Tuesday, March 3, 2026


 

ভেজা প্রেম
প্রদীপ কুমার দে

এইমাত্র বৃষ্টির জলে ভিজে গেলাম আমি। ভিজে গেল শরীর। সিল্কের শাড়িতে জলে লেপ্টে যাওয়া যৌবন যখন রাস্তার সকল পথিকের দৃষ্টি আরোপিত হচ্ছিল তখন একমাত্র বেরসিক দেখলাম তোমায়, হ্যাঁ এমাত্র তুমিই আমাকে অবজ্ঞা করে মুখ ঘুরিয়ে নিলে, যেন কিছুই দেখনি যেন এক যুবতী নারীর দেহ সৌন্দর্য কোন দ্রষ্টব্য বিষয়ই না তোমার কাছে।

আমি অবাক হয়েছিলাম সেই মুহূর্তে।
যদিও হাজারো দৃষ্টি আর বৃষ্টি তখন আমাকে ধুয়ে খাচ্ছিল।

তাই তাড়াতাড়ি পথে পা ছোটালাম।

বৃষ্টি থেমে গেছে কখন। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি এখন। কেন জানো?

হ্যাঁ। শুধুমাত্র তোমাকে মাপবো বলেই। এক মাথা এলেমেলো উস্কোখুশকো চুল নিয়ে যে যুবকটি কিছু আগে আমার ভিজে যাওয়া শরীরকে উপেক্ষা করেছিল, আর লজ্জায় নিজেই সরে গেছিল পথের বাঁকে, এখন যে তাকেই আমার মন খুব চাইছে।

ওইতো ও আসছে ....
আসুক, ও আরও কাছে আসুক, এবার আমিই লজ্জার মাথা ভেঙে আমার কামোদ চোখ দিয়ে ওকে ডেকে নেব, আমার জন্যে ......

এবারও কি ও আমার মনের সিক্ত প্রেমকে উপেক্ষা করে দেবে ঠিক তখনকার ভিজে যাওয়া দেহের মতই ?


 

ক্রমবিন্যাস 

জনা বন্দ্যোপাধ্যায়

শাল, মহুয়ার জঙ্গল ঘেরা অযোধ্যা পাহাড়ের পথে চড়িদা গ্রাম। এখানকার একনিষ্ঠ মুখোশ শিল্পী সমীরণ মাহাতোর ছেলে সিধু ও মেয়ে তরলা বাবাকে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরীর কাজে সাহায্য করে। সিধুর বয়স সতেরো ছাড়িয়েছে, তরলার পনেরো !
        সমীরণ মাহাতোর স্ত্রী তুলসী কাকভোরে পুকুরে স্নান করতে যায়। পুকুর ধারে ছিপ হাতে বসে থাকেন পার্বতীচরণ। প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে চলে দুজনের প্রেম। অকৃতদার পার্বতীচরণের এই গ্রামে একটি মুদির দোকান আছে। শিল্প বোঝেন না তিনি, ব্যবসা ভালো বোঝেন।
        পৃথিবীর সুখ দু:খের আবর্তের মাঝে মহামারীর প্রকোপ ভয়াবহ দু:স্বপ্নের মতো মানুষের জীবনকে ঘিরে ধরে। সেবার শীতে কলকাতা থেকে শিল্পমেলা আয়োজক অনুপম তালুকদার এসে কিছু মুখোশের অর্ডার দিয়ে যান। কিন্তু করোনার প্রকোপে কিছু দিন পর অনুপম তালুকদার তাঁর অর্ডারগুলো ক্যানসেল করেন। সমীরণ নিরাশ হয়ে পড়েন। 
      একদিন হঠাৎ করেই করোনায় আক্রান্ত হন সমীরণ মাহাতো। পরীক্ষা করানোর পর দুদিনের জ্বরে মৃত্যু হয় তাঁর। তুলসী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। দিশাহারা, সাদা থান পরিহিতা তুলসীকে দেখে পার্বতীচরণ  বলেন, " তুই আমার বাড়ি চল তুলসী। আমরা সংসার পাতবো।"
তুলসী শেষ পর্যন্ত রাজী হয় না, গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘোষদের বাড়িতে  কাজে ঢোকে।
           বছর দুয়েক পর হঠাৎ সমীরণের চৌকির তলা থেকে একটা ঠিকানা লেখা কার্ড পেয়ে সিধু মাকে বলে, " এটা কলকাতায় অনুপম বাবুর ঠিকানা। ওখানে বাবার বানানো মুখোশগুলো নিয়ে যাব বিক্রির জন্য। এখন তো আর দেশে করোনা নেই। ওনারা না করতে পারবেন না।"
     মহামারী দেশকে শ্মশান করেছে। তবু মানুষের মনে আশার আলো নেভেনি। তুলসী আর তরলা কিছু মুখোশ সহ সিধুর ব্যাগপত্তর গুছিয়ে দেয়। মা বোনকে বিদায় জানিয়ে আত্মবিশ্বাসী সিধু তার অদম্য ইচ্ছা পূরণের পথে পাড়ি দেয়। তুলসী "দুগ্গা দুগ্গা" বলে বার বার প্রণাম করে।


 

কে…

পর্ণা চক্রবর্তী 


আধো ঘুমের মধ্যে  সদর দরজা খোলার আওয়াজ শুনতে পেলো রাত্রি।শুভর এখন নাইট শিফট চলছে। অফিসে কাজের খুব চাপ।   

বাড়ীর একটা চাবি শুভর কাছে থাকে। রাত্রিকে স্কুলের জন্য অনেক সকালে উঠতে হয়। তাই ও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।   

ঘুমের ঘোরে রাত্রি শুনছে টেবিলে চাবি রাখার আওয়াজ। বেড রুমের দরজাটা  ক্যাঁচ শব্দে খোলা হলো,বন্ধ হলো। বাথরুমে জলের আওয়াজ,  রাত্রি পাশ ফিরল। অন্ধকার ফিকে হচ্ছে।


পা টিপে টিপে হাঁটছে শুভ।

রাত্রি যেন একটা মাছের মতো ,ঘুমের  সাগরে কখনো ভাসছে, কখনো ডুব দিচ্ছে গভীরে।শুভ পাশে এসে শুলো। অভ্যাস মতো রাত্রির গায়ে আলতো করে হাতটা রাখলো একবার।

 টয়লেটে গেলে হতো। কিন্তু রাত্রির দুচোখে বড়ো ঘুম,ইচ্ছা করছে না। শীত করছে, গায়ের চাদরটা হাতড়াচ্ছে। শুভ  কুঁকড়ে শুয়ে থাকা শরীরটাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল। 


উফ! কে ভীষণ জোরে জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে,চিৎকার করছে।

রাত্রি ধড়মড় করে উঠে বসল। ঘরে হালকা অন্ধকার।ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে দরজাটা খুলল রাত্রি। 

“লক্ষী দি? কি হয়েছে ,দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন ?  

গেট খোলা ? কে  ওখানে? পুলিশ ? 

কি হয়েছে? এই সময়  আমার বাড়িতে, আপনারা ? কেন?  অজানা ভয়ে রাত্রির হাত, পা  ঠান্ডা হয়ে আসছে।

 ওরা  যেন কিসব বলছে । রাত্রির  মাথাটা ঘুরছে, কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।


লক্ষীদি কাঁদছে ।

রাত্রি পাগলের মতো শোবার ঘরে ছুটে গেলো। আলো জ্বালালো, বিছানাটা খালি ,কেউ শুয়ে নেই। 

“কি যা তা বলছেন আপনারা। একটু আগে এখানেই তো ছিল ,আমার পাশে শুয়ে ছিল।”  রাত্রি  কাঁদছে  হাউ হাউ করে।

শুভ,শুভ….   বারান্দা, পাশের ঘর  গোটা ফ্ল্যাট ….নেই।

তবে কে এসে শুলো আমার পাশে ?

কে আমার গায়ে হাত রাখলো? 

 ভোর হয়ে আসছে।রাত্রির আর্তনাদে শান্ত ভোর মুহূর্তে অশান্ত হয়ে উঠল। 


 

লক্ষ্মণরেখা 

নির্মাল্য ঘোষ 

ঘরের কলিঙ বেলটা অনেকক্ষণ ধরে বাজাচ্ছিল রিপন - কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছিল না। অফিস থেকে ফিরতে দেরী হয়েছে। সুদীপ্তা  কি নেই বাড়িতে? কিছু তো বলেনি!!! ফোন ও ধরছে না। 

রিপন অফিসার মানুষ - বেসরকারী ব্যাঙ্কে। ফিরতে প্রায় দিনই দেরী হয়। বেল বাজালেই সুদীপ্তা দরজা খুলে দেয়। তাহলে আজকে? কি হল? ক্ষিদেও পেয়েছে খুব। কি মুস্কিল!!! 

সুদীপ্তা রিপনের বিয়ে হয়েছে এক বছর হল। লাভ ম্যারেজ। এমনিতে ওরা হ্যাপি কাপল। তবে মাঝে মধ্যে ঝগড়া ঝাটি সব স্বামী স্ত্রীর মধ্যেই হয়। তাতে কি?

প্রায় পনের মিনিট হয়ে গেল - দরজা খুলছে না সুদীপ্তা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ -আলো জ্বলছে। তাহলে??? নানা রকম দুশ্চিন্তা মাথায় উঁকি দিতে লাগল। পাড়ার লোককে ডাকবে কি না ভাবতে লাগল! কিন্তু, কেমন যেন একটা সঙ্কোচ হচ্ছে। বিপদে সঙ্কোচ করলে তো চলবে না... নিজের মনকে বোঝাল রিপন। আরেকবার শেষ চেষ্টা করে পাড়ার লোককে ডাকতেই হবে। বেশ কয়েকবার বেল বাজিয়ে এবার খুব জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিল রিপন।

দরজা খুলে গেল। সুদীপ্তা সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে বিস্ময়!!!

"এত জোরে দরজা ধাকাচ্ছ কেন? "
" কখন থেকে ডাকছি তোমাকে খেয়াল আছে???" মুখ বিরক্ত করে রিপন বলে উঠল - "শুনতে পাওনা - কি করছিলে?"

অবাক এবং নির্বিকার চোখে সুদীপ্তা বলে উঠল - " কেন? Face book reel বানাচ্ছিলাম। আরেকটা  মোবাইল silent ছিল। তোমার কিনে দেওয়া নতুন মোবাইল দিয়ে video করছিলাম আমার। কালকেই monetize হয়েছে ফেস বুক। ভালো কণ্টেণ্ট না  দিলে টাকা আসবে কি করে? "

"তোমার এত টাকার কিসের দরকার? আমি তো যথেষ্ট ভালো income করি... তোমাকে হাত খরচও ভালো দেই... তাহলে???" রিপনের চোখে মুখে বিস্ময় ও বিরক্তি!!!

"তাতে কি? নিজেকে প্রকাশ করতে কে না চায়???" সুদীপ্তা দরজা খোলা রেখে মুখ বেঁকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

রাগে, দুঃখে, বিরক্তিতে, হতাশায় রিপন নিজের হাতে ঝোলানো অফিসের ব্যাগটা দূরে ছুঁড়ে মারল।



 

স্বপ্ন 

লীনা চন্দ


আজকাল স্বপনের মা সন্ধ্যাবাতি দিয়েই আদা দিয়ে এক কাপ চা বানায়। তারপর তারিয়ে তারিয়ে চায়ে চুমুক দেয় আর সিরিয়াল দেখে। বছর খানেক হলো স্বপন পাকা দালান তুলেছে। দামি খাট, সোফা, টিভি সব কিনেছে। জানালা, দরজায় বাহারি পর্দা। রান্নাঘরটিকেও সারিয়েছে। গ্যাসের উনুন, বাসনপত্র সব কিনেছে।
স্বপন মাকে খাটে শোয়ায়। ও নিজে মেঝেতে ঘুমোয়। মা রাগ করলে বলে,
–সারা জীবন আমার জন্য করলে। ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি সেটা বুঝতেই দাওনি। এবার তুমি পায়ের ওপর পা তুলে বসে আমাকে হুকুম করবে।
স্বপনের মা হাসে না। কিন্তু মনে মনে খুশি হয়। কপালে হাত ঠেকায়। মনে মনে ভগবানকে বলে,
– ঠাকুর, কারো নজর যেন না লাগে।
স্বপনের মা গ্যাসের উনুনে রান্না করে। ঘরদোর পরিষ্কার করে। স্নান সেরে পরিষ্কার শাড়ি পরে। আর সন্ধ্যাবেলায় সিরিয়াল দেখে। পাড়া পড়শী চোখ টাটায়। বলে,
–ছেলের বিয়ের পর দেখব কত বাবুগিরি থাকে।
অজানা আশঙ্কায় স্বপনের মায়ের বুক ঢিপ ঢিপ করে।
সেদিন আটটার সিরিয়াল সবে শেষ হয়েছে। ঠিক সেই সময় দরজায় বাইরে স্বপনের গলা।
-মা, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো।
দরজা খুলে চমকে ওঠে স্বপনের মা। স্বপনের পাশে একটি মেয়ে। দুজনের গলায় ফুলের মালা।
–হেই স্বপন, তুই বিয়ে করেছিস?
তার গলার আওয়াজ নিজের কানেই আর্তনাদের মতো শোনায়। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে,
–আগে বলবি তো বাবা। বরণডালা সাজিয়ে রাখতুম।
স্বপনের মা বৌমাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে। ওদের ঘরে বসিয়ে রান্নাঘরে আসে। দুধে চালে বসিয়ে দেয় পায়েস করবে বলে।
রাতে খাবার পর মাকে মাদুর নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে দেখে স্বপন বলে,
– কোথায় যাও?
– রান্নাঘরে।
– কেন?
– শোবো। তোরা দরজার খিল আটকে দে।
নতুন বৌ মায়ের হাত থেকে মাদুরটা কেড়ে নিয়ে বলে,
-এটা তোমার ঘর। তোমাকে কোত্থাও যেতে হবে না।
স্বপনের মায়ের বুক থেকে ভারি পাথরটা নিমেষে নেমে যায়।


 

স্মার্টফোন 

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

ডাকবাক্সের তলায় এভাবে সুবলবাবুকে দেখব কখনো  ভাবিনি। মাথায়  উস্কোখুস্কো চুল, প্রায় পাগল  পাগল  অবস্থা।  কিছু  জিজ্ঞেস করলে কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। সুবলবাবু মানে সুবল  বিশ্বাস,  এই  গ্রামের অলিখিত পোস্টমাস্টার। 

 গোবরডাঙার  বাবুপাড়ায়, বনেদি  সম্ভ্রান্ত মানুষের বাস। পৌরসভার এলাকাভুক্ত হলেও আধা গ্রাম,  আধা শহর।  সেখানে খেলার মাঠ, সিনেমা হল সুইমিং পুল যেমন আছে,  তেমনই আছে শাক সবজির চাষ, আমবাগান, পুকুর সহ ধান,গম, সরষের ক্ষেত। 

 বাবুপাড়ার মোড়ের রঙ চটা বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে, নিতান্তই একটা  পোড়োবাড়ি বলেই মনে হবে। অনেক আগে এই বাড়িটিই  ছিল গ্রামের  ডাকঘর।  বাড়ির  মালিক  শম্ভু চ্যাটার্জি  ছিলেন  পোস্ট  মাষ্টার।  এখন সে বাড়িতে আর পোস্ট অফিস নেই,  বেঁচে নেই পোস্টমাষ্টার চাটুজ্জ্যে  মশাই। খুব রাগী এবং অহংকারী মানুষ ছিলেন এই  চাটুজ্জ্যে মশাই। কাউকেই ঘুনাক্ষরে বিশ্বাস করতেন না।  কারো কোন বিপদে আপদে তিনি এগিয়ে তো আসতেনই না। বরং কেন সে বিপদে পড়ল সেই কথা নিয়ে তুমুল কান্ড বাঁধিয়ে দিতেন।  শোনা যায় একবার এক বালক তাঁর জামগাছে জাম পাড়তে উঠেছিল।  সেটা চাটুজ্জ্যে মশাই এর চোখে পড়ায় বলেছিলেন,  " তোমার ছেলে মরে মরুক, আমার জামের ডাল যেন না ভাঙে।"

  সেসব দিন আজ অতীত, কিন্তু সেই লাল রঙের রঙচটা  ডাকবাক্সটা আজও রয়ে গিয়েছে। আর
সুবলবাবুই  এখন   ডাকপিয়ন।  তিনিই  এখন  পোস্টমাস্টারের কাজটাও  চালিয়ে নেন। চিঠি পত্র, টাকা পয়সা জমা তোলার মতো অতি বিশ্বাসের কাজটা, সুবল বাবু খুব সুনিপুণ ভাবে করেন।  সেই জন্য তার সুনামও আছে। কিন্তু কি এমন ঘটলো,  যে সদাহাস্যজ্বল মানুষটি পাল্টে গেল নিমেষেই। একটা এঁদো পুকুরের পাড়ে ভর সন্ধ্যায় সেই ডাকবাক্সের নিচে  টর্চ লাইট হাতে কি একটা খুঁজে চলেছেন। 
 চাটুজ্জ্যে মশাই এর পর তিনিই এখন সর্বের সর্বা। জগতে  কাউকেই তিনি বিশ্বাস করতেন না। সবাই বলে,  সুবলবাবু চাটুজ্জ্যে মশাই এর ওই একটা গুণ পেয়েছেন। পাড়ার যুবকরা তার অনুপস্থিতিতে তাঁকে সুবল অবিশ্বাস বলে ডাকত।

সেবার  জামাই ষষ্ঠীতে সুবলবাবু শ্বশুরবাড়ি থেকে  একটা স্মার্টফোন উপহার পেয়েছিলেন।  সারা দিন খুট খুট করে সেই ফোনের সব টুকিটাকি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। অফিসের সব কাজকর্ম, ব্যাক্তিগত  সব কিছু মোবাইলে রেকর্ড করে রাখতেন। চিঠি দেওয়া, টাকা দেওয়া সব ছবি তুলে রাখতেন। তার মোবাইলে ছিল  শত শত কল  রেকর্ড,  কখন কার সাথে কথা বলেছেন, সব। 

 "আমার কাছে সব রেকর্ড আছে " এই লাইনটা সারাদিন তিনি বলতেন।  এই কথাটা শুনতে শুনতে সকলের কান খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একটা  খারাপ রেকর্ড প্লেয়ারের মত সেই কথা সারাক্ষণ  বেজে চলত।

দূরে একজন মহিলা ঘোমটা মাথায় দাড়িয়ে সুবল বাবুকে একদৃষ্টে দেখে চলেছে।  কাছে গিয়ে জানলাম, উনি সুবল বাবুর স্ত্রী।  

"...সুবলদা'র কি হয়েছে, বৌদি ?"  কি খুঁজছেন,জানতে চাইলাম।

..."আর বলবেন না, আপনার দাদার প্রিয় মোবাইলটা... "

..."মোবাইল ওখানে গেল কিভাবে? "

..."আসলে মোবাইলটা স্টোরেজ ফুল হয়ে,  বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।   অনেক চেষ্টা করেও যখন মোবাইল অন করতে পারেন নি, তখন রাগ করে সেটা টান মেরে ফেলে দেয়, ওই ডাকবাক্সের নিচে। "


 

প্রিয়াঙ্কা
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

আলো ঝলমলে এক পৃথিবীর মাঝখানে সময় দাঁড়িয়ে তখন। ডান পাশে ঘরের মানুষটি জানলা ঘেঁষে ঝুঁকে পড়ে বিভিন্ন কায়দায় বাইরের দৃশ্যপটকে ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত। পেছনে অল্প দূরত্বেই মেয়ে জামাই রয়েছে।বাঁ দিকে মেয়েরই বয়সী তরুণীটি হাসমুখ সফট টয়টিকে কোলে রেখে মাথা এলিয়ে দেওয়ার ফাঁকে কখনো আমার দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে থাকছে। হাসি ফিরিয়ে দিলেও মনে আমার হাসি নেই এতটুকুও। মহা গোলযোগের অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা আমি তখন। আমার সঙ্গে যেকোন মুহূর্তে যে কিছু ঘটতে পারে।তারমধ্যে বেশ কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে সুবেশা সুন্দরী আকস্মিক কিছু সম্ভাবনা আর সতর্কতার যে সমস্ত বাণী আওড়াচ্ছে,আরও একগুচ্ছ ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া প্রায়।

হঠাৎ দেখি,পাশের তরুণীর সফট টয় নাচানাচি করছে আমার হাতের ওপর। এতক্ষণ চুপটি করে বসে থাকা তরুণীটি একনাগাড়ে তার পুতুলের নাম থেকে শুরু করে পুতুল ঘিরে নিজের যাবতীয় বৃত্তান্ত আমাকে হিন্দিতে শোনাতে শোনাতে পুতুলটিকে নাচাচ্ছে আমার কোলে, হাতে। পাগল নাকি! হতবাক আমি সবকিছু ভুলে ফ্যালফ্যাল করে দেখছি।মুহূর্তের জন্য কানটা বন্ধ হয়ে খুলে গেল আবার। অবাঙালি মেয়েটি দুহাতের যাবতীয় উষ্ণতা দিয়ে আমার হাত চেপে ধরে বলে উঠল, 'টেকঅফ হয়ে গেছে আন্টি..এই পুরো যাত্রাপথে আমি আপনার সাথে আছি, পাশে আছি..আরও অনেক গল্প হবে।'

তারপর গল্প অনেক হয়েছিল বিমানের পরবর্তী সময়টুকুতে। ঘর ছেড়ে অনেক দূরে উচ্চমানের চাকরি সামলে সঙ্গে প্রায় সারাবছরই ট্রেকিং-এ ব্যস্ত ঝকঝকে স্মার্ট তরুণীটি কেমন আপন করে নিল সাদামাটা এই আমাকে! সেই মুহূর্তে আমার ভয়ের বাসাকে কেমন ভেঙে গুড়িয়ে দিল!  সময়টা কোথা দিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। 

এয়ারপোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসবার পথে যতক্ষণ চোখ যায় ফিরে ফিরে তাকালেই মেয়েটির ছলছলে চোখের শেষ দেখাটুকু আর তার হাত ধরে নেক পিলো সফট টয়ের অবিরাম হাত নেড়ে চলা ভারাক্রান্ত করছিল মনকে। প্রথম দেখা সম্পূর্ণ অচেনা সহৃদয় ভিন রাজ্যের এই মেয়েটি অনেক সম্পর্ককে ডিঙিয়ে হৃদয়ের আত্মীয়তার গ্রন্থিতে বিনিসুতোয় বাঁধা পড়ছিল থেকে থেকে।


 

হঠাৎ দেখা 

আরাত্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

শহর তখন বিকেলের শেষ আলোয় নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল। ভিড় বাসে জানলার ধারে বসে মৌ ভাবছিল, আজকের দিনটা বোধহয় আর পাঁচটা একঘেয়ে দিনের মতোই কাটবে। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। কলেজ স্ট্রিটের সেই পুরনো বইয়ের দোকানটার সামনে সে যখন নামল তখন, আকাশ হঠাৎই একটু ম্লান হয়ে আসছিল। 
বইয়ের স্তূপের মধ্যে একটা ধুলোমাখা কবিতার বই খুঁজছিল সে। ঠিক তখনই উল্টোদিকে হাত বাড়াল অন্য কেউ। একই বইয়ে দুজনের আঙুল ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। মৌ মুখ তুলে দেখল, একজোড়া উজ্জ্বল চোখ আর এক চিলতে দ্বিধামাখা হাসি। ছেলেটি আলতো করে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, "আপনি নিতে পারেন, আমি পরে আসব।"
মৌ কোনও কথা বলতে পারল না, শুধু দেখল বইয়ের হলদেটে পাতার গন্ধে এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ছাতাটা ব্যাগেই ছিল, কিন্তু সেটা খোলার কথা মাথায় এল না। দোকানের চালের তলায় দুজনে দাঁড়িয়ে রইল পাশাপাশি। কোনও ভূমিকা নেই, কোন পরিচয় নেই, শুধু বৃষ্টির শব্দের মধ্যে একটি নিঃশব্দ আলাপের জন্ম হল। 
সেই প্রথম দেখা কোনও রূপকথা ছিল না। কিন্তু অদ্ভুত সজীবতা ছিল। বৃষ্টির জল আর পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ মিশে গিয়ে সেই মুহূর্তটি যেন স্থির হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পর বাস এলে ছেলেটি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। রেখে গেল শুধু এক পশলা ভালোলাগা।
মৌয়ের মনে হল, সব প্রথম দেখায় কথা হতে হয় না, কিছু ছোঁয়া থেকে যায় মনে—যাকে ভুলে যাওয়া যায় না কোনও দিন। প্রথম দেখার মুহূর্তগুলো বোধহয় সব সময় একটু অন্যরকমই হয়। ঠিক যেন ডায়েরির পাতায় হঠাৎ পড়ে যাওয়া এক ফোঁটা কফির দাগ। মোছা যায় না, আবার ফেলতেও ইচ্ছে করে না।


 

খাঁচাবন্দি বসন্তের কিস্তি

 উৎস চক্রবর্তী

​সকাল থেকেই ল্যাপটপের নীল আলোয় বসন্তের বিজ্ঞাপনগুলো পপ-আপ হয়ে ভেসে উঠছে। ‘স্প্রিং সেল’, ‘নিউ কালেকশন’—বিশ্বায়নের এই যুগে ঋতু এখন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে নেমে এসে কর্পোরেট মেইলের ইনবক্সে ভিড় জমায়। জানলার ওপাশে আকাশটা ধোঁয়াটে ধূসর। বহুতল আবাসনগুলোর ভিড়ে সূর্যোদয় দেখা এক বিলাসিতা, আর কোকিলের ডাক তো এখন কেবল কলটোন বা নোটিফিকেশন সাউন্ডে সীমাবদ্ধ।

​নীলিমা বারান্দায় রাখা আধমরা মানিপ্ল্যান্টটার গায়ে একটু জল ছিটিয়ে দিল। এই কংক্রিটের জঙ্গলে এটাই ওর একচিলতে অরণ্য। বাইরে রাস্তার মোড়ে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে, যেখানে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে রাস্তার ধারের শেষ পলাশ গাছটা। আধুনিক সমাজ-ব্যবস্থার যাতাকলে মানুষের আবেগগুলো এখন বড্ড হিসেবি। প্রেম মানে ডেটিং অ্যাপের সোয়াইপ, আর আড্ডা মানে হোয়াটসঅ্যাপের টেক্সট।

​হঠাৎ এক ঝলক তপ্ত হাওয়া নীলিমার অবিন্যস্ত চুলে বিলি কেটে গেল। সেই হাওয়ায় কোনো বুনো ঘ্রাণ নেই, আছে পোড়া মবিল আর এসির গরম নিঃশ্বাস। তবু কেন জানি মনটা হু হু করে উঠল। পদাতিক কবির সেই 'ফুল ফুটুক না ফুটুক'- এর উপলব্ধির মতো ওর মনে হলো, বসন্ত আসলে বাইরে নয়, থাকে মানুষের ভেতরে। ধুলোমাখা এই শহরে একমুঠো আকাশ দেখার নামই হয়তো এখনকার বসন্ত।

​অনলাইন অর্ডারের পার্সেলটা হাতে নিতে নিতে নীলিমা ভাবল, পৃথিবী হয়তো অনেক বদলে গেছে, কিন্তু ওই ছেঁড়া জামা পরা কিশোরটা যখন রাস্তার ধারের ডাস্টবিন থেকে একটা ঝরঝরে হলুদ ফুল কুড়িয়ে পরম যত্নে নিজের কানে গোঁজে, তখন বোঝা যায়—কংক্রিটের হাহাকার ছাপিয়ে বসন্ত আজও মানুষের জিজীবিষায় বেঁচে আছে।


 

কনটেন্ট
শ্রুতি দত্ত রায়

বছর দশেকের একটা ছেলে। স্টেশনের মেইন গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পরণে আধময়লা টিশার্ট ও একটি ধুলোমাখা বারমুডা। হাতে লাল, কমলা, সবুজ রঙের লজেন্সের বয়াম। কাঁধ থেকে আড়াআড়িভাবে নেমে এসেছে একটা তাপ্পিমারা ভারী ঝোলা। ছেলেটির চোখে ঈগলের দৃষ্টি। একটু আগেই স্টেশনে থেমেছে ছয়টার লোকাল। কোল্ড ড্রিংকসের বোতলের ছিপি খুললে যেমন হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে বুদবুদ, তেমনি কামরাগুলো থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে অগুন্তি নিত্যযাত্রী। ছুটছে মূল ফটকের দিকে। তাদের মাঝেই একজনকে ছেলেটার দরকার। 

      প্রায় দেড়মাস আগের একটি ঘটনা। কামরায় ঘুরে ঘুরে ছেলেটা যখন লজেন্স বিক্রি করছিল, লোকটা ওকে দাঁড় করিয়ে শুনতে চেয়েছিল ওর এত ছোট বয়সের জীবনযুদ্ধের কথা। ভিডিও করেছিল সেসব। অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

    ওই তো লোকটা। চেক শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরে ভিড়ের স্রোতে ভেসে আসছে। ছেলেটা স্রোতের প্রতিকূলে গা ভাসালো।
" কাকু আমাকে চিনতে পারছো? ওই যে তুমি একদিন আমার ভিডিও তুললে,,,," ছেলেটা বড়দের পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোল। 

"ফটো তোলার সময় তুমি যে বলেছিলে লোকে নাকি আমাকে এখন থেকে অনেক হেল্প করবে,,,, আর,,, কখনো বিপদে পড়লে সবচেয়ে আগে যেন আমি তোমাকে জানাই? জানো, আমার মায়ের খুব অসুখ। কাজে যেতে পারে না। চারদিন হলো ঘরে টাকা নেই। বোনটা খালি খিদেতে কাঁদে। তোমার ভিডিও দেখে প্রথমে কয়দিন লোকে বেশি করে লজেন্স কিনছিল। কিন্তু এখন আর কেনে না। আমাকে একটা কাজ দেবে কাকু?"
"কেন রে? তোর ভিডিও তো কবেই ভাইরাল , একদম সুপারহিট। এত করলাম তোর জন্য, তবু কোনো লাভ হলো না? দেখ, যাতায়াতের পথে তোর মত এমন কত কনটেন্টের ভিডিও তুলি। সবাইকে কি আমার একার পক্ষে হেল্প করা সম্ভব? আচ্ছা আমি নাহয় তোর স্টোরিটা একটু অন্যভাবে আবার আপলোড করে দেব, বুঝলি?" কপালের ঘামের সাথে জড়িয়ে থাকা অস্বস্তিটুকু রুমালে একবার মুছে নিল লোকটা। তারপর তড়িঘড়ি মিলিয়ে গেল জনসমুদ্রে। পেছনে পড়ে রইল ওর মলিন কন্টেন্ট। হাতে তার স্বচ্ছ বয়াম। সেখানে বন্দি সবুজ, কমলা, লাল রঙের স্বপ্নেরা। বিক্রির অপেক্ষায়।


 

আকাশের প্রতিফলন

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 

শহরটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক—বাস থামে, দোকান খোলে, বিকেলে চায়ের দোকানে ভিড় জমে। তবু বাতাসে এক ধরনের ক্লান্তি লেগে থাকে। প্রতিদিন একই কথার পুনরাবৃত্তি—সময়ের দোষ, দেশের দোষ, অন্যের দোষ। কথাগুলো বদলায় না, দিনগুলো বদলায় না।
শহরের মাঝখানে একটি পুরোনো পুকুর। কেউ বলে একসময় সেখানে শাপলা ফুটত। এখন পলিথিনের স্তর, পচা গন্ধ, নিস্তেজ জল।
এক বিকেলে অর্ণব দেখল—একজন বৃদ্ধ নীরবে জলে নেমে আবর্জনা তুলছেন। লোকজন দাঁড়িয়ে হাসল—
“এতে কী হবে?”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
পরদিনও তিনি এলেন। তার পরদিনও।
কয়েক সপ্তাহ পরে পুকুরের এক কোণে আকাশের ফিকে নীল দেখা গেল।
এক রবিবার অর্ণব জলে নামল। কাদা পায়ে আটকে গেল, গন্ধে শ্বাস থমকে গেল। তবু সে একটি প্লাস্টিক তুলল, তারপর আরেকটি। বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“জল পরিষ্কার হলে মানুষ আকাশ দেখতে শেখে।”
ধীরে ধীরে কয়েকজন শিশু নেমে পড়ল। তারপর আরও মানুষ। দুর্গন্ধ কমল, জলে হালকা ঢেউ দেখা গেল। এক ভোরে একটি সাদা বক এসে দাঁড়াল পাড়ে।
মানুষ থেমে জলের দিকে তাকাতে শিখল।
একদিন বৃদ্ধ আর এলেন না। পুকুরপাড়ে একটি ভাঁজ করা কাগজ পড়ে ছিল—
“যেখানে মানুষ তুচ্ছতায় ডুবে থাকে, সেখানে জল পচে যায়। যেখানে মানুষ হাত ভেজায়, সেখানে আকাশ ফিরে আসে।”
বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে পুকুর ভরে উঠল। শিশুরা কাগজের নৌকা ভাসাল। অর্ণব জলে আকাশের প্রতিফলন দেখে বুঝল—পরিবর্তন আসলে জলের নয়, মানুষের চোখের।


 

সন্তান 

রীনা মজুমদার 

সাত বছর বয়সে লক্ষ্মী মাকে হারিয়েছে।
দুমাস পরে বাবা লক্ষ্মীকে মামা মামীর কাছে রেখে চলে যায়। বাবা তার নতুন সংসার পেতে নেয়। 
লক্ষ্মীর খুব মায়ের জন্য মন কাঁদে। মামা-মামীর দশ বছরের সংসারে বড়ই নিঃসঙ্গ তাই খুব খারাপ ব্যবহার মামী করে না। লক্ষ্মীও মামীর সঙ্গে কাজে হাত লাগায়। সরল লক্ষ্মীর জীবনটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। মায়ের স্বপ্ন ছিল অনেক পড়াশোনা করাবে। চেয়ে থাকে ছোট্ট জীবন আকাশের দিকে। বাবার আদর সব সব যেন কেড়ে নিল তার কাছ থেকে ভাবে নিস্পাপ ছোট্ট মনে।
একদিন রাতে লক্ষ্মী খাবার খেয়ে কলতলায় বাসন ধুতে ধুতে দেখে অন্ধকারে একটি বেড়ালের মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে। মা খুব বেড়াল ভাল বাসত।
তিনদিন ধরে মামী রাতে খাওয়ার সময় খেয়াল করে, লক্ষ্মী বাটির দুধটুকু লুকিয়ে কলতলায় চলে যায়। 
একদিন লক্ষ্মী বেড়ালকে দুধ খাইয়ে পেছন ফিরতেই দেখে মামী দাঁড়িয়ে আছে। মামীর ভয়ে লক্ষ্মী বলে ওঠে মা বলত ওরা মা ষষ্ঠীর বাহন। এই ঠাকুরের দয়াতেই আমি লক্ষ্মী হয়ে মায়ের কোলে এসেছি।
পরদিন রাতে খেতে বসে লক্ষ্মী দেখে দুটো বাটিতে দুধ। 'এক বাটি তোর জন্য, আরেকটি যা দিয়ে আয়' 
মামীমা দু হাত জোড়া করে কপালে রাখে। আর বিড়বিড় করে বলে, তুই আমার কোলের লক্ষী। 


 

একটা শিমুল গাছ এবং
   তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য

শিমুল ফুলে ফুলে ধূসর সবুজ ঘাস বিছানো মাঠটা রাঙা হয়ে উঠেছে। সেই রাঙা সবুজ মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল গাছটা একা।আর তার নীচে বসে একটা একা মেয়ে। চোখ তার উদাসীন,মুখ তার বিবর্ণ। বসন্ত বিকেলের পরে আসা রোদ্দুর তার বিষাদময় মুহূর্তের চিত্র এঁকে দিচ্ছে।
‘একত্রিশ বছরের মেয়ে বিয়ে করার নাম নেই, আমরা মরলে তোকে দেখবে কে? কার আপেক্ষায় জীবনটা নষ্ট করছিস ? কার?’ কথা গুলো বিরহ গীতের মতো বেজে চলেছে একলা মেয়েটার কানের কাছে।

বছর সাতেক আগে। এমনি এক বসন্তের বিকেল। এই মাঠ,এই একলা শিমুল গাছ। মাঠ জুড়ে ফুল ছিটিয়ে রেখেছে গাছটা আর গাছটার নীচে বসে এক প্রেমিক যুগল। ছেলেটার কাঁধে মেয়েটা মাথা রেখে বলে উঠেছিল,‘তুমি আমায় ভুলে যাবে না তো?ফিরে আসবে তো? আমি কিন্তু অপেক্ষা করে থাকবো।’ ছেলেটা আশ্বাসের সুরে বলেছিল,‘দেখিস আমি ঠিক ফিরে আসবো, আসবোই।’

ছেলেটা কথা রেখে ফিরেই আসছিল, কিন্তু আসার পথে বাসটা যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদের অন্ধকার তলিয়ে যাবে, সে কী আর সে কথা জানতো। তারপর কতো বর্ষা আসে, বসন্ত আসে, আবার চলেও যায়।আবহমান চক্র ঘুরে চলে। 

শিমুল গাছটা সেই একাই দাঁড়িয়ে আছে। আর আছে একটা মেয়ে। যে মেয়ে সেই বসন্ত দিনটার স্মৃতি আঁকড়ে বসন্তের পর বসন্ত কাটিয়ে দিচ্ছে। যে মেয়ে বিকেল করে সেই শিমুল গাছটার তলে এসে বসে একা।মুখ তার উদাসীন,চোখ তার অপেক্ষারত, বিকেলের পরে আসা রোদ্দুর তার বিষাদময় মুহূর্তের চিত্র এঁকে চলেছে চিত্রশিল্পীর মতো করে।


 

 শিকার
 সোমা দাশ 

উফফ্, ডোপামিন ডোপামিন! প্রতি রাতে অজয়ের ফেভারিট টাইম পাস ফেসবুক-ইনস্টায় সুন্দরী বুদ্ধিমতী মেয়েদের প্রোফাইল দেখা, তাদের সাথে আলাপ জমানো। 

এক মাস আগে খুঁজতে খুঁজতে এই প্রোফাইলটা পেয়েছিল সে। খুব ক্রিয়েটিভ মেয়েটা। চোখটা মায়াবী। একটু বিষন্ন আর অনেকটা রোমান্টিক। দেখা গেল, সেও কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট, একই ইউনিভার্সিটি র। ব্যস, চটপট ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। একসেপটেডও হয়ে গেল। মজার কথা, মেয়েটার নামও যেন অজয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়েই জয়শ্রী। অদ্ভুত না? খরস্রোতা নদীর মত দ্রুত এগোতে থাকে তাদের আগলভাঙা গল্পকথা। মাঝে মাঝে সেন্স অফ হিউমারের নুড়ি-পাথর, টুকরো খুনসুটি ঝগড়া। মনে অদ্ভুত উচাটন। আর পারছে না অজয় এই টান কাটাতে। আজকাল সে আর নিত্য নতুন প্রোফাইলের সন্ধান করে না। জয়শ্রী কে একটা গান ডেডিকেট করে পাঠিয়েছে, ‘ভালোবাসার মরসুম’। সে না বুঝলে এবার অজয় সরাসরি বলবে মনের কথা, বলবেই।

এদিকে পূর্ণিমা রাতে ছাদে জয়শ্রী বসে আছে। পরনে গাঢ় নীল শাড়ি। চুল অল্প অল্প উড়ছে হাওয়ায়। চাঁদের ঠিক নিচে ডানদিক ঘেঁষে আজ একটা অত্যুজ্জ্বল লালচে-বেগুনি জ্যোতিষ্ক। তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জয়শ্রীর চোখ জ্বলে উঠল। সেই চোখে স্পষ্ট প্রতিবিম্বিত অজয়ের ছায়া, তার কর্মকান্ড। আর তার মনের ভাবনা গুলোও জয়শ্রী ডিকোড করে ফেলছে।

এক মিনিট, তা তো নয়! আসলে উল্টো! জয়শ্রী যেটা ভাবাতে চাইছে অজয় ঠিক সেটাই ভাবছে আর করছে! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অজয় প্রপোজ করবে, জানাবে সে তার শ্রীকে 'ভালোবেসে ফেলেছে, ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে'। শ্রী প্রথমে রিফিউজ করবে তারপর অজয়ের অস্থিরতা তুঙ্গে উঠিয়ে একসেপ্ট করবে। সেই সর্বগ্রাসী টান অজয়কে টেনে আনবে এই বাড়িতে। আর তারপর…

জয়শ্রীর চোখে লাল-বেগুনি আলো খেলা করে। ঠোঁটের কোণে হাসি চওড়া হতে হতে অন্ধকারেও তার ঝকমকে সাদা দাঁত স্পষ্ট দেখা যায়।


 

দোতারা

স্বপন সিংহ


 সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রমাকান্তর মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় দোতারার সুরে। প্রতিরাতেই সেই একই শব্দ। ওঝা–গুণিনেও কাজ হয়নি।
 
বিষয়টি ক্রমে ভয় আর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 
একদিন গভীর রাতে একমাত্র পুত্র সুরজিতের শোবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রমাকান্ত স্পষ্ট শুনতে পান—দোতারার সুর আসছে ছেলের ঘর থেকেই। ঘরে ঢুকে দেখেন, লেপের নীচে শুয়ে তন্দ্রাঘোরে ডুবে থাকা ছেলে ভাটিয়ালি আর ভাওয়াইয়ার সুরের মূর্ছনায় বিভোর হয়ে দোতারা বাজাচ্ছে।
ঘুম ভাঙিয়ে ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর আর ধমক দেওয়া হলো।
শুরু হলো দুই বিপরীত মানসিকতার মানুষের লড়াই।
সময় গড়াল।
আজ রমাকান্ত শয্যাশায়ী। অসহ্য রোগযন্ত্রণায় তাঁর চোখে আর ঘুম নেই। সেই বিভেদও আর নেই। প্রতিরাতে ছেলেকে সামনে বসিয়ে অনুনয়ের সুরে বলেন—
“আমার চোখ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত দোতারা বাজিয়ে যাবে।”
এক রাতে ছেলের দোতারায় ভেসে ওঠে সুরেলা ভাওয়াইয়া গানের সুর—“ ও মোর চাঁদ ওরে ও মোর সোনা, ও মোক ছাড়িয়া না যান…”
দোতারার সুর শুনতে শুনতেই রমাকান্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাবার মৃত্যুর পর থেকে প্রতি রাতে বাবার সমাধির সামনে বসে সুরজিত দোতারায় গান গায়। 
আজ সুরজিত সুরকে জয় করেছে। নাম ছড়িয়েছে চারদিকে । দোতারার মাধুরীতে মোহিত মানুষ এখনও রাতের শেষে তার কন্ঠের অপেক্ষায় থাকে । 


 

নষ্ট মানুষ

অমলকৃষ্ণ রায়

মানুষ কি কখনও নষ্ট হতে পারে? পারে। কী করে? ভিন্ন জাতির স্পর্শজনিত কারণে। সেটা কী করে হল? ভিন্ন জাতির সেনাবাহিনী পাড়ায় তাঁবু গেড়েছিল, পুকুরের জল খেয়েছিল। গোলা থেকে খাদ্যশষ্য লুটপাট পর্যন্ত করেছিল। তারা তো এখন আর নেই। কামতাপুর রাজ্য আক্রমণ করে কবেই অন্যত্র চলে গেছে। চলে গেলেও সমাজপতির কাছে তারা এখন পতিত, যাকে বলে নষ্ট। সোজা কথায় ধর্মহীন। এখন তাদের কী করা উচিত? কী করলে তারা নিজের ধর্মে আবার ফিরে আসতে পারবে? ফেরা তো কোনওভাবেই সম্ভব নয়। তবে একটা কাজ করতেই পারে। কী সেটা? আরব দেশ থেকে কোনও পীরবাবা ধর্মপ্রচার করতে এতদঞ্চলে এলে তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তাতে অন্তত ধর্মহীন কলঙ্কটা ঘুচে যাবে। ‘নষ্ট’ নামটা তখন এক অলংকাররূপে পৃথক জাতি সত্তার পরিচায়ক হয়ে দাঁড়াবে। পদবির মতো বংশ পরম্পরায় সেটিকে বয়ে বেড়াতে পারবে। কিন্তু তারা তো এককালে আমাদেরই মানুষ ছিল। একই সামাজিক অনুষ্ঠানে একই পংক্তিতে বসে অন্ন গ্রহণ করেছি। একই আসরে ঈশ্বরের নামগান করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছি। একটা সামান্য কারণে তারা অচ্ছুৎ হয়ে গেল! কী করবে বলো। এটাই সমাজিক বিধি। জানি এতে তাদের কোনও দোষ নেই। সেনাদের সামরিক শক্তি তাদের উপর স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়েছিল। ঠিক একইভাবে একটা হাতির বাচ্চা যখন লোকলয়ে হারিয়ে যায়, তখনও তো তার কোনও দোষ থাকে না। শুধু একটু অন্যমনস্কতার কারণে দলছুট হয়ে যায়। তারপর তাকে লোকালয় থেকে জঙ্গলে ফেরালেও তার মা কি তাকে সন্তানরূপে গ্রহণ করে! এরইমধ্যে স্বপ্নাদিষ্ট মানসপটে দৃশ্যান্তর ঘটলো। স্পষ্ট দেখলাম, আরব দেশ থেকে জনৈক পীর বাবা পতিত গাঁয়ে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করতে এসেছেন। ধর্মহীনেরা ‘নস্যশেখ’ নামে তার পদতলে আশ্রয় পেয়ে সমস্বরে আল্লাহর ‘জিকির’ (নামজপ) উচ্চারণ করছেন।


 

পরিপূরক

শ্রাবণী সেনগুপ্ত 

- কালু,বল পড়েছে ঝোপে, দৌড়ে যা....

কথাটা কানে যেতেই সেদিকে ছুটে যায় ছোটখাটো ছেলেটি। ঝোপঝাড়ের খোঁচায় হাত পা ছড়ে গেলেও খড়ি ওঠা চামড়া আমল দেয় না। বলটা হাতে পেয়ে তাতে বারকয়েক হাত বোলায় সে, ভাবে কবে যে এমন একটা আস্ত বলের মালিক হবে। হাঁক শোনা যায় - "এ্যাই ছোঁড়া,এতক্ষণ কি করছিস? শিগগির বলটা দে।"

বলটায় একটা চুমু খেয়ে দৌড়ে এসে দাদাদের বোলিংয়ের অনুকরণে একহাত ঘুরিয়ে বলটা তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয় সে। ক্যাচ লুফতে না পারা পাড়ার দাদারা গালি দেয়। দাদাদের হারিয়ে দেবার আনন্দে ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কিশোর আড়াই পাক নেচে আবার বসে পড়ে যথাস্থানে।

               শীতের দুপুরে মাঠের রোদে একটু যতটা সম্ভব গা সেঁকে নেয় কালু, সেই ওম্ ধরে রেখে কাটাতে হয় সারা রাত ঐ ইঁট বার করা স্যাঁতস্যাঁতে পোড়ো বাড়িতে। শীতের রাতে তো সম্বল বলতে শম্ভু মুদির দেওয়া ছালা, আর জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া একটা কম্বল। একসময় স্ট্রিট লাইট জ্বলে ওঠে, খেলা শেষ হয়, খেলুড়েরা সব যে যার বাড়িতে চলে যায়। এই সময়টা বড্ড মন কেমন করে তার, খুব মনে পড়ে আগের কথা। সর্বনাশী নদীটার পাড় না ভাঙলে বাপ মা সে আর তার ঠাগমা দিব্যি ছিল তাদের এক চিলতে মাটির ঘরে। রাগ হয় তার ওপর, যে সেই ঝড় জলের রাতের অন্ধকারে তাকে কোলে করে এক অচেনা নৌকাতে তুলে দিয়েছিল।  তা না হলেতো সেও এতদিনে তার মা বাবা ঠাগমার সঙ্গে -
সেই নৌকা তাকে নামিয়ে দিল এই অচেনা গঞ্জে। বছর দুয়েক এখানেই কেটে গেল ফাই ফরমাশ খেটে।
সঙ্গী বলতে একটা নেড়ি। কালু আদর করে নেড়ির নামও রেখেছে নিজের নামে। 

  এইবারের শীতটা খুব বেশি পড়েছে।সেদিন রাতে খুব জ্বর এলো কালুর। নির্জলা,অনাহারে পড়ে রইল সে, কেউ খোঁজ করলোনা। দিন দুই পরে মাঝ দুপুরে খেলার সময় পাশের মাঠে আবার শোরগোল, "ঐ যাঃ, বলটা আবার ঝোপে পড়ল,কালু ,কালু কোথায় গেলি রে!" তাদের সম্মিলিত চিৎকারে পোড়ো বাড়িটা থেকে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে এলো চারপেয়ে কালু। এক দৌড়ে ঝোপে ঢুকে মুখে করে বল এনে দিল সে।


 

ফেরা

মনোরঞ্জন ঘোষাল


অয়ন যখন বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। দশ বছর পর এই চেনা কড়াটা নাড়তে গিয়ে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। বড় চাকরি, বিদেশের ব্যস্ততা আর নাগরিক কোলাহলে সে ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধমাখা গ্রামটার কথা।

দরজা খুললেন তার মা। সাদা চুলে একটু বেশি রূপালি আভা ধরেছে, চোখের কোণে বলিরেখাগুলো আরও গভীর। অয়নকে দেখেই মা থমকে দাঁড়ালেন। বিস্ময় কাটিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আসলি শেষমেশ?"

অয়ন ভেবেছিল মা হয়তো অভিমানে ফেটে পড়বেন, জানতে চাইবেন কেন সে এতগুলো বছর একটা ফোন পর্যন্ত ঠিকমতো করেনি। কিন্তু মা কেবল তার হাতটা ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন, "তোর প্রিয় নারকেল নাড়ু করে রেখেছি। আজ সকালেই মনে হচ্ছিল তুই আসবি।"

অয়ন অবাক হয়ে দেখল, ঘরের কোণে তার সেই ছোটবেলার ভাঙা সাইকেলটা আজও রাখা। পড়ার টেবিলের ধুলো ঝেড়ে মা সব বইগুলো গুছিয়ে রেখেছেন। যেন এই দশটা বছর সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল তার প্রতীক্ষায়।

রাতের নিস্তব্ধতায় অয়ন যখন পুরনো বিছানায় গা এলিয়ে দিল, তার মনে হলো—শহরের ওই কাঁচঘেরা অট্টালিকা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তিটা এখানেই জমা ছিল। সাফল্যের ইঁদুর দৌড়ে সে আসলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। আজ মায়ের হাতের সামান্য ডাল-ভাতের স্বাদে সে খুঁজে পেল সেই হারানো অস্তিত্বকে।

বিদেশের ফ্লাইটের টিকিটটা মনে মনে বাতিল করে অয়ন জানলার বাইরে তাকাল। জোনাকি জ্বলছে। আজ অনেক বছর পর সে কোনো দুঃস্বপ্ন ছাড়া শান্তিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।


 

অস্তিত্ব 
প্রতিভা পাল 

           মিতুলের ছোট একটা চারকোণা ফ্ল্যাটে আজ রিমির গৃহপ্রবেশ। 'অভিধান' অনাথ আশ্রম থেকে সে আজ নিজের বাড়িতে আসবে। মায়ের কাছে।

            স্কুলের সেই দিনটির কথা মিতুলের আজও মনে আছে। ক্লাস এইট। বন্ধুদের মুখে সে প্রথম জেনেছিল তার বাবা মা নিজের না। সে দত্তক নেওয়া সন্তান। বাড়ি ফিরে অসহায় রাগ, কান্না, অভিযোগ আরও কত কিছু। সেদিন মা-বাবার কোনও কথাই তাকে শান্ত করতে পারেনি। বেশ কিছুদিন স্কুল তো দূর স্নান, খাওয়া, ঘুমহীন। ক্লান্ত চেহারার মেয়েটি কী যেন একটি ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নেওয়ার প্রবল চেষ্টা করেও বারবার হেরে যাচ্ছিল। একদিন মা তাকে অনেক বোঝালেন- 'বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো সত্যি আমাদের কাছে। জন্ম, অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না। কাজ আমাদের পরিচয়।' কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল সে। তখন তার ভিতরে আমূল একটি পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। সেদিনের পর থেকে এই বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করেনি মিতুল। আর কখনও। বরং মায়ের কথা মেনে সে নিজেকে গড়ে তুলেছে একজন ভালো মানুষ হিসেবে। 

           শহরের নামকরা একটি কলেজের বোটানি-র প্রফেসর মিস মিতালী বসু আজ স্বয়ং সম্পূর্ণ। তিন বছরের রিলেশনে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। করোনার সময় বাবা মা চলে গেলেন। বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাটে শিফট করেছে সে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- তার মতো কোনও অনাথ শিশুকে তার নিজের পরিচয়ে বাঁচতে শেখাবে। মায়ের নামে সে নাম রেখেছে সেই ছোট্ট মেয়েটির।
     
             ছোট্ট রিমিকে কোলে নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে ঢুকে বাবা মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়াল মিতুল। তখন তার মুখে একরাশ তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল।


 

সেরা

শুভেন্দু নন্দী 

বঙ্কু কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলো বইমেলায়। তার মায়ের অনুরোধে তাদের সঙ্গী ছিলেন অমলকাকু। পাড়ার ছোট -বড় সকলের অমলকাকু। হাজারের বেশী প্রকাশনী সংস্থার বুকষ্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে অবশেষে দু -তিনটে বই কিনেছিল বঙ্কু। মা -বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থের সুরাহা করেছিল তার সখের বইগুলো কিনতে। খেলার কুইজ, কার্টুন আর স্বপনকুমারের গোয়েন্দা বই। শহর ঘেঁষা বর্ধিষ্ণু গ্রামে বঙ্কুর বাস। গ্রামের বেশীর ভাগই কৃষিজীবী। পড়াশোনায় তার তেমন মনোযোগ নেই। কোনও রকমে ক্লাস উৎরে যাচ্ছে। স্কুলে খেলাধুলায় তার ভালো পারফরমেন্স। শিক্ষকেরা তাকে ভালোবাসেন। রাজ্যস্তরে প্রতিযোগিতার জন্য বেশ কিছুদিন পাড়ার মাঠে অনুশীলন করছে বঙ্কু। বড়সড় রেসের "হিট" হবে। দশজন অংশ গ্রহণ করবে তাতে। নেবে মাত্র  একজনকে।

বাবা সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। সকালে চাষবাস। তারপর গ্রাম থেকে দূরে এক মুদিখানার কর্মচারী। মা সংসারের জন্য প্রাণপাত করে যাচ্ছেন। ছেলে মিলখা সিং ও উইনসাইন বোল্টের পরম ভক্ত। পড়ার সময় ওঁদের ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাবা-মার তাতে ঘোর অপছন্দ। আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। মাঠে লোক জড়ো হয়েছে।

বঙ্কু দৌঁড়চ্ছে- সঙ্গে আরও নয় জন। বঙ্কুর বাবা দুপুরবেলায় ফিরছিলেন কাজের শেষে মাঠের পাশ দিয়ে। চিৎকার শুনে তাঁর মনে হোলো "তবে কি আজ বঙ্কুর খেলা?" তার জন্যই তার দিবা রাত্রি অনুশীলন? মাঠে ঢুকেই বাবা ধাবমান বঙ্কুকে দেখতে পেলেন। " বাঃ! ছেলেটাতো বেশ জোরে দৌঁড়োচ্ছে " কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌঁছুতে পারেনি। তার স্থান দ্বিতীয়তে। পরাজয়ের গ্লানিতে বঙ্কুর চোখে জল।

-আরে! কাঁদছিস কেন? আমার চোখে তুই-ই সেরা! ঐ দেখ, সবাই দাঁড়িয়ে তোকে বাহবা দিচ্ছে। এ পারাজয় নয় - তোর জয়ের খিদে আরও বাড়িয়ে দেবেরে এতে আগামীতে। দুঃখ
এটাই- এতদিনে তোকে আমরা গুরুত্ব দিইনি " বাবা বললেন।
 বঙ্কুর চোখে আবার জল।


 

স্মৃতিকনা

​কুণাল গোপ


 রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটের সামনে আজ এক বিশাল ফেস্টুন –
“৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী সমাবেশ”
দীর্ঘদিন পর স্কুলটা আজ যেন নিজের যৌবনে ফিরেছে।
বাঁশি বাজছে, ঘুড়ি উড়ছে, ছেলেমেয়েরা ফুল দিচ্ছে প্রাক্তনদের।
আর হুইলচেয়ারে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছেন চারজন প্রবীণ বন্ধু – সুভাষদা, কালী, মোহিনীদা আর বিশ্বজিৎ কাকা।
সবার চুলে রূপোর ছোঁয়া, হাঁটার গতি কম, কিন্তু চোখে ছেলেবেলার দীপ্তি।
পুরনো ক্লাসরুমে ঢুকে সুভাষদা হেসে বললেন –
“এই বেঞ্চেই তো মোহিনী প্রেমপত্র পেয়েছিল… ভুল করে মাস্টারমশাইয়ের বইয়ের ভেতর ঢুকে গেছিল!”
 “আর কালী কেমন নাটকে হেমন্ত মুখার্জির গলা নকল করে নায়িকার মন জিতেছিল… অথচ পরে শুনি ওরই বিয়ে হয় পাশের গ্রামের এক পাত্রীর সঙ্গে!” – বলে হো হো করে হাসলেন বিশ্বজিৎ।
মোহিনী মুচকি হেসে বললেন,
“তখন তো প্রেম ছিল অক্ষরজ্ঞান! চিঠি মানেই কবিতা।”
হঠাৎই কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ।
তারপর সুভাষদা বের করলেন একটা পুরনো, হলদেটে ছবি।
১৯৭০ সালের স্কুল ফোটো।
ছবির কোণে হাত বুলিয়ে ,
“জানিস? এদের অনেকেই আর নেই… কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ওরা এই মাঠেই দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের পাশেই…”


 

মধু নাম

অর্পিতা গুহ মজুমদার

করোনা কালের শেষ দিকে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর শৈশবকালের বন্ধু সুমনকে খুঁজে পেয়েছে ঝিনুক।  সুমনই প্রথম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়।প্রথমে ঝিনুক ঠিক চিনতে না পারলেও পারসোনাল ডিটেইলস এ গিয়ে আশির দশকের সেই ছোট্ট মফস্বল শহরে প্রাইমারী স্কুলে একসাথে পড়া সুমনকে চিনতে পেরেই তৎক্ষনাৎ অ্যাকসেপ্ট করে। সেও তো কতই না খুঁজেছে সুমনকে কিন্তু টাইটেল দেবের পরিবর্তে দে লিখে সার্চ করতো। উচ্ছ্বসিত সুমন ও ঝিনুকের মধ্যে মেসেঞ্জারে চলে " পুরনো সেই দিনের কথা " এবং প্রায়ই ফোনালাপ। 

                         ঝিনুকের মনে পরে দুজনেই গল্পের বইয়ের পোকা ছিল, বই আদান -প্রদান চলতেই থাকত।তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভ সুমন একবার  'অরণ্যদেব ' কমিকসের বইটা ফেরত দেবার সময়  বলেছিল, " জানিস, তোকে না আমার একদম ডায়ানার মতো লাগে।" খুব লজ্জা পেয়ে সুমনের হাত থেকে বই নিয়েই ঘরে দে ছুট। বলা হলো না ডাকাবুকো সুমনকে "তোকেও না আমার অনেক সময় অরণ্যদেব মনে হয়।" এরপর ক্লাস সিক্সে উঠতেই সুমনের ব্যাংক চাকুরে বাবার বদলি হয়ে অন্য এক দূরের শহরে পোস্টিং এবং  দীর্ঘ এত বছর  সুমনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। 

                  সেদিন ফোনে এটা সেটা কথার মাঝে ঝিনুক বলে, "সুমন গতকাল তুই মেয়ের সাথে যে ছবিটা পোস্ট করেছিস খুব সুন্দর। তোর মেয়ের নাম কী রেখেছিস রে?" হঠাৎ যেন থমকে যায় সুমন। কিছু মুহূর্তের নীরবতা ভেঙ্গে সুমন উত্তর দেয়, " ওর নাম ঝিনুক।" 

                   ফোনের এ প্রান্তেও মুহূর্ত থমকে যায়। দীর্ঘকালের অবরুদ্ধ কোন  দখিনা বাতাস যেন ঢেউয়ের অনুরণন তোলে ঝিনুকের বুকের মধ্যে।নিজেকে সামলে ঝিনুক বলে, "আজ রাখি।"


 

তোমার সাথে আমৃত্যু দেখা না হোক

মহঃ সানোয়ার 


ইকরা চলে গেছে আকাশকে ছেড়ে।
চলে যাওয়ার সময় পেছনে তাকায়নি—যেন তাকালেই আকাশ ভেঙে পড়বে। আকাশও ডাকেনি, শুধু জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, নিঃশব্দে। যে শহরে তারা একসাথে হেঁটেছিল, সেই শহর আজও আছে, কিন্তু ইকরার ছায়া নেই।

শেষ কথাটা ছিল—
“তোমার সাথে আমৃত্যু দেখা না হোক।”
কথাটা অভিশাপ ছিল না, ছিল বাঁচার একটা চেষ্টা। কারণ দেখা হলে স্মৃতিরা জেগে উঠত, আর স্মৃতি মানেই আবার ভেঙে পড়া।

আকাশ জানে, ইকরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছোট ছোট জিনিসগুলো যায়নি। এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে গেলে যে অভিমান জমে, একজোড়া চটি দরজার পাশে পড়ে থাকলে যে অপেক্ষা জন্মায়—সবই রয়ে গেছে। রাতে ঘুম আসে না, কারণ স্বপ্নে ইকরা আসে। স্বপ্নে সে হাসে, ঠিক আগের মতো। তখন আকাশের বুকটা ব্যথায় ভরে যায়।

দিনের আলোয় আকাশ নিজেকে বোঝায়—দেখা না হওয়াই ভালো। না দেখাই ভালো।
কারণ কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না, শুধু দূরে সরে যায়। আর দূরত্বটাই তখন সবচেয়ে নিরাপদ ভালোবাসা হয়ে ওঠে।

তবু, কোনো কোনো সন্ধ্যায় আকাশ আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে—
“দেখা না হোক, ইকরা… কিন্তু ভালো থেকো।”


 

হাসিকথা
সোমনাথ মুখার্জী 

সুন্দর হাসির মর্যাদাটাই আলাদা।হাসছিল তনিমা।হাসিতে মিশে আছে অন্তরের সাবলীল অমলিন সৌন্দর্য্য। অথচ, হাসির তোড়ে আক্রান্ত তরুণ দাস মর্ম বোঝার চেষ্টায় ক্লান্ত। তবু সে দুঃসাধ্য সাধনার পথে। কতদিন,কত রকমের, কত ধরণের হাসির ছটায় সংসার ভরিয়ে রেখেছে তনিমা। মনের খাতায় লিখে নিয়েছে তরুণ সেই সব হাসির টুকরো আবেগ। রবিবারের আলোর সকাল। সেই আলোকিত আলোয় আর হাসির নির্মল প্রকাশে তরুণ বিবশ। বেহালার শীলপাড়া থেকে বাজার এনেছে মনের মতন। লকডাউনের ঘেরাটোপ মাকড়সার জালের মত ফাঁদে ফেলেছিল জীবনকে। সবে তার থেকে নিষ্কৃতি মিলেছে।আসলে, জীবনের প্রশ্নপত্র উত্তর প্রত্যাশী।তরুণ তখন হাঁপিয়ে উঠৈছিল। তখন‌ও, আশ্চর্য রকমের শান্ত আর শিষ্ট দেখেছে তণিমাকে। সঙ্গে ছিল হাসির লহরী। সে মজে ছিল অনায়াসে নিজেতেই।
হাসছিল তনিমা। তরুণ তাকাল।ভাবনার চোখে। বিয়ের পর পর ঘরোয়া আড্ডায় অন্যের চোখে মুখে মুগ্ধতার আবেশ লক্ষ্য করেছে। কিন্তুু, হাসির মূল্যায়ন যে অনেক কঠিন। একদিন ঘন অবস্থায় তনিমা বলেছিল, অনেকে হাসিকে ব্যবহার করে জীবন সংগ্ৰামে জয়ী হতে চায়। তেমন ধরণের হাসি ও হাসে না।
চা বানিয়ে কাপ হাতে ধরিয়ে তনিমা বলল, এত ভেবো না স্বামী মশাই। চা খাও। জানো কষ্টের জীবনে হাসিটাই ভ্যাকসিন। তুমি বড্ড ছেলেমানুষ।