Sunday, August 3, 2025


 

আবর্তন

অনিতা নাগ 

আজকাল এই এক রোগ হয়েছে অনুর। দুপুরবেলায় সব কাজ সেরে ঘরে এলেই মনটা পালাই পালাই করে। বর্ষার মেঘের সাথে মন হারানোর খেলাটা জমে ভালো। জানলার পর্দাটা সরালে গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে এক টুকরো আকাশ আজও দেখা যায়। ওই খোলা আকাশটা অনুর বড্ড আপন। ঋতু বদলের সাথে সাথে ওই টুকরো আকাশে কতো যে রঙের খেলা চলে! ওই আকাশের সাথে ভেসে ভেসে চলে মন হারানোর খেলা। আজ কোথায় যাবে ভাবতে ভাবতেই এক দমকা হাওয়া এসে ভাসিয়ে নিয়ে চললো। পড়ে রইলো সংসার, রইলো পড়ে রাজ্যপাট। অনু তখন পৌঁছে গেছে সেই ছোটবেলার দিনগুলোয়। তাদের পৈতৃক বাড়ীতে। যেখানে পুরো বাড়ী জুড়ে অবাধ বিচরণ তার। তাদেরও একটা ঘর ছিলো। সেই ঘরে দুটো জানলা, আর দরজা খুললে একটা বারান্দা। ওই বারান্দায় জীবনের কতো যে গল্প! ওই ঘরেই ছিলো একটা মিটসেফ, যাতে থাকতো রাজ্যের ধনরত্ন। আচার, জেলি, জ্যাম। মা সব ওখানে রাখতেন। দুপুর বেলা মা ঘুমিয়ে পড়লে চুপি চুপি উঠে বারান্দায় চলে যেতো অনু। কতো ফেরীওয়ালা যেতো হাঁক পেড়ে পেড়ে। এক বয়স্ক দাদু আসতো, মুখে বসন্তের দাগ, রোগা, ঢ্যাঙা চেহারা। কাঁচের বাক্সে মণিহারী জিনিষ থাকতো। সাইকেলের সামনে কাঁচের বাক্সটা লাগানো থাকতো। কাঁচের বাক্সে রঙিন চুড়ি। দাদু হাঁকতো বেলোয়ারী চুড়ি, মণিহারী….। সাইকেলের হাতলে একটা লাঠির গায়ে হরেক রঙের ফিতে, লাল, কালো কার, সেফটিপিন, আরো কতো কিছু থাকতো। ইচ্ছে হতো ছুট্টে চলে যায়। কিন্তু দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার সাহস ছিলো না। পাড়ার বাকীরা সকলে কিনতো। পাশের বাড়ীতে রূপারা ভাড়া থাকতো। অনুর বন্ধু ছিলো। হিন্দুস্তানী। ওর বাবার খাটাল ছিলো। সারাদিন ওদের বাড়ীতে কতো যে লোকজন আসতো। সব হিন্দুস্তানী। রূপার মা’কে পাড়ার সকলের সাথে অনুও বৌ বলে ডাকতো। বৌ কিনতো কাঁচের চুড়ি। ওরা তো কাঁচের চুড়িই পরে। বৌ ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতো। অনুকে বলতো নিবে তুমি কুছু? অনু পালাতো ঘরে। মা জানতে পারলে বকবে যে! মা বলতেন পূজোর সময় জামার সাথে ম্যাচ করে ফিতে কিনে দেবে। ওতেই শান্তি। কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে বড়ো ভালো লাগতো। ক্রমশঃ সুরটা দূরে মিলিয়ে যেতো। বেলোয়ারী চুড়ি, মণিহারী…।

 মেঘ ছুটে চলে। অনু বলে এই মেঘ, একটু সবুর কর না, আর একটু থাকি। ওই যে রাস্তার এক কোণে টালির টুকরো দিয়ে এক্কা দোক্কার ঘর আঁকা। বিকেলে খেলবে সকলে মিলে। ও বাবা! মাধুরী কতো তেঁতুল নিয়ে এসেছে। ওর বাবার দোকান আছে। আলু, পিয়াজ, আদা, রসুন, সাথে তেঁতুল ও থাকে। মাধুরী নিয়ে আসে অনুদের জন্য। ইজেরের ট্যাঁকে করে লুকিয়ে আনে। কেউ একটু নুন আনে। তারপর বড়দের লুকিয়ে কলাবাগানের একটা কোণে সব বন্ধুরা মিলে তেঁতুল খাওয়া! আহা! কি সুখ! এই বুড়ো বয়সেও অনুর জিভে জল এসে গেলো! আহা! কি স্বাদ! এখন তো একটু টক বেশী খেলেই নানান বিপত্তি। সন্ধ্যেবেলায় পড়তে বসে শুনতে পেতো আরেকটা সুর। ঘুগনি, ভেজিটেবল চপ। ওই চপ-কাকুর সুরটা একবারে অন্যরকম ছিলো। অনেক দূর থেকে ওই সুরটা শোনা যেতো। কোনোদিন বাৰীতে ঘুঘনি কেনা হতো। কি আনন্দ সে'দিন! গরমের সময় ওই কাকুটাই লাল শালু জড়ানো মাটির হাঁড়ি করে কুলফি বিক্রি করতো। আর ছিলো আইসক্রীম। ফুচকার গাড়ীর ঘড়ঘড়ে আওয়াজ ছাপিয়ে যেতো আইসক্রিমের গাড়ীর আওয়াজ। লাল, সবুজ, কমলা, কতো রঙের আইসক্রিম পাওয়া যেতো। আর মাটির ভাঁড়ে ঝুরো বরফ। কোনোদিন পাঁচ পয়সা পেলে ঝুরো বরফ কিনে খেতো। মাটির ভাঁড়ে লাল, সবুজ, হলুদ সিরাপ দেওয়া ঝুরো বরফ। কতো স্মৃতি। মেঘ ছুটে চলে। অনু বলে এই মেঘ, একটু সবুর করো। আর একটু থাকি। মেঘের কি থামলে চলবে! কতো কাজ তার। এ’ দেশ থেকে ও’দেশ ভাসিয়ে নিয়ে চলে। পেছনে পড়ে থাকে পুরোনো দিনের স্মৃতি। মেঘ বলাকার পাখার সাথে ভেসে চলে মন। ছোট থেকে কতো বিবর্তন। ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে মেয়ে জীবন। এক জীবনে কতো ভূমিকা। বাড়ীর ছোট মেয়েটি থেকে আজকের পরিণত জীবন। মেয়ে বেলা এগিয়ে চলে। সব সময় ছন্দ মেলে না। তবু মেলাতে হয়। ওই যে মা ঠাকুমা শিখিয়েছেন মানিয়ে নিতে হয়। আসল কথা ওটাই। মানিয়ে নেওয়া। বড্ড কঠিন কাজ। ওই কঠিন কাজটা করতে হয়। সব মেয়েদের করতে হয়। সে যতো আধুনিক আর যতো স্বাধীণই হোক। অনুদের জীবনের সাথে আজকের মেয়েদের জীবনের অনেক তফাৎ। আজ মেয়েরা এগিয়ে চলেছে আপন লক্ষে। তবু কতো বাধা। কতো বিপদ। এই তো সে'দিন রাজ্যের সরকারী হাসপাতালে, সরকারী ডাক্তার মেয়েটি খুন হয়ে গেলো। কেউ কোনোদিন শুনেছে! অন ডিউটি ডাক্তার মেয়েটিকে মেরে ফেললো, শুধু মানিয়ে নেয় নি বলে, মেনে নেয় নি বলে। একবছর হয়ে গেলো। আজো বিচার পেলো না সে মেয়ে। কতো আন্দোলন, কতো মিছিল, কতো রাত দখল। কিচ্ছু হলো না। অনুও তো প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলো। স্কুলের বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলো ধর্ণা মঞ্চে। সে’ বছর ঠাকুর দেখতে যায় নি। সেই সময়টায় আন্দোলনকারীদের অনশন মঞ্চে ছুটে গিয়েছিলো। যে দেবীর আবাহনে এতো উৎসব, এতো আনন্দ সেই দেবীও তো এক মেয়ে! মা’র কাছে প্রার্থণা করেছে বিচারের। কিচ্ছু হয় নি। একটা বছর কেটে গেলো। ক্ষমতা যার বিচারও তার। তবু আশা করে বিচার আসবে। সেই মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার হবে। হবেই। যুগ পাল্টেছে। ধর্মের কল আর বাতাসে নড়ে না। অসুর বিনাশিনী দেবীকে জাগাতে হবে। আভরণ আর আবরনের মোহজাল কাটিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে নিজের ভিতরের আমিকে। সবার আগে নিজেকে সম্মান করতে হবে। আপোষ করা চলবে না। আনমনা মন চমকে ওঠে মুঠোফোনের ঝনঝনানিতে। আর সেই সুযোগে মেঘগুলো কেমন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। ও’ মেঘ, এতো জল তুই কোথায় লুকিয়ে রাখিস! অঝোর ঝরন শ্রাবন জলে কোন বিরহিনীর ব্যথা বয়ে নিয়ে বেড়াস তুই! উদাস হয় মন। বুকের ভিতরটা কেমন টনটনিয় ওঠে। মেঘের সাথে ভাসিয়ে দেয় তার সব ভালোলাগা, সব মনখারাপ, সব কষ্ট। জানে মেঘ বলাকা ঠিক সামলে রাখবে। আবার কোনো দিন মেঘবলাকার সাথে ভেসে যাবে অনু। ও মেঘ, তখন বৃষ্টি হয়ে ঝরিয়ে দিস বুকে বয়ে নিয়ে চলা সব ব্যথা। বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঘোর কাটে অনুর। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নামবে। ফিরতে হবে আপন রাজ্যপাটে। মেঘ পিওনের খামের মধ্যে ভরে রাখে তার স্মৃতির পুটুলি। ওই যে’কদিন স্মৃতি আছে! সেই কদিন এই স্মৃতিগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করা। তারপর গুগল খুঁজে আগামী প্রজন্ম জানবে কেমন ছিলো সে যুগের কথা। গুগল কি বলতে পারবে তেঁতুল মাখা কেমন খেতে ছিলো! বলতে পারবে ঝুরো বরফের স্বাদ! কে জানে! জেনেই বা কি করবে সে! অনু তার ছোটবেলাকে পরম আদরে আর সোহাগে আগলে রাখে আপন মনের আঙিনায়। এই টুকুই তার বেঁচে থাকার শক্তি। এ’ জীবনের যে’কটা দিন আছে, চারদিকে শুধু আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করে। এতো আলো যে সেই আলোয় সব অন্ধকার মুছে যাবে। জীবন দেবতার কাছে একটা প্রদীপও যদি জ্বালতে পারে! অনুর বাবা, মাও ঠিক এমন করেই ভাবতেন। হয়তো এমন ভাবেই জীবন তার আবর্তনে চলতে থাকে। শুধু পাত্র- পাত্রী বদলে যায়। বদলে যায় সমাজের মানদন্ডের মাপকাঠি। অনুর ঘোর কাটে কর্তার ডাকে। সন্ধ্যে হয়ে গেলো যে! ঝটপট অগোছালো মনকে বাক্স বন্দী করে ফেরে জীবনের মঞ্চে। সন্ধ্যাদীপ জ্বেলে দেয়। গরম চায়ের পেয়ালা নিয়ে গা এলিয়ে দেয় সোফায়। মুঠোফোনে রবি কবির গানের সুর ভেসে আসে…….
“যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেনো পাই শেষে
দু হাত দিয়ে বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে”।।


 

ধাপ্পা

লীনা রায়


গ্রীন পার্ক সোসাইটি – শহুরে কংক্রীটের জঙ্গলে এক আলাদা পৃথিবী। ঝকঝকে, তকতকে চারদিক। চওড়া পিচ ঢালা রাস্তা। রাস্তার দু' পাশে কৃষ্ণচুড়া, সোনাঝুরি আর অমলতাস। চারদিক শুনশান। শুধু গাছের পাতায় বাতাসের সর সর শব্দ। গাছের পেছনে সার সার বাড়ি। প্রতিটি বাড়িতে সযত্নে লালিত ফুলের বাগান। এখানকার রাস্তায় ভীড় নেই, যান বাহনের অধিক্য নেই। ফেরিওয়ালার হাঁকডাক নেই। রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান নেই। অযথা জটলা নেই। নেই স্লোগান, মিটিং, মিছিল। এখানে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা ফ্ল্যাট বাড়ি নেই।

এটি একটি অভিজাত পাড়া। বাড়ির সামনের নেম-প্লেট দেখেই তাদের সামাজিক অবস্থান বোঝা যায়। বেশির ভাগ বাড়ির কর্তা গিন্নি সুপ্রতিষ্ঠিত। হাতে গোনা যে কয়েকজন গৃহবধূ আছে, তারা প্রত্যেকে সমাজসেবী। এন জি ওর সঙ্গে যুক্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকে। আর সপ্তাহে তিনদিন কিটি পার্টি করে। আর সব থেকে মজার ব্যাপার হল এদের বয়স মধ্য ত্রিশ থেকে ষাট পার।

এস আর চ্যাটার্জি সোসাইটির নতুন বাসিন্দা। স্ত্রী সুনন্দা, দুই পুত্র আর আধ ডজন পরিচারক নিয়ে তাদের সংসার। সুনন্দা চ্যাটার্জির বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তার ফিগার, ত্বকের জেল্লা চল্লিশের কোন মহিলাকে টেক্কা দিতে পারে। কথা বলার মুন্সিয়ানায় সহজেই গ্রুপের মধ্যমনি হয়ে উঠল সুনন্দা।

সুনন্দার গল্পে বার বার তার স্বামী, সন্তানদের কথা আসে। তার কথাতেই বোঝা যায় সংসারে তার কদর কতটা। তার সুখ সব্বার চোখে পড়ে। প্রথম প্রথম তার মিশুকে স্বভাব সবার মনে ধরে। কিছুদিন পর ওর সুখ, সৌন্দর্য দেখে অন্যদের আফশোস হতে লাগলো। এরপর পালা করে এলো হিংসে আর রাগ। সবার মনে হল সুনন্দা মিথ্যে বলছে। নয়ত তুক তাক জানে।

রহস্য ভেদ করার জন্য তদন্ত শুরু হল। কাজে লাগানো হল বাড়ির পরিচারকদের। খবর যা পাওয়া গেল তাতে কেউ খুশি হতে পারেনি। জানা গেল সুনন্দার ছেলেরা খুব বাধ্য। মা অন্ত প্রাণ। আর গত তিন মাসে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে একবারও মনোমালিন্য হয়নি। সবার মনে হলো এমনটা হওয়া অসম্ভব। কাজেই সুনন্দা খুব চতুর আর অভিনয় করে পুরোটা সামলে নিয়েছে এটা সবাই বুঝে গেল।

এরপর চিন্তা ভাবনা শুরু হলো কিভাবে সুনন্দার মুখোশ খোলা যায় সেটা নিয়ে। গোপন মিটিং হল। ঠিক হলো পরের কিটিতে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলা হবে। তখন সুনন্দাকে প্রশ্নের প্যাঁচে ফেলে সত্যিটা বের করা হবে। কিটি পার্টিতে খেলা শুরু হল। সুনন্দা কাছে জানতে চাওয়া হল তার জীবনের আফশোসের কথা।

সুনন্দা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে একটু হাসলো। সবার মনে হল সেই হাসিতে বিষাদ মাখা। মনে মনে সবাই খুশি। এবার সুনন্দা বলতে শুরু করল,
–খুব ইচ্ছে ছিল নরওয়েতে হানিমুনে যাবার। মাঝ রাতে সূর্য দেখব ওর পাশে বসে। কিন্তু হয়নি। গিয়েছিলাম সুইজারল্যান্ডে। তবে সেই আফশোস আর নেই। ফার্স্ট এনিভার্সারিতেই আমার ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল।

সবাই চুপ। প্ল্যান ভেস্তে যাবার দুঃখ সবার মুখে স্পষ্ট। কোন রকমে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হাততালি দিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করা হলো। এরপর ঠিক হল পরের কিটিতে সুনন্দাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হবে।
পরের কিটিতে সুনন্দা এলো না। যদিও জানিয়েছে ওর অসুস্থতার কথা। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি। ওদের মনে হয়েছে হয়ত ও কিছু আঁচ করেছে। তাই মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে আসেনি। পরের কিটিতে কিন্তু সুনন্দা এলো। খাওয়া দাওয়া, তাস খেলায় পার্টি জমজমাট। হঠাৎ গল্পের ছলে একজন সুনন্দাকে জিগ্জ্ঞেস করল ওদের স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া হয় কিনা। প্রশ্ন শুনে সুনন্দা তো প্রথমে লজ্জা লজ্জা মুখ করে একটু হাসলো। তারপর বলল,
_ওমা, ঝগড়া হয় তো। খুব হয়। তবে ঝগড়া করে একটুও সুখ নেই।
কেউ একজন অবাক হয়ে বলল,
–মানে?
–মি. চ্যাটার্জি একদম ঝগড়ুটে নয় তো।
এতটুকু বলেই হাসিতে ফেটে পড়ল সুনন্দা। হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার দাঁতে, চোখের মনিতে। তারপর ধীরে ধীরে সারা শরীরে। আগে এই হাসিটাই সংক্রমিত হতো সবার মধ্যে। কিন্তু আজ হলো না। একজন বিরক্ত হয়ে তাড়া দিলো। সুনন্দা বলতে শুরু করল।
-আমার রাগ হলে একটু চেঁচিয়ে ফেলি। আর চেঁচালেই আমার রাগ কিছুটা কমে আসে। তখন ওর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াই।
-তারপর?
-তারপর দশ স্টেপ হাঁটি।
-তারপর?
-গুনে গুনে কুড়ি সেকেন্ড অপেক্ষা করি। তারপর ঘুরে ওর দিকে ছুটে আসি। তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘ধাপ্পা’……


 

অক্ষর পরিচয়

কবিতা বণিক



- দিদি ! তোমার টিফিন। 
- সীতামণি! ওহ! দে।

এটাই ওর নাম। রোজই তো সবসময়ই ওকে দেখি কিন্তু আজ যেন অন্যরকম লাগছে। আমার মনের ভিতরটাও একটা অতৃপ্তি উঁকি দিচ্ছে। ও তো স্কুলে পড়ে। আমার থেকে বেশ কয়েক বছরের ছোট। রোজ সকালে আসে সারাদিন থাকে সন্ধ্যেবেলায় মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে যায়। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সীতার মাকে বলেছিলাম “ চাচী! সীতাকে আমি রোজ পড়াব। তুমি ওকে হিন্দি স্কুলে ভর্তি করে দাও। আমি সেভেন ,এইট হিন্দি পড়েছি। আমি প্রাথমিক পড়ানো পড়িয়ে দেব।” সাথে সাথে সীতা বলে ওঠে “আমি পড়ব না। আমার মুখ দুখায়।” বললাম, ``বেশ! পড়তে হবে না। আমি গল্প বলব, শুনবি। আর ছবি আঁকব দুজনে কেমন?`` একটু গররাজি হয়ে ও চাচী বললেন “সীতা কি মর্জি।” অনেক যত্নে কয়েক মাসে অক্ষর পরিচয় হলেও সব কটা তখনও হয়নি কিন্তু ওরই মধ্যে নিজের নামটা বেশ লিখতে শিখেছে। তার পর আর আসে না। শুনলাম ওর বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এখন সে শ্বশুর ঘরে যাবে না। বাড়ির, ক্ষেতের কাজ কর্ম শিখে সতের আঠারো বছর বয়স হলে তারপর ঘটা করে বর এসে নিয়ে যাবে। 
অনেক গুলো বসন্ত পার করলাম। আমিও সংসারী এখন। একদিন দুপুরে ছেলেরা স্কুলে, স্বামী কাজে। বাড়িতে আমি একাই। কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খুলে দেখি সেই চাচী! প্রণাম করে বললাম কেমন আছ? এমন সময় চাচীর পিছন থেকে বেরিয়ে এসে বলল - “ দিদি ! আমি সীতামণি! “ আমি তো অবাক! কতদিন পর দেখলাম। ভিতরে ঢুকিয়ে তাদের দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। সীতা খুব আনন্দের সাথে বলল “ আমরা কোর্ট থেকে আসছি। জান দিদি! আমি নিজে সই করলাম। আমার শ্বশুর মশাইয়ের জমি ভাগ হল তো ! সেদিন তুমি আমাকে শিখিয়েছিলে বলেই আজকে এই জমিনটা পেলাম।“ 

আমি অবাক হয়ে ভাবি।  কিছুই করি নি রে তোর জন্য! তাতেই এত সম্মান? 

“ আমি শুনে হাসি আঁখি জলে ভাসি ।”


 


লটারি 
চিত্রা পাল 

এপ্রিল ফুল করা রতন বাবুর পুরনো অভ্যেস। চেনাশোনা অনেকেই এই দিনটা তাঁকে এড়িয়ে চলে। তাই তাঁর ফোনটাকে পাত্তাই দিলো না সঞ্জয়। কেননা কে যে কখন ওনার টার্গেট হয়ে ফেঁসে যাবে তা আগে থেকে বোঝা যায় না। রতন বাবু বাবার বন্ধু,আমরা মানে আমার বন্ধুরা সকলে রতন কাকুই বলি।রতন কাকুর এই এপ্রিল ফুল করার ব্যাপারটা আজকের নয়,আগে থেকেই আছে। তাতে ছোট বড় কেউই বাদ যায় না। বাবার মুখে শুনেছি, অনেকদিন আগে এখানে সুবল্ রায় বলে একজন চৌধুরিদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। কিন্তু পাড়ার সকলের সঙ্গে এতো ভাব হয়ে গিয়েছিলো যে ওনারা এখানে ভাড়াটে হয়ে আছেন,তাই সকলে ভুলে গিয়েছিলো। সুবল কাকু আর কাকিমার খুব শখ সিনেমা দেখার। তো রতন কাকু একদিন সুবল কাকুকে বললেন, আজ রূপশ্রী তে বই দেখতে যাবেন? দাদা বৌদিও যাবে তাহলে। সুবল কাকু বললেন, আজ ছুটির দিন গেলেই হয়,কিন্তু টিকিট পাওয়া যাবে কি? শুনেছি হলে খুব ভীড় হচ্ছে। রতন কাকু বললেন,কিচ্ছু চিন্তা করবেন না, আমি আগে গিয়ে চারটে টিকিট করে হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো। ছটায় শো শুরু,আপনারা পাঁচটা নাগাদ চারজনে বেরিয়ে পড়বেন, দাদাকেও বলে দিচ্ছি। কাকিমা দুবেলার রান্না সেরে বেশ ফুরফুরে মেজাজে সাজগোজ করছেন,কাকুও তৈরি হচ্ছেন, হলটা একটু দূরে, রিক্সা নিয়ে যেতে হবে। পাঁচটার একটু আগেই বেরোবেন। ঠিক বেরোবার আগেই বাড়ির গেটে একটা শব্দ হলো। একেবারে তৈরি হয়ে সুবল কাকুএকবার বাইরে বেরিয়ে দেখতে এলেন, ক্যানো, শব্দোটা হলো। ওমা, বাইরে বেরিয়ে এসে দ্যাখেন, এত্ত বড় বড় করে লেখা এপ্রিল ফুল। কাকু প্রথমে বুঝতে পারেননি, পরে তারিখটা খেয়াল হতে হো হো করে হেসে উঠলেন। আর কাকিমা একেবারে রেগেমেগে শয্যা নিলেন।

  আজ সকালে সঞ্জয়ের ফোনটা বেজে উঠতে,সঞ্জয় দ্যাখে ওটা রতনবাবুর ফোন। ফোনটা ধরার সময় হঠাত্‌, চোখ চলে যায় সামনের ক্যালেন্ডারে, দেখে সেখানেজ্বলজ্বল করছে১লা এপ্রিল। ওরে বাবা,১লা এপ্রিল, তার সঙ্গে রতনকাকুর ফোন।তাই আর কোন কথা না বলে,ওটাকে পাত্তা না দিয়ে ও নিজের কাজে মন দিলো। আসলে ও আজ ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। যত রাশি রাশি পুরনো কাগজ বাতিল ম্যাগাজিন সব বিদায় করবে আজ। সামনে আসছে ১লা বৈশাখ, তার আগে এবারে ঘরটাকে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফেলবে। প্রথমে আলনার নীচের র‍্যাক থেকে সব খবরের কাগজের স্তূপ বাইরে রেখে এলো। এবার ড্রয়ারে হাত লাগালো। ড্রয়ারটায় যে কত্ত বাজে কাগজ রয়েছে তার ঠিক নেই। পুরনো কাগজের কাটিং,নেমন্তন্নর চিঠি,লটারির বাতিল হওয়া টিকিট সব। লটারির টিকিট কাটা ওর শখ। পায়না কখনো,তবু ওই মনে আশা। এখনো সেই আশার মরুভূমিতে হাঁটে মরীচিকার খোঁজে। এবারও বসন্ত উত্‌সব নামে লাষ্ট লটারির টকিট কিনে ফেলে রেখেছে এই ড্রয়ারে অবহেলায়। ঠিক করেছে আর লটারির টিকিট কিনবে না। এবার ড্রয়ার থেকে বার করে সব পুড়িয়ে ফেলবে, তাতে কাগজ গুলো সব এদিক সেদিক উড়ে যাবে না। 

      সবে আগুনটা ধরিয়েছে,এমন সময়ে আবার রতন কাকুর ফোনফোনটা ধরেই সঞ্জয় বলে, কি, এপ্রিল ফুল হবার জন্যে? ওদিক থেকে তড়িঘড়ি রতনকাকু ওকে বলেন, নারে, তুইতো লটারির টিকিট কিনিস,এদিক থেকে সঞ্জয় বলে , হ্যাঁ তা কি হয়েছে? আরে আজ লটারির রেজাল্ট বেরিয়েছে,তুই শিগগির লটারির টিকিট খানা নিয়ে চলে আয়, বাজারের কাউন্টারে। ওদিকে আগুন ধরে গেছে, ওখানটায় জল পড়ে ছিলো বলে ততটা ধরেনি। তাড়াতাড়ি খানিকটা জল ঢেলে আগুন নিভিয়ে দেয়। তারপরে লটারির টিকিটগুলো একধারে করে খুঁজে বের করে টিকিটখানা। ওটার কোনটা পুড়েছে, কিন্তু নম্বরটা আছে। তাড়াতাড়ি তাই নিয়েই ছুটলো, লটারি সেন্টারে। 

   বেশ ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের পরে যেদিন লটারির টাকাটা হাতে এলো, সঞ্জয় জড়িয়ে ধরলো রতন কাকুকে। আজ ওনার জন্যেই টাকাটা পেলো, না হলে সবই পুড়ে যেতো। বুঝতে পারলো সঞ্জয়, রতনকাকু এপ্রিল ফুল করে মজা করলেও মনটা খাঁটি সোনা, সেখানে কোন খাদ নেই। লটারির সঙ্গে এটাও ওর বড় প্রাপ্তি।।   


 

রহস্যের অন্তরালে 

শুভেন্দু নন্দী


অর্কর মনে শ্যামল কাকুর ঝড়-জল রাতে আগমনের ব্যাপারটা যেন স্বপ্নের মত মনে হয় এখনও। অথচ তাঁর জীবন-মরন বা অস্তিত্ব এখন  এক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বাড়িতে।  ভাবলেই কেন যেন বেশ আশ্চর্য লাগছে। অর্ক যেটা কল্পনাই করতে পারছেনা। বাড়ির সবার চোখেমুখে দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তার এক কালো ছায়া ।  

" খোকা তবে কাকে দেখলো?" বাবার এই প্রশ্ন  রীতিমতন আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে অর্ককে। জটিল প্রশ্ন সন্দেহ নাই।  দূর্যোগের সেই রাতে নিজের চোখে যাঁকে দেখেছে ও বাড়িতে যিনি এক রাত্রির জন্য halt করেছেন- তাঁকে কেমন করে অস্বীকার করবে অর্ক। আর সেই প্রশ্নে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে অর্কর সারা দেহ- মন-প্রান । ভেবেও কোনও কূলকিনারা পাচ্ছেনা। আসলে "পেপারে" একাউন্টারে কাকুর "শেষ হয়ে" যাবার খবরটা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মিলিটারী ডিপার্টমেন্টের সংবাদের ভিত্তিতে যে সেটাকে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছেনা।  

যুদ্ধে  সংজ্ঞাহীন ও কোমায় চলে যাওয়া একমাত্র বাঙালী ভদ্রলোক - দীর্ঘ তিন মাস পরে আবার জীবন  ফিরে পেয়েছেন এবং প্রেস মিডিয়াকে তিনি তাঁদের একাধিক জেরায় জানিয়েছেন যে শ্যামল তাঁর সহকর্মী এবং উঁচু পাহাড় থেকে নীচে তাঁর পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। সুতরাং তাঁর জীবনাবসানের খবরটা হাইপোথেটিকাল। শত্রুপক্ষের গুলি বিনিময়ের প্রাক মুহুর্তে শরীরের ভারসাম্য বজায় না থাকার কারণে গড়িয়ে পড়ে যান নীচে তিনি। তবে প্রাণ রক্ষা হয়েছিলো কিনা শেষ পর্যন্ত, ঈশ্বরই তা বলতে পারবেন। একশো ভাগ নিশ্চিত হয়েই তাঁর একথা ব্যক্ত করা, সমবেত প্রেস মিডিয়াকে। 

...তবে একটা ব্যাপারে বাবার সাথে তাঁর সহমত পোষণ করে অর্ক। আর তা হোলো নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও এ বাড়িতেই আশ্রয় গ্রহন আর পরের দিনই ভোরে চলে যাওয়ার তাঁর যে এই decision মন থেকে একেবারেই মেনে নিতে পারছেনা সে। এক দূর সম্পর্কের পিসির স্নেহ, আদর, যত্নেই তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা ছেলেবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে। আর্থিক দৌর্বল্যের কারনে স্কুলের গন্ডী পেরিয়েই তাঁর এ চাকরী গ্রহন। ব্যাপারটা পিসি অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেননি। বাবার কাছ থেকেই এসব জেনেছে অর্ক। সবচেয়ে অবাক লাগে তার এত বড়ো একটা বিভ্রান্তিকর ঘটনার বিন্দুমাত্র আঁচ পায়নি সে। 

আসলে বাবা-মা এ ঘটনার কথা জানিয়ে তাকে বিব্রত করতে চাননি। যেটা সে আজ বেশ বুঝতে পারছে। স্নেহ-অন্ত প্রাণ পিসির কাছে আদৌ গিয়েছিলেন কিনা তিনি- সেটা confirmed হবার জন্য তাগিদ অনুভব করলো সে। এ ব্যাপারে জয়ন্তর কাছে suggestion নেওয়া জরুরী বলে মনে করলো। পুরো ঘটনাটা জয়ন্তকে সে অবহিত করেছিলো। জয়ন্ত একজন বিচক্ষন ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিও বটে। বেশ অনুসন্ধানী চোখ। রহস্য- তা যে ধরনেরই হোক- তা উদ্ঘাটনের জন্য আগ্রহ তার যথেষ্ট। যুক্তিবাদী মন তার। তাই ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সে বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বাস করেছিলো। যা অর্কর পরিবারকে unnerved করে দিয়েছিলো ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই না করেই।  অবশ্য তার জন্য প্রচার বা অপপ্রচার(?) ভীষণভাবে দায়ী। 

"আমি এ রহস্যের সমাধান সূত্র খোলার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করবো না। তোকে কথা দিচ্ছি।" জয়ন্ত  আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে কথাগুলো বললো। ছেলেবেলা থেকেই সে ডানপিটে। সাহসী ও জেদী মনোভাবে গড়া।  বাবা একটা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারীং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে মেকানিকের  কাজ করে। স্বল্প বেতন। তাই তাঁকে কিছুটা আর্থিক সাপোর্ট দেবার জন্য গৃহশিক্ষকতার কাজ করে সে। কলেজে তার আর পড়া হয়ে ওঠেনি।  ভাইকে মনের মত মানুষ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সে। তা হোলে কাকুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনার একটা ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পেলো অর্ক। -" হে ভগবান! তাই  যেন হয় " মনে মনে সে প্রার্থনা করতে লাগলো ঈশ্বরের কাছে। তা ছাড়া "রাখে হরি মারে কে? 

সব প্রশ্নের সমাধান করতে পারতেন একমাত্র কাকু, অবশ্য তিনি যদি সত্যি সত্যিই ফিরে আসতেন"।একথা বলার অর্থ তার চাক্ষুষ দেখার প্রমান পরিবারের কারোর কাছে গ্রহনযোগ্য নয় এই মুহূর্তে। সশরীরে আবার সবার কাছে ফিরে এলে তবেই হবে বিশ্বাসযোগ্যতার অকাট্য প্রমান। তারই ভরষায় অর্ক ও তার পরিবার দিনাতিপাত করতে লাগলো। ভাবছে সে ও জয়ন্ত দিনদুয়েকের মধ্যে শ্যামলকাকুর বাড়িতে খবর নেবে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঐ দূর্যোগের রাতে কেউ এসেছিলেন কিনা ? জয়ন্তের ওপর তার দারুন আস্থা। বাবার কাছে শুনেছে এই পাড়ার পুরণো ভাড়া বাড়ি ছেড়ে ঠিক এই পাড়ার সংলগ্ন হালদার পাড়ায় নতুন একতলা বাড়িতে চলে গেছেন তার শ্যামলকাকু পিসিকে নিয়ে। তার জন্য তাঁকে প্রচুর ঋণও করতে হয়েছিলো। একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কাকু বাবাকে বলেছিলেন একথা ঘনিষ্ট সম্পর্কের সুত্রে। যাই হোক, জয়ন্তের সহযোগিতায় এ রহস্যের যবনিকাপাত অবশ্যই হবে যথাসময়,তারই আশায় বাড়ির সবাই প্রহর গুনতে লাগলো। 


 

ঘর থেকে আটমাইল
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

'ভ্রমণ' এই শব্দটি তিন অক্ষরের হলেও এর ব্যপ্তি অপরিসীম। এর পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের মাঝের সময়টুকু যে অনাবিল আগ্রহ ও দুরন্ত প্রতীক্ষায় কেটে যায়,তার আনন্দ সীমাহীন। আবার তেমন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই চটজলদি সিদ্ধান্তে কোনো সফর যদি ডানা মেলে, হঠাৎ পাওয়া সে আনন্দও তুলনাহীন। বুক ভরে শ্বাস নেওয়া, চোখ ভরে সুন্দরকে দেখা, মন দিয়ে উপলব্ধি করা ও যা দেখছি সেগুলি সম্পর্কে কিছুটা হলেও জেনে নেওয়া সম্ভব হলে পরিপূর্ণ এক ভ্রমণকে মুঠোয় ভরে নিয়ে ফেরা যায়। 
'তিন-চূড়ো পাহাড়ের দেশে
গোধূলিতে ডুলি ক'রে আমি চলি দূর গাঁয়ে
তিন- চূড়ো পাহাড়ের শেষে..... 
চলে চলে ডুলি চলে ওই পাহাড়ের গাঁয়ে, 
তিন-চূড়ো পাহাড়ের দেশে।।। '
                                                 সুনির্মল বসু





পাহাড়কে কাছ থেকে দেখার অমোঘ টানে আমাদের সফর এবার ডানা মেলেছিল কালিম্পং- এর পথে আটমাইলের দিকে।তবে কবিতার মতো গোধূলি বেলায় নয়, খুব সকাল সকাল আমাদের যাত্রা হলো শুরু।কালিম্পং- এর সৌন্দর্য্য নিয়ে নতুন করে কিছু বলবার নেই। মনোরম এই যাত্রাপথে আবহাওয়া দারুণ ভাবে সাথ দিয়ে চলেছিল আমাদের।পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে কানায় কানায় যে মনকাড়া ভালোলাগার খনি তা থেকে মণিমুক্তো কুড়িয়ে নেওয়াতে এতটুকুও যাতে বিঘ্ন না ঘটে তার নিঃশর্ত দায়িত্ব যেন বর্তেছে আবহাওয়ার ওপর।রোদ ঝলমলে নিসর্গের মাঝে দৃশ্যমান পাহাড়ের সঙ্গে শুভদৃষ্টির আনন্দে যেন এতটুকুও ঘাটতি না হয়,প্রকৃতির কড়া প্রহরায় আবহাওয়া সেই দায়িত্বপালন করে চলেছিল নিরলস ভাবে।পাকদন্ডী পথ বেয়ে চলমান পাহাড় তার মোহময়ী রূপ নিয়ে আমাদের সঙ্গ দিয়ে চলেছিল অবিরাম।কোমল,রোদ ঝলমলে একটি সকাল শান্ত এক দুপুরে পৌঁছে গিয়েছিল নির্দিষ্ট গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নেমে চারিদিকে চেয়ে আশ্চর্য এক মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়েছিল মন। নাম জানা,না জানা অজস্র ফুল স্বাগত জানিয়েছিল ঢাল বেয়ে নীচে নামা পাহাড়ি চলার পথে। সেও এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বটে। মাথার ওপর স্বচ্ছ নীল আকাশের দুধসাদা উড়োমেঘের দল কেবল সাক্ষী ছিল ধাপে ধাপে খাঁজকাটা সেই বন্ধুর পথযাত্রার। বেশ লাগছিল দলেবলে কিছুটা ভয় আর বাকি পুরোটাই আনন্দ নিয়ে এভাবে এগিয়ে যেতে।এদিকে আমাদের সকলের যাবতীয় লাগেজ ব্যাগগুলি পিঠে নিয়ে কী আশ্চর্য তৎপরতায় হোমস্টের দায়িত্ব প্রাপ্ত মানুষটি বহু আগেই পৌঁছে গেছেন জাগয়ামতো।নেমে চলার কোনো এক বাঁকে এক মুহূর্তের জন্য তাঁকে দেখেছিলাম হয়তো বা। 






এরপর থমকে দাঁড়াবার পালা। পাহাড় কাছ থেকে আগে দেখিনি এমন তো নয়। কিন্তু এই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তা ধারণারও বাইরে ছিল। নীল সাদা আকাশের গায়ে স্তরে স্তরে সবুজ ঢেউ এঁকে যে পাহাড় নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছিল,এমন অপরূপ পাহাড় আগে কখনো দেখিনি। ঝকঝকে রোদ সোনার জলে প্রাণময়তার ছবি এঁকে দিচ্ছিল এর গায়ে। মন বলছিল এই পরম পাওয়ার মুহূর্তগুলোর জন্যই বেঁচে থাকা। 

ফুলে লতায় পাতায় চমৎকার ভাবে সাজানো হোমস্টে টি নেহাত ছোট নয়। ধাপে ধাপে সুদৃশ্য সব কটেজ পাহাড় আর সবুজ গাছপালাকে সঙ্গে করে হাতে আঁকা ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন।প্রকৃতির নিজস্ব ধাপ বেয়ে সেগুলিতে ওঠা নামার বন্দোবস্ত। কটেজগুলি নির্মানে পিলার হিসেবে বাঁশের ব্যবহার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।এছাড়া পাটি ও ছনের দৃষ্টিনন্দন দেওয়াল ও ছাদ অত্যন্ত মনোগ্রাহী। এদের ঘিরে থাকা রংবেরঙের ফুলেরা সমস্ত জৌলুসটুকু জড়ো করে স্বর্গীয় সুন্দর করে তুলেছে আটমাইলের এই জায়গাটিকে। 

আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটির জানালায় চোখ রাখতেই অপার্থিব এক সৌন্দর্যের সাক্ষী রইলাম। এতটুকুও বাধা নেই এখান থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ পাহাড়কে লুটেপুটে নেওয়ার। শুধু চোখদুটো বিছিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা। একটা গোটা পাহাড়ের মালিক তখন অপার দৃষ্টিসুখ।সঙ্গে রয়েছে সবুজ বনানী।একটা ঘোরের মধ্যে কতক্ষণ কেটে গেছিল জানা নেই। 






পায়ে পায়ে পথচলা এরপর দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে। রান্নার দোতলা বাড়িটি হোমস্টের একপাশে স্বতন্ত্র ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। সেটির পাশ ঘেঁষে সিঁড়ি বেয়ে নেমে উঠে খোলামেলা একটি বারান্দার মতো খাবার ঘর।এর রেলিং ধরে সামনের অপূর্ব পাহাড়ের আর সবুজের গালিচা বিছোনো উপত্যকার দিকে তাকিয়ে সারাটা জীবন দাঁড়িয়ে থাকতে মন চায়।খাবারগুলিও অত্যন্ত সুস্বাদু এবং পরিবেশন, পরিচ্ছন্নতা, আপ্যায়ন সবকিছুর বিচারে সেরার দাবি রাখে। বিশেষ করে শেষপাতের ডেজার্ট হিসেবে যে কাস্টার্ড ছিল,তার স্বাদ এখনও মুখে লেগে রয়েছে। 

একটু বিশ্রাম নিয়েই ফের সবাই একজোট ওই খাবার জায়গায়। গল্প, হাসি, আনন্দ সহযোগে চা ও টায়ের আড্ডা তখন জমজমাট।মুঠোফোনে সেইসব মুহূর্তদের বন্দী করতে করতে কখন যে আলোর জড়োয়ার গয়নায় গা মুড়েছে পাহাড়ের আনাচকানাচ খেয়ালই করিনি। ভালোলাগায় বিবশ হয়ে শুধু চেয়ে থাকতে মন চায় সন্ধেবেলার এই পাহাড়ের দিকে। নেপথ্যে আবহাওয়া সাথ দিয়ে চলেছিল বলে সবটা এত উপভোগ্য হয়েছিল সেদিন।এরপর ঘোলাটে রাতের আকাশের গা ফুঁড়ে পাহাড়কে কবিতা শোনাতেই যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিল আধভাঙা চাঁদ।নয়নাভিরাম প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করতে করতে মনকাড়া রাতের খাওয়া সারা হলো।এবারও মন জয় করল ডেজার্ট।মায়াবী রাতের আধভাঙা সেই মায়াবী চাঁদের তখনও পাহাড়ের কানে কানে কিছু পংক্তি বলা বাকি। 

রাতের বেশিটাই তন্দ্রার ঘোরে কেটে গিয়েছিল। নির্ঘুম চোখ কতবার যে জানালার কাছে গিয়ে পাহাড়কে দেখে দেখে ফিরে এসেছে তার ঠিক নেই। এ সময়টুকু ছিল একেবারে নিজস্ব।মৌনতার মাঝে প্রকৃতির এই সান্নিধ্য ছিল এক অপার প্রাপ্তি।রাত কেটে একসময় আবছা আলোর ভোর এসে হাজির হয়েছিল চোখের সামনে। 

পাহাড় ছোঁয়া আকাশের গায়ে তখন রং ধরছে একটু একটু করে। পাখিরা দায়িত্ব নিয়ে জাগিয়ে তুলছে চরাচর।ভোর থেকেই তাদের গল্প শুরু। অবিরাম কথার মালায় জড়িয়ে নিচ্ছে দিক দিগন্তকে। চোখ মেলছে পাহাড়িয়া আলো। আধো আলো আধো অন্ধকারের সেই পাহাড়িয়া গল্পের বেশিরভাগ পৃষ্ঠাতেই পাখিদের ছবি আঁকা। 

            ঘুম জড়ানো পাহাড় রাতের আদর করে পরিয়ে দেওয়া আলোর নেকলেস খুলবে কিনা সে নিয়ে গড়িমসি করতে করতে একসময় স্নিগ্ধ এক আলোর আবেশ এসে জড়িয়ে নিল তাকে।বেশ কিছুক্ষণ ধরে কুসুম কোমল এক রোশনাইয়ে পাহাড়কে স্নান করিয়ে সাজিয়ে দিল।এরপর সদ্য জেগে ওঠা সূর্য কোমল হাতে মুঠোভরা আবির ছড়িয়ে দিল পাহাড়ের গায়ে।আকাশের ময়দানেও তখন রঙের খেলা। ভোরবেলার প্রকৃতি রাঙিয়ে উঠছে এভাবেই।নির্জনতার মাঝে ভোরের আলাপ চলছে শুধু পাখিদের। আকাশ, পাহাড়, পাখির দল জেগে উঠলেও ঘুমে জড়িয়ে আছে হোমস্টের কটেজগুলি।শব্দ, বর্ণ, রূপ, রস গন্ধে প্রকৃতি তাই আরো বেশি নিজের মতো করে সুন্দর তখন।




এই আলোর খেলা চলতে চলতে কখন একপাল উড়োমেঘ এসে পাহাড়কে লুঠ করে নিয়ে চলে যায় কোন নিরুদ্দেশের ঠিকানায়।জানালার ছবিতে তখন দুধসাদা আকাশের একচ্ছত্র আধিপত্য। মনেও হয়না সেখানে সামান্য কিছু আগেও শৈলশ্রেণী তার স্তরে স্তরে মনোলোভা সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজমান ছিল। খামখেয়ালি মেঘের মর্জিতে আবার ডানা ভর করে একসময়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা পাহাড়ের গা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে সকালের আলোর সংকেতে দৃশ্যমান করে পাহাড়কে। আংশিক মেঘলা এই সকালে মেঘ পাহাড়ের এই অবিরাম লুকোচুরি খেলার সাক্ষী থাকতে থাকতে অপার বিস্ময়ে ছেয়ে যায় মন।তারপর হঠাৎই মুখভার করা আকাশ বৃষ্টিজলে ধুয়ে দেয় আটমাইলের প্রকৃতিকে। সেও এক আলাদা ভালোলাগা। বৃষ্টিস্নাত কটেজগুলি থেকে শুরু করে রকমারি ফুলের দল, চারিদিকের আরামদায়ক সবুজ সবকিছুই আলাদা এক মাত্রা পেল যেন এই বৃষ্টির ছোঁওয়ায়। বৃষ্টি থামতেই আবার রূপসী পাহাড়ের হাতছানি। 

জলখাবারের পর্ব সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আটমাইল থেকে।মনের ক্যানভাসে রয়ে গেল কুড়িয়ে পাওয়া সেই আলোর বৃত্তান্ত। প্রকৃতির অকৃত্রিম এই রমনীয়তার কাছে, সকলে মিলে সুন্দর করে কাটানো মুহূর্তগুলির কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম বারংবার।সবুজে সবুজ অরণ্য ঘেরা হোমস্টে, সামনের হাসমুখ পাহাড়,হরেক কিসিমের ফুল ও সহজ সরল অতিথিবৎসল কিছু মানুষ তখন একযোগে আবার ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে আমাদের।সময়ে ডুলি বেয়ে আমরা তখন আবারও পাহাড়কে পাশে রেখে এবং প্রাপ্তির একরাশ ভালোলাগাকে সঙ্গী করে ফিরতি পথের যাত্রী সবাই।


 

গুচ্ছকবিতা

শিশির আজম



স্পুটনিক সুইটহার্ট


আমার স্পুটনিক সুইটহার্ট আমি খুঁইজা পাইতেছি না
অবশ্য
আমার সম্মতি নিয়াই  ও হারায়ে গেছে
আর ওর যে হারায়ে যাওয়া দরকার
এইটা তো আমি জানি
একমাত্র আমিই জানি
মানে ওর নাই হয়ে যাওয়াটা আমার কাছে
না অদ্ভুত না বিস্ময়কর
না কি বহুবীজপত্রী উদ্ভিদের পরিবারে ও খুঁজতেছে আমারে
আমারেই
নভচারীদের দ্রাঘিমাচ্যূত টুথপেষ্টে
কার্পাশবনের আগুনলাগা বিমানে





ঘড়িটা আমায় উপহার দিয়েছিল বন্ধু সালভাদর দালি


ঘড়িটা আমার টেবিলেই ছিল এখন দেখছি তেলাপোকা
দেখছি
চায়ের লিকারের মতো ওটা গলে পড়ছে গলে গলে পড়ছে
আগামীকাল যখন তাকাবো ঐ নিষ্কলঙ্ক সংবেদনশীল ঘড়িটার দিকে
দেখবো টেবিলটায় পড়ে আছে টিকটিকির জ্যান্ত লেজ
টিকটিকিটা নেই
আচ্ছা টেবিলটার কোন দোষ নেই তো কোন দুরভিসন্ধি
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো
এতো এতো বিখ্যাত সব ঘড়ি কোম্পানি ক্লাসিকাল আর এ্যালকোহলিক
এদের অফিস কোথায় কেউ তো বলতে পারে না




দুর্ঘটনা বলে কয়ে আসে না


কফিশপ থেকে বেরিয়ে একান্ত একাগ্রতায় লোকটা
বামে মোড় নিলো
তারপর আনুমানিক বিশ পা হাঁটলো
তারপর একবার ডানে একবার বামে তাকালো
তারপর রাস্তা পার হলো
ফলে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি

রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলেছে
মানুষের ভীড়
যদিও কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি আমরা দেখেছি

আমরা কি নিশ্চিত যে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি
ঐ লোকটার ভেতর
তোমার আমার ভেতর
কোন দুর্ঘটনা কি নেই
অথবা
দুর্ঘটনা কেবল রাস্তায়ই ঘটে
এমন গপ্পগাথা
কেন আমাদের বিশ্বাস করতে হবে
যখন
হেমন্ত যাবো যাবো করছে
আর দু'টো দোয়েল একই ডালে বসে আছে
মুখ দু'দিকে




যে পাখি ওড়ে না


এবার একটা পাখি আঁকবো আমি
যার চোখ না কালো না নীল
'তাহলে ওর চোখজোড়া কী রঙের?'
হ্যা এই প্রশ্ন তোমরা করতে পারো

পাখিটার কোন ডানা আমি আঁকবো না
ধরে নাও
ওর কোন ডানা নেই

'কিন্তু পাখিটা তো ওড়ে'

তুমি কি নিশ্চিত যে পাখিটা ওড়ে
তুমি কি দেখেছ

তোমার চোখ কী রঙের





আমি চাইতেছি আরও বড় বেকুব হয়া উঠবার


আমি যে আস্ত এক বেকুব
এইটা
বারবার বারবার আমারে মনে করায়া দেওয়া হয়

হ আমি তো জানিই যে আমি বেকুব
আর
সেগুলাই আমি করতেছি
বা করবার লাইগা মনপ্রাণ ঢাইলা দিতেছি
যেগুলাতে প্রমাণ হয়
প্রজ্ঞায় ও প্রপাতরেখায়
আমি আরও বড় বেকুব হয়া উঠবার
চাইতেছি

যেমনটা অরা ভাবতিছে
তার চায়া বেশি


 

বিপরীত স্মৃতির কাছে ফিরবে নাকি?
তন্ময় ধর 

আলোর জন‍্য আমার স্মৃতিভ্রম আটকে আছে অনন্ত আকাশে
ধরো, এই নদীটিই কথা বলল না আর
সময়ের সংকেত থেকে তরল চোখ তুলল একটি মাছের কৌতূহল

আর অনভ্যাসের অতিশর্ত থেকে ভেঙে গেল পাখিদের কোলাহল 
বিষাক্ত লালায় ভরে ওঠা মুখে কোন জন্তুর পালিয়ে যাওয়ার শব্দ হল না 
অসংখ্য সাপের শীতল দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ল না বহির্বিশ্বের দেহকোষে 

ধরো, এই নদীটিই ক্রোধকান্না রাখল না আর
বিপরীত বৃশ্চিকনক্ষত্রের আলো রীতিবহির্ভূত হয়ে উঠল তোমার উপশিরায়

জন্মান্ধ ঘুম হয়ে উঠল
ক্ষীণকটির এই দেবত্বসংক্ষেপ 

এখনো বলো,
ডুবন্ত এই দৃষ্টির ক্ষতস্থানে কখনো ফিরে আসবে কিনা...


 


নিঠুর শ্রাবণ
অপর্ণা সাহা 

নিঠুর শ্রাবণ বৃষ্টি হীন উষ্ণতার পারদ মাপে!

দগ্ধ দেহ-মন ক্লান্ত ভীষণ বৃষ্টি ধারা খোঁজে।
তপ্ত শ্রাবণ-দুপুরও গ্রীষ্মের দীর্ঘ পরশে তাপিত! 
ঘর্মাক্ত কৃষক তাপক করালে ভীত-সন্ত্রস্ত।
তাপিত হৃদয়
তাপিত শহর 
তাপিত উত্তর বাংলা---

মেঘহীন নিঃসঙ্গতায় হেঁটে চলা শহর 
ছুঁতে চায় বৃষ্টির হাত---
শত যোজন দূরে আকাশে তখন 

সবুজ হীন উন্নয়নের অজুহাত। 


 

রং 
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 

ত্বকের রং বদলানো যায় ,
যদিও হৃদয়ের রং সব সময় লাল;

সালোকসংশ্লেষে জুড়ে যায় জীবন, 

ভরকেন্দ্র গিলে নেয় অন্ধকার,

ফ্ল্যাশব্যাকে বন্ধুত্বের পথচলা;

আকাশের কোন সীমানা নেই ,
তবুও সব ঘাসকে আন্তর্জাতিক বলা যায় না।


 

স্থিরচিত্র 

মিষ্টু সরকার


খোদাই করা চিত্র মাঝে চুপকথা এক কান্না 
রঙিন শোক সে গড়ায় যতো তুলি বলে আর-না ।

জিঘাংসা রূপ আঁচড় কামড় আর ছিল যা গোপন 
ছিন্নভিন্ন রঙিন ইজেল খুঁজছে আপন আঁচল ।

এই তো ! সেদিন গেঁথেছিলে ভালোবাসার দোঁহা 
বিশ্বাসী সব মিলন প্রহর  ক্ষণের 
অনুমেহা ।

হিলহিলিয়ে শীতলতায়  উঠছি  কেঁপে কেঁপে ।
মাপের হিসাব নিক্তিতে নেয় আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ।

শিল্প হলো লক্ষ্মী এলো  সমাজ পেলো বার্তা 
বুলবুলি যে ধান খেয়েছে  হয়েছে 
বেপাত্তা ।

শ্রী হারিয়ে নগ্ন সমাজ। হারাচ্ছে 
সম্বিৎ ।
নির্লিপ্তি আঁকড়ে ধরে  কীর্তিমানের 
কিরীট ।


 


চলমানতার স্তব

প্রতিভা পাল 


বৃষ্টির অজুহাতে ভিজতে চাওয়া দু'চোখ 

বর্ষা হতে চায় নামহীন অভিমানে।

গ্রীষ্ম-বিকেলের নৈঃশব্দ চিরে

শ্রাবণের সবুজ ভেজা ভিড়।

দূর দূর থেকে ভেসে আসে সন্ধ্যার শিহরণ। 

ঝাপসা দৃষ্টি ; 

কখন যেন রাত নামে অচিরেই ! 

মেঘের আড়ালে তারারা আজ চাঁদ খোঁজে। 

অদ্ভুত এই অদৃশ্য সমাপতন !

মাঝেমাঝে ভাবি স্তব্ধতার সংজ্ঞা লিখি,

জীবন অথচ লিখিয়ে নেয় নির্দ্বিধায় 

চলমানতার স্তব.....


 

আবর্ত
অর্পিতা মুখার্জী


সংলাপের বিভূতি দ্বারা সম্পন্ন যজ্ঞে
বৃথা চেষ্টা যুগসন্ধির।
নিষ্পলক দৃষ্টি দেখতে পায় যেন
সহস্রাধিক পরিযায়ী প্রাণের 
লক্ষ-কোটি যাপনচিত্র।
স্বপ্নতৃষায় হেরে যাওয়া ফিনিক্স পাখিরাও
জন্মায় নবরূপে বারংবার।
পুনরায় মেলে দৃষ্টিশক্তি
বুনতে থাকে স্বপ্ন।
তৈরি হতে থাকে আরও একটা 
নতুন লক্ষ্য জয়ের প্রস্তুতিচিত্র।
শেষ থেকে আবারও একটা 
নতুন শুরুর জন‍্য, চলতে  থাকে
 মৃত্যুর সাথে জীবনের লড়াই।


 

বৃষ্টিকালীন 

উৎপলেন্দু পাল 


বৃষ্টি নামার আগে 
এক জোড়া সাদা পায়রা 
উঠোনের কোণে বকবকম্ প্রেম নিবেদনে 

বৃষ্টি নামার পর 
একটা হাভাতে দাঁড়কাক 
ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে যায় হাতের মোয়া  

বৃষ্টি থামার আগে 
কতগুলো ছাতারে পাখি 
কলতলায় খুঁটে খুঁটে খায় মরিয়া হয়ে 

বৃষ্টি থামার পর 
একটা শিকারী সোনালী চিল 
উঠোনের ওপর পাক খেয়ে খেয়ে ওড়ে। 




 এই শ্রাবণে

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 


একটা গানের কলি যেন ভাসিয়ে দিল এই শ্রাবণে
বৃষ্টিঝরা শ্রাবণ প্রাতেও হাসেন রবি দূর গগনে।

সকল মনের কান্না হাসি পদ্য ছড়া গল্প গাথা
সহজ পাঠের মধুর স্মৃতি গীতবিতান আর সঞ্চয়িতা। 

বর্ষা এলেই  অঝোর ধারায় শ্রাবণ কাঁদে অন্তরেতে
ফুলগুলো সব নুইয়ে পড়ে বর্ষাস্নাত ভোরবেলাতে।

ভিজছে আকাশ ভিজিয়ে বাতাস প্রান্ত জুড়ে অঝোর ধারা 
পাখপাখালি  উল্লাসেতে মত্ত যেন পাগলপারা

উড়িয়ে আঁচল মেঘের ধ্বজা রাত জাগা চোখ চায় যে ছুটি 
বাঁশের বনে কালচে সবুজ খাচ্ছে যেন লুটোপুটি 

সাজিয়ে নিয়ে বরণডালা মেছেনিগান গাইছে তালে 
ভাঙলো মেলা তিস্তাবুড়ীর আড়চোখে চায় বটের ডালে

চাষার মনে আশার আলো মিলিয়ে গিয়ে হয় যে ফিঁকে
শ্রাবণ ধারা ভিজিয়ে ধরা যায় ছুটে যায় দিকবিদিকে

এই শ্রাবণেই ভাঙলো যে ঘুম গান শোনালো ভোরের পাখি 
মাঝ গগনে চোখ মেলে চাই
দেখতে যে পাই তোমার আঁখি।


 

পেরেও পারিনি

মোহিত ব্যাপারী


এক পৃথিবী ভালোবাসি তোমাকে।
তবু এক পৃথিবী ভালোবাসতে পারিনি।
এক পৃথিবী ভালোবাসা যায়না কখনো।
তবু কথাটা শুনে তুমি মুচকি হেসেছিলে।
আমাকে জড়িয়ে নিয়েছিলে বুকে শীতের চাদরে।
এক বুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলে নিশ্চিন্তে।
তোমার জন্যে আকাশের চাঁদটাকেও এনে দিতে পারি।
তোমাকে অনেক ভালোবেসে বলেছিলাম।
তুমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলে আমার দিকে।
তোমার চোখদুটি বিস্ময় স্নেহ মমতায় ভরে উঠেছিল।
ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলে।
বলেছিলে আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেনা।
পৃথিবীর সুন্দরতম মুহূর্ত ছিল সময়টা।
সবই কথার কথা তুমিও জানো।
কথা দিয়ে সব কথা রাখা যায়না।
সময়টা সুন্দর হয় শুধু জীবনের কাছে।
চাঁদটা আজও জ্বলজ্বল করে রাতের আকাশে।
কেউ স্থানচ্যুত করতে পারেনি তাকে।
তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে গেছ শেষবেলায়।
তোমাকেও আমি ধরে রাখতে পারিনি।
তোমার জন্যে আমি মরতেও পারি।
মিথ্যে রাগের ভঙ্গিমায় আমার মুখে হাত চেপে ধরেছিলে।
অভিমানী সুরে বলেছিলে একসাথে বাঁচব একসাথে মরব।
কিন্তু আজ আবার সেই পিঁপড়েটি আমাকে কামড়ালে
তুমি জানতেও পার না।
ওটা শুধু পাগলামি ছাড়া কিছু নয়।


 

অপেক্ষা

প্রাণেশ পাল 


ভালবাসার অনুভূতিগুলো দূর দিগন্তে
পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে যায়,
ছুটে যাই পাহাড়ের বাঁকে,পাহাড় বলে--অপেক্ষা !

ডুয়ার্সের শাল,সেগুনের ঝরাপাতায় 
ভালবাসার স্মৃতিগুলো ঝরে পড়ে
ঝরাপাতায় খুঁজে ফিরি তোমার ভালবাসা,
ঝরাপাতা বলে--অপেক্ষা !

পাহাড়ী ঝর্ণার উচ্ছল জলরাশি 
ভালবাসার তীব্র স্রোত,পাথর ক্ষয়ে যায়,
কিশোরীর স্রোতে ভালবাসা খুঁজি
ঝর্ণা বলে যায়--অপেক্ষা !

শ্রাবণের অবিরাম ধারাপাত 
ভালবাসায় প্রকৃতি ভিজে যায়,
বারিধারায় খুঁজে ফিরি ভালবাসা
শ্রাবণ বলে যায়--অপেক্ষা !

বর্ষার ভালবাসায় নদী কুল ছাপিয়ে যায়,
অভিসারী বিকেলে ছুটে যাই নদী তীরে,
নদী বলে যায়--অপেক্ষা !

সমুদ্রের ঢেউয়ে তরঙ্গায়িত ভালবাসা,
আছড়ে পড়ে সৈকতে,ছুটে যাই 
বালিতে লেখা থাকে--অপেক্ষা !


 

বাবা
রেজাউল করিম রোমেল 

এই যে আমি এইখানে
খুঁজছি আমি সবখানে,
খুঁজছি আমি  খুঁজছি তোমায়
বাবা  তুমি  কোনখানে।

বাঁধা বিপত্তি মাথায় নিয়ে
আমাদের করেছ লালন,
তোমার কথা সবাই মিলে
 আমরা পালন।

বাবা তুমি শ্রেষ্ঠ বাবা
যাবে না তোমায় ভোলা,
রেখেছি অনেক ভালোবাসা
তোমার জন্য তোলা।


 

স্ট্যাটাস

মাথুর দাস


দিনরাত্তির যা ইচ্ছে তাই

দিচ্ছি স্ট্যাটাস বেশ ঠুকে,

কনস্টিপেশন লুজ-মোশন

বা উদ্গীরণ, ফেসবুকে ।


ঘর ঘর আর হর-কোণার

ভিডিও করি দুর্ঘটনার,

মরার সময় কেমন দেখায়

মুমূর্ষুকে শেষ লুক্-এ ॥



 

সাগর নদী জল
 মজনু মিয়া

নদী সাগর জলের এ দেশ
রূপ সুন্দর্য্যের নেই তো শেষ
সে হলো সোনার বাংলাদেশ।
জলে আছে মাছে ভরা
চলে নৌকা সাম্পান,
মন মাঝি তুই চলরে এবার
চল গেয়ে মনের গান।
স্বপ্ন গড়ার সাগর পথে
অর্থ আসে আয়ের খাতে
চলে যে তা দিনে রাতে।
সুন্দর জলে সুন্দর স্থূলে
মানুষের বসতী কূলে।
দুঃখ সুখের জীবনের বাস
জলে ধুয়ে দেয় দীর্ঘঃশ্বাস!


 

কঠিন বাস্তব 

প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী 


কালের অমোঘ নিয়মে কঠিন বাস্তব, 
জীবনের সোপান নয় মধুর;
সুখে দুঃখে একসুরে এ জীর্ণ জীবন, 
গতির অভিমুখে সংগ্রামী মানসে,
এক ধাঁধার বন্ধনে আবদ্ধ, 
 নব সমীকরণে জাগৃতি-
 ভঙ্গুর গতিতে এগিয়ে চলা,
  এটা জীবন কথার ধ্রুব সত্য ।।


 

জ্বালানি 
মোঃ আব্দুল রহমান

বর্ণরা পোড়ায় শব্দকে
শব্দরা পোড়ায় বাক্যকে
ছাইয়ের স্তূপে নির্মিত কবিতারা
পোড়াতে থাকে সভ্যতা
এবং জনপদ
যুগে যুগে মাটি চাপা পড়ে
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে উত্থিত
কখনো জ্বালামুখে
কখনো আবার মৃত রূপে
জীবাশ্ম দেখি পাথরে
এভাবেই কবিতারা জ্বালানি হয়ে
আমায় বাঁচতে শেখালো!


 

শিল্পী- জোয়া আফরোজ