Tuesday, March 3, 2026


 

মুনা 

অনলাইন ফাল্গুন সংখ্যা ১৪৩২

সম্পাদকের কথা 

টালমাটাল এই অবস্থা। ঘরে, বাইরেও। এবারের বসন্ত আদৌ নিয়ে এলো না মধুদিন। বরং `মাশরুম ক্লাউড`-এ বোমাবৃষ্টির অকাল বর্ষা মধ্যপ্রাচ্যে। আঁচ এসে পড়ছে এত দূরেও। আহত হচ্ছে অর্থনীতি। নেমে যাচ্ছে প্রত্যাশার সূচক। ইতিমধ্যে রাজ্য উত্তাল বিশেষ নিবিড় সংশোধনী ঘিরে। এই যুদ্ধ থামবে কবে কে জানে। এছাড়াও শিয়রে নির্বাচন। আর বঙ্গের নির্বাচন মানেই সেই হানাহানি, মৃত্যু। সব কিছু মিলিয়েই পাতা ঝরা বসন্ত সত্যিই ঝরিয়ে দিচ্ছে আমাদের আশা-আকাঙ্খা। 

ফাল্গুন মাসের অনলাইন মাসিক এই সংখ্যায় প্রচুর অণুগল্প পাঠিয়েছেন আপনারা। আমরা আপ্লুত। আক্ষরিক অর্থেই কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপের লেখকদের লেখা আমরা পেয়েছি। মুজনাই যে এভাবে সকলের বুকে বয়ে চলেছে সেটা বুঝে সত্যিই আনন্দিত আমরা। কয়েকজনের লেখা রাখতে পারিনি মাত্রাতিরিক্ত  শব্দসংখ্যার জন্য। কিছু লেখা বাদ রাখতে হয়েছে পত্রিকার নিজস্ব ভাবনায়। যে লেখাগুলি স্থান পেল, সেগুলি অণুগল্প হিসেবে কতটা উত্তীর্ণ হয়েছে সেই বিচার অবশ্যই আপনাদের। 


রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


এই সংখ্যায়  আছেন যাঁরা  - 

চিত্রা পাল, অমলকৃষ্ণ রায়, শ্যামলী সেনগুপ্ত, সুদীপ দত্ত, 

মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ী, গৌতমেন্দু নন্দী,  রীনা সাহা, 

মৈত্রেয়ী নন্দী, কবিতা বণিক, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মাল্য ঘোষ, 

রীনা মজুমদার,  লীনা চন্দ, অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী, রাজর্ষি দত্ত, মৌসুমী চৌধুরী,  

লিপিকর, মিঠু অধিকারী,  প্রদীপ কুমার দে, জনা বন্দ্যোপাধ্যায়, পর্ণা চক্রবর্তী, 

আরাত্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎস চক্রবর্তী, শ্রুতি দত্ত রায়, অমিতাভ চক্রবর্ত্তী,

 তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য, সোমা দাশ,  স্বপন সিংহ, 

 শ্রাবণী সেনগুপ্ত, মনোরঞ্জন ঘোষাল, প্রতিভা পাল, 

শুভেন্দু নন্দী, কুণাল গোপ, অর্পিতা গুহ মজুমদার, মহঃ সানোয়ার, 

সোমনাথ মুখার্জী,  সুস্মিতা দত্ত রায়,  আদিল হোসেন মাহি, রিয়া চ্যাটার্জী, 

অভিজিৎ সেন,   তন্ময় কবিরাজ, মিত্রা রায়চৌধুরী, অনুষ্টুপ রায়,

অনিতা নাগ, প্রদীপ সেন, মনোমিতা চক্রবর্তী, রথীন পার্থ মণ্ডল, অভিমন্যু,

 সায়ন্তন ঘোষ, সুদেবী গোস্বামী, মজনু মিয়া, সুদীপ ঘোষাল,  রাণা চ্যাটার্জী  


অনলাইন ফাল্গুন সংখ্যা ১৪৩২


 

বড় গল্পের মতো...
            রীনা সাহা 

         কয়েকশো মাইল দূর থেকে রোজ একবার ঘরটায় ঢুঁ মারে বুবুর মা। গোটা ফ্ল্যাটের একভাগ হয়তো হবে। ষড়ভুজ শেপের ঘর। রট আয়রনের খাট, স্টীল আলমারি, আলনা, একটা টুল, দু'তাকের প্লাস্টিক সেল্ফ আর ভারী মিষ্টি দুটো মানি প্ল্যান্ট। একেবারেই সাধারণ। তবুও বুবুর বাবা-মায়ের কাছে ওদের এই যাযাবর আস্তানা অনেকটা হেনরীর গল্পে আঁকা শেষ পাতাটার মতো... মৃত শিল্পীর মাস্টারপিস।

       কিন্তু বুবুদের নিজের বাড়ি অনেকটাই বড়। ওর নিজের অজন্তা- ইলোরা মার্কা ঘরটাও ফ্ল্যাটের ওই ঘরটার চেয়ে বড়। রোজ সকালে ঝাঁট দিতে গিয়ে ফাঁকা বিছানায় হাত বোলায় বুবুর মা। গন্ধ শোঁকে।কান্না পায় না রোজ। তবুও ছাদে যায়। হেঁটে আসে রোদের দিকটায়। অর্ধেক ছাদ জুড়ে পুজোর ফুলগাছ, কিছু শাকসবজি, একটা কলম চারার হিমসাগর, আর একটা বনসাই টাইপের লেবু গাছ। লেবু হয়েছিল একবার। এবারও অনেক গুটি ধরেছে। লেবু না হলেও পাতার জন্যই গাছটাকে যত্নে রাখতে হয়। আড় মাছের মাথা দিয়ে বেগুনের মাখামাখি তরকারি। ওপরে লেবু পাতা দিয়ে খানিকক্ষণ ঢেকে রাখলেই পুরো তরকারিতে লেবুর ফ্লেভার। বুবুর বাবার খুব প্রিয় পদ।

        প্রতিবছর দোলের সময় বুবু আসে। বন্ধুদের সঙ্গে রঙ খেলতে বেরোয়। বেরোবার আগে মাকে নিয়ে ছাদে যায়। গায়ে,মাথায় নারকেল তেল মাখিয়ে দেয় মা।সেই ফাঁকে নতুন, পুরনো গাছগুলোতে আঙুল ছোঁয়ায় বুবু।

রঙ খেলে ফিরে এলে রঙ তোলার পালা। টমেটোর টুকরোর সাথে অ্যালোভেরা জেল আর নারকেল তেল মিশিয়ে দলাইমলাই। বুবুর গা জ্বালা করে। মায়ের হাত ছাড়িয়ে পালাতে চায়। পালাবে কোথায়! এ বাড়িতে তো বাঙ্কার নেই!

        এবছরই প্রথম মুকুল এসেছে গাছটায়। ছাদ জুড়ে বসন্ত...অ্যালোভেরা,পাকা টমেটো। ওমানে যুদ্ধ।এবার তাই আসা হবে না বুবুর। তবে ওর মতোই কেউ একজন আসবে। বুবুর মায়ের অ্যালিস। অপেক্ষায় ওয়ান্ডারল্যান্ড, বুবুর ঘর, বুবুর ছাদ।


 

অভিশাপ

মৈত্রেয়ী নন্দী

"এর ফল তুক্যে ভুগ্যতে হবেক। মারাংবুরু কাউখ্যে ছাইড়ব্যেক লাই রে! কাউখ্যে না!” মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বকতে বকতে সিধো বুড়ার পাকানো কালো শরীরটা অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। 

অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকি আমি।

শালগোড়াতে তেজস্ক্রিয় মৌলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। ফ্যাক্টরি বসানোর জন্য অনেকটা জমি চাই। 

গাঁওবুড়া সিধো হাঁসদার সঙ্গে নরমে-গরমে অনেক আলোচনা করেও তাকে টলানো যায়নি। তার এক কথা,  সাঁওতালরা আজন্মকাল এই জঙ্গলে মারাংবুরুর পূজা করে। ফ্যাক্টরি হলে মারাংবুরুর অভিশাপ লাগবে।

আদিবাসীদের অন্ধ বিশ্বাস! শেষপর্যন্ত জোর খাটাতেই হল। কোর্টের অর্ডার এনে পুলিশের সাহায্যে  জঙ্গল কেটে জায়গাটা ঘিরে পাঁচিল তুলে দিলাম।

সিধো বুড়া সহ শ’খানেক সাঁওতাল নর নারী পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে সবটা দেখল।

ফেরার পথে আদিবাসী ড্রাইভার সেঙ্গেল বলল, “স্যার এই ক’টাদিন একটু সাবধানে থাকবেন।”

“কেন?”

 "আমাদের বিশ্বাস এই পৃথিবীর প্রতিটা অনু পরমাণু জীবন্ত। গাছ, পাথর, জল, পাহাড়, মাটি সবার অনুভূতি আছে।  প্রকৃতিই আমাদের বোঙ্গা।”

এসবের সাথে আমার সাবধানে থাকার কী সম্পর্ক?  কথা বাড়ালাম না। গেস্ট হাউসে পৌঁছে গেছি ততক্ষণে।

রাত গভীর। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। হঠাৎ মেঝে থেকে উঠে এল খসখস আওয়াজটা। কান পাতলাম। মেঝেতে টর্চের আলো ফেলেই এক লাফে উঠে বসলাম। ঘরের ভেতর এত সবুজ ঘাস, ছোট ছোট ঝোপ? পাগল হলাম নাকি? নাহ্, ঠিকই দেখছি! আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে আসছে! চোখের সামনে গাছগুলো লকলকিয়ে বড় হচ্ছে। অন্ধকারেই টের পেলাম ঘর ভরে যাচ্ছে। তিলধারণের জায়গা থাকছে না। জানালাগুলো সব বন্ধ। উঃ! একটু বাতাস! হিস্ হিস্ শব্দে শাখা-প্রশাখা বাড়িয়ে ওরা এগিয়ে আসছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

দুদিন পর কলকাতার সব দৈনিক পত্রিকার  প্রথম পাতার খবর, শালগোড়াতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারের রহস্যমৃত্যু। ময়না তদন্তে জানা গেছে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং। কারণ জানা যায়নি। তদন্ত চলছে।


 

গোপন ছিল যা...

            শ্যামলী সেনগুপ্ত 

  ' আসছি' বলে সেই যে গেল, আর ফেরেনি। বলার মধ্যে কোনও ভান ছিল না। ভণিতা বলেও মনে হয়নি চুয়ার। সে তো জানতোই না 'আসছি' বলে কেউ কেউ আর ফেরে না। ঠাম্মি বলতো, 'যাচ্ছি, গেলাম, চললাম-এসব বলতে নেই। যাওয়ার সময় আসি বা আসছি বলতে হয়।' 
        অনিকেতের ব্যবহারেও চলে যাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বড়ো হয়েছে তারা। একই স্কুল। কলেজ অবশ্য আলাদা। একজন হিউম্যানিটিজ। অন্যজন ইঞ্জিনিয়ারিং। অনিকেতের মা, বাবা নেই। ওর দাদু চুয়ার বাবার দপ্তরী।
স্যারের কাছে সঁপে দিয়েছিল অনিকেতকে। শুধু স্যার কেন, অনিকেতকে পেয়ে সকলেই খুব খুশি হয়েছিল।
চুয়ার তো অনেক সময় মনে হতো, তার চেয়ে মা-বাবা অনিকেতকে বেশি ভালোবাসে। অনিকেতের সঙ্গে বাবার একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। ভরসা করতো বাবা ওকে। ভরসা কি চুয়াও করতো না! ওরা ভাইবোনের চেয়ে বন্ধু হয়ে উঠেছিল বেশি। সব কথা, সব গোপন কথা, এমনকি 
শরীরের বদলের কথাও ওদের কথোপকথনের বিষয় ছিল। 'অ্যাই অনি, আমার বগলে চুল উঠছে দেখ, বাবাদাদুর মতো!' খুব বিস্ময়ে প্রায় ফিসফিস করে এক ছুটির দুপুরে আড্ডার মাঝে জানিয়েছিল চুয়া। 'আমি কি তবে ছেলে!' অনিকেত তার সাফসুতরো বগল দেখিয়ে বলেছিল, 'ভ্যাট।তবে কি আমি মেয়ে?' ছেলে মেয়ের ব্যাপারগুলো একটু একটু ধরা পড়ছিল আর সেসব ছিল ওদের হাসিঠাট্টার বিষয়। অনিকে তার তো ছেলে বলে আলাদা কিছু মনে হয়নি।দিব্যি অনির কোলে পা তুলে দিয়ে কামরাঙা মাখা খেতে খেতে অনির প্রেমিকা অস্মিতার গপ্প করতো তারা দুজনে। 
     সেদিন ভোর থেকেই বৃষ্টি। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বৃষ্টি দেখছিল চুয়া। অনিকেত কিছু বলতে এসে থমকে গেল। ফিরে যাচ্ছিল। চুয়া টের পেল। অনি, অনি ডাকতে ডাকতে দোতলার ব্যালকোনি থেকে নীচে নামছিল চুয়া। অনি সেদিন অস্মিতার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে ফিরে এসেছিল। চুয়ার স্টাডি রুমে বসে সে কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠেছিল অনিকেত। সান্ত্বনা দিতে তার কাছে আসতেই অনি ছিটকে সরে গিয়েছিল। তারপর নিজের স্টাডি রুমে চলে গিয়েছিল। বাবার সঙ্গে সেই রাতে অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল অনিকেতের। 
          দু'দিন পরে খুব ক্যাজুয়ালি 'আসছি' বলে বেরোয় অনিকেত। চুয়াও বেরোচ্ছে।হাত নেড়েছিল শুধু।


 

শোধবোধ 

সুদীপ দত্ত 

ওষুধের দোকানটায় থিকথিক করছে ভিড়। প্রায় আধ- ঘন্টা দাঁড়াবার পর রমেনবাবু ওষুধের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একটা দু'শো টাকার নোট এগিয়ে দিলেন। পঞ্চাশ টাকা ফেরৎ পাবার কথা।
তার বদলে কাউন্টারের ছেলেটি ফিরিয়ে দিল সাড়ে তিনশো টাকা। 
পাঁচশো টাকার নোট ভেবে ভুল করেছে! 
অতিরিক্ত টাকাটা কি ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ?  
রমেনবাবু ভাবলেন, ধুর, এত বড় দোকানে তিনশো টাকা কোনও ব্যাপারই না। এখন মাসের শেষ। এই টাকাটা দিয়ে বরং কাল মাছ কেনা যাবে।
এবার বাসস্টপ। তারপর টোটো ধরে বাড়ি।
টোটো থেকে নামার পর পার্সটা বের করতে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন রমেশবাবু। 
নেই!  
বাস-এ কে যেন নিপুণভাবে হাতসাফাই করে তুলে নিয়েছে।


 

বডি

 গৌতমেন্দু নন্দী

"---কীরে আর কতক্ষণ লাগবে ?"

   " ---আর আধাঘণ্টা মতো সময় লাগবে--"
       "----ইলেকট্রিক চুল্লিতে বডি তো বিশ-পঁচিশ মিনিট আগেই ঢুকল। এতো তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে?!"
 ---এই কথোপকথন চলছে সুদীপ্তর দুই বন্ধু বিশ্বজিৎ ও দেবাশীষের মধ্যে। 
            করলা নদীর ধারে শ্মশানের বিশ্রাম কক্ষের পরিসরে তার বন্ধু সহ পাঁচ ছয় জন শ্মশান যাত্রীদের সাথে বসে আছে সদ্য মাতৃহারা সুদীপ্ত।
গভীর রাতেও হ্যালোজেনের হলুদ আলোতে শ্মশানের সেই নিস্তব্ধতা,গা ছমছমে পরিবেশ এখন আর নেই। তবুও মা কে হারিয়ে এক অব্যক্ত শূণ্যতা গ্রাস করে চলেছে সুদীপ্ত কে।
       সুদীপ্ত ভাবছে তার দুই বন্ধু, বিশ্বজিৎ ও দেবাশীষ যারা ছিল তার মা অর্থাৎ মাসীমা অন্ত প্রাণ, তাদের
কাছে আজ কী অনায়াসে তার মা ,আর মাসীমা নয়,"বডি" তে রূপান্তরিত হয়ে গেল! শুধু ওরা নয়, যখন শববাহী গাড়িতে মা কে তোলা হচ্ছে তখনও সেই উচ্চারণ ----" এই সাবধানে তোল বডি..."!
       কী নির্মম বাস্তব!  জীবন্ত মানুষ কে বাঁচিয়ে রাখতে কতো উৎকন্ঠা,উদ্বেগ! আর প্রাণহীন হলেই নিথর শরীর টা কত তাড়াতাড়ি সৎকার করা যায় তার ব্যস্ততা!  
     সুদীপ্ত ভাবতে থাকে কয়েক ঘন্টা আগেও তো সে ভাবতে পারেনি এইভাবে হঠাৎ সে মাতৃহীন হয়ে পড়বে। অথচ কত হাজার ভোল্টের তপ্ত আঁচে পুড়ে যাচ্ছে  তার সেই ভাবনা!  সুদীপ্ত ভাবতে থাকে সেই  ভাবনা, অনুভূতি সত্যি কি পুড়ে যায়, না পোড়ানো যায়! 
       সুদীপ্ত মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার দিকে। সে দেখতে পাচ্ছে "বডি" নয়, মায়ের জীবন্ত শরীরটা মিলিয়ে যাচ্ছে  রাতের অন্ধকারে অজানা এক "লোক"-এর দিকে।


 

ফিরিস্তি এবং…
রাজর্ষি দত্ত
                                                                   

 ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটা, নাম গদাই, সব দেখে-টেখে বলল "ফিফটিন অ্যাম্পিয়ার সুইচ বোর্ড,  কপার কেবেল, আর কিছু টুকটাক... হাজার খানেক দিন - কিনে এসে কাজ ধরব।"    

বেরনোর সময় তালুকদার গিন্নি ডাক দিল "এই যে আরও দুইশ নাও, রাস্তায় ফলের দোকান পাবে। একটু কলা আর আপেল..."

ফিরে এসে কাজে ব্যস্ত ছেলেটির জন্য চা-বিস্কুট এনে তালুকদার গিন্নি বসলেন সোফায়।
 
" উফ্, আর পারি না ! আজকেই আবার কাজের মেয়েটা আসেনি। তোমার সারা হলে নোংরা ঝেড়ে চানে যাব।"      
-" চিন্তা নেই" গদাই বলে "আমি সাফা করে দেব"।  
-"বাঁচালে বাবা! আসলে আমরা দুই বুড়ো-বুড়ি বাড়িতে একলা। একমাত্র মেয়ে বিয়ে করে সেই জব্বলপুর। আগে তোমার কাকু সবই করত। এখন বয়স বাড়ছে আর খোকা হয়ে যাচ্ছে..."

চা খাওয়া শেষ হলে তালুকদার গিন্নি ছেলেটাকে বাথরুমে নিয়ে গেলেন। "দ্যাখো কেমন টপটপ করে জল পড়ছে! তুমি পারবে?"
গদাই-এর গলায় বিরক্তি -"এসব আমাদের কাজ না কাকিমা ! প্লাম্বার লাগবে।"
-"ও তাই?" অপর প্রান্তে হতাশা।
-"আচ্ছা, চেনা কাউকে বলে দেবখন "।    

তালুকদার গিন্নি  আবার খুলে বসেছেন অফুরান সমস্যা ও শখের ইস্তাহার  -   ওষুধপত্তর, ব্যাথার মলম , লক্ষ্মীর ফ্রেম, তালপাখা, বালিশের ওয়ার, জর্দার কৌটা, ত্রিফলা, কাঁচাগোল্লা ... ইত্যাদি।  
ঝালাপালা কানে গদাই বলে "আপনারা সবসময়ের লোক রাখুন...অথবা মেয়ের কাছে গিয়ে..."

সে কথার উত্তর শুনে ভেতরে ফুঁসে উঠে গদাই। এই সিনিয়র সিটিজেনদের নিয়ে যত লাফড়া! হাতে টাকা আছে - অথচ সঙ্গে কেউ নেই।    

এর মধ্যেই দুবার ফোন আসে গদাই-এর। জবাবে একবার “আমি রাস্তায়-”, অন্যবার “আপনার বাড়ির সামনেই !!” জানায়। শেষমেশ জলদি বেরুবার মুখে বড় নোটগুলি দেখে বলে – “ একি ! খুলা দিন...”    
“ কোথায় পাব বাবা ? তোমারটা রেখে বাকি টাকায় ওষুধটা অন্ততঃ…”


 

আনন্দ

মৌসুমী চৌধুরী


গত চারদিন ধরে তাদের মন্দির সাফাই অভিযান পর্ব চলছিল। মন্দিরের পুরোহিত এবং ট্রাস্টিরাও সে বিষয়ে খুব সাহায্য করেছেন জয়দের। আজ শিবচতুর্দশী, একটু পরেই শুরু হবে ভক্ত সমাগম। খুব ভোরবেলায় মন্দিরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে জয় দেখল মন্দির চত্বরটা একেবারে ঝকঝক করছে। কুচকুচে কালো গ্রানাইট পাথরে তৈরি শিবলিঙ্গটা যেন আরও চকচক করছে। শিবলিঙ্গের ওপর যে সাদা রঙের তিনটি সমান্তরাল রেখা বা ত্রিপুণ্ড্র দেখা যায় সেটাও জুঁইফুলের মতো একেবারে
 সাদা ধপধপে হয়ে উঠেছে। শিবলিঙ্গের পিছনে জয়রা অ্যালুমিনিয়ামের চওড়া একটি চ্যালেন তৈরি করে দিয়েছে যাতে করে মহাদেবের মাথায় দুধ ঢালার সঙ্গে সঙ্গেই তার পুরোটা সোজা গিয়ে পড়ে
তার নিচে রাখা একটা বড় ড্রামে। 
        আগে থেকেই সব সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি ছিল জয় ও তার বন্ধুরা। সারাদিন ধরে তারা ভক্তদের ঢেলে যাওয়া দুধ সংগ্রহ করল। তারপর সেটা সঙ্গে সঙ্গেই বড় বড় ছাঁকনিতে ছেঁকে, খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে দু'শো গ্রাম ওজনের ছোট ছোট বোতলে ভরে ফেলল। আর মন্দিরে সমাগত ভক্ত দলের কাছ থেকে পাওয়া কড়া পাকের সন্দেশ বা প্যাড়াগুলোও তারা জমিয়ে বাক্সবন্দি করে ফেলল।
     ফাল্গুন মাস। বাতাসে কোন একটা নাম না জানা ফুলের উল্লসিত গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। গোধূলির কমলারঙা ম্লান আলো ঘিঞ্জি বস্তিটার টালির চালের ঘরগুলোর মাথায় ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। দুধের বোতল আর মিঠাই হাতে বাচ্চাগুলো বহুদিন পর যেন একটু কলকাকলিতে মেতে উঠেছে। বাতাসে ভাসছে তাদের আনন্দঘন সুমিষ্ট কিচির মিচির। সেই আনন্দ আষ্টেপৃষ্ঠে ছুঁয়ে দিচ্ছে জয়কে। ভীষণ আনন্দে তার ভিতরটা যেন কানায় ভরে উঠছে! হঠাৎ জয়ের মনেহল ঘিঞ্জি বস্তির নর্দমা থেকে উঠে আসা দুর্গন্ধটাও আর নাকে লাগছে না তো!


 

বৃক্ষপ্রাণা

মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ী

ঘোষমাসিমা কতকাল যে বিছানায় কাটিয়েছিলেন সে হিসেব কষতে হলে খানিকক্ষণ বসে ভাবতে হবে। বহুকাল আগে থেকেই তিনি বালিকা স্বভাবের হয়ে গেছিলেন। সর্বদা ছোটদের মতো হাততালি দিয়ে হাসতেন আর আনন্দের সঙ্গে হরিনাম করতেন। সবকিছু ভুলে যেতেন। মঙ্কু ওঁর মেয়ে মিতার সঙ্গে চাকরি করে, একবার ওঁকে দেখতে গেছিল। মিতাকে দেখিয়ে বলল, মাসিমা, এ কে বলুন তো! তিনি ভালো করে দেখে হাসিমুখে বললেন, মুখটা তো চেনা চেনা লাগছে, কাছাকাছি থাকে বোধহয়! প্রায়ই আসে। কোঁকড়া কোঁকড়া কাঁচা-পাকা চুলের মাসিমা দেখতে ভারী মিষ্টি। সেসময় মিতার ছেলে ফাইভে পড়ে। তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তার বিয়ে হল, তখনও মাসিমা বেঁচে, কিন্তু বিছানায়। মঙ্কু কখনও ওঁর কথা জানতে চেয়ে মিতার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাত, তারপর আবার কথাটা গিলে নিত। কি জানি মাসিমা চলেই গেছেন কিনা, ওর তো সবই ভুল হয়ে যায়! তাহলে কেমন হবে না প্রশ্ন করাটা!

 সেদিন মাসিমার মৃত্যুর খবর পেয়ে মঙ্কু বুঝতে পারল মাসিমা বেঁচেছিলেন, তবে সেই বাঁচা নামেই বেঁচে থাকা। সমস্ত কাজকর্ম মিটে যাবার পর মিতা স্কুলে এসে একটা অদ্ভুত গল্প বলেছিল। মাসিমার নিজের হাতে লাগানো একটি স্থলপদ্ম গাছের নিচে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছিল। সেই গাছ নাকি পেল্লায় বড় হয়ে উঠেছিল, ফুল পাড়া ছিল অসাধ্য। অসংখ্য ফুল হয়ে আপনিই শুকিয়ে ঝরে পড়ত। মাসিমার চলে যাবার পরের দিন ফুলভরা গাছের দিকে তাকিয়ে মিতার বৌদি বলল, ওঁরই হাতে তো বেড়ে উঠেছ, মাথা ঝুঁকিয়ে দুটো ফুল দাও না বাপু, তোমার ফুলে হাত ছোঁয়াবে এমন তো কারও সাধ্য নেই ! কি আশ্চর্য! সরসর করে হাওয়া বইল একটা, ওপর থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল একটা ফুল। ভীষণ অবাক হয়ে গেল বৌদি। একে ওকে ডেকে ডেকে বলতে লাগল। এরপর রোজই ফুল-পাতা পড়তে লাগল ওই জায়গায়, আর গাছটিও ক্রমশ ন্যাড়া হতে লাগল। যেদিন মাসিমার শ্রাদ্ধকার্য হল, সেদিন গাছটি একেবারে রিক্ত ও শূন্য, তাঁর পুত্রের মুণ্ডিত মস্তকের মতই!
 মিতার দাদা গাছটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভগ্নস্বরে বললেন, আজ মা সত্যিই চলে গেল!  


 

ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড

লিপিকর


- “৪২৩২০১”

- “১৫৫৪৩৫”

- “৩১৭৮৯৩”

- “এগুলো কী? আমাকে এইসব নাম্বার মেসেজ করেছিস কেন? বলেছিই তো তোর সঙ্গে আমি কোনও যোগাযোগ রাখতে চাই না।”

- “এগুলো আমার অনলাইন ট্র্যান্স্যাকশ্যনের ওটিপি। এখন তো বাইরে বেরোনোর উপায় নেই, তুইও কথা বন্ধ করে দিয়েছিস, তাই প্রচুর কেনাকাটা করে দেউলিয়া হওয়ার চেষ্টা করছি।”

-”ওসব গ্যাসলাইটিং অন্য কাউকে করিস! আমাকে জ্বালানো বন্ধ কর! নইলে …”

-”নইলে কী? আমাকে ব্লক করবি? সে তো তুই শুনিয়েইছিস আমার নম্বর তুই আমার মতই তোর জীবন থেকে মুছে ফেলেছিস পুরোপুরি। আমি এই চ্যাটটা এখন থেকে স্ক্রিব্ল প্যাড হিসেবে ব্যবহার করব, তুই যা পারিস করে নে …”

অপরপক্ষ বিরক্তিবশতঃ উত্তরদানে বিরত থাকে। জানে, এই কথোপকথন আসলে একটি রেজ বেট -  তিক্ত কলহে ঢুকিবার টোপ। কিন্তু কেন কে জানে, ব্লক টিপিতেও তাহার অঙ্গুলি থমকায়! আহা, তবু তো অহরহ টের পাওয়া যাইবে অপরদিকের মানুষটি এখনও আছে। একটি সচল কার্ড লইয়া একটি জীবিত মানুষ … এই অনির্দিষ্ট লকডাউনে সেই জানাটুকুই বা কম কী?

অতএব ৬ অঙ্কের সংখ্যারা জমিতে থাকে। সেগুলিতে নীরবে নীল টিকজোড়া পড়িতেছে, প্রেরকের শ্যেন দৃষ্টিতে তাহা ধরাও পড়ে। অথচ, “গুড মর্ণিং” লিখিলে বা কোনো মীম পাঠাইলে তাহা দর্শনমাত্র বার্তাটি উভয়ের আলাপের ইতিহাস হইতে উড়িয়া যায়।

তাহার পরে, দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্র প্রকোপের সময়ে একসপ্তাহ কোনো ওটিপি না দেখিতে পাইয়া অপরপক্ষ নিজেই একটি ৬ অঙ্কের সংখ্যা লিখিয়া পাঠায়, কিন্তু পূর্বজনের উচ্ছসিত সমস্ত বাক্যালাপ প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে। 

ধীরে ধীরে প্রথমজন অনুধাবন করে, অপরপক্ষ নিজ জীবনে তাহাকে ঠিক কতটুকু পরিসর দিতে প্রস্তুত। অতঃপর পরস্পরের সহিত অন্য কোন বাক্যালাপে অনিচ্ছুক দুইটি মানুষ অতীতের প্রেমজ বেদনা হৃদয়ে চাপিয়া যন্ত্রজাত ৬ অঙ্কের সংখ্যাগুলিকে যান্ত্রিকরূপে নিজেদের বৈদ্যুতিন কথোপকথনের উপসংহারে জুড়িতে থাকে।


 

শাস্তিদাতা 
মিঠু অধিকারী 


বনবস্তির ১০ নং লাইন আজ থমথমে । গত রাতে আবার হানা দিয়েছিলো দাঁতালটা ।এবার আর  রক্ষে নেই । পায়ে পিষে মেরেছে মাতালটাকে ।


রাত তখন বেশি নয়, সবে দশটা বেজেছে ।বন জঙ্গল এলাকায় ঘরের বাতি নিভতে শুরু করেছে ।  সুখি রাতের এটো  বাসন মেজে  ঘরে ঢুকে  দেখে , মেয়ের  বেদম  জ্বর । সন্ধ্যে থেকেই চুপচাপ বছর তিনেকের ছোট্ট মেয়েটি । সর্দি লেগেছে । এখন তো গা পুড়ে যাচ্ছে । কি করবে ভেবে পায়না সুখি । ঘরে ঔষধ নেই । বুড়ি শাশুড়ী ঘুমিয়ে কাদা ।

 দেরি না করে , দরজাটা বাইরে থেকে খিল দিয়ে  দুলু কাকার বাড়ির দিকে হাঁটা দিল সুখি ।   একটু দুরে দুলু কাকার বাড়ি ।  উনি এলাকার মোড়ল মানুষ । জ্বর , পেটখারাপ , মাথা ব্যথার দাওয়াই থাকে তার কাছে । পরে সকাল হলে সেন্টারে নিয়ে যাবে মেয়েকে । মেয়ের বাবা  ছয় মাস হল ভুটানে কাজে গেছে । তারপর থেকে সুখির   উপর সব ভার ।

জ্বরের বড়ি নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল সুখি । হটাৎ পথ আটকায় বুধন । কিছুদিন ধরে খুব বাড় বেড়েছে বুধন । পার্টি করে বেশ টাকা কামিয়েছে । লাইনের মেয়ে , বৌরা এখন ভয়ে থাকে ওর । কখন যে কাকে নিজের লালসার শিকার করবে কে জানে !  পয়সার বড় জোর এখন ।

বুধন বলে ,”চল আমার ঘর , আজ রাত তোর আর আমার “। সুখি হিস হিসিয়ে বলে ,”পথ ছাড় , ঘরে ছুয়ামনের জ্বর ।” বুধন হাত  টেনে ধরে বলে ,”চল নোট দিব  নোট , জ্বর পালাবে ।” কাছে এসে সুখি কে জাপটে ধরে ।

কি এক আসুরিক শক্তি নেমে আসে সুখির শরীরে । এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়  দৌড়ে  পালায় । 

বনপথে তখন মানুষজন নেই । কিন্তু আশেপাশে ছিল সে । মাতাল বুধন কিছু বোঝার আগেই হয়তো পিষে দিয়েছে ওকে ।

 বনবস্তির জুড়ে শুধু  ফিসফাস । বনদফতর এর লোকজনের আনাগোনা।   সুখি মেয়েকে বুকে চেপে ধরে । দুহাত কপালে ঠেকায় বলে ,” রক্ষা কর মহাকাল , তুমিই পার শাস্তি দিতে , শান্তি দিতে ।”


 

ভেজা প্রেম
প্রদীপ কুমার দে

এইমাত্র বৃষ্টির জলে ভিজে গেলাম আমি। ভিজে গেল শরীর। সিল্কের শাড়িতে জলে লেপ্টে যাওয়া যৌবন যখন রাস্তার সকল পথিকের দৃষ্টি আরোপিত হচ্ছিল তখন একমাত্র বেরসিক দেখলাম তোমায়, হ্যাঁ এমাত্র তুমিই আমাকে অবজ্ঞা করে মুখ ঘুরিয়ে নিলে, যেন কিছুই দেখনি যেন এক যুবতী নারীর দেহ সৌন্দর্য কোন দ্রষ্টব্য বিষয়ই না তোমার কাছে।

আমি অবাক হয়েছিলাম সেই মুহূর্তে।
যদিও হাজারো দৃষ্টি আর বৃষ্টি তখন আমাকে ধুয়ে খাচ্ছিল।

তাই তাড়াতাড়ি পথে পা ছোটালাম।

বৃষ্টি থেমে গেছে কখন। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি এখন। কেন জানো?

হ্যাঁ। শুধুমাত্র তোমাকে মাপবো বলেই। এক মাথা এলেমেলো উস্কোখুশকো চুল নিয়ে যে যুবকটি কিছু আগে আমার ভিজে যাওয়া শরীরকে উপেক্ষা করেছিল, আর লজ্জায় নিজেই সরে গেছিল পথের বাঁকে, এখন যে তাকেই আমার মন খুব চাইছে।

ওইতো ও আসছে ....
আসুক, ও আরও কাছে আসুক, এবার আমিই লজ্জার মাথা ভেঙে আমার কামোদ চোখ দিয়ে ওকে ডেকে নেব, আমার জন্যে ......

এবারও কি ও আমার মনের সিক্ত প্রেমকে উপেক্ষা করে দেবে ঠিক তখনকার ভিজে যাওয়া দেহের মতই ?


 

ক্রমবিন্যাস 

জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

শাল, মহুয়ার জঙ্গল ঘেরা অযোধ্যা পাহাড়ের পথে চড়িদা গ্রাম। এখানকার একনিষ্ঠ মুখোশ শিল্পী সমীরণ মাহাতোর ছেলে সিধু ও মেয়ে তরলা বাবাকে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরীর কাজে সাহায্য করে। সিধুর বয়স সতেরো ছাড়িয়েছে, তরলার পনেরো !
        সমীরণ মাহাতোর স্ত্রী তুলসী কাকভোরে পুকুরে স্নান করতে যায়। পুকুর ধারে ছিপ হাতে বসে থাকেন পার্বতীচরণ। প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে চলে দুজনের প্রেম। অকৃতদার পার্বতীচরণের এই গ্রামে একটি মুদির দোকান আছে। শিল্প বোঝেন না তিনি, ব্যবসা ভালো বোঝেন।
        পৃথিবীর সুখ দু:খের আবর্তের মাঝে মহামারীর প্রকোপ ভয়াবহ দু:স্বপ্নের মতো মানুষের জীবনকে ঘিরে ধরে। সেবার শীতে কলকাতা থেকে শিল্পমেলা আয়োজক অনুপম তালুকদার এসে কিছু মুখোশের অর্ডার দিয়ে যান। কিন্তু করোনার প্রকোপে কিছু দিন পর অনুপম তালুকদার তাঁর অর্ডারগুলো ক্যানসেল করেন। সমীরণ নিরাশ হয়ে পড়েন। 
      একদিন হঠাৎ করেই করোনায় আক্রান্ত হন সমীরণ মাহাতো। পরীক্ষা করানোর পর দুদিনের জ্বরে মৃত্যু হয় তাঁর। তুলসী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। দিশাহারা, সাদা থান পরিহিতা তুলসীকে দেখে পার্বতীচরণ  বলেন, " তুই আমার বাড়ি চল তুলসী। আমরা সংসার পাতবো।"
তুলসী শেষ পর্যন্ত রাজী হয় না, গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘোষদের বাড়িতে  কাজে ঢোকে।
           বছর দুয়েক পর হঠাৎ সমীরণের চৌকির তলা থেকে একটা ঠিকানা লেখা কার্ড পেয়ে সিধু মাকে বলে, " এটা কলকাতায় অনুপম বাবুর ঠিকানা। ওখানে বাবার বানানো মুখোশগুলো নিয়ে যাব বিক্রির জন্য। এখন তো আর দেশে করোনা নেই। ওনারা না করতে পারবেন না।"
     মহামারী দেশকে শ্মশান করেছে। তবু মানুষের মনে আশার আলো নেভেনি। তুলসী আর তরলা কিছু মুখোশ সহ সিধুর ব্যাগপত্তর গুছিয়ে দেয়। মা বোনকে বিদায় জানিয়ে আত্মবিশ্বাসী সিধু তার অদম্য ইচ্ছা পূরণের পথে পাড়ি দেয়। তুলসী "দুগ্গা দুগ্গা" বলে বার বার প্রণাম করে।


 

কে…

পর্ণা চক্রবর্তী 


আধো ঘুমের মধ্যে  সদর দরজা খোলার আওয়াজ শুনতে পেলো রাত্রি।শুভর এখন নাইট শিফট চলছে। অফিসে কাজের খুব চাপ।   

বাড়ীর একটা চাবি শুভর কাছে থাকে। রাত্রিকে স্কুলের জন্য অনেক সকালে উঠতে হয়। তাই ও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।   

ঘুমের ঘোরে রাত্রি শুনছে টেবিলে চাবি রাখার আওয়াজ। বেড রুমের দরজাটা  ক্যাঁচ শব্দে খোলা হলো,বন্ধ হলো। বাথরুমে জলের আওয়াজ,  রাত্রি পাশ ফিরল। অন্ধকার ফিকে হচ্ছে।


পা টিপে টিপে হাঁটছে শুভ।

রাত্রি যেন একটা মাছের মতো ,ঘুমের  সাগরে কখনো ভাসছে, কখনো ডুব দিচ্ছে গভীরে।শুভ পাশে এসে শুলো। অভ্যাস মতো রাত্রির গায়ে আলতো করে হাতটা রাখলো একবার।

 টয়লেটে গেলে হতো। কিন্তু রাত্রির দুচোখে বড়ো ঘুম,ইচ্ছা করছে না। শীত করছে, গায়ের চাদরটা হাতড়াচ্ছে। শুভ  কুঁকড়ে শুয়ে থাকা শরীরটাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল। 


উফ! কে ভীষণ জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে,চিৎকার করছে।

রাত্রি ধড়মড় করে উঠে বসল। ঘরে হালকা অন্ধকার।ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে দরজাটা খুলল রাত্রি। 

“লক্ষী দি? কি হয়েছে ,দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন ?  

গেট খোলা ? কে  ওখানে? পুলিশ ? 

কি হয়েছে? এই সময়  আমার বাড়িতে, আপনারা ? কেন?  অজানা ভয়ে রাত্রির হাত, পা  ঠান্ডা হয়ে আসছে।

 ওরা  যেন কিসব বলছে । রাত্রির  মাথাটা ঘুরছে, কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।


লক্ষীদি কাঁদছে ।

রাত্রি পাগলের মতো শোবার ঘরে ছুটে গেলো। আলো জ্বালালো, বিছানাটা খালি ,কেউ শুয়ে নেই। 

“কি যা তা বলছেন আপনারা। একটু আগে এখানেই তো ছিল ,আমার পাশে শুয়ে ছিল।”  রাত্রি  কাঁদছে  হাউ হাউ করে।

শুভ,শুভ….   বারান্দা, পাশের ঘর  গোটা ফ্ল্যাট ….নেই।

তবে কে এসে শুলো আমার পাশে ?

কে আমার গায়ে হাত রাখলো? 

 ভোর হয়ে আসছে।রাত্রির আর্তনাদে শান্ত ভোর মুহূর্তে অশান্ত হয়ে উঠল। 


 

লক্ষ্মণরেখা 

নির্মাল্য ঘোষ 

ঘরের কলিঙ বেলটা অনেকক্ষণ ধরে বাজাচ্ছিল রিপন - কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছিল না। অফিস থেকে ফিরতে দেরী হয়েছে। সুদীপ্তা  কি নেই বাড়িতে? কিছু তো বলেনি!!! ফোন ও ধরছে না। 

রিপন অফিসার মানুষ - বেসরকারী ব্যাঙ্কে। ফিরতে প্রায় দিনই দেরী হয়। বেল বাজালেই সুদীপ্তা দরজা খুলে দেয়। তাহলে আজকে? কি হল? ক্ষিদেও পেয়েছে খুব। কি মুস্কিল!!! 

সুদীপ্তা রিপনের বিয়ে হয়েছে এক বছর হল। লাভ ম্যারেজ। এমনিতে ওরা হ্যাপি কাপল। তবে মাঝে মধ্যে ঝগড়া ঝাটি সব স্বামী স্ত্রীর মধ্যেই হয়। তাতে কি?

প্রায় পনের মিনিট হয়ে গেল - দরজা খুলছে না সুদীপ্তা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ -আলো জ্বলছে। তাহলে??? নানা রকম দুশ্চিন্তা মাথায় উঁকি দিতে লাগল। পাড়ার লোককে ডাকবে কি না ভাবতে লাগল! কিন্তু, কেমন যেন একটা সঙ্কোচ হচ্ছে। বিপদে সঙ্কোচ করলে তো চলবে না... নিজের মনকে বোঝাল রিপন। আরেকবার শেষ চেষ্টা করে পাড়ার লোককে ডাকতেই হবে। বেশ কয়েকবার বেল বাজিয়ে এবার খুব জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিল রিপন।

দরজা খুলে গেল। সুদীপ্তা সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে বিস্ময়!!!

"এত জোরে দরজা ধাকাচ্ছ কেন? "
" কখন থেকে ডাকছি তোমাকে খেয়াল আছে???" মুখ বিরক্ত করে রিপন বলে উঠল - "শুনতে পাওনা - কি করছিলে?"

অবাক এবং নির্বিকার চোখে সুদীপ্তা বলে উঠল - " কেন? Face book reel বানাচ্ছিলাম। আরেকটা  মোবাইল silent ছিল। তোমার কিনে দেওয়া নতুন মোবাইল দিয়ে video করছিলাম আমার। কালকেই monetize হয়েছে ফেস বুক। ভালো কণ্টেণ্ট না  দিলে টাকা আসবে কি করে? "

"তোমার এত টাকার কিসের দরকার? আমি তো যথেষ্ট ভালো income করি... তোমাকে হাত খরচও ভালো দেই... তাহলে???" রিপনের চোখে মুখে বিস্ময় ও বিরক্তি!!!

"তাতে কি? নিজেকে প্রকাশ করতে কে না চায়???" সুদীপ্তা দরজা খোলা রেখে মুখ বেঁকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

রাগে, দুঃখে, বিরক্তিতে, হতাশায় রিপন নিজের হাতে ঝোলানো অফিসের ব্যাগটা দূরে ছুঁড়ে মারল।



 

স্বপ্ন 

লীনা চন্দ


আজকাল স্বপনের মা সন্ধ্যাবাতি দিয়েই আদা দিয়ে এক কাপ চা বানায়। তারপর তারিয়ে তারিয়ে চায়ে চুমুক দেয় আর সিরিয়াল দেখে। বছর খানেক হলো স্বপন পাকা দালান তুলেছে। দামি খাট, সোফা, টিভি সব কিনেছে। জানালা, দরজায় বাহারি পর্দা। রান্নাঘরটিকেও সারিয়েছে। গ্যাসের উনুন, বাসনপত্র সব কিনেছে।
স্বপন মাকে খাটে শোয়ায়। ও নিজে মেঝেতে ঘুমোয়। মা রাগ করলে বলে,
–সারা জীবন আমার জন্য করলে। ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি সেটা বুঝতেই দাওনি। এবার তুমি পায়ের ওপর পা তুলে বসে আমাকে হুকুম করবে।
স্বপনের মা হাসে না। কিন্তু মনে মনে খুশি হয়। কপালে হাত ঠেকায়। মনে মনে ভগবানকে বলে,
– ঠাকুর, কারো নজর যেন না লাগে।
স্বপনের মা গ্যাসের উনুনে রান্না করে। ঘরদোর পরিষ্কার করে। স্নান সেরে পরিষ্কার শাড়ি পরে। আর সন্ধ্যাবেলায় সিরিয়াল দেখে। পাড়া পড়শী চোখ টাটায়। বলে,
–ছেলের বিয়ের পর দেখব কত বাবুগিরি থাকে।
অজানা আশঙ্কায় স্বপনের মায়ের বুক ঢিপ ঢিপ করে।
সেদিন আটটার সিরিয়াল সবে শেষ হয়েছে। ঠিক সেই সময় দরজায় বাইরে স্বপনের গলা।
-মা, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো।
দরজা খুলে চমকে ওঠে স্বপনের মা। স্বপনের পাশে একটি মেয়ে। দুজনের গলায় ফুলের মালা।
–হেই স্বপন, তুই বিয়ে করেছিস?
তার গলার আওয়াজ নিজের কানেই আর্তনাদের মতো শোনায়। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে,
–আগে বলবি তো বাবা। বরণডালা সাজিয়ে রাখতুম।
স্বপনের মা বৌমাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে। ওদের ঘরে বসিয়ে রান্নাঘরে আসে। দুধে চালে বসিয়ে দেয় পায়েস করবে বলে।
রাতে খাবার পর মাকে মাদুর নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে দেখে স্বপন বলে,
– কোথায় যাও?
– রান্নাঘরে।
– কেন?
– শোবো। তোরা দরজার খিল আটকে দে।
নতুন বৌ মায়ের হাত থেকে মাদুরটা কেড়ে নিয়ে বলে,
-এটা তোমার ঘর। তোমাকে কোত্থাও যেতে হবে না।
স্বপনের মায়ের বুক থেকে ভারি পাথরটা নিমেষে নেমে যায়।


 

স্মার্টফোন 

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

ডাকবাক্সের তলায় এভাবে সুবলবাবুকে দেখব কখনো  ভাবিনি। মাথায়  উস্কোখুস্কো চুল, প্রায় পাগল  পাগল  অবস্থা।  কিছু  জিজ্ঞেস করলে কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। সুবলবাবু মানে সুবল  বিশ্বাস,  এই  গ্রামের অলিখিত পোস্টমাস্টার। 

 গোবরডাঙার  বাবুপাড়ায়, বনেদি  সম্ভ্রান্ত মানুষের বাস। পৌরসভার এলাকাভুক্ত হলেও আধা গ্রাম,  আধা শহর।  সেখানে খেলার মাঠ, সিনেমা হল সুইমিং পুল যেমন আছে,  তেমনই আছে শাক সবজির চাষ, আমবাগান, পুকুর সহ ধান,গম, সরষের ক্ষেত। 

 বাবুপাড়ার মোড়ের রঙ চটা বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে, নিতান্তই একটা  পোড়োবাড়ি বলেই মনে হবে। অনেক আগে এই বাড়িটিই  ছিল গ্রামের  ডাকঘর।  বাড়ির  মালিক  শম্ভু চ্যাটার্জি  ছিলেন  পোস্ট  মাষ্টার।  এখন সে বাড়িতে আর পোস্ট অফিস নেই,  বেঁচে নেই পোস্টমাষ্টার চাটুজ্জ্যে  মশাই। খুব রাগী এবং অহংকারী মানুষ ছিলেন এই  চাটুজ্জ্যে মশাই। কাউকেই ঘুনাক্ষরে বিশ্বাস করতেন না।  কারো কোন বিপদে আপদে তিনি এগিয়ে তো আসতেনই না। বরং কেন সে বিপদে পড়ল সেই কথা নিয়ে তুমুল কান্ড বাঁধিয়ে দিতেন।  শোনা যায় একবার এক বালক তাঁর জামগাছে জাম পাড়তে উঠেছিল।  সেটা চাটুজ্জ্যে মশাই এর চোখে পড়ায় বলেছিলেন,  " তোমার ছেলে মরে মরুক, আমার জামের ডাল যেন না ভাঙে।"

  সেসব দিন আজ অতীত, কিন্তু সেই লাল রঙের রঙচটা  ডাকবাক্সটা আজও রয়ে গিয়েছে। আর
সুবলবাবুই  এখন   ডাকপিয়ন।  তিনিই  এখন  পোস্টমাস্টারের কাজটাও  চালিয়ে নেন। চিঠি পত্র, টাকা পয়সা জমা তোলার মতো অতি বিশ্বাসের কাজটা, সুবল বাবু খুব সুনিপুণ ভাবে করেন।  সেই জন্য তার সুনামও আছে। কিন্তু কি এমন ঘটলো,  যে সদাহাস্যজ্বল মানুষটি পাল্টে গেল নিমেষেই। একটা এঁদো পুকুরের পাড়ে ভর সন্ধ্যায় সেই ডাকবাক্সের নিচে  টর্চ লাইট হাতে কি একটা খুঁজে চলেছেন। 
 চাটুজ্জ্যে মশাই এর পর তিনিই এখন সর্বের সর্বা। জগতে  কাউকেই তিনি বিশ্বাস করতেন না। সবাই বলে,  সুবলবাবু চাটুজ্জ্যে মশাই এর ওই একটা গুণ পেয়েছেন। পাড়ার যুবকরা তার অনুপস্থিতিতে তাঁকে সুবল অবিশ্বাস বলে ডাকত।

সেবার  জামাই ষষ্ঠীতে সুবলবাবু শ্বশুরবাড়ি থেকে  একটা স্মার্টফোন উপহার পেয়েছিলেন।  সারা দিন খুট খুট করে সেই ফোনের সব টুকিটাকি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। অফিসের সব কাজকর্ম, ব্যাক্তিগত  সব কিছু মোবাইলে রেকর্ড করে রাখতেন। চিঠি দেওয়া, টাকা দেওয়া সব ছবি তুলে রাখতেন। তার মোবাইলে ছিল  শত শত কল  রেকর্ড,  কখন কার সাথে কথা বলেছেন, সব। 

 "আমার কাছে সব রেকর্ড আছে " এই লাইনটা সারাদিন তিনি বলতেন।  এই কথাটা শুনতে শুনতে সকলের কান খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একটা  খারাপ রেকর্ড প্লেয়ারের মত সেই কথা সারাক্ষণ  বেজে চলত।

দূরে একজন মহিলা ঘোমটা মাথায় দাড়িয়ে সুবল বাবুকে একদৃষ্টে দেখে চলেছে।  কাছে গিয়ে জানলাম, উনি সুবল বাবুর স্ত্রী।  

"...সুবলদা'র কি হয়েছে, বৌদি ?"  কি খুঁজছেন,জানতে চাইলাম।

..."আর বলবেন না, আপনার দাদার প্রিয় মোবাইলটা... "

..."মোবাইল ওখানে গেল কিভাবে? "

..."আসলে মোবাইলটা স্টোরেজ ফুল হয়ে,  বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।   অনেক চেষ্টা করেও যখন মোবাইল অন করতে পারেন নি, তখন রাগ করে সেটা টান মেরে ফেলে দেয়, ওই ডাকবাক্সের নিচে। "


 

প্রিয়াঙ্কা
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

আলো ঝলমলে এক পৃথিবীর মাঝখানে সময় দাঁড়িয়ে তখন। ডান পাশে ঘরের মানুষটি জানলা ঘেঁষে ঝুঁকে পড়ে বিভিন্ন কায়দায় বাইরের দৃশ্যপটকে ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত। পেছনে অল্প দূরত্বেই মেয়ে জামাই রয়েছে।বাঁ দিকে মেয়েরই বয়সী তরুণীটি হাসমুখ সফট টয়টিকে কোলে রেখে মাথা এলিয়ে দেওয়ার ফাঁকে কখনো আমার দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে থাকছে। হাসি ফিরিয়ে দিলেও মনে আমার হাসি নেই এতটুকুও। মহা গোলযোগের অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা আমি তখন। আমার সঙ্গে যেকোন মুহূর্তে যে কিছু ঘটতে পারে।তারমধ্যে বেশ কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে সুবেশা সুন্দরী আকস্মিক কিছু সম্ভাবনা আর সতর্কতার যে সমস্ত বাণী আওড়াচ্ছে,আরও একগুচ্ছ ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া প্রায়।

হঠাৎ দেখি,পাশের তরুণীর সফট টয় নাচানাচি করছে আমার হাতের ওপর। এতক্ষণ চুপটি করে বসে থাকা তরুণীটি একনাগাড়ে তার পুতুলের নাম থেকে শুরু করে পুতুল ঘিরে নিজের যাবতীয় বৃত্তান্ত আমাকে হিন্দিতে শোনাতে শোনাতে পুতুলটিকে নাচাচ্ছে আমার কোলে, হাতে। পাগল নাকি! হতবাক আমি সবকিছু ভুলে ফ্যালফ্যাল করে দেখছি।মুহূর্তের জন্য কানটা বন্ধ হয়ে খুলে গেল আবার। অবাঙালি মেয়েটি দুহাতের যাবতীয় উষ্ণতা দিয়ে আমার হাত চেপে ধরে বলে উঠল, 'টেকঅফ হয়ে গেছে আন্টি..এই পুরো যাত্রাপথে আমি আপনার সাথে আছি, পাশে আছি..আরও অনেক গল্প হবে।'

তারপর গল্প অনেক হয়েছিল বিমানের পরবর্তী সময়টুকুতে। ঘর ছেড়ে অনেক দূরে উচ্চমানের চাকরি সামলে সঙ্গে প্রায় সারাবছরই ট্রেকিং-এ ব্যস্ত ঝকঝকে স্মার্ট তরুণীটি কেমন আপন করে নিল সাদামাটা এই আমাকে! সেই মুহূর্তে আমার ভয়ের বাসাকে কেমন ভেঙে গুড়িয়ে দিল!  সময়টা কোথা দিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। 

এয়ারপোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসবার পথে যতক্ষণ চোখ যায় ফিরে ফিরে তাকালেই মেয়েটির ছলছলে চোখের শেষ দেখাটুকু আর তার হাত ধরে নেক পিলো সফট টয়ের অবিরাম হাত নেড়ে চলা ভারাক্রান্ত করছিল মনকে। প্রথম দেখা সম্পূর্ণ অচেনা সহৃদয় ভিন রাজ্যের এই মেয়েটি অনেক সম্পর্ককে ডিঙিয়ে হৃদয়ের আত্মীয়তার গ্রন্থিতে বিনিসুতোয় বাঁধা পড়ছিল থেকে থেকে।