনা, ওসব এখন backdated হয়ে গেছে। আসলে অসিতবাবু এখন বাতিল হওয়া বুড়োর দলে। হয়তো এটাই, শহুরে জীবন।

          একদিন সন্ধ্যায় কৃত্রিম প্রদীপ জ্বালাতে এসে তার নাতি বলছিলো, "দাদু, তুমি সকালে মা কে বলেছিলে না আজকে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাতে। মা খুব রাগ করেছিলো। আমি জ্বালিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমায় বলো what is সাঁঝবাতি?" অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো এটাই পরিবর্তন, এটাই পার্থক্য, শহর আর গ্রামের। মনে মনে ভাবলেন, অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি, কারণ বর্তমান প্রজন্মকে সাঁঝবাতি চেনাতে পারিনি। দাদু তার নাতিকে আকাশের দিকে দেখিয়ে বললেন, সাঁঝবাতিরা এখন অনেক দূরে চলে গেছে। ওই যে মিটমিট করছে, ওটাই সাঁঝবাতি।


 

 

 

 

 

 

 

 

আমার ছেলেবেলা 

অতনু মৈত্র

 

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ছেলেবেলার কিছু ঘটনা থাকে যা আমৃত্যু পর্যন্ত মনে থেকে যায়। ছেলেবেলার স্মৃতি বড়োই সুখকর হয়ে থাকে। আমার জীবনের সেইরকম কয়েকটি ভুলে না যাওয়া সাধারণ ঘটনাই এখানে রোমন্থন করছি।

আমার বয়স তখন সাত-আট বছর হবে, আমাদের বাড়ির কিছুটা দূরে একটা পুকুর ছিল। ঐ পুকুরের পাড়ে একটা বড়ো মাটির ঢিবি ছিল। মাঝে মাঝে আমরা বন্ধুরা মিলে যেতাম ঐ ঢিবির উপরে ডিকবাজী খেতে। ডিকবাজী খেতে খেতে গড়িয়ে ঢিবির নীচে আসার মজাটাই আলাদা ছিল। মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো, কে সবার আগে গড়িয়ে ঢিবির নীচে নামতে পারে। ঢিবির মাঝে বরাবর কয়েকটি ছোট ছোট গর্ত ছিল। যদিও আমরা কোনদিন দেখার চেষ্টা করিনি ঐ গর্তের ভিতরে কি আছে? এইরকমই একদিন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ডিকবাজীর প্রতিযোগিতা চলছিল। গড়িয়ে নিচে নামতে নামতে অনুভব করলাম পিঠে ঠান্ডা কি একটা স্পর্শ করলো। ডিকবাজী খাওয়ার আনন্দে তখন কিছুই মনে হয়নি। নীচে আসার পর উপরে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। দেখলাম প্রায় দেড় হাত লম্বা একটা সাপ যন্ত্রণায় ছটপট করছে। আমার এক বন্ধু ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করে "সাপ সাপ"। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কিছুটা দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, আমাদের চিৎকার শুনে তিনি ছুটে আসেন। কাছে এসে তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন "কি হয়েছে?" এক বন্ধুর কাছে তিনি পুরো বর্ণনা শুনে ঢিবির উপরের দিকে তাকান। সাপটিকে দেখে তিনিও ভীতি প্রদর্শন করেন। বলেন "আরে এটা তো শাঁখামুটী সাপ, তোমাদের কাউকে কামড়ায়নি তো?" আমরা সমস্বরে উওর দিলাম "না"। জবাব শুনে তিনি বললেন "তোমরা আজ বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছো, ঐ সাপ কামড়ালে আর রক্ষে থাকতো না। আর কোন দিন এদিকে এসো না"। সত্যি সেদিনের পড়ে আর কোনদিন সেই মাটির ঢিবিতে আর খেলতে যাইনি।

আরোও একটু বড়ো হলাম, তখন আমার বয়স বারো কি তেরো বছর হবে। বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন ছিল। তারপর একমাসের লম্বা ছুটি।  তাই মনটা আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল। কয়েকজন  বন্ধু সাইকেলে করে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরছিলাম। ফেরার পথে একটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাগান দেখলাম। বাগানের একপাশে একটা পেয়ারা গাছ ছিল। গাছটিতে পাকা পাকা পেয়ারা ফলে রয়েছে। দেখে বড়ো লোভ হলো, বন্ধু দের বললাম "চল পেয়ারা পাড়ি"। যেই বলা সেই কাজ,  সাইকেল গুলো ব্যাগ সমেত পাঁচিলের পাশে রেখে, পাঁচিল টপকে গাছে উঠে আনন্দে পেয়ারা খেতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে অবশ্য একজন বলেছিল, যদি কেউ দেখে নেয় তাহলে কি হবে? আমি তখন তাকে বলেছিলাম "এই ভরদুপুরে কে তোকে দেখবে?" সেই সুপক্ক পেয়ারার স্বাদই আলাদা ছিল। আমরা পেয়ারা পাড়তে এতটাই মশগুল ছিলাম, আশে পাশে কে কি করছে সেটা নজরে আসেনি। আমার এক বন্ধু কয়েকটি পেয়ারা পেড়ে ব্যাগে রাখতে দিয়ে দেখে, আমাদের সাইকেল গুলো আছে কিন্তু ব্যাগগুলো নেই। সে চিৎকার করে আমাদের ডাকলো। তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে দৌড়ে ছুটে এসে দেখলাম সত্যি সাইকেল থেকে ব্যাগ গুলো উধাও। দূরে দেখলাম লাইট পোষ্টের গায়ে দাঁড় করানো একটি সাইকেলের উপরে আমাদের ব্যাগ গুলো ঝোলানো। আর তার পাশে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের বুঝতে বাকি রইলো না, তিনিই সেই বাগানের মালিক। চুড়ির আনন্দ, ধরা পড়ে যাওয়ার ভীতিতে বদলে গেলো। ভদ্রলোকটির কাছে গিয়ে বললাম "কাকু এই ব্যাগগুলো আমাদের"। ভদ্রলোক একটু মুচকি হেসে বললেন "তোমরা স্কুলে গিয়ে কিছু্ই শেখোনি, তাই এই ব্যাগগুলো আমার কাছেই থাক। ওগুলো তোমাদের স্কুলের হেডমাস্টার মশাইকে জমা দিয়ে আসবো। তোমরা উনার থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে নিও। যাও এখন পেয়ারা পারো। " এটা শুনে আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলাম, বললাম "কাকু আর হবে না। প্লিজ ছেড়ে দিন"। এসব শোনার পর, ভদ্রলোক একটু মুচকি হেসে ব্যাগ সমেত সাইকেল নিয়ে হাঁটা দিলেন। আমরাও গেলাম তার পিছনে। কিছুটা দূরে পাঁচিল দেওয়া একটি বাড়িতে তিনি ঢুকলেন। বুঝলাম এটা উনার বাড়ি। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভদ্রলোক বাড়িতে ঢুকতেই উনার মা বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন "এতোগুলো ব্যাগ কোথা থেকে আনলি?" তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন “এঁরা কারা?" ভদ্রলোক জবাব দিলেন " তুমি পড়াশোনা করবে তাই নিয়ে এলাম, আর ওরা আমাদের বাগানে পিয়ারা পারছিল।" এইকথা শুনে বয়স্কা ভদ্রমহিলা সব বুঝতে পারেন। একটু মুচকি হেসে তিনি বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন। তখন ভদ্রলোকটি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন "তোমারা দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও পেয়ারা পারো, না হয় বাড়িতে যাও"। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম, একজন বন্ধুতো আবার কান্না জুড়ে দিলো। আমরা সমবেত ভাবে ভদ্রলোকটিকে বিভিন্ন অনুনয় বিনয় করতে লাগলাম। এমন সময় সেই বয়স্কা ভদ্রমহিলা বেড়িয়ে এলেন। তাঁর দুই হাতে একথালা মিস্টি এবং একজগ জল। আমাদের তিনি ডাকলেন। ভদ্রলোকটি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন "যাও মা তোমাদের ডাকছেন"। আমরা গেট খুলে তাঁর কাছে যেতেই তিনি বললেন "এগুলো খেয়ে নাও, স্কুল ছুটির পর তো কিছুই খাওয়া হয়নি। এটাই তোমাদের শাস্তি। না বলে কারো বাগান থেকে কিছু নিলে, সেটাকে চুড়ি বলে। আর কোনদিন এরকম কাজ করোনা"। তারপর উনি তাঁর ছেলেকে উদ্যেশ্য করে বললেন "তুইও পারিস বটে, কটা পেয়ারাই তো নিয়েছে। ব্যাগগুলো দিয়ে দে"। ভদ্রলোক তখন বাধ্য ছেলের মতো ব্যাগগুলো ফেরত দিয়ে বলেছিলেন "যখন পেয়ারা খেতে ইচ্ছে করবে আমার কাছে আসবে। ওভাবে গাছে উঠবে না, আঘাত লাগতে পারে"। মিষ্টিগুলো খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিলাম সেদিন। ঘটনাটি খুবই সাধারণ, কিন্তু ভদ্রলোকটির শিক্ষা দেবার পদ্ধতি এবং ঐ বয়স্কা ভদ্রমহিলার অমায়িক মিষ্টি ব্যবহার মন ছুঁয়ে গেছিলো সেদিন।

আর একটু বড়ো হলাম, পাড়ার ক্রিকেট এবং ফুটবল টিমের নিয়মিত সদস্য হয়ে উঠলাম। পাড়ার পূজা পার্বণ, আচার অনুষ্ঠান সমস্ত রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতো। মহালয়ার আগের দিন পাড়ার ক্লাবে বন্ধুদের সাথে রাতজেগে পিকনিক, তারপর চলতো চুরি। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন চুরি। কারো গাছের ডাব-নারিকেল, কারো আখের ঝাড় কেটে সাফ্, আবার কারো গাছের বাতাবি লেবু ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক সময় যেই বাড়িতে চুরি করতে যেতাম, সেই বাড়ির কূলপ্রদীপও আমাদের সাথে থাকতো। তবে বছরে ঐ একটা দিনই আমরা এসব কাজ করতাম। পাড়ার বড়োরাও এসব জানতেন। কখনো ধরা পড়লে একটু ভৎসনা করে ছেড়ে দিতেন।

কোন এক মহালয়ার রাতের একটা চুরির ঘটনাই আজ বলবো। এক বাড়িতে নারিকেল গাছে উঠেছি ডাব পাড়তে। গাছটা একটু উঁচু ছিল, আর পাঁচিলের ধারে ছিল। আমি গাছের ওপর থেকে পাঁচিলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন বন্ধুকে ডাব চালান করছিলাম। তারাও সেগুলো নীচে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিদের চালান করছিল। অকস্মাৎ একটা ডাব আমার হাত ফসকে নীচে মাটিতে পড়ে যায়। সেই আওয়াজে বাড়ির মালিক আলো জ্বেলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। নীচের সবাই ততোক্ষণে যে যার মতো পগাড় পাড়। কিন্তু এই অধম গাছের উপর আটকে পড়লাম। নিজেকে যথেষ্ট আড়াল করার চেষ্টা করেছিলাম, তবুও ভদ্রলোক টর্চের আলোয় আমার একটি পা দেখে নেন। আর তৎক্ষণাৎ তাঁর চিৎকার শুরু হয়ে যায়। বেগতিক দেখে কয়েকটি দোমালা নারিকেল ভদ্রলোকটির চারিপাশে ছুড়তে লাগলাম। এতে উনি খুব ভয় পেয়ে যান। তারপর উনি দৌড়ে বাড়ির বারান্দায় ঢুকে চিৎকার করতে থাকেন। সেই সুযোগে কোনরকমে গাছ থেকে নেমে পালিয়ে বেঁচেছিলাম সেদিন। বুকে অনেকটা কেটে গেছিলো, তবু ধরা না পড়ার আনন্দ সেই কষ্টকে ছাপিয়ে গেছিলো।

আর একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। ঘটনাটি ঘটেছিল কোন এক শীতের সন্ধ্যায়। মাধ্যমিক পাশ করে science নিয়ে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছি। তখনকার সমাজ বলাবাহুল্য এখন কার মতো এতোটা প্রাপ্ত বয়স্ক ছিল না। দুটি কিশোর কিশোরী পাশাপাশি হেঁটে গেলে পাশ দিয়ে গুঞ্জন শোনা যেতো। যাদের কিশোরী জুটতো তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতো, আর যাদের জুটতো না। তারা ছিল ঐ আঙুর ফল টকের দলে। আমি তখন ঐ দ্বিতীয় দলেই পড়তাম। এক শীতের সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশনি করে সাইকেলে করে ফিরছিলাম। আমার কিছুটা সামনে একজোড়া রোমিও, জুলিয়েট সাইকেলে করে পাশাপাশি যাচ্ছিল। জুলিয়েটের ডান হাত রোমিওর সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে ছিল। রাস্তাটা একটু সরু ছিল। উল্টো দিক থেকে একটা  বেরসিক মারুতি চলে এলো। অগত্যা জুলিয়েট রোমিওর সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিল। কারন দুজনে এভাবে পাশাপাশি গেলে মারুতি যেতে পারবে না। জুলিয়েট সামনে চলে গেলো, রোমিও তার পিছনে। আর এই অধম ছিলাম ঠিক রোমিওর পিছনে। আমার একটু তাড়া ছিল, তাই মারুতি চলে যাবার পর, রোমিওকে পাশ কাটিয়ে যেই জুলিয়েটকে পাশ কাটাতে যাবো। তখনই দূর্ঘটনা ঘটে গেলো। জুলিয়েট খপ্ করে আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো "বাড়িতে গিয়ে এখন তুমি কি করবে?" । প্রথমে একটু অবাক হলেও পরোক্ষনেই বুঝতে পেরেছিলাম, আসল ব্যাপারটা। উত্তর দিলাম "একটু ছোটবাইরে যাবো "। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অবাক দৃষ্টিতে জুলিয়েট তাকাল আমার দিকে। আমি মুচকি হেসে সেদিন জুলিয়েটকে জবাব দিয়েছিলাম "wrong number, আমি না পিছনে আসছে"।



 

 

 

 

 

 

 

 

আমি মেয়ে বলে!

 আপরোজা খাতুন

আমার জন্মে খুশি হয়নি কেউই,মাকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছিল,আমি মেয়ে বলে!
আনন্দের বদলে বুকে টেনে নিয়ে মা অঝোর ধারে কেঁদেছিল,আমি মেয়ে বলে!
আমার জন্মে কোনো মঙ্গলশঙ্খ বাজেনি,কোনো প্রদীপ জ্বলেনি,হয়নি কোনো মিষ্টি মুখ,আমি মেয়ে বলে!
নামকরা কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়,পড়েছি পাড়ার স্কুলে, আমি মেয়ে বলে!
সন্ধ্যার পর খুব দরকার সত্ত্বেও বাইরে যাওয়া যাবে না,আমি মেয়ে বলে!
পড়ার অদম্য ইচ্ছে থাকলেও স্কুল পেরিয়ে কলেজের গন্ডিতে পা রাখলেও এগোতে পারিনি,আমি মেয়ে বলে!
বিয়ে নামক প্রথার নাম করে বিসর্জন দেবার আগে একবারও জানতে চাওয়া হয়নি আমার পছন্দ-অপছন্দ,আমি মেয়ে বলে!
সংসার,ঘরকন্না মেনে নিয়ে নিজের ইচ্ছে,স্বপ্ন,অস্তিত্বকে টুটি চিপে হত্যা করতে হয়, আমি মেয়ে বলে!
খিদে পেলেও সকলের খাওয়া শেষে এঁটোকাঁটা খেতে হয়,আমি মেয়ে বলে!
নিজের প্রিয়জনের কাছে যেতেও আমায় অনুমোদন পেতে হয়,আমি মেয়ে বলে!
বাপের বাড়ি,শ্বশুরবাড়ি এত বাড়ি সত্ত্বেও নিজের বলতে কিছুই নেই,আমি মেয়ে বলে!
দশমাস,দশদিন কষ্ট করে,প্রসবের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও সন্তানের পরিচয় হয়না আমার নামে,আমি মেয়ে বলে!
পুরুষের শত আঘাত,অত্যাচার,নির্যাতন মুখ বুজে নীরবে সইতে হয়,আমি মেয়ে বলে!
জননী,কন্যা,প্রিয়সী,ভগিনী শত ভূমিকা পালন করেও সমাজের কাছে আমার ভূমিকা নগন্য,আমি মেয়ে বলে!
সত্যিই কি আমি এতখানি অবহেলার যোগ্য?আমি মেয়ে বলে!


 

 

 

 

 

 

 

 

হেরে যাওয়া
ফিরোজ হক

এভাবেই ভেঙে যায় নীড়
সমঝোতা করতে করতে ভেঙে যায় মেরুদন্ড
আমি হা করে তাকিয়ে থাকি নীলাকাশের দিকে
আর ভাবি, এভাবেই হেরে যায় মানুষ
হারিয়ে যায় মানুষ...


 

 

 

 

 

 

 

 

 দীপ জ্বালি

 চুমকি দাস

আঁধার ঘুচে আলো জ্বলে,
আলোর উৎসব দীপাবলীতে ।

অসুর বিনাশিনী মুন্ডমালিনী
মায়ের রুদ্ররূপের পূজোও সেদিন।
মা- কে আচঁড়ে খাবার আগে-
ছিন্নমস্তক রুপ স্মরণে রেখো।

সবে এসো দীপাবলীতে-
সমাজের বুকে প্রদীপ জ্বালি।


 

 

 

 

 

 

 

 

ঠিক যেমন হারিয়ে যাচ্ছি আমি
 সাত্যকি

রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে রয়েছে ঘর 
কিছু আসবার ধুলো ছেটানো 
কিছু মুখ ছবির ভূমিকায় 
তাদের শব্দ সংকট,স্বরহীন 
কতকগুলো মুখ দর্শক ভূমিকায় 

সামনে পথ মুহুর্মুহু ছুটছে গাড়ি 
পাশের নরম জঙ্গল 
ওখানে শিশিরের দেখা মিলতে পারে
এখন তো শিশিরের সময় 

ঘাস সরাচ্ছি,জঙ্গল ভেদ করে চলেছি
শিশির কোথায়?এখন তো শিশিরের মাস...

গুমোট হাওয়া গায়ে লাগছে 
আকাশ চাদরে ঢেকেছে মুখ
নোংরা মলিন একটা চাদর 
ঘাসের উপর খুঁজে চলেছি শিশির
হঠাৎ করেই জল গড়িয়ে পড়ল গায়ে 
তারপর ভিজতে লাগল শরীর 
এরপর আর শিশির খোঁজা হয় নি 
শিশির ভেসে গেছে আশ্বিন জলে...

                                           


 

 

 

 

 

 

 

 

পাহাড় ও নদী 
নবনীতা

তোমার আমার মাঝে ভালোলাগা যা কিছু আছে ,
তা একটা নদী হয়ে বয়ে যাক পাহাড়ের আঁকে বাঁকে ৷
আর যা কিছু খারাপলাগা ...
তা পাহাড় হয়ে জমে থাক ঐ নদীর ফাঁকে ফাঁকে ৷
নদী ছুঁয়ে যায় অনেক কিছু ....
পাহাড় ছুঁতে পারে না ৷
আমি একটা নীল পাহাড়ে দাঁড়িয়ে 
একটা পাংশু চাঁদের ক্ষত মেপে যাই রোজ ৷
সেই মুহূর্তের প্রেক্ষিতে
ভালো আর খারাপ যুগপৎ আটকে থাকে 
আমার ভাবলেশহীন চোখের তারায় ৷
স্তিমিত বিস্ময়ে আজকাল ঘোর জাগে ....
কুয়াশার কামড়ে ক্রমশ জটিল হয় পাহাড়ি রাস্তারা ...৷
নদীর গতি বাঁক নেয় 
আরও একটি পাহাড় ছোঁবে বলে ৷৷


 

 

 

 

 

 

 

 

সমাজ
অদিতি মুখার্জী (সেনগুপ্ত) 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজটা আজ বড়ই মজাদার ,
হেথায় শৈশবের আখ্যান হয় ছেলেবেলা, মেয়েবেলা শব্দটি মেলা বড্ড ভার। 
পুরুষকে বলে বেটাছেলে, নারী হেথা মেয়েছেলে, 
এখানকার অভিদানটা বড্ডই হাস্যকর।। 
সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় নজর কারে - 
বধূ নির্যাতন, কন্যাভ্রুন হত্যা, এ সকল খবর। 
কখনও পুরুষ নারীর রক্ষক, আবার সেই কখনও ভক্ষক -
ইতিহাসের নিদারুণ সাক্ষী "পদ্মিনীর জৌহর"।।
ইংরেজের বিরুদ্ধে বীরাঙ্গনা লক্ষ্মীবাঈ তুলেছিল তলোয়ার, 
শহীদ হয়েছিল হাসিমুখে মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদেদার।
নারী তবুও চিহ্নিত অবলা হিসাবে সর্বত্র সর্বদা, 
কিন্তু হায়!পূজার বেলায় নারী শক্তিই পূজিত সর্বথা।। 
চলো তবে  জয় মা বলে ভিরাও তরী,
প্রমাণ করতে হবেই হবে পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এদিনের নারী।।


 

 

 

 

 

 

 

 

 জীবনের ভালোবাসা
                        নিত্য রঞ্জন 

 
আর আসিবো না
মাতালের মতন করে এই শরৎ আকাশে
সাদা সাদা মেঘ নীল আকাশে
বুঝিনি নিজের কাছে
এই নদী আমারে চেনে না
গভীরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়
কি নিয়ে যায় জানি না নিজের গভীরে কে করে
নিজের কাছে নিজেরে বেঁধেছি
বিচারের আদালতে কাঠগড়ায় জীবন দাঁড়িয়ে
আমি যে মুচির মতন চেয়ে আছি
আকাশের দিকে, ভেবেছি জীবন কি নিয়ে
মাপা যায় আলো আসে আমারে ডাকে
আমি যে আমারে ডাকি না
কিবা আছে দাম হাজার জেলখানা
হাত বাড়িয়ে থাকে কিছু না পায়
ভোরের জোৎস্না আমারে কাঁদায়
কেঁদে কি হবে!  ভালোবাসার ফুল গেছে একা-একা ঝরে
বুঝিবার কেউ নয় হৃদয়ের ঘরে মন করে চুরি
জানি না এ জীবনের কি খেলা কবে হবে শেষ
আঁধারে শেষ দেখা তারাদের আকাশে
ছবির মতো আঁকা, আপন ঘরে শিশু খেলা করে
সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে কে তুমি নারী
আপনারে ছাড়ি বাড়িয়ে দিলে হাত
বলিলে মৃদু স্বরে ভালোবাসি হৃদয়ে আছে তরি
ডুবিয়ে দিয়ো না
কৃষকের ফসলের খেতের মতো
কাকতাড়ুয়া একা-একা দাঁড়িয়ে আছে
সারা জীবন দাঁড়িয়ে আছে
থাকিবে দাঁড়িয়ে জীবনের তাড়া তাড়িয়ে
মনের মন করে খেলা দূরে আছি বেঁচে আছি
ভালোলাগার গান গেয়ে
উঠানে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার জোৎস্না বুকের
এক তাড়াটা বাজে
আজ যে তার সুর তারাটা গেছে ছিঁড়ে।


 

 

 

 

 

 

 

 

খুশির ঢেউ দেখে যা 

মজনু মিয়া 

আনন্দ আজ ঘরে ঘরে 
পূজার ধুমধাম সরোবরে 
কি মজা পায় খুকি, 
পূজার আয়োজনে সে দেয় 
আড়ে আড়ে উঁকি। 

যখন বাজে বাদ্য বাজনা 
কে দেখে তার খুশির নাচনা 
পরে নতুন জামা, 
কার কথা কে শোনে বলো? 
তোরা একটু থামা! 

ওর খুশিতে ভালো লাগছে 
মনে শান্তি সুখ যে জাগছে 
যখন শোনে উলু, 
দৌড়ে আসে তাদের কাছে 
সাথে বাজায় তালু।


 

 

 

 

 

 

 

 

আমি অ্যামাজনের ঘাস

শ্যামল কুমার রায়

আমি অ্যামাজনের ঘাস গো বাবু! 
চিনতে পারলে নে?
এই তো ক'দিন আগেই,
তোমরা বাবুরা রাতের আঁধারে
ডলে দিলে আমার যৌবন।
দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিলে আমায়
তোমরা নাকি ওখানে মধু খুঁজে পেয়েছো?
তাই তো সরিয়ে দিলে আমায়।
কিন্তু মারতে পারলে না!
অনেকটা দূর থেকে দেখি তোমাদের
চেয়ে দেখেছো, আমরা আবার বাড়ছি? 
তবে আমরা তোমাদের সরিয়ে নয় গো,
সঙ্গে নিয়ে বাঁচবো।


 

 

 

 

 

 

 

  

প্রভু হে

 অমিতাভ সরকার

 তোমারই দেওয়া চোখে
              তোমারই প্রকৃতি দেখি
পাইনা তোমারে হেরিতে 
              এ তবে কেমন আঁখি ।

তোমারই দেওয়া নাকে
              গন্ধ পাই আমি,
তোমারই দেওয়া কানে 
              কত সুর, ধ্বনি শুনি।

তোমারই দেওয়া জিভে
              আস্বাদ কত সব,
তোমারই দেওয়া ত্বকে 
               কত না অনুভব।

তোমারই দেওয়া মনে
              কত যে ভাসে স্মৃতি,
তোমারই দেওয়া প্রানে
              আনন্দ- দুঃখ- প্রীতি ।

তুমি যে দিলে মোরে 
               আমারে প্রাণ ভরে,
না হেরি, না বুঝি তোমায়
              ব্যর্থ জীবন মোর-এ।

ধন্য কর প্রভু
             পুর্ণ কর মোরে,
এ মোহজাল ভেঙ্গে
              তোমাতে সঁপি নিজেরে।


 

 

 

 

 

 

 

 

 আমায় কেউ মনে রাখেনি 

 প্রনব রুদ্র

যাদের মনে রাখবার কথা ছিলো-
তার কেউ দু'বার ফোনই করেনি।
এক সময় যাদের বুদ্ধি-পরামর্শ, টাকা-কড়ি-সময় ইত্যাদি
 সহযোগে সাহায্য করেছি ;
তারা তৃতীয় বারও সাহায্য চেয়েছে-
শুধু আমাকে মনে রাখেনি; ব্যক্তি মননের খোঁজ করেনি।

জীবনের অভিধানে হয়তো কৃতজ্ঞ শব্দটা আছে, থাকেও;
চলার পথে বেশিরভাগ যে অবস্থান বিন্দুটা পাই,
তা আসল পরিচয়ে হয় কৃতঘ্ন।
আমি অকৃতজ্ঞ নই, আমি অকৃতঘ্ন।
তোমাদের ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে আছি।

ব্যক্তিগত সমস্যায় নিমজ্জিত থেকে বুঝলাম
যৌন চাহিদার মতো শারীরিক এ জীবন,
অস্তিত্ব ফুরিয়ে ফেলেছে- এইতো জীবনের অনির্বায চলা
চলনগতিতে অন্যত্বেরবোধ সহজাত, জোরলব্ধ নয়।

আমাকে কেউই নোটিশ করেনি,
বিগত ছ'দিন যে সারমেয়কে খাবার দিলাম;
আজ সেও পাশ দিয়ে নির্বিকার চলে গেলো!
অথচ একদা সে কতো সুন্দর লেজটি নাড়তো,
মিষ্ট কতো কথা বলতো, যথেষ্ট শিক্ষিতও ছিলো,
কিন্তু যেই জানতে চাইলাম- "লেজ যে নাড়ছ,
সব সত্য জেনে আর স্বীকার করেই তো?"
অমনি দূর থেকে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো!

অবশ্য, অধিকাংশ সমস্যা যদি আমরা দেখি
দেখতে পাই, অন্যের জন্যই সর্বদা তৈরী হয়
নিজের তেমন কোন দোষ থাকে না
এবং অন্য পক্ষটিও এমনটাই ভাবে।

আসলে সত্যটা এই যে-
আমি মনে রেখেছি 
 আমাকে কেউ মনে রাখেনি 
যাদের মনে রাখার কথা ছিলো … …




 

 

 

 

 

 

 

 

 বর্তমান 

বিজয়কৃষ্ণ সরকার

মনীষা...বিষাক্ত হায়নার লেলিহান দৃষ্টি, নগ্ন পিশাচের দল; 

ছিন্ন করেছে উনিশের নিঃষ্পাপ মল্লিকা দল। 

হে রাজন,বিস্মিত তোমার সংবিধান। 

পৈশাচিক তান্ডবতায় উন্মত্ত মদ‍্যপ তোমার প্রদেশ, 

যেথা পদদলিত তোমার শাসন,

অমানবিক অত‍্যাচারের শিকার তোমার বোন। 

হায়রে দেশ!এ কোন শাসন?যেথা অহোরাত্র দলিত পীড়ন। 

যেখানে জলন্ত অনলে অর্ধদগ্ধ তোমার আত্মজা। 

নির্বাক নপুংসক তোমার শাসকদল, আত্মনির্ভরতার দল...


 

 

 

 

 

 

 

 

মহামায়ার নানান রূপ  

 মাম্পী রায়


কালি কালি মহাকালি
    কালিকে মা ভক্ত তারিনি 
শঙ্খ ধারক, সিংহারোহীনি
    ত্রিশূল বাহক, ত্রিনয়না তুমি
চন্ড-মুন্ড মা ভবতারিনি।।

    কপালকুন্ড, অম্বিকা তুমি,
মুন্ডমাল্য গলে মা চন্ডি কপালিনি
    পান,শুপারি,লং,নারিকেল 
ভেদি মা তোমায় হে বিপদতারিনি।।

    শ্বেত,রক্ত,শ্যাম বর্ণা ভগবতী তুমি 
শ্যামা নামে ডাকি হে খরগ ধারিণী।
     রক্তবিজ, মধুকোটপ, নিশুম্ভ-শুম্ভ
          দস্যু সংহারি,
প্রসারিত  জিহ্বা শিবের আননে
      লজ্জিত তুমি বন বিহারিনী।।

কালি কালি মহাকালি 
    ডমরু ধারিনি মা শস্ত্র ধারিনী।।
কালি কালি মহাকালি
       নমামি চন্ডিকা ভক্ত তারিনি।।

 


 
 
আজকের অঞ্জলি আমার
অঞ্জলি দে নন্দী 
 
আমার হাতে শাণিত খড়্গ।
অসুর-শোণিত আমার অর্ঘ্য।
কলুষিত মর্তকে বানাবো পবিত্র স্বর্গ।
আমি আজকের নারী।
সহ্যের সীমা আজ হয়েছে শেষ।
ধৈর্যের বাঁধ আজ ভেঙেছে।
আর দব না অশ্রু অঞ্জলি।
সব দ্বিধা ছাড়ি
এবার করব নারী-খাদক বলী।
রক্ষা করব আপন আভ্রু-বেশ।
মুঠোয় ধরে দানবের কেশ
ছিন্ন করব শয়তানী-মাথা।
ধর্ষকের মৃত দেহে ফেলবো 
আমার পায়ের পাতা।
নৃশংসের কাটা মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলবো।
হ্যাঁ, শ্রী কালি দেবী আমার মাতা।


Monday, October 5, 2020


  


উৎসব শুরু। 

তবে এবারের আবহ সম্পূর্ণই আলাদা। 
তাই এবারের উৎসবের তাৎপর্যও ভিন্ন।
এক বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে দিশেহারা এই সময়ে উৎসব তখনই সফল হবে যখন আমরা নিরন্ন অসহায় মানুষের পাশে প্রকৃত অর্থে দাঁড়াতে পারব। 
মানুষের সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তির চাইতে তো বড় উৎসব আর কিছু হতে পারে না, তাই এবারের উৎসব আমাদের অন্য শিক্ষা দেবে এটাই আশা রাখি।
দ্রুত থামুক মৃত্যু মিছিল। দ্রুত সুস্থ হোক পৃথিবী।
উৎসবে এটাই চাওয়া। আর কিছু নয়।
 
 
 
 

 অঙ্কিতা ধর


মুজনাই অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা অনলাইন উৎসব সংখ্যা ১৪২৭



মুজনাই সাহিত্য সংস্থা 
রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020
হসপিটাল রোড 
কোচবিহার 
৭৩৬১০১
ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com
 
প্রচ্ছদ-  ঋত্বিক চৌধুরী
 প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই সাহিত্য পত্রিকা অনলাইন উৎসব সংখ্যা 



এবারের সংখ্যায় আছেন যাঁরা

 মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস, ড. ইন্দ্রানী বন্দোপাধ্যায়,  তৈমুর খান, গৌতম চক্রবর্তী, শ্যামলী সেনগুপ্ত, যাজ্ঞসেনী, সুবীর সরকার, কুমকুম ঘোষ, নির্মাল্য ঘোষ, সুবীর এস রায়, চন্দন কুমার দাস, আফতাব হোসেন, জয়শ্রী চ্যাটার্জি, রীতা মোদক, অঙ্কিতা ধর, অভ্রদীপ ঘোষ, গৌতম বিশ্বাস, বানী প্রসাদ নাগ, বেলা দে, রক্তিম লস্কর, অনুস্মিতা বিশ্বাস, রাহুল গাঙ্গুলি, রুদ্র সান্যাল, অর্পিতা গুহ মজুমদার, সুপর্ণা চৌধুরী, শঙ্খনাদ আচার্য, কিশোর পন্ডিত, সুদীপ কুমার বোস, মৌসুমী চৌধুরী, স্বপন দত্ত, বিজন মজুমদার, প্রসূন সমাজদার, সুস্মিতা পাল কুন্ডু, বাবলি দে সরকার, জয়দীপ বসু, কাকলি বিশ্বাস সরকার, অমল রায়, অমিতাভ সরকার, প্রনব রুদ্র, নয়ন রায়, পাপিয়া চক্রবর্তী, নবনীতা, শঙ্খ মিত্র, রীনা মজুমদার, সায়ন ব্রক্ষ্ম, অদিতি সেনগুপ্ত মুখার্জি, মাম্পি রায়, গৌতমী ভট্টাচার্য, সম্পা পাল, তৌফিক ইমরোজ খালেদি সরদার, নন্দিতা পাল, চন্দ্রানী চৌধুরী, মনোজ ভৌমিক, বিজয় বর্মন, লুবনা আখতার বানু, নন্দিতা কার্জী, দীন মোহাম্মাদ দুখু, সত্য মোদক, তাপসকিরণ রায়, সুনন্দ মন্ডল, আফরোজা খাতুন, অসীম মালিক, খোকন বর্মন, মৌসুমী নন্দী, অনুনয় চ্যাটার্জি, শিল্পাশ্রী রায়দে, সাত্যকি, সুজাতা পাল বসু, আবু আফজাল সালেহ, সজল কুমার টিকাদার, পরিজ্ঞান চক্রবর্তী, পার্থ সারথি চক্রবর্তী, মধুমিতা শীল মন্ডল, সায়ন্তন ঘোষ, তৃণা মুখার্জি, পলাশ পাল, মাথুর দাস, বিপ্লব গোস্বামী, অতনু মৈত্র, মজনু মিয়া, রবীন বসু, রুনা দত্ত, শাহীন রায়হান, মহসিনা বেগম


 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তামগ্নিবর্ণাং তমসা জ্বলন্তীং   -- রূপে ও অরূপে     মহিষাসুরমর্দিনী
                      ড. ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়    
 
ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধারাটি হল  শক্তি উপাসনা বা দেবী ভাবনা ।দেবী ভাবনায় বিধৃত আছে দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও বৈভবের  নানা বর্ণময় উপাখ্যান, লোকায়ত বিশ্বাস ,মিথ ও রূপকথার কাহিনী। আসলে এই মাতৃমূর্তি গুলি ভাগবৎ বিভূতির বিচিত্র প্রকাশের প্রতীক মাত্র।আর প্রতীক কল্পনা ভক্ত দের ধ্যান ও মননের সোপান বিশেষ।
     সমাজ তাত্ত্বিকেরা মনে করেন বৈদিক সমাজে ও বৈদিক ধারার পাশাপাশি প্রবহমান ছিল তান্ত্রিকী ধারা। বৈদিকী ও তান্ত্রিকী এই দুই ধারার যুগ্ম প্রভাবেই পৌরাণিক কালের দুই দেবী শক্তি দুর্গা ও কালীর উদ্ভব ঘটেছে বলে মনে করা হয়।
দুর্গা শব্দটির আভিধানিক অর্থ পরমা প্রকৃতি,শিবপত্নী আবার বিশেষ রাগিনী ও।দুর+ গম্ +আ = দুর্গা। দেবীর তত্ত্ব খুব ই দুর্গম অথবা তিনি বিপদ নাশ করেন তাই তিনি বিপত্তারিনী দুর্গা।দুর্গম নামক অসুর কে বধ করে ও তিনি দুর্গা নামে পরিচিত।
ঋগ্বেদে দেবী সূক্তে অম্ভৃণ ঋষি কন্যা বাক্ নিজেকে সর্বাত্মিকা শক্তি ও জগতের ঈশ্বরী বলে ঘোষণা করেছেন -   দুর্গার রূপকল্পের সূচনা এই মন্ত্রকে ধরে নেওয়া যেতে পারে
"অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্"
এখনো মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানে এই মন্ত্র পাঠ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বাল্মীকির রামায়নে অকাল বোধনের  কোনো প্রসঙ্গ নেই, তবে কৃত্তিবাসী রামায়নে আছে। মহাভারতে দুইবার দেবীর মহিমার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মহাদেবী বা দুর্গাশক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ লক্ষ্য করি মার্কন্ডেয় পুরাণ ও শ্রী শ্রী চন্ডী তে। দেবী দুর্গা মহা চন্ডী রূপে দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র ও  সজ্জায় সজ্জিত হয়ে  ভীষণ যুদ্ধে মহিষাসুর কে বধ করেন।
এই মহাশক্তির উদ্বোধন ও পরম প্রকাশের জন্য দেবী দুর্গার  মর্ত্যে আগমন। ভিন্ন ভিন্ন রূপে, মূর্তি ও মাধুর্যে আরাধিত হন মানবমনে। মহাশক্তির আধার  দেবী দশভূজা সারা বিশ্বে নানা রূপে নিজেকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন --
       নিত্যৈব সা জগন্মূর্তি সর্বমিদং ততম্
তাঁর কোন রূপ শান্ত ,কোনটি প্রচন্ড,কোনটিতে বরাভয় কোন টি উগ্র কালী। তাঁর সবথেকে পরিচিত মূর্তি  বা রূপবৈচিত্র দেখি দশমহাবিদ্যা  মূর্তি তে, এই দশমহাবিদ্যা হলেন  --  কালী ,তারা,ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা,ধূমাবতী,বগলা,মাতঙ্গী ও কমলা ।
পৌরাণিক কাহিনী তে আছে  পিতা দক্ষরাজের  যজ্ঞে বিনা নিমন্ত্রণে যাবার জন্য সতী প্রস্তুত হলে মহাদেব বার বার বারণ করলেন। তাঁর অনুনয়ে শিব যখন রাজী হলেন না তখন সতী  তাঁর অনন্ত মায়াময়ী  লীলা দেখালেন, দেখালেন তাঁর দশ রূপ। শিবকে বললেন যে তিনি শিবের সামনে যে উগ্র দশনা রূপে দেখা দিচ্ছেন  তাই কালী রূপ , উর্দ্ধে মহাকাল রূপিনী তারা,ঈশান কোনে সমস্ত সৌন্দর্যের অধিকারী ষোড়শী,বামদিকে সৌম্য বরাভয়  ভুবনেশ্বরী রূপ,কাল ভৈরব শিবের অর্ধাঙ্গিনী তাই ভৈরবী, দক্ষিণ দিকে নিজের রক্ত পান কারী কর্তিত মুন্ড ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ছিন্নমস্তা,অগ্নিকোনে বিধবা জরতী রূপে ধূমাবতী, পশ্চাতে দানব নাশিনী  বগলা, বায়ুকোনে মাতঙ্গী আর নৈঋত কোনে সর্ব ঐশ্বর্যের অধিকারিণী রূপে কমলা। তিনি মূলতঃ এক ও অদ্বিতীয় আদ্যাশক্তি  কিন্তু লীলাচ্ছলে তাঁর দশ রূপের প্রকাশ।
    দুর্গা কে আরো নয় টি রূপে পুজো করা হয়, এই নব দুর্গা হলেন -- শৈলপুত্রী,ব্রহ্মচারিণী,চন্ডঘন্টা,কুষ্মান্ডা ,স্কন্দমাতা,কাত্যায়নী,কালরাত্রি,মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী ।
   শৈলরাজের ঘরে জন্ম তাই শৈলপুত্রী, তিনি ব্রহ্ম জ্ঞান দান করেন তাই ব্রহ্মচারিণী। চন্দ্রের মত নির্মল ঘন্টা তাই তিনি চন্ডঘন্টা। ত্রিবিধ তাপ যুক্ত সংসার যাঁর অন্ডে তিনি কুষ্মান্ডা।স্কন্দ বা কার্তিকের মা তাই স্কন্দমাতা। মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে তিনি অসুর নিধনের জন্য আবির্ভূতা তাই  নাম কাত্যায়নী  ।সর্ব বিনাশক কাল কেও তিনি নাশ করেন তিনি কালরাত্রি।  তপস্যায় উজ্জ্বল গৌর বর্ণ দেহ পেয়েছিলেন বলে তাঁর নাম মহাগৌরী। মুক্তিদাত্রী তাই তিনি সিদ্ধিদাত্রী।
শক্তি অনুসারে আরো তের টি রূপ --
জয়ন্তী,মঙ্গলা,কালী,ভদ্রকালী,কপালিণী,দুর্গা ,শিবা,ক্ষমা,ধাত্রী,স্বাহা এবং স্বধা । দুর্গা পুজা র অঞ্জলী র সময় প্রণাম করা হয় এই নাম গুলি দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে।
দেবীর প্রত্যেকটি নাম ও মূর্তির  সঙ্গে  সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী সংযুক্ত।    
তিনি অজস্র রূপের মধ্যে থেকে ও অরূপ।'কে এই মহামায়া?'  - মেধস মুনি এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন  এই মহামায়া এই নিখিল ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী,আদি জননী অন্নপূর্ণা প্রয়োজনে রণরঙ্গিনী।  শিব ও আদ্যা শক্তির সমন্বিত রূপ ই ব্রহ্মান্ড। 
মোহ মায়ায় আচ্ছন্ন  মানুষ তাঁর সন্ধান করে নানা রূপের মধ্যে  আসলে তিনি এক ও অদ্বিতীয়া মাতৃরূপা শক্তি। তবে আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে  তিনি যেন ঘরের মেয়ে  গিরি রাজ দুহিতা উমা, বছরে একবার তিন দিনের জন্য আসছেন বাপের বাড়ি সপরিবারে।শরতের রৌদ্র করোজ্জ্বল আবহে কাশের দোলায় ঢাকের শব্দে শিউলি র আলপনা য়  মন্ত্র,হোম, অঞ্জলী একশো আট নীলপদ্মে আন্তরিক ভক্তি দিয়ে আমরা আরাধনা করি। চোখের জলে দিই বিসর্জন।তার বরাভয় মূর্তি আমাদের দেয় আশ্বাস। মৃন্ময়ী দশভূজা তখন হয়ে যান প্রাণাত্মিকা চিন্ময়ী।তিনি ভক্তের মনে বাস করেন , শুভ ও অভিলষিত ফল দান করেন বলেই তার সর্বমঙ্গলা রূপ টি সার্থক --
সর্বানি হৃদয়স্থিতানি  মঙ্গলানি শুভানি চ
দদাতি ঈপ্সিতাল্লোকে তেন সা সর্বমঙ্গলা।
    এভাবেই যুগ যুগান্তর ধরে মানুষের মনে দেবীর অনন্য রূপ ও শক্তির সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা বহমান। 
তাঁর রূপ ও প্রতিমা কালের নিরীখে পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে ও। দেবীর ত্রাণ কারিণী ও সিদ্ধিদায়িকা রূপ বৈশিষ্ট্যের আদি যোগসূত্র টি তৈত্তরীয় আরণ্যকের এই ধ্যান মন্ত্রে ধরা আছে বলেই মনে করা হয়
তাং অগ্নিবর্ণাং তপসাজ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টম্ ।
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরমে নমঃ।।
অর্থাৎ সূর্য বা অগ্নির কন্যা,তিনি কর্মফলের জন্য প্রার্থিত হন,এমন দুর্গা দেবীর আমি শরণাপন্ন হই ,হে সুন্দর রূপে ত্রানকারিণী তোমাকে নমস্কার।



 
 

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শে ডুয়ার্সের দেবী বন্দনা
গৌতম চক্রবর্তী 

সর্বধর্মসমন্বয়ের ডুয়ার্সে দুর্গাপুজোর সূচনা

দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উপলক্ষ নয়। সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শেই দুর্গাপুজো হয়ে থাকে এই শরৎকালে। তাই শ্রেষ্ঠ শারদোৎসব হচ্ছে দুর্গাপুজো। যেখানেই বঙ্গসন্তানেরা রয়েছে সেই অঞ্চলে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে শারদ উৎসবের সূচনা ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে ডুয়ার্স অঞ্চল একসময়ে ভুটানের দখলে ছিল। এই অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে আসার পর পুরো অঞ্চল চা শিল্পের পীঠস্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মূলত চা বাগান প্রতিষ্ঠা করতে ইংরেজরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। সুতরাং ইংরেজদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দুর্গাপূজার তাৎপর্য তেমন কিছু গুরুত্ব পায়নি। তাই পুজোর ব্যপ্তি বৃদ্ধি পেতে পেতে সর্বধর্ম সমন্বয়ের শারদ উৎসবের অনেক সময় লেগে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার আগেই ডুয়ার্সে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল। রাজাভাতখাওয়াতে সেই সময় বনবিভাগের ডিভিশনাল অফিস থাকার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হত। তাছাড়াও জয়ন্তী যাওয়ার রেলপথ এখানেই শুরু হত। তাই সেই দিক থেকেও এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কাদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার সূচনা ঘটেছিল তা না জানা গেলেও বলা যায় রেলস্টেশনে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। সেই সময়ে দুর্গাপুজো হত সাতালিতে এক জমিদারের বাড়িতে, গোপালপুর চা-বাগানে, মেটেলি কালীবাড়িতে। বেশিরভাগ চা-বাগান ইংরেজ পরিচালিত ছিল বলে ইংরেজদের নজরে দুর্গাপুজোর তেমন সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল না। অথচ চা বাগানগুলোর প্রায় একশো শতাংশ করণিক ছিলেন বঙ্গসন্তান।
 
 
 
 

 

চা বাগিচাকেন্দ্রিক দুর্গাপুজো

ইংরেজ পরিচালিত চা বাগানগুলিতে প্রধান করণিক অর্থাৎ বড়বাবুর এক বিশেষ ভূমিকা ছিল। সাহেব বা ম্যানেজারেরা যে কোনো বিষয়ে প্রথমে বড়বাবুকে ডেকে বলতেন। তারপর বড়বাবু সবদিক বিবেচনা করে সমস্যার সমাধান করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাহেবরা সেই সমাধানকে গুরুত্ব দিতেন। এর ফলে বাগানে অন্য বাবুদের থেকে বড়বাবুর আধিপত্য এবং গুরুত্ব সবটাই অধিকমাত্রায় থাকতো। কোন শ্রমিক কিংবা কর্মচারী যে প্রয়োজনই হোক না কেন, বড়বাবুকে প্রথমে সমাধানের জন্য বলতে হতো। বড়বাবুও তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেন। বাগানে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা বেশিরভাগ পূর্ববঙ্গ থেকে আগত ছিল। বঙ্গের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার কথা তাদের মনে হওয়াতে তারা বড়বাবুকেই জানালেন তাদের ইচ্ছার কথা।। এভাবে নানা টানাপোড়েন পার করে অবশেষে  ১৯৩৪-৩৫ সাল নাগাদ রাজাভাতখাওয়া অঞ্চলের কাছাকাছি ডিমা চা বাগানের হেডক্লার্ক হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে বাগানে প্রথম দুর্গাপূজার কথা বললেন। হেমচন্দ্রবাবু দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে ইংরেজ ম্যানেজারকে বোঝানোর চেষ্টা করে অবশেষে সফল হলেন। সাহেব অনুমতি দিলেন বাগানে দুর্গাপুজো করার। সমস্ত বাঙালি কর্মচারী একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লো পূজা সম্পন্ন করতে। সেই আমলে বহু কর্মচারী স্ত্রী, পুত্র, পরিজন পূর্ববঙ্গের বাড়িতে রেখে দিতেন আর পুজোর সময় ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে যেতেন। সেবার যেহেতু বাগানে পুজোর ব্যবস্থা হলো তাই অনেক কর্মচারী বাড়িতে গেলেন না। এমনকি পরিবার-পরিজনকে পুজো উপলক্ষে এই দেশে অর্থাৎ চাকরিস্থলে নিয়ে এলেন। এইভাবেই চা বাগানে দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে বসবাসকারী সকল মানুষের মনে এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়।
 
 

 
 
 

শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুজো

সেই আমলে প্রান্তিক কেন্দ্র ছিল শিলিগুড়ি। নেহাত কিছু লোক বাস করত বন জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট জনপদে। একমাত্র গুরুত্ব ছিল শিলিগুড়ি থেকে ট্রেন সরাসরি কলকাতায় যেত এবং অন্যদিকে ছোট রেলপথ যেত দার্জিলিং-এ। দার্জিলিং যাওয়ার রেলপথের একটি শাখা পঞ্চনই জংশন থেকে কিশানগঞ্জ পর্যন্ত যেত। রেল লাইনের পাশ দিয়ে ছিল গাড়ি যাবার রাস্তা। গরুর গাড়ি ছিল যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন। তাই সেই রাস্তার নাম ছিল হিলকার্ট রোড। এখনো সেই রাস্তা এই নামেই পরিচিত। এছাড়া শিলিগুড়ির আর কোনো গুরুত্ব ছিল না। শিলিগুড়ি থেকে গরুর গাড়ি অথবা ট্রেনে জলপাইগুড়িতে আসা যেত। কিন্তু ডুয়ার্সের সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছিল না। ১৯৩৭ সাল নাগা দসেবকে করোনেশন সেতু তৈরি হবার পর ডুয়ার্সের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৪০ সালে করোনেশন সেতু সরকারিভাবে উদ্বোধন হলে ডুয়ার্সের যোগাযোগ ব্যবস্থা মজবুত হলেও যাতায়াতে অনেক হ্যাপা ছিল। যেহেতু শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা যাবার ট্রেন ছাড়ত সুতরাং রেলগাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেশ কিছু রেল কর্মচারী শিলিগুড়িতে বাস করতেন। এ কথা ঠিক, যেখানেই বাঙালি কর্মচারী একত্রিত হতো সেখানেই দুর্গাপুজোর একটা গুঞ্জন প্রতিধ্বনিত হত। এইভাবেই ইস্টবেঙ্গল রেল কর্মচারীরা দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে তারা নিউ সিনেমা রোডের ওপর দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। পাশাপাশিভাবে ডুয়ার্স অঞ্চলে চায়ের দেশেও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে একতার ঐকতান অনুরণিত হয়েছিল বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে। চা বাগান অঞ্চলের দুর্গাপুজোর চালচিত্র খুঁজে পেতে ফিরে যেতে হয় বিস্মৃত অতীতের গভীরে। একবিংশ শতকের আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ডুয়ার্সের অধিবাসীরা হয়তো ভাবতেই পারবেন না যে সেই আমলে ডুয়ার্সে সাংস্কৃতিক চেতনার শ্রীবৃদ্ধি ঘটানোর কাজ ছিল কতটাই কঠিন। বর্তমানে পাকা সড়কের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুদৃঢ়। তাই অতীতের সেই যোগাযোগহীন অখ্যাত নির্জন, বন্য শ্বাপদসংকুল প্রাঙ্গণে কবে এবং কোথায় দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া বড়ই কঠিন।
 
 

 
 

উত্তরবঙ্গে বনদুর্গার পূজো

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পরে লর্ড কার্জন কোচবিহারের তৎকালীন রাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণকে সঙ্গে করে কয়েকটি জায়গায় শিকার করতে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি হল শালকুমার জঙ্গল এলাকা। সেই সময় ওই এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন খাউচাঁদ কার্জি। ওই অঞ্চলে একদিকে ছিল বন্য জন্তুর হামলা, অন্যদিকে ভুটান রাজ এবং ব্রিটিশদের আক্রমণ। ওই সময় গৌরীপুরের রাজা প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া সহ অনেকেই জংলী হাতিকে বশ করার জন্য বহুবার শালকুমারের জঙ্গলে এসেছিলেন। খাউচাঁদ কার্জি শালকুমার এলাকার জমিদার হবার পরে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কোচবিহার এবং অসমের গৌরীপুরের রাজপরিবারের যোগাযোগ ছিল। বন্যজন্তু এবং ভুটানি শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই খাউচাঁদ কার্জী জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই পুজোর আজীবনের দায়িত্ব নেন তাঁর এক ছেলে ধনীরাম কার্জি। এরপরে পুজোর দায়িত্ব নেন পরবর্তী প্রজন্মের পক্ষে ধনীরাম বাবুর ছেলে ললিত কার্জি। তিনি কয়েকবার পুজো করার পর দায়িত্ব নেন সেই পরিবারের সঙ্গে জড়িত খগেন্দ্র নাথ বর্মন। দুর্গাপুজোর জন্য আলাদাভাবে তিনি জমিও দান করেন। তিনি মারা যাবার পর সর্বজনীন হয়ে যাওয়া পুজোর দায়িত্ব নেয় এলাকার পুজো কমিটি। বর্তমানে সেই পুজো কমিটি রাজ আমলের এই পুজো পরিচালনা করছে প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশিসময় ধরে। স্থানীয় মানুষ দ্বারা পরিচালিত এই পুজো এখন সর্বজনীন।
 
 

 
 

দুর্গাপুজোর পরেই পূজিতা হন বনদূর্গা

একই মন্দিরে পরপর মা দুর্গা এবং বনদুর্গা অর্থাৎ ভান্ডানি পুজো হয় ময়নাগুড়ি ব্লকের পদমতি ২ অঞ্চলের ডাকুয়াবাড়িতে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী ডাকুয়াবাড়ির দুর্গাপুজো এবং ভান্ডানি পুজো। তবে ডাকুয়া পরিবারে কতদিন আগে এই পুজো শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। পরিবারের প্রবীণতম সদস্য দেবব্রত রায় ডাকুয়ার কাছ থেকে জানতে পারলাম তাদের ঠাকুরদা তারকনাথ রায়ডাকুয়া বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন এবং একই মন্দিরে বনদুর্গা এবং মা ভান্ডানির পুজো শুরু করেন সন্তান লাভের কামনায়। তাঁরা সন্তান লাভ করলে সেই থেকেই বাড়িতে মা দুর্গার বিসর্জনের পর বনদুর্গার পুজো হয়ে আসছে। পরবর্তীকালে দেবব্রত বাবুর বাবা রথীন্দ্রনাথ রায়ডাকুয়া এই পুজো করতেন। দেশ বিভক্ত হয়ে ভারতে আসার পর তিনি নিজে পুজো শুরু করেন। কিন্তু বয়সের ভারে তাঁর পক্ষে পুজো করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি বলে তাই তাঁর বড় ছেলে নির্মল রায়ডাকুয়া এবং ভাইপো উৎস রায়ডাকুয়া পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই ভাবেই বংশপরম্পরায় প্রতিবছর বাড়ির স্থায়ী মন্দিরে তাঁদের এই পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের দাবি, পুজো কবে শুরু হয়েছিল তার সঠিক হিসেব না থাকলেও তাদের পরিবারের পুজো যে শতাব্দী প্রাচীন তা বলাই যায়। কারণ এদেশে আসার পরে তাঁরা ৭৩ বছর ধরে পুজো করছেন এবং তাঁদের পূর্ব পুরুষেরা বাংলাদেশের বাড়িতে অনেক আগে থেকে দুর্গাপুজো করতেন। প্রতিবার মহা ষষ্ঠীর দিন গতবারের বনদুর্গাকে বিসর্জন দিয়ে মা দুর্গাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিষ্ঠার সঙ্গে পুজোর পর দশমীর দিন রাতেই দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পরের দিন সেখানেই আবার নতুন বনদুর্গা অর্থাৎ মা ভান্ডানির প্রতিমা আনা হয়। পুজো করার পর দুর্গাকে সারাবছর মন্দিরেই রাখা হয়। পরের বার ঠিক একই নিয়মে ষষ্ঠীর দিন দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ডাকুয়া বাড়ির পুজোয় শামিল হয়ে খুব আনন্দ উপভোগ করেন প্রতিবেশীরাও। পুজোর ক’দিন এখানেই কাটান তাঁরা। বিজয়া দশমীর দিন হেলাপাকড়ি বাজারে বিজয়া দশমীর মেলা বসে।  দুর্গা প্রতিমাকে মেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে এনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় আর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন আবার সেখানে বনদুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠেন সকলে।
 
 

 
 

দুর্গারূপে পূজিতা গোসানিমারির দেবী কামতেশ্বরী

গোসানিমারি হাইস্কুলের উল্টোদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কামতেশ্বরী মন্দির। মহকুমা শহর দিনহাটা থেকে আট কিলোমিটার দূরে গোসানিমারি কামতেশ্বর মন্দিরে কয়েকশো বছরেরও বেশিসময় ধরে শরৎকালে দেবী কামতেশ্বরী দুর্গারূপে পূজিতা হন। গোসানিমারি কোচবিহার দেবত্র ট্রাস্টের অধীনে এই পুজোয় ভিড় করেন প্রচুর দর্শনার্থী। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মন্দিরের দেয়ালে লেখা রয়েছে বর্তমান মন্দিরটি কোচবিহারের মহারাজা প্রাণনারায়ণের আমলে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মন্দিরের বড় দেউড়ি কালীনাথ ঝাঁ এর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, সারা বছরইএই মন্দিরে পুজো হয়। এর পাশাপাশি দেবী কামতেশ্বরী শরৎকালে দুর্গা রূপে, কার্তিক মাসের দীপাবলিতে দীপান্বিতা কালী রূপে এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালী রূপে পুজো নেন। প্রতিপদ থেকে মূল মন্দিরে দেবীর সিংহাসনের উত্তরদিকে ঘট বসিয়ে পুজো শুরু হয়। ষষ্ঠীর দিন মন্দির প্রাঙ্গণে থাকা বেল গাছের তলায় পুজো হয়। সপ্তমী পুজো হয়ে থাকে যজ্ঞের মাধ্যমে। গর্ভগৃহের সামনে সপ্তমীর দিন থেকে যে যজ্ঞ শুরু হয় দশমী পর্যন্ত একটানা চলতে থাকে সেই যজ্ঞ। প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন জোড়া পায়রা বলি দেওয়া হয়। পাশাপাশি অষ্টমীতে মোষ বলি দেওয়া হয়। তাছাড়াও দশমীতে চালকুমড়ো বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিদিন যে ভোগ দেওয়া হয় সেই মহাভোগে লঙ্কা ব্যবহার করা হয় না। গোলমরিচ ব্যবহার করা হয়। পুজোর দিনগুলোতে মন্দিরের বাইরে মেলা বসে। পুজোর সময় মন্দিরে ভিড় জমান দিনহাটা মহকুমার বাইরের এলাকার বহু মানুষ। কোচবিহার হেরিটেজ সোসাইটির দিনহাটা মহকুমার সম্পাদক শঙ্খনাদ আচার্যের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম প্রাচীন এই পুজোয় ভক্তি এবং নিষ্ঠা নিয়ে দর্শনার্থীরা পুজোর দিনগুলিতে ভিড় করেন।
 
 

 

সীমান্তের দুর্গাপুজোয় নেই জাতপাতের ভেদাভেদ 

জলপাইগুড়ি জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের রায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় সীমান্ত গ্রামগুলির মানুষ সপরিবারে দুর্গাপুজোর আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন এবং এখানে থাকে না জাতপাত এবং সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ। আগে গৌরাঙ্গবাজার, মানিকগঞ্জ এবং গৌরচন্ডীধাম এই তিন জায়গায় দুর্গাপুজো হত। জলপাইগুড়ির দক্ষিণ বেরুবাড়ির মানিকগঞ্জের নয়াবস্তির অধিকারী পাড়ায় শরদিন্দু রায়দের বাড়িতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা শালগ্রাম শিলাটি আজও অক্ষত রয়েছে। বাড়ির সামনে মহামায়া ধাম মন্দিরে দেবী দুর্গার পুজোর আয়োজন করা হলেও বাহাত্তর বছর আগে প্রায় পন্চাশ কেজি ওজনের কষ্টি পাথরের শালগ্রাম শিলাটি মহামায়াধাম মন্দিরের ডানদিকে আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে। তার পাশেই রয়েছে রাধাকৃষ্ণের মন্দির। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই শালগ্রাম শিলা এনে পুজো শুরু করার পাশাপাশি দুর্গাপুজোও শুরু করেছিলেন বর্তমান রায় পরিবার। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রায় পরিবারের পূর্বসূরী প্রয়াত ধরণীমোহন রায়ের মাধ্যমে শালগ্রাম শিলাটি জলপাইগুড়ির দক্ষিণ বেরুবাড়ীর অধিকারী পাড়ার নয়াবস্তিতে নিয়ে আসা হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে মানিকগঞ্জের ডাকেরকামাত, মরিঙ্গাটারি, নয়াবস্তি গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে ধরণী মোহন রায় শুরু করেন মহামায়াধামের দুর্গাপুজো। আজও এই পারিবারিক পুজো করে আসছেন রায় পরিবার। পুজোর চারদিন অন্নভোগ হয়। বহু গ্রামের মানুষ ভোগ নিতে হাজির হন। মহামায়ার মন্দিরের ডানদিকে কষ্টিপাথরের শালগ্রাম শিলাটিকে একটি চালাঘরে রাখার পাশাপাশি এই মন্দিরের পাশে কালি এবং মনসা সহ একাধিক দেবীর থান রাখা হয়েছে।
 
 


সম্প্রীতির উৎসব শারদোৎসব 

শুধু কি দুর্গাপুজো হিন্দুদের তথা বাঙ্গালীদের উৎসব নাকি? বাঙালি মুসলিমরাও সম্পৃক্ত হয়ে যায় এই শারদ উৎসবে। হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ডুয়ার্সের আংরাভাসার সজনাপাড়াতে দুর্গাপুজোয় দুই সম্প্রদায়ের মানুষের একতা ডুয়ার্সের দুর্গাপুজোকে এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। জাতপাতের সংকীর্ণ মনোভাব থেকে বেড়িয়ে এসে প্রতিবার এখানকার মুসলিম সমাজ দুর্গাপুজোতে শুধু অংশগ্রহণ করেন না, চাঁদা তোলা থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত হিন্দুদের পাশাপাশি তারাও বাঙ্গালীদের শ্রেষ্ঠ উৎসবে মেতে ওঠেন।