Tuesday, March 3, 2026


 

পরিপূরক

শ্রাবণী সেনগুপ্ত 

- কালু,বল পড়েছে ঝোপে, দৌড়ে যা....

কথাটা কানে যেতেই সেদিকে ছুটে যায় ছোটখাটো ছেলেটি। ঝোপঝাড়ের খোঁচায় হাত পা ছড়ে গেলেও খড়ি ওঠা চামড়া আমল দেয় না। বলটা হাতে পেয়ে তাতে বারকয়েক হাত বোলায় সে, ভাবে কবে যে এমন একটা আস্ত বলের মালিক হবে। হাঁক শোনা যায় - "এ্যাই ছোঁড়া,এতক্ষণ কি করছিস? শিগগির বলটা দে।"

বলটায় একটা চুমু খেয়ে দৌড়ে এসে দাদাদের বোলিংয়ের অনুকরণে একহাত ঘুরিয়ে বলটা তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয় সে। ক্যাচ লুফতে না পারা পাড়ার দাদারা গালি দেয়। দাদাদের হারিয়ে দেবার আনন্দে ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কিশোর আড়াই পাক নেচে আবার বসে পড়ে যথাস্থানে।

               শীতের দুপুরে মাঠের রোদে একটু যতটা সম্ভব গা সেঁকে নেয় কালু, সেই ওম্ ধরে রেখে কাটাতে হয় সারা রাত ঐ ইঁট বার করা স্যাঁতস্যাঁতে পোড়ো বাড়িতে। শীতের রাতে তো সম্বল বলতে শম্ভু মুদির দেওয়া ছালা, আর জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া একটা কম্বল। একসময় স্ট্রিট লাইট জ্বলে ওঠে, খেলা শেষ হয়, খেলুড়েরা সব যে যার বাড়িতে চলে যায়। এই সময়টা বড্ড মন কেমন করে তার, খুব মনে পড়ে আগের কথা। সর্বনাশী নদীটার পাড় না ভাঙলে বাপ মা সে আর তার ঠাগমা দিব্যি ছিল তাদের এক চিলতে মাটির ঘরে। রাগ হয় তার ওপর, যে সেই ঝড় জলের রাতের অন্ধকারে তাকে কোলে করে এক অচেনা নৌকাতে তুলে দিয়েছিল।  তা না হলেতো সেও এতদিনে তার মা বাবা ঠাগমার সঙ্গে -
সেই নৌকা তাকে নামিয়ে দিল এই অচেনা গঞ্জে। বছর দুয়েক এখানেই কেটে গেল ফাই ফরমাশ খেটে।
সঙ্গী বলতে একটা নেড়ি। কালু আদর করে নেড়ির নামও রেখেছে নিজের নামে। 

  এইবারের শীতটা খুব বেশি পড়েছে।সেদিন রাতে খুব জ্বর এলো কালুর। নির্জলা,অনাহারে পড়ে রইল সে, কেউ খোঁজ করলোনা। দিন দুই পরে মাঝ দুপুরে খেলার সময় পাশের মাঠে আবার শোরগোল, "ঐ যাঃ, বলটা আবার ঝোপে পড়ল,কালু ,কালু কোথায় গেলি রে!" তাদের সম্মিলিত চিৎকারে পোড়ো বাড়িটা থেকে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে এলো চারপেয়ে কালু। এক দৌড়ে ঝোপে ঢুকে মুখে করে বল এনে দিল সে।


 

ফেরা

মনোরঞ্জন ঘোষাল


অয়ন যখন বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। দশ বছর পর এই চেনা কড়াটা নাড়তে গিয়ে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। বড় চাকরি, বিদেশের ব্যস্ততা আর নাগরিক কোলাহলে সে ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধমাখা গ্রামটার কথা।

দরজা খুললেন তার মা। সাদা চুলে একটু বেশি রূপালি আভা ধরেছে, চোখের কোণে বলিরেখাগুলো আরও গভীর। অয়নকে দেখেই মা থমকে দাঁড়ালেন। বিস্ময় কাটিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আসলি শেষমেশ?"

অয়ন ভেবেছিল মা হয়তো অভিমানে ফেটে পড়বেন, জানতে চাইবেন কেন সে এতগুলো বছর একটা ফোন পর্যন্ত ঠিকমতো করেনি। কিন্তু মা কেবল তার হাতটা ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন, "তোর প্রিয় নারকেল নাড়ু করে রেখেছি। আজ সকালেই মনে হচ্ছিল তুই আসবি।"

অয়ন অবাক হয়ে দেখল, ঘরের কোণে তার সেই ছোটবেলার ভাঙা সাইকেলটা আজও রাখা। পড়ার টেবিলের ধুলো ঝেড়ে মা সব বইগুলো গুছিয়ে রেখেছেন। যেন এই দশটা বছর সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল তার প্রতীক্ষায়।

রাতের নিস্তব্ধতায় অয়ন যখন পুরনো বিছানায় গা এলিয়ে দিল, তার মনে হলো—শহরের ওই কাঁচঘেরা অট্টালিকা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তিটা এখানেই জমা ছিল। সাফল্যের ইঁদুর দৌড়ে সে আসলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। আজ মায়ের হাতের সামান্য ডাল-ভাতের স্বাদে সে খুঁজে পেল সেই হারানো অস্তিত্বকে।

বিদেশের ফ্লাইটের টিকিটটা মনে মনে বাতিল করে অয়ন জানলার বাইরে তাকাল। জোনাকি জ্বলছে। আজ অনেক বছর পর সে কোনো দুঃস্বপ্ন ছাড়া শান্তিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।


 

অস্তিত্ব 
প্রতিভা পাল 

           মিতুলের ছোট একটা চারকোণা ফ্ল্যাটে আজ রিমির গৃহপ্রবেশ। 'অভিধান' অনাথ আশ্রম থেকে সে আজ নিজের বাড়িতে আসবে। মায়ের কাছে।

            স্কুলের সেই দিনটির কথা মিতুলের আজও মনে আছে। ক্লাস এইট। বন্ধুদের মুখে সে প্রথম জেনেছিল তার বাবা মা নিজের না। সে দত্তক নেওয়া সন্তান। বাড়ি ফিরে অসহায় রাগ, কান্না, অভিযোগ আরও কত কিছু। সেদিন মা-বাবার কোনও কথাই তাকে শান্ত করতে পারেনি। বেশ কিছুদিন স্কুল তো দূর স্নান, খাওয়া, ঘুমহীন। ক্লান্ত চেহারার মেয়েটি কী যেন একটি ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নেওয়ার প্রবল চেষ্টা করেও বারবার হেরে যাচ্ছিল। একদিন মা তাকে অনেক বোঝালেন- 'বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো সত্যি আমাদের কাছে। জন্ম, অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না। কাজ আমাদের পরিচয়।' কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল সে। তখন তার ভিতরে আমূল একটি পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। সেদিনের পর থেকে এই বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করেনি মিতুল। আর কখনও। বরং মায়ের কথা মেনে সে নিজেকে গড়ে তুলেছে একজন ভালো মানুষ হিসেবে। 

           শহরের নামকরা একটি কলেজের বোটানি-র প্রফেসর মিস মিতালী বসু আজ স্বয়ং সম্পূর্ণ। তিন বছরের রিলেশনে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। করোনার সময় বাবা মা চলে গেলেন। বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাটে শিফট করেছে সে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- তার মতো কোনও অনাথ শিশুকে তার নিজের পরিচয়ে বাঁচতে শেখাবে। মায়ের নামে সে নাম রেখেছে সেই ছোট্ট মেয়েটির।
     
             ছোট্ট রিমিকে কোলে নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে ঢুকে বাবা মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়াল মিতুল। তখন তার মুখে একরাশ তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল।


 

সেরা

শুভেন্দু নন্দী 

বঙ্কু কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলো বইমেলায়। তার মায়ের অনুরোধে তাদের সঙ্গী ছিলেন অমলকাকু। পাড়ার ছোট -বড় সকলের অমলকাকু। হাজারের বেশী প্রকাশনী সংস্থার বুকষ্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে অবশেষে দু -তিনটে বই কিনেছিল বঙ্কু। মা -বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থের সুরাহা করেছিল তার সখের বইগুলো কিনতে। খেলার কুইজ, কার্টুন আর স্বপনকুমারের গোয়েন্দা বই। শহর ঘেঁষা বর্ধিষ্ণু গ্রামে বঙ্কুর বাস। গ্রামের বেশীর ভাগই কৃষিজীবী। পড়াশোনায় তার তেমন মনোযোগ নেই। কোনও রকমে ক্লাস উৎরে যাচ্ছে। স্কুলে খেলাধুলায় তার ভালো পারফরমেন্স। শিক্ষকেরা তাকে ভালোবাসেন। রাজ্যস্তরে প্রতিযোগিতার জন্য বেশ কিছুদিন পাড়ার মাঠে অনুশীলন করছে বঙ্কু। বড়সড় রেসের "হিট" হবে। দশজন অংশ গ্রহণ করবে তাতে। নেবে মাত্র  একজনকে।

বাবা সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। সকালে চাষবাস। তারপর গ্রাম থেকে দূরে এক মুদিখানার কর্মচারী। মা সংসারের জন্য প্রাণপাত করে যাচ্ছেন। ছেলে মিলখা সিং ও উইনসাইন বোল্টের পরম ভক্ত। পড়ার সময় ওঁদের ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাবা-মার তাতে ঘোর অপছন্দ। আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। মাঠে লোক জড়ো হয়েছে।

বঙ্কু দৌঁড়চ্ছে- সঙ্গে আরও নয় জন। বঙ্কুর বাবা দুপুরবেলায় ফিরছিলেন কাজের শেষে মাঠের পাশ দিয়ে। চিৎকার শুনে তাঁর মনে হোলো "তবে কি আজ বঙ্কুর খেলা?" তার জন্যই তার দিবা রাত্রি অনুশীলন? মাঠে ঢুকেই বাবা ধাবমান বঙ্কুকে দেখতে পেলেন। " বাঃ! ছেলেটাতো বেশ জোরে দৌঁড়োচ্ছে " কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌঁছুতে পারেনি। তার স্থান দ্বিতীয়তে। পরাজয়ের গ্লানিতে বঙ্কুর চোখে জল।

-আরে! কাঁদছিস কেন? আমার চোখে তুই-ই সেরা! ঐ দেখ, সবাই দাঁড়িয়ে তোকে বাহবা দিচ্ছে। এ পারাজয় নয় - তোর জয়ের খিদে আরও বাড়িয়ে দেবেরে এতে আগামীতে। দুঃখ
এটাই- এতদিনে তোকে আমরা গুরুত্ব দিইনি " বাবা বললেন।
 বঙ্কুর চোখে আবার জল।


 

স্মৃতিকনা

​কুণাল গোপ


 রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটের সামনে আজ এক বিশাল ফেস্টুন –
“৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী সমাবেশ”
দীর্ঘদিন পর স্কুলটা আজ যেন নিজের যৌবনে ফিরেছে।
বাঁশি বাজছে, ঘুড়ি উড়ছে, ছেলেমেয়েরা ফুল দিচ্ছে প্রাক্তনদের।
আর হুইলচেয়ারে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছেন চারজন প্রবীণ বন্ধু – সুভাষদা, কালী, মোহিনীদা আর বিশ্বজিৎ কাকা।
সবার চুলে রূপোর ছোঁয়া, হাঁটার গতি কম, কিন্তু চোখে ছেলেবেলার দীপ্তি।
পুরনো ক্লাসরুমে ঢুকে সুভাষদা হেসে বললেন –
“এই বেঞ্চেই তো মোহিনী প্রেমপত্র পেয়েছিল… ভুল করে মাস্টারমশাইয়ের বইয়ের ভেতর ঢুকে গেছিল!”
 “আর কালী কেমন নাটকে হেমন্ত মুখার্জির গলা নকল করে নায়িকার মন জিতেছিল… অথচ পরে শুনি ওরই বিয়ে হয় পাশের গ্রামের এক পাত্রীর সঙ্গে!” – বলে হো হো করে হাসলেন বিশ্বজিৎ।
মোহিনী মুচকি হেসে বললেন,
“তখন তো প্রেম ছিল অক্ষরজ্ঞান! চিঠি মানেই কবিতা।”
হঠাৎই কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ।
তারপর সুভাষদা বের করলেন একটা পুরনো, হলদেটে ছবি।
১৯৭০ সালের স্কুল ফোটো।
ছবির কোণে হাত বুলিয়ে ,
“জানিস? এদের অনেকেই আর নেই… কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ওরা এই মাঠেই দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের পাশেই…”


 

মধু নাম

অর্পিতা গুহ মজুমদার

করোনা কালের শেষ দিকে দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর শৈশবকালের বন্ধু সুমনকে খুঁজে পেয়েছে ঝিনুক।  সুমনই প্রথম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়।প্রথমে ঝিনুক ঠিক চিনতে না পারলেও পারসোনাল ডিটেইলস এ গিয়ে আশির দশকের সেই ছোট্ট মফস্বল শহরে প্রাইমারী স্কুলে একসাথে পড়া সুমনকে চিনতে পেরেই তৎক্ষনাৎ অ্যাকসেপ্ট করে। সেও তো কতই না খুঁজেছে সুমনকে কিন্তু টাইটেল দেবের পরিবর্তে দে লিখে সার্চ করতো। উচ্ছ্বসিত সুমন ও ঝিনুকের মধ্যে মেসেঞ্জারে চলে " পুরনো সেই দিনের কথা " এবং প্রায়ই ফোনালাপ। 

                         ঝিনুকের মনে পরে দুজনেই গল্পের বইয়ের পোকা ছিল, বই আদান -প্রদান চলতেই থাকত।তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভ সুমন একবার  'অরণ্যদেব ' কমিকসের বইটা ফেরত দেবার সময়  বলেছিল, " জানিস, তোকে না আমার একদম ডায়ানার মতো লাগে।" খুব লজ্জা পেয়ে সুমনের হাত থেকে বই নিয়েই ঘরে দে ছুট। বলা হলো না ডাকাবুকো সুমনকে "তোকেও না আমার অনেক সময় অরণ্যদেব মনে হয়।" এরপর ক্লাস সিক্সে উঠতেই সুমনের ব্যাংক চাকুরে বাবার বদলি হয়ে অন্য এক দূরের শহরে পোস্টিং এবং  দীর্ঘ এত বছর  সুমনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। 

                  সেদিন ফোনে এটা সেটা কথার মাঝে ঝিনুক বলে, "সুমন গতকাল তুই মেয়ের সাথে যে ছবিটা পোস্ট করেছিস খুব সুন্দর। তোর মেয়ের নাম কী রেখেছিস রে?" হঠাৎ যেন থমকে যায় সুমন। কিছু মুহূর্তের নীরবতা ভেঙ্গে সুমন উত্তর দেয়, " ওর নাম ঝিনুক।" 

                   ফোনের এ প্রান্তেও মুহূর্ত থমকে যায়। দীর্ঘকালের অবরুদ্ধ কোন  দখিনা বাতাস যেন ঢেউয়ের অনুরণন তোলে ঝিনুকের বুকের মধ্যে।নিজেকে সামলে ঝিনুক বলে, "আজ রাখি।"


 

তোমার সাথে আমৃত্যু দেখা না হোক

মহঃ সানোয়ার 


ইকরা চলে গেছে আকাশকে ছেড়ে।
চলে যাওয়ার সময় পেছনে তাকায়নি—যেন তাকালেই আকাশ ভেঙে পড়বে। আকাশও ডাকেনি, শুধু জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, নিঃশব্দে। যে শহরে তারা একসাথে হেঁটেছিল, সেই শহর আজও আছে, কিন্তু ইকরার ছায়া নেই।

শেষ কথাটা ছিল—
“তোমার সাথে আমৃত্যু দেখা না হোক।”
কথাটা অভিশাপ ছিল না, ছিল বাঁচার একটা চেষ্টা। কারণ দেখা হলে স্মৃতিরা জেগে উঠত, আর স্মৃতি মানেই আবার ভেঙে পড়া।

আকাশ জানে, ইকরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছোট ছোট জিনিসগুলো যায়নি। এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে গেলে যে অভিমান জমে, একজোড়া চটি দরজার পাশে পড়ে থাকলে যে অপেক্ষা জন্মায়—সবই রয়ে গেছে। রাতে ঘুম আসে না, কারণ স্বপ্নে ইকরা আসে। স্বপ্নে সে হাসে, ঠিক আগের মতো। তখন আকাশের বুকটা ব্যথায় ভরে যায়।

দিনের আলোয় আকাশ নিজেকে বোঝায়—দেখা না হওয়াই ভালো। না দেখাই ভালো।
কারণ কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না, শুধু দূরে সরে যায়। আর দূরত্বটাই তখন সবচেয়ে নিরাপদ ভালোবাসা হয়ে ওঠে।

তবু, কোনো কোনো সন্ধ্যায় আকাশ আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে—
“দেখা না হোক, ইকরা… কিন্তু ভালো থেকো।”


 

হাসিকথা
সোমনাথ মুখার্জী 

সুন্দর হাসির মর্যাদাটাই আলাদা।হাসছিল তনিমা।হাসিতে মিশে আছে অন্তরের সাবলীল অমলিন সৌন্দর্য্য। অথচ, হাসির তোড়ে আক্রান্ত তরুণ দাস মর্ম বোঝার চেষ্টায় ক্লান্ত। তবু সে দুঃসাধ্য সাধনার পথে। কতদিন,কত রকমের, কত ধরণের হাসির ছটায় সংসার ভরিয়ে রেখেছে তনিমা। মনের খাতায় লিখে নিয়েছে তরুণ সেই সব হাসির টুকরো আবেগ। রবিবারের আলোর সকাল। সেই আলোকিত আলোয় আর হাসির নির্মল প্রকাশে তরুণ বিবশ। বেহালার শীলপাড়া থেকে বাজার এনেছে মনের মতন। লকডাউনের ঘেরাটোপ মাকড়সার জালের মত ফাঁদে ফেলেছিল জীবনকে। সবে তার থেকে নিষ্কৃতি মিলেছে।আসলে, জীবনের প্রশ্নপত্র উত্তর প্রত্যাশী।তরুণ তখন হাঁপিয়ে উঠৈছিল। তখন‌ও, আশ্চর্য রকমের শান্ত আর শিষ্ট দেখেছে তণিমাকে। সঙ্গে ছিল হাসির লহরী। সে মজে ছিল অনায়াসে নিজেতেই।
হাসছিল তনিমা। তরুণ তাকাল।ভাবনার চোখে। বিয়ের পর পর ঘরোয়া আড্ডায় অন্যের চোখে মুখে মুগ্ধতার আবেশ লক্ষ্য করেছে। কিন্তুু, হাসির মূল্যায়ন যে অনেক কঠিন। একদিন ঘন অবস্থায় তনিমা বলেছিল, অনেকে হাসিকে ব্যবহার করে জীবন সংগ্ৰামে জয়ী হতে চায়। তেমন ধরণের হাসি ও হাসে না।
চা বানিয়ে কাপ হাতে ধরিয়ে তনিমা বলল, এত ভেবো না স্বামী মশাই। চা খাও। জানো কষ্টের জীবনে হাসিটাই ভ্যাকসিন। তুমি বড্ড ছেলেমানুষ।



 

জন্মদিন

 সুস্মিতা দত্ত রায় 

বাচ্চা নাকি যে জন্মদিনের এক্সাইটমেন্ট থাকবে এখনও?  আমার কাজ আছে বেকার সময় নষ্ট করার মতন সময় আমার কাছে নেই। 

আজ সুমিতা ঘুম থেকে উঠে বসে আছে ফোনের সামনে। আজ তার জন্মদিন। সে ফোনটা হাতে নিয়ে নেট অন করল। নাহ কেউ তাকে আজ শুভেচ্ছা পাঠায়নি। সৌগতও না। এমনকি ফোনও করেনি সৌগত।
                           
সৌগত আর সুমিতার বিয়ে হয়েছে আজ আড়াই বছর হল। তাদের একটা ছেলে হয়েছে, ওর নাম স্বপ্নদীপ। বয়স তিন মাস। মেয়েদের প্রথম বাচ্চা বাপের বাড়িতে হয়। তাই সুমিতা ওর ছেলেকে নিয়ে মায়ের কাছে আছে, গত তিন মাস ধরে। বাড়িতে সুমিতা, ওর মা আর ওর বোন থাকে।
 
সৌগত আসে শনিবার, রবিবার থেকে বাড়ি যায়। জরুরী কাজ থাকায় সে রবিবারে চলে গেছে বাড়ি। আর সুমিতার জন্মদিন পড়েছে সোমবার।
                         
সুমিতা ছেলেকে কৌটোর দুধ খাইয়ে ঘুম পারাতেই  ঘড়িতে এগারোটা। এরপরের খাবারটা কখন খাওয়াবে তার হিসেব রাখতে হয় ওকে। তখন ওর মা এসে ওকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালে, সুমিতা প্রণাম করলো মা কে। 
     
মা জিজ্ঞেস করলেন - কি রে সৌগত ফোন করে উইস করেনি?
- সকাল থেকে উঠে তোমরাও তো কেউ করো নি উইস। 
মা বোনকে ডেকে বললেন - তুই তোর দিদি কে আজ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাসনি?
- তুমি তো দেখলে আমি বাড়ি ছিলাম না। আর ও কি বাচ্চা নাকি এখনও!  জন্মদিনের এক্সাইটমেন্ট থাকবে? 
                      
সুমিতা মনে মনে খুব কষ্ট পেল। ভাবলো, আমি তো কখনো বলিনি আমাকে দামি গিফ্ট দিতে, বা কেক এনে দিতে। জন্মদিনের দিন কি ওর পরিবারের লোকেরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও জানাবে না আমাকে? আমি কি এতই বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছি?


 

ফেরার আগে যে নীরবতা
আদিল হোসেন মাহি

ফেরা কখনও কেবল দূরত্বের হিসাব নয়; ফেরা মানে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক পুরোনো নাম উচ্চারণ করা।

বহু বছর পর আরিব যখন শালবন–এর মাটিতে পা রাখল, তার মনে হলো—এই মাটি তাকে মনে রেখেছে। মানুষেরা ভুলে যায়, জায়গা ভুলে যায় না। বিকেলের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে নেমে এসে তার কাঁধে হাত রাখল, যেন বলল—“তুমি দেরি করেছ, কিন্তু আসেছ।”

তার বর্তমান ঠিকানা ঢাকা। সেখানে সাফল্য শব্দে মাপা হয়, সময় টাকায়। মানুষ উঁচুতে ওঠে, কিন্তু ভেতরে কোথাও নিচে নেমে যায়। আরিবও উঠেছে—পদে, মর্যাদায়, ব্যস্ততায়। শুধু নিজের ভেতরের শিশুটিকে কোথায় যেন রেখে এসেছে।

নদীর ধারে মায়া দাঁড়িয়ে ছিল। কোনো অভিযোগ নয়, কোনো প্রত্যাশা নয়—শুধু একটি স্থির উপস্থিতি।
“শহর কি তোমাকে নিজের করে নিয়েছে?”—তার প্রশ্ন ছিল নরম, কিন্তু গভীর।

আরিব উত্তর দিল না। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল। জল বয়ে যাচ্ছে—তার নিজের ছন্দে। সে বুঝল, নদী কখনও শহরে যায় না; শহরই একদিন নদীর কাছে ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর।

মায়া বলল, সে শিশুদের শেখায় স্বপ্ন দেখতে। আর শেখায়—স্বপ্ন যেন শেকড় কেটে না ফেলে। কারণ ডানা থাকলেই উড়া যায়, কিন্তু মাটি না থাকলে নামা যায় না।

গোধূলি ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে গেল। তারা পাশাপাশি হাঁটল, কথা কম, নীরবতা বেশি।

সেদিন আরিব বুঝল—ফেরা মানে জায়গায় ফিরে আসা নয়; ফেরা মানে সেই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া, যে কখনও বদলায়নি।

আর মানুষ যত দূরেই যাক, তার ভেতরে একটি গ্রাম চিরকাল অপেক্ষা করে।


 

বিবর

রিয়া চ্যাটার্জী 

" উফফ", "বড্ড দেরি হয়ে গেছে।" ছুটে ছুটে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় রাজীব দেখলো একজন বৃদ্ধা বেশ ভারি একটা ব্যাগ নিয়ে কোনো রকমে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। 

এক মুহুর্ত দাড়িয়ে ভাবলো রাজীব তার ব্যাগটা নিয়ে যাওয়া উচিত। বৃদ্ধার কষ্ট হচ্ছে, তার কপালে ঘাম, মুখে কষ্টের ছাপ । বৃদ্ধা ঠিক তার মৃত ঠাকুমার মত। কিন্তু  দাঁড়ালে দেরি হবে যাবে। ইন্টারভিউটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট তার জন্য! 

সাতপাঁচ ভেবে দ্রুত ছুটে ট্রেন ধরে রাজীব। 
" মা, চাকরি টা আমি পেয়ে গেছি।" উচ্ছসিত রাজীব বলে ওঠে ফোনে। 

আজ রাজীবের অফিসের প্রথম দিন। বাবা মায়ের আশীর্বাদ নিলো পা ছুঁয়ে , ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালো। 

ব্রেকফাস্টের পর, অফিস যাওয়ার আগে খবরের কাগজের পাতা ওল্টানোর সময় চোখে পড়ল তাদের শ্রীরামপুর স্টেশনের একটা খবর। 

হৃৎপিণ্ড অচল হয়ে ওভারব্রিজে অসুস্থ হয়ে, চিকিৎসার  অভাবে পড়েছিলেন এক বৃদ্ধা অনেক ক্ষণ ধরে। অনেকক্ষণ কেউ তার সাহায্যের জন্য যায় নি। নিচে মহিলার নাম ও ছবি।  দেখে চিনতে পারলো রাজীব। গতকালের সেই বৃদ্ধা মহিলা।  মহানগরীর উদাসীন কর্মব্যস্ততা কেড়ে নিলো আরো এক জীবন।

তার মনে হলো সেও এক জন এই অমানুষের দলে.... অফিসের প্রথম দিনটা তার কালো হয়ে গেলো।


 

দৌড়

অভিজিৎ সেন


দৌড়, দৌড় স্বপ্ননীল আরও জোড়ে, পৌঁছেও গেলো। স্বপ্ননীল আনন্দে লাফিয়ে উঠলো, দেখলো বিছানায় বসে আছে। বুঝলো স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ননীল নবম শ্রেণির ছাত্র।পরীক্ষায় প্রথম তাকে হতেই হবে, এমনই পাহাড় পরিমান চাপ মাথার উপরে। প্রতিটি বিষয়ে দুটো,কোনোটির তিনজন করেও শিক্ষক আছেন। ছেলেকে যন্ত্রের মতো গড়ে তুলতে চায় তার বাবা মা । প্রতিযোগিতার দৌড়ে প্রথম না হলে ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার। স্বপ্ননীল কৃত্রিম ছাঁচে পড়ে কৃত্রিমতা, অস্বাভাবিকতাকেই স্বাভাবিক সত্য বলে ধরে নিয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে ক্রমশ সমাজ‌ থেকে, প্রকৃতির রূপ-রস‌-গন্ধ-বর্ণ ও স্পর্শের মতো অনাবিল আনন্দ থেকে। স্বপ্ননীল লাটিমের মতো অনবরত ঘুরে চলেছে। প্রথম হতেই হবে । দিনেরাতে সেভাবেই তাকে অনুশীলন করতে হয়। অথচ এসবের বাইরে একটি পৃথিবী আছে। সমাজ আছে। মনমুগ্ধকর প্রকৃতি আছে। সৌন্দর্য আছে। নদী আছে। ভোরের সূর্যোদয় আছে। পাখির কলকাকলি আছে। না স্বপ্ননীলের জীবনে এসব আবেগের কোন স্থান নেই । সে পড়া মুখস্ত করতে পারে কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই। বিদ্যালয়ের 'অঙ্কুর' পত্রিকায় সায়ন অনায়াসে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ লিখতে পারে। যদিও ছাত্র হিসেবে সে মধ্যমানের,সেও নবম শ্রেণির ছাত্র। স্বপ্ননীল, সায়নকে মনে মনে হিংসে করে । এখানে সায়ন তার থেকে এগিয়ে । সায়নকে সে হারাবেই। কিন্তু সাহিত্য সৃজনে সে অক্ষম। শেষে অনেক বুদ্ধি খরচ করে একটি লেখা পত্রিকায় সে দিল। একটি কবিতা। গভীর ভাবব্যঞ্জক একটি কবিতা। আশ্চর্য ! সায়নের কবিতার থেকেও সুন্দর ! সকলেই তার প্রতিভার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ‌ কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয় ! স্বপ্ননীল 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে' ব্যবহার করে কবিতাটি পত্রিকায় দিয়েছিল। পত্রিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক সেই 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে' কাজে লাগিয়ে ধরেও ফেলেন ।


 

উপহার

 চিত্রা পাল

                                                                                 

একমাত্র মেয়ের বিয়ে, তাই কাউকেই নেমন্তন্নর লিস্ট থেকে বাদ দিচ্ছে না সুপ্রভা। তারমধ্যে ওর ছোটকাকার ছোট মেয়ে মণিও বাদ যায়নি। মণির নামে বিয়ের নেমন্তন্ন পত্র দেখে সুধীনবাবু  বলেই ফেললেন, তুমি একেও আনতে চাইছো, দেখো তখন আবার কোন গন্ডগোল না হয়। সুপ্রভা বলে, সে তখন দ্যাখা যাবে। ও আমার কোলেই বড় হয়েছে, ওকে বাদ দিই কি করে। না না ওকে আমি বাদ দিতে পারবো না।আসলে ওর নিজের পছন্দের বিয়ে আর আর্থিক অবস্থাও তেমন নয় সব মিলিয়ে মণিকে সবাই দূরেই রেখে ছিল।  

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেলো। মণি বিয়ে বাড়িতে যেন এলো, দেখলো জয় করলো এমনতর। আইবুড়ো ভাত থেকে বৌভাত সবেতেই মণি একেবারে কাজেকর্মে হৈচৈ করে আনন্দ করে একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলো। পরের দিন সকালে যখন বিদায় নিল, তখন সকলের চোখে জল।সবাই বলছে তুই আর দুটো দিন থেকে যা না।

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে সবাই বসলো উপহারের পসরা নিয়ে। কে কি দিয়েছে তা আর একবার করে দেখে নেওয়া। সবাই সবায়েরটা দেখলো, কিন্তু মণি কি দিয়েছে তা খুঁজে পাওয়া গেলো না। বেশ খানিকক্ষণ পরে মেয়ে লিলি একঘুম দিয়ে এসে দ্যাখে উপহারের ঢিবির মধ্যে সবাই মণির উপহার খুঁজছে।লিলি বলে ,’তোমরা কি খুঁজছো গো?’ তখন সেজমাসী বলে,’হ্যাঁরে, মণি কি দিয়েছে রে?’  লিলি বলে,ওমা,সেতো আমি মাকে দিলুম মা বললে, রেখে দে। তখন সুপ্রভা বলে, কোনটা বলতো?লিলি বলে, ওই যে রুপোর চাবির রিং।রুপো না মাথা কি একটা যেন। তখন হলো উল্টো কথাবার্তা। অনেক নিন্দেমন্দ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য। সুপ্রভা বলে  একটা মেয়ে ক দিনযে আনন্দে হাসিতেকাজেকর্মে বাড়িটাকে ভরিয়ে দিয়েছিলো সেটা কি কম,সেটাই তো বড় পাওয়া। 


 

তোমার সন্ধানে

তন্ময় কবিরাজ 


বিভুবাবু অবসর নিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। এখন আর প্র্যাকটিস করেন না। পাড়ার মানুষজন এলে সাহায্য করেন। ভালো নামডাক ছিল। মানুষের কষ্ট দেখতে আর ভালো লাগে না। একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে। বউও গত মাসে গেছে ছেলের কাছে। ছ মাসের আগে ফিরবে না। বিভুবাবু একাই থাকেন। সকালে পাড়ার এক মহিলা এসে বাড়ির টুকিটাকি কাজকর্ম করে দিয়ে যান।বাকিটা সময় বই পরেই সময় কাটান। গ্রামের লাইব্রেরিতে বিভুবাবু নিয়মিত যান। খুব মন দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সমগ্র পড়ছেন। কলেজে পড়ার সময় বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তাঁর কাছেই রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্প শুনেছিলেন। কিন্তু সে ভাবে পড়া হয়নি বাবার ভয়ে। বিভুবাবা আর্মিতে কাজ করতেন। উঁচু গলায় সাবধান করে দিয়েছিলেন, "পড়াশোনা করছ তো মন দিয়ে পড়বে। ওই সব ফালতু কবিতা টবিতা পড়তে যাবে না।" এখন বাবাও নেই, আর সেই শাসনও নেই। নিজের মত করে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে চান তিনি। গত সপ্তাহে উপন্যাসগুলো শেষ করলেন। কবিতা, গল্প আগেই শেষ হয়েছিল। প্রবন্ধটা সবে ধরেছেন। তবু যেন মনে হচ্ছে মানুষটাকে বোঝা যাচ্ছে না। একটার সঙ্গে একটা দ্বন্দ্বের জন্ম হচ্ছে। গভীরে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলছেন বিভূবাবু। সমস্যার কথা একদিন লাইব্রেরীয়ানকে জানালেন, "রবীন্দ্রনাথকে কিছুতেই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমি তো মোটামুটি সবই পড়ে  ফেলেছি।" হাসলেন প্রবীণ লাইব্রেরীয়ান। বলেন, ``দাদা সূর্যের কাছে কি অত সহজে যাওয়া?গঙ্গার জল কি এক নদীতে বয়ে যায়? শুধু তাঁর জার্মান বিষয়ে জানতে হলে মার্টিন কেমচেনকে পড়তে হবে।" বুঝতে পারলেন বিভুবাবু। ঘাড় নাড়ালেন, "বুঝলাম দাদা। শুধু তাঁর লেখায় তিনি নেই। অনেকটা আমাদের প্রফেশনের মত। এমবিবিএস তো শুধু তো একটা ডিগ্রি। আসল খেলা তার পরেই শুরু হয়।প্র্যাকটিস!"




 

বোধোদয় 

মিত্রা রায়চৌধুরী

মা বিদিশা বাবা অরিন্দম। দুজনেই চাকুরীরতা। তাদের একমাত্র ছেলে অঙ্কুর। বয়স মাত্র তিন।বাচ্চাটিকে দেখাশোনার জন্য বাড়িতে রয়েছে একজন  আয়া। আধুনিক মা-বাবা জানে বাচ্চাকে সময় দেওয়া খুবই দরকার কোয়ালিটি নয় কোয়ান্টিটি টাইম বাচ্চার সাথে অতিবাহিত করলে বাচ্চার মানসিক ও দৈহিক বিকাশ ভালো হয়। সে বড় হয়ে ভালো মানুষ হিসাবে সমাজে পরিগণিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে  তার ইচ্ছা শক্তির বিকাশ হবে, যা তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে।  কিন্তু জানাকে বাস্তবে রূপ দিতে তারা পারে না কারণ এক তো কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপের কারণে বাড়ি ফিরে আর এনার্জি থাকে না।  আরো একটি কারণ তাদের প্রবল মোবাইলে আসক্তি। বিদিশার সাজগোজ শপিং বন্ধুদের সাথে আড্ডা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটিভ থাকা সব ভালো লাগে কিন্তু বাচ্চাকে সময় দেওয়াতেই দারুণ অনীহা। অরিন্দমও তথৈবচ। নিয়মিত আড্ডা তাকে কাজের শেষে দিতেই হবে আর বাড়িতে ফিরে মোবাইল নিয়ে ঘুটঘুট করা তার নিত্য দিনের কাজ। মা ও বাবার সাথে একাত্মতা তৈরি হচ্ছে না বাচ্চার এটা কি তারা বুঝতে পারে না না বুঝেও বোঝেনা! অঙ্কুরের দাদু অনিমেষ বাবু ও দিদুন রিতা দেবী। মাঝে মাঝে এ বাড়িতে আসেন তারা তাদের অভিজ্ঞতার চোখে সবই বুঝতে পারেন কিন্তু বলতে গেলেই "মেয়ের সংসারে মাথা গলিও না তো " মেয়ের ঝাঁঝালো উত্তর। বাধ্য হয়ে চুপ থাকতেই হয়। অঙ্কুরের ঠাকুমা ও ঠাকুরদা প্রভাদেবী ও শান্তনুবাবুরও একই অবস্থা, দেখা সহ্য করা চুপ করে থাকা, দূরে থাকেন বছরে একবার ছেলে ছেলের বউ ও নাতির সাথে দেখা হয়। সবই বুঝতে পারেন খুব কষ্ট পান কিন্তু কিছুই করার নেই। তারা বুঝতে পারেন মা-বাবার সাথে সন্তানের কোনো বন্ডিং তৈরি হচ্ছে না। অবসর জীবন  এদের কাটবে চরম দুঃখে। তারা ভগবানের কাছে আকুল প্রার্থনা জানান যেন বিদিশা ও অরিন্দমের  শুভ বুদ্ধি জাগ্রত হয়।
                


 

খুঁজতে খুঁজতে

 অনুষ্টুপ রায়



লোকটাকে মাঝে মাঝেই দেখি। মাঝে মাঝে বলতে গ্রামে বন্ধুর বাড়িতে এলে। সরাসরি কথা হয়নি কখনো। বন্ধুর সাথে ওনার আলাপ তাদের দুজনের মাঠেঘাটে ঘোরার সময়। শুনেছি তিনি দক্ষ চিত্রকর।

  শংসাপত্র বোধহয় নেই। পড়ার খরছ জোগাতে না পারায় আর্ট কলেজ ত্যাগ। এখন ঘুরে ঘুরে আঁকা শেখান। মেলাতেও বসেছেন নানান হাতে তৈরি ঘর সাজানোর জিনিস নিয়ে। তবে কোনোটাতেই খুব একটা জুত হয়নি।

    শেষমেশ সংসার চালাতে মোমোর দোকান দিয়েছেন। তবে আঁকা থামেনি। দেওয়াল লিখন থেকে পুজো উপলক্ষে প্যান্ডেল সজ্জা সবই করে চলেছেন। স্থায়িত্বের অভাবটা বড় হয়ে উঠেছে বহু সময়ে।

      এই অবধি পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে: এটা গল্পনাকি কোনো মানুষের বাস্তব চিত্র আশ্রিত গদ্যলেখক হিসেবে উত্তর- এই দুইয়ের মাঝামাঝি। ধরা যাকএই গল্পের লোকটা অনেক খেটে খাওয়া মানুষের প্রতীক।

 

  তা এই লেখার বিষয়টা ঠিক কিশিল্পের সাথে রুজি লড়াইনানা কোনো বাইনারি বাঁধতে চাইনা। স্বল্প পরিসরেঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ। যা আমি চাক্ষুষ করেছি। তা বাকিদের সাথে ভাগ করে নেওয়া। 

  

২ 

 এক সময়, লেখক আর চিত্রকরের আলাপ। ঠিক হলো, নিজেদের অভিজ্ঞতা কে লেখা ও আঁকার মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে তারা। যার মাধ্যমে আলাপ, তার কী ভূমিকা? সে কবি। ছড়া বাঁধেবই পড়ায়, পেট চালাতে ছাত্র পড়ায়।

      তা তাদের উদ্যোগ কেমন এগোচ্ছেমন্দ নয়। তবেতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছেআরে নানা! তা নালোকে ছবি দেখে পাড়ার দেওয়ালেসাথে খানিক গদ্য বা পদ্য সময় পেলে পড়ে।

      খরছ আর আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। চিত্রকর আঁকার সময় বা লেখক/কবি রচনার সময় পাশে গামছা রাখা থাকে। তবে তা দিয়ে রং কেনার খরচও ভালভাবে ওঠেনা! তবে তারা চেষ্টা করবে না থামার।


 

পোস্ট বাক্স

অনিতা নাগ


আমাদের ছোটবেলাটা ছিলো বড় সহজ আর সাবলীল।ছোট ছোট খুশি আর আনন্দে ভরা ছিলো সেই দিনগুলো। মনে পড়ে এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের কথা। হলদে রঙের মোটা আয়তাকার এক কাগজ, নাম তার পোষ্টকার্ড! তখন চিঠিই ছিলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম, পোষ্টকার্ড ছিলো সবচেয়ে সুলভ। মনের কথাটি লিখে, প্রাপকের ঠিকানা লিখে লালরঙের বড়ো বাক্সটায় ফেলে দিলেই হলো! কি যে রহস্য মাখা ছিলো ওই বাক্সটায়! ভেবেই পেতাম না ওই বাক্সটার মধ্যে দিলে কেমন করে তা পৌঁছে যায় গন্তব্যে! সেই পোস্টকার্ড কতো বার্তা পৌঁছে দিতো। মাঝে মাঝে আমাদেরও সুযোগ হতো দু'লাইন লেখার। তারপর লেখা হলে সেই পোস্টকার্ড পোস্ট বাক্সে ফেলা হতো। তারপর অপেক্ষা উত্তর আসার। বাড়ীর সদর দরজার সামনে একটা কাঠের বাক্স লাগানো ছিলো। বাক্সটার নীচে একটা কাটা জায়গা ছিলো, যেখান দিয়ে দেখা যেতো ভিতরে কিছু আছে কিনা! ছোট্ট তালা লাগানো থাকতো। দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হতো তখন খাঁকি জামাপ্যান্ট পরা পিওন কাকু আসতো ব্যাগ বোঝাই চিঠি নিয়ে। ঠিক বাড়ীতে ঠিক চিঠিটা কি'করে যে পৌঁছে দিতেন, ভেবে কূলকিনারা পেতাম না।

এখনও পোষ্ট নিয়ে পোষ্টম্যান আসেন। রেজেষ্ট্রি চিঠি বা স্পীডপোষ্ট আসে। কলিং বেল বাজিয়ে দিয়ে যান। চিঠির বাক্স দেখার উত্তেজনা হারিয়ে গেছে! বড় যে পোস্টবাক্স, তাতে সময় লেখা থাকতো। মনে পড়ে ঐ বাক্সটার সামনে নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। নির্দিষ্ট সময়ে বড় বাক্সটা খোলা হতো, তা থেকে বেরুতো গোছাগোছা পোষ্টকার্ড, নীল রঙের ইনল্যান্ড লেটার, ডাকটিকিট আটকানো কতো রকমের খাম। সে'সব ব্যাগে ভরে নিয়ে যেতেন পোষ্টম্যান কাকু। অবাক হয়ে ভাবতাম আর মনে মনে বলতাম, ‘ রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে’

আজ সবই গল্পকথা। কতো ছোট ছোট আনন্দ আমাদের জীবনকে আলোকিত করে দিতো। সেই স্মৃতিটুকু আগলে রেখেছি মনের মণিকোঠায়।


 

ছেলেটির নাম অভিমন্যু
প্রদীপ সেন

আমার সাংবাদিকতা পেশার দৌলতে এ সমাজের হাঁড়ির খবর জানা। ঘুণেধরা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমাজের ইমারত। ঝড় বইছে না, এই যা রক্ষে। নইলে নড়বড়ে ইমারত কবেই ধসে পড়ত। দুর্নীতি আর দুর্নীতি মাকড়সার জালের মতো পরিব্যাপ্ত নিচুতলা থেকে উপরতলা অবধি।

সব অধঃপতন আজকাল আর খবরের শিরোনাম হয় না। নানাভাবে ম্যানেজ করা হয় অঘোষিত মাৎস্যন্যায়। সাংবাদিক হিসেবে জানি যতটা প্রকাশ করতে পারছি না তার সবটা। আমাদের ওপর চাপ আছে। কিন্তু যেখানে রাজনীতি আর ভেস্টেড ইন্টারেস্টের প্রশ্ন জড়িত নেই সেখানেই আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারি।

সেদিন ডিউটি করতে ঘর থেকে উঠোনে পা রাখতেই দেখি উঠোনে ঠ্যালাভ্যান নিয়ে বছর বারোর একটা ছেলে। ঘেমে উঠেছে রীতিমত। মনটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ঠ্যালায় লাউ কুমড়োর ডগার আঁটি, ঢেঁড়স, আলু, বেগুন, উচ্ছে, কাঁচ কলা, লংকা ইত্যাদি।

বড্ড মায়া পড়ে গেল। এই তো সেদিন জাল ওষুধ, ভেজাল মেশানো মশলা আর ও কত দুর্নীতির খবর ছাপিয়েছে তার কাগজে। যে যেভাবে পারছে লুটছে, কামাই করছে। এখানে নিষ্পাপ শিশুটি সংসারের গন্ধমাদন বইছে।

আমার বিধবা মা নিরামিষাশী। আমাকে রোজ বাড়ি ফেরার পথে মায়ের জন্য শাক সবজি বাজার করতে হয়। মা উঠোনে ভিজে কাপড়চোপড় রোদ্দুরে মেলে দিচ্ছিলেন। আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম। মা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে ছেলেটার ঘর্মাক্ত মুখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন - এখন থেকে আমরা সবসময় তোর কাছ থেকে আনাজপাতি কিনবো। তুই রোজ আসবি বাবা, কেমন।

সেদিন মা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আনাজই কিনেছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছি কেন। ছেলেটির নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। ভাবছি ওকে নিয়ে একটি আর্টিক্যাল লিখব। তার নাম দেব অভিমন্যু।


 

শৈশব
মনোমিতা চক্রবর্তী

মাঠের কোনায় বটগাছটার ওদিকটায় বেশ নিরিবিলি। ওখানেই রোজ কাব্য ক্রিকেট খেলতে আসে দাদু কিশোরবাবুর সাথে। বাচ্চাগুলোর খেলা দেখতে দেখতে কিশোরবাবু হারিয়ে যান নিজের কৈশোরে; শৈশবে। কত রকমের খেলাই না খেলতেন ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে। কত বন্ধু ছিল ওনার।

এখন বয়স হয়েছে তাই বন্ধুও কমে গেছে। হঠাৎই বাচ্চাদের ক্যাচ ক্যাচ শব্দে সম্বিত ফিরল কিশোরবাবুর। খেয়াল করলেন টুবলুর  মারা বলটা ওনার দিকেই আসছে। কাব্যও আসছে বলটা ধরতে।কিশোরবাবু ক্যাচটা ধরে ফেলেন।

কাব্য-"দাদু বলটা দাও।"
কিশোরবাবু -"না দেবোনা ।কি মজা আমি ক্যাচ ধরেছি ! আমি ব্যাট করবো!"
কাব্য -"কেন ?"
কিশোরবাবু-" তোমাদের নিয়মানুযায়ী যে ক্যাচ ধরবে সেই তো ব্যাট করবে। আমি ক্যাচ ধরেছি তাই এবার আমি ব্যাট করবো।"
কাব্য -"দাদু দাও বলছি ,নাহলে বাড়ি গিয়ে ঠাম্মিকে বলে দেবো কিন্তু। তোমার না হাঁটুতে ব্যথা ?"

গিন্নির নাম শুনতেই আর হাঁটু ব্যথার কথা মনে পড়তেই  কিশোরবাবুর মনে পড়ে যায় মাথার রুপোলী চুল আর কপালে মরুভূমির মতো বলিরেখা। খেয়াল করলেন পড়ন্ত বিকেলের উজ্জ্বল লাল আকাশে ক্রমশ কালো হয়ে সন্ধ্যে নেমে আসছে। শৈশব থেকে বাস্তবে ফেরেন কিশোরবাবু। বলটা বাড়িয়ে দেন কাব্যর দিকে।


 

আর্তনাদ
রথীন পার্থ মণ্ডল

বড় সাধ করে মেয়েকে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠিয়েছিলেন রিমাদেবী। কখনও ভাবেননি তাঁকে এই দিনটার মুখ দেখতে হবে। চুপচাপ পাথর হয়ে বসে আছেন তিনি, আর চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। মনে পড়ছে মেয়ের সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো।

এখনও কানে বাজছে মেয়ের আর্তনাদ--- মা, বাঁচাও আমায়, মা... আমায় নিয়ে চলো, মা... আমি যে আর পারছিনা, মা...


 

রামধনু

অভিমন্যু

মুসলধারায় বৃষ্টি নেমে এলে লিপি ঘরের সব জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ করে দেয়। তারপর লিপি দৌড়ে গিয়ে ছাদে মেলে রাখা জামা কাপড় তুলে নিয়ে আসে। কিছু জামা কাপড় আলনায় গুছিয়ে রাখে। বাকী জামা কাপড় শো-কেসে পাট পাট করে সাজিয়ে রাখে। লিপির কতই বা বয়স। সবে ১২-তে পড়লো।

বর্ষাকাল লিপির খুবই প্রিয় ঋতু। বৃষ্টি এলেই ওর ভিজতে ইচ্ছে করে। একটা মজার ছড়া নিজেই আনমনে আউরে ওঠে সে।
" আয় বৃষ্টি ঝেপে,ধান দেবো মেপে
ধানের মধ্যে পোকা,জামাইবাবু বোকা।"
মৃদু হেসে উঠোনে নেমে পড়ে সে। উঠোনের মাঝখানে গেলে সারা শরীর বৃষ্টিতে চুপসে যায়, ফ্রক জামাটা ভিজে লেপ্টে থাকে। এক সময় বৃষ্টি থেমে যায়। ঝলমলিয়ে রোদ ওঠে। আকাশের উত্তরপূর্ব কোণে সাতরঙা রামধনু ভেসে ওঠে। লিপি উঠোন থেকে উঠে সোজা স্নান ঘরে গিয়ে ঝপাঝপ এক বালতি জল মাথায় ঢেলে নেয়। গামছা দিয়ে সারা শরীর মুছে নিয়ে নতুন ফ্রক জামা পরে জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। লিপি জানালার দুটি পাল্লা খুলে রামধনু দেখে পুলকিত হয়।
উফ ! কি অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য !
লিপি একদৃষ্টে রামধনুর দিকে মুগ্ধতায় চেয়ে থাকে।


 

ঙের রাগ

কবিতা বণিক

অষ্টমঙ্গলায় পর্না বরের সাথে এসেছে বাপের বাড়ি। বড় মেয়ে তৃণা, বড় জামাই তুষার ও এসেছে। সব আত্মীয় স্বজনেরা আনন্দে মেতে উঠেছে। অষ্টমঙ্গলার অনুষ্ঠান শেষে খাওয়াদাওয়ার পর, পরের দিন রঙ খেলার সাবধানতার আলোচনা চলছে। বাড়ির কর্তা রঙ খেলা পছন্দ করেন না। সেই জন‍্যে বাড়িতেই বসন্ত উৎসব পালন হবে। প্রচুর ফুল আনা হয়েছে নিজেরা সাজবে আর স্টেজ সাজাবে। নাচে, গানে, কবিতায়, এক টুকরো শান্তিনিকেতনের আবহাওয়া তৈরি করার রিহার্সালও শুরু হয়ে গিয়েছে। পরদিন প্রত‍্যেকে যখন তৈরি, বাড়ির অনেকেই বসেছে দর্শক আসনে। স্টেজে উঠেছে নাচ, গানের দল। এমন সময় বড় জামাই তুষার পেতলের বড় পিচকারী ভরে লাল রঙে সবাইকে রাঙিয়ে দিল। এখনকার দিনে ঐ দৃশ‍্যটা যেন এ.কে. 47. চালানোর মত। রাগে ফেটে পড়লেন কর্তা। বড় জামাইকে তুলোধোনা করছেন। গিন্নীমা, কিছুতেই সামাল দিতে পারছেন না। হঠাৎই কেউ বলে উঠল “যাঃ রঙ তো নেই! গায়েব?” ততক্ষণে বড় মেয়ে, জামাইকে নিয়ে ঘরে খিল দিয়েছে। গিন্নিমা একচোট নিলেন ওটা ভ‍্যানিশিং রঙ ছিল। তবে জামাইয়ের চেয়েও মেয়েকে মানাতে খুব বেগ পেতে হয়েছিল বাবার। রঙের রাগ তো উড়ে গেল। কিন্তু রাগের এই রঙ ভ‍্যানিস করতে পারলেন না মেয়ের বাবা। শেষে মেয়ের প্রতিজ্ঞা- কোন উৎসবে সে আর থাকবে না।


 

দোলের ফুল

সায়ন্তন ঘোষ

কয়েক মাস পরেই দোল উৎসব। দোলার রঙিন ফুল ভীষণ প্রিয়। বাড়িতে নানারকম ফুলগাছের বাহার। রঙের খেলায় বাড়ির চারিদিক রঙিন হয়ে উঠবে, তাই শখ করে বাড়ির উঠোনে নানা রঙের বিভিন্ন ফুলের গাছ রোপণ করেছিলো দোলা। প্রতিদিনের পরিচর্যায় বড় করে তুলছে নিজের সন্তানের মত।

দোল এগিয়ে আসছে। শরীরটা ভালো নেই। পেটে ক্যান্সার হয়েছে, যন্ত্রণাটা বেড়েছে। শ্বাসকষ্ট হয়, বুকে চিন্‌চিন্‌ ব্যথা অনুভব হয় কখনো। তার স্বামী রতনকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বললেও স্বল্প রোজগারে ভালো চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হয় রতন। গ্রামের এক কবিরাজকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করলেও ক্রমশঃ শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় দোলার। ছোটো একটি মেয়ে আছে। কিছু হলে মেয়ের কি হবে? গাছগুলো পরিচর্যার অভাবে মৃতপ্রায়। কিভাবে ওদের বাঁচিয়ে রাখা যায়। এই চিন্তায় হটাৎ স্ট্রোক করে দোলার। হৃদস্পন্দন নিমেষেই বন্ধ হয়ে যায়। কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা বাড়ি। রতন জানায় শ্মশানে নেওয়ার আগে ফুলেদের কোলে দোলার নিথর দেহ যেন রাখা হয়। কিন্তু দোলার সাথেই বাহারি ফুলের গাছগুলোও যে স্বর্গযাত্রা করেছে। রঙিন ফুলে সুসজ্জিত বাড়ির স্বপ্ন হয়তো চিরকালের জন্য ভঙ্গ হয় রতনের।

এক বছর অতিক্রান্ত। ফাল্গুন এসেছে। পলাশ, কৃষ্ণচূড়া গায়ে আবীর মেখেছে। আগের বছর দোলের সময় দোলার চলে যাওয়াটা এখনো মেনে নিতে পারছে না রতন। উঠোনের সামনে বসে অশ্রুভরা জলে স্মৃতিচারণ করতে থাকে। হঠাৎ চোখ যায় উঠোনের এক কোণায়। বেশ কয়েকটি রঙিন ফুলের গাছ স্বেচ্ছায় জন্মেছে। গাছের লাল, হলুদ ফুলগুলো যেন মনের আনন্দে গাইছে "ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়"। কাছে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে রতন। গাছেরা যেন বলতে চাইছে, ফুলের রূপে দোলের সময় দোলা এসেছে। দোলা আজ নেই, কিন্তু ওই ফুলের মাধ্যমে দোলার স্পর্শ হয়তো ছুঁয়ে যায় রতনকে।



 

আরশি 
সুদেবী গোস্বামী 

পর্ব - এক 

কাঁপা হাতে নিজের গণিতের খাতাগুলোর ধুলো পরিষ্কার করলেন আরশি দেবীl নিঃসঙ্গ স্বামীহারা জীবনl ছেলে বিদেশেl কতবার মনে হয়েছে, "ঠাকুর কেন তাকে নিয়ে নেন না?" একফালি হলুদ আলো তার হাতে এসে পড়লো, ফোনে টাইপ করলেন অক্ষর দুটো, 'distance learning '. আবেদনপত্র পূরণ করতে শুরু করলেন, বিকেল ৫ টায় একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো তার মুখে... নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা থেকে হঠাৎ তার পরিচয় হলো 'শিক্ষার্থী ' l 

পর্ব - দুই 

বার কতক ঠাকুর ঘর থেকে ঘুরে এলেনl দু বছরের শিক্ষার্থী জীবনের পরিনাম আজ l উফ এই রকম দিনগুলোতেই ঘড়ির কাঁটা যেন চলতেই চায় নাl ঠিক সেদিনের মতো বিকেলের আলো তার হাত ছুঁতে এলো, রেজাল্ট ভেসে উঠলো স্ক্রিনে.. আরশি দেবী বি. এস. সি পরীক্ষায় পাশ করেছেনl গণিতে সাম্মানিক সহl

পর্ব - তিন 

আয়নার সামনে দাঁড়ালেন আরশি দেবী, আর কোনো নিঃসঙ্গতা নেই, সংসারের কোনো চাপ নেইl উনি পেরেছেন, বাবার দেওয়া নামের মর্যাদা রাখতে.. ফুরিয়ে যাওয়ার বয়সে সমাজকে এক নতুন আয়না দেখাতে l


 

বইমেলা ও মেয়েটা
 মজনু মিয়া

করিম ভাই, মেয়েটা কাঁদছে কেন? 
আর বলো না,ওকে বই মেলায় নিয়ে যাও! আমি কাজে সারতে পারি না টাকা পয়সাও হাতে নাই। কী করে ওকে বই মেলায় নিয়ে যাই, তুমিই বলো তো রহিম মিয়া?
করিম ভাই, মেয়েটা হয়তো, কোনো বই পছন্দ করেছে, তাই সে বই মেলায় যেতে চাইছে,  সেখানে গেলে পাবে। কিনে আনতে চায়। আসলে টাকা পয়সা সব সময় থাকে না আবার বই মেলাও সারা বছর হয় না।তুমি এক কাজ করো, কালকে আমার সাথে দেখা করে তারপর মেয়েটাকে সাথে করে বই মেলায় নিয়ে যেইও। কাঁদিস না মা, যাসনি দু দিন পর।

এ কথা শোনে মেয়েটা খুশিতে দৌড়ে খেলতে গেলো আর বান্ধবিদের বলতে গেলো। তার পর কানে কানে কী যেন কী রহিম মিয়া করিম মিয়া কে বলে গেলো। যেমন কথা তেমন কাজ, মেয়েটাকে সাথে নিয়ে বই মেলায় রওনা দিলো। যথা সময়ে মেলায় গেলো; ভিতরে বই দেখে মেয়েটার খুশির আর সীমা রইলো না।

কত রকম বই যে মেয়েটা দেখে, তার আনন্দ দেখে করিম মিয়া নিজেও খুশি। ঘুরতে ঘুরতে অনেক দেখা হলো মেয়েটার; পছন্দের বই হলো, ভূতের ছড়া, ভূতের গল্প আরো অনেক অনেক ছড়া গল্পের মজার মজার সব বই। একে একে চার পাঁচটা বই কিনতে চাইলো। করিম মিয়া কিনে দিলো।  অবশেষে করিম মিয়া নিজেও একটা উপন্যাস ও কবিতার বই কিনলো।  আরো অনেক বই তার ভালো লাগলো কিন্তু সামর্থ নাই তাই চলে এলো।

এখন মেয়েটার স্কুলে পড়ালেখা কম, খেলাধুলা হবে তাই, এ সময়ে মেয়েটা সময় পেলেই বই পড়ে আর খলখল করে হেসে উঠে,আবার ছড়া পড়ার তালে তালে  নাচে; কি ভালোই লাগছে তার, এ অবস্থা দেখে করিম মিয়া ক্ষণে হাসে, আবার চুপ করে,এ দৃশ্য রহিম এসেও যখন চুপেচুপে দেখে তখন সেও আনন্দ পায় আর মেয়েটাকে কাছে ডেকে আদর করে বলে, তুমি অনেক বড় হও মা।


 

মাছ
সুদীপ ঘোষাল


সংসার চালাতে হয় আয় বুঝে। ব্যয় করতে হয় সামর্থ্য বুঝে।

সনাতনের ষাট বছর বয়স। এখন হিসেব করে, গুছিয়ে, চিন্তা ক'রে চলতে হয়।
 
সনাতন কাউন্সিলর ছিল যখন, তখন রোজ সকালে একটা পাঁচশ টাকা বের করে বলত, `সব থেকে বড় মাছটা দিবি, চালাকি করবি না,`আমারটা যেন সব থেকে বড় মাছ হয়।`
 
বাজারে সকলে আড়ালে লুকিয়ে বলত, সনাতনবাবু রোজ সকালে পাঁচশ টাকার নোট কোথায় পান? 
অবাক কান্ড, রোজ সকালে পাঁচশ টাকার নোট ভাঙিয়ে তার দিন শুরু হয়।

তারপর কত বসন্ত দীর্ঘশ্বাস  ফেলে এগিয়ে গেল। রাজনীতির গতিপথ পাল্টায়, দিন পাল্টায় আর তাল মিলিয়ে পাল্টায় সকলের জীবনের গতিপথ।

এখনও বাজারে যেতে হয় তাকে। তার ছেলেটা তাকে পাশ কাটিয়ে কলকাতায় বউ, ছেলে নিয়ে সুখে আছে। তার স্ত্রী রুগ্ন, তবু কাজ করেন। এখনও দুবেলা দুমুঠো খান। বাজার থেকে ফিরলে ,সনাতনের স্ত্রী ব্যাগ খোলেন আর বের করেন, 'একশ গ্রাম চুনোমাছ'। 
- কত দাম নিলো গো। চুনোমাছগুলো খুব টাটকা।
সনাতন বলেন, 
- চুনোমাছও তিনশ টাকা কেজি গো। আর মাছ খাওয়া যাবে না, পৌষমাস চিরকাল থাকে না গো।পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।
তার স্ত্রী বলেন, `ঠিক বলেছো,দুঃখ কোরো না। রোজ মাছ খাওয়ার কী প্রয়োজন। আলুসিদ্ধ আর ভাত হলেই আমাদের বেশ চলবে দুজনের। জীবনে কত মাছ তো খেলাম, বলো?`
সনাতন ভাবেন, এবার বোধহয় আর মান রাখা যাবে না। ক্রমশ জীবন, যৌবন একদিন শুকিয়ে যায় শীর্ণ নদীস্রোতের মত।
সনাতনের স্ত্রী জানেন, সনাতন শুকনো কিশমিশের মত, মরমে মরে শুকিয়ে গেছেন অনেক আগেই।এখন কেবল অতীত নিয়েই  বেঁচে আছে। এখন তার জীবনটা পাকা ফলের মত। কবে যে ঝরে পড়বে, কে জানে!


 

কুর্নিশ তোমায় সন্তান

    রাণা চ্যাটার্জী 



সেদিন রবিবারের মাছের বাজারে উৎসুক ক্রেতার ইলিশ মাছ কেনার ভিড়ে আমিও ছিলাম। পেছন থেকে হঠাৎ এক কাতর গলায় কে যেন বলল, "বাবু এক টুকরো মাছ দেবেন, অসুস্থ বাবাকে খাওয়াবো।" এমন আবদার তো প্রায়শই কানে আসে কিন্তু এখানে বাবা শব্দটি জুড়ে দিয়েছে তাই পেছনে ঘুরে তাকালাম। দেখি একটা শীর্ণকায় লম্বা লোক, কাঁধে ছোট বাচ্চাকে চাপিয়ে হাত পেতে মাছের অনুরোধ করছে। মাছ দোকানী অমনি সরু কঞ্চিটা তুলে সপাত করে পিঠে এক ঘা দিতেই বাচ্চাটা ভয়ে কেঁদে উঠলো তার বাবাকে মার খেতে দেখে। রাস্তায় কত ঘটনার সাক্ষী হই আমরা, তবু এটা মনে দাগ কেটে গেছিলো সেদিন।

আরেকটা দিন অফিস যাচ্ছি, আরে সেই লোকটাই তো! আজ কোনও বাচ্চা ছেলে নয়, নিজের পিঠে বৃদ্ধ বাবাকে চাপিয়ে দেখি ঝুঁকে টলমল করে হাঁটছে। সামনে কিছুটা এগিয়ে দাঁড় করিয়ে বললাম, ``আচ্ছা তোমাকেই তো,সেদিন মাছ বাজারে দেখলাম।`` শান্ত হয়ে বললো, ``হ্যাঁ দাদা। বাবা পায়ে জোর পাচ্ছে না ,এদিকে ডাক্তারবাবু ভালো ভালো খাবার খেতে বলেছেন!`` কথাগুলো বলতে গিয়ে তার গলায় হতাশা ঝরে পড়লো, তবু যেন ওর মধ্যে একটা হার না মানা দৃঢ়তা, যেটা আমার শ্রদ্ধা কেড়ে নিচ্ছিল!তাকিয়ে দেখলাম নিজের ওজনের ভারে নুইয়ে যাওয়া অথচ নিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করা ছেলের পিঠে বসা বৃদ্ধ মানুষটির চোখে জল! এমন দৃশ্যে আমি ভীষণ বিহবল হয়ে গেলাম। ওরা হাসপাতাল যাচ্ছে জানতে পেরে একটা টোটো দাঁড় করে চাপালাম। বিশদে জেনে নিলাম শহরের কোনদিকে ওরা থাকে, ওদের পাশে দাঁড়াতে তো আমায় হবেই! নিজেকেই মনে মনে বললাম এ জীবনে অসহায় আরো কিছু মানুষকে যদি উজ্জীবিত করতে পারি আর কি চাই, এ খুশির ভাগ হবে না।