পরিপূরক
Tuesday, March 3, 2026
ফেরা
মনোরঞ্জন ঘোষাল
অয়ন যখন বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। দশ বছর পর এই চেনা কড়াটা নাড়তে গিয়ে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। বড় চাকরি, বিদেশের ব্যস্ততা আর নাগরিক কোলাহলে সে ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধমাখা গ্রামটার কথা।
দরজা খুললেন তার মা। সাদা চুলে একটু বেশি রূপালি আভা ধরেছে, চোখের কোণে বলিরেখাগুলো আরও গভীর। অয়নকে দেখেই মা থমকে দাঁড়ালেন। বিস্ময় কাটিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আসলি শেষমেশ?"
অয়ন ভেবেছিল মা হয়তো অভিমানে ফেটে পড়বেন, জানতে চাইবেন কেন সে এতগুলো বছর একটা ফোন পর্যন্ত ঠিকমতো করেনি। কিন্তু মা কেবল তার হাতটা ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন, "তোর প্রিয় নারকেল নাড়ু করে রেখেছি। আজ সকালেই মনে হচ্ছিল তুই আসবি।"
অয়ন অবাক হয়ে দেখল, ঘরের কোণে তার সেই ছোটবেলার ভাঙা সাইকেলটা আজও রাখা। পড়ার টেবিলের ধুলো ঝেড়ে মা সব বইগুলো গুছিয়ে রেখেছেন। যেন এই দশটা বছর সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল তার প্রতীক্ষায়।
রাতের নিস্তব্ধতায় অয়ন যখন পুরনো বিছানায় গা এলিয়ে দিল, তার মনে হলো—শহরের ওই কাঁচঘেরা অট্টালিকা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তিটা এখানেই জমা ছিল। সাফল্যের ইঁদুর দৌড়ে সে আসলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। আজ মায়ের হাতের সামান্য ডাল-ভাতের স্বাদে সে খুঁজে পেল সেই হারানো অস্তিত্বকে।
বিদেশের ফ্লাইটের টিকিটটা মনে মনে বাতিল করে অয়ন জানলার বাইরে তাকাল। জোনাকি জ্বলছে। আজ অনেক বছর পর সে কোনো দুঃস্বপ্ন ছাড়া শান্তিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।
সেরা
স্মৃতিকনা
কুণাল গোপ
মধু নাম
তোমার সাথে আমৃত্যু দেখা না হোক
মহঃ সানোয়ার
জন্মদিন
দৌড়
অভিজিৎ সেন
উপহার
চিত্রা পাল
একমাত্র মেয়ের বিয়ে, তাই কাউকেই নেমন্তন্নর লিস্ট থেকে বাদ দিচ্ছে না সুপ্রভা। তারমধ্যে ওর ছোটকাকার ছোট মেয়ে মণিও বাদ যায়নি। মণির নামে বিয়ের নেমন্তন্ন পত্র দেখে সুধীনবাবু বলেই ফেললেন, তুমি একেও আনতে চাইছো, দেখো তখন আবার কোন গন্ডগোল না হয়। সুপ্রভা বলে, সে তখন দ্যাখা যাবে। ও আমার কোলেই বড় হয়েছে, ওকে বাদ দিই কি করে। না না ওকে আমি বাদ দিতে পারবো না।আসলে ওর নিজের পছন্দের বিয়ে আর আর্থিক অবস্থাও তেমন নয় সব মিলিয়ে মণিকে সবাই দূরেই রেখে ছিল।
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেলো। মণি বিয়ে বাড়িতে যেন এলো, দেখলো জয় করলো এমনতর। আইবুড়ো ভাত থেকে বৌভাত সবেতেই মণি একেবারে কাজেকর্মে হৈচৈ করে আনন্দ করে একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলো। পরের দিন সকালে যখন বিদায় নিল, তখন সকলের চোখে জল।সবাই বলছে তুই আর দুটো দিন থেকে যা না।
দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে সবাই বসলো উপহারের পসরা নিয়ে। কে কি দিয়েছে তা আর একবার করে দেখে নেওয়া। সবাই সবায়েরটা দেখলো, কিন্তু মণি কি দিয়েছে তা খুঁজে পাওয়া গেলো না। বেশ খানিকক্ষণ পরে মেয়ে লিলি একঘুম দিয়ে এসে দ্যাখে উপহারের ঢিবির মধ্যে সবাই মণির উপহার খুঁজছে।লিলি বলে ,’তোমরা কি খুঁজছো গো?’ তখন সেজমাসী বলে,’হ্যাঁরে, মণি কি দিয়েছে রে?’ লিলি বলে,ওমা,সেতো আমি মাকে দিলুম মা বললে, রেখে দে। তখন সুপ্রভা বলে, কোনটা বলতো?লিলি বলে, ওই যে রুপোর চাবির রিং।রুপো না মাথা কি একটা যেন। তখন হলো উল্টো কথাবার্তা। অনেক নিন্দেমন্দ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য। সুপ্রভা বলে একটা মেয়ে ক দিনযে আনন্দে হাসিতেকাজেকর্মে বাড়িটাকে ভরিয়ে দিয়েছিলো সেটা কি কম,সেটাই তো বড় পাওয়া।
তোমার সন্ধানে
তন্ময় কবিরাজ
বোধোদয়
মিত্রা রায়চৌধুরী
খুঁজতে খুঁজতে
অনুষ্টুপ রায়
১
লোকটাকে মাঝে মাঝেই দেখি। মাঝে মাঝে বলতে গ্রামে বন্ধুর বাড়িতে এলে। সরাসরি কথা হয়নি কখনো। বন্ধুর সাথে ওনার আলাপ তাদের দুজনের মাঠেঘাটে ঘোরার সময়। শুনেছি তিনি দক্ষ চিত্রকর।
শংসাপত্র বোধহয় নেই। পড়ার খরছ জোগাতে না পারায় আর্ট কলেজ ত্যাগ। এখন ঘুরে ঘুরে আঁকা শেখান। মেলাতেও বসেছেন নানান হাতে তৈরি ঘর সাজানোর জিনিস নিয়ে। তবে কোনোটাতেই খুব একটা জুত হয়নি।
শেষমেশ সংসার চালাতে মোমোর দোকান দিয়েছেন। তবে আঁকা থামেনি। দেওয়াল লিখন থেকে পুজো উপলক্ষে প্যান্ডেল সজ্জা সবই করে চলেছেন। স্থায়িত্বের অভাবটা বড় হয়ে উঠেছে বহু সময়ে।
এই অবধি পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে: এটা গল্প? নাকি কোনো মানুষের বাস্তব চিত্র আশ্রিত গদ্য? লেখক হিসেবে উত্তর- এই দুইয়ের মাঝামাঝি। ধরা যাক, এই গল্পের লোকটা অনেক খেটে খাওয়া মানুষের প্রতীক।
তা এই লেখার বিষয়টা ঠিক কি? শিল্পের সাথে রুজি লড়াই? নানা কোনো বাইনারি বাঁধতে চাইনা। স্বল্প পরিসরে, ঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ। যা আমি চাক্ষুষ করেছি। তা বাকিদের সাথে ভাগ করে নেওয়া।
২
এক সময়, লেখক আর চিত্রকরের আলাপ। ঠিক হলো, নিজেদের অভিজ্ঞতা কে লেখা ও আঁকার মধ্যে ফুটিয়ে তুলবে তারা। যার মাধ্যমে আলাপ, তার কী ভূমিকা? সে কবি। ছড়া বাঁধে, বই পড়ায়, পেট চালাতে ছাত্র পড়ায়।
তা তাদের উদ্যোগ কেমন এগোচ্ছে? মন্দ নয়। তবে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে? আরে নানা! তা না, লোকে ছবি দেখে পাড়ার দেওয়ালে, সাথে খানিক গদ্য বা পদ্য সময় পেলে পড়ে।
খরছ আর আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। চিত্রকর আঁকার সময় বা লেখক/কবি রচনার সময় পাশে গামছা রাখা থাকে। তবে তা দিয়ে রং কেনার খরচও ভালভাবে ওঠেনা! তবে তারা চেষ্টা করবে না থামার।
পোস্ট বাক্স
অনিতা নাগ
রঙের রাগ
কবিতা বণিক
দোলের ফুল
দোল এগিয়ে আসছে। শরীরটা ভালো নেই। পেটে ক্যান্সার হয়েছে, যন্ত্রণাটা বেড়েছে। শ্বাসকষ্ট হয়, বুকে চিন্চিন্ ব্যথা অনুভব হয় কখনো। তার স্বামী রতনকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বললেও স্বল্প রোজগারে ভালো চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হয় রতন। গ্রামের এক কবিরাজকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করলেও ক্রমশঃ শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় দোলার। ছোটো একটি মেয়ে আছে। কিছু হলে মেয়ের কি হবে? গাছগুলো পরিচর্যার অভাবে মৃতপ্রায়। কিভাবে ওদের বাঁচিয়ে রাখা যায়। এই চিন্তায় হটাৎ স্ট্রোক করে দোলার। হৃদস্পন্দন নিমেষেই বন্ধ হয়ে যায়। কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা বাড়ি। রতন জানায় শ্মশানে নেওয়ার আগে ফুলেদের কোলে দোলার নিথর দেহ যেন রাখা হয়। কিন্তু দোলার সাথেই বাহারি ফুলের গাছগুলোও যে স্বর্গযাত্রা করেছে। রঙিন ফুলে সুসজ্জিত বাড়ির স্বপ্ন হয়তো চিরকালের জন্য ভঙ্গ হয় রতনের।
এক বছর অতিক্রান্ত। ফাল্গুন এসেছে। পলাশ, কৃষ্ণচূড়া গায়ে আবীর মেখেছে। আগের বছর দোলের সময় দোলার চলে যাওয়াটা এখনো মেনে নিতে পারছে না রতন। উঠোনের সামনে বসে অশ্রুভরা জলে স্মৃতিচারণ করতে থাকে। হঠাৎ চোখ যায় উঠোনের এক কোণায়। বেশ কয়েকটি রঙিন ফুলের গাছ স্বেচ্ছায় জন্মেছে। গাছের লাল, হলুদ ফুলগুলো যেন মনের আনন্দে গাইছে "ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়"। কাছে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে রতন। গাছেরা যেন বলতে চাইছে, ফুলের রূপে দোলের সময় দোলা এসেছে। দোলা আজ নেই, কিন্তু ওই ফুলের মাধ্যমে দোলার স্পর্শ হয়তো ছুঁয়ে যায় রতনকে।
সংসার চালাতে হয় আয় বুঝে। ব্যয় করতে হয় সামর্থ্য বুঝে।
কুর্নিশ তোমায় সন্তান
রাণা চ্যাটার্জী


























